
দানবাক্স। মসজিদ, মাজার, পীর, মাদ্রাসার নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হাজার হাজার দানবাক্স। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা না গেলেও ঢাকায় এর সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ হাজার বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। দানবাক্সের বেশিরভাগই রাজধানী ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় অবস্থিত মসজিদ ও মাজারের। লাল ও কালো রং এর ছোট গোল এবং চৌকোনাবিশিষ্ট এসব দানবাক্সে প্রতিদিন গড়ে আড়াই লাখ টাকা জমা পড়ে বলে আদায়কারীদের দেয়া তথ্য সমন্বয় করে জানা যায়। মাজার, মসজিদ, মাদ্রাসার নামে কিছু কিছু দানবাক্স থাকলেও মূলত মাজার ও পীরের নামে থাকা দানবাক্সের সংখ্যাই বেশি।
সরেজমিন তেজগাঁও, পল্টন, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর এলাকায় গিয়ে জানা যায়, তেজগাঁওয়ের কলমিলতা বাজারের চালের আড়তের পাশেই ইয়ার উদ্দিন (রঃ) পীর সাহেবের দানবাক্স। কলমিলতা বাজারের ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ব্যবসা শুরুর আগে এ দানবাক্সে দান করেই ব্যবসার কাজ শুরু করেন। বাজারের ব্যবসায়ীদের দানের পরিমাণ প্রতিদিন পাঁচ টাকা থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত। বাজারের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এক ধরনের বিশ্বাস থেকে তারা প্রতিদিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দরজা খোলার আগে দান করেন। তাদের বিশ্বাস, এই সামান্য দানে ব্যবসায় ভাল লাভ হয়। ব্যবসায়ীরা বিশ্বাস করেন, ইয়ার উদ্দীনের দানবাক্সে দান করলে পীর সাহেব কবর থেকে ব্যবসায় উন্নতির জন্য দোয়া করবেন।
কলমিলতা বাজার ছাড়াও সরেজমিন নগরীর বিভিন্ন কাঁচা বাজার, চালের আড়ত, পীরের মাজার, অধিকাংশ মাদ্রাসা ও মসজিদের প্রবেশ পথগুলোতে দেখা যায় দানবাক্স। আবার নগরীর কোনো কোনো এলাকায় এবং বড় বড় বাজারে টিনের তৈরি ছোট ও মাঝারি সাইজের দান বাক্সের দেখা পাওয়া যায়। এসব দানবাক্সের বেশিরভাগই কোনো না কোনো পীরের নামে বসানো হয়েছে। দানবাক্সের গায়েই পীরদের নাম লেখা থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা শহরে যেসব পীরের নামে দানবাক্স খোলা হয়েছে এদের মধ্যে ইয়ার উদ্দিন (রঃ), