রাইট হো, জীভস
রূপান্তরঃ শরীফুল হাসান
চার
বারট্রাম উষ্টার সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, সে কাউকে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেনা, আমার স্রিতিকথায় লক্ষ্য করবেন আমি প্রায়ই বলি আন্ট ডাহলিয়া একেবারে সাভাবিক একজন মানুষ।
ইনিই তিনি যদি সবার মনে থাকে, যে বুড়ো টম ট্রাভারস কে বিয়ে করেছেন, সময়টা ছিল ব্লুবটল যখন কেম্ব্রিজশায়ার জিতেছিল, আর আমাকে উনি যখন উনার পত্রিকায় ওই আটিকেলটা লিখিয়েছিলেন ‘সুসজ্জিত পুরুষেরা কি পড়ছে’ তখনকার কথা। উনি একজন বিশাল, সরিদয় আত্তা, যার সাথে টুকটাক কথা বলা সবসময়ই আনন্দের। আমার আন্ট আগাথা সবার জন্যই মুরতিমান আতংক। কিন্তু আন্ট ডাহলিয়া পুরো তার বিপরীত।
কাজেই বুঝতেই পারছেন, এই সাতসকালে উনার হাজির হওয়াটা আমার জন্য যথেষ্টই আশ্চরযজনক। আমি বলতে চাচ্ছি, আমি উনার ওখানে অনেকবারই গিয়েছি আর তিনি আমার সভাব জানেন। তিনি এটা অবশ্যই জানেন আমি সকালে চা না খেয়ে আমার দিনই শুরু করিনা।
আর, লন্ডনে এখন উনার কি কাজ থাকতে পারে? এটাই আমি নিজেকে প্রশ্ন করছিলাম। সাত সপ্তাহ পর যখন একজন করিতকরমা গ্রিহবধু বাড়ি ফেরে, কেউ নিসচয় আশা করেনা সে ফিরে আসার পরদিনই আবার ছুটে বেড়াবে। এটা ভাবাই সাভাবিক যে যে বাড়িতেই থাকবে, সামীর দেখাশোনা করবে, রাধুনির সাথে রান্না নিয়ে পরামরশ করবে, বেড়ালকে খাওয়াবে, এককথায় বাসায়ই থাকবে। আমার চোখ ঢুলুঢুলু, যদিও চেষ্টা করছি দুই চোখের পাতা আলাদা রেখে খুব গম্ভির ভঙ্গীতে তাকাতে।
উনি এইসব খেয়ালই করলেন না।
-বারটি, জেগে উঠো, হাদারাম, তিনি চিতকার দিলেন যা আমার দুচোখ ভেদ করে মাথার ভেতরে চলে গেল।
আমি উনার দিকে আবার তাকালাম, একটু বিরক্ত দৃষ্টিতে, উনি লক্ষ্য করলেন মন হয়।
-“এইভাবে মিটমিট করে তাকিয়ে কোন লাভ নেই” উনি বললেন, “আমি অবাক হয়ে ভাবি বারটি”, উনি এমনভাবে বলছেন আমার দিকে তাকিতে গুসি যেমন তার নিওটদের দিকে তাকায় “তোমার যদি বিন্দুমাত্র ধারনা থাকতো তোমাকে এখন কেমন দেখাচ্ছে?কাল সারারাত বাইরে গড়াগড়ি খেয়েছো নাকি?
-“আমি একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম” আমি বললাম ঠান্ডা সরে, “পঙ্গো টুইস্লেটনের জন্মদিন। আমি নিশ্চয়ই পঙ্গোকে ফিরিয়ে দিতে পারিনা।“
-ঠিক আছে, উঠে পড়ো আর তৈরি হয়ে নাও।
মনে হলো উনার কথা আমি শুনতে পাইনি।
-উঠবো আর তৈরি হবো?
