মজার খবর পড়লাম একটা। খাসিয়াপুরুষদের খুব মন খারাপ। মেয়েদের অন্যায় অবিচার আর সহ্য করতে পারছেনা তারা। সত্যিকার অর্থে কোনও অধিকারই নেই তাদের। মেয়েরা যা বলবে তাই করতে হবে। যা খেতে দেবে তাই খেতে হবে, যা পরতে বলবে তাই পরতে হবে। শত শত বছর ধরে চলছে এই অপমান। আর নয়। এবার এর একটা বিহিত করতে চায় তারা। তারা সংঘবদ্ধ হবে, আন্দোলন করবে, মিছিল করে রাস্তায় নামবে, জোরগলায় ঘোষণা করবে তাদের দাবিদাওয়া। খাসিয়ার পুরুষরা এক নতুন ধরণের আন্দোলন সৃষ্টি করতে যাচ্ছেঃ নরস্বাধীনতার আন্দোলন। বাইরের পৃথিবীতে মেয়েরা যেমন আদায় করে নিচ্ছে তাদের ন্যায্য অধিকার, খাসিয়া পুরুষও তেমনি আদায় করবে তাদের অধিকার।
বিশ্বজোড়া আদিবাসী সমাজের একটা বড় অংশ একসময় নারীভিত্তিক ছিল। তাদের সংখ্যা হ্রাস পেতে পেতে এখন হাতে গোনার অবস্থায় এসে গেছে। ভারতের উত্তর-পূর্ব পর্বতসংকুল মেঘালয়া অঞ্চলের খাসিয়া সম্প্রদায়টি তার অন্যতম। তাদের সংখ্যা আনুমানিক ১০ লক্ষ। তারা যে এখনও টিকে আছে তাদের সনাতন রীতিনীতি আর আচার অনুষ্ঠান অক্ষুন্ন রেখে ত্তার প্রধান কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা। ভারতের সংবিধানে আদিবাসী সমাজের জীবনধারা ও সংস্কৃতিকে সসম্মানে সংরক্ষিত রাখার প্রতিশ্রুতি দ্ব্যর্থহীনভাবে লিপিবদ্ধ। আদিবাসী কেবল নয়, যেকোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরই পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে তাদের নিজ নিজ ঐতিহ্য বজায় রেখে মুক্তভাবে জীবনযাপন করার।
খাসিয়া পুরুষদের জন্যে সেটাই হয়েছে বড় বাধা---বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে পা মিলিয়ে তাদের সমাজও যে আধুনিকতার পথে দ্রুত অগ্রসর হবে তার কোন তাড়া নেই, নেই কোনও উদ্দীপনা। ক্ষমতাবান সমাজপতিদের (পতি না বলে কি পত্নী বলা উচিত?) জন্যে স্থিতাবস্থাই আদর্শাবস্থা---পরিবর্তন তাদের স্বার্থবিরোধী। তারা পরিবর্তনের যেকোন প্রচেষ্টাকে প্রতিরোধ করবার চেষ্টা করবে সকল শক্তি প্রয়োগ করে।
কিন্তু ক্ষমতাহীন পুরুষকূলের একটা বড় অংশ এখন অধৈর্য হয়ে উঠছে পরিবর্তনের জন্যে। কৈথ পারিয়াত নামক এক ৫৮ বছর বয়স্ক খাসিয়া পুরুষের নালিশঃ আমাদের কিছু করার নেই। আমরা কেবল খাইদাই ঘুমাই, গীটার বাজাই, আড্ডা মারি, আর সন্তান উৎপাদন করি। এর বাইরে আর কিছু করতে দেওয়া হয়না আমাদের।
নালিশগুলো একেবারে হেসে উড়িয়ে দেবার মত নয়। পুরুষ হিসেবে আমার এক মন বলবেঃ সুখে আছো তো মিয়ারা, বোঝনা সংসার কাকে বলে। আমাদের মত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ভাতকাপড়ের পয়সা রোজগার করতে হত, তাহলে বুঝতে কত ধানে কত চাল।অবশ্য আরেক মন, ঠাণ্ডা মাথার যুক্তিশীল মন, ভাল করেই জানে বেচারা খাসিয়াদের কেন এত ক্ষোভ। মেয়েদের এতই দাপট সেখানে যে উত্তরাধিকার আইনে পুরুষের কোনও স্থান নেই---সব সম্পত্তি মেয়ের ভাগে যাবে। কোন পরিবারে কন্যাসন্তান না থাকলে ওরা কি করে জানেন? বাইরের একটি মেয়েকে দত্তক নিতে হয় পরিবারটিকে, যাতে সেই মেয়ে সম্পত্তির মালিক হতে পারে!