somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আর কতো মেধাবীর জীবন চাই তোমার হে বাংলাদেশ?

১৪ ই আগস্ট, ২০১১ রাত ২:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লিখতে গিয়ে বারবার কান্না পাচ্ছে। লজ্জা লাগছে এই দেশের নাগরিক হিসেবে। মিশুক স্যারের সঙ্গে আমার সেভাবে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ হয়নি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের কর্মী হিসেবে তারেক ভাইয়ের সঙ্গে আমার যোগযোগটা ছিলো। মেধাবী এই দুজন মানুষই বিদেশ ছেড়ে দেশে এসেছিলেন স্বদেশকে কিছু দেবেন বলে। কিন্তু প্রিয় স্বদেশ তাদের দিলো গাড়ি চাপা। আর আমরা দেশের মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে কেবল দেখলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের অত্যন্ত সুহৃদ ছিলেন তারেক মাসুদ। ওই সংসদের কর্মী এবং পরে সাধারান সম্পাদক হিসেবে টানা ছয়-সাত বছর আমি কাছ থেকে তারেক ভাইকে দেখেছি। আমরা ডাকলেই চলে আসতেন তারেক ভাই। স্বপ্ন দেখাতেন সেলুলয়েডের গল্প বুননের। চলচ্চিত্র নির্মাতা না হতে পারলেও চলচ্চিত্র সংসদের কর্মী হিসেবে আমি মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনতাম। স্বপ্ন দেখতাম।

কি অসম্ভব স্বপ্নবাজ আর সাহসী মানুষই না ছিলেন তারেক মাসুদ! মুক্তির গান তাঁর সেই সাহসেরই প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের কোন প্রেক্ষাগৃহ যখন তাঁর ছবি মুক্তি দিতে রাজি হচ্ছিল না তখন নিজেই সারাদেশ ঘুরে তারেক ভই সেই ছবি দেখিয়েছেন দর্শকদের। সর্বশেষ ছবি রানওয়ে। এ নিয়ে সারাদেশে মিশুক মনিরকে নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। বাঙ্গালিকে মুক্তির গান শুনিয়েছিলেন তারেক ভাই। বানচ্ছিলেন একের পর এক দুর্দান্ত ছবি।

সামনে যখন দেশকে কেবল দেবার দিন, জাতিকে সমৃদ্ধ করার দিন তখনই তারেক ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আসলে তারেক ভাই চলে গেলেন নাকি আমরা তাকে রাখতে পারলাম না? এটি কি কেবলই মরে যাওয়া। কেবল তারেক ভাই নয়, এদেশের আরেক মেধাবী চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির, তারেক ভাই যার শীর্ষ্য ছিলেন সেই সেই আলমগীর ভাইও মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায়।

আজ সকালে এসাইনমেন্ট ছিলো প্রেসক্লাবে। সেটি শেষ করে আসছি এমন সময় প্রথম আলো থেকে একটি ফোন। তারেক মাসুদ আর মিশুক মনির মারা গেছে। পরিবারের কারো সঙ্গে কথা বলতে হবে। মিশুক মনিরের ছোট ভাই আসিফ মুনীরের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ যোগযোগ। সঙ্গে সঙ্গেই ফোন দিলাম আসিফ ভাইকে। আসিফ ভাইয়ের কথাগুলো যেন ভেঙ্গে ভেঙ্গে আসছে। ফোন রাখার পর চোখ ভিজে এলো আমারও।

মিশুক মনির এদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরীর ছেলে। বাবার মতোই দেশের জন্য কিছু করার কথা ভাবতেন মিশুক স্যার। কখনো নিজের কথা ভাবেননি। সাংবাদিকতাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরি ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন একুশে টিভিতে। খুঁজে নিতে চাইছিলেন সত্যিকারের সাংবাদিকতাকে। কানাডার একটি টেলিভিশনের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন মিশুক স্যার। কাজ করেছেন বিবিসি, ন্যাশনাল জিওগ্রোফিতে। কিন্তু দেশের প্রতি যে টান সেই টানেই কানাডা কিংবা আমেরিকা ছেড়ে বারবার ফিরে এসেছেন দেশে।

দুপুরে দুজনের চলে যাওয়ার খবর শুনে কেবল একটা কথাই মনে হচ্ছিল-এই যে এতো দেশের কথা ভাবছি সেই দেশ কি আমাকে বেঁচে থাকার নিরাপত্তাটা দিতে পরেবে? মিশুক স্যার আর তারেক ভাই দুজনেই তো বিদেশ ছেড়ে দেশে এসেছিলেন। কি দিলাম বিনিময়ে আমরা তাদের। তাদের মরে যাওয়ার খবরে আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী আর মন্ত্রীরা শোক বার্তা দিয়েই খালাস। লজ্জা করে না এই সরকারের যোগযোগ মন্ত্রীর? লজ্জা করে না শেখ হাসিনার? লজ্জা করে না এদেশের রাজনীতিবিদদের? আর কতো মানুষ মরলে আপনাদের মনে হবে, এইইবার রাস্তাটা একটু ঠিক করি। আর কতো মানুষ মরলে আপনাদের মনে হবে নিরাপদ সড়ক করি? আর কবে আপনাদের বিবেক জাগবে?