-হুম।
আমি বালিসে পাশ ফিরে একটু গুঙ্গিয়ে উঠলাম আর ঠিক এই সময় জীভস ঘরে ঢুকলো আমার প্রিয় চা নিয়ে। ডুবন্ত মানুষ যেমন খড়কুটো পেলে আকড়িয়ে ধরে আমিও যেন হাতে প্রান পেলাম। এক-দুই চুমুকেই যেন চাঙ্গা হয়ে উঠলাম, অবশ্য চাঙ্গা বলা ঠিক হবেনা, পঙ্গোর অনুষ্ঠান থেকে ফিরে একটু চা খেয়েই চাঙ্গা হওয়া অসম্ভব।কিন্তু কিছুটা চাঙ্গা হলাম বলেই বুঝতে পারলাম সামনে খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে।
-এটা কি, আন্ট ডাহলিয়া? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
- দেখতে তো চা মনে হচ্ছে, উনি বললেন, কিন্তু তুমিই ভালো জানো, কারন তুমি এটা খাচ্ছো।
- কাপে কি আছে তা নিয়ে তো বলছিনা, আমি সবকিছুর কথা বলছি।তুমি ঝড়ের মত এলে আর এখন বলছো উঠো আর তৈরি হও।
-ঠিক আছে, আমি ঝড়ের মতো এসেছি, কারন আমার টেলিগ্রামে তো কোন কাজ হচ্ছিলো না এবং আমি তোমাকে বলেছি উঠো আর তৈরি হও কারন আমি চাচ্ছি তুমি উঠবে আর তৈরি হবে। আমি তোমাকে নিয়ে যাতে এসেছি। তোমার অনেক সাহস, তুমি বলেছো তুমি সাম্নের বছর বা তার পরের বছর যে কোন সময় আসবে।তুমি এক্ষুনি আসছো। তোমার জন্য কাজ আছে।
-কিন্তু আমি তো কাজ চাইনা।
-তুমি কি চাও,আর তুমি যা পেতে যাচ্ছো দুটো সম্পুর্ন ভিন্ন জিনিস। ব্রিঙ্কলী কোর্টে তোমার জন্য কাজ অপেক্ষা করছে।বিশ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নাও।
- কিন্তু আমার মনে হচ্ছে বিশ মিনিটের ভেতর আমি তৈরি হতে পারবোনা। অসুস্থ লাগছে।
মনে হচ্ছে উনি বিবেচনা করছেন।
-আচ্ছা, উনি বললেন, মানবিকতার খাতিরে তোমাকে এক-দুই দিন সময় দেয়া যেতে পারে। ঠিক আছে, তিরিশ তারিখের মধ্যে আমি তোমাকে আশা করছি।
-আচ্ছা, বাদ দাও, এসব কি হচ্ছে? কাজ বলতে তুমি কি বোঝাতে চাচ্ছো? কাজ কেন? কি ধরনের কাজ?
- এক মিনিটের জন্য কথা বন্ধ করো, আমি বলছি তোমাকে। কাজটা খুব সোজা আর মজার। তোমার ভালো লাগবে। তুমি কি মার্কেট স্নডসবুরি গ্রামার স্কুলের নামে শুনেছো?
-কখনই না।
- এটা স্নডসবুরি মার্কেটের একটা গ্রামার স্কুল।
আমি কোনমতে বললাম যে আমি শুনে পুলকিত হয়েছি।
-আচ্ছা, আমি কি করে বুঝব তোমার মতো একজন ব্যাপারটা ধরতে পারবে এতো তাড়াতাড়ি? উনি প্রতিবাদ করলেন মনে হলো। ‘তুমি যা ভেবেছো তাই, মার্কেট স্নডসবুরি গ্রামার স্কুল হচ্ছে স্নডসবুরি মার্কেটের গ্রামার স্কুল, আমি স্কুলের গভর্নিং বোর্ডের একজন সদস্য’
- তুমি বলতে চাইছো অনেক নারী সদস্যার মতো তুমিও একজন।
-না, তা না, শোন গাধা, ইটনে বোর্ড অফ গভর্নরস আছে না? সেরকমই মার্কেট স্নডসবুরি গ্রামার স্কুলেরও বোর্ড অফ গভর্নরস আছে, আমি ঐ বোর্ডের সদস্য।গ্রীষ্মকালীন পুরষ্কার বিতরনের দ্বায়িত্ব এবার আমার উপর। অনুষ্ঠানের তারিখ পড়েছে এই মাসের একত্রিশে। এবার বুঝেছো?
