মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১ টায় চীফ রিপোর্টারের ফোন। পরদিন তারেক মাসুদের দাফন। ফরিদপুর যেতে হবে। নির্ধারিত এই এসানইমেন্ট কাভার করতে বুধবার সকাল ৭ টায় লাশ নিয়ে তারেক মাসুদের স্বজনদের সঙ্গে ছুটে চলা। ১৮ ঘন্টার সফর শেষে রাত দেড়টায় ঢাকা ফেরা। । কান্না-শোক আর নতুন অভিজ্ঞতায় পার হলো অরো একটা দিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের কর্মী ও সাধারন সম্পাদক হিসেবে তারেক মাসুদকে কিছুটা চিনতাম। কিন্তু আজ ফরিদপুরের ভাঙ্গায় তারেক ভাইয়ের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তোকে জানলাম নতুন করে। জানলাম নিরহঙ্কারী এক মানষের কথা। ভাঙ্গার ছেলে হিসেবে আমার গর্ব হচ্চে। যাই হোক, আজকের দিনটা কিভাবে কাটলো সেই অভিজ্ঞতা লেখার চেষ্টা করছি।
গত কয়েকদিন দিন ধরেই তারেক ভাইয়ের লাশ কোথায় দাফন হবে তা নিয়ে এক ধরনের সংশয় ছিলো। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানলাম শেষ পর্যন্ত ফরিদপুরে গ্রামের বাড়িতেই তারেক ভাইকে দাফন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। খবরটি অফিসে জানিয়ে, ছোট্ট একটা নিউজ করে রাত ১১ টার দিকে বাসায় ফিরলাম। তাঁর কিছুক্ষন পরেই পিন্টু ভাইয়ের ফোন। ফরিদপুর যেতে হবে।
কখন কিভাবে লাশ নেওয়া হবে জানতে ফোন করলাম তারেক ভাইয়ের ছোট ভাই হাবিব মাসুদকে। হাবিব ভাই জানালেন, সকাল ৭ টায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক পিজি) মরচুয়ারি থেকে লাশ নিয়ে রওয়ানা হবেন ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে। তথ্যটি জানালাম আমাদের আলোকচিত্রী মনির ভাইকে। বললাম সাতটার আগেই যেন তিনি উপস্থিত হন সেখানে। মনির ভাইও আমার সঙ্গে ফরিদপুর যাবেন।
বুধবার সকাল ৬ টা। মোহাম্মপেুরে আমার বাসা থেকে শাহবাগে যাবো। হালকা বৃষ্টি। কোন রিকশা খুঁজে পাচ্ছি না। যে দুই-একটা পাওয়া যায় তাও আকাশচুম্বি ভাড়া। বাধ্য হয়েই মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহরুল হক হলে সেটি রাখতে না রাখতেই মনির ভাইয়ের ফোন। সব গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি আসেন। আমি বললাম আপনি আগে কোন একটা গাড়িতে উঠেন।
অমি হলের সামনে থেকে একটা রিকশা নিয়ে যখন তাড়াহুড়ো করে পিজি হাসপাতালের সামনে ততোক্ষনে সাতটা দুই বেজে গেছে। আমাদের ফটোগ্রাফার মনির ভাই জানালেন, সব গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। আমি তখন দিশেহারা। কিভাবে গাড়িবহর ধরবো? আমি কি মাওয়া ঘাটে চলে যাবো-নাকি বাবুবাজার ব্রিজে দাঁড়াবো তা নিয়ে মনির ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা।
