somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... ছাম্মাক ছাল্লো আর দেশপ্রেমের বিরোধে নতুন দিন না এটি কোন কাল্পনিক দৃশ্য নয়। আজ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এই দৃশ্য দেখতে হয়েছে। আর মনে মনে ভেবেছি, কি কুক্ষনেই না টিএসসি গিয়েছিলাম।

একটু ব্যাখ্যা করি। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর উদযাপন উপলক্ষ্যে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্তৃতিক সংগঠন। বিতর্ক, গান, চলচ্চিত্র সবই আছে। ১৪ ডিসেম্বর থেকে সেসব অণুষ্ঠান চলছে। প্রতিবছরই আমি এসব অনুষ্ঠানে যোগ দেই সময় সুযোগ করে। কিন্তু এবার নানান ঝামেলা আর অফিসের ব্যস্ততা এসব কারণে যাওয়া হচ্ছিলো না। ১৫ডিসেম্বর রাতে অফিস শেষ করে মনে হলো সব বিজয় দিবসে কোন না অনুষ্ঠানে যাই এবার স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে বসে থাকবো? ঠিক করলাম কোন একটি অনুষ্ঠানে যবো। কিন্তু কোথায় যাবো? ঢাকায় এতো এতো প্রোগাম।

হঠাৎ মনে হলো রাজারবাগ পুলিশ লাইনে স্বাধীনতার চল্লিশ বছর উপলক্ষ্যে যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হেয়ছে সেখানেই যাই। অনুষ্ঠানের একটি কার্ডও ছিলো আমার কাছে। মনে হলো, চল্লিশ বছর উদযাপনের সবচেয়ে ভালো জায়গা হতে পারে রাজারবাগ।

রাত ১১ টার দিকে গেলাম সেখানে। দেশাত্মবোধক গান, নগরবাউল জ্মেস-এর কয়েকটা অসাধারণ গান আর রাত ১২ টায় পুলিশের প্রতিরোধ যুদ্ধ আর বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে প্রদর্শণী দেখে ভালো লাগলো। চোখ দুটো ভিজে আসছিলো। মনে হলো, যেখান থেকে স্বাধীনতার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়েছিলো মার্চে, যেখানে শহীদ হয়েছিলো ১১৯ জন পুলিশ সদস্য, সেখানে বসে বিজয় দিবসরে মুহুর্তটা উদযাপন করাটা সৌভাগ্যের। রাজারবাগের অনুষ্ঠান শেষে টিএসসি গেলাম রাত সাড়ে ১২ টার দিকে।

টিএসসিতে গিয়ে দেখি আতশবাজি চলছে। অসংখ্য তরুণ। অনেক চেনা পরিচিতি মুখ। পুরোনো কয়েকজনের সঙ্গে গল্প করছিলাম। হঠাৎ করে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মানব দা বললেন, তোর সঙ্গে আলাপ আছে। আয় বসি। শুরু হলো রাজনৈতিক আলাপ। আমরা টিএসতি বসে কথা বলেই যাচ্ছি শীতে কাপতে কাপতে। রাতের খাওয়া হয়নি। তবুও দেশের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমরা নানা স্বপ্ন বুনে যাচ্ছি রাজনীতির।

হঠাৎ উচ্চস্বরে কম্পিউটারে বেজে আসা শুরু হলো হিন্দি গান আর উলালা শব্দ। তাও আবার একাত্তর নামধারী একটি সংগঠন থেকে। মানব দা চরম বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। তার কথা, টিএসসিতে এভাবে সকাল হতে পারে না। চল চলে যাই।

মনে মনে আমিও চরম বিরক্ত। তারপরেও মানবদাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম দাদা ওরা তিনদিন ধরে সারারাত কাজ করছে। ক্লান্ত। তাই হয়তো রাতে হিন্দি গান শুনছে ক্লান্ত দূর করতে। ওরা বুঝতে পারছে না এইটার শব্দ বাইরে যাচ্ছে। অন্যদের খারাপ লাগছে। মানবদার প্রশ্ন, কোন দেশাত্মবোধক গান শুনে তার সঙ্গে তাল মিলিয়েও তো ওরা ক্লান্তি কাটাতে পারতো। আর এই ভোরে যারা টিএসসি আসছ হিন্দি গান শুনে তারা কি ভাববে? আমার জানা নেই সেই প্রশ্নের উত্তর। মনে মনে ভাবছি, এই সংগঠনকে দোষ কি দেওয়া যায়? কিন্তু এই সংগঠনের অনেককে তো আমি দেখেছি কঠোর পরিশ্রম করতে। তাদের মধ্যে আছে অনেক দেশপ্রম। তাহলে কি বাইরে একটি রাত কাটানো আর হৈ হুল্লোড় করাই বিজয় দিবস। এসব ভাবতে ভাবতেই কথা না বাড়িয়ে মানবদাকে বললাম চলো এখান থেকৈ বিদায় নেই।

শীতের সকালে মানব দাকে দিয়ে পুরাণ ঢাকায় দিয়ে আসতে যাচ্ছি। ভোর ছয়টা বাজে। মনটা একটু খারাপই। কিন্তু নগরভবনের সামনে আসতেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।

ভ্যান আর পরিবহন শ্রমিকদের মাইকে তখন বাজছে, দেশাত্মবোধক গান। সব কটা জানালা খুলে দাও না এই গান। আমরা পরষ্পরকে তখন বলছি, আজকের এই সকালে কোন গান শুনতে হবে সেটি এই পরিবহন শ্রমিকরাও জানে। কিন্তু টিএসসির কিছু দেশপ্রেমিক সাংস্কৃতিক কর্মী জানে না। একটু আগাতেই বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কার্যালয় থেকে মাইকে ভেসে আসছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। যাক সকালটা তাহলে মন্দ নয়।

মানবদাকে নামিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে বাসায় ফিরছি। টিএসসি দিয়ে যাওার পথে দেখলাম কিছু তরুণ এবার আজকের অনুষ্ঠানের জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছে। ভালো লাগলো। আরেকটু এগিয়ে দেখি বিভিন্ন হলের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস দাড়িয়ে। যাবে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে। ছাত্ররা ঘুম ভাঙ্গা চোখে সেসব বাসে উঠছে। তাদের চোথে মুখে দেশের জন্য চরম ভালোবাসা। আর তাই শীতের সকালে ঘুম ভেঙ্গে তারা যাচ্ছে সাভারে। দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেলো।

আমি চিরকাল আশাবাদী মানুষ। কখনো হতাশ হয়নি। চরম নিরাশার মধ্যেও স্বপ্ন দেখতে আমার ভালো লাগে। আমি স্বপ্ন দেখতে দেখতে বাসায় ফিরছি। আর মনে মনে ভাবছি, আমরা কেউ কেউ ক্ষনিকের মোহে ভুল পথে চললেও সবাই একসঙ্গে ভুল পথে চলি না। কাজেই বিজয় আসবেই।

জয় বাংলা। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29504198 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29504198 2011-12-16 20:30:25
তারেক মাসুদের জন্য ১৮ ঘন্টা-সাংবাদিকতার যতোসব অভিজ্ঞতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের কর্মী ও সাধারন সম্পাদক হিসেবে তারেক মাসুদকে কিছুটা চিনতাম। কিন্তু আজ ফরিদপুরের ভাঙ্গায় তারেক ভাইয়ের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তোকে জানলাম নতুন করে। জানলাম নিরহঙ্কারী এক মানষের কথা। ভাঙ্গার ছেলে হিসেবে আমার গর্ব হচ্চে। যাই হোক, আজকের দিনটা কিভাবে কাটলো সেই অভিজ্ঞতা লেখার চেষ্টা করছি।

গত কয়েকদিন দিন ধরেই তারেক ভাইয়ের লাশ কোথায় দাফন হবে তা নিয়ে এক ধরনের সংশয় ছিলো। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানলাম শেষ পর্যন্ত ফরিদপুরে গ্রামের বাড়িতেই তারেক ভাইকে দাফন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। খবরটি অফিসে জানিয়ে, ছোট্ট একটা নিউজ করে রাত ১১ টার দিকে বাসায় ফিরলাম। তাঁর কিছুক্ষন পরেই পিন্টু ভাইয়ের ফোন। ফরিদপুর যেতে হবে।

কখন কিভাবে লাশ নেওয়া হবে জানতে ফোন করলাম তারেক ভাইয়ের ছোট ভাই হাবিব মাসুদকে। হাবিব ভাই জানালেন, সকাল ৭ টায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সাবেক পিজি) মরচুয়ারি থেকে লাশ নিয়ে রওয়ানা হবেন ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে। তথ্যটি জানালাম আমাদের আলোকচিত্রী মনির ভাইকে। বললাম সাতটার আগেই যেন তিনি উপস্থিত হন সেখানে। মনির ভাইও আমার সঙ্গে ফরিদপুর যাবেন।

বুধবার সকাল ৬ টা। মোহাম্মপেুরে আমার বাসা থেকে শাহবাগে যাবো। হালকা বৃষ্টি। কোন রিকশা খুঁজে পাচ্ছি না। যে দুই-একটা পাওয়া যায় তাও আকাশচুম্বি ভাড়া। বাধ্য হয়েই মোটরসাইকেল নিয়ে বের হলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহরুল হক হলে সেটি রাখতে না রাখতেই মনির ভাইয়ের ফোন। সব গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি আসেন। আমি বললাম আপনি আগে কোন একটা গাড়িতে উঠেন।

অমি হলের সামনে থেকে একটা রিকশা নিয়ে যখন তাড়াহুড়ো করে পিজি হাসপাতালের সামনে ততোক্ষনে সাতটা দুই বেজে গেছে। আমাদের ফটোগ্রাফার মনির ভাই জানালেন, সব গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। আমি তখন দিশেহারা। কিভাবে গাড়িবহর ধরবো? আমি কি মাওয়া ঘাটে চলে যাবো-নাকি বাবুবাজার ব্রিজে দাঁড়াবো তা নিয়ে মনির ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা।

একটু পরেই মনির ভাই জানালেন, গাড়িবহর এখন বেইলি রোডে। এখান থেকে তারেক ভাইয়ের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ উঠবেন। পথে আমাকে তুলে নেবেন। অামি যেন মৎস্য ভবনের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। আমি দ্রুত একটা সিএনজি নিয়ে মৎস্য ভবনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মনির ভাইকে বললাম আমাকে তুল নিয়েন।

অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে আছি। গাড়িবহরের দেখা নেই। মনির ভাই বললেন বেইলি রোডে চলে আসেন। এখান থেকে ক্যাথরিন গাড়িতে উঠবেন। দেরি হবে। আরেকটা সিএনজি নিয়ে গেলাম সেখানে।

বাড়ির সামনে টিভি সাংবাদিকদের ভীড়। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের এই অমানবিকতা দেখে কষ্ট পেলাম আবারো। তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন বের হতে পারছেন না কারণ বাড়ির সামনে অসংখ্য টিভি ক্যামেরা আর ফটোগ্রাফার। তারা ক্যাথরিনের ছবি তুলবেন-ফুটেজ নেবেন। কিন্তু ক্যাথরিন চাচ্ছেন সাংবাদিক এড়াতে। কিন্তু কেউ তাঁর ব্যাক্তিগত চাওয়াটাকে মর্যাদা দেবে না।

হায়রে বাংলাদেশের সাংবাদিক! একসময়ে নাসিরউিদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ভাই সাংবাদিকদের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইলেন। বললেন, ক্যাথরিনকে বিরক্ত না করতে। এক পর্যায়ে অনেকটা তাড়াহুড়ো করে ক্যাথরিনকে ওঠানো হলো গাড়িতে।

সকাল ৮ টায় আমরা রওয়ানা হলাম ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা। চেনা পথ। এই পথে তারেক মাসুদ ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরেছেন শতবার। এবারো ফিরছেন। মা-ভাই-বোন-স্বজন সবাই আছেন। পার্থক্য কেবল তারেক ভাই বেঁচে নেই। যাওয়ার পথে বেশ বৃষ্টি। মানিকগঞ্জে বৃষ্টিতে দুর্ঘটনা। এই বৃষ্টিই আবার ভিজিয়ে দিচ্ছে তারেক ভাইকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি।

সকাল সোয়া নয়টায় আমরা পৌঁছালাম মাওয়া ঘাটে। কোন ফেরি নেই। আমরা অপেক্ষা করে আছি। এই হলো বাংলাদেশের ব্যাবস্থাপনা! আধাঘন্টা পর ফেরি এলো। একে একে আমাদের সব গাড়ি উঠলো ফেরিতে। চলচ্চিত্র নির্মাতা, সংষ্কৃতি কর্মী, পরিবারের লোকজন সহ অনেকেই এই ফেরিতে। সবাই আছেন। কেবল তারেক ভাই নাই।

ফেরিতে বসেই অনুমতি নিয়ে তারেক ভাইয়ের মায়ের একটা সাক্ষাতকার নিলাম। জানতে চাইলাম তারেক মাসুদের ছোটবেলার কথা। নানান গল্প। শুনলাম। নতুন করে আবিস্কার করলাম তারেক মাসুদকে।

দুপুর ১২ টায় আমাদের গাড়িবহর পৌছাল ভাঙ্গা পাইলট হাইস্কুল মাঠে। দুপুর ২ টায় এখানে জানাযা। চারদিকে মানুষের ভীড়। কোন শৃঙ্খার নেই। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা কে যাবেন, কার নাম মাইকে বলা হয়নি এই নিয়ে-কাউ। লাশের ফুল দিতে গিয়েও হা্উ-কাউ। পুলিশ অস্থির। ভীড়-বাট্টা-ঠেলে কাজ করতে থাকলাম। কথা বললাম এর ও্রর সঙ্গে। এক ফাঁকে ঘুরে এলাম তারেক ভাইয়ের বাড়ি থেকে। সেখানে কবর খোড়ার কাজ চলচে।

বিকেল পৌনে তিটনায় গ্রামের বাড়িতে কবর দেওয়া হলো। কবর দেওয়ার পর আরো কিছুক্ষন থাকলাম সেখানে। কথা বলালাম এর ওর সঙ্গে। এবার নিউজ পাঠাতে হবে। আমার সঙ্গে টেলিভিশনের দুই সাংবাদিক। তাদের ল্যাপটপে চার্জ নেই। ভাঙ্গায় আবার কারেন্ট নেই। বাধ্য হয়ে কথা বললাম পাশের উপজেলা শিবচরের আমাদের প্রতিনিধির সঙ্গে। তারা আবার স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সাংবাদিক। বাসায় সব যন্ত্রপাতি থাকে। তিনি জানালেন, তার বাসায় কারেন্ট আছে। ব্যাকআপ হিসেবে আইপ্এস-ও আছে। অতপর ভাঙ্গা থেকে ছুটলাম শিবচরে।

বিকেল পাঁচটা। নিউজ লিখছি। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় নিউজ পাঠালাম। কয়েকবার পড়লাম। ইন্ট্রোটা ঠিক করলাম। এরপর নিউজ পাঠালাম ঢাকায়। প্রথম আলোয় আজ প্রকাশিত আঙ্গিনায় আশ্রয় নিলেন তারেক শিরোনামে নিউজটি পড়লে একজন অসম্ভব মানবিক-দেশপ্রেমিক তারেক মাসুদকে খুঁজে পাবেন। নিউজটার লিঙ্ক দিচ্চি। লিঙ্ক থেকে সরাসরি না গেলে ঠিকানাটা কপি করে পেষ্ট করে দেখুন।
আঙ্গিনায় আশ্রয় নিলেন তারেক

নিউজ পাঠানো শেষ। এবার আমায় ঢাকায় ফিরতে হবে। শিবচর থেকে এক সহকর্মীর মোটরসাইকেলে কাওরাকান্দি ঘাট। ততোক্ষনে সাড়ে ৯ টা। ওই সহকর্মী জানালেন, নদী পার হতে হতে রাত ১২ টা বেজে যাবে। এতো রাতে ওই পারে গিয়ে কোন গাড়ি পাবো না। অতঃপর সাংবাদিক ও পুলিশের সহায়তায় মংলা পোর্ট থেকে ছেড়ে আসা একটি প্রাইভেট কারের দেখা মিললো যেটি ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিলো। ঠিক হলো এটি আমাকে ঢাকয় পৌঁছে দেবে।

ফেরিতে একটা মাত্র কেবিন। আমার সেখানে একটু আসন পাওয়ার কথা। কিন্তু জানলাম একজন সাংসদও যাবেন এই ফেরিতে। তিনি তার লোকজন নিয়ে কেবিনে থাকবেন। কাজেই সাংসদকে ফেরির লোকজন জানালো, একজন সাংবাদিকও থাকবেন। তিনি যেন কোন আপত্তি না করেন। সাংসদ আপত্তি করলেন না। আমার জায়গা হলো কেবিনে যদিও বেশিরভাগ সময়ই আমি বাইরে কাটিয়েছি।

মাঝে মাঝে কেবিনে আসছিলাম। সাংসদ আর তাঁর লোকজনের গল্প শুনছিলাম। এক পর্যয়ে বললাম সরকারের জনপ্রিয়তা তো কমছেই। কি হবে আগামী নির্বাচনে। মাঠ পর্যায়ের অবস্থা যাই হোক এই সাংসদ যে জিতবেন সে ব্যপারে শতভাগ নিশ্চয়তা দিলেন সাংসদের কর্মীরা। কারণ এলাকায় নাকি বিএনপির দুই গ্রুপ।

রাতে সাংসদের লোকজন রুমে খাবার আনলেন। ভাত, আর ইলিশ মাছ। গরম ভাজা ইলিশ মাছ দেখে লোভ হলো আমারও। আমি রুম থেকে বেরিয়ে ক্যান্টিনে গেলাম খাবার খেতে। গিয়ে দেখি ইলিশ মাছের ছোট-দুই একটি টুকরো পড়ে আছে। ঠান্ডা। আমি বলি, ভাই আমাকে একটু গরম ইলিশ মাছ বেজে দেন। বলে ভাজতে পারবে না। একজনের জন্য এক পিস ভাজা যাবে না। মেজাজ খারাপ হয়। আমি বললাম ভাজতে হবে। আমি খাবোই। দোকানি ছেলেটি বললো, তাহলে এক পিসের জন্য একশ টাকা দিতে হবে। মেজাজ আরো খারাপ হলো। বলি ভাজো। যতো টাবা চাও দেবো। রাজি হয় সে।

এর কিছুক্ষন পারেই সাংসদ তার লোকজন পাঠায় সাংবাদিকের খোঁজ নিতে। তার লোকজন এসে আমাকে বলে, এমপি সাহেব আপনাকেও খেতে ডাকছে। আমি বলি না ভাই আমি এখানে খাচ্ছি। তারা নাছোড়বান্দা। আমি এমপি সাহেবকে গিয়ে বলে আসি আমি খেয়েছি। এই বলে আমি আবার ক্যান্টিনে গিয়ে বসি।

আমার ইলিশ মাছ তখনো ভাজা হয়নি। ক্যান্টিনের মালিক খাওয়ার সময়টায় এমপি সাহেবের সেবায় ব্যাস্ত। এরই মধ্যে মালিক বাইরে এসে দোকানের বয়টিকে বলে, এই স্যার যা যা খেতে চায় দাও। এমপি সাহেব বলে দিছে। আমি বলি ভাই আমি এক পিস ইলিশ মাছ চাইছি। ভাজার ব্যাবস্থা করেন। আর কিছু লাগবে না। মালিক গিয়ে এবার ছেলেটারে দেয় ধমক। এতোক্ষনে ভাজস নাই কেন? এমপি সাহেবের লোক। একশ টাকা চাইছোস কোন সাহসে? ছেলেটির উত্তর, এই লোক তো আমাকে বলে নাই তিনি ভিআইপি কেবিন থেকে এসেছেন কিংবা এমপি সাহেবের লোক। আমি বলি ভাই আমি এসপি সাহেবের সঙ্গে খাবো না বলেই বেরিয়ে আসছি।

আমার মনে মনে হাসি পায়। এমপিদের কতো ক্ষমতা। খাওয়া শেষ করি। বলি বিল কতো? তারা বলে এমপি সাহেব বলছে, আপনার বিল তিনিই দেবে। আমি বলি আরে বেটা আমি এমপি সাহবেদের সঙ্গে খাই না। বিল নে। জোর করেই বিল দেই। এবার ইলিশের দাম কমে যায়। একশ টাকার জায়গায় ৭০।

খাওয়া শেষে চাঁদের আলোয় পদ্মা দেখছি। রাত সোয়া ১২ টায় আমি পদ্মা পার হয়ে মাওয়া ঘাটে পোঁছাই। এরপর উঠি আমার সেই নির্ধারিত পোর্টের গাড়িতে। গাড়ি ছুটে চলছে ঢাকার দিকে।

ড্রাইভার নাম জানালেন ইব্রাহিম। বাড়ি যশোরে। জানলেন, জাপান থেকে যেসব রিকণ্ডিশন গাড়ি আনা হয় সেগুলো চট্টগ্রাম ও মংলা পোর্টে নামে। তারা কিছু চালক মংলা পোর্ট থেকে সেই গাড়ি চালিয়ে পৌছে দেন ঢাকার শো-রুমে। আজ তাদের দশটি গাড়ি যাচ্ছে।

এতো গাড়ি কারা কেনে বাংলাদেশে? ইব্রাহিম বললেন, ভাই বেশিরভাগই গাড়ি কেনেন অসৎ টাকায়। আজকে যে ১০ টা গাড়ি যাচ্ছে তার মধ্যে একটির দাম দেড় কোটি টাকা। বাকিগলো ১৮ থেকে বিশ লাখ টাকা। ইব্রাহিমের প্রশ্ন, আপনিই বলেন দেড় কোটি টাকা দিয়ে বাংলাদেশের একজন লোক কেমনে গাড়ি কেনে? এরা সব কাস্টমস কর্মকর্তা, নইলে পুলিশ-নইলে দুই নম্বর ব্যাবসায়ী। ইব্রাহিম জানালে, মংলা থেকে একটি গাড়ি আনতে কতো জায়গায় ঘুষ দিতে হয় সেই কাহিনী।

ইব্রহামিরা মংলা থেকে ঢাকায় এক একটি গাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য পার ট্রিপ হিসেবে এক হাজার টাকা পান। ইব্রাহিম জানান, ১১ বছর ধরে গাড়ি চালান। আগে বিভিণ্ন মালিকের অধীরনে চাকুরি করেছেন। কোন স্বাধীনতা নেই। সারাদিন গাধার মতো খাটুনি। পরে একটা কোম্পানিতে চাকুরি নেন। ওই কোম্পানি আবার অবৈধ ব্যাবসায় জড়িত। তাই চাকুরি ছেড়ে দেন। এখান বাড়িতে থাকেন। ফোন পেলে মংলা পোর্টে যান। মাসে-আট দশটা ট্রিপ পান। আট-দশ হাজার টাকা হয়। কিন্তু সৎ টাকা। এই টাকা দিয়ে দুই ছেলকে মানুষ করবেন। তাদের লেখাপড়া শেখাবেন। কারণ নিজে লেখাপড়া শেখেননি। লেখাপড়া জানা থাকলে নিশ্চয়ই ভালো কোন চাকুরি পেতেন।

ইব্রাহিম জানতে চান আমি গাড়ি চালাতে পারি কিনা। বলি না। আমার মোটরসাইকেল আছে। সেটি চালাই। ইব্রাহিম বলে, আমি আপনাকে এক ঘন্টায় শিখিয়ে দেবো। আইসেন। ইব্রাহিম সদ্য জাপান থেকে আসা গাড়ির নানান কিছু আমাকে দেখাতে থাকে। দুই ছেলেকে নিয়ে তার ভবিষ্যত স্বপ্নের কথা বলতে থাকে।

গল্প করতে করতে আমরা চলে আসি ঢাকায়। ততোক্ষনে রাত দেড়টা। ইব্রাহহিমের আমাকে হাইকোর্টের সামনে নামিয়ে দেয়। জোর করে তাঁর বাচ্চাদের চকলেট কেনার জন্য কিছু টাকা দেই।

হাইকোর্ট থেকে ভাড়া ঠিক না করেই একটা রিকশা ঠিক করে রওয়ানা হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহরুল হক হলের দিকে। এখানে আমার মোটরসাইকেলটি রাখা।

বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা। ধীরে টানছে। হলে নামার পর জিজ্ঞেস করলাম চাচা কতো দেবো? বললো ৩০ টাকা। জানতে চাইলাম হাইকোর্ট থেকে এখানে ভাড়া তো ১৫ টাকা।আপনার বাড়ি কই? রিকশাওয়ালা চাচা জানালন শিবচরে। বললাম ঈদ উপলক্ষ্যে ঢাকায় আসছেন রিকশা চালাতে নাকি? উত্তরে বললেন হ্যা। জানালেন, একসময় ট্রলার চালাতেন। এখন ঘাট দখল হয়ে গেছে। সামনে ঈদ। তাই কিছু টাকা আয় করতে ঢাকায় এসেছেন। মায়া হলো। চাচাকে সালাম জানিয়ে বিদায় দিলাম।

হলে রাখা আমার মোটরসাইকেলটা নিয়ে মোহাম্মদপুরে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। পৌছালাম পৌনে দুইটার দিকে।

সকাল ৬ টা থেকে রাত দেড়টা। সারাদিন কাজ আর কাজ। তারপরেও মনে হয়, একদিনে কতো কিছু শিখলাম। মেধাবী মানুষের চলে যাওয়া-কোটি টাকার গাড়ি-সততা-সামান্য আয়ের জন্য ঢাকা। এভাবে প্রতিদিনই শিখি। এভাবেই সাংবাদিকতা করতে করতে জেনে চলেছি প্রিয় বাংলাদেশকে।

মাঝে মাঝে খুব কষ্ট হয়। মনে হয়, এভাবে আর কতোদিন চলবে? কতোদিন এই দেশে ইব্রাহিমরা খেটে বেড়াবে আর কোটি টাকার গাড়ি কিনবেন দুর্নীতিবাজেরা? আর কতোদিন এভাবে চলবে? তারেক মাসুদ কিংবা মিশুক মুনীরের আত্মা কি আমাদের কাউকে বলছ না, তোমরাই এই দেশটা ঠিক করো। হায় সেলুকাস! কি বিচিত্র এই দেশ।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29434188 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29434188 2011-08-18 04:39:28
আর কতো মেধাবীর জীবন চাই তোমার হে বাংলাদেশ?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের অত্যন্ত সুহৃদ ছিলেন তারেক মাসুদ। ওই সংসদের কর্মী এবং পরে সাধারান সম্পাদক হিসেবে টানা ছয়-সাত বছর আমি কাছ থেকে তারেক ভাইকে দেখেছি। আমরা ডাকলেই চলে আসতেন তারেক ভাই। স্বপ্ন দেখাতেন সেলুলয়েডের গল্প বুননের। চলচ্চিত্র নির্মাতা না হতে পারলেও চলচ্চিত্র সংসদের কর্মী হিসেবে আমি মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনতাম। স্বপ্ন দেখতাম।

কি অসম্ভব স্বপ্নবাজ আর সাহসী মানুষই না ছিলেন তারেক মাসুদ! মুক্তির গান তাঁর সেই সাহসেরই প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের কোন প্রেক্ষাগৃহ যখন তাঁর ছবি মুক্তি দিতে রাজি হচ্ছিল না তখন নিজেই সারাদেশ ঘুরে তারেক ভই সেই ছবি দেখিয়েছেন দর্শকদের। সর্বশেষ ছবি রানওয়ে। এ নিয়ে সারাদেশে মিশুক মনিরকে নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। বাঙ্গালিকে মুক্তির গান শুনিয়েছিলেন তারেক ভাই। বানচ্ছিলেন একের পর এক দুর্দান্ত ছবি।

সামনে যখন দেশকে কেবল দেবার দিন, জাতিকে সমৃদ্ধ করার দিন তখনই তারেক ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আসলে তারেক ভাই চলে গেলেন নাকি আমরা তাকে রাখতে পারলাম না? এটি কি কেবলই মরে যাওয়া। কেবল তারেক ভাই নয়, এদেশের আরেক মেধাবী চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির, তারেক ভাই যার শীর্ষ্য ছিলেন সেই সেই আলমগীর ভাইও মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায়।

আজ সকালে এসাইনমেন্ট ছিলো প্রেসক্লাবে। সেটি শেষ করে আসছি এমন সময় প্রথম আলো থেকে একটি ফোন। তারেক মাসুদ আর মিশুক মনির মারা গেছে। পরিবারের কারো সঙ্গে কথা বলতে হবে। মিশুক মনিরের ছোট ভাই আসিফ মুনীরের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ যোগযোগ। সঙ্গে সঙ্গেই ফোন দিলাম আসিফ ভাইকে। আসিফ ভাইয়ের কথাগুলো যেন ভেঙ্গে ভেঙ্গে আসছে। ফোন রাখার পর চোখ ভিজে এলো আমারও।

মিশুক মনির এদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরীর ছেলে। বাবার মতোই দেশের জন্য কিছু করার কথা ভাবতেন মিশুক স্যার। কখনো নিজের কথা ভাবেননি। সাংবাদিকতাকে অসম্ভব ভালোবাসতেন। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরি ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন একুশে টিভিতে। খুঁজে নিতে চাইছিলেন সত্যিকারের সাংবাদিকতাকে। কানাডার একটি টেলিভিশনের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন মিশুক স্যার। কাজ করেছেন বিবিসি, ন্যাশনাল জিওগ্রোফিতে। কিন্তু দেশের প্রতি যে টান সেই টানেই কানাডা কিংবা আমেরিকা ছেড়ে বারবার ফিরে এসেছেন দেশে।

দুপুরে দুজনের চলে যাওয়ার খবর শুনে কেবল একটা কথাই মনে হচ্ছিল-এই যে এতো দেশের কথা ভাবছি সেই দেশ কি আমাকে বেঁচে থাকার নিরাপত্তাটা দিতে পরেবে? মিশুক স্যার আর তারেক ভাই দুজনেই তো বিদেশ ছেড়ে দেশে এসেছিলেন। কি দিলাম বিনিময়ে আমরা তাদের। তাদের মরে যাওয়ার খবরে আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী আর মন্ত্রীরা শোক বার্তা দিয়েই খালাস। লজ্জা করে না এই সরকারের যোগযোগ মন্ত্রীর? লজ্জা করে না শেখ হাসিনার? লজ্জা করে না এদেশের রাজনীতিবিদদের? আর কতো মানুষ মরলে আপনাদের মনে হবে, এইইবার রাস্তাটা একটু ঠিক করি। আর কতো মানুষ মরলে আপনাদের মনে হবে নিরাপদ সড়ক করি? আর কবে আপনাদের বিবেক জাগবে?

মন্ত্রীদের দিয়ে দোষ দিয়ে লাভ কি? দোষ তো আমাদের মতো জনতার। প্রতিদিন এতো মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মরে তাও আমাদের লজ্জা হয় না। আমরা চামড়া মোটা নির্বোধ হয়ে গেছি। কতাই প্রতিবাদ করে আমরা কেউ-ই রাস্তায় নামি না। কেউ-ই সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করি না সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধের জন্য; সড়ক ঠিক করার জন্য। কিন্তু যার স্বজন হারায় তিনিই জানেন এই কষ্ট। আপনার-আমার কোন আত্মীয়-ভাই-বোন-বাবা মা যখন কেউ মারা যাবে তখন আমরাও বুঝবো এই কষ্ট।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে বাংলাদেশের সব মন্ত্রী কি জীবন দিয়ে কি একটা তারেক মাসুদ তৈরি করতে পারবেন? আমরা সবাই যদি মরেও যাই তাহলেও কি একটা তারেক মাসুদ কিংবা মিশুক মনির তৈরি হবে? হবে না। তাহলে কে নেবে এই দায়। যোগযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন নাকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা!

আমাদের মন্ত্রীরা চরম নির্লজ্জ। এতো লোক মারা যায়, খারাপ অবস্থার কারণে মহাসড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায় তাও তারা হাসেন। তারা বক্তব্য দেন; সভা-সেমিনারে যান। মিডিয়ার সামনে প্রতিদিন মিথ্যা মিথ্যা সব কথা বলেন। এলিভেটেড এক্সপ্রেস আর ম্যাগনেটিক রেলের স্বপ্ন দেখান। তাদের কি একবারও লজ্জা হয় না। গত ২০ বছরেই আমাদের যোগযোগ মন্ত্রীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন করতে পারে নাই। কিন্তু অন্তত হাজারবার বলছে হচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মহাসড়ক। কিন্তু ক্ষমতার আড়াই বছরেও আবুল মন্ত্রীটা এদেশের একটা রাস্তা ঠিক করতে পারে নাই।

তবে কাজ করতে না পারলেও এই মন্ত্রীরা কোটি কোটি টাকা লুটপাট করতে পারে। কমিশন খেতে পারে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, জাতির বিবেক, গণতন্ত্রের মানসকন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর এতোকিছুর পরেও মনে হয় না অথর্ব এই মন্ত্রীকে সরাই। বরং আমাদের প্রধানমন্ত্রী এসব অথর্ব মন্ত্রীদের পক্ষেই থাকেন।

ক্যাথরিন মাসুদ@ কি জবাব দেবো আমরা আপনাকে? আমেরিকা ছেড়ে বাংলাদেশের টানে সারা জীবন আপনি কাটিয়ে দিলেন। আর এই দেশই কেড়ে নিলো আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষকে।

খুব কান্না পাচ্ছে। আজকে প্রধানমন্ত্রী আর যোগযোগ মন্ত্রীর কাছে জানতে চাই আর কতো লোক মরলে আপানাদের মনে হবে এইবার দেশের রাস্তাঘাট একটু ঠিক করি। আর কতো মেধাবী লোক মরলে আপনাদের বিবেক জাগবে? জবাব দিন আপনারা। বলুন কতো লাশ চাই আপনাদের। বলেন তো আমিও মরি। তাও আপনারা দেশের মানুষকে একটু বাঁচান। জানি হাসিনা-আবুলদের এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় নেই।

আমার খুব লজ্জা করে সরকারের এই নির্লজ্জতা দেখে। দেশ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি। বারবার মনে হয়, দেশটা ঠিক করি। তাই দেশ ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে না। বাইরের স্কলারশীপের অফার নিয়ে মাথা ঘামাই না। অনার্স-মাষ্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে বসি আছি এই দেশে। সাংবাদিকতা করে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু তারেক ভাই আর মিশুক ভাইয়ের চলে যাওয়ার খবর শুনে বারবার মনে হচ্ছে, এই দেশটা আমার না। এই দেশে আর বাস করা যায় না। মনে হচ্ছে এই দেশটা ছেড়ে পালাই। শেখ হাসিনা আর আবুলরা থাকুক এই দেশে। হাসিনা আর খালেদার বৃত্তে বন্দি থাকুক এই দেশ। তাদের ক্ষমতার লোভ, তাদের মারামারি-হানাহানিতে শেষ হয়ে যাক এদেশের সব সম্ভাবনা.. চলুন আমরা পালাই।

পালাতে চান না? তাইলে চলুন প্রতিবাদের মিছিলে নামি। চলুন আন্দোলন শুরু করি.. চলুন একটা নতুন দেশ গড়ার জন্য যুদ্ব করি যেখানে কোন শয়তান থাকবে না। আমরা তরুন প্রজন্ম সেই দেশের নেতৃত্ব দেবো? আমরা তরুন প্রজন্ম সেই দেশকে স্বপ্নের দেশ বানাবো। মরতে তো হবেই। চলেন সড়ক দুর্ঘটনায় না মরে লড়াই করে মরি।..]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29431576 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29431576 2011-08-14 02:02:31
টাইম ম্যাগাজিনের তালিকা, বাংলাদেশি মিডিয়া। শেখ হাসিনার নাম, কর্মীদের আনন্দ!
ঘটনা হলো যুক্তরাষ্ট্রের টাইম সাময়িকী এই মুহুর্তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতায আছেন এমন ১২ জন নারিকে নিয়ে একটি নিউজ করেছে। নিউজের শিরোনাম ‌টপ টুয়েলভ ফিমেল লিডারস অ্যারাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড। নিউজে এই মুহুর্তে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আছেন এমন নারীদের নাম এবং তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হযেছে। তালিকায় সবার আগে আছেন থাইল্যান্যের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইংল্যাক। মূলত সর্বশেষ নির্বাচনে ইংল্যাক-কের জয়কে কেন্দ্র করেই এ মুহুর্তে ক্ষমতায় থাকা আরো ১১ জন নারী রাষ্ট্রপ্রধানের নাম এসেছে। তাই ওই প্রতিবদেনে ১২ জনেরই জীবনী দেওয়া হযেছে। তাতে শেখ হাসিনার নাম এসেছে সাত নম্বরে। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো বাংলাদেশের সবগুলো মিডিয়া নিউজ করেছে টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী নারীদের তালিতায় শেখ হাসিনা সপ্তম। প্রথম ইংল্যাক।

এদেশের কোন মিডিয়ার কোন বার্তা প্রধানের মনে হলো না এটি কিসের তালিকা? যদি নারী ক্ষমতাশালীদের তালিকাই হয় তাহলে কেন এই তালিকায় প্রথমেই সদ্য নির্বাচিত ইংল্যাকের নাম। কেন সোনিয়া গান্ধী বা হিলারি ক্লিনটনের নাম নেই। কারো মাথায়ই সেটি এলো না। আর শেখ হাসিনার দিক থেকে চিন্তা করলে ইংল্যাকের চেয়ে শেখ হাসিনা বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক প্রভাবশালী এবং শেখ হাসিনার অবদানও বেশি।

কিন্তু এসবের কোনটাই না ভেবে এদেশের মিডিয়াগুলো নিউজ করে দিলো শেখ হাসিনা প্রভাবশালীদের তালিতায় সপ্তম। আর আওয়ামী লীগ-এর কর্মীরা শেখ হাসিনার নাম দেখে মহা আনন্দে নাচতে লাগলো। তারা মনে করলো এটিও শেখ হাসিনার একটি অর্জন। কি হাস্যকর বিষয়।

আনন্দ না করে সরকারের উচিত ছিলো এই প্রতিবেদনরে তথ্য বিভ্রাটের প্রতিবাদ করা। কারণ টাইম ম্যাগাজিনে শেখ হাসিনার জীবনীতে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক হামলায় শেখ হাসিনার ছেলে, ভাই ও বাবাসহ ১৭ জন মারা গেছেন। কি অদ্ভুত। ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ছেলে মারা গেলো কিভাবে? এমন তথ্য বিভ্যাট দিয়ে যে নিউজ প্রকাশিত হয় সেই নিউজ নিয়ে খুব বেশি আনন্দের কি সুযোগ আছে। আমরা হুজুগ মাতি বলেই হয়তো এটা সম্ভব।

এই হচ্ছে টাইম ম্যাগাজিনের সেই নিউজ।
http://www.time.com/time/specials/packages/completelist/0,29569,2005455,00.html
এটা হচ্ছে শেখ হাসিনার জীবনী।
http://www.time.com/time/specials/packages/article/0,28804,2005455_2005458_2005459,00.html ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29430689 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29430689 2011-08-12 19:31:10
জাপানির রবীন্দ্রপ্রেম, বাংলাদেশির প্রতারণা, মসজিদ হয়ে গেলো সংস্কৃতি কেন্দ্র
আমার নিউজটা দেখে অনেকেই প্রশংসাও করছে। বলছে ভালো অনুসন্ধানী নিউজ। কিন্তু আমার কোনকিছুতেই ভালো লাগছে না। কোন নিউজ করে আমার আগে খারাপ লাগেনি। কিন্তু এই নিউজটা করার পর লজ্জায় আমার মাথায় হেট হয়ে গেছে। স্বজাতির এমন প্রতারণা অনুসন্ধান করতে ভালো লাগার কথাও নয়।

আমি গত বছর মাসখানেক জাপানে ছিলাম। দেখেছি জাপানের মানুষ কতোটা সহজ-সরল। কতোটা উপকারী। এমন একজন জাপানি যিনি সমগ্র জীবন বাংলাদেশকে ভালোবেসে রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে কাটিয়ে দিয়েছেন তার সঙ্গে এমন প্রতারনায় আমার চরম লজ্জা লাগছে। তাই সমগ্র জাপানিদের কাছে আমরা ক্ষমা চাইছি।..


http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-06-28/news/165993
http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-06-28/news/165992 ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29403614 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29403614 2011-06-28 02:38:55
সামহোয়ারের মান কই গিয়ে দাঁড়াচ্ছে! এখানে আর থাকবো কিনা ভাবছি..
ঘটনাটি বলছি। আজম খানের মারা যাওয়ার খবরটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য চরম কষ্টের। এমন একজন মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের পপগুরুর চলে যাওয়ার ঘটনা সবাইকে কাঁদিয়েছে। তাকে নিয়ে অনেকেই অনেক লেখা লিখছেন। কিন্তু খুব অবাক হলাম তাকে নিয়ে ব্লগে প্রকাশিত একটি লেখা দেখে। কে বলেছেন আজম খান মারা গেছেন এ্যই টাইপের শিরোনাম দিয়ে লেখা। এই লেখায় ব্যাবহার করা হয়েছে আনন্দ জাতীয় ইমোটিক। মারা যাওয়ার একটি ঘটনায় কেউ এভাবে লেখা দিতে পারে সেটা নিয়ে কষ্ট পেলাম। কিন্তু খুব অবাক হলাম এমন একটি লেখা আবার ব্লগে প্রকাশও করেছেন আমাদের মডারটেটরা।

আরো বেশি মেজাজ খারাপ হয় লেখকের মন্তব্য দেখলে। সবাই তার লেখার ধরনে কষ্ট পেয়ে সমালোচনা করছেন। কিন্তু তিনি দিব্বি মজা করে যাচ্ছেন। এই লেখার বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে সামুতে আসবো কিনা ভাববো.. নিচে লেখার লিংকটা দিলাম।

Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29392029 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29392029 2011-06-05 19:56:40
প্রধানমন্ত্রীরও কথা প্রকাশের স্বাধীনতা নেই..<img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_51.gif" width="23" height="22" alt="/:)" style="border:0;" />
লিমন নামে এক কিশোরকে গুলি করার পর রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে Rab-কে রক্ষায় মেতে উঠলেন তাতে বিবেকবান যে কোন মানুষই কষ্ট পাবে। অথচ এ ঘটানয় দুই একজন যারা জড়িত তাদের বিচার করলেই হয়তো। Rab এদেশে অনেক ভালো কাজ করেছে এবং করছে। কাজেই এই এক ঘটনা দিয়ে তাদের কলঙ্কিত করার চেষ্টা ঠিক নয। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো যারা গুলি করলো তাদের বিচার না করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সবাই লিমনকে সন্ত্রাসী বানালেন। বললেন, প্রথম আলো Rab- ধ্বংসের চক্রান্ত করছে। কারণ প্রথম আলো প্রথম লিমনকে নিয়ে সংবাদ পরিবেশ করে।

রাষ্ট্রযন্ত্র যখন এভাবেই লিমনকে সন্ত্রাসী বানাতে ব্যস্ত ছিলো তখন ভরসা ছিলো প্রধানমন্ত্রী। আর তাই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার পর আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম।

ঘটনাটা বলছি। আজ বিকেলে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস Rab-এর গুলিতে আহত লিমনকে নিয়ে একটি সংবাদ সংবাদ প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন তদন্ত করে প্রমানিত হয়েছে লিমন কোন সন্ত্রাসী নয়। কাজেই লিমনকে নিয়ে সরকারের কারো কোন বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রী লিমনের চিকিৎসার ব্যাপারে যথাযথ ব্যাবস্থা নেওয়ার জন্যও নির্দেশ দেন।

PM asks leaders to withhold comments on Limon শিরোনামে বাসস নিউজটি প্রকাশ করে। বাংলা নিউজ, প্রথম আলোর অনলাইনসহ দেশের অনেক টেলিভিশন এই সংবাদ প্রকাশ করতে থাকে। লিমনকে নিয়ে সারাদেশে যখন বিতর্কের ঝড়, যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, সরকারের উপদেষ্টারা লিমনকে সন্ত্রাসী আর প্রথম আলোকে ষড়যন্ত্রকারী বলতে ব্যস্ত তখন শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যে আমরা খুবই খুশি হয়েছিলাম। দেরিতে হলেও শেখ হাসিনা একটি ভালো কাজ করলেন।

বাসসের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্স থেকে এসে শেখ হাসিনা লিমনের ব্যাপারে খোঁজখবর নেন এবং সব জানতে পারেন। এরপরেই তিনি এমন নির্দেশ দেন।

এবার শুনুন পরের খবর। শেখ হাসিনার চেয়েও বড় কোন শক্তি এদেশে আছে। আর তাই মাত্র চার ঘন্টা পর কোন এক অদৃশ্য শক্তির টানে লিমনের নিউজটা বাসস বাতিল করে। এখন আর কেউ এই সংবাদটা প্রকাশ করতে পারবে না। বাসসের ওয়েবসাইটে যান দেখবেন একটা নিউজে লেখা কিল, কিল, কিল।

এই কিলের মানে শেখ হাসিনার বক্তব্যে কোন শ্রেনী চরম ক্ষুব্ধ হয়েছে। তাদের ক্ষমতা শেখ হাসিনার চেয়েও বেশি। তাই তারা শেখ হাসিনার বক্তব্যও প্রত্যাহার করাতে বাসসকে বাধ্য করেছে। তার মানে প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও শক্তিশালী আমাদের সেই বাহিনী।

সাত বছর ধরে সাংবাদিকতা করছি। প্রধানমন্ত্রীর কোন সংবাদ নিয়ে এমন ঘটনা আমি দেখিনাই। কাজেই বলতে হবে, আজকে আমি আমার সাংবাদিকতা জগতের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি দেখলাম। এই যদি হয় দেশের অবস্থা তাহলে ভবিষ্যতে কি হবে আমি বুঝতে পারছি না। এক পঙ্গু লিমনকে নিয়ে যা দেখলাম তারপর আর এদেশ নিয়ে ভালো কিছু ভাবার সাহস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, সামনে আরো বিপদ। লিমনের মতোই হয়তো এদেশের আরো অনেক নিরীহ মানুষ কিংবা প্রতিবাদকারীদের পঙ্গু হতে হবে। হয়তো প্রধানমন্ত্রীকেও এই শক্তির কাছে হার মানতে হবে বারবার.. বারবার হয়েতা তাই শোনা যাবে কিল!কিল!কিল। এই কিল মানে কি কেবল একটি সংবাদ হত্যা? কিংবা কেবল একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর কথা হত্যা নাকি তার চেয়েও ভয়াবহ কিছু? বুঝতে পারছি না।

বাসসের সংবাদটা নিচে দিয়ে দিচ্ছি.. ইংরেজি দৈনিক সান পত্রিকায় এখনো নিউজটা দেওয়া আছে। তারা হয়তো জানে না বাসস পৌনে দশটায় এই সংবাদটি বাতিল করেছে। তাই তারা নিউজটা দিয়ে রেখেছে এখনো। কিন্তু কাল সকালের পত্রিকায় নিউজটা যে পাওয়া যাবে না সেটি নিশ্চিত.. (Click This Link) এই লিঙ্কে এখনো নিউজটা দেওয়া আছে।




PM asks leaders to withhold comments on Limon’
Prime Minister Sheikh Hasina has asked government leaders and officials to withhold comments on Limon as ongoing investigations could not find evidence of allegations that he was a “terrorist”, a highly placed source close to the premier said.
“The prime minister asked them to withhold comments which could prejudice the investigation or enquiry reports as she was fully briefed about the outcome of the investigations on the Limon issue on her return from France,” the source told BSS preferring anonymity on Wednesday.
He added: “the investigations and the intelligence reports so far found no evidence of Limon’s links to terrorist activities.”
The source said the premier also asked officials to take appropriate steps to ensure proper treatment of the teenaged college student as he lost a leg in shootouts by Rapid Action Battalion (Rab) personnel.
Limon was shot in a leg as Rab troops were carrying out a manhunt in search of suspected gangster Morshed Jamaddar in Jhalakathi district two months ago while his affected leg had to be amputated subsequently as he was required to be treated at different health facilities including the Orthopedics Hospital in the capital.
The source referred to Sheikh Hasina’s tough personal stance against extra judicial killings or tortures of innocent people by law enforcement agency men and said “she reiterated several times at interactions with the media and in different forums”.
During a press conference at her Ganobhaban residence on February 3 this year, Sheikh Hasina said her government was trying to “the best of our ability” to stop extra judicial killings by law enforcement agencies.
She recalled that the phenomenon began during the past 2001-2006 BNP regime with the start of the military-led Operation Clean Heart and subsequent anti-crime campaign of the newly floated Rapid Action Battalion (Rab). —BSS

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29389958 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29389958 2011-06-02 01:36:11
আলসে সাংবাদিকের অন্যরকম এভারেষ্ট জয়!
নেপালে যেবার মাসখানেক ছিলাম সেবার গাড়িতে করে নাগরকোট ও অন্নপূর্ণার যতোখানি যাওয়া যায় আমি গিয়েছি; পর্বত দেখেছি মুগ্ধ হয়ে। সেই থেকে এভারেষ্টের প্রতি আমার এবকটা অন্য রকম ভালোবাসা ছিলো। তবে সত্যিকারের এভারেষ্ট জয়ের স্বাদ আমি পাই কপাল গুনে। এ বছর মুহিতের এভারেষ্ট জয়ের ফলোআপ করার এসাইনমেন্টটা আমাকেই কেন যেন দেন চীফ রিপোর্টার। অবশ্য প্রবাসে যে কোন বাংলাদেশির অর্জনের খবর কাভার করাটা আমার বিটের মধ্যেই পড়ে। গত বছরও মুসা ভাইয়ের সাক্ষাতকারও আমিও নিয়েছিলাম। অবশ্য সেটা ঢাকায় আসার পর।

যাই হোক। মূল ঘটনায় যাই। এ বছরের ২১ মে দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে এভারেষ্ট জয় করেছেন এম এ মুহিত। এভারেষ্ট থেকে তিনি নেমেছেন ২৫ মে। ওইদিন ঢাকা থেকে টেলিফোনে আমি তাঁর ইন্টারভিউ করি। টানা দেড় ঘন্টা কথা হয় তাঁর সঙ্গে। আমিই বোধহয় বাংলাদেশের প্রথম সাংবাদিক যে নামার পর তাঁর সঙ্গে এতোক্ষন কথা বললাম এবং পুরো অভিযানের বর্ণনা নিলাম। মুহিত ভাইয়ের বোনের কাছ থেকে অবশ্য আগেই নম্বরটা নিয়েছিলাম। যাই হোক মুহিত ভাইয়ের সাক্ষাতকার নিয়ে পরদিন নিউজ করলাম এভারেষ্টে চূড়ায় মুহিতের বাংলাদেশের পতাকা ওড়নোর অনুভুতি।

২৫ মে সন্ধ্যা থেকে মুহিত ভাই যখন নেপাল থেকে ফোনে আমাকে এভারেষ্ট চূড়ায় ওঠার অনুভুতি বলছিলেন তখন আমিও যেন তাঁর সঙ্গে এভারেষ্টে চলে যাচ্ছিলাম। শত মাইল দূর থেকেও মুহিত ভাইয়ের উত্তেজনা,আমি টের পা্ছিলাম। মুহিত ভাই যেন স্বপ্নলোক থেকে বলে চলছেন এক দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প।

মুহিত ভাই বলছিলেন, এভারেষ্ট চূড়ায় যখন্ বাংলাদেশের পতাকাটা ওড়ালাম তখন মনে হচ্ছিল আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ। মনে হচ্ছিলো্ সারা বিশ্বকে আমি দেখিয়ে দিলাম বাংলাদেশও পারে। মুহিত ভাই যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন তাঁর যে অনুভুতি আমিও তাতে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিলো এ যেন আমারও বিজয়। চোখ ভিজে যাচ্ছিলো।

এভারেষ্ট থেকে নামার সময় পাঁচটা লাশ দেখার বর্ণনা দিচ্ছিলেন মুহিত ভাই। বললেন ‌‌অন্ধকার রাতে সরু পথ দিয়েই নামছিলাম। ঝড়ো বাতাস। এরপর লাশ। ভয়ে আমি শিউরে উঠছিলাম। কারণ এভারেষ্ট জয় করার চেয়ে নেমে আসা কঠিন। শরীরে তখন শক্তি থাকে না। অনেকেই ফেরার পথে মারা যায়। মুহিত ভাই বলছিলেন চারদিন পর অ্যাডভান্স ক্যাম্পে এসে ভাত খেলাম। যেন ভাত খাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে সুখের কাজ।

বারবার কথা বলছিলাম। বারবার ফোন কেটে যাচ্ছিলো। তারপরেও আমার সাক্ষাতকার নেওয়া চলছে। মুহিত ভাই বলছেন, জানেন হাসান রাত নয়টা থেকে একটানা পাহাড়ে উঠছি। ভোর পাঁচটা। এভারেষ্ট চূড়া থেকে আমি তখন মাত্র একশ মিটার দূরে। ঠিক তখনই চোখের সামনে এক আইরিশ অক্সিজেনের অভাবে মারা গেলেন।তিনি হেল্প হেল্প বলে চিৎকার করছিলেন। কিন্তু শেরপা যাওয়ার আগেই তিনি মারা যান। খুব ভয় হচ্ছিলো। কিন্তু কেবল মনের জোরেই উঠে গেছি। কিন্তু চূড়ায় ওঠার পর আমার অক্সিজেন শেস হয়ে যায়। কিন্তু শেরপা তখুনি সেটা বদলে দেয়।

মুহিত ভাইয়ের গল্প যেন শেষই হয় না। ক্যাম্প-১, ক্যাম্প-২, ক্যাম্প-৩, এবিসি- নানা গল্প বলছেন। তাঁর বর্ণণা আর উত্তেজনায় আমিও বারবার হারিয়ে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিলো আমিই যেন এভারেষ্ট জয় করলাম। গত কয়েকদিনে মুহিত ভাইয়ের সঙ্গে ৪০-৫০ বার ফোনে কথা হয়েছে। বারবারই তাঁর কাছ থেকে নানা গল্প শুনছি আর তাঁর সঙ্গে আমিও উঠছি এভারেষ্টে।

এ তো গেলো দ্বিতীয় বাংলাদেশির সঙ্গে সাক্ষাতের কথা। বাংলাদেশের প্রথম এভারেষ্ট বিজয়ী ইতিহাসের নায়ক মুসা ইব্রাহিম যেদিন এভারেষ্ট জয় করে ঢাকায় ফিরলেন সেই সাক্ষাতকারও আমি নিয়েছি।

মনে আছে, সেদিন সকাল থেকে আমরা সবাই এয়ারপোর্টে। শত শত লোক। সব নিরাপত্তা যেন ভেঙ্গে পড়ছে এয়ারপোর্টের। বিকেল বেলা মুসা ভাইয়ের ফ্লাইট নামলো। একের পর এক ফুলের মালায় ভেসে যাচ্ছেন আমাদের বীর সন্তান।

এয়ারপোর্ট থেকে কারওয়ানবাজারের প্রথম আলো অফিস। এই সময়টুকু আমি আর মুসা ভাই এক গাড়িতে। শুনছিলাম তার এভারেষ্ট জয়ের গল্প।বলছিলেন মুসা ভাই। সেই দুঃসাহসিক অভিযান। অক্সিজেন শেষ হয়ে যাওয়ার পর মুসা ভাই যখন চোখে অন্ধকার দেখছেন তখন এক শেরপা তাকে বাঁচিয়ে তুলছেন।

মোবাইলে একের পর এক ফোন আসছে মুসা ভাইয়ের। এর মধ্যেই আমরা কথা বলছি। মুসা ভাই বলে চলছেন এভারেষ্ট বিজয়ের গল্প। পথে পথে লোকজন তাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। সাড়া দিতে দিতেই কথা বলছেন মুসনা ভাই। আমরা যখন কারওনাবাজারে পৌছাই তখন সেখানে রাজ্যের ভীড়।

সাংবাদিক হিসেবে আমার নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয় যে বাংলাদেশের দুই এভারেষ্ট বিজয়ীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমি তাদের নিয়ে নিউজ করেছি। তাদের চোখে-মুখে-তাদের কথায় আমার এভারেষ্ট বিজয় হয়ে গেছে। দুজনেই বলেছেন, তারা অন্য রকম এক সুন্দর বাংলাদেশ চান। দুজনেই বলেছেন, তরুণ প্রজণ্মই পারে বাংলাদেশকে বদলে দিতে। দুজেনই শুনিয়েছেন আশার কথা।নতুন দেশের কথা। আমি মুগদ্ধ হয়ে শুনেছি। শ্রদ্ধা করেছি তাদের।

এভারেষ্ট জয় না করলেও মুসা ভাই আর মুহিত ভাইয়ের মতো আমারও বুকের ভেতর একটা বিশ্বাস আছে। আমারও বারবার মনে হয়, এই দেশটা একদিন ভালো হবে। সারা পৃথিবীর বুকে মাথা উুঁচ করে দাঁড়াবে। আর এজন্য তরুণ প্রজন্মকেই মানে আমাদেরই যার যার জায়গা থেকে লড়তে হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুসা আর মুহিতরা যদি এভারেষ্ট জয় করতে পারে তাহলে আমরাও পারবো একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে।

আমাদের সেই বাংলাদেশে সব মানুষ ভালোভাবে বাঁচতে পারবে। সেখানে রাজনীতির নামে ভন্ডামি-শঠতা থাকবে না। আমলাতন্ত্রের নামে মানুষকে কষ্ট দেওয়া থাকবে না। যানজট নামে কোন সমস্যা থাকবে না। লোডশেডিং থাকবে না। লিমনের মতো কাউকে পঙ্গু হতে হবে না। কোন দুঃস্বপ্ন থাকবে না সেখানে। থাকবে কেবল চ্যালেঞ্জ। এভারেষ্ট জয় করার মতো দেশকে উত্তেরোত্তর এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ।

ভালোবাসি বাংলাদেশ।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29386728 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29386728 2011-05-27 02:24:19
প্রিয় মায়ের জন্য কান্না..
২০০৮ সালের ৩ ডিসেম্বর আমার মা মারা যান। আড়াই বছর হয়ে গেলো। কিন্তু আমার এখনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় মা নেই। ঢাকা ছেড়ে বাসায় গেলে মা আর ছুটে আসবে না, আমাকে রান্না করে খাওয়াতে ব্যাস্ত হয়ে পড়বে না ভাবতে খুব কষ্ট লাগে।

২০০৮ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তায়, কোরবানির ঈদের কয়েকদিন আগে আমরা মাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। সুস্থ্য একজন মানুষ, সামান্য একটি সমস্যার কারনে হাসপাতালে। আমরা কেউই বুঝতেই পারিনি এভাবে হুট করে মা আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। হাসপাতালে তিনদিন সবই ভালো। কিন্তু ১ ডিসেম্বর কিছু বুঝে উঠার আগেই হঠাৎ আইসিইউতে নিতে হয়। দুদিন সেন্ট্রাল হাসপাতালের আইসিইউতে থাকার পর আমার মা চলে গেলেন আমাদের চোখের জলে ভাসিয়ে। আমরা কোনভাবেই মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তার এই হঠাৎ চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না।

আমার মা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ার সুযোগ তার হয়নি বিয়ের কারনে। মার সহপাঠীরা আমাদের বলতেন, তোরা লেখাপড়ায় ভালো, কারণ তোর মা ক্লাসের সেরা ছাত্রী ছিলেন। অনেক আদারে কেটেছে তাঁর ছোটবলা। তাঁর পরিবার ছিলো ফরিদপুরের এককালের শীর্ষ কয়েকটি পরিবারের একটি। মায়ের মনটা ছিলো বিশাল।

চট্টগ্রামে আমার বাবার সরকারী চাকুরি। সরকারী কলোনীতে আমরা যে বাসায় থাকতাম সেখানে একবার যে গেছে সে মায়ের রান্না খেয়ে, তার আন্তরিকতা দেখে ভক্ত হয়ে গেছে। মা মানুষকে খাইয়ে খুব আনন্দ পেতেন। সবসময় তিনি বাসায় অনেক লোকজন, উৎসব দেখতে পছন্দ করতেন। আমরা দিন নেই, রাত নেই বাসায় বন্ধুবান্ধব নিয়ে যেতাম। মা কখনো বিরক্ত হয়ে বলতেন না অসময়ে কেন এতো বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসিস? এমন অসাম্প্রদায়িক মানুষ, উচ্চ মনের মানুষ আমি জীবনে খুব কম দেখেছি।

মা কখনো গরীব বা ভিক্ষুকদের না বলতেন না। কলোনীতে থাকার কারনেই বাসায় সবসময় ভিক্ষুক আসতো। আমরা খুব বিরক্ত হতাম। কিন্তু মা হাসিমুখে কিছু না কিছু দিয়ে তাদের বিদায় করতেন। তাঁর জীবনে এমন দিন খুব কমই গেছে যেদিন তিনি কোন গরিব বা ভিক্ষুককে খাওয়াননি। মানুষের জন্য তাঁর ছিলো চরম সহমর্মিতা। কারো কোন কষ্টের কথা শুনলেই মা কাঁদতেন। তাদের স্বান্ত্বনা দিতেন।

মা মারা যাওয়ার পর আমার ছোট বোন জানালো, কয়েকদিন আগে নাকি সকাল ১১ টার দিকে এক ভিক্ষুক আমাদের বাসায় এসে মাকে বললো তার খুব খিদে লেগেছে। ১১ টার সময় রান্না থাকার কথা নয়, তাই বাসায় ভাত নেই। কিন্তু আমার মা গরম ভাত রান্না করে তাকে খাইয়ে বিদায় করলেন। এমন হাজারো ঘটনা আছে আমার মায়ের জীবনে। ছুটিতে বাসায় গেলেই মা আমার কাছে বলতেন হাসান টাকা দে তো। আমি বলতাম মা কি করবে? তিনি হাসতেন। সেই টাকা চলে যেতো গরীবদের কাছে। আমরা বাসায় আছি-ড্রয়িং রুমে টিভি দেখছি-হঠাৎ দেখি কোন এক ভিক্ষুক। আমরা তাকে বলি মাফ করো। সে বলে, তোমার মাকে ডাকো। তোমার মা আমাদের কখনো খালি হাতে বিদায় করে না। আমরা চুপসে যাই তখন। মাঝে মাঝে এ নিয়ে মায়ের সাথে ঝগড়াও বাঁধে। বলি মা ভিক্ষকু-গরিব এরা কি তোমার বান্ধবী? সবসময় এতো জ্বালাতন করে কেন? মা হাসে। প্রতিবেলা রান্নার আগে মা পুরনো ভাত বাইরে কাক বা শালিককে দিতেন। মার রান্না করার সময় রান্নাঘরের সামনে সবসময় পাখি থাকতো। মা প্রচুর বই পড়তেন। তাঁর কারনেই ছোটবেলা থেকে আমরা ভাই বোন প্রচুর বই পড়তাম।

আমাদের পরিবারে দুঃখ কষ্ট সেভাবে ছিল না। বেশিরভাগ সময়েই ছিল আনন্দ উচ্ছলতা। কিন্তু এতো আনন্দের মধ্যেই আমার মাটা চলে গেলো আমাদের ছেড়ে। আমরা ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারিনি সে এভাবে হঠাৎ করে চলে যাবে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর সকাল সোয়া সাতটায় আমার মা মারা যায়। সেন্ট্রাল হাসপাতালে আমার ছোটবোনটার কান্না দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল কষ্টে। আমরা দুই ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারনে ওই বাসায় বেশি থাকতো। ওর কতো আফসোস মাকে নিয়ে। ও হাসপাতালে মাকে সুস্থ্যে দেখে, রাতে খাইয়ে বাবার সাথে চট্টগ্রাম গিয়েছিল ভর্তি হতে। এসে দেখে মা আর নেই।

এসএসসি পাস করার পর বাসা ছেড়ে কলেজ হোস্টেল, এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যলেয়ের হল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পেশা আবার সাংবাদিকতা। তাই বছরের খুব কম সময় বাসায় গিয়ে থাকতে পারতাম। কিন্তু যখন যেতাম মা আমায় নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে উঠতেন। কি খাওয়াবেন কি করবেন দিশা পেতেন না। আমি ফেরার সময় মায়ের চোখ ছলছল করতো। ভাবতে কষ্ট হয়, সেসব দিন আর কখনো ফিরে আসবে না।

মায়ের কথা মনে করে আমার বাবা কখনো আমাদের সামনে মন খারাপ করেন না। আমরা বুঝি প্রতিমুহুর্তে কতোটা কষ্ট তিনি পান। আমি আমার ছোটবোনের সামনে কাঁদতে পারি না মাকে নিয়ে। কিন্তু আমি বুঝি আমরা সবাই কাঁদি সবাই সবাইকে আড়াল করে। এই কান্না কখনোই হয়তো শেষ হবে না।

ফরদেপুরের বালিয়াডাঙ্গী ঈদ গা মাঠের কবরে এখন আমার মা শুয়ে আছেন। তিনি এখন সব কিছুর উর্ধ্বে। মা কি দেখছে তাঁর সাজানো পরিবারের এখন কি অবস্থা। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও কোনভাবেই মায়ের হঠাৎ চলে যাওয়া আমি মেনে নিতে পারিনা। ভাবলেই তাই কষ্ট হয়। আমার খুব চিৎকার করে তোমাকে ডাকতে ইচ্ছে করে মা। আল্লাহ তাকে শান্তি দিক। মা আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তুমি ভালো থাকো মা। ভালো থাকো।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29376901 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29376901 2011-05-07 16:00:24
সমাবেদনা-এবার বউয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খাসিয়া পুরুষরা (নরস্বাধীনতা বিষয়ক একটি সিরিয়াস ফান পোষ্ট) বিশ্বজোড়া আদিবাসী সমাজের একটা বড় অংশ একসময় নারীভিত্তিক ছিল। তাদের সংখ্যা হ্রাস পেতে পেতে এখন হাতে গোনার অবস্থায় এসে গেছে। ভারতের উত্তর-পূর্ব পর্বতসংকুল মেঘালয়া অঞ্চলের খাসিয়া সম্প্রদায়টি তার অন্যতম। তাদের সংখ্যা আনুমানিক ১০ লক্ষ। তারা যে এখনও টিকে আছে তাদের সনাতন রীতিনীতি আর আচার অনুষ্ঠান অক্ষুন্ন রেখে ত্তার প্রধান কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা। ভারতের সংবিধানে আদিবাসী সমাজের জীবনধারা ও সংস্কৃতিকে সসম্মানে সংরক্ষিত রাখার প্রতিশ্রুতি দ্ব্যর্থহীনভাবে লিপিবদ্ধ। আদিবাসী কেবল নয়, যেকোন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরই পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে তাদের নিজ নিজ ঐতিহ্য বজায় রেখে মুক্তভাবে জীবনযাপন করার।
খাসিয়া পুরুষদের জন্যে সেটাই হয়েছে বড় বাধা---বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে পা মিলিয়ে তাদের সমাজও যে আধুনিকতার পথে দ্রুত অগ্রসর হবে তার কোন তাড়া নেই, নেই কোনও উদ্দীপনা। ক্ষমতাবান সমাজপতিদের (পতি না বলে কি পত্নী বলা উচিত?) জন্যে স্থিতাবস্থাই আদর্শাবস্থা---পরিবর্তন তাদের স্বার্থবিরোধী। তারা পরিবর্তনের যেকোন প্রচেষ্টাকে প্রতিরোধ করবার চেষ্টা করবে সকল শক্তি প্রয়োগ করে।
কিন্তু ক্ষমতাহীন পুরুষকূলের একটা বড় অংশ এখন অধৈর্য হয়ে উঠছে পরিবর্তনের জন্যে। কৈথ পারিয়াত নামক এক ৫৮ বছর বয়স্ক খাসিয়া পুরুষের নালিশঃ আমাদের কিছু করার নেই। আমরা কেবল খাইদাই ঘুমাই, গীটার বাজাই, আড্ডা মারি, আর সন্তান উৎপাদন করি। এর বাইরে আর কিছু করতে দেওয়া হয়না আমাদের।
নালিশগুলো একেবারে হেসে উড়িয়ে দেবার মত নয়। পুরুষ হিসেবে আমার এক মন বলবেঃ সুখে আছো তো মিয়ারা, বোঝনা সংসার কাকে বলে। আমাদের মত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ভাতকাপড়ের পয়সা রোজগার করতে হত, তাহলে বুঝতে কত ধানে কত চাল।অবশ্য আরেক মন, ঠাণ্ডা মাথার যুক্তিশীল মন, ভাল করেই জানে বেচারা খাসিয়াদের কেন এত ক্ষোভ। মেয়েদের এতই দাপট সেখানে যে উত্তরাধিকার আইনে পুরুষের কোনও স্থান নেই---সব সম্পত্তি মেয়ের ভাগে যাবে। কোন পরিবারে কন্যাসন্তান না থাকলে ওরা কি করে জানেন? বাইরের একটি মেয়েকে দত্তক নিতে হয় পরিবারটিকে, যাতে সেই মেয়ে সম্পত্তির মালিক হতে পারে!(পুরুষশাসিত সমাজে কি এতটা অবিচার হয়?)বিয়ের পর আমাদের মত খাসিয়াবাড়ির মেয়েরা চোখের জলে লুটোপুটি হয়ে শ্বশুরবাড়ি যায় না, বরং ছেলেরাই যায় শ্বশুরালয়ে (কান্নাকাটি হয়ত তারাও করে কিঞ্চিৎ), এবং সেখানেই সংসার পাততে হয় তাদের। শুধু তাই নয়, শ্বশুরালয়ে আবাস নেবার পর নিয়ম হলঃ ছেলে বেশি কথাবার্তা বলবে না, যা বলার শ্বাশুরিই বলবে, আর বলবে তার স্ত্রী। সমাজের কোনও জরুরি বৈঠকে তাদের প্রবেশাধিকার নেই। গোত্রবিষয়ক যা কিছু সিদ্ধান্ত নেবার সব মেয়েরাই নেয়---পুরুষদের কোন হাত নেই।
অতএব তারা যে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ ঘোষণা করবে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এটাই স্বাভাবিক, বিশেষ করে আধুনিক যুগের পরিপ্রেক্ষিতে। আগেকার দিনে যখন খাসিয়া পুরুষরা শিকারের খোঁজে দীর্ঘ সময় ব্যাপী বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত তখন অতটা গা করত না তারা---বাড়ি ফেরার পর কিছুটা সমাদর পেত বইকি মেয়েদের কাছ থেকে। কিন্তু বর্তমান যুগের নতুন জীবনধারাতে শিকারের প্রয়োজন প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে খাসিয়া পুরুষ একরকম গৃহবন্দী---বেকার এবং নিষ্ক্রিয়। হতাশার মাত্রা এতটাই বেড়ে গেছে যে অনেকে গাঁজা খেয়ে, তাড়ি খেয়ে মন থেকে সে-হতাশা দূর করে সবকিছু ভুলে থাকবার চেষ্টা করছে। নারীর এমনই প্রতাপ খাসিয়া সমাজে যে কোনও পরিবারে স্বামীস্ত্রীর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে সন্তানের একক অধিকার স্ত্রীর, স্বামীর কোন ভূমিকাই থাকে না তাতে। স্ত্রী যদি একটি দুষ্ট চরিত্রের মেয়ে হয়, সন্তানপালনের মোটেও কোন যোগ্যতা নেই, ওদিকে স্বামী একজন সাধুসজ্জন পুরুষ বলে সর্বজনস্বীকৃত, তাহলেও সেই অযোগ্য মেয়েই পাবে সন্তান, সুযোগ্য পুরুষটি নয়। অর্থাৎ পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের যেরকম লাঞ্ছনা নারীশাসিত সমাজে পুরুষের লাঞ্ছনা তার চেয়ে খুব একটা কম নয়। তাই খাসিয়া পুরুষরা পশ্চিমের নারী আন্দোলনের অনুকরণে একটি ‘মেনস লিব’ বা নরস্বাধীনতা আন্দোলন সূচনা করার উদ্যোগ নিচ্ছে।
নারীপুরুষের সম্পর্ক আর পরিবার বিষয়ে নারীশাসিত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী একেক গোষ্ঠীতে একেকরকম। কোথাও খুব ঢিলেঢালা কোথাও বেশ কড়া। খাসিয়াদের মধ্যে বহুবিবাহ কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ। বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ। বেশির ভাগ বিয়ে নিজ নিজ গোত্রের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে, যদিও তাদের কোন কোন শাখায়গোত্রান্তর বিবাহ খুব বিরল নয়। যৌনসম্পর্ক আর বিয়েশাদীর ব্যাপারে ওদের দৃষ্টিভঙ্গী অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়। তবে এটুকু বোধ হয় নির্দ্বিধায় বলা যায় যে ছেলেমেয়ের যৌনসম্পর্ক বিষয়ে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টিভঙ্গী আমাদের চাইতে অনেকটাই উদা্র---অনেকটাই সুস্থ ও স্বাভাবিক। উদারতার মাত্রা অবশ্য একেক সমাজে একেকরকম। খাসিয়াদের মধ্যে এটা বেশ সংযত, কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব চীনের ইউনান অঞ্চলে মসৌ নামক যে জাতিটির বাস সেখানে কোনরকম লাগাম নেই এব্যাপারে। বেসামাল যৌনাচার বলতে পারেন---আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে নিঃসন্দেহে তাই। মসৌ সমাজে মেয়েরাই বাছাই করে কোন পুরুষকে তারা ঘরে আনবে, এবং কোন রাতে। বিয়শাদির বালাই নেই---ইচ্ছে হলে করবে, নইলে করবে না। এবং ইচ্ছেটা ছেলেদের নয়, মেয়েদের। একই পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে সবসময়, বা একই সময়, তারও কোন অর্থ নেই। মেয়ের ইচ্ছে হলে একেক রাতে একেক পুরুষ আসবে তার ঘরে। একটা পুরুষ যে নিশাযাপন করতে এসেছে তার ঘরে সেটা সে জানান দেয় বাইরের বেড়ায় একটা রঙ্গিন গামছা ঝুলিয়ে রেখে! অনেকটা হোটেলের দরজায় “ডু নট ডিসটার্ব” সাইন ঝুলিয়ে রাখার মত। ওদের সমাজে প্রথাটি এতই স্বাভাবিক যে একে নিয়ে মুখ টিপে হাসাহাসি ঠাট্টামস্করা করার কল্পনাই করে না তারা। এটাই নিয়ম, সংস্কৃতির অংশ। আমাদের তথাকথিত “সভ্য” সমাজের দৃষ্টিভঙ্গীতে এগুলোকে তীব্র ঘৃণার চোখে দেখা হবে জানি, “দোজখেও জায়গা হবে না” বলে ঢালাও মন্তব্য করবে অনেকে, কিন্তু মজার ব্যাপার যে মসৌ সমাজে যৌনঅপরাধ নামক কোন জিনিস নেই, ধর্ষণ কাকে বলে জানেনা তারা, বিকৃত যৌনাচার ওদের অজানা---ওই সমাজে আইনশৃংখলা রক্ষার জন্যে পুলিশবাহিনী মোতায়েন করার প্রয়োজন হয়না। ওদের মত শান্তিপূর্ণ সমাজ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। সুতরাং বিচারকের আসনে বসে অঙ্গুলি উত্তোলন করে ওদের “চরম চারিত্রিক পতনের” জন্যে গুরুদণ্ড জারি করার আগে একটু ধীরমস্তিস্কে ভেবে দেখা দরকার একটা সমাজের শেষ লক্ষ্যটা কি। মসৌ সমাজে বিয়ে জিনিসটাই একটা ন্যাক্কারজনক বিষয়। ছিঃ বিয়ে করে কে?—এমন একটা ঘিনঘিন ভাব। বাড়ির ছেলেমেয়েদেরদুষ্টুমি একটু মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে বাবামা ওদের ভয় দেখায় বিয়ে দিয়ে দেবে বলে। বিয়ের ভয়ই তাদের বড় শাস্তি! আমাদের কাছে অভাবনীয় এসব---কিন্তু ওদের জন্যে এ’ই স্বাভাবিক।
তবে একটা মৌলিক বিষয়ে প্রতিটি উপজাতিরই দৃষ্টিভঙ্গী এক---নারী হলেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। পুরুষের কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেই সমাজে। তাদের কোনও দায়দায়িত্ব নেই। তাদের কোন সাংবিধানিক অধিকার নেই। খাসিয়া পুরুষ ক্ষুব্ধ। সম্ভবত মসৌ পুরুষও ক্ষুব্ধ। একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি যুগে কোনও সমাজের একটা অংশ আরেকটা অংশ দ্বারা দিবারাত্র পরিপূর্ণভাবে শাসিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে সেটা মুখ গুঁজে সহ্য করবে না কেউ। মসৌ পুরুষরা দলে দলে গোত্রত্যাগ করে নাগরিক জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠছে। খাসিয়া তরুণরাও আস্তে আস্তে শহরমুখি হচ্ছে। কালে কালে এই প্রাচীন সমাজগুলো যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে যুগের হাওয়াতে তাতে কোন সন্দেহ নেই। অধিকাংশ সমাজ হয়েছে। এটা দুঃখজনক সন্দেহ নেই, কিন্তু একেই বলে সামাজিক বিবর্তন---এটা অবধারিত।
একটা অস্বস্তিকর চিন্তা কিন্তু থেকেই যায় শেষ পর্যন্ত। আদিসমাজ যখন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তখন থাকবে কেবল আমাদের এই “সভ্য” সমাজ। সত্যি কি পুরোপুরি সভ্য হতে পেরেছি আমরা? এত এত ধর্মযাজক এলেন আমাদের মধ্যে, নিয়ে এলেন এত এত মহৎ বানী, শোনালেন এত এত নীতিবাক্য, কই, আমাদের পুরুষগুলো তো প্রায় একইরকম আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে নারীর ওপর। “অসভ্য”দের নারী-পুরুষের সামাজিক অসমতার নিন্দায় মুখর হই আমরা, আমাদের অসমতা কি তার চেয়ে খুব বেশি স্বতন্ত্র? আমাদের নারী কি পুরুষের চাবুকের বাড়ি খাচ্ছে না এখনো?আমাদের নারী কি ধর্ষিত হচ্ছে না অহরহ?এবং ধর্ষিত হবার পর পরিবারের ধিক্কারের শিকার হচ্ছে না অনেক জায়গায়?অর্থাৎ ধর্ষিতা হওয়াটিকেও দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য করা হয় না সেসব সমাজে?এমনকি পশ্চিমের অত্যুন্নত সমাজেও কি সব অসমতার সমাধান হয়ে গেছে?যেখানে হয়েছে সেখানে কি উল্টোরকম একটা বৈষম্য তৈরি হয়ে যাচ্ছে না?অর্থাৎ নারীর অধিকার পাচ্ছে না অগ্রাধিকার পুরুষের তুলনায়?
মূল কথা বোধ হয় এই যে মানবসমাজ যত চেষ্টাই করুক না কেন একটা ন্যায়নিষ্ঠ পূর্ণ মানবাধিকারভিত্তিক জনগোষ্ঠী রচনা করা, পূর্ণ সমতা রক্ষা করা মানবপ্রকৃতির বাইরে। ভারসাম্য আমরা কোনদিনই রক্ষা করতে পারিনি। ভবিষ্যতে কোনদিন পারব সে আশা অন্তত আমার নেই।
নারীপুরষের সামাজিক অসমতা ও বৈষম্য থেকে কোন জাতিই পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি আজ পর্যন্ত। অতি প্রাচীন সমস্যা এটি। উপজাতিদের বেলায় কেবল নয়, এটা সব জাতিরই সমস্যা। এ-নিয়ে বিশিষ্ট চিন্তাবিদরা যুগে যুগে অনেক চিন্তাভাবনা করে গেছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন জর্জ বার্নার্ড শ’। তাঁর শেষ দিককার একটি নাটকে তিনি এক অভিনব সমাজের নকসা এঁকেছিলেন যাতে কোনও জাতি তার নেতা নির্বাচন করাকালে একজন নেত্রীও নির্বাচন করবে---অর্থাৎ নেতা-নেত্রীরা জোড়ায় জোড়ায় থাকবেন, একা পুরুষ বা একা নারী নন। মৌলিক প্রস্তাব, কিন্তু মানবপ্রকৃতির ভেতরেই যদি প্রোথিত থাকে ভারসাম্যতার অভাব তাহলে বার্নার্ড শ’র আদর্শ জাতি যে তাঁর নাট্যমঞ্চেই সীমাবদ্ধ থাকবে সেটা তো খুবই স্বাভাবিক।
(মীজান রহমানের এই লেখাটি নতুন দেশ থেকে নেওয়া।)


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29367881 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29367881 2011-04-23 16:18:55
হায়রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়! মঙ্গলবার আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু আপা বলেছেন, পরমানু তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তেজস্ক্রিয়তা যেন আমেরিকান, অষ্ট্রেলিয়ানসহ কাউকে ছোবে না; ছোবে কেবল বাংলাদেশ দূতাবাসকে।
প্রথম আলো অনলাইনে সংবাদটি প্রকাশের পর থেকেই অসংখ্য বাংলাদেশি টেলিফোন করে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, আগে দূতাবাস নয়, আগে বাংলাদেশি নাগরিকদের সরাতে হবে। তা না হলে দশ হাজার লোককে ভোগান্তিতে পড়তে হবে। কাজেই তারা সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
প্রবাসীরা বলছেন, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিমান পাঠিয়ে আগে তার নাগরিকদের সরিয়ে নিচ্ছে আর আমরা দূতাবাস সরিয়ে নিচ্ছি। কোনদিনই হয়তো আমরা সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে পারবো না। কে জানে দূতাবাস সরানোর মধ্যে আমাদের কোন ধান্ধা আছে! ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29344995 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29344995 2011-03-15 20:10:43
ফেইসবুক সংক্রান্ত হেল্প চাই.. http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29339004 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29339004 2011-03-06 01:55:11 স্মৃতিতে হুমায়ুন আজাদ: যেভাবে তাকে হাসপাতালে নিয়েছিলাম এবং পরবর্তী ঘটনাগুলো...
লিখবো লিখবো করেও কখোনো লেখা হয়নি ঘটনাটা। সবসময় মনে হয়েছে, মানুষকে জানিয়ে লাভ কি? তারপরেও ২০০৯ সালের আগস্টে প্রথম ব্লগেই লিখি ঘটনাটা। সেটিই রিপোষ্ট।

[প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি আর আগষ্ট এলেই ভাবি এবার সেই ঘটনা নিয়ে লিখবো। কিন্তু আলসেমিতে হয়ে ওঠে না। আমাদের অফিসের ফিচার সম্পাদক জাহিদ রেজা নূর কয়েকবার বলেছিলেন লিখতে। তাঁর কথায় একবার কিছুটা লিখেওছিলাম। কিন্তু শেষ আর করা হয়ে ওঠেনি নানা ব্যস্ততায়।

আজ মনে হচ্ছে ব্লগে শেয়ার করি সেদিনের ঘটনা। পাঠক বিষয়টি জানুক। আমি মুক্ত হই গণমাধ্যমে ইতিহাস চেপে রাখার দায় থেকে। কারন আমার পরিচিতরা ছাড়া সাধারন মানুষ ঘটনাটি জানে না। আজ তাদের জানাচ্ছি।


আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের (ডিইউএফএস) সদস্য। আমার বিশ্ববিদ্যালয় মানেই তখন এই সংগঠন। ক্লাস শেষ করেই কলা ভবন থেকে ছুটে যাই টিএসসিতে। সেখানেই আড্ডা, সেখান থেকে খেতে যাওয়া, আবার ফিরে আসা। রাতে এখান থেকে নয়টা সাড়ে নয়টা কখনো কখনো ১০ টায় হলে ফিরি।

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৪। তখন শীতকাল। বইমেলা চলছে। টিএসসি জমজমাট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন একটি গানের উৎসব হবে। টিএসসির নিচে তার মহড়া চলছে। গিটারে গান। আমি বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সেই গান শুনছি। রাত আটটা থেকে নয়টার মধ্যে। হঠাৎ একটি বোমা ফাটার মতো শব্দ হলো। মাঝারি ধরনের শব্দ। আমার আবার সব কিছুতেই ব্যাপাক কৌতুহল। খুব সাহসী আমি সেটি বলবো না, তবে ভয় ডর নেই এটুকু বলতে পারি।

তো কোথা থেকে এলো সেই শব্দ সেটি জানতে আমি টিএসসি থেকে হাঁটা শুরু করলাম বাংলা একাডেমির দিকে। রাস্তার মাঝে যে ডিভাইডার আমি সেটি ধরে আনমনে হাঁটছি। মনে হলো সোহরাওয়াদী উদ্যান দিয়ে কেউ দৌড়ে পালাচ্ছে। একটু দূরে যেতেই দেখি এক জায়গায় জটলা। গেলাম সেখানে। দেখলাম চাঁর-পাঁচজন পুলিশ সদস্য, কিছু লোক সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সামনে পড়ে আঝছ রক্তাত্ব একটি দেহ। কিন্তু কেউ ধরছে না। বরং সবাই যেন তামাশা দেখছে। কিংবা হয়তো ঝামেলার ভয়।

আমি দ্রুত সেখানে গিয়ে উপুড় হওয়া লোকটিকে তুললাম। রক্তে ভেজা। মুখ দেখে চিৎকার করে উঠি এ তো হুমায়ুন আজাদ। আমি যখন স্যারকে তুলি স্যারের এক পাশের গাল দুই ভাগ হয়ে দুদিকে চলে গিয়েছিলো। পুরো মুখটা পুরো হা হয়ে ছিল। আমি দুই পাশে চাপ দিয়ে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করলাম।

হুমায়ুন আজাদকে আমি সামনাসামনি আগে কখনো দেখি নাই। কিন্তু তাঁর অনেক বই পড়েছি। আমার স্কুলের এক ইংরেজি শিক্ষক যে আমাকে মানুষ হওয়ার দীক্ষা দিয়েছিল তাঁর কাছ থেকে জেনেছি হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে। অনেক বই পড়েছি আজাদ স্যারের। ব্যাক কাভারের সেই ছবি আর সেই চুল দেখে তাই স্যারকে চিনতে পারলাম।

মূল ঘটনায় ফিরি। স্যারকে হাসপাতালে নিতে হবে। কি করবো? আমি আমার মোবাইল ফোন থেকে একটি ফোন করলাম বিটু ভাইকে। বললাম-বিটু ভাই, হুমায়ুন আজাদকে বোমা মারছে। আপনি বাংলা একাডমেরি সামনে আসেন। বিটু ভাই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় চলচ্চিত্র সংসদের অর্থ সম্পাদক এবং আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ বড় ভাই। (আমি তখন ভেবেছিলাম স্যারকে বোমা মারা হয়েছে। আসলে তা নয়, তাকে কোপানো হয়েছিল। দুস্কৃতিকারীরা পরে পালানোর সময় বোমা ফাটায়)

বিটু ভাইকে ফোন করে আমি রক্তাত্ব হুমায়ুন আজাদকে হাপাতালে নেওয়ার জন্য একটি রিকশায় উঠানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু রিকশায় উঠানো সম্ভব হলো না।
স্যারকে কোনভাবেই রিকশায় রাখতে পারছিলাম না। আমি তখন দৌড়ে টিএসসির দিকে আসলাম। সাদা একটি প্রাইভেট কার এদিকেই আসছিলো। আমি তাকে বললাম ভাই আমাদের এক স্যার হুমাযুন আজাদকে কেউ বোমা মেরেছে। হাসপাতালে নিতে হবে। একটু আসেন। সে কিছুতেই রাজি হলো না। বরং গাড়ি ঘুরিয়ে উল্টো দিকে চলে গেলো। আমি কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এদিক ওদিক তাকিয়ে কোন দিশা পাচ্ছিলাম না। ছটফট করছিলাম।

হঠাৎ অন্য বুদ্ধি আসে। দেখি পুলিশের বিশাল এক ট্রাক দাঁড়িয়ে টিএসসির সামনে। আমি তখন চিৎকার দিয়ে তাদের বললাম ভাই স্যারকে হাসপাতালে নিতে হবে। আমি এখানকার ছাত্র। প্লিজ আপনাদের গাড়িটা নিয়ে আসেন। একই সঙ্গে আমি হুমকিও দিলাম। বললাম স্যারকে হাসপাতালে না নিতে পারলে ছাত্ররা আপনাদের ওপর খেপবে। চেচামেচি করলাম। এক পর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা রাজি হলো। তারা এলো গাড়ি নিয়ে। লোকজনের সহায়তায় আমি স্যারকে পুলিশের সেই ট্রাকে তুললাম। স্যারকে গাড়িতে তুলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কারণ শরীরের ওপর তার কোন নিয়ন্ত্রন ছিলো না।

এদিকে স্যারকে আমি ট্রাকে উঠনোর আগেই সেখানে হাজির হলো সাংবাদিক পাভেল ভাই। (সে বোধহয় নিউ নেশন বা কোন একটা ইংরেজি কাগজে কাজ করতো। মাঝে মাঝে আমাদের সংগঠনে আসতো। তাই তাকে চিনতাম।) স্যারকে পড়ে থাকা অবসস্থা থেকে উঠানোর সময় থেকে পাভেল ভাই তাঁর ক্যামেরা দিয়ে একের পর এক ছবি তুলছে স্যারের সঙ্গে আমার। যখন ট্রাকে উঠাচ্ছিলাম তখনো ছবি তুলছে। আমি তখনন তাকে গালি দিয়ে বলছি, পাভেল ভাই এখন ছবি তোলার সময়? [পরে বুঝেছিলাম সে তার কাজ করেছে। তাঁর তোলা এই ছবিগুলোই পরের দিন সব ফটো সাংবাদিকরা নেয়। পরে সিআইডিও তার ছবিগুলো নিয়েছিল এবং তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছিল।]

যাই হোক আমি স্যারকে পুলিশের ট্রাকে তুললাম অনেক কষ্টে। কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এতো ভীড়, চেচাচেমি, আমি খুব অস্থির বোধ করছি। পরিচিত কাউকে খুঁজছিলাম। পুলিশের ট্রাক ছাড়ার আগে আমি দেখলাম আমার পাশে বিটু ভাই আছে। চরম স্বস্তি বোধ করলাম। যাক চেনাপরিচিত কেউ আছে।

ট্রাকের মধ্যে স্যারকে জড়িয়ে ধরে আছি। ট্রাক চলছে। স্যারের হা করা মুখ দিয়ে আমি রাস্তা দেখছি। স্যার আমাকে জিঞ্জাসা করলো বাবা আমাকে কই নিয়ে যাও? আমি বললাম স্যার হাসপাতালে। আপনার কিছু হয়নি। স্যার বললো আমার চশমা কই? আমি বললাম স্যার আছ। স্যার বললো আমি পুলিশের গাড়িতে যাবো না। আমি বললাম ঠিক আছে স্যার আমরা নেমে যাবো এখুনি।

আহত রক্তাক্ত অবস্থায় আমি কোন মানুষকে এতো শক্ত থাকতে দেখিনি। অন্য কেউ হলে এতো ব্যাথা নিয়ে চিৎকার করতো। ভয় পেতো, কিন্তু স্যার খুব শক্ত দৃড় চিত্তে বসে আছে; যেন কেউ ভুল করে তাকে কুপিয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি যেন খুব কষ্ট পেয়েছেন। আমি আজো স্যারের সেই শক্ত মুখ মনে করতে পারি।

যাই হোক ট্রাক চলছে। আমরা যাচ্ছি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বাংলা একাডেমি থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ গেলে দোয়েল চত্ত্বর পেরিয়ে সোজা চলে গেলেই হয়। কিন্তু পুলিশের ভ্যান দোয়েল চত্ত্বর হয়ে অবার ডানে স্টেডিয়ামের দিকে চলে গেলো। আমি চিৎকার করলাম। পুলিশকে বললাম ভাই আপনারা ঢাকা মেডিকেল চেনেন না? পুলিশের এই সময় নষ্টে মেজাজ খারাপ হলো। ট্রাক ঘুরে শহীদ মিনার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগের সামনে গিয়ে থামলো। আমি আর বিটু ভাই অনেক কষ্টে স্যারকে নামালাম ট্রাক থেকে। জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলাম।


ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগে যে কোন রুগীর জন্য পাঁচ টাকা দিয়ে স্লিপ কাটতে হয়। সেটা কাটলাম। এরপর স্যারকে নিয়ে ট্রলিতে করে রওয়ানা দিলাম সম্ভবত ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসককে বললাম উনি আমাদের স্যার। ডাক্তার স্লিপ চাইলো। আমি স্লিপ বের করতে গিয়ে দেখি সেটি রক্তে ভিজে গেছে। কান্না পেল। ডাক্তার আবারো স্লিপ আনতে বললেন। ছুটলাম আবার। এরপর শুরু হলো স্যারের চিকিৎসা। আমরা স্যারের হাত পো জোরে ধরে আছি। রক্ত থামানোর চেষ্টা চলছে।

ইতিমধ্যে ডাক্তাররা প্রাথমিক কিছু ওষুধ আনতে বললো। আমি আর বিটু ভাই নিজেদের টাকায় সেই অসুধ আনালাম। এরপর দেখি আমাদের টাকা শেষ। ছাত্র মানুষ। কতো টাকাই বা আমাদের পকেটে থাকে। যাই হোক, আমরা সেখানে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বললম এই অসুধগুলো আনার ব্যবস্থা করতে। আমাদের টাকা নেই। তিনি তাই করলেন।

এদিকে স্যারের চিকিৎসা শুরু হওয়ার পরপরই আমি মোবাইলে শুভকে বললাম ঢাকা মেডিকেল আয়। শুভ আসলো। (শুভ মানে আমার বন্ধু। ও তখন প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক) এরপর শুভ, তখনকার ভিসি ফায়েজ স্যারসহ আরো অনেকেই আসলো। আমাদের চলচ্চিত্র সংসদের বড় ভাইরাও আসলো। সবাই বললেন, আমি যনে এখন হলে গিয়ে রক্তে ভেজা এসব ড্রেস চেঞ্জ করি। আমার হাসপাতাল থেকে চলে আসতে ইচ্ছে করছিল না। তবুও এলাম।

এদিকে স্যারকে নিয়ে আমি যখন ট্রলিতে করে ৩২ নম্বর ওয়র্ডে যাচ্ছিলাম সেটি চ্যানেল আই তাদের খবরে দেখায়। আমার বাবা-মা আমার রক্তে ভেজা সে ছবি টেলিভিশনে দেখে ভাবলো আমার কিছু একটা হয়েছে। আমি তাদের ফোন করে ঘটনা জানাণাম। বললাম ভালো আছি। কোন সমস্যা নেই। আমার কিছু হয়নি। তারা নিশ্চিন্ত হলো।

এরপর আমি বিটু ভাইয়ের সাথে তার ফজলুল হক হলে এলাম। আমার হল জহরুল হক হল অনেক দূরে। তাই তার হলেই আমি গোসল করলাম। ড্রেস চেঞ্জ করে বের হলাম। ততোক্ষনে বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল শুরু হয়ে গেছে। হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা কেন? বিচার চাই এই টাইপের কোন মিছিল। আমিও যোগ দিলাম সেই মিছিলে। অনেক রাতে হলে ফিরলাম। ঘুমালাম।

একটি বিষয় ভেবে খুব ভালো লাগে এখনো। পরে জেনেছিলাম, ঘটনা ঘটার মাত্র ১১ মিনিটের মাথায় স্যারকে আমি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেছিলো, কোনভবে স্যারকে হাসপাতালে নিতে আরেকটু দেরি হলে রক্তক্ষরনের কারনে বাঁচানো যেতো না। এজন্য খুব ভালো লাগছিল আমাদের; যে স্যারকে বাঁচাতে পারবো।

রাতে ৩ টার দিকে ঘুমাতে গেলাম। সারাদিনের ক্লান্তি, পরিশ্রম, উত্তেজনায় দীর্ঘক্ষন ঘুমালাম।

পরদিন দুপুর ১২ টায় আমার ঘুম ভাঙ্গলো। দ্রুত টিএসসি গেলাম। জানতে পারলাম স্যারকে রাতেই সিএমএইচ নেওয়া হয়েছে। এদিকে পরদিনের প্রায় সব দৈনিকে আমার ছবি। আমি রক্তাত্ব স্যারকে ধরে আছি। সেই ছবি। যাই হোক। জনকণ্ঠ বিরাট করে খবরটা ছাপছে। একটা জনকন্ঠ কিলনাম। খবরটা পড়লাম।

যাই হোক-সারাদিন আমি মনে মনে বারবার প্রার্থনা করছি -স্যার আপনি সুস্থ্য হয়ে উঠেন। কিন্তু সারাদিন নানা গুজব। একবার শুনি স্যার বেঁচে নেই। আবার শুনি বেঁচে আছেন। এসবরে মধ্যে সময় কাটছে। এর মধ্যে বিকেলে কলকাতার তারা বাংলা বা অন্য কোন চ্যানেলের কল্যান টিএসসিতে খবর শুনলাম স্যার নাকি মারা গেছে। কথাটা শুনেই আমার প্রচন্ড মন খারাপ হলো। টিএসসির দোতালায় চলচ্চিত্র সংসদের রুমে এসে আমার মাথা ঘুরতে লাগলো। এরপর আমি অসুস্থ্য হয়ে গেলাম। বমি করলাম। কষ্টে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমি ব্যার্থ। স্যারকে বাঁচাতে পারলাম না।

কিন্তু কিছুক্ষন পরেই আবার জানতে পারলাম না স্যার বেঁচে আছে। ইন্ডিয়ার টেলিভিশন ভুল খবর দিছে। এও জানলাম স্যারকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়া হচ্ছে। আমি স্বস্তি ফিরে পেলাম। স্যারকে ক'দিন পর যথারীতি দেশের বাইরে নেওয়া হলো।

এদিকে স্যারের উপর হামলার ঘটনার বিচার চেয়ে ক্যাম্পাসে শুরু হলো তীব্র আন্দোলন। সব জায়গায় পোষ্টার টানানো হয়েছে। তাতে একটিই ছবি-আমি স্যারকে ধরে আছি। ক্যাম্পাসের যেদিকেই তাকাই আমার ছবি। আমার হাঁটতে বিব্রত লাগে। মনে হয় সবাই আমাকে দেখছে। টিএসসিতে গেলে মনে হয় পুলিশ আমাকে ফলো করছে। ইনকিলাব সে সময় নিউজ করলো ঘটনা ঘটার কিছুক্ষনের মধ্যেই যে দুই ছাত্র স্যারকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো তাদের গ্রেপ্তার করা হোক। তাহলেই সব জানা যাবে।

ছবিটা খেয়াল করুন। দেখুন আমি চিৎকার করছি। কিন্তু কেউ কেউ ভুল করে ভাবেন, আমি হাসছি। সংগ্রাম ইনকিলাব্ সেই কথা বলে তাই নিউজ করলো এই ছেলে হাসে কেন? পরে জানতে পারলাম যথাসময়ে হাসপাতালে নেওয়ায় সংগ্রাম খুবই বিরক্ত। সে সময় স্যারের রাজাকদের বিরুদ্ধে বই নিয়ে সংগ্রাম ক্ষেপে আছে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে আমার খালি মনে হয় পুলিশ আমাকে ফলো করে। কেমন একটা ভয় ভয়। সবাই বললো বাসা থেকে ঘুরে আয়। ভয় কেটে যাবে। ভালো লাগবে। আমি চট্টগ্রাম গেলাম।

মাস খানেক পর স্যার সম্ভবত দেশে আসলেন সুস্থ্য হয়ে। মুখে একটা দাগ হয়ে থাকলো। স্যারের ফেরা উপলক্ষ্যে অপরাজেয় বাংলার সামনে অনুষ্ঠান। সবাই সেখানে বক্তৃতা করছে। আমি দর্শকের মতো শুনছি।

স্যার বক্তৃতা করা শুরু করলো। আমি স্যারের কথাগুলো শুনলাম। মুগ্ধ হয়ে দেখছি। খুব তৃপ্ত লাগছে। মনে মনে বলছি স্যার আপনি কি জানেন রাস্তায় যখন আপনি পড়ে ছিলেন, কেউ যখন আপনাকে ধরেনি, তখন এই আমিই আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমিই আপনাকে বাঁচিয়েছি। আমার মধ্যে তখন সাফল্যের আনন্দ।

আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল স্যারের সঙ্গে দেখা করতে। শুভকে নিয়ে আমি একদিন স্যারের বাসায় যাওয়ার চেষ্টাও করলাম সেদিনের ঘটনা বলতে। কিভাবে স্যারকে হাসপাতলে নিলাম সেই কাহিনী। একদিন গেলামও স্যারের বাসায়। কিন্তু জানানো হলো, স্যার বাসায় নেই।

স্যারের সঙ্গে আমার সেই আলাপ আর কখনোই করে ওঠা হয়নি। স্যার কখনো জানতেও পারিনি কে তাকে হাসপাতালে নিয়েছিলো? স্যার তখন কি বলেছিলেন।


এদিকে স্যার দেশে ফেরার পর এই ঘটনা নিয়ে দায়ের করা মামলার তদন্ত নিয়ে শুরু হলো আন্দোলন। পুলিশের বদলে মামলার তদন্তভার পড়লো সিআইডির ওপর। একদিন আমি ক্লাস করে বের হচ্ছি আমাদের জহরুল হক হলের এক কর্মচারী এসে জানালো, প্রভোষ্ট স্যার আপনাকে এখুনি তাঁর বাসায় যেতে বলছে। আমি বুঝলাম না এতো সকালে স্যার কেন আমাকে ডাকছে? সন্দেহ হলো। শুভকে জানালাম আমি প্রভোষ্টের বাসায় যাচ্ছি। কোন সমস্যা হলে খবর নিস। সে সময় আমাদের হলের প্রভোষ্ট ছিলেন আমিনুর রহমান মজুমদার।


আমি সকাল ১০ টার দিকে স্যারের বাসায় গেলাম। স্যার নানান তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমার সাথে গল্প শুরু করলো। কিছুক্ষন পর দেখি সেখানে দু'জন লোক এসে ঢুকলো। এরপর প্রভোষ্ট স্যার চলে গেলো। তারা দেখি কতোগুলো ছবি দেখছে। পাভেল ভাইয়ের তোলা সেই ছবিগুলো যেখানে আমি স্যারকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি। আমি শুনছিলাম পাভেল ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি ধরে নিয়েছে। যাই হোক, অনেকক্ষন তারো আমার ছবিগুলো দেখলেন। এরপর নিজেদের পরিচয় দিলেন। জানালেন তারা সিআইডির কর্মকর্তা। একজনের নাম মনে আছে আব্দুল মালেক।

তারা আমাকে নানান বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সেদিনের ঘটনা নিয়ে। জানতে চাইলেন স্যার কি সে সময় কারো নাম বলেছিলেন কিনা, স্যার শেষ পর্যন্ত কি বলেছিলেন এসব। বললো আপনার সঙ্গে আরেকটা ছেলে ছিলো ও কই। আমি মোবাইলে বিটু ভাইকেও আসতে বললাম স্যারের বাসায়। বিটু ভাই এল। মালেক ভাই আমাদের দু'জনের সঙ্গে কথা বললেন।

মালেক সাহেব আমাকে বললনে, আপনেকে আমাদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা ছিল। কিন্তু আপনার প্রভোষ্ট স্যার বলছে সে অপনাকে চেনে। আপনি তার হলের মেধাবী ছেলে। তাই আপনাকে অ্যারেস্ট কলা হলো না। কিন্তু আপনি আর বিটু কাল সিআইডর মালিবাগ অফিসে আসবেন। কিছু প্রশ্নের উত্তর দেবেন। এরপর মালেক ভাই দেখালেন, গত এক মাসে আমি কখনে কোথায় গেছি সব রিপোর্ট তাদের কাছে আছে। আমি দেখলাম। আমি কবে চট্টগ্রাম গেছি, কথন কি করি সব সেখানে লেখা।

সিআইডি জিজ্জ্ঞাসাবাদ করবে শুনে ভালোই ভয় পেলাম। বুঝতে পারলাম না আমি কি করলাম। আমাকে কেন জিজ্ঞেস করবে। কেন অ্যারেষ্ট করবে। রাতে আমি আমার বিভাগের এক শিক্ষকের বাসায় গেলাম। পুলিশের সাবেক আইজি এনামুল হক তাঁর ঘনিষ্ঠ। তাই তাকে দিয়ে ফোন করানোর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। ওই আইজি জানিয়ে দিলেন, তিনি এ বিষয়ে কাউকে ফোন করতে পারবেন না। তাতে নাকি তার মান যায়, অথচ আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম। সে আমাদের একটা কোর্স পড়াতো।

ভয় নিয়েই কাটলো বাকি রাত। পরদিন সকাল ১১ টায় কিছুটা ভয়েই বিটু ভাইকে নিয়ে পৌছালাম মালিবগে সিআইডির প্রধান অফিসে। কিছুক্ষন পর মালেক সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন সিআইডির উর্ধ্বতন এক অফিসারর রুমে। তিনি সম্ভবত বড় কোন পোষ্টে। দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক। এখন আর নাম মনে করতে পারছি না।

তিনি আমাকে ভালো করে দেখলেন। তারপর বললেন, ঘটনার পরদিন যখন আপনার এই ছবিটা পত্রিকয়া ছাপা হলো তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ সাহেব আমাকে বলেছিলেন এই ছেলেটা রক্তাত্ব স্যারকে জড়িয়ে ধরে আছে। তাকে অ্যারেস্ট করে জিজ্ঞাসাবদ করেন। কিন্তু আমি সেটা করি নাই। কারন আমার কাছে মনে হয়েছে, যারা হামলা করে, তারা কখনোই তাকে উদ্ধার করে না। সেখানকার সব পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, সবাই বলেছি, স্যারকে যে ছেলেটা জড়িয়েছিলো ছবিতে সেই স্যারকে উদ্ধার করেছেন। কাজেই আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করি নাই। আমি সব জানতাম।

এরপর তিনি নানান বিষয়ে জানতে চাইলেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক কথা। সার শেষ মুহুর্তে কি কি বলেছিলেন মনে করার চেষ্টা করেন। স্যার কারো নাম বলেছেন কিনা মনে করার চেষ্টা করেন। আমি একই ঘটনা বললাম। এরপর তিনি বললেন, আপনি সব বর্ণনা একটা লিখিত স্টেমেন্ট হিসেবে দিয়ে যান। আমি সেটা দিয়ে সেখান থেকে এলাম। আর মনে মনে ভাবলাম এসব কারনেই মানুষ বোধহয় মানুষের উপকার করে না। একজন মানুষকে আমি বাঁচালম আর এজন্য আমাকে এখন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।


মেজাজ খারাপ হলো হুমায়ুন আজাদ এবং তার পরিবারের প্রতিও। কারন তারা গত দুই মাসে একবারও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে নাই কে স্যারকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলো। উল্টো তারাও সংগ্রাম পত্রিকবার সুরে বলছেন এমনকি স্যারও নাকি বলেছেন, এই ছেলেটা হাসছে কেন? স্যার চাইলেই হয়তো খোঁজ নিতে পারতেন। কথা বলে সেদিনের ঘটনা জানতে পারতেন। কিন্তু তাদের সেই ইচ্ছাটাই হয়নি। উল্টো আমাকে স্যারের বাসায় গিয়ে না পেয়ে ঘুরে আসতে হয়েছে।

অরেক অধ্যায়:
আজাদ স্যারকে জড়িয়ে আমার গল্পটা এখানেই শেষ হলো ভালো হতো। কিন্তু হলো না। গল্প আরো জড়িয়ে আছে। ২০০৪ সালেরই আগস্ট মাস। আমি তখন একটি দৈনিকের সাংবাদিক। ১১ বা ১২ আগষ্ট শুনতে পেলাম জার্মানে স্যার মারা গেছেন। সেদিন সম্ভবত শুক্রবার ছিলো। খুব মন খারাপ হলো। স্যারের সঙ্গে আমার আর কথা বলা হয়ে উঠল না।

সেদিন অফিসে ক্রাইমের কেউ ছিলো না। তখন চীফ রিপোর্টার ছিলেন আশরাফ ভাই। তিনি কি করবেন কিভাবে লিখবেন এই স্টোরি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আমি তাকে বললাম ভাইয়া, আমি স্টোরিরা লিখে দিচ্ছি। আমার পুরো ঘটনা জানা। আমি লিখলাম। আশরফ ভাই বললেন, আমি তারিখ, সময়সহ স্যারের ওপর হামলার ঘটনার এতো বিস্তারিত জানলাম কি করে? তাকে বললাম আমি তখন ঘটনাস্থলে ছিলাম।

পরদিন এই স্টোরিটা লিড হলো। এরপর টানা কয়েকদিন আমি স্টোরিটা ফলোআপ করলাম। আমার কাছে মালেক ভাইয়ের নাম্বার ছিল, তার সঙ্গে যোগযোগ করে মামলার সব তথ্য দিলাম। সব মিলিয়ে আশরাফ ভাই খুব খুশি ছিলেন স্টোরিগুলো দেখে।

যাই হোক, পরে যখন একটি জঙ্গি সংগঠনের হত্যার লিষ্টের তালিকায় হুমায়ুন আজাদের নাম এবং এ সংক্রান্ত কাগজপত্র পাওয়া গেলো, তখন প্রমানিত হলো জঙ্গিরাই স্যারকে হত্যা করতে চেয়েছিল। সে সময় আমি প্রথম আলোতে। সেবারও আজাদ স্যারের নিউজে পুরোনো ঘটনার ইতিহাস টানলাম আমি।

আমার পরিবার এবং শিক্ষকরা শিখিয়েছেন নিজের শতো সমস্যা হরো মানুষের উপকার করবে। গাধা বলেই হয়তো খনো সেটি মানার চেষ্টা করি। বারবার মানুষের কাছ থেকে কষ্ট পাই, তবুও মানুষকেই ভালোবাসি। চেষ্টা করি মানুষের পাশে থাকার। এজন্য আমি ব্যাক্তিগতভাবে তৃপ্ত। আমি জানি মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর কি আনন্দ। কিন্তু আফসোস স্যারকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারলাম না। অরেকটা আফসোস আজ পর্যন্ত স্যারের পরিবারের কেউ কখনো খোঁজ করে সেদিনের ঘটনাটা জানার চেষ্টা করেনি।

আমি দীর্ঘদিন রক্তে ভেজা ক্যাটস আইয়ের সেই গেঞ্জিটা যেটি ভিজে গিয়েছিল আজাদ স্যারের রক্তে সেটি সংরক্ষন করে রেখেছিলাম। এ বছর হল ছাড়ার সময় আর আনিনি সেটা। তবে স্মৃতিগুলো এখনো আছে জ্বলজ্বেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কালে শামসুন্নাহার আন্দোলন, দুর্ঘটনায় হ্যাপির মারা যাওয়া এবং এ নিয়ে আন্দোলন, ২০০৭ সালের আগস্টের আন্দোলন, শিক্ষকদের গ্রেপ্তার ও মুক্তি, বিডিআরের ঘটনাসহ আরো অনেক ইতিহাসের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী আমি। সর্বশেষ বকরের মৃত্যুর ঘটনার নিউজগুলো করলাম। প্রায়ই ভাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাগুলো নিয়ে একটা বই লিখি। হয়ে উঠে না আলসেমিতে কিংবা সারাদিনের ব্যস্ততায়। তাই ভাবলাম এবার ব্লগেই লিখে ফেলি ডিজিটাল ডায়েরি। ভালো লাগছে লেখাটা শেষ করে। মনে হলো ইতিহাস চেপে রাখার দায় থেকে মুক্ত হলাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29334682 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29334682 2011-02-26 19:28:47
প্রধানমন্ত্রীকে আমার প্রশ্ন..
মাননীয় খাদ্য ও বানিজ্য মন্ত্রী, আমরা যে চাল খাই সেটা এখন ৫০ টাকা কেজি। মোটা চাল ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা। এবার বলুন চালের দাম আর কতোটা বাড়লে আপনাদের মনে হবে, এবার বাজার ঠিক করা দরকার। আর কতো বাড়লে বেহায়ারে মতো আপনারা বলবেন না বাজার নিয়ন্ত্রনে আছে।

মাননীয় যোগযোগ মন্ত্রী ঢাকার যানজট আর কতোটা বাড়লে আপনার মনে হবে, এবার কিছু করা দরকার। আপনি বলুন কবে পদ্মা সেতুর কাজ আপনি শূরু করতে পারবেন?

মাননীয় অর্থমন্ত্রী ও উপদেষ্টা, শেয়ারবাজার নিয়ে এতো সমস্যা হয়ে গেলে আপনারা চেয়ে চেয়ে দেখলেন। কেন? আপনারা কি কিছুই আচ করতে পারলেন না আগে।

মাননীয় প্রবাসী মন্ত্রী, বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদরে অবস্থা আর কতোটা খারাপ হলে আর কতোটা বাজার নষ্ট হলে আপনার মনে হবে, এবার দালালদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাওয়া দরকার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি বলুন এবার একটানা বিদু্ত আর গ্যাসের জন্য আর কতোদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আপনি বলুন ছাত্রলীগ আর কতো সমস্যা করলে আপনার মনে হবে, এদের বাদ দিয়ে নতুন কমিটি করা দরকার। ছাত্রলীগকে ঠিক করা দরকার।

মানীয় প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিক নয়, আপনাকে পছন্দ করি, আপনাকে ভোট দিয়েছি তাই আমি আমার এই প্রশ্নগুলোর জবাব চাই। আপনি আমাকে বলুন আপনার মন্ত্রীসভার বেশিরভাগ সদস্য আর কতোটা অদক্ষতা দেখালে আপনার মনে হবে এদের বাদ দেওয়া দরকার। প্রিয় প্রধানমন্তী ৯৬ সালে আমি স্কুলের ছাত্র। ক্লাস এইটে পড়ি। সে সময় আপনার নামে স্লোগান দিয়েছি। আপনার জন্য মাঠেঘাটে প্রচারনা চালিয়েছি। আপনি আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন।

আপনার কাছে অনুরোধ এই অথর্ব মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে নতুন কিছু করুন। প্লিজ প্রিয় নেত্রী কিছু করুন। আপনি আমাদের আর ছোট করবেন না। আপনি ব্যার্থ হয়ে রাজাকারদের মুখে হাসি ফোটাবেন না প্লিজ। আমরা যে আর রাজাকারদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা দেখতে চাই না না। প্লিজজ প্রধানমন্ত্রী এ দেশের মানুষকে আপনি ফোরাবেন না যারা অনেক স্বপ্ন নিয়ে আপনাকে ভোট দিয়েছিলো..
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29305420 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29305420 2011-01-11 01:13:21
মাকে হারানোর দুই বছর...
মানতে ইচ্ছে করে না, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। তবুও এটাই সত্যি যে এমনটি আর হবে না আমার এ জীবনে। আর কখনোই আমার মা আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না। কি দুরন্ত উচ্ছল জীবনই না ছিল আমার। এই একটি ঘটনা আমাকে কতো বদলে দিয়েছে। এখন আমার কাছে ঈদ মানে তোমাকে না দেখার শোক, ছুটি মানে শোক। আমি এখন বিচ্ছিন্ন এক মানুষ। মাকে হারিয়ে আমি যেন হঠাৎ বড় হয়ে গেছি। প্রতিটা দিনই মায়ের কথা মনে হয়, একা একা গুমরে কাঁদি।

২০০৮ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তায়, কোরবানির ঈদের কয়েকদিন আগে আমরা মাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। সুস্থ্য একজন মানুষ, সামান্য একটি সমস্যার কারনে হাসপাতালে। আমরা কেউই বুঝতেই পারিনি এভাবে হুট করে মা আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। হাসপাতালে তিনদিন সবই ভালো। কিন্তু ১ ডিসেম্বর কিছু বুঝে উঠার আগেই হঠাৎ আইসিইউতে নিতে হয়। দুদিন সেন্ট্রাল হাসপাতালের আইসিইউতে থাকার পর আমার মা চলে গেলেন আমাদের চোখের জলে ভাসিয়ে। আমরা কোনভাবেই মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তার এই হঠাৎ চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না।

আমার মা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ার সুযোগ তার হয়নি বিয়ের কারনে। মার সহপাঠীরা আমাদের বলতেন, তোরা লেখাপড়ায় ভালো, কারণ তোর মা ক্লাসের সেরা ছাত্রী ছিলেন। অনেক আদারে কেটেছে তাঁর ছোটবলা। তাঁর পরিবার ছিলো ফরিদপুরের এককালের শীর্ষ কয়েকটি পরিবারের একটি। মায়ের মনটা ছিলো বিশাল।

চট্টগ্রামে আমার বাবার সরকারী চাকুরি। সরকারী কলোনীতে আমরা যে বাসায় থাকতাম সেখানে একবার যে গেছে সে মায়ের রান্না খেয়ে, তার আন্তরিকতা দেখে ভক্ত হয়ে গেছে। মা মানুষকে খাইয়ে খুব আনন্দ পেতেন। সবসময় তিনি বাসায় অনেক লোকজন, উৎসব দেখতে পছন্দ করতেন। আমরা দিন নেই, রাত নেই বাসায় বন্ধুবান্ধব নিয়ে যেতাম। মা কখনো বিরক্ত হয়ে বলতেন না অসময়ে কেন এতো বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসিস? এমন অসাম্প্রদায়িক মানুষ, উচ্চ মনের মানুষ আমি জীবনে খুব কম দেখেছি।

মা কখনো গরীব বা ভিক্ষুকদের না বলতেন না। কলোনীতে থাকার কারনেই বাসায় সবসময় ভিক্ষুক আসতো। আমরা খুব বিরক্ত হতাম। কিন্তু মা হাসিমুখে কিছু না কিছু দিয়ে তাদের বিদায় করতেন। তাঁর জীবনে এমন দিন খুব কমই গেছে যেদিন তিনি কোন গরিব বা ভিক্ষুককে খাওয়াননি। মানুষের জন্য তাঁর ছিলো চরম সহমর্মিতা। কারো কোন কষ্টের কথা শুনলেই মা কাঁদতেন। তাদের স্বান্ত্বনা দিতেন।

মা মারা যাওয়ার পর আমার ছোট বোন জানালো, কয়েকদিন আগে নাকি সকাল ১১ টার দিকে এক ভিক্ষুক আমাদের বাসায় এসে মাকে বললো তার খুব খিদে লেগেছে। ১১ টার সময় রান্না থাকার কথা নয়, তাই বাসায় ভাত নেই। কিন্তু আমার মা গরম ভাত রান্না করে তাকে খাইয়ে বিদায় করলেন। এমন হাজারো ঘটনা আছে আমার মায়ের জীবনে। ছুটিতে বাসায় গেলেই মা আমার কাছে বলতেন হাসান টাকা দে তো। আমি বলতাম মা কি করবে? তিনি হাসতেন। সেই টাকা চলে যেতো গরীবদের কাছে। আমরা বাসায় আছি-ড্রয়িং রুমে টিভি দেখছি-হঠাৎ দেখি কোন এক ভিক্ষুক। আমরা তাকে বলি মাফ করো। সে বলে, তোমার মাকে ডাকো। তোমার মা আমাদের কখনো খালি হাতে বিদায় করে না। আমরা চুপসে যাই তখন। মাঝে মাঝে এ নিয়ে মায়ের সাথে ঝগড়াও বাঁধে। বলি মা ভিক্ষকু-গরিব এরা কি তোমার বান্ধবী? সবসময় এতো জ্বালাতন করে কেন? মা হাসে। প্রতিবেলা রান্নার আগে মা পুরনো ভাত বাইরে কাক বা শালিককে দিতেন। মার রান্না করার সময় রান্নাঘরের সামনে সবসময় পাখি থাকতো। মা প্রচুর বই পড়তেন। তাঁর কারনেই ছোটবেলা থেকে আমরা ভাই বোন প্রচুর বই পড়তাম।

আমাদের পরিবারে দুঃখ কষ্ট সেভাবে ছিল না। বেশিরভাগ সময়েই ছিল আনন্দ উচ্ছলতা। কিন্তু এতো আনন্দের মধ্যেই আমার মাটা চলে গেলো আমাদের ছেড়ে। আমরা ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারিনি সে এভাবে হঠাৎ করে চলে যাবে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর সকাল সোয়া সাতটায় আমার মা মারা যায়। সেন্ট্রাল হাসপাতালে আমার ছোটবোনটার কান্না দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল কষ্টে। আমরা দুই ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারনে ওই বাসায় বেশি থাকতো। ওর কতো আফসোস মাকে নিয়ে। ও হাসপাতালে মাকে সুস্থ্যে দেখে, রাতে খাইয়ে বাবার সাথে চট্টগ্রাম গিয়েছিল ভর্তি হতে। এসে দেখে মা আর নেই।

এসএসসি পাস করার পর বাসা ছেড়ে কলেজ হোস্টেল, এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যলেয়ের হল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পেশা আবার সাংবাদিকতা। তাই বছরের খুব কম সময় বাসায় গিয়ে থাকতে পারতাম। কিন্তু যখন যেতাম মা আমায় নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে উঠতেন। কি খাওয়াবেন কি করবেন দিশা পেতেন না। আমি ফেরার সময় মায়ের চোখ ছলছল করতো। ভাবতে কষ্ট হয়, সেসব দিন আর কখনো ফিরে আসবে না।

মায়ের কথা মনে করে আমার বাবা কখনো আমাদের সামনে মন খারাপ করেন না। আমরা বুঝি প্রতিমুহুর্তে কতোটা কষ্ট তিনি পান। আমি আমার ছোটবোনের সামনে কাঁদতে পারি না মাকে নিয়ে। কিন্তু আমি বুঝি আমরা সবাই কাঁদি সবাই সবাইকে আড়াল করে। এই কান্না কখনোই হয়তো শেষ হবে না।

ফরদেপুরের বালিয়াডাঙ্গী ঈদ গা মাঠের কবরে এখন আমার মা শুয়ে আছেন। তিনি এখন সব কিছুর উর্ধ্বে। মা কি দেখছে তাঁর সাজানো পরিবারের এখন কি অবস্থা। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও কোনভাবেই মায়ের হঠাৎ চলে যাওয়া আমি মেনে নিতে পারিনা। ভাবলেই তাই কষ্ট হয়। আমার খুব চিৎকার করে তোমাকে ডাকতে ইচ্ছে করে মা। আল্লাহ তাকে শান্তি দিক। মা আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তুমি ভালো থাকো মা। ভালো থাকো।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29282545 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29282545 2010-12-02 23:18:34
একটি ছোট্ট নিউজ: আকতার এবং মানবতার কিছু গল্প (আপডেটসহ রিপোষ্ট)
পুরোনো কথা:
সাত বছল ধরে সাংবাদিকতায়। এর মধ্যে অনেক নিউজ করছি, অনেকগুলো লিডও। নিউজ ছাপার পর পাঠক বা বন্ধুদের ফোনে তৃপ্তও হয়েছি অনেকবার। বিশেষ করে সেতু বা কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে লিডের পর। কিন্তু বিডিআরের ঘটনায় আহত এক কিশোরকে নিয়ে করা একটি সংবাদ প্রকাশের পর মানবতার যে অনন্য রুপ দেখলাম সে অন্যরকম পাওয়া। অনেক ভালো লেগেছে।
এই ব্লগেই বিডিআরের ঘটনায় আহত কিশোর আকতারকে নিয়ে শোভন ভাইয়ের একটা লেখা স্টিকি করা ছিল ২০০৯ সালের আগস্টে। সেটি দেখে পড়ে আকতারের জন্য খারাপ লাগে। এরপর খোঁজ নিয়ে আকতারের সঙ্গে কথা বলে একটি ছোট্ট নিউজ করি।

১৩ বছরের কিশোর আকতার চা বিক্রি করে সংসার চালাতো। বিডিআরের ঘটনার দিন সে চা বিক্রি করছিলো ঝিগাতলা এলাকায়। হঠাৎ একটি গুলি এসে লাগে তার। অনেক্ষন পড়ে থাকার পর এক রিকশাওয়ালা তাকে নেয় ঢাকা মেডিকেলে। বাড়ির জমি বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসা করায় আকতারের বাবা। কিন্তু একসময়ে টাকা শেষ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসা। পঙ্গু হয়ে যায় আকতার। সর্বস্ব হারানো বাবা কাঁদতে কাঁদতে বিলাপ করে বলেন, আমার ছেলেটা কেন গুলিতে মারা গেলো না। তাহলে তো এতো কষষ্ট ওকে পেতে হতো না।

আকতারকে নিয়ে আমার এই নিউজটা ছাপা হয় রাজধানী পাতায়। ২০০৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রথম বা শেষ পাতায় না সে ভেতরের পাতায় এলে আর কার কি হয় জানি না; তবে আমার বেশ খারাপ লাগে। কাজেই নিজের করা ওই সংবাদটি রাজধানীর পাতায় আসায় আমার কিছুটা খারাপ লেগেছিলো। মনে হয়েছিলো বেশি কিছু হবে না। কিন্তু এই সংবাদের সূত্র ধরে মানবিকতার যে রুপ আমি দেখলাম এবং আজো দেখছি তাতে অন্যরকম শান্তি পেলাম।

৩ সেপ্টেম্বরের কথা:
সংবাদটি প্রকাশের পর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আমায় ফোন করলো। এরপর একজন কর্মকর্তা আমার মাধ্যেম আকতকারের সঙ্গে যোগযোগ করলো এবং জানাল তারা দেখবে বিষয়টি। ভালো লাগলো শুনে। সারাদিনে আরো কিছু ফোন পেলাম এ নিয়ে। কিন্তু খুব ভালো লাগলো যখন বৃহষ্পতিবার রাতে একটি ফোন পেলাম মিরপুর থেকে। উনি জানালেন আকতারকে সাহায্য করতে চান। শুক্রবার সকাল ১১ টায় তাকে লালমাটিয়া আসতে বললাম। যথারীতি তিনি হাজির।

বেশ কিছুক্ষন কথা হলো টিপু নামক লোকটির সাথে। তিনি আকতারকে ১০ হাজার টাকা দিলেন। বললেন, ছোট্ট এই নিউজটি তাকে ব্যাথিত করেছে। তিনি চান আকতার সুস্থ্য হয়ে উঠুক। বেশ কিছুক্ষন কথা বলার পর লোকটির মহত্বের আরো পরিচয় পেলাম।
জানলাম লোকটি সুযোগ পেলেই মানুষকে সহায়তার চেষ্টা করেন। হাসতে হাসতে বললেন তিনি খুব ভালো আছেন। ঈদ উপলক্ষ্যে তিনি গ্রামের লোকেদের সাহায্যের জন্য এক লাখ ১০ হাজার টাকা তোলেন ব্যবসা থেকে এবং তাঁর ভাষ্যমতে পরদিনই তাঁর ব্যবসায় আরো এক লাখ টাকা লাভ হয়। তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সবার দানশীল মনোভবের কথা শুনে খুব ভালো লাগলো।

সেদিনই এর মাঝে আরো কিছু ফোন পেলাম। সন্ধ্যায় আহছানিয়া মিশন থেকে ফোন করে তারা জানাল, আকতারের চিকিৎসার ব্যবস্থা তারা করবে। মনটা আনন্দে ভরে গেল। রাতে আরেক সরকারি কর্মকর্তা ফোন করলেন। জানালেন তিনিও আকতারকে সাহায্য করতে চান। তিনিও আকতারকে কিছু টাকা দিয়ে গেলেন। ইতিমধ্যে প্রধানমমন্ত্রী শেখ হাসিনা আকতারের চিকিৎসায় এক লাখ টাকা দিলেন।

এবং অষ্ট্রেলিয়া: আহছানিয়া মিশনে কিছুদিন চিকিৎসা চলে আকতারের। এর কিছূদিন পর অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এক লোক এলেন আমার প্রথম আলোর অফিসে। জানালেন তিনি আকতারকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে চিকিৎসা করাতে চান। আমি তাকে শোভন ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। অত:পর পাসপোর্ট, ভিসা নানান জটিলতা। আমি অনেকদিন কোন খোঁজ নিতে পারি নাই। বলতে গেলা নেওয়া হয়ে উঠতো না। তবে শোভন ভাই মাঝে মাঝে ফোন করে জানাতেন আজ ভিসা হচ্ছে, কাল টিকেট ইত্যাদি। আকতার যেদিন চিকিৎসার জন্য অস্ট্রেলিয়া গেলো সেদিনও ফোন করেছিলেন তিনি। এরপর আমি জাপানে। অনেকদিন যোগযোগ নেই শোভন ভাইয়ের সাথেও। দেশে ফেরার পরও যোগযোগ হয়নি।

সর্বশেষ: আজ ২০ নভেম্বর, ২০১০। সকালে ফোন এলো শোভন ভাইয়ের। ঘূমের ঘোরে জানলাম সুস্থ্য হয়ে আকতার অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফিরছে। ভালো লাগলো। তবে সারাদিনের ব্যাস্তাতায় আবার ভূলে গেছিলাম খবরটা। রাতে ফেইসবুকে বারি ভাইয়ের স্ট্যাটাস দেখে আবার মনে পড়লো আকতারের খবরট। মনে হতেই আনন্দে ভরে গেলো মনটা। মনে হলো এমন ভালো একটি খবর স্মৃতি করে রাখতে ব্লগে লিখি।

একটা ছোট্ট নিউজ বদলে দিয়েছে আকতারের জীবন। শোভন ভাইয়ের অশেষ পরিশ্রম, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লোকটির চেষ্টা, মহত্ব, আরো অনেকের চেষ্টা আমায় আনন্দিত করেছে। অকে বেশি আনন্দিত। ভালো লাগছে। আমি হয়তো কিছূই করি নাই। সাংবাদিক হিসেবে একটি ছোট্ট নিউজ। সেই ছোট্ট নিউজটাই বদলে দিলো এক কিশোরের, এক পরিবারের জীবন। আমি জানি চারপাশের খারাপের ভীড়ে এখনো অনেক ভালো মানুষ আছে। তাই তো বারবার জয় হয় মানবতার। বাঁচতে ইচ্ছে হয় বারবার। সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে অনেক স্বার্থক মনে হয়।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29275136 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29275136 2010-11-21 02:12:28
ইন্টারনেট নিয়ে বিরক্ত, পরামর্শ চাই মনের দুঃখে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ব্রডব্যান্ডে আর থাকবো না। অনেকেই পরামর্শ দিচ্ছেন সিটিসেটল জুম আলট্রা কেনার জন্য। কেউ কেউ আবার বলছেন জিপির কথা। আপনারা যারা ব্যাবহার করেন তারা কি একটু দয়া করে বলবেন, কোনটা ভালো।

আমি মোটামুটি স্ডিডের নেট চাই। বিল এমন হবে যতোটুকু ব্যাবহার করবো ততোটাকা দেবো। তবে মাসে ৫০০ বা ৬০০ এর বেশি টাকা দিতে চাই না। সামর্থ্য নেই। এখন আমার কি করা উচিত?

ওয়াইম্যাক্স কি মোহাম্মদপুর হাউজিং লিমিটেড এলাকায় আছে? আমার বাসা ৪ নম্বর রোডে। ওই এলাকায় অন্য কোন ভালো ব্রডব্যান্ড লাইন কি আছে? একটু পরামর্শ দিয়ে কৃতার্থ করবেন। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29152380 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29152380 2010-05-10 13:38:11
বিশ্বব্যাংককে না বলে দিল বাংলাদেশ। <img src="http://cdn.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_09.gif" width="23" height="22" alt=";)" style="border:0;" />শাবাস বাংলাদেশ!
২৬ মার্চের আগে এমন একটি সংবাদ আসলেই মন ভালো করে দেয়। যেই বাংলাদেশ বিদেশি সাহায্য নেওয়ার জন্য বসে থাকতো, যখন গর্ভনররা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে জ্বি স্যার বলতে বলতে ব্যাস্ত থাকতো-সেখানে এখন গর্ভনর সোজা সাপ্টা বলে দিতে পারেন-আমাদের ঋন লাগবে না। এর পেছনে আছে ৬০ লাখ প্রবাসীর ঘামের টাকা। তাদের পাঠানো সত্তর হাজার কোটি টাকা এখন বাংলাদেশ ব্যাংককে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশকে শক্ত একটা ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
শাবাস প্রবাসী ভাইয়েরা। শাবাস বাংলাদেশ। লাল সালাম সবাইকে!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29122723 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29122723 2010-03-24 23:01:48
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন স্কোয়াড আশরাফ আহমেদের নিজের বর্নণায় শুনুন লেখাটি...

[এই নিবন্ধটি ১৯৯৮ সনে লিখেছিলাম ও সে বছরের এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটন ডিসি এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাইদের সম্মিলনে আমারই সম্পাদিত স্মারণিকায় প্রকাশ করেছিলাম একই নামে। ঐ বছরের মাঝামাঝি দেশে গিয়ে নিবন্ধের অন্যতম চরিত্র আনোয়ার ভাইকে একটি কপি দিয়ে অনুরোধ করেছিলাম এর তথ্যগুলোয় গরমিল থাকলে তা শুধরে আমাকে জানাতে। পরের বছর আবার ঢাকায় গেলে তিনি বলেছিলেন যে, এই নিবন্ধের অন্যান্য যেসব চরিত্র ঢাকায় আছেন তিনি তাঁদের একত্র করে এটি সবাইকে পড়তে দিয়েছিলেন; কেউ কোন ত্রুটি পান নাই। এক যুগের ব্যাবধানে এর অনেক পাত্র-পাত্রীরই বর্তমান কর্মস্থল বদলেছে, আমি আর কষ্ট করে সেগুলো শুধরানোর চেষ্টা করলাম না। নতুন করে আবার টাইপ করতে গেলে দুয়েকটি যায়গায় হোঁচট খাওয়ায় দুটো কমা ও তিনটি শব্দ যোগ করেছি মাত্র। পুরনো মাল চালাচ্ছি মনে না করে বেশির ভাগ পাঠকের কাছেই এটি নতুন হবে বলে আমার বিশ্বাস। ]
জনাব আলী যাকের বললেন, আপনার সাথে আগে নিশ্চয়ই আমার দেখা হয়েছে, কোথায় বলুন তো? ঠাট্টা করে বললাম, আমার তো খুবই সাধারণ চেহারা – সর্বত্রই দেখা যায়, তাই হয়তো আপনার এমন মনে হচ্ছে। পরে বললাম আপনার স্ত্রী (সারা যাকের) আমার ছাত্রী (বায়োকেমিষ্ট্রিতে) থাকাকালীন হয়তো দেখে থাকবেন। বললেন, এ ছাড়াও আমি অন্য প্রেক্ষিতের কথা ভাবছি। কথায় কথায় ’৭১ এর ঘটনা প্রবাহে চলে আসি। তিনি ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের একজন ট্রাষ্টি। আমি বললাম, পাকসেনা বা রাজাকার বধ করার মত সৌভাগ্য আমার হয় নাই কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন প্রথম সৈনিক হিসাবে গর্ববোধ করি। মার্চের প্রথম সপ্তাহে নড়াইলের এসডিও জনাব কামাল সিদ্দিকীর সাথে মগবাজারে একটি আধা-তৈরী ইঁটের বাড়িতে যাই। সেখানে ডান হাতের তিন আঙ্গুলবিহীন এক ভদ্রলোক বোমা বানালেন। বোমাটি নিয়ে দূরে রেললাইনের পাশে আমরা ফাটানোর চেষ্টা করি। আলী যাকের আমাকে থামিয়ে নাটকের সংলাপ বলার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, কিন্তু বোমাটি ফাটলো না। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি করে জানলেন? বললেন, সেদিন আমিও সাথে ছিলাম, আধা-তৈরী বাসাটি ছিল আমার......।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মার্চের এক তারিখ দুপুরের খবরের পর নিশ্চিত হ’লাম, বাংলাকে স্বাধীন হতেই হবে আর অস্ত্র দিয়েই দেশকে স্বাধীন করতে হবে। সহপাঠী আনোয়ার হোসেনের উদ্যোগে ফজলুল হক হলে দুজন মিলে “সূর্যসেন স্কোয়াড” নামে একটি সশস্ত্র দল গঠন করি। উদ্দেশ্য, অস্ত্র সংগ্রহ, বানানো ও ব্যাবহার শিখে শত্রু মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হওয়া। আমার বয়স তখন ১৯ বছর। স্বাধীনতাসংগ্রামের ঊষালগ্নে আমাদের এই প্রচেষ্টা পরবর্তিতে যুদ্ধের প্রচণ্ড ভয়াবহতার কাছে অতি নগণ্য বলে বিবেচিত হবে। তা সত্ত্বেও সম্ভবতঃ সেটিই ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রস্তুতি। লিখিত আকারে বা প্রচার মাধ্যমে এর বিবরণ আজও প্রকাশিত হয় নাই। বছর দুয়েক আগে সাপ্তাহিক ‘প্রবাসী’তে ডঃ নুরন্নবী তার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে আমাদের প্রস্তুতির একাংশ উল্লেখ করেছিলেন মাত্র। সম্পুর্ণ স্মৃতির উপর নির্ভর করেই লিখছি বলে সময়, সংখ্যা ও পাত্রপাত্রীর উল্লেখে ত্রুটি থাকতে পারে।
বিকেলে হলের হাউজ টিউটর ও আমাদের শিক্ষক ডঃ আশরাফুল আলমের বাসায় যাই। তাঁর সবুজ রঙের একটা টয়োটা গাড়ী ছিল। স্যারকে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় বুঝিয়ে বললাম, অস্ত্র বানাতে পেট্রোলের প্রয়োজন, আপনার গাড়ী থেকে তা পেতে চাই। তিনি একমত হয়েও শিক্ষক হিসাবে আমাদের এই বিপজ্জনক প্রস্তাবে সাথে সাথে রাজী হতে পারলেন না। বললাম, স্যার যদি জোর করে নেই? প্রিয় ছাত্র থেকে তিনি এমন দুর্বচন আশা করেন নাই। সদাহাস্য চেহারার মুখটা মলিন করে বললেন, আমার কিছু করার থাকবে না। খালি হাতেই ফিরে এলাম।
সন্ধ্যায় খেয়ে ডাইনিং হল থেকে বেরুচ্ছি, দেখলাম ছাত্রলীগ নেতা আব্দুর রশীদ কেরোশিনের টিন (রান্নাঘরের) নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন। থামিয়ে জিজ্ঞেস করে জানলাম, বিভিন্ন যায়গায় বিহারী ও পাকসেনারা বাঙালি নিধনে মত্ত হয়েছে, তাই তাঁর মাথায় প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে। বললাম, প্রতিশোধে শুধু নিরীহ লোকজনই কষ্ট পাবে, আপনি বিশ্রাম নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন। এবার কেরোশিনের টিনটা আমার হাতে দিন। হলের এক্সটেন্সন বিল্ডিং এর চার নম্বর রুমে আনোয়ার ভাইয়ের রুমে গেলাম। ইতিমধ্যেই তিনি সিগারেটের দোকান থেকে সাড়ে ছয় আনায় অস্ত্র বানানোর আরেকটি উপাদান কিনে এনেছেন। ইলেক্ট্রিক ষ্টোভে সব মসলা চাপিয়ে আমরা এর কেমিষ্ট্রি নিয়ে আলাপ করতে লাগলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম আগুন! নিমেষে ছাঁদ পর্যন্ত পৌছে গেল। ধোঁয়ায় ঘরে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। ভ্যাবাচ্যাকার মুহূর্ত পার হতেই প্রথমে জানালা বন্ধ করলাম। হাতড়ে হাতড়ে বালতি ও কম্বল নিয়ে বাথরুমে ছুটলাম। ভেজা কম্বল দিয়ে বহু কষ্টে আগুন নেভানোর প্রায় আধ ঘন্টা পর যখন ধোঁয়া দূর হোল, দেখতে পেলাম দুজনেরই চেহারা হাবসীদের মতো কালো হয়ে গেছে। অনেক জিনিষের মতো আমেরিকা থেকে ভাইএর পাঠানো আনোয়ার ভাইএর দামী কম্বলটা পুড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেলেও আমরা অক্ষত দেহে বেঁচে গেলাম।
এরই মাঝে আমরা স্লোগানের সময় শেষ হয়ে গেছে বলে ছাত্রলীগের বন্ধুদের সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা চালাই। মার্চের দুই তারিখে সূর্যসেন স্কোয়াডে ফিজিক্সের জুলফিকার হায়দার ও হাবিবুল্লাহ খান ভাই, কেমিষ্ট্রির তারেক মঞ্জুর ও বায়োকেমিষ্ট্রির রিযাযউদ্দিন যোগ দিলেন। আনোয়ার ভাই কমান্ডার ও আমি ডেপুটি। রাত ১টার পর অস্ত্র বানানোর রসদ আমরা কেমিষ্ট্রি ডিপারটমেন্টের ষ্টোর থেকে সংগ্রহ করতে রওনা হই। এখন ভাবতে অবাক লাগে আমাদের কোন টর্চলাইটও ছিল না। টিনের ক্যান ফুটো করে তার ভেতর মোমবাতি জ্বালিয়ে টর্চের কাজ চালিয়েছিলাম। গ্রামে নানাবাড়ীতে গেলে কৃষকদের এধরনের বাতি ব্যাবহার করতে দেখেছি। বহু কষ্টে দরজার গায়ে ছোট একটি পথ তৈরী হলে, তার ভেতর দিয়ে শরীরে ছোট বলে, আমি প্রথমে ষ্টোরে প্রবেশ করি। পরিচিত স্নেহশীল একটি চিৎকার শুনতে পেলাম, লেহাফরা গুম বাদ দিয়া অত রাইতে ইহানো কি করেন? দ্যাশের অবস্তা খরাপ, বাইত মা’র কাছে যান, শান্তি ফাইবো। কার্জন হলের লিচুতলায় এই গভীর রাতে অবস্থা সুবিধার নয় বুঝতে পেরে বায়োকেমিষ্ট্রি ডিপার্টমেন্টের Animal house এর caretaker গোলাম হোসেন ভাই আমাদের এসব দুঃসাহসিক কাজের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকলেন।
ভোর রাতে দরজার বাইরে তালা লাগিয়ে আমার ২১২ নম্বর ঘরের ভেতরে ঘুমাতে গেলাম যেন সকালে ঘুমের ব্যাঘাত না হয়। আম্মা বলছেন, রুবিকে রোকেয়া হল থেকে বাড়ীতে রেখে এসে তোমার যা করার কর। স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাংলো। তিন তারিখ ১১টার দিকে গোসল করতে যাচ্ছি, কেমিষ্ট্রির ইকবাল এসে বললো, দুজন লোক এসেছিলেন দেশের প্রয়োজনে কিছু ‘সাহসী’ ছেলের খোঁজে। আমি তোমার কথা বলেছি, তুমি ছিলেনা তাই বিকেলে ওরা আবার আসবেন।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তখন প্রতিদিন বেলা ২টা পর্যন্ত হরতাল পালিত হচ্ছে। হলের গেটে আমার হাতে একটি লোহার রড। বায়োকেমিষ্ট্রির সিরাজুল হক মজুমদার ভাই বললেন, আশরাফ রড দিয়ে কি দেশ স্বাধীন হবে? বললাম তা হবে না, তবে দেশকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার আমাদের যে ইচ্ছা বা সাধ, তা জন্ম দেবে সাধ্য। আর সাধ্য দিয়েই দেশ স্বাধীন হবে। আপাততঃ রডটি আমার সেই ইচ্ছারই এক প্রকাশ। হরতাল শেষ হতেই অস্ত্র বানানোর মশলা যোগাড় করতে দুটো বেবীট্যাক্সি করে আমরা সাতজন রওনা হলাম। গন্তব্য পুরনো ঢাকার একটি কেমিক্যাল সাপ্লাই ষ্টোর। আত্মরক্ষার্থে আমার লোহার রড ছাড়া আনোয়ার ভাইয়ের কাছে একটি রিভলবার আর রিয়াজের হাতে মুরগী জবাই করার একটি ছুরি – রিয়াজ তখন ডাইনিং হলের কর্মকর্তা ছিল। আমাদের ধমনীর ভেতর প্রবাহিত রক্তের গতি তখন আলোর গতিকে ছাড়িয়ে গেছে। গন্তব্যে পৌঁছে নিমেষে কাজে নামলাম। দুজন থাকলো রাস্তায় বেবীট্যাক্সি পাহারায়, দুজন একটু ভেতরে কিন্তু দোকানের বাইরে, আমি দোকানের সামনের অফিসে টেলিফোনের পাহারায়, আর আনোয়ার ভাই ও আরেকজন ভেতরে গুদাম এলাকায়। প্রাথমিক চমক কেটে যেতে দোকানীরা আমাদের মহৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে নিজ থেকেই সহযোগী হয়ে উঠলেন। অবাংগালির কয়েকটি দোকান দেখিয়ে সেখানে না যেতে আমাদের পরামর্শ দিলেন। দশ মিনিটের কম স্থায়ী এই অভিযান শেষ হলে ফিরে রসদগুলো আমরা বিভিন্ন যায়গায় লুকিয়ে রাখি। ভাবনার কোন সীমানা নাই, যদি থাকতো তবে সূর্যসেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সাথে আমাদের আজকের সফল অভিযানের তুলনা করে পুলকিত হতাম না।
বিকেল ৫টার দিকে ইকবালের কথামত দুজন লোক এলেন। একজন কামাল সিদ্দিকী, নড়াইলের এসডিও বলে পরিচয় দিলেন। দীর্ঘদেহী বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার অপরজনের পরিচয় এখন মনে নেই। তাদের মুখে দেশের পরিস্থিতিতে আমাদের মনোভাবেরই প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম। ঠিক লোকের সন্ধান পেয়েছেন বলে তাঁরা খুব খুশী হয়েছেন বলে মনে হোল। অস্ত্র বানানোর শিক্ষা দেয়ার জন্য আমাদের কোথাও নিয়ে যাওয়ার জনাব সিদ্দিকীর প্রস্তাবে আমি রাজী হলাম। দুজনেই মার্চের ৪ বা ৫ আবার হলে আসেন সকালে। ইতিমধ্যে আবদুর রশীদ ভাই, বায়োকেমিষ্ট্রির নুরন্নবী ভাই ও আমিনুল হক ভাই আমাদের স্কোয়াডে যোগ দিয়েছেন। পায়ে হেঁটে আমরা ৬/৭ জন রওনা হলাম ১ বা ২ জনের ছোট ছোট দলে। হাইকোর্টের পাশ দিয়ে, কাঁকড়াইল, রমনা গার্ডেন, শান্তিনগর হয়ে মগবাজার রেললাইনের পাশে আধা-তৈরী ইঁটের লাল একটি বাড়ীতে আমরা সমবেত হই......।
মাত্র দুদিন পরেই আমাদের কাজের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসাবে বজ্রকন্ঠে নির্দেশ এলোঃ ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে......’।
যুদ্ধ শেষে এই হলের গেটে দাঁড়িয়েই সিরাজভাই আবার বলেছিলেন, আশরাফ, সত্যি ইচ্ছা দিয়েই দেশটা স্বাধীন হোল। দীর্ঘ ছয় বছর কাটিয়ে ফজলুল হক হল ছেড়েছি সেই চুয়াত্তর সনে। এর আকর্ষণ এখনো ছাড়ে নাই। সুযোগ পেলেই হলের চার নম্বর রুম, ২১২ নম্বর রুম, মেইন গেট, সিগারেটের দোকান ও ডাইনিং হলের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়াই। নির্মল চেহারার ছাত্ররা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায়। সময়ের ব্যাবধানে ও জীবনের প্রয়োজনে সাথীদের কেউ কাছে থাকে না। লাল দেয়ালের গা বেয়ে চুঁয়ে চুঁয়ে জল পড়ে। আমার স্মৃতি, আমার আনন্দ-অহঙ্কার-বেদনা আমারই বন্ধ অনুভূতির কুয়ায় ঘুরপাক খায়।
পরিশিষ্টঃ আলী যাকের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইংরেজী সংবাদ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন, পরে বাংলা নাট্য জগতে খ্যাতি লাভ করেন। ’৯৫ সনে তাঁর নাট্যদল নিয়ে ওয়াশিংটনে এসেছিলেন। কামাল সিদ্দিকী প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সচিব ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে আনোয়ার ভাই ১১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেন কর্ণেল তাহেরের সহযোদ্ধা হয়ে, এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। নূরন্নবী ভাই কাদের বাহিনীর অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে খ্যাতিলাভ করেন, বর্তমানে নিউজার্সিতে পামোলিভ কোম্পানীর ম্যানেজার এবং নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক প্রবাসীর প্রেসিডেন্ট ও ম্যানেজিং এডিটর। ডঃ আশরাফুল আলম নর্থ ক্যারোলাইনায় এলিযাবেথ সিটি ষ্টেট ইউনিভার্টির প্রফেসর। রশীদ ভাই, তারেক, আমিন ভাই, যুলফিকার, রিয়াজ ও হাবিবুল্লাহ ভাই দেরাদুনে সামরিক শিক্ষা নিয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। এদের শেষ তিনজন দেশে সরকারী চাকুরি করছেন। রশীদ ভাই যুদ্ধে আহত হন, পরে হলের ভিপি হয়েছিলেন। তারেক ঢাকায় ইউনিয়ন কার্বাইড এর প্রধান ও আমিন ভাই ব্যাবসায়ী। গোলাম হোসেন ভাই এখনো আগের কাজ করছেন, বার্ধক্যের কাছে মাথা নীচু করেন নাই। আম্মা ’৯৪ সনে মারা গিয়েছেন। রুবি, আমার ছোটআপা ঢাকার একটি কলেজে অধ্যাপনা করেন। ইকবাল বাংলাদেশে সরকারী কৃষিবিভাগে বিজ্ঞানী। সিরাজভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিষ্ট্রিতে অধ্যাপনাকালে হৃদরোগে মারা যান ’৮৯ সনে।

(লেখকের পুরোনাম সৈয়দ আশরাফউদ্দিন আহমেদ। থাকেন আমেরিকার মেরিল্যান্ড রাজ্যের পোটোম্যাক শহরে।)

১লা মার্চ, ২০১০

পোটোম্যাক, মেরিল্যান্ড
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29111723 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29111723 2010-03-07 13:27:48
আমার স্মৃতিতে হুমায়ুন আজাদ: যেভাবে তাকে হাসপাতলে নিয়েছিলাম এবং পরবর্তী ঘটনাগুলো...
{হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা আছে। আছে একটি বিখ্যাত ছবি। রক্তাত্ব হুমায়ুন আজাদকে জড়িয়ে ধরে আছি আমি। এটি আমার জীবনের এক স্মরনীয় ঘটনা। লিখবো লিখবো করেও কখোনো লেখা হয়নি। সবসময় মনে হয়েছে, মানুষকে জানিয়ে লাভ কি? তারপরেও গত বছরের আগস্টে প্রথম ব্লগেই লিখি ঘটনাটা। সেটিই রিপোষ্ট। .......}
ব্লগে প্রথম প্রকাশ, আগস্ট ২০০৯

[ব্লগে হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে কয়েকটি লেখা এবং ছবি দেখলাম। তাতে চোখে পড়লো সেই বিখ্যাত ছবিটিও। রক্তাত্ব হুমায়ুন আজাদকে জড়িয়ে ধরে আছি আমি। এটি আমার জীবনের এক স্মরনীয় ঘটনা। লিখবো লিখবো করেও কখোনো লেখা হয়নি। সবসময় মনে হয়েছে, মানুষকে জানিয়ে লাভ কি?