আমি চায়ে চুমুক দিলাম আর মাথাটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করলাম। পঙ্গোর জন্মদিনের পার্টির পরও তাই বিষয়টা আমি যেন ধরতে পারলাম।
-আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি। তুমি যা বলতে চাইছো তা হলো... মার্কেট... স্নডসবুরি... গ্রামার স্কুল...... বোর্ড অফ গভর্নরস...... পুরষ্কার বিতরনী...ঠিক না, কিন্তু এখানে আমার ভুমিকা কি?
- তুমি পুরষ্কার বিতরন করবে।
আমি ঢোক গিললাম। উনার কথাও কোন অর্থ খুজে পেলাম না।
-আমি?
-তুমি।
আমি আবার ঢোক গিললাম।
-তুমি নিশ্চয়ই আমাকে বলছো না।
- আমি অবশ্যই তোমাকে বোঝাচ্ছি।
আমি তৃতীয়বার ঢোঁক গিললাম।
-তুমি আমার পা ধরে এভাবে টানছো কেন?
- আমি তোমার পা ধরে তাঞ্ছি না। তোমার ঐ নোংরা পা ধরার জন্য কিছুই আমাকে বাধ্য করতে পারবে না। আমাদের এলাকার যাজককে আমরা ঠিক করেছিলাম শুরুতে, কিন্তু আমি যখন কানেস থেকে ফিরলাম শুনলাম উনি অসুস্থ আর আমাদের অনুষ্ঠান থেকে উনার নাম প্রত্যাহার করতে চিঠি দিয়েছেন। বুঝতেই পারছো কি রকম পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম আমি। সবাইকেই ফোন করেছি কিন্তু কেঊই রাজি হচ্ছেনা। তখন হতাট তোমার কথা মনে পড়লো।
আমি শুরু থেকে সব ভাবলাম। বারট্রাম ঊষ্টারের মতো আন্টদের সেবা আর কেউ করেনা। কিন্তু সবকিছুরই তো একটা সীমা আছে।
-কাজেই তুমি ভেবেছো তোমার ঐ হলরুমে আমি পুরষ্কার বিতরন করছি?
- হ্যা, আমি তাই ভাবাছি।
- আর একটা ভাষন দেবো?
- ঠিক তাই।
আমি অপ্রকিতস্থের মতো হাসলাম।
-খোদার দোহাই, কুলকুচোর মতো শব্দ করোনা। ব্যাপারটা গুরুত্বপুর্ন।
- আমি হাসছিলাম।
- ওহ,তাই? যাক, বিষয়টা তুমি আনন্দচিত্তে গ্রহন করেছো।
- “হাসিটা ছিল পাগলের মতো” আমি পরিষ্কার করলাম, “আমি একাজ করবো না। কখনই না।”
- তুমি করবে,বারটি ছোড়া আর নইলে আমার দরজায় আর কখনই আসবেনা। আর তুমি জানো ব্যাপারটা কতো ভয়ানক। আনাতোলের রান্না তোমার জন্য একেবারে বাতিল।
একটা ভীষন ধাক্কা খেলাম। ভদ্রমহিলা এখন উনার রাধুনীকে ব্যাবহার করছেন যে আমার চোখে একজন শিল্পী। তার পেশায় সে অদ্বিতীয়, অন্য কারো সাথে তার তুলনা চলেনা। এমনভাবে রান্না করে যে জিভে পানি চলে আসে। আমি জিভ বের করে এই আনাতোলের আকর্ষনেই ব্রিঙ্কলী কোর্টে যাই। আমার সেরা মুহুর্তগুলোর কিছু হচ্ছে যখন এই মহান শিল্পীর রান্না করা কিছু খাই। কাজেই এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবার আশংকা আমাকে বোকা বানিয়ে দিল।
-না, বাদ দাও, আমি বললাম।
- আমি ভেবেছিলাম এটাতেই কাজ হবে, লোভী শুকরছানা।
- লোভী শুকরছানার এই ক্ষেত্রে কিছু করার নেই, আমি বললাম কিছুটা রাগের সাথে, ‘রান্নার যাদুকরকে প্রশংসা করলেই কেউ লোভী শুকরছানা হয়ে যায়না।’
- আমার খুব ভালো লাগে ওর রান্না, আমার আত্মীয়া বলে চললেন, “কিন্তু তুমি যদি এই সহজ,আরামদায়ক কাজটা না করো তো আর কখনই এই স্বাদ তুমি পাবেনা। আর দীর্ঘশ্বাস নিওনা। ওটা তোমার বারো ইঞ্চি সিগারেট কেসে ঢুকিয়ে রাখো।
”
মনে হচ্ছিল একটা বন্যজন্তু কোন ফাদে পড়েছে।
-কিন্তু তুমি আমাকেই চাইছো কেন? বলতে চাচ্ছি, আমি কে? নিজেকে জিজ্ঞেস করো।
- আমি প্রায়ই করি।
- আমি বলতে চাচ্ছি, আমি ঐ ধরনের নই। তুমি কেউকেটা কাউকে যোগাড় করতে পারো। আমার মনে পড়ে যখন স্কুলে ছিলাম, তখন প্রধানমন্ত্রী বা ওরকম কেউ এই কাজগুলো করতো।
-ইটনে সেরকম হয়। কিন্তু মার্কেট স্নডসবুরিতে আমরা এতোদুর আশা করতে পারিনা। ডাকাবুকো একজন হলেই আমাদের চলবে।
- আঙ্কল টমকে রাজি করাচ্ছোনা কেন?
-আঙ্কল টম!
- হ্যা, কেন নয়? সে বেশ নামকরা।
-‘বারটি’, উনি বললেন। “ তোমাকে বলছি কেন তোমার আঙ্কল টম নয়। মনে আছে কানেসে ব্যাকারেট খেলায় আমি সব টাকা হারালাম? তো, তোমার আঙ্কল টমকে খুব শিগগিরি সেটা জানাতে যাচ্ছি। এই খবর জানানোর পরই যদি তাকে আমি মার্কেট স্নডসবুরি গ্রামার স্কুলে সেজেগুজে পুরষ্কার বিতরন করতে বলি তাহলে পরিবারে একটা ডিভোর্সের ঘটনা ঘটতে পারে। না, বাছা আমার, এই কাজের জন্য তুমিই যোগ্য, তুমিই পারো কাজটা ভালোভাবে সারতে।‘
- কিন্তু আন্ট ডাহলিয়া, আগে কারন শোনো, আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, তুমি ভুল মানুষকে ধরেছো। এই ধরনের খেলায় আমি একবারে আনাড়ী। জীভসকে জিজ্ঞেস করো সেবার মেয়েদের স্কুলে বক্ত্রিতা দিতে গিয়ে কি হয়েছিল। আমি নিজেকে সেরা গাধায় পরিনত করেছিলাম।
- আমি নিশ্চিতভাবে আশা করছি একত্রিশ তারিখের অনুষ্ঠানেও তুমি নিজেকে এক সেরা গাধা হিসেবে প্রমান করবে। এইজন্যই আমি তোমাকে চাচ্ছি।আমি এইভাবেই বিষয়টাকে দেখছি, যাইহোক, আমার ধারনা লোকজন এতে প্রানভরে হাসার একটা উপলক্ষ্য পাবে। তোমাকে পুরষ্কার বিতরন করতে দেখলে আমার ভালোই লাগবে,বারটি।আচ্ছা,তোমাকে আর আটকে রাখবো না, তুমি তোমার সকালের ব্যায়াম করে নাও। আমি তোমাকে দুই-একদিনের ভেতর আশা করছি।
এই দয়ামায়াহীন কথাগুলো বলে উনি চলে গেলেন আমাকে বিষাদময় চিন্তায় ডুবিয়ে রেখে। পঙ্গোর পার্টির পর এরকম একটি পরিস্থিতি, বলা যায় আমার আত্মাটাকে শুষ্ক করে দিল।
আর আমি তখনও বিষয়টার গভীরতা বিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম, দরজা খুলে জীভস উপস্থিত হল।
-মিঃ ফিঙ্ক-নটল আপনার সাথে দেখা করবেন,স্যার,সে ঘোষনা দিল।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