(পুরুষশাসিত সমাজে কি এতটা অবিচার হয়?)বিয়ের পর আমাদের মত খাসিয়াবাড়ির মেয়েরা চোখের জলে লুটোপুটি হয়ে শ্বশুরবাড়ি যায় না, বরং ছেলেরাই যায় শ্বশুরালয়ে (কান্নাকাটি হয়ত তারাও করে কিঞ্চিৎ), এবং সেখানেই সংসার পাততে হয় তাদের। শুধু তাই নয়, শ্বশুরালয়ে আবাস নেবার পর নিয়ম হলঃ ছেলে বেশি কথাবার্তা বলবে না, যা বলার শ্বাশুরিই বলবে, আর বলবে তার স্ত্রী। সমাজের কোনও জরুরি বৈঠকে তাদের প্রবেশাধিকার নেই। গোত্রবিষয়ক যা কিছু সিদ্ধান্ত নেবার সব মেয়েরাই নেয়---পুরুষদের কোন হাত নেই।
অতএব তারা যে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ ঘোষণা করবে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এটাই স্বাভাবিক, বিশেষ করে আধুনিক যুগের পরিপ্রেক্ষিতে। আগেকার দিনে যখন খাসিয়া পুরুষরা শিকারের খোঁজে দীর্ঘ সময় ব্যাপী বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত তখন অতটা গা করত না তারা---বাড়ি ফেরার পর কিছুটা সমাদর পেত বইকি মেয়েদের কাছ থেকে। কিন্তু বর্তমান যুগের নতুন জীবনধারাতে শিকারের প্রয়োজন প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে খাসিয়া পুরুষ একরকম গৃহবন্দী---বেকার এবং নিষ্ক্রিয়। হতাশার মাত্রা এতটাই বেড়ে গেছে যে অনেকে গাঁজা খেয়ে, তাড়ি খেয়ে মন থেকে সে-হতাশা দূর করে সবকিছু ভুলে থাকবার চেষ্টা করছে। নারীর এমনই প্রতাপ খাসিয়া সমাজে যে কোনও পরিবারে স্বামীস্ত্রীর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে সন্তানের একক অধিকার স্ত্রীর, স্বামীর কোন ভূমিকাই থাকে না তাতে। স্ত্রী যদি একটি দুষ্ট চরিত্রের মেয়ে হয়, সন্তানপালনের মোটেও কোন যোগ্যতা নেই, ওদিকে স্বামী একজন সাধুসজ্জন পুরুষ বলে সর্বজনস্বীকৃত, তাহলেও সেই অযোগ্য মেয়েই পাবে সন্তান, সুযোগ্য পুরুষটি নয়। অর্থাৎ পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের যেরকম লাঞ্ছনা নারীশাসিত সমাজে পুরুষের লাঞ্ছনা তার চেয়ে খুব একটা কম নয়। তাই খাসিয়া পুরুষরা পশ্চিমের নারী আন্দোলনের অনুকরণে একটি ‘মেনস লিব’ বা নরস্বাধীনতা আন্দোলন সূচনা করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
নারীপুরুষের সম্পর্ক আর পরিবার বিষয়ে নারীশাসিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী একেক গোষ্ঠীতে একেকরকম। কোথাও খুব ঢিলেঢালা কোথাও বেশ কড়া। খাসিয়াদের মধ্যে বহুবিবাহ কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ। বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ। বেশির ভাগ বিয়ে নিজ নিজ গোত্রের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে, যদিও তাদের কোন কোন শাখায়গোত্রান্তর বিবাহ খুব বিরল নয়। যৌনসম্পর্ক আর বিয়েশাদীর ব্যাপারে ওদের দৃষ্টিভঙ্গী অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়। তবে এটুকু বোধ হয় নির্দ্বিধায় বলা যায় যে ছেলেমেয়ের যৌনসম্পর্ক বিষয়ে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টিভঙ্গী আমাদের চাইতে অনেকটাই উদা্র---অনেকটাই সুস্থ ও স্বাভাবিক। উদারতার মাত্রা অবশ্য একেক সমাজে একেকরকম। খাসিয়াদের মধ্যে এটা বেশ সংযত, কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব চীনের ইউনান অঞ্চলে মসৌ নামক যে জাতিটির বাস সেখানে কোনরকম লাগাম নেই এব্যাপারে। বেসামাল যৌনাচার বলতে পারেন---আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে নিঃসন্দেহে তাই। মসৌ সমাজে মেয়েরাই বাছাই করে কোন পুরুষকে তারা ঘরে আনবে, এবং কোন রাতে। বিয়শাদির বালাই নেই---ইচ্ছে হলে করবে, নইলে করবে না। এবং ইচ্ছেটা ছেলেদের নয়, মেয়েদের। একই পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে সবসময়, বা একই সময়, তারও কোন অর্থ নেই। মেয়ের ইচ্ছে হলে একেক রাতে একেক পুরুষ আসবে তার ঘরে। একটা পুরুষ যে নিশাযাপন করতে এসেছে তার ঘরে সেটা সে জানান দেয় বাইরের বেড়ায় একটা রঙ্গিন গামছা ঝুলিয়ে রেখে! অনেকটা হোটেলের দরজায় “ডু নট ডিসটার্ব” সাইন ঝুলিয়ে রাখার মত। ওদের সমাজে প্রথাটি এতই স্বাভাবিক যে একে নিয়ে মুখ টিপে হাসাহাসি ঠাট্টামস্করা করার কল্পনাই করে না তারা। এটাই নিয়ম, সংস্কৃতির অংশ। আমাদের তথাকথিত “সভ্য” সমাজের দৃষ্টিভঙ্গীতে এগুলোকে তীব্র ঘৃণার চোখে দেখা হবে জানি, “দোজখেও জায়গা হবে না” বলে ঢালাও মন্তব্য করবে অনেকে, কিন্তু মজার ব্যাপার যে মসৌ সমাজে যৌনঅপরাধ নামক কোন জিনিস নেই, ধর্ষণ কাকে বলে জানেনা তারা, বিকৃত যৌনাচার ওদের অজানা---ওই সমাজে আইনশৃংখলা রক্ষার জন্যে পুলিশবাহিনী মোতায়েন করার প্রয়োজন হয়না। ওদের মত শান্তিপূর্ণ সমাজ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। সুতরাং বিচারকের আসনে বসে অঙ্গুলি উত্তোলন করে ওদের “চরম চারিত্রিক পতনের” জন্যে গুরুদণ্ড জারি করার আগে একটু ধীরমস্তিস্কে ভেবে দেখা দরকার একটা সমাজের শেষ লক্ষ্যটা কি। মসৌ সমাজে বিয়ে জিনিসটাই একটা ন্যাক্কারজনক বিষয়। ছিঃ বিয়ে করে কে?—এমন একটা ঘিনঘিন ভাব। বাড়ির ছেলেমেয়েদেরদুষ্টুমি একটু মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে বাবামা ওদের ভয় দেখায় বিয়ে দিয়ে দেবে বলে। বিয়ের ভয়ই তাদের বড় শাস্তি! আমাদের কাছে অভাবনীয় এসব---কিন্তু ওদের জন্যে এ’ই স্বাভাবিক।
তবে একটা মৌলিক বিষয়ে প্রতিটি উপজাতিরই দৃষ্টিভঙ্গী এক---নারী হলেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। পুরুষের কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেই সমাজে। তাদের কোনও দায়দায়িত্ব নেই। তাদের কোন সাংবিধানিক অধিকার নেই। খাসিয়া পুরুষ ক্ষুব্ধ। সম্ভবত মসৌ পুরুষও ক্ষুব্ধ। একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি যুগে কোনও সমাজের একটা অংশ আরেকটা অংশ দ্বারা দিবারাত্র পরিপূর্ণভাবে শাসিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে সেটা মুখ গুঁজে সহ্য করবে না কেউ। মসৌ পুরুষরা দলে দলে গোত্রত্যাগ করে নাগরিক জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠছে। খাসিয়া তরুণরাও আস্তে আস্তে শহরমুখি হচ্ছে। কালে কালে এই প্রাচীন সমাজগুলো যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যুগের হাওয়াতে তাতে কোন সন্দেহ নেই। অধিকাংশ সমাজ হয়েছে। এটা দুঃখজনক সন্দেহ নেই, কিন্তু একেই বলে সামাজিক বিবর্তন---এটা অবধারিত।
একটা অস্বস্তিকর চিন্তা কিন্তু থেকেই যায় শেষ পর্যন্ত। আদিসমাজ যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তখন থাকবে কেবল আমাদের এই “সভ্য” সমাজ। সত্যি কি পুরোপুরি সভ্য হতে পেরেছি আমরা? এত এত ধর্মযাজক এলেন আমাদের মধ্যে, নিয়ে এলেন এত এত মহৎ বানী, শোনালেন এত এত নীতিবাক্য, কই, আমাদের পুরুষগুলো তো প্রায় একইরকম আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে নারীর ওপর। “অসভ্য”দের নারী-পুরুষের সামাজিক অসমতার নিন্দায় মুখর হই আমরা, আমাদের অসমতা কি তার চেয়ে খুব বেশি স্বতন্ত্র? আমাদের নারী কি পুরুষের চাবুকের বাড়ি খাচ্ছে না এখনো?আমাদের নারী কি ধর্ষিত হচ্ছে না অহরহ?এবং ধর্ষিত হবার পর পরিবারের ধিক্কারের শিকার হচ্ছে না অনেক জায়গায়?অর্থাৎ ধর্ষিতা হওয়াটিকেও দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য করা হয় না সেসব সমাজে?এমনকি পশ্চিমের অত্যুন্নত সমাজেও কি সব অসমতার সমাধান হয়ে গেছে?যেখানে হয়েছে সেখানে কি উল্টোরকম একটা বৈষম্য তৈরি হয়ে যাচ্ছে না?অর্থাৎ নারীর অধিকার পাচ্ছে না অগ্রাধিকার পুরুষের তুলনায়?
মূল কথা বোধ হয় এই যে মানবসমাজ যত চেষ্টাই করুক না কেন একটা ন্যায়নিষ্ঠ পূর্ণ মানবাধিকারভিত্তিক জনগোষ্ঠী রচনা করা, পূর্ণ সমতা রক্ষা করা মানবপ্রকৃতির বাইরে। ভারসাম্য আমরা কোনদিনই রক্ষা করতে পারিনি। ভবিষ্যতে কোনদিন পারব সে আশা অন্তত আমার নেই।
নারীপুরষের সামাজিক অসমতা ও বৈষম্য থেকে কোন জাতিই পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি আজ পর্যন্ত। অতি প্রাচীন সমস্যা এটি। উপজাতিদের বেলায় কেবল নয়, এটা সব জাতিরই সমস্যা। এ-নিয়ে বিশিষ্ট চিন্তাবিদরা যুগে যুগে অনেক চিন্তাভাবনা করে গেছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন জর্জ বার্নার্ড শ’। তাঁর শেষ দিককার একটি নাটকে তিনি এক অভিনব সমাজের নকসা এঁকেছিলেন যাতে কোনও জাতি তার নেতা নির্বাচন করাকালে একজন নেত্রীও নির্বাচন করবে---অর্থাৎ নেতা-নেত্রীরা জোড়ায় জোড়ায় থাকবেন, একা পুরুষ বা একা নারী নন। মৌলিক প্রস্তাব, কিন্তু মানবপ্রকৃতির ভেতরেই যদি প্রোথিত থাকে ভারসাম্যতার অভাব তাহলে বার্নার্ড শ’র আদর্শ জাতি যে তাঁর নাট্যমঞ্চেই সীমাবদ্ধ থাকবে সেটা তো খুবই স্বাভাবিক।
(মীজান রহমানের এই লেখাটি নতুন দেশ থেকে নেওয়া।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