মন্ত্রীদের দিয়ে দোষ দিয়ে লাভ কি? দোষ তো আমাদের মতো জনতার। প্রতিদিন এতো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মরে তাও আমাদের লজ্জা হয় না। আমরা চামড়া মোটা নির্বোধ হয়ে গেছি। কতাই প্রতিবাদ করে আমরা কেউ-ই রাস্তায় নামি না। কেউ-ই সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করি না সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধের জন্য; সড়ক ঠিক করার জন্য। কিন্তু যার স্বজন হারায় তিনিই জানেন এই কষ্ট। আপনার-আমার কোন আত্মীয়-ভাই-বোন-বাবা মা যখন কেউ মারা যাবে তখন আমরাও বুঝবো এই কষ্ট।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে বাংলাদেশের সব মন্ত্রী কি জীবন দিয়ে কি একটা তারেক মাসুদ তৈরি করতে পারবেন? আমরা সবাই যদি মরেও যাই তাহলেও কি একটা তারেক মাসুদ কিংবা মিশুক মনির তৈরি হবে? হবে না। তাহলে কে নেবে এই দায়। যোগযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন নাকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা!

আমাদের মন্ত্রীরা চরম নির্লজ্জ। এতো লোক মারা যায়, খারাপ অবস্থার কারণে মহাসড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায় তাও তারা হাসেন। তারা বক্তব্য দেন; সভা-সেমিনারে যান। মিডিয়ার সামনে প্রতিদিন মিথ্যা মিথ্যা সব কথা বলেন। এলিভেটেড এক্সপ্রেস আর ম্যাগনেটিক রেলের স্বপ্ন দেখান। তাদের কি একবারও লজ্জা হয় না। গত ২০ বছরেই আমাদের যোগযোগ মন্ত্রীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন করতে পারে নাই। কিন্তু অন্তত হাজারবার বলছে হচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মহাসড়ক। কিন্তু ক্ষমতার আড়াই বছরেও আবুল মন্ত্রীটা এদেশের একটা রাস্তা ঠিক করতে পারে নাই।

তবে কাজ করতে না পারলেও এই মন্ত্রীরা কোটি কোটি টাকা লুটপাট করতে পারে। কমিশন খেতে পারে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, জাতির বিবেক, গণতন্ত্রের মানসকন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এতোকিছুর পরেও মনে হয় না অথর্ব এই মন্ত্রীকে সরাই। বরং আমাদের প্রধানমন্ত্রী এসব অথর্ব মন্ত্রীদের পক্ষেই থাকেন।

ক্যাথরিন মাসুদ@ কি জবাব দেবো আমরা আপনাকে? আমেরিকা ছেড়ে বাংলাদেশের টানে সারা জীবন আপনি কাটিয়ে দিলেন। আর এই দেশই কেড়ে নিলো আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষকে।

খুব কান্না পাচ্ছে। আজকে প্রধানমন্ত্রী আর যোগযোগ মন্ত্রীর কাছে জানতে চাই আর কতো লোক মরলে আপানাদের মনে হবে এইবার দেশের রাস্তাঘাট একটু ঠিক করি। আর কতো মেধাবী লোক মরলে আপনাদের বিবেক জাগবে? জবাব দিন আপনারা। বলুন কতো লাশ চাই আপনাদের। বলেন তো আমিও মরি। তাও আপনারা দেশের মানুষকে একটু বাঁচান। জানি হাসিনা-আবুলদের এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় নেই।

আমার খুব লজ্জা করে সরকারের এই নির্লজ্জতা দেখে। দেশ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি। বারবার মনে হয়, দেশটা ঠিক করি। তাই দেশ ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে না। বাইরের স্কলারশীপের অফার নিয়ে মাথা ঘামাই না। অনার্স-মাষ্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে বসি আছি এই দেশে। সাংবাদিকতা করে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু তারেক ভাই আর মিশুক ভাইয়ের চলে যাওয়ার খবর শুনে বারবার মনে হচ্ছে, এই দেশটা আমার না। এই দেশে আর বাস করা যায় না। মনে হচ্ছে এই দেশটা ছেড়ে পালাই। শেখ হাসিনা আর আবুলরা থাকুক এই দেশে। হাসিনা আর খালেদার বৃত্তে বন্দি থাকুক এই দেশ। তাদের ক্ষমতার লোভ, তাদের মারামারি-হানাহানিতে শেষ হয়ে যাক এদেশের সব সম্ভাবনা.. চলুন আমরা পালাই।

পালাতে চান না? তাইলে চলুন প্রতিবাদের মিছিলে নামি। চলুন আন্দোলন শুরু করি.. চলুন একটা নতুন দেশ গড়ার জন্য যুদ্ব করি যেখানে কোন শয়তান থাকবে না। আমরা তরুন প্রজন্ম সেই দেশের নেতৃত্ব দেবো? আমরা তরুন প্রজন্ম সেই দেশকে স্বপ্নের দেশ বানাবো। মরতে তো হবেই। চলেন সড়ক দুর্ঘটনায় না মরে লড়াই করে মরি।..
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০১১ রাত ৩:৩৩
১০টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×