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি আর আগষ্ট এলেই ভাবি এবার সেই ঘটনা নিয়ে লিখবো। কিন্তু আলসেমিতে হয়ে ওঠে না। আমাদের অফিসের ফিচার সম্পাদক জাহিদ রেজা নূর কয়েকবার বলেছিলেন লিখতে। তাঁর কথায় একবার কিছুটা লিখেওছিলাম। কিন্তু শেষ আর করা হয়ে ওঠেনি নানা ব্যস্ততায়।

আজ মনে হচ্ছে ব্লগে শেয়ার করি সেদিনের ঘটনা। পাঠক বিষয়টি জানুক। আমি মুক্ত হই গণমাধ্যমে ইতিহাস চেপে রাখার দায় থেকে। কারন আমার পরিচিতরা ছাড়া সাধারন মানুষ ঘটনাটি জানে না। আজ তাদের জানাচ্ছি।


আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের (ডিইউএফএস) সদস্য। আমার বিশ্ববিদ্যালয় মানেই তখন এই সংগঠন। ক্লাস শেষ করেই কলা ভবন থেকে ছুটে যাই টিএসসিতে। সেখানেই আড্ডা, সেখান থেকে খেতে যাওয়া, আবার ফিরে আসা। রাতে এখান থেকে নয়টা সাড়ে নয়টা কখনো কখনো ১০ টায় হলে ফিরি।

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৪। তখন শীতকাল। বইমেলা চলছে। টিএসসি জমজমাট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন একটি গানের উৎসব হবে। টিএসসির নিচে তার মহড়া চলছে। গিটারে গান। আমি বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সেই গান শুনছি। রাত আটটা থেকে নয়টার মধ্যে। হঠাৎ একটি বোমা ফাটার মতো শব্দ হলো। মাঝারি ধরনের শব্দ। আমার আবার সব কিছুতেই ব্যাপাক কৌতুহল। খুব সাহসী আমি সেটি বলবো না, তবে ভয় ডর নেই এটুকু বলতে পারি।

তো কোথা থেকে এলো সেই শব্দ সেটি জানতে আমি টিএসসি থেকে হাঁটা শুরু করলাম বাংলা একাডেমির দিকে। রাস্তার মাঝে যে ডিভাইডার আমি সেটি ধরে আনমনে হাঁটছি। মনে হলো সোহরাওয়াদী উদ্যান দিয়ে কেউ দৌড়ে পালাচ্ছে। একটু দূরে যেতেই দেখি এক জায়গায় জটলা। গেলাম সেখানে। দেখলাম চাঁর-পাঁচজন পুলিশ সদস্য, কিছু লোক সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সামনে পড়ে আঝছ রক্তাত্ব একটি দেহ। কিন্তু কেউ ধরছে না। বরং সবাই যেন তামাশা দেখছে। কিংবা হয়তো ঝামেলার ভয়।

আমি দ্রুত সেখানে গিয়ে উপুড় হওয়া লোকটিকে তুললাম। রক্তে ভেজা। মুখ দেখে চিৎকার করে উঠি এ তো হুমায়ুন আজাদ। আমি যখন স্যারকে তুলি স্যারের এক পাশের গাল দুই ভাগ হয়ে দুদিকে চলে গিয়েছিলো। পুরো মুখটা পুরো হা হয়ে ছিল। আমি দুই পাশে চাপ দিয়ে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করলাম।

হুমায়ুন আজাদকে আমি সামনাসামনি আগে কখনো দেখি নাই। কিন্তু তাঁর অনেক বই পড়েছি। আমার স্কুলের এক ইংরেজি শিক্ষক যে আমাকে মানুষ হওয়ার দীক্ষা দিয়েছিল তাঁর কাছ থেকে জেনেছি হুমায়ুন আজাদ সম্পর্কে। অনেক বই পড়েছি আজাদ স্যারের। ব্যাক কাভারের সেই ছবি আর সেই চুল দেখে তাই স্যারকে চিনতে পারলাম।

মূল ঘটনায় ফিরি। স্যারকে হাসপাতালে নিতে হবে। কি করবো? আমি আমার মোবাইল ফোন থেকে একটি ফোন করলাম বিটু ভাইকে। বললাম-বিটু ভাই, হুমায়ুন আজাদকে বোমা মারছে। আপনি বাংলা একাডমেরি সামনে আসেন। বিটু ভাই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় চলচ্চিত্র সংসদের অর্থ সম্পাদক এবং আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ বড় ভাই। (আমি তখন ভেবেছিলাম স্যারকে বোমা মারা হয়েছে। আসলে তা নয়, তাকে কোপানো হয়েছিল। দুস্কৃতিকারীরা পরে পালানোর সময় বোমা ফাটায়)

বিটু ভাইকে ফোন করে আমি রক্তাত্ব হুমায়ুন আজাদকে হাপাতালে নেওয়ার জন্য একটি রিকশায় উঠানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু রিকশায় উঠানো সম্ভব হলো না।
স্যারকে কোনভাবেই রিকশায় রাখতে পারছিলাম না। আমি তখন দৌড়ে টিএসসির দিকে আসলাম। সাদা একটি প্রাইভেট কার এদিকেই আসছিলো। আমি তাকে বললাম ভাই আমাদের এক স্যার হুমাযুন আজাদকে কেউ বোমা মেরেছে। হাসপাতালে নিতে হবে। একটু আসেন। সে কিছুতেই রাজি হলো না। বরং গাড়ি ঘুরিয়ে উল্টো দিকে চলে গেলো। আমি কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এদিক ওদিক তাকিয়ে কোন দিশা পাচ্ছিলাম না। ছটফট করছিলাম।

হঠাৎ অন্য বুদ্ধি আসে। দেখি পুলিশের বিশাল এক ট্রাক দাঁড়িয়ে টিএসসির সামনে। আমি তখন চিৎকার দিয়ে তাদের বললাম ভাই স্যারকে হাসপাতালে নিতে হবে। আমি এখানকার ছাত্র। প্লিজ আপনাদের গাড়িটা নিয়ে আসেন। একই সঙ্গে আমি হুমকিও দিলাম। বললাম স্যারকে হাসপাতালে না নিতে পারলে ছাত্ররা আপনাদের ওপর খেপবে। চেচামেচি করলাম। এক পর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা রাজি হলো। তারা এলো গাড়ি নিয়ে। লোকজনের সহায়তায় আমি স্যারকে পুলিশের সেই ট্রাকে তুললাম। স্যারকে গাড়িতে তুলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কারণ শরীরের ওপর তার কোন নিয়ন্ত্রন ছিলো না।

এদিকে স্যারকে আমি ট্রাকে উঠনোর আগেই সেখানে হাজির হলো সাংবাদিক পাভেল ভাই। (সে বোধহয় নিউ নেশন বা কোন একটা ইংরেজি কাগজে কাজ করতো। মাঝে মাঝে আমাদের সংগঠনে আসতো। তাই তাকে চিনতাম।) স্যারকে পড়ে থাকা অবসস্থা থেকে উঠানোর সময় থেকে পাভেল ভাই তাঁর ক্যামেরা দিয়ে একের পর এক ছবি তুলছে স্যারের সঙ্গে আমার। যখন ট্রাকে উঠাচ্ছিলাম তখনো ছবি তুলছে। আমি তখনন তাকে গালি দিয়ে বলছি, পাভেল ভাই এখন ছবি তোলার সময়? [পরে বুঝেছিলাম সে তার কাজ করেছে। তাঁর তোলা এই ছবিগুলোই পরের দিন সব ফটো সাংবাদিকরা নেয়। পরে সিআইডিও তার ছবিগুলো নিয়েছিল এবং তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছিল।]

যাই হোক আমি স্যারকে পুলিশের ট্রাকে তুললাম অনেক কষ্টে। কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এতো ভীড়, চেচাচেমি, আমি খুব অস্থির বোধ করছি। পরিচিত কাউকে খুঁজছিলাম। পুলিশের ট্রাক ছাড়ার আগে আমি দেখলাম আমার পাশে বিটু ভাই আছে। চরম স্বস্তি বোধ করলাম। যাক চেনাপরিচিত কেউ আছে।

ট্রাকের মধ্যে স্যারকে জড়িয়ে ধরে আছি। ট্রাক চলছে। স্যারের হা করা মুখ দিয়ে আমি রাস্তা দেখছি। স্যার আমাকে জিঞ্জাসা করলো বাবা আমাকে কই নিয়ে যাও? আমি বললাম স্যার হাসপাতালে। আপনার কিছু হয়নি। স্যার বললো আমার চশমা কই? আমি বললাম স্যার আছ। স্যার বললো আমি পুলিশের গাড়িতে যাবো না। আমি বললাম ঠিক আছে স্যার আমরা নেমে যাবো এখুনি।

আহত রক্তাক্ত অবস্থায় আমি কোন মানুষকে এতো শক্ত থাকতে দেখিনি। অন্য কেউ হলে এতো ব্যাথা নিয়ে চিৎকার করতো। ভয় পেতো, কিন্তু স্যার খুব শক্ত দৃড় চিত্তে বসে আছে; যেন কেউ ভুল করে তাকে কুপিয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি যেন খুব কষ্ট পেয়েছেন। আমি আজো স্যারের সেই শক্ত মুখ মনে করতে পারি।

যাই হোক ট্রাক চলছে। আমরা যাচ্ছি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বাংলা একাডেমি থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ গেলে দোয়েল চত্ত্বর পেরিয়ে সোজা চলে গেলেই হয়। কিন্তু পুলিশের ভ্যান দোয়েল চত্ত্বর হয়ে অবার ডানে স্টেডিয়ামের দিকে চলে গেলো। আমি চিৎকার করলাম। পুলিশকে বললাম ভাই আপনারা ঢাকা মেডিকেল চেনেন না? পুলিশের এই সময় নষ্টে মেজাজ খারাপ হলো। ট্রাক ঘুরে শহীদ মিনার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগের সামনে গিয়ে থামলো। আমি আর বিটু ভাই অনেক কষ্টে স্যারকে নামালাম ট্রাক থেকে। জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলাম।


ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগে যে কোন রুগীর জন্য পাঁচ টাকা দিয়ে স্লিপ কাটতে হয়। সেটা কাটলাম। এরপর স্যারকে নিয়ে ট্রলিতে করে রওয়ানা দিলাম সম্ভবত ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসককে বললাম উনি আমাদের স্যার। ডাক্তার স্লিপ চাইলো। আমি স্লিপ বের করতে গিয়ে দেখি সেটি রক্তে ভিজে গেছে। কান্না পেল। ডাক্তার আবারো স্লিপ আনতে বললেন। ছুটলাম আবার। এরপর শুরু হলো স্যারের চিকিৎসা। আমরা স্যারের হাত পো জোরে ধরে আছি। রক্ত থামানোর চেষ্টা চলছে।

ইতিমধ্যে ডাক্তাররা প্রাথমিক কিছু ওষুধ আনতে বললো। আমি আর বিটু ভাই নিজেদের টাকায় সেই অসুধ আনালাম। এরপর দেখি আমাদের টাকা শেষ। ছাত্র মানুষ। কতো টাকাই বা আমাদের পকেটে থাকে। যাই হোক, আমরা সেখানে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বললম এই অসুধগুলো আনার ব্যবস্থা করতে। আমাদের টাকা নেই। তিনি তাই করলেন।

এদিকে স্যারের চিকিৎসা শুরু হওয়ার পরপরই আমি মোবাইলে শুভকে বললাম ঢাকা মেডিকেল আয়। শুভ আসলো। (শুভ মানে আমার বন্ধু। ও তখন প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক) এরপর শুভ, তখনকার ভিসি ফায়েজ স্যারসহ আরো অনেকেই আসলো। আমাদের চলচ্চিত্র সংসদের বড় ভাইরাও আসলো। সবাই বললেন, আমি যনে এখন হলে গিয়ে রক্তে ভেজা এসব ড্রেস চেঞ্জ করি। আমার হাসপাতাল থেকে চলে আসতে ইচ্ছে করছিল না। তবুও এলাম।

এদিকে স্যারকে নিয়ে আমি যখন ট্রলিতে করে ৩২ নম্বর ওয়র্ডে যাচ্ছিলাম সেটি চ্যানেল আই তাদের খবরে দেখায়। আমার বাবা-মা আমার রক্তে ভেজা সে ছবি টেলিভিশনে দেখে ভাবলো আমার কিছু একটা হয়েছে। আমি তাদের ফোন করে ঘটনা জানাণাম। বললাম ভালো আছি। কোন সমস্যা নেই। আমার কিছু হয়নি। তারা নিশ্চিন্ত হলো।

এরপর আমি বিটু ভাইয়ের সাথে তার ফজলুল হক হলে এলাম। আমার হল জহরুল হক হল অনেক দূরে। তাই তার হলেই আমি গোসল করলাম। ড্রেস চেঞ্জ করে বের হলাম। ততোক্ষনে বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল শুরু হয়ে গেছে। হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা কেন? বিচার চাই এই টাইপের কোন মিছিল। আমিও যোগ দিলাম সেই মিছিলে। অনেক রাতে হলে ফিরলাম। ঘুমালাম।

একটি বিষয় ভেবে খুব ভালো লাগে এখনো। পরে জেনেছিলাম, ঘটনা ঘটার মাত্র ১১ মিনিটের মাথায় স্যারকে আমি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেছিলো, কোনভবে স্যারকে হাসপাতালে নিতে আরেকটু দেরি হলে রক্তক্ষরনের কারনে বাঁচানো যেতো না। এজন্য খুব ভালো লাগছিল আমাদের; যে স্যারকে বাঁচাতে পারবো।

রাতে ৩ টার দিকে ঘুমাতে গেলাম। সারাদিনের ক্লান্তি, পরিশ্রম, উত্তেজনায় দীর্ঘক্ষন ঘুমালাম।

পরদিন দুপুর ১২ টায় আমার ঘুম ভাঙ্গলো। দ্রুত টিএসসি গেলাম। জানতে পারলাম স্যারকে রাতেই সিএমএইচ নেওয়া হয়েছে। এদিকে পরদিনের প্রায় সব দৈনিকে আমার ছবি। আমি রক্তাত্ব স্যারকে ধরে আছি। সেই ছবি। যাই হোক। জনকণ্ঠ বিরাট করে খবরটা ছাপছে। একটা জনকন্ঠ কিলনাম। খবরটা পড়লাম।

যাই হোক-সারাদিন আমি মনে মনে বারবার প্রার্থনা করছি -স্যার আপনি সুস্থ্য হয়ে উঠেন। কিন্তু সারাদিন নানা গুজব। একবার শুনি স্যার বেঁচে নেই। আবার শুনি বেঁচে আছেন। এসবরে মধ্যে সময় কাটছে। এর মধ্যে বিকেলে কলকাতার তারা বাংলা বা অন্য কোন চ্যানেলের কল্যান টিএসসিতে খবর শুনলাম স্যার নাকি মারা গেছে। কথাটা শুনেই আমার প্রচন্ড মন খারাপ হলো। টিএসসির দোতালায় চলচ্চিত্র সংসদের রুমে এসে আমার মাথা ঘুরতে লাগলো। এরপর আমি অসুস্থ্য হয়ে গেলাম। বমি করলাম। কষ্টে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমি ব্যার্থ। স্যারকে বাঁচাতে পারলাম না।

কিন্তু কিছুক্ষন পরেই আবার জানতে পারলাম না স্যার বেঁচে আছে। ইন্ডিয়ার টেলিভিশন ভুল খবর দিছে। এও জানলাম স্যারকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়া হচ্ছে। আমি স্বস্তি ফিরে পেলাম। স্যারকে ক'দিন পর যথারীতি দেশের বাইরে নেওয়া হলো।

এদিকে স্যারের উপর হামলার ঘটনার বিচার চেয়ে ক্যাম্পাসে শুরু হলো তীব্র আন্দোলন। সব জায়গায় পোষ্টার টানানো হয়েছে। তাতে একটিই ছবি-আমি স্যারকে ধরে আছি। ক্যাম্পাসের যেদিকেই তাকাই আমার ছবি। আমার হাঁটতে বিব্রত লাগে। মনে হয় সবাই আমাকে দেখছে। টিএসসিতে গেলে মনে হয় পুলিশ আমাকে ফলো করছে। ইনকিলাব সে সময় নিউজ করলো ঘটনা ঘটার কিছুক্ষনের মধ্যেই যে দুই ছাত্র স্যারকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো তাদের গ্রেপ্তার করা হোক। তাহলেই সব জানা যাবে।

ছবিটা খেয়াল করুন। দেখুন আমি চিৎকার করছি। কিন্তু কেউ কেউ ভুল করে ভাবেন, আমি হাসছি। সংগ্রাম ইনকিলাব্ সেই কথা বলে তাই নিউজ করলো এই ছেলে হাসে কেন? পরে জানতে পারলাম যথাসময়ে হাসপাতালে নেওয়ায় সংগ্রাম খুবই বিরক্ত। সে সময় স্যারের রাজাকদের বিরুদ্ধে বই নিয়ে সংগ্রাম ক্ষেপে আছে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে আমার খালি মনে হয় পুলিশ আমাকে ফলো করে। কেমন একটা ভয় ভয়। সবাই বললো বাসা থেকে ঘুরে আয়। ভয় কেটে যাবে। ভালো লাগবে। আমি চট্টগ্রাম গেলাম।

মাস খানেক পর স্যার সম্ভবত দেশে আসলেন সুস্থ্য হয়ে। মুখে একটা দাগ হয়ে থাকলো। স্যারের ফেরা উপলক্ষ্যে অপরাজেয় বাংলার সামনে অনুষ্ঠান। সবাই সেখানে বক্তৃতা করছে। আমি দর্শকের মতো শুনছি।

স্যার বক্তৃতা করা শুরু করলো। আমি স্যারের কথাগুলো শুনলাম। মুগ্ধ হয়ে দেখছি। খুব তৃপ্ত লাগছে। মনে মনে বলছি স্যার আপনি কি জানেন রাস্তায় যখন আপনি পড়ে ছিলেন, কেউ যখন আপনাকে ধরেনি, তখন এই আমিই আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমিই আপনাকে বাঁচিয়েছি। আমার মধ্যে তখন সাফল্যের আনন্দ।

আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল স্যারের সঙ্গে দেখা করতে। শুভকে নিয়ে আমি একদিন স্যারের বাসায় যাওয়ার চেষ্টাও করলাম সেদিনের ঘটনা বলতে। কিভাবে স্যারকে হাসপাতলে নিলাম সেই কাহিনী। একদিন গেলামও স্যারের বাসায়। কিন্তু জানানো হলো, স্যার বাসায় নেই।

স্যারের সঙ্গে আমার সেই আলাপ আর কখনোই করে ওঠা হয়নি। স্যার কখনো জানতেও পারিনি কে তাকে হাসপাতালে নিয়েছিলো? স্যার তখন কি বলেছিলেন।


এদিকে স্যার দেশে ফেরার পর এই ঘটনা নিয়ে দায়ের করা মামলার তদন্ত নিয়ে শুরু হলো আন্দোলন। পুলিশের বদলে মামলার তদন্তভার পড়লো সিআইডির ওপর। একদিন আমি ক্লাস করে বের হচ্ছি আমাদের জহরুল হক হলের এক কর্মচারী এসে জানালো, প্রভোষ্ট স্যার আপনাকে এখুনি তাঁর বাসায় যেতে বলছে। আমি বুঝলাম না এতো সকালে স্যার কেন আমাকে ডাকছে? সন্দেহ হলো। শুভকে জানালাম আমি প্রভোষ্টের বাসায় যাচ্ছি। কোন সমস্যা হলে খবর নিস। সে সময় আমাদের হলের প্রভোষ্ট ছিলেন আমিনুর রহমান মজুমদার।


আমি সকাল ১০ টার দিকে স্যারের বাসায় গেলাম। স্যার নানান তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমার সাথে গল্প শুরু করলো। কিছুক্ষন পর দেখি সেখানে দু'জন লোক এসে ঢুকলো। এরপর প্রভোষ্ট স্যার চলে গেলো। তারা দেখি কতোগুলো ছবি দেখছে। পাভেল ভাইয়ের তোলা সেই ছবিগুলো যেখানে আমি স্যারকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি। আমি শুনছিলাম পাভেল ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি ধরে নিয়েছে। যাই হোক, অনেকক্ষন তারো আমার ছবিগুলো দেখলেন। এরপর নিজেদের পরিচয় দিলেন। জানালেন তারা সিআইডির কর্মকর্তা। একজনের নাম মনে আছে আব্দুল মালেক।

তারা আমাকে নানান বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সেদিনের ঘটনা নিয়ে। জানতে চাইলেন স্যার কি সে সময় কারো নাম বলেছিলেন কিনা, স্যার শেষ পর্যন্ত কি বলেছিলেন এসব। বললো আপনার সঙ্গে আরেকটা ছেলে ছিলো ও কই। আমি মোবাইলে বিটু ভাইকেও আসতে বললাম স্যারের বাসায়। বিটু ভাই এল। মালেক ভাই আমাদের দু'জনের সঙ্গে কথা বললেন।

মালেক সাহেব আমাকে বললনে, আপনেকে আমাদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা ছিল। কিন্তু আপনার প্রভোষ্ট স্যার বলছে সে অপনাকে চেনে। আপনি তার হলের মেধাবী ছেলে। তাই আপনাকে অ্যারেস্ট কলা হলো না। কিন্তু আপনি আর বিটু কাল সিআইডর মালিবাগ অফিসে আসবেন। কিছু প্রশ্নের উত্তর দেবেন। এরপর মালেক ভাই দেখালেন, গত এক মাসে আমি কখনে কোথায় গেছি সব রিপোর্ট তাদের কাছে আছে। আমি দেখলাম। আমি কবে চট্টগ্রাম গেছি, কথন কি করি সব সেখানে লেখা।

সিআইডি জিজ্জ্ঞাসাবাদ করবে শুনে ভালোই ভয় পেলাম। বুঝতে পারলাম না আমি কি করলাম। আমাকে কেন জিজ্ঞেস করবে। কেন অ্যারেষ্ট করবে। রাতে আমি আমার বিভাগের এক শিক্ষকের বাসায় গেলাম। পুলিশের সাবেক আইজি এনামুল হক তাঁর ঘনিষ্ঠ। তাই তাকে দিয়ে ফোন করানোর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। ওই আইজি জানিয়ে দিলেন, তিনি এ বিষয়ে কাউকে ফোন করতে পারবেন না। তাতে নাকি তার মান যায়, অথচ আমি তাঁর ছাত্র ছিলাম। সে আমাদের একটা কোর্স পড়াতো।

ভয় নিয়েই কাটলো বাকি রাত। পরদিন সকাল ১১ টায় কিছুটা ভয়েই বিটু ভাইকে নিয়ে পৌছালাম মালিবগে সিআইডির প্রধান অফিসে। কিছুক্ষন পর মালেক সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন সিআইডির উর্ধ্বতন এক অফিসারর রুমে। তিনি সম্ভবত বড় কোন পোষ্টে। দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক। এখন আর নাম মনে করতে পারছি না।

তিনি আমাকে ভালো করে দেখলেন। তারপর বললেন, ঘটনার পরদিন যখন আপনার এই ছবিটা পত্রিকয়া ছাপা হলো তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ সাহেব আমাকে বলেছিলেন এই ছেলেটা রক্তাত্ব স্যারকে জড়িয়ে ধরে আছে। তাকে অ্যারেস্ট করে জিজ্ঞাসাবদ করেন। কিন্তু আমি সেটা করি নাই। কারন আমার কাছে মনে হয়েছে, যারা হামলা করে, তারা কখনোই তাকে উদ্ধার করে না। সেখানকার সব পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, সবাই বলেছি, স্যারকে যে ছেলেটা জড়িয়েছিলো ছবিতে সেই স্যারকে উদ্ধার করেছেন। কাজেই আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করি নাই। আমি সব জানতাম।

এরপর তিনি নানান বিষয়ে জানতে চাইলেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক কথা। সার শেষ মুহুর্তে কি কি বলেছিলেন মনে করার চেষ্টা করেন। স্যার কারো নাম বলেছেন কিনা মনে করার চেষ্টা করেন। আমি একই ঘটনা বললাম। এরপর তিনি বললেন, আপনি সব বর্ণনা একটা লিখিত স্টেমেন্ট হিসেবে দিয়ে যান। আমি সেটা দিয়ে সেখান থেকে এলাম। আর মনে মনে ভাবলাম এসব কারনেই মানুষ বোধহয় মানুষের উপকার করে না। একজন মানুষকে আমি বাঁচালম আর এজন্য আমাকে এখন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।


মেজাজ খারাপ হলো হুমায়ুন আজাদ এবং তার পরিবারের প্রতিও। কারন তারা গত দুই মাসে একবারও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে নাই কে স্যারকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলো। উল্টো তারাও সংগ্রাম পত্রিকবার সুরে বলছেন এমনকি স্যারও নাকি বলেছেন, এই ছেলেটা হাসছে কেন? স্যার চাইলেই হয়তো খোঁজ নিতে পারতেন। কথা বলে সেদিনের ঘটনা জানতে পারতেন। কিন্তু তাদের সেই ইচ্ছাটাই হয়নি। উল্টো আমাকে স্যারের বাসায় গিয়ে না পেয়ে ঘুরে আসতে হয়েছে।

অরেক অধ্যায়:
আজাদ স্যারকে জড়িয়ে আমার গল্পটা এখানেই শেষ হলো ভালো হতো। কিন্তু হলো না। গল্প আরো জড়িয়ে আছে। ২০০৪ সালেরই আগস্ট মাস। আমি তখন একটি দৈনিকের সাংবাদিক। ১১ বা ১২ আগষ্ট শুনতে পেলাম জার্মানে স্যার মারা গেছেন। সেদিন সম্ভবত শুক্রবার ছিলো। খুব মন খারাপ হলো। স্যারের সঙ্গে আমার আর কথা বলা হয়ে উঠল না।

সেদিন অফিসে ক্রাইমের কেউ ছিলো না। তখন চীফ রিপোর্টার ছিলেন আশরাফ ভাই। তিনি কি করবেন কিভাবে লিখবেন এই স্টোরি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আমি তাকে বললাম ভাইয়া, আমি স্টোরিরা লিখে দিচ্ছি। আমার পুরো ঘটনা জানা। আমি লিখলাম। আশরফ ভাই বললেন, আমি তারিখ, সময়সহ স্যারের ওপর হামলার ঘটনার এতো বিস্তারিত জানলাম কি করে? তাকে বললাম আমি তখন ঘটনাস্থলে ছিলাম।

পরদিন এই স্টোরিটা লিড হলো। এরপর টানা কয়েকদিন আমি স্টোরিটা ফলোআপ করলাম। আমার কাছে মালেক ভাইয়ের নাম্বার ছিল, তার সঙ্গে যোগযোগ করে মামলার সব তথ্য দিলাম। সব মিলিয়ে আশরাফ ভাই খুব খুশি ছিলেন স্টোরিগুলো দেখে।

যাই হোক, পরে যখন একটি জঙ্গি সংগঠনের হত্যার লিষ্টের তালিকায় হুমায়ুন আজাদের নাম এবং এ সংক্রান্ত কাগজপত্র পাওয়া গেলো, তখন প্রমানিত হলো জঙ্গিরাই স্যারকে হত্যা করতে চেয়েছিল। সে সময় আমি প্রথম আলোতে। সেবারও আজাদ স্যারের নিউজে পুরোনো ঘটনার ইতিহাস টানলাম আমি।

আমার পরিবার এবং শিক্ষকরা শিখিয়েছেন নিজের শতো সমস্যা হরো মানুষের উপকার করবে। গাধা বলেই হয়তো খনো সেটি মানার চেষ্টা করি। বারবার মানুষের কাছ থেকে কষ্ট পাই, তবুও মানুষকেই ভালোবাসি। চেষ্টা করি মানুষের পাশে থাকার। এজন্য আমি ব্যাক্তিগতভাবে তৃপ্ত। আমি জানি মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর কি আনন্দ। কিন্তু আফসোস স্যারকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারলাম না। অরেকটা আফসোস আজ পর্যন্ত স্যারের পরিবারের কেউ কখনো খোঁজ করে সেদিনের ঘটনাটা জানার চেষ্টা করেনি।

আমি দীর্ঘদিন রক্তে ভেজা ক্যাটস আইয়ের সেই গেঞ্জিটা যেটি ভিজে গিয়েছিল আজাদ স্যারের রক্তে সেটি সংরক্ষন করে রেখেছিলাম। এ বছর হল ছাড়ার সময় আর আনিনি সেটা। তবে স্মৃতিগুলো এখনো আছে জ্বলজ্বেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কালে শামসুন্নাহার আন্দোলন, হ্যাপির মৃতু, ২০০৭ সালের আগস্টের আন্দোলন, শিক্ষকদের গ্রেপ্তার ও মুক্তিসহ নানান ঘটনার প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী আমি। সর্বশেষ বকরের মৃত্যুর ঘটনার নিউজগুলো করলাম। প্রায়ই ভাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাগুলো নিয়ে একটা বই লিখি। হয়ে উঠে না আলসেমিতে কিংবা সারাদিনের ব্যস্ততায়। তাই ভাবলাম এবার ব্লগেই লিখে ফেলি ডিজিটাল ডায়েরি। ভালো লাগছে লেখাটা শেষ করে। মনে হলো ইতিহাস চেপে রাখার দায় থেকে মুক্ত হলাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29108222 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29108222 2010-03-02 00:41:53
আমার স্মৃতিতে হুমায়ুন আজাদ: যেভাবে তাকে হাসপাতলে নিয়েছিলাম এবং পরবর্তী ঘটনাগুলো...
হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে আমার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা আছে। আছে একটি বিখ্যাত ছবি। রক্তাত্ব হুমায়ুন আজাদকে জড়িয়ে ধরে আছি আমি। এটি আমার জীবনের এক স্মরনীয় ঘটনা। লিখবো লিখবো করেও কখোনো লেখা হয়নি। সবসময় মনে হয়েছে, মানুষকে জানিয়ে লাভ কি? তারপরেও গত বছরের আগস্টে প্রথম ব্লগেই লিখি ঘটনাটা। সেটিই রিপোষ্ট। .......

[ব্লগে হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে কয়েকটি লেখা এবং ছবি দেখলাম। তাতে চোখে পড়লো সেই বিখ্যাত ছবিটিও। রক্তাত্ব হুমায়ুন আজাদকে জড়িয়ে ধরে আছি আমি। এটি আমার জীবনের এক স্মরনীয় ঘটনা। লিখবো লিখবো করেও কখোনো লেখা হয়নি। সবসময় মনে হয়েছে, মানুষকে জানিয়ে লাভ কি?