একটু পরেই মনির ভাই জানালেন, গাড়িবহর এখন বেইলি রোডে। এখান থেকে তারেক ভাইয়ের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ উঠবেন। পথে আমাকে তুলে নেবেন। অামি যেন মৎস্য ভবনের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। আমি দ্রুত একটা সিএনজি নিয়ে মৎস্য ভবনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনির ভাইকে বললাম আমাকে তুল নিয়েন।
অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে আছি। গাড়িবহরের দেখা নেই। মনির ভাই বললেন বেইলি রোডে চলে আসেন। এখান থেকে ক্যাথরিন গাড়িতে উঠবেন। দেরি হবে। আরেকটা সিএনজি নিয়ে গেলাম সেখানে।
বাড়ির সামনে টিভি সাংবাদিকদের ভীড়। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের এই অমানবিকতা দেখে কষ্ট পেলাম আবারো। তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন বের হতে পারছেন না কারণ বাড়ির সামনে অসংখ্য টিভি ক্যামেরা আর ফটোগ্রাফার। তারা ক্যাথরিনের ছবি তুলবেন-ফুটেজ নেবেন। কিন্তু ক্যাথরিন চাচ্ছেন সাংবাদিক এড়াতে। কিন্তু কেউ তাঁর ব্যাক্তিগত চাওয়াটাকে মর্যাদা দেবে না।
হায়রে বাংলাদেশের সাংবাদিক! একসময়ে নাসিরউিদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাই সাংবাদিকদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলেন। বললেন, ক্যাথরিনকে বিরক্ত না করতে। এক পর্যায়ে অনেকটা তাড়াহুড়ো করে ক্যাথরিনকে ওঠানো হলো গাড়িতে।
সকাল ৮ টায় আমরা রওয়ানা হলাম ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা। চেনা পথ। এই পথে তারেক মাসুদ ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরেছেন শতবার। এবারো ফিরছেন। মা-ভাই-বোন-স্বজন সবাই আছেন। পার্থক্য কেবল তারেক ভাই বেঁচে নেই। যাওয়ার পথে বেশ বৃষ্টি। মানিকগঞ্জে বৃষ্টিতে দুর্ঘটনা। এই বৃষ্টিই আবার ভিজিয়ে দিচ্ছে তারেক ভাইকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি।
সকাল সোয়া নয়টায় আমরা পৌঁছালাম মাওয়া ঘাটে। কোন ফেরি নেই। আমরা অপেক্ষা করে আছি। এই হলো বাংলাদেশের ব্যাবস্থাপনা! আধাঘন্টা পর ফেরি এলো। একে একে আমাদের সব গাড়ি উঠলো ফেরিতে। চলচ্চিত্র নির্মাতা, সংষ্কৃতি কর্মী, পরিবারের লোকজন সহ অনেকেই এই ফেরিতে। সবাই আছেন। কেবল তারেক ভাই নাই।
ফেরিতে বসেই অনুমতি নিয়ে তারেক ভাইয়ের মায়ের একটা সাক্ষাতকার নিলাম। জানতে চাইলাম তারেক মাসুদের ছোটবেলার কথা। নানান গল্প। শুনলাম। নতুন করে আবিস্কার করলাম তারেক মাসুদকে।
দুপুর ১২ টায় আমাদের গাড়িবহর পৌছাল ভাঙ্গা পাইলট হাইস্কুল মাঠে। দুপুর ২ টায় এখানে জানাযা। চারদিকে মানুষের ভীড়। কোন শৃঙ্খার নেই। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা কে যাবেন, কার নাম মাইকে বলা হয়নি এই নিয়ে-কাউ। লাশের ফুল দিতে গিয়েও হা্উ-কাউ। পুলিশ অস্থির। ভীড়-বাট্টা-ঠেলে কাজ করতে থাকলাম। কথা বললাম এর ও্রর সঙ্গে। এক ফাঁকে ঘুরে এলাম তারেক ভাইয়ের বাড়ি থেকে। সেখানে কবর খোড়ার কাজ চলচে।