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি আর আগষ্ট এলেই ভাবি এবার সেই ঘটনা নিয়ে লিখবো। কিন্তু আলসেমিতে হয়ে ওঠে না। আমাদের অফিসের ফিচার সম্পাদক জাহিদ রেজা নূর কয়েকবার বলেছিলেন লিখতে। তাঁর কথায় একবার কিছুটা লিখেওছিলাম। কিন্তু শেষ আর করা হয়ে ওঠেনি নানা ব্যস্ততায়।

আজ মনে হচ্ছে ব্লগে শেয়ার করি সেদিনের ঘটনা। পাঠক বিষয়টি জানুক। আমি মুক্ত হই গণমাধ্যমে ইতিহাস চেপে রাখার দায় থেকে। কারন আমার পরিচিতরা ছাড়া সাধারন মানুষ ঘটনাটি জানে না। আজ তাদের জানাচ্ছি।


আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের (ডিইউএফএস) তুখোড় সদস্য। ক্লাস শেষ করেই কলা ভবন থেকে ছুটে যাই টিএসসিতে। সেখানেই আড্ডা, সেখান থেকে খেতে যাওয়া, আবার ফিরে আসা। রাতে এখান থেকে নয়টা সাড়ে নয়টা কখনো কখনো ১০ টায় হলে ফিরি।

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৪। তখন শীতকাল। বইমেলা চলছে। টিএসসি জমজমাট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন একটি গানের উৎসব হবে। টিএসসির নিচে তার মহড়া চলছে। গিটারে গান। আমি বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে সেই গান শুনছি। রাত আটটা থেকে নয়টার মধ্যে। হঠাৎ একটি বোমা ফাটার মতো শব্দ হলো। মাঝারি ধরনের শব্দ। আমার আবার সব কিছুতেই ব্যাপাক কৌতুহল। খুব সাহসী আমি সেটি বলবো না, তবে ভয় ডর নেই এটুকু বলতে পারি।

তো কোথা থেকে এলো সেই শব্দ সেটি জানতে আমি টিএসসি থেকে হাঁটা শুরু করলাম বাংলা একাডেমির দিকে। রাস্তার মাঝে যে ডিভাইডার আমি সেটি ধরে আনমনে হাঁটছি। মনে হলো সোহরাওয়াদী উদ্যান দিয়ে কেউ দৌড়ে পালাচ্ছে। একটু দূরে যেতেই দেখি এক জায়গায় জটলা। গেলাম সেখানে। দেখলাম চাঁর-পাঁচজন পুলিশ সদস্য, কিছু লোক সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সামনে পড়ে আঝছ রক্তাত্ব একটি দেহ। কিন্তু কেউ ধরছে না। বরং সবাই যেন তামাশা দেখছে। কিংবা হয়তো ঝামেলার ভয়।

আমি দ্রুত সেখানে গিয়ে উপুড় হওয়া লোকটিকে তুললাম। রক্তে ভেজা। মুখ দেখে চিৎকার করে উঠি এ তো হুমায়ুন আজাদ। আমি যখন স্যারকে তুলি স্যারের এক পাশের গাল দুই ভাগ হয়ে দুদিকে চলে গিয়েছিলো। পুরো মুখটা পুরো হা হয়ে ছিল। আমি দুই পাশে চাপ দিয়ে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করলাম।

হুমায়ুন আজাদকে আমি সামনাসামনি আগে কখনো দেখি নাই। কিন্তু তাঁর অনেক বই পড়েছি। আমার স্কুলের এক ইংরেজি শিক্ষক যে আমাকে মানুষ হওয়ার দীক্ষা দিয়েছিল তাঁর কাছ থেকে জেনেছি হুমায়ুন সম্পর্কে। অনেক বই পড়েছি স্যারের। ব্যাক কাভারের সেই ছবি আর সেই চুল দেখে তাই স্যারকে চিনতে পারলাম।

মূল ঘটনায় ফিরি। স্যারকে হাসপাতালে নিতে হবে। কি করবো? আমি আমার মোবাইল ফোন থেকে একটি ফোন করলাম বিটু ভাইকে। বললাম-বিটু ভাই, হুমায়ুন আজাদকে বোমা মারছে। আপনি বাংলা একাডমেরি সামনে আসেন। বিটু ভাই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় চলচ্চিত্র সংসদের অর্থ সম্পাদক এবং আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ বড় ভাই। (আমি তখন ভেবেচিলাম স্রারকে বোমা মারা হয়েছে। আসলে তকা নয়, তাহলে কোপানো হয়েছিল, দুস্কৃতিকারীরা পালানোর সময় বোমা ফাটায়)
বিটু ভাইকে ফোন করে আমি রক্তাত্ব হুমায়ুন আজাদকে হাপাতালে নেওয়ার জন্য একটি রিকশায় উঠানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু রিকশায় উঠানো সম্ভব হলো না।
স্যারকে কোনভাবেই রিকশায় রাখতে পারছিলাম না।
আমি তখন দৌড়ে টিএসসির দিকে আসলাম। সাদা একটি প্রাইভেট কার এদিকেই আসছিলো। আমি তাকে বললাম ভাই আমাদের এক স্যার হুমাযুন আজাদকে কেউ বোমা মেরেছে। হাসপাতালে নিতে হবে। একটু আসেন। সে কিছুতেই রাজি হলো না। বরং গাড়ি ঘুরিয়ে উল্টো দিকে চলে গেলো। আমি কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এদিক ওদিক তাকিয়ে কোন দিশা পাচ্ছিলাম না। ছটফট করছিলাম।

হঠাৎ অন্য বুদ্ধি আসে। দেখি পুলিশের বিশাল এক ট্রাক দাঁড়িয়ে টিএসসির সামনে। আমি তখন চিৎকার দিয়ে তাদের বললাম ভাই স্যারকে হাসপাতালে নিতে হবে। আমি এখানকার ছাত্র। প্লিজ আপনাদের গাড়িটা নিয়ে আসেন। একই সঙ্গে আমি হুমকিও দিলাম। চেচামেচি করলাম। পুলিশ সদস্যরা রাজি হলো। তারা এলো গাড়ি নিয়ে। লোকজনের সহায়তায় আমি স্যারকে পুলিশের সেই ট্রাকে তুললাম। স্যারের খুব কষ্ট হচ্ছিল বোঝা যাচ্ছিল।

এদিকে স্যারকে আমি ট্রাকে উঠনোর আগে আগে সেখানে হাজির হলো পাভেল ভাই। (সে বোধহয় নিউ নেশন বা কোন একটা ইংরেজি কাগজে কাজ করতো। মাঝে মাঝে আমাদের সংগটনে আসতো। তাই তাকে চিনতাম।) দেখি পাভেল ভাই তাঁর ক্যামেরা দিয়ে একের পর এক ছবি তুলছে স্যারের সঙ্গে আমার। আমি তাকে গালি দিয়ে বলছি, পাভেল ভাই এখন ছবি তোলার সময়? পরে বুঝেছিলাম সে তার কাজ করেছে। তাঁর তোলা এই ছবিগুলোই পরের দিন সব ফটো সাংবাদিকরা নেয়। পরে সিআইডিও তার ছবিগুলো নিয়েছিল এবং তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছিল।

যাই হোক আমি স্যারকে ট্রাকে তুললাম অনেক কষ্টে। কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এতো ভীড়, চেচাচেমি, আমি খুব অস্থির বোধ করছি। পরিচিত কাউকে খুঁজছিলাম। পুলিশের ট্রাক ছাড়ার আগে আমি দেখলাম আমার পাশে বিটু ভাই আছে। আমি চরম স্বস্তি বোধ করলাম।

ট্রাকের মধ্যে স্যারকে জড়িয়ে ধরে আছি। ট্রাক চলছে। স্যারের হা করা মুখ দিয়ে আমি রাস্তা দেখছি। স্যার আমাকে জিঞ্জাসা করলো বাবা আমাকে কই নিয়ে যাও? আমি বললাম স্যার হাসপাতালে। আপনার কিছু হয়নি। স্যার বললো আমার চশমা কই? আমি বললাম স্যার আছ। স্যার বললো আমি পুলিশের গাড়িতে যাবো না। আমি বললাম ঠিক আছে স্যার আমরা নেমে যাবো এখুনি।

আহত রক্তাক্ত অবস্থায় আমি কোন মানুষকে এতো শক্ত থাকতে দেখিনি। অন্য কেউ হলে এতো ব্যাথা নিয়ে চিৎকার করতো। ভয় পেতো, কিন্তু স্যার খুব শক্ত দৃড় চিত্তে বসে আছে যেন কেউ কোন ভুল করেছে। কেউ যেন ভুল করে তাকে কুপিয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি যেন খুব কষ্ট পেয়েছেন। যাই হোক ট্রাক চলছে। আমরা যাচ্ছি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

বাংলা একাডেমি থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ গেলে দোয়েল চত্ত্বর পেরিয়ে সোজা চলে গেলেই হয়। কিন্তু পুলিশের ভ্যান দোয়েল চত্ত্বর হয়ে অবার ডানে স্টেডিয়ামের দিকে চলে গেলো। আমি চিৎকার করলাম। পুলিশকে বললাম ভাই আপনারা ঢাকা মেডিকেল চেনেন না? পুলিশের এই সময় নষ্টে মেজাজ খারাপ হলো। ট্রাক ঘুরে শহীদ মিনার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগের সামনে গিয়ে থামলো। আমি আর বিটু ভাই অনেক কষ্টে স্যারকে নামালাম ট্রাক থেকে। জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলাম।


ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগে যে কোন রুগীর জন্য পাঁচ টাকা দিয়ে স্লিপ কাটতে হয়। সেটা কাটলাম। এরপর স্যারকে নিয়ে ট্রলিতে করে রওয়ানা দিলাম সম্ভবত ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসককে বললাম উনি আমাদের স্যার। ডাক্তার স্লিপ চাইলো। আমি স্লিপ বের করতে গিয়ে দেখি সেটি রক্তে ভিজে গেছে। কান্না পেল। ডাক্তার আবারো স্লিপ আনতে বললেন। ছুটলাম আবার। এরপর শুরু হলো স্যারের চিকিৎসা।

প্রাথমিক কিছু ওষুধ আমি আর বিটু ভাই নিজেরেদর টাকায় আনালাম। এরপর টাকা শেষ। আমরা সেখানে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তাকে বললম এগুলো আনার ব্যবস্থা করতে। তিনি তাই করলেন। স্যারের চিকিৎসা শুরু হলে আমি শুভকে বললাম শুভ হাসপাতালে আয়। শুভ আসলো। (শুভ মানে আমার বন্ধু। ও তখন প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক) এরপর শুভ, তখনকার ভিসি ফায়েজ স্যারসহ আরো অনেকেই আসলো। আমাদের চলচ্চিত্র সংসদের বড় ভাইরাও আসলো।

সবাই বললেন, আমি যনে এখন হলে গিয়ে রক্তে ভেজা এসব ড্রেস চেঞ্জ করি। আমার হাসপাতাল থেকে আসতে ইচ্ছে করছিল না। তবুও এলাম।

এদিকে স্যারকে নিয়ে আমি যখন ট্রলিতে করে ৩২ নম্বর ওয়র্ডে যাচ্ছিলাম সেটি চ্যানেল আই তাদের খবরে দেখায়। অঅমার বাবা-মা আমার রক্তে ভেজা সে ছবি দেখে ফোন করে আমার বাবা-মা ঘটনা জানতে চাইলো। বললাম আমি ভালো আছি। কোন সমস্যা নেই। আমার কিছু হয়নি। তারা নিশ্চিন্ত হলো।

এরপর আমি আর বিটু ভাই ফজলুল হক হলে এলাম। আমি গোসল করলাম। ড্রেস চেঞ্জ করে বের হলাম। ততোক্ষনে বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল শুরু হয়ে গেছে। হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা কেন? বিচার চাই এই টাইটের কোন মিছিল। যোগ দিলাম সেই মিছিলেও। অনেক রাতে হলে ফিরলাম। ঘুমালাম।

একটি বিষয় জানা দরকার-ঘটনা ঘটার মাত্র ১১ মিনিটের মাথায় স্যারকে আমি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেছিলো, কোনভবে স্যারকে হাসপাতালে নিতে দেরি হলে রক্তক্ষরনের কারনে স্যারকে বাঁচানো যেতো না। এজন্য খুব ভালো লাগছিল আমাদের। যে স্যারকে বাঁচাতে পারবো।

রাতে ৩ টার দিকে ঘুমাতে গেলাম। সারাদিনের ক্লান্তি, পরিশ্রম, উত্তেজনায় দীর্ঘক্ষন ঘুমালাম।

পরদিন দুপুর ১২ টায় আমার ঘুম ভাঙ্গলো। দ্রুত টিএসসি গেলাম। জানতে পারলাম স্যারকে রাতেই সিএমএইচ নেওয়া হয়েছে। এদিকে পরদিনের প্রায় সব দৈনিকে আমার ছবি। আমি স্যারকে ধরে আছি। এই সেই ছবি। যাই হোক। একটা জনকন্ঠ কিলনাম। খবরটা পড়লাম। নিজের ছবি দেখলাম।

এদিকে আমি মনে মনে বারবার প্রার্তনা করছি -স্যার আপনি সুস্থ্য হয়ে উঠেন। যাই হোক। সারাদিন নানা গুজব। একবার শুনি স্যার নেই। আবার শুনি বেঁচে আছেন। এসবরে মধ্যে সময় কাটছে। এর মধ্যে বিকেলে কলকাতার তারা বাংলা বা কারো কল্যাণে টিএসসিতে খবর শুনলাম স্যার নাকি মারা গেছে। কথাটা শুনেই আমার প্রচন্ড মন খারাপ হলো। টিএসসির দোতালায় সংসদের রুমে এসে আমার মাথা ঘুরতে লাগলো। এরপর আমি অসুস্থ্য হয়ে গেলাম। বমি করলাম। কিছুক্ষন পরেই জানতে পারলাম না স্যার বেঁচে আছে। তাকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেওয়া হচ্ছে। অঅমি স্বস্তি ফিরে পেলাম। স্যারকে ক'দিন পর যথারীতি দেশের বাইরে নেওয়া হলো।

এদিকে স্যারের উপর হামলার ঘটনার বিচার চেয়ে ক্যাম্পাসে শুরু হলো তীব্র আন্দোলন। সব জায়গায় পোষ্টার টানানো হয়েছে। তাতে একটিই ছবি-আমি স্যারকে ধরে আছি। ক্যাম্পাসের যেদিকেই তাকাই আমার ছবি। আমার হাঁটতে বিব্রত লাগে। মনে হয় সবাই আমাকে দেখছে। টিএসসিতে গেলে মনে হয় পুলিশ আমাকে ফলো করছে। ইনকিলাব সে সময় নিউজ করলো ঘটনা ঘটার কিছুক্ষনের মধ্যেই যে দুই ছাত্র স্যারকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো তাদের গ্রেপ্তার করা হোক। তাহলেই সব জানা যাবে।

ছবিটা খেয়াল করুন। দেখুন আমি চিৎকার করছি। কিন্তু সংগ্রাম ইনকিলাব্ নিউজ করলো এই ছেলে হাসে কেন? পরে জানতে পারলাম যথাসময়ে হাসপাতালে নেওয়ায় সংগ্রাম খুবই বিরক্ত। সে সময় স্যারের রাজাকদের বিরুদ্ধে বই নিয়ে সংগ্রাম কেপে আছে।

যাই হোক আমার খালি মনে হয় পুলিশ আমাকে ফলো করে। সবাই বললো বাসা থেকে ঘুরে আয়। ভালো লাগবে। আমি চট্টগ্রাম গেলাম।

মাস খানেক পর স্যার সম্ভবত দেশে আসলেন সুস্থ্য হয়ে। মুখে একটা দাগ হয়ে থাকলো। স্যারের ফেরা উপলক্ষ্যে অপরাজেয় বাংলার সামনে অনুষ্ঠান। সবাই সেখানে বক্তৃতা করছে। আমি দর্শকের মতো শুনছি।

স্যার বক্তৃতা করা শুরু করলো। আমি স্যারের কথাগুলো শুনলাম। মুগ্ধ হয়ে দেখছি। খুব তৃপ্ত লাগছে। মনে মনে বলছি স্যার আপনি কি জানেন রাস্তায় যখন আপনি পড়ে ছিলেন, কেউ যখন আপনাকে ধরেনি, তখন এই আমিই আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম।

স্যারের সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করছিলো। শুভকে নিয়ে আমি একদিন স্যারের বাসায় যাওয়ার চেষ্টাও করলাম সেদিনের ঘটনা বলতে। একদিন গেলামও কিন্তু জানানো হলো, স্যার বাসায় নেই। স্যারের সঙ্গে আমার সেই আলাপ আর কখনোই করে ওঠা হয়নি। সস্রার কখনো জানতেও পারিনি কে তাকে হাসপাতালে নিয়েছিলো?


এদিকে স্যার দেশে ফেরার পর এই ঘটনা নিয়ে দায়ের করা মামলার তদন্ত নিয়ে শুরু হলো আলোচনা। তদন্তভার পড়লো সিআইডির ওপর। একদিন আমি ক্লাস করে বের হচ্ছি আমাদের জহরুল হক হলের এক কর্মচারী এসে জানালো, প্রভোষ্ট স্যার আপনাকে এখুনি তাঁর বাসায় যেতে বলছে। আমি বুঝলাম না এতো সকালে স্যার কেন আমাকে ডাকছে? সন্দেহ হলো। শুভকে জানালাম। আমি প্রভোষ্টের বাসায় যাচ্ছি। কোন সমস্যা হলে খবর নিস। সে সময় আমাদের হলের প্রভোষ্ট ছিলেন আমিনুর রহমান মজুমদার।


যাই হোক, আমি সকাল ১০ টার দিকে স্যারের বাসায় গেলাম। স্যার নানান তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমার সাথে গল্প শুরু করলো। কিছুক্ষন পর দেখি সেখানে দু'জন লোক এসে ঢুকলো। স্যার চলে গেলো। তারা দেখি কতোগুলো ছবি দেখছে। পাভেল ভাইয়ের তোলা সেই ছবিগুলো যেখানে আমি স্যারকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি। আমি শুনছিলাম পাভেল ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি ধরে নিয়েছে। যাই হোক, অনেকক্ষন তারো আমার ছবিগুলো দেখলেন। এরপর নিজেদের পরিচয় দিলেন। জানালেন তারা সিআইডির কর্মকর্তা। একজনের নাম মনে আছে আব্দুল মালেক।

তারা আমাকে নানান বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সেদিনের ঘটনা নিয়ে। জানতে চাইলেন স্যার কি সে সময় কারো নাম বলেছিলেন কিনা, স্যার শেষ পর্যন্ত কি বলেছিলেন এসব। বললো আপনার সঙ্গে আরেকটা ছেলে ছিলো ও কই। আমি মোবাইলে বিটু ভাইকেও আসতে বললাম স্যারের বাসায়। বিটু ভাই এল। মালেক ভাই আমাদের দু'জনের সঙ্গে কথা বললেন।

মালেক সাহেব আমাকে বললনে, আপনেকে আমাদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা ছিল। কিন্তু আপনার প্রভোষ্ট স্যার বলছে সে অপনাকে চেনে। তাই আপনাকে অ্যারেস্ট কলা হলো না। আপনি আর বিটু কাল সিআইডর মালিবাগ অফিসে আসবেন। মালেক ভাই দেখালেন, গতো এক মাসে আমি কখনে কোথায় গেছি সব রিপোর্ট তাদের কাছে আছে। আমি দেখলাম। আমি কবে চট্টগ্রাম গেছি, কথন কি করি সব সেখানে লেখা। কিছুটা ভয় পেলাম। রাতে আমার এক শিক্ষকের বাসায় গেলাম। পুলিশের সাবেক আইজি এনামুল হক তাঁর ঘনিষ্ট। তাকে দিয়ে ফোন করানোর চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না।

ভয় নিয়েই কাটলো বাকি রাত। পরদিন সকাল ১১ টায় কিছুটা ভয়েই গিয়ে পৌছালাম মালিবগে সিআইডির হেড অফিসে। কিছুক্ষন পর মালেক সাহেব আমাকে নিয়ে গেলেন সিআইডির উর্ধ্বতন এক অফিসারর রুমে। তিনি সম্ভবত বড় কোন পোষ্টে। দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক। এখন আর নাম মনে করতে পারছি না।

তিনি আমাকে ভালো করে দেখলেন। তারপর বললেন, ঘটনার পরদিন যখন আপনার এই ছবিটা পত্রিকয়া ছাপা হলো তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ সাহেব আমাকে বলেছিলৈন এই ছেলেটাকে অ্যারেস্ট করে জিজ্ঞাসাবদ করেন। কিন্তু আমি সেটা করি নাই। কারন আমার কাছে মনে হয়েছে, যারা হামলা করে, তারা কখনোই তাকে উদ্ধার করে না। সেখানকার সব পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, সবাই বলেছি, আপনি তাকে উদ্ধার করেছেন। কাজেই আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করি নাই।

এরপর তিনি নানান বিষয়ৈ জানতে চাইলেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক কথা। সার শেষ মুহুর্তে কি কি বলেছিলেন মনে করার চেষ্টা করেন। স্যার কারো নাম বরেছিলো কিনা মনে করার চেষ্টা করেন। যাই হোক, আমি একটা লিখিত স্টেমেন্ট দিয়ে সেখান থেকে এলাম। আর মনে মনে ভাবলাম এসব কারনেই মানুষ বোধহয় মানুষের উপকার করে না। একজন মানুষকে আমি বাঁচালম আর এজন্য আমাকে এখন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।


মেজাজ খারাপ হলো হুমায়ুন আজাদ এবং তার পরিবারের প্রতিও। কারন তারা গত দুই মাসে একবারও খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে নাই কে স্যারকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলো। উল্টো তারাও সংগ্রাম পত্রিকবার সুরে বলছেন এমনকি স্যারও নাকি বলেছেন, এই ছেলেটা হাসছে কেন?

যাই হোক। আজাদ স্যারকে জড়িয়ে আমার গল্পটা এখানেই শেষ হলো ভালো হতো। কিন্তু হলো না। গল্প আরো জড়িয়ে আছে। ২০০৪ সালেরই আগস্ট মাস। আমি তখন কাজ করি বাংলাবাজার পত্রিকায়। ১১ বা ১২ আগষ্ট শুনতে পেলাম জার্মানে স্যার মারা গেছেন। সেদিন সম্ভবত শুক্রবার ছিলো।

সেদিন অফিসে ক্রাইমের কেউ ছিলো না। তখন চীফ রিপোর্টার ছিলেন আশরাফ ভাই। তিনি কি করবেন কিভাবে লিখবেন এই স্টোরি বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আমি তাকে বললাম ভাইয়া, আমি স্টোরিরা লিখে দিচ্ছি। আমার পুরো ঘটনা জানা। আমি লিখলাম। আশরফ ভাই বললেন, আমি তারিখ, সময়সহ স্যারের ওপর হামলার ঘটনার এতো বিস্তারিত জানলাম কি করে? পরদিন এই স্টোরিটা সম্ভবত লিড হলো। এরপর টানা কয়েকদিন আমি স্টোরিটা করলাম। আমার কাছে মালেক ভাইয়ের নাম্বার ছিল, তার সঙ্গে যোগযোগ করে মামলার সব তথ্য দিলাম। সব মিলিয়ে আশরাফ ভাই খুব খুশি ছিলেন স্টোরিগুলো দেখে। তিনি প্রায়ই আমাকে বাসায় নিয়ে খাওয়াতেন।

যাই হোক, পরে যখন একটি জঙ্গি সংগঠনের হত্যার লিষ্টের তালিকায় হুমায়ুন আজাদের নাম এবং এ সংক্রান্ত কাগজপত্র পাওয়া গেলো, তখন প্রমানিত হলো জঙ্গিরাই স্যারকে হত্যা করতে চেয়েছিল। সে সময় আমি দেশের একটি প্রধান দৈনিকে। একইভাবে সেবারও আজাদ স্যারের নিউজে পুরোনো ঘটনার ইতিহাস টানলাম আমি।

আমার পরিবার এবং শিক্ষকরা শিখিয়েছেন নিজের শতো সমস্যা হরো মানুষের উপকার করবে। এখনো সেটি মানার চেষ্টা করি। বারবার মানুষের কাছ থেকে কষ্ট পাই, তবুও মানুষকেই ভালোবাসি। চেষ্টা করি মানুষের পাশে থাকার। জানি না কতোটা সফল হয়েছি। তবে আমি ব্যাক্তিগতভাবে তৃপ্ত। আমি জানি মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর কি আনন্দ। কিন্তু আফসোস স্যারকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারলাম না। অরেকটা আফসোস আজ পর্যণ্ত স্যারের পরিবারের কেউ ককনো খোঁজ করে সেদিনের ঘটনা জানতে চায়নি। না আমি কোন পুরস্কার চাই না তাদের কাছে। তাদের কেবল জানাতে চাই কি হয়েছিলো সেদিন। কিন্তু আজও তাদের সেই সময় হয়নি।

আমি দীর্ঘদিন ক্যাটস আইয়েল সেই গেঞ্জিটা যেটি ভিজে গিয়েছিল আজাদ স্যারের রক্তে সেটি সংরক্ষন করে রেখেছিলাম। এ বছর হল ছাড়ার সময় আর আনিনি সেটা। তবে স্মৃতিগুলো এখনো আছে জ্বলজ্বেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কালে শামসুন্নাহার আন্দোলন, হ্যাপির মৃতু, ২০০৭ সালের আগস্টের আন্দোলন, শিক্ষকদের গ্রেপ্তার ও মুক্তিসহ নানান ঘটনার প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী আমি। প্রায়ই ভাবি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাগুলো নিয়ে একটা বই লিখি। হয়ে উঠে না আলসেমিতে কিংবা সারাদিনের ব্যস্ততায়। তাই ভাবলাম এবার ব্লগেই লিখে ফেলি ডিজিটাল ডায়েরি। ভালো লাগছে লেখাটা শেষ করে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29108025 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29108025 2010-03-01 19:00:31
দুই পক্ষে সঘের্ষের পর প্রশিকার দখল নিলেন কাজী ফারুক কি অদ্ভুত এক দেশ বাংলাদেশ। যেই বেসরকারি সংস্থার দায়িত্ব ছিলো দেশের উন্নয়ন সেই এনজিও এখন নিজেরাই মারামারিতে ব্যাস্ত।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29076748 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29076748 2010-01-12 01:00:19
আংশিক সত্য, বাকিটা মিথ্যা!
বুসন্ধরা গ্রুপ বাজারে একটি দৈনিক এনেছে। ইতিমধ্যে সেটি অনেকের নজর কেড়েছে। পত্রিকাটির শ্লোগান নয়, আংশিক নয় পুরোপুরি সত্য। পত্রিকাটি তাদের সব বিজ্ঞাপনে জোর দিয়ে বলেছে, তারা সব ঘটনার শতভাগ সত্যি খবর ছাপবে।

কিন্তু আজকে কালের কণ্ঠে সংবাদটি পড়ে মনে হলো, সত্য তো নয়ই, কিভাবে পুরোপুরি একটি সংবাদকে মিথ্যা করা যায় সেটি করা হয়েছে। ওই বৈঠকে বসুন্ধরার গ্রুপ বা ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে মন্ত্রী যে সাহসী বক্তব্য দিয়েছেন তার কিছুই দৈনিকটি ছাপেনি। বরং কৌশলে পুরো ঘটনাকে মিথ্যা করে তুলেছে।
এই লিংকে গিয়ে পুরো সংবাদটি পড়তে পারেন।
(Click This Link)

তাহলে কালের কণ্ঠ যে শতভাগ সত্যির স্লোগান দিলো সেটি যে শতভাগ সত্যি নয়, সেটিই প্রমানিত হলো। কাজেই মানুষকে বোকা বানানোর দরকার নেই। পত্রিকা প্রকাশের দ্বিতীয় দিনেই কালের কণ্ঠ যেভাবে সত্যিকে আড়াল করলো তাতে তাদের উদ্দেশ্য পরিস্কার হয়ে গেলো। আমার মনে হয় পত্রিকাটির স্লোগান দ্বিতীয় দিনেই মিথ্যা হয়ে গেছে। এখন এর স্লোগান হওয়া উচিত, আংশিক সত্য, বাকিটা মিথ্যা।

একটি গণমাধ্যম কখনোই কোন ঘটনার শতভাগ সত্যি বলতে পারে না। এক একটি ঘটনা এক একজনের কাছে একেকরকম। কাজেই শতভাগ সত্যির দাবি করাটা এক ধরনের প্রতারণা। আর বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিটি গণমাধ্যমই কোন না কোন উদ্দেশ্যে বাজারে আসে। সারা বিশ্বেই সেটি হয়েছে। কিন্তু সেই উদ্দেশ্যটি যদি হয়, পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে ব্যাবসা সেটি মঙ্গলজনক। কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয়, ব্যাবসার জন্য পত্রিকা ব্যাবহার সেটি ভয়াবহ বিপদজনক। আমার মনে হয়, কালের কণ্ঠ ব্যাবসা রক্ষার জন্য পত্রিকা বের করছে। এখনো সময় আছে, সেটি না করে সত্যিকারভাবে পত্রিকাটি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। এটিকে ব্যাবসাসফল করে তোলা যেতে পারে। তাহলেই দেশ ও জাতির মঙ্গল হবে না। অন্তপক্ষে বিপদ হবে না সেটি বলতে পারি।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29076361 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29076361 2010-01-11 15:37:32
ক্লাস নাইনের গোলমালে বুঝি তারিখটা ৩১ ডিসেম্বর! তবুও শুভ জন্মদিন...
দুই-এক মিনিট বিষয়টি নিয়ে ভাবার চেষ্টা করলাম। জন্মদিনের তালিকার দিকে তাকালাম। দেখলাম আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককেরও জন্মদিন ৩১ ডিসেম্বর। আরো অনেকেরই... হুমম..

ইউরেকা। ইউরেকা! পাইছি। রহস্য উদ্ধার। ঘটনা তো অন্যখানে। আবিস্কার করলাম ৩১ ডিসেম্বরে এতো মানুষের জন্ম হওয়ার এক গুঢ় রহস্য।

এতোক্ষনেও যারা রহস্যের সমাধান করতে পারেননি তাদের বলছি। এর পেছনে নিরীহ ওই লোকটি যার জন্মদিন ৩১ ডিসেম্বর তাঁর কোন দায় নেই। বরং তাঁর এক ধরনের ক্ষোভই আছে। কারণ মেট্টিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ক্লাস নাইনে যেবার রেজিস্ট্রেশন করতে হয় তখনই ঘটে গেছে সর্বনাশ। আমাদের প্রাণ প্রিয় শিক্ষা গুরুরা আমাদের ভবিষ্যত চাকুরি বাকুরির চিন্তায় যার যেদিনই জন্মতারিখ থাকুক না কেন সব ৩১-১২- করে ফেলেছেন। অনেকের অভিভাবকরাই আবার সজ্ঞানে সন্তানদের চাকুরির ভবিষ্যত চিন্তা করে এই বয়স রহস্যের সমাধান করেছেন।

বাংলাদেশে ক্লাস নাইনে কতো কিশোর যে এভাবে তাঁর সত্যিকার জন্মতারিখ হারিয়েছে তার হিসাব নেই। প্রথমে বিষয়টি অনেকেরই মেনে নিতে কষ্ট হয়। কিন্তু যখন রেজিস্ট্রেশন হয়ে যায় তখন আর করার কিছু থাকে না। আস্তে আস্তে ভুলে যেতে হয় নিজের সত্যিকার জন্মতারিখ। এরপর একসময়ে নিজেও তিনি বিভিন্ন জায়গায় জন্মতারিখ লেখা শুরু করেন ৩১-১২-ওমকু সাল। দেখা যায় ওই তারিখ ধরে অনেকেই জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠায়। কিন্তু তাতে মন ভরে না। মনে হয় কি যেন নেই। আফসোস।

শুধু কি ৩১ ডিসেম্বর? আমাদের প্রিয় শিক্ষক বা অভিভাবকদের আরেকটা প্রিয় তারিখ ১ জানুয়ারি। আপনার ফেইসবুকের বন্ধুদের দেখুন। অনেকেরই জন্মদিন ১ জানুয়ারি। রহস্য সেই ক্লাস নাইন।

এ তো গেলো অন্যদের কথা। কিন্তু আমার। আমার পোড়া কপাল যে আমার এক শিক্ষক আমার সত্যিকারের জন্মদিন ৬ মে'র বদলে ৩১ করলেন। কিন্তু সেটা হলো ৩১ মে। তাঁর মাথা থেকে ৩১--এর ভুত আর নামলো না। যথারীতি অফিসিয়াল জায়গাগুলোতে আমার জন্মতারিখ লিখতে হয় ৩১-০৫-।

দেখা যায়, প্রতি বছর ওইদিনে আমাদের অফিসের এইচআর নামক একটি জঘন্য ডিপার্টমেন্ট ( মাফ করবেন যারা এই মানব সম্পদে কাজ করেন) থেকে কোকিলা কণ্ঠে একজন ফোন দেয় এবং সাত সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গায় জন্মদিনের শূভেচ্ছা জানিয়ে। আমি বিরস কন্ঠে বলি এইটা আমার আসল জন্মদিন না। দয়া করে ৬ মে আমাকে ফোন দেবেন। উনি মিষ্টি করে হেসে বলেন, তিনি ঠিক করে রাখছেন। পরের বছর এই ভুল হবে না।

বিশ্বাস করলেন তাঁর কথা। করতে পারনে। কিন্তু আপনার বিশ্বাস ভেঙ্গে যাবে যখন দেখবেন পরের বছরও সেই একই ভুলই হয়ে যাচ্ছে। যতোদিন বেঁচে থাকবেন ততোদিন ক্লাস নাইনের শিক্ষকদের সেই ভুলের খেসারত আপনাকে দিতেই হবে।

তাই কি আর করা। চলেন তাদের শুভেচ্ছা জানাই যারা জন্ম নিয়েছিলেন ৩১ ডিসেম্বর আর ১ জানুয়ারি। কারো জন্মদিন যদি সত্যিকারই এই দিনে হয় তাকেও শূভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29068704 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29068704 2009-12-31 01:56:27
বিএনপির দুইদিনের কৌতুক অবশেষে শেষ হলো
না এটি কেবলই কৌতুক নয়। সত্যি ঘটনা। গত দুইদিন বাঙ্গালি জাতি সেই কৌতুকটিই দেখলো। খালেদা জিয়া বিএনপির একমাত্র চেয়ারপার্সন পদপ্রার্থী। কাজেই কার সাহস আছে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। একমাত্র প্রার্থী যেহেতু কাজেই তিনিই চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গত দুদিনে বিএনপির নাটকের পর শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় বিএনপির নেতাকর্মীদের উল্লাস আর মন্তব্য ছিলো উল্টো। তারা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। তাই টেলিভিশন ক্যামেরাগুলোর সামনে যখন নাটকের মহড়ার মতো ঘোষনা করা হলো খালেদা জিয়াই বিএনপির চেয়ারপার্সন শুরু হয়ে গেলো নাচানাচি। ভাবটা যেন হাজার হাজার প্রার্থীদের মধ্যে থেকে খালেদা নির্বাচিত হলেন। শুরু হলো মিস্টি বিতরন। রাস্তা বন্ধ করে মিছিল। কে কার চেয়ে বেশি খালেদার স্তুতি করবেন সেই নিয়ে শুরু হলো প্রতিযোগিতা। দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি সেগুলোর আবার ব্যাপক কাভারেজ দিলো। এসব স্তুতিই এদেশে বারবার ডোবায় হাসিনা আর খালেদাকে।

এ ধরনের নাটক না করলেই জাতি খুশি হয়। সবাই জানে আওয়ামী লীগে হাসিনা বিএনপিতে খালেদা দলের হাল ধরবেন। বেশিরভাগ সমর্থকই হয়তো সেটা চায়। কিন্তু এ নিয়ে গত দুইদিন বিএনপি যেভাবে নাটক করলো তাতে গোপালভাড়ও ফেল। বুঝতে বাকি থাকে না এসবই করা সম্মেলনে ভালো পদের জন্য। কিন্তু মজা পেলাম খালেদার প্রতিক্রিয়া দেখে। তিনি বললেন, তাকে চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করায় তিনি ব্যাপাক খুশি। ভবিষ্যতেও দলকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তাঁর ভাবখানা যেন, হাজারখানেক প্রার্থীর মধ্যে থেকে নির্বাচন করে তিনি জিতে এসেছেন।

রাজনীতির এসব কৌতুক যে কবে এ দেশ থেকে বন্ধ হবে কে জানে? এ দেশে গণতন্ত্র কয়েকজন নেতা নেত্রীর হাতে বন্দি। এখানে সম্মেলন, কাউন্সিল এসব সাজানো নাটক। সেই নাটকের মঞ্চায়নটা স্রেফ কৌতুক ছাড়া আর কি ?

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29053633 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29053633 2009-12-05 00:21:51
মাকে হারানোর এক বছর...
বিশ্বাস করতে আসলেই কষ্ট হয় এমনটি আর হবে না এ জীবনে। আর কখনোই আমার মা আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে না। কি দুরন্ত উচ্ছল জীবনই না ছিল আমার। এই একটি ঘটনা আমাকে কতো বদলে দিয়েছে। মাকে হারিয়ে আমি যেন হঠাৎ বড় হয়ে গেছি। প্রতিটা দিনই মায়ের কথা মনে হয়, একা একা গুমরে কাঁদি।

গত বছর কোরবানির ঈদের কয়েকদিন আগে আমরা মাকে হাসপাতালে ভর্তি করি। সুস্থ্য একজন মানুষ, সামান্য একটি সমস্যার কারনে হাসপাতালে। আমরা কেউই বুঝতেই পারিনি এভাবে হুট করে মা আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। হাসপাতালে তিনদিন সবই ভালো। কিন্তু ১ ডিসেম্বর কিছু বুঝে উঠার আগেই হঠাৎ আইসিইউতে নিতে হয়। দুদিন সেন্ট্রাল হাসপাতালের আইসিইউতে থাকার পর আমার মা চলে গেলেন আমাদের চোখের জলে ভাসিয়ে। আমরা কোনভাবেই মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তার এই হঠাৎ চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না।

আমার মা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ার সুযোগ তার হয়নি বিয়ের কারনে। মার সহপাঠীদের কাছে শুনেছি তিনি খুবই ভালো ছাত্রী ছিলেন। ক্লাসের শীর্ষ ছাত্রী ছিলেন। অনেক আদারে কেটেছে তাঁর ছোটবলা। তাঁর পরিবার ছিলো ফরিদপুরের এককালের শীর্ষ কয়েকটি পরিবারের একটি। মায়ের মনটা ছিলো বিশাল। চট্টগ্রামে আমার বাবার সরকারী চাকুরি। সরকারী কলোনীতে আমরা যে বাসায় থাকতাম সেখানে একবার যে গেছে সে মায়ের রান্না খেয়ে, তার আন্তরিকতা দেখে ভক্ত হয়ে গেছে। মা মানুষকে খাইয়ে খুব আনন্দ পেতেন। সবসময় তিনি বাসায় অনেক লোকজন, উৎসব দেখতে পছন্দ করতেন। আমরা দিন নেই, রাত নেই বাসায় বন্ধুবান্ধব নিয়ে যেতাম। মা কখনো বিরক্ত হয়ে বলতেন না অসময়ে কেন এতো বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসিস? এমন অসাম্প্রদায়িক মানুষ, উচ্চ মনের মানুষ আমি জীবনে খুব কম দেখেছি।

মা কখনো গরীব বা ভিক্ষুকদের না বলতেন না। কলোনীতে থাকার কারনেই বাসায় সবসময় ভিক্ষুক আসতো। আমরা খুব বিরক্ত হতাম। কিন্তু মা হাসিমুখে কিছু না কিছু দিয়ে তাদের বিদায় করতেন। তাঁর জীবনে এমন দিন খুব কমই গেছে যেদিন তিনি কোন গরিব বা ভিক্ষুককে খাওয়াননি। মানুষের জন্য তাঁর ছিলো চরম সহমর্মিতা। কারো কোন কষ্টের কথা শুনলেই মা কাঁদতেন। তাদের স্বান্ত্বনা দিতেন।

মা মারা যাওয়ার পর আমার ছোট বোন জানালো, কয়েকদিন আগে নাকি সকাল ১১ টার দিকে এক ভিক্ষুক আমাদের বাসায় এসে মাকে বললো তার খুব খিদে লেগেছে। ১১ টার সময় রান্না থাকার কথা নয়, তাই বাসায় ভাত নেই। কিন্তু আমার মা গরম ভাত রান্না করে তাকে খাইয়ে বিদায় করলেন। এমন হাজারো ঘটনা আছে আমার মায়ের জীবনে। ছুটিতে বাসায় গেলেই মা আমার কাছে বলতেন হাসান টাকা দে তো। আমি বলতাম মা কি করবে? তিনি হাসতেন। সেই টাকা চলে যেতো গরীবদের কাছে। আমরা বাসায় আছি-ড্রয়িং রুমে টিভি দেখছি-হঠাৎ দেখি কোন এক ভিক্ষুক। আমরা তাকে বলি মাফ করো। সে বলে, তোমার মাকে ডাকো। তোমার মা আমাদের কখনো খালি হাতে বিদায় করে না। আমরা চুপসে যাই তখন। মাঝে মাঝে এ নিয়ে মায়ের সাথে ঝগড়াও বাঁধে। বলি মা ভিক্ষকু-গরিব এরা কি তোমার বান্ধবী? সবসময় এতো জ্বালাতন করে কেন? মা হাসে। প্রতিবেলা রান্নার আগে মা পুরনো ভাত বাইরে কাক বা শালিককে দিতেন। মার রান্না করার সময় রান্নাঘরের সামনে সবসময় পাখি থাকতো। মা প্রচুর বই পড়তেন। তাঁর কারনেই ছোটবেলা থেকে আমরা ভাই বোন প্রুচর বই পড়তাম।

আমাদের পরিবারে দুঃখ কষ্ট সেভাবে ছিল না। বেশিরভাগ সময়েই ছিল আনন্দ উচ্ছলতা। কিন্তু এতো আনন্দের মধ্যেই আমার মাটা চলে গেলো আমাদের ছেড়ে। আমরা ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারিনি সে এভাবে হঠাৎ করে চলে যাবে। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর সকাল সোয়া সাতটায় আমার মা মারা যায়। সেন্ট্রাল হাসপাতালে আমার ছোটবোনটার কান্না দেখে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল কষ্টে। আমরা দুই ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারনে ওই বাসায় বেশি থাকতো। ওর কতো আফসোস মাকে নিয়ে। ও হাসপাতালে মাকে সুস্থ্যে দেখে, রাতে খাইয়ে বাবার সাথে চট্টগ্রাম গিয়েছিল ভর্তি হতে। এসে দেখে মা আর নেই।

এসএসসি পাস করার পর কলেজ, এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১০ বছর ধরে আমি বাসার বাইরে। এরপর আবার সাংবাদিকতা। তাই বছরে খুব কম সময় বাসায় গিয়ে থাকতে পারতাম। কিন্তু যখন যেতাম মা আমায় নিয়ে ব্যাস্ত হয়ে উঠতেন। কি খাওয়াবেন কি করবেন দিশা পেতেন না। আমি ফেরার সময় মায়ের চোখ ছলছল করতো। ভাবতে কষ্ট হয়, সেসব দিন আর কখনো ফিরে আসবে না।

মায়ের কথা মনে করে আমার বাবা কখনো আমাদের সামনে মন খারাপ করেন না। আমরা বুঝি প্রতিমুহুর্তে কতোটা কষ্ট তিনি পান। আমি আমার ছোটবোনের সামনে কাঁদতে পারি না মাকে নিয়ে। কিন্তু আমি বুঝি আমরা সবাই কাঁদি সবাই সবাইকে আড়াল করে। এই কান্না কখনোই হয়তো শেষ হবে না।

ফরদেপুরের বালিয়াডাঙ্গী ঈদ গা মাঠের কবরে এখন আমার মা শুয়ে আছেন। তিনি এখন সব কিছুর উর্ধ্বে। মা কি দেখছে তাঁর সাজানো পরিবারের এখন কি অবস্থা। এক বছর পেরিয়ে গেলেও কোনভাবেই মায়ের হঠাৎ চলে যাওয়া আমরা মেনে নিতে পারি নাই। ভাবলেই তাই কষ্ট হয়। আল্লাহ তাকে শান্তি দিক। মা আমরা সবাই তোমাকে খুব ভালোবাসি। তুমি ভালো থাকো মা। ভালো থাকো।



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29052719 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29052719 2009-12-03 01:52:28
জাতির পাপ মোচনের দিন আজ
জিয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনের মূল নায়ক। বিএনপি সমর্থকরা হয়তো দিব্যি এই সত্য অস্বীকার করবেন। ঠিক আছে মানলাম, জিয়া কিছুই জানতেন না। তাহলে কেন তিনি এই খুনিদের বিভিন্ন জায়গায় চাকুরি দিয়েছিলেন। কি অদ্ভুত। আমরা কতোগুলো খুনিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পাঠিয়েছি। কি লজ্জা। যারা হত্যাকারী তারাই কিনা করবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব। বাংলাদেশ কি তাহলে খুনির দেশ?

সত্যি হয়তো তাই। বাংলাদেশ যে খুনির দেশ সেটা প্রমানিত হয়েছিল। ৭৫ এর পর যারাই ক্ষমতায় এসেছে তারাই খুনীদের পুরস্কৃত করেছে। গণতান্ত্রিক নেত্রী খালেদা জিয়া তো আরো একধাপ এগিয়ে তাদের প্রমোশনও দিয়েছেন। ৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ কুখ্যাত সেই আইন বাতিল করে যা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নামে পরিচিত ছিলো। এরপরই শুরু হয় হত্যার বিচার কাজ। হাইকোর্ট, স্রপীম কোর্ট হয়ে আজ চুড়ান্ত রায় দেবে আপিল বিভাগ।

বাঙ্গালি জাতি যারা এদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বাস করে, স্বাধীনতা বিশ্বাস করে তারা সবাই অপেক্ষায় আছে আদালত খুনিদের সর্ব্বোচ্চ শাস্তি দেবে। আমরাও সেই অপেক্ষায। সকাল হলেই আদালতে যাবে ঐতিহাসিক এই রায়ের সংবাদ কাভার করতে। আশা করি জাতির পাপ মোচন হবে আজ।

২১ বছর পর বঙ্গবন্ধু হত্যার মামলা, ১৩ বছর ধরে বিচার। আমরা আশা করি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শেষেই শুরু হোক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ, চার নেতার হত্যাকারীদের বিচার কাজ, কর্ণেল তাহের হত্যার বিচার কাজ, বের করা হোক জিয়ার খুনিদেরও। বেরিয়ে আসুক সব ইতিহাস। আমরা আর খুনি জাতি হিসেবে পরিচিত হতে চাই না।




]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29045838 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29045838 2009-11-19 00:58:48
গোলাম আযম-নিজামীর সন্তানরা কি কেউ মাদ্রাসায় পড়ছে?
আমার মনে আছে, ক্লাস সিক্সে উঠার পর ধর্ম নামক একটি বিষয় যোগ হলো স্কুলে। আমি দেখতাম এই ক্লাসটি শুরু হলে আমার কিছু বন্ধু বান্ধব আলাদা হয়ে অন্য ক্লাসে যেতো। তাদের আলাদা ক্লাসে পাঠিয়ে যে শিক্ষক আমাদের ক্লাস নিতে আসতেন আমরা তাকে বলতাম হুজুর স্যার। আমি দেখেছি স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে সবচেয়ে বাজে স্যার হলো হুজুর স্যার। কোন কারণ ছাড়াই এরা বাচ্চাদের পেটায়। প্রায় সব স্কুলেই একই দৃশ্য।

যাই হোক, যে কথা বলছিলাম। শিশু বয়সে এই যে ধর্ম ক্লাসে আলাদা হয়ে যাওয়া, বাচ্চাদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া, তুমি মুসলমান, তুমি হিন্দু সেটাই বড় হয়ে মানুষকে বিভক্ত করে। সংঘর্ষের সূত্রপাত করে। এসব বাদ দিয়ে একটা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যাবস্থা গড়ে উঠলে সমস্যাটা কি?

ভেবে দেখেন, মাদ্রাসা থেকে যারা পাস করে, তাদের ডিগ্রি তো তাদের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই ডিগ্রি নিয়ে কোথাও চাকুরি মেলে না। তারা সেই মাদ্রসার শিক্ষকই হন। কাজেই মাদ্রাসা শিক্ষাই বাদ দেওয়া উচিত। তবে কেউ যদি ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করতে চায়, তার জন্য সে সুযোগ থাকতেই পারে। উচ্চ শিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও সেই সুযোগ আছে।

আমরা গত ৩৮ বছরে দেখেছি প্রতি সরকারই যাওয়ার শেষ সময়ে একটি শিক্ষানীতি করে যায়, যাতে সেটি বাস্তবায়নের কোন সুযোগই না থাকে। বর্তমান সরকার যতো খারাপ কাজই করুক, ক্ষমতায় এসেই একটি মোটামুটি ভালো শিক্ষানীতি করেছে। এটি বাস্তবায়নের যথেষ্ট সুযোগ আছে। এখুনি কাজ শুরু করলে ভবিষ্যত নিশ্চয়ই ভালো।

কাজেই ধর্ম নিয়ে যারা রাজনীতি করেন, তাদের বলছি-দয়া করে মানুষের স্বার্থ চিন্তা করুন। আমি জানি আপনাদের এসব বলে কোন লাভ নেই। আপনারা কেন ধর্মকে কেন্দ্র করে শিক্ষা ব্যাবস্থা চান সেটি তো আমরা জানি। আপনারা এসব বলেন রাজনীতির স্বার্থে। মাদ্রাসার কিছু ওগা মগা না থাকলে আপনাদের হয়ে মাঠে থাকবে কে? তাই তো নিজে মোল্লা সেজে নিজের ছেলেটাকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পাঠিয়ে রাজনীতি করেন। মাদ্রাসা শিক্ষার কথা বলেন।

যেসব গর্দভ এসব কাঠ-মোল্লাদের পেছনে শ্লোগান দেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন- একজন নেতার নাম বলুন তো আপনাদের যিনি তাঁর সন্তানকে ধর্ম শিক্ষা দিতে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছেন। এমন একজন নেতার নাম বলুনতো আপনাদের যিনি তাঁর সন্তাকে ইসলাম বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা দিয়েছেন। বলতে পারবেন। পারবেন না। যদি না পারেন তাহলে নোংরা রাজনীতি ছাড়ুন।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29034952 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29034952 2009-10-31 00:18:08
জীবন সংগ্রামী মামুন এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
মামুন হায়দার ওরফে রানার সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে। হঠাৎ একদিন অফিসে গিয়ে দেখি এক বাউল আমাদের সঙ্গে কাজ করতে এসেছে। বিশাল বিশাল চুল। লম্বা দাঁড়ি। নাম জানালো মামুন। কথায় কথায় জানলাম, আমার পাঁচ ব্যাচ সিনিয়র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েল সাংবাদিকতার ছাত্র।

প্রথম দিনেই, মামুনের সহজ স্বীকারোক্তি-ভাই আমি সাংবাদিকতার ছাত্র। পড়াশোনা করে রেজাল্ট ভালো করেছি। কিন্তু জীবনে এই প্রথম পত্রিকায় কাজ করতে এলাম। একুট সাহায্য করবেন। প্রথম দিনেই এমন সহজ স্বীকারোক্তি আমার দারুণ লাগলো।

শুরুতে মামুনকে দেওয়া হলো ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে। বেচারা আন্তর্জাতিক নিউজ করে অভ্যস্ত ছিল না। ফলে মাঝে মাঝেই সমস্যায় পড়তো। আমি চেষ্টা করতাম সাহায্য করার। যাই হোক, ধীরে ধীরে মামুন প্রতিভার স্বাক্ষর রাখলো। রাতের শিফটে মূল বার্তা বিভাগে চলে এলো আমার সঙ্গে। বয়সে পাঁচ বছরের বড় হওয়ার পরেও আমার সঙ্গে তাঁর চরম ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেলো। এতো বেশি ঘনিষ্ঠতা যে আমি ওকে তুই করে বলতে শুরু করলাম। সেও তাই। অথচ মামুনের বন্ধুরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বড় ভাই। তাদের সবাইকে আমি আবার আপনি বলি।

যাই হোক সাড়ে তিন বছর আমরা একসঙ্গে কাজ করলাম। আমি এই তিন বছরে মুগ্ধ হয়ে দেখেছি একজন সংগ্রামী মানুষকে। আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা। অনেক বেশি স্বচ্ছলতা হয়তো ছিলো না আমাদের, কিন্তু জীবনে সেভাবে কখনো অভাবও ছিল না। কাজেই আনন্দেই কেটেছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর দ্বিতীয় বর্ষ থেকে আমি সাংবাদিকতা করি। বাবার পাঠানো টাকা-এরপর বেতন। সব মিলিয়ে মহা আনন্দে ছিলাম। কাজেই বলতে গেলে আমি টাকা উড়াতাম। উড়াতাম মানে বেহিসেবি খরচ করতাম।

কিন্তু মামুনকে আমি দিনের পর দিন এক ড্রেস পরে অফিসে আসতে দেখতাম। একটাই ফতুয়া। আমার খুব ইচ্ছে করতো, ওকে একটা ফতুয়া কিনে দেই। লজ্জায় বলতে পারতাম না। কারণ, ও আমার কলিগ। কি জানি কে মনে করে? মামুন বোধহয় বিষয়টা বুঝতে পেরেছিল। কথায় কথায় মামুন একদিন আমাকে বললো, ‌তুই তো কখনো অভাবে পড়িসনি। টাকার অভাবে পড়িসনি। তুই অভাব বুঝবি কি?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুই-তো আমার সমান বেতন পাস? টাকা কি করিস? মামুন জানালো ওর জীবন সংগ্রামের ইতিহাস। ওর বাবা যাত্রা পালা করতো। বছরে ছয় মাস সে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ান। তিনি সত্যিকারের শিল্পি মানুষ। তাই আর্থিক অস্বচ্ছলতা ছিল চরম। জমি জমা বিক্রি করতে হয়েছে। ফলে ওর বাবার অনেক ঋন হয়ে গেছে। তাই বেতনের বেশিরভাগ টাকা ও বাড়িতে পাঠায় সেই ঋন শোধের জন্য। এছাড়া বোনের পড়াশোনার খরচ চালায়।

মামুন জানালো, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেক দিনই ওর খাবার টাকা থাকতো না। দিনের পর দিন ও সকালে না খেয়ে থেকেছে। সকাল দুপরের খাবার একবারে খেয়েছে। ওর এসব গল্প শুনে আমার চোখ ভিজে এলো। পাছে ও দেখে ফেলে তাই কাঁদলাম না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি কতো টাকা বন্ধুদের নিয়ে উড়িয়েছি আর ওর এতো কষ্ট। মামুনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো।

যাই হোক, একদিন দুইদিন অফিস থেকে ওকে আমার জহরুল হক হলে নিয়ে আসতাম। আমাদের হলের পুকুর পাড়ে বসে ও গান গাইতো। লালন গীতি। ও অসাধারণ গান গাইতো। একসঙ্গে শিপন ভাইয়ের বাসায় খেতে যাওয়া, দিনের পর দিন আড্ডা, লেট নাইট, ঝগড়া-অভিমান আরো কতো কি করে দেখতে দেখেতে তিন বছর কেটে গেলো।

মাষ্টার্সের পড়াশোনার কারণেই আমি মাঝখানে কয়েক মাস দেশে ছিলাম না। মে মাসে দেশে এসে শুনি মামুন প্রথম আলো ছেড়ে কালের কন্ঠে চলে গেছে। সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ আরো কয়েকজন। ওদের অনেক বেতন। ও সিনয়ির সাব এডিটর। আমাদের কাজের ক্ষেত্র আলাদা হয়ে গেলো। তবে এরপরও নিয়মিত যোগযোগ ছিলো।

ক'দিন আগে হঠাৎ মামুন জানালো, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেবে। ২৯ অক্টোবর ওর ভাইভা। মামুন অনার্স ফার্ষ্ট, মাষ্টার্সে রেকর্ড মার্কস নিয়ে ফার্স্ট। কাজেই মেধাবী মামুন নিজ যোগ্যতায় আজ ২৯ অক্টোবর ভাইভা দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলো। সিন্ডেকেটেও পাস হয়ে গেছে। শনিবার মামুন জয়েন করবে। মামুনের বহুদিনের স্বপ্ন সফল হলো। আমার খুবই ভালো লাগছে।

মামুন জানানোর আগেই আমি জানলাম ও শিক্ষক হয়ে গেছে। মামুনকে শুভেচ্ছা জানালাম ফোন করে। আমার খুব ভালো লাগছে। সংগ্রামী এক বন্ধুর বিজয় দেখলাম। মামুন তুমি এগিয়ে যাও। তোমায় লাল সালাম।

(পোস্টটি কাল গভীর রাতে দিয়েছিলাম। অনেকেরই চোখে পড়েনি। তাই আবার দিলাম) ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29034654 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29034654 2009-10-30 15:01:43
সংগ্রামী মামুন এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
মামুন হায়দার ওরফে রানার সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে। হঠাৎ একদিন অফিসে গিয়ে দেখি এক বাউল আমাদের সঙ্গে কাজ করতে এসেছে। বিশাল বিশাল চুল। লম্বা দাঁড়ি। নাম জানালো মামুন। কথায় কথায় জানলাম, আমার পাঁচ ব্যাচ সিনিয়র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েল সাংবাদিকতার ছাত্র।

প্রথম দিনেই, মামুনের সহজ স্বীকারোক্তি-ভাই আমি সাংবাদিকতার ছাত্র। পড়াশোনা করে রেজাল্ট ভালো করেছি। কিন্তু জীবনে এই প্রথম পত্রিকায় কাজ করতে এলাম। একুট সাহায্য করবেন। প্রথম দিনেই এমন সহজ স্বীকারোক্তি আমার দারুণ লাগলো।

শুরুতে মামুনকে দেওয়া হলো ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে। বেচারা আন্তর্জাতিক নিউজ করে অভ্যস্ত ছিল না। ফলে মাঝে মাঝেই সমস্যায় পড়তো। আমি চেষ্টা করতাম সাহায্য করার। যাই হোক, ধীরে ধীরে মামুন প্রতিভার স্বাক্ষর রাখলো। রাতের শিফটে মূল বার্তা বিভাগে চলে এলো আমার সঙ্গে। বয়সে পাঁচ বছরের বড় হওয়ার পরেও আমার সঙ্গে তাঁর চরম ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেলো। এতো বেশি ঘনিষ্ঠতা যে আমি ওকে তুই করে বলতে শুরু করলাম। সেও তাই। অথচ মামুনের বন্ধুরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বড় ভাই। তাদের সবাইকে আমি আবার আপনি বলি।

যাই হোক সাড়ে তিন বছর আমরা একসঙ্গে কাজ করলাম। আমি এই তিন বছরে মুগ্ধ হয়ে দেখেছি একজন সংগ্রামী মানুষকে। আমার বাবা সরকারি কর্মকর্তা। অনেক বেশি স্বচ্ছলতা হয়তো ছিলো না আমাদের, কিন্তু জীবনে সেভাবে কখনো অভাবও ছিল না। কাজেই আনন্দেই কেটেছে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর দ্বিতীয় বর্ষ থেকে আমি সাংবাদিকতা করি। বাবার পাঠানো টাকা-এরপর বেতন। সব মিলিয়ে মহা আনন্দে ছিলাম। কাজেই বলতে গেলে আমি টাকা উড়াতাম। উড়াতাম মানে বেহিসেবি খরচ করতাম।

কিন্তু মামুনকে আমি দিনের পর দিন এক ড্রেস পরে অফিসে আসতে দেখতাম। একটাই ফতুয়া। আমার খুব ইচ্ছে করতো, ওকে একটা ফতুয়া কিনে দেই। লজ্জায় বলতে পারতাম না। কারণ, ও আমার কলিগ। কি জানি কে মনে করে? মামুন বোধহয় বিষয়টা বুঝতে পেরেছিল। কথায় কথায় মামুন একদিন আমাকে বললো, ‌তুই তো কখনো অভাবে পড়িসনি। টাকার অভাবে পড়িসনি। তুই অভাব বুঝবি কি?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুই-তো আমার সমান বেতন পাস? টাকা কি করিস? মামুন জানালো ওর জীবন সংগ্রামের ইতিহাস। ওর বাবা যাত্রা পালা করতো। বছরে ছয় মাস সে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ান। তিনি সত্যিকারের শিল্পি মানুষ। তাই আর্থিক অস্বচ্ছলতা ছিল চরম। জমি জমা বিক্রি করতে হয়েছে। ফলে ওর বাবার অনেক ঋন হয়ে গেছে। তাই বেতনের বেশিরভাগ টাকা ও বাড়িতে পাঠায় সেই ঋন শোধের জন্য। এছাড়া বোনের পড়াশোনার খরচ চালায়।

মামুন জানালো, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেক দিনই ওর খাবার টাকা থাকতো না। দিনের পর দিন ও সকালে না খেয়ে থেকেছে। সকাল দুপরের খাবার একবারে খেয়েছে। ওর এসব গল্প শুনে আমার চোখ ভিজে এলো। পাছে ও দেখে ফেলে তাই কাঁদলাম না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি কতো টাকা বন্ধুদের নিয়ে উড়িয়েছি আর ওর এতো কষ্ট। মামুনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো।

যাই হোক, একদিন দুইদিন অফিস থেকে ওকে আমার জহরুল হক হলে নিয়ে আসতাম। আমাদের হলের পুকুর পাড়ে বসে ও গান গাইতো। লালন গীতি। ও অসাধারণ গান গাইতো। একসঙ্গে শিপন ভাইয়ের বাসায় খেতে যাওয়া, দিনের পর দিন আড্ডা, লেট নাইট, ঝগড়া-অভিমান আরো কতো কি করে দেখতে দেখেতে তিন বছর কেটে গেলো।

মাষ্টার্সের পড়াশোনার কারণেই আমি মাঝখানে কয়েক মাস দেশে ছিলাম না। মে মাসে দেশে এসে শুনি মামুন প্রথম আলো ছেড়ে কালের কন্ঠে চলে গেছে। সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ আরো কয়েকজন। ওদের অনেক বেতন। ও সিনয়ির সাব এডিটর। আমাদের কাজের ক্ষেত্র আলাদা হয়ে গেলো। তবে এরপরও নিয়মিত যোগযোগ ছিলো।

ক'দিন আগে হঠাৎ মামুন জানালো, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেবে। ২৯ অক্টোবর ওর ভাইভা। মামুন অনার্স ফার্ষ্ট, মাষ্টার্সে রেকর্ড মার্কস নিয়ে ফার্স্ট। কাজেই মেধাবী মামুন নিজ যোগ্যতায় আজ ২৯ অক্টোবর ভাইভা দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলো। সিন্ডেকেটেও পাস হয়ে গেছে। শনিবার মামুন জয়েন করবে। মামুনের বহুদিনের স্বপ্ন সফল হলো। আমার খুবই ভালো লাগছে।

মামুন জানানোর আগেই আমি জানলাম ও শিক্ষক হয়ে গেছে। মামুনকে শুভেচ্ছা জানালাম ফোন করে। আমার খুব ভালো লাগছে। সংগ্রামী এক বন্ধুর বিজয় দেখলাম। মামুন তুমি এগিয়ে যাও। তোমায় লাল সালাম।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29034378 http://www.somewhereinblog.net/blog/hasandublog/29034378 2009-10-30 00:31:10