বিকেল পৌনে তিটনায় গ্রামের বাড়িতে কবর দেওয়া হলো। কবর দেওয়ার পর আরো কিছুক্ষন থাকলাম সেখানে। কথা বলালাম এর ওর সঙ্গে। এবার নিউজ পাঠাতে হবে। আমার সঙ্গে টেলিভিশনের দুই সাংবাদিক। তাদের ল্যাপটপে চার্জ নেই। ভাঙ্গায় আবার কারেন্ট নেই। বাধ্য হয়ে কথা বললাম পাশের উপজেলা শিবচরের আমাদের প্রতিনিধির সঙ্গে। তারা আবার স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সাংবাদিক। বাসায় সব যন্ত্রপাতি থাকে। তিনি জানালেন, তার বাসায় কারেন্ট আছে। ব্যাকআপ হিসেবে আইপ্এস-ও আছে। অতপর ভাঙ্গা থেকে ছুটলাম শিবচরে।
বিকেল পাঁচটা। নিউজ লিখছি। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় নিউজ পাঠালাম। কয়েকবার পড়লাম। ইন্ট্রোটা ঠিক করলাম। এরপর নিউজ পাঠালাম ঢাকায়। প্রথম আলোয় আজ প্রকাশিত আঙ্গিনায় আশ্রয় নিলেন তারেক শিরোনামে নিউজটি পড়লে একজন অসম্ভব মানবিক-দেশপ্রেমিক তারেক মাসুদকে খুঁজে পাবেন। নিউজটার লিঙ্ক দিচ্চি। লিঙ্ক থেকে সরাসরি না গেলে ঠিকানাটা কপি করে পেষ্ট করে দেখুন।
আঙ্গিনায় আশ্রয় নিলেন তারেক
নিউজ পাঠানো শেষ। এবার আমায় ঢাকায় ফিরতে হবে। শিবচর থেকে এক সহকর্মীর মোটরসাইকেলে কাওরাকান্দি ঘাট। ততোক্ষনে সাড়ে ৯ টা। ওই সহকর্মী জানালেন, নদী পার হতে হতে রাত ১২ টা বেজে যাবে। এতো রাতে ওই পারে গিয়ে কোন গাড়ি পাবো না। অতঃপর সাংবাদিক ও পুলিশের সহায়তায় মংলা পোর্ট থেকে ছেড়ে আসা একটি প্রাইভেট কারের দেখা মিললো যেটি ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিলো। ঠিক হলো এটি আমাকে ঢাকয় পৌঁছে দেবে।
ফেরিতে একটা মাত্র কেবিন। আমার সেখানে একটু আসন পাওয়ার কথা। কিন্তু জানলাম একজন সাংসদও যাবেন এই ফেরিতে। তিনি তার লোকজন নিয়ে কেবিনে থাকবেন। কাজেই সাংসদকে ফেরির লোকজন জানালো, একজন সাংবাদিকও থাকবেন। তিনি যেন কোন আপত্তি না করেন। সাংসদ আপত্তি করলেন না। আমার জায়গা হলো কেবিনে যদিও বেশিরভাগ সময়ই আমি বাইরে কাটিয়েছি।
মাঝে মাঝে কেবিনে আসছিলাম। সাংসদ আর তাঁর লোকজনের গল্প শুনছিলাম। এক পর্যয়ে বললাম সরকারের জনপ্রিয়তা তো কমছেই। কি হবে আগামী নির্বাচনে। মাঠ পর্যায়ের অবস্থা যাই হোক এই সাংসদ যে জিতবেন সে ব্যপারে শতভাগ নিশ্চয়তা দিলেন সাংসদের কর্মীরা। কারণ এলাকায় নাকি বিএনপির দুই গ্রুপ।
রাতে সাংসদের লোকজন রুমে খাবার আনলেন। ভাত, আর ইলিশ মাছ। গরম ভাজা ইলিশ মাছ দেখে লোভ হলো আমারও। আমি রুম থেকে বেরিয়ে ক্যান্টিনে গেলাম খাবার খেতে। গিয়ে দেখি ইলিশ মাছের ছোট-দুই একটি টুকরো পড়ে আছে। ঠান্ডা। আমি বলি, ভাই আমাকে একটু গরম ইলিশ মাছ বেজে দেন। বলে ভাজতে পারবে না। একজনের জন্য এক পিস ভাজা যাবে না। মেজাজ খারাপ হয়। আমি বললাম ভাজতে হবে। আমি খাবোই। দোকানি ছেলেটি বললো, তাহলে এক পিসের জন্য একশ টাকা দিতে হবে। মেজাজ আরো খারাপ হলো। বলি ভাজো। যতো টাবা চাও দেবো। রাজি হয় সে।
এর কিছুক্ষন পারেই সাংসদ তার লোকজন পাঠায় সাংবাদিকের খোঁজ নিতে। তার লোকজন এসে আমাকে বলে, এমপি সাহেব আপনাকেও খেতে ডাকছে। আমি বলি না ভাই আমি এখানে খাচ্ছি। তারা নাছোড়বান্দা। আমি এমপি সাহেবকে গিয়ে বলে আসি আমি খেয়েছি। এই বলে আমি আবার ক্যান্টিনে গিয়ে বসি।
আমার ইলিশ মাছ তখনো ভাজা হয়নি। ক্যান্টিনের মালিক খাওয়ার সময়টায় এমপি সাহেবের সেবায় ব্যাস্ত। এরই মধ্যে মালিক বাইরে এসে দোকানের বয়টিকে বলে, এই স্যার যা যা খেতে চায় দাও। এমপি সাহেব বলে দিছে। আমি বলি ভাই আমি এক পিস ইলিশ মাছ চাইছি। ভাজার ব্যাবস্থা করেন। আর কিছু লাগবে না। মালিক গিয়ে এবার ছেলেটারে দেয় ধমক। এতোক্ষনে ভাজস নাই কেন? এমপি সাহেবের লোক। একশ টাকা চাইছোস কোন সাহসে? ছেলেটির উত্তর, এই লোক তো আমাকে বলে নাই তিনি ভিআইপি কেবিন থেকে এসেছেন কিংবা এমপি সাহেবের লোক। আমি বলি ভাই আমি এসপি সাহেবের সঙ্গে খাবো না বলেই বেরিয়ে আসছি।
আমার মনে মনে হাসি পায়। এমপিদের কতো ক্ষমতা। খাওয়া শেষ করি। বলি বিল কতো? তারা বলে এমপি সাহেব বলছে, আপনার বিল তিনিই দেবে। আমি বলি আরে বেটা আমি এমপি সাহবেদের সঙ্গে খাই না। বিল নে। জোর করেই বিল দেই। এবার ইলিশের দাম কমে যায়। একশ টাকার জায়গায় ৭০।
খাওয়া শেষে চাঁদের আলোয় পদ্মা দেখছি। রাত সোয়া ১২ টায় আমি পদ্মা পার হয়ে মাওয়া ঘাটে পোঁছাই। এরপর উঠি আমার সেই নির্ধারিত পোর্টের গাড়িতে। গাড়ি ছুটে চলছে ঢাকার দিকে।
ড্রাইভার নাম জানালেন ইব্রাহিম। বাড়ি যশোরে। জানলেন, জাপান থেকে যেসব রিকণ্ডিশন গাড়ি আনা হয় সেগুলো চট্টগ্রাম ও মংলা পোর্টে নামে। তারা কিছু চালক মংলা পোর্ট থেকে সেই গাড়ি চালিয়ে পৌছে দেন ঢাকার শো-রুমে। আজ তাদের দশটি গাড়ি যাচ্ছে।
এতো গাড়ি কারা কেনে বাংলাদেশে? ইব্রাহিম বললেন, ভাই বেশিরভাগই গাড়ি কেনেন অসৎ টাকায়। আজকে যে ১০ টা গাড়ি যাচ্ছে তার মধ্যে একটির দাম দেড় কোটি টাকা। বাকিগলো ১৮ থেকে বিশ লাখ টাকা। ইব্রাহিমের প্রশ্ন, আপনিই বলেন দেড় কোটি টাকা দিয়ে বাংলাদেশের একজন লোক কেমনে গাড়ি কেনে? এরা সব কাস্টমস কর্মকর্তা, নইলে পুলিশ-নইলে দুই নম্বর ব্যাবসায়ী। ইব্রাহিম জানালে, মংলা থেকে একটি গাড়ি আনতে কতো জায়গায় ঘুষ দিতে হয় সেই কাহিনী।
ইব্রহামিরা মংলা থেকে ঢাকায় এক একটি গাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য পার ট্রিপ হিসেবে এক হাজার টাকা পান। ইব্রাহিম জানান, ১১ বছর ধরে গাড়ি চালান। আগে বিভিণ্ন মালিকের অধীরনে চাকুরি করেছেন। কোন স্বাধীনতা নেই। সারাদিন গাধার মতো খাটুনি। পরে একটা কোম্পানিতে চাকুরি নেন। ওই কোম্পানি আবার অবৈধ ব্যাবসায় জড়িত। তাই চাকুরি ছেড়ে দেন। এখান বাড়িতে থাকেন। ফোন পেলে মংলা পোর্টে যান। মাসে-আট দশটা ট্রিপ পান। আট-দশ হাজার টাকা হয়। কিন্তু সৎ টাকা। এই টাকা দিয়ে দুই ছেলকে মানুষ করবেন। তাদের লেখাপড়া শেখাবেন। কারণ নিজে লেখাপড়া শেখেননি। লেখাপড়া জানা থাকলে নিশ্চয়ই ভালো কোন চাকুরি পেতেন।
ইব্রাহিম জানতে চান আমি গাড়ি চালাতে পারি কিনা। বলি না। আমার মোটরসাইকেল আছে। সেটি চালাই। ইব্রাহিম বলে, আমি আপনাকে এক ঘন্টায় শিখিয়ে দেবো। আইসেন। ইব্রাহিম সদ্য জাপান থেকে আসা গাড়ির নানান কিছু আমাকে দেখাতে থাকে। দুই ছেলেকে নিয়ে তার ভবিষ্যত স্বপ্নের কথা বলতে থাকে।
গল্প করতে করতে আমরা চলে আসি ঢাকায়। ততোক্ষনে রাত দেড়টা। ইব্রাহহিমের আমাকে হাইকোর্টের সামনে নামিয়ে দেয়। জোর করে তাঁর বাচ্চাদের চকলেট কেনার জন্য কিছু টাকা দেই।
হাইকোর্ট থেকে ভাড়া ঠিক না করেই একটা রিকশা ঠিক করে রওয়ানা হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহরুল হক হলের দিকে। এখানে আমার মোটরসাইকেলটি রাখা।
বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা। ধীরে টানছে। হলে নামার পর জিজ্ঞেস করলাম চাচা কতো দেবো? বললো ৩০ টাকা। জানতে চাইলাম হাইকোর্ট থেকে এখানে ভাড়া তো ১৫ টাকা।আপনার বাড়ি কই? রিকশাওয়ালা চাচা জানালন শিবচরে। বললাম ঈদ উপলক্ষ্যে ঢাকায় আসছেন রিকশা চালাতে নাকি? উত্তরে বললেন হ্যা। জানালেন, একসময় ট্রলার চালাতেন। এখন ঘাট দখল হয়ে গেছে। সামনে ঈদ। তাই কিছু টাকা আয় করতে ঢাকায় এসেছেন। মায়া হলো। চাচাকে সালাম জানিয়ে বিদায় দিলাম।
হলে রাখা আমার মোটরসাইকেলটা নিয়ে মোহাম্মদপুরে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। পৌছালাম পৌনে দুইটার দিকে।
সকাল ৬ টা থেকে রাত দেড়টা। সারাদিন কাজ আর কাজ। তারপরেও মনে হয়, একদিনে কতো কিছু শিখলাম। মেধাবী মানুষের চলে যাওয়া-কোটি টাকার গাড়ি-সততা-সামান্য আয়ের জন্য ঢাকা। এভাবে প্রতিদিনই শিখি। এভাবেই সাংবাদিকতা করতে করতে জেনে চলেছি প্রিয় বাংলাদেশকে।
মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়। মনে হয়, এভাবে আর কতোদিন চলবে? কতোদিন এই দেশে ইব্রাহিমরা খেটে বেড়াবে আর কোটি টাকার গাড়ি কিনবেন দুর্নীতিবাজেরা? আর কতোদিন এভাবে চলবে? তারেক মাসুদ কিংবা মিশুক মুনীরের আত্মা কি আমাদের কাউকে বলছ না, তোমরাই এই দেশটা ঠিক করো। হায় সেলুকাস! কি বিচিত্র এই দেশ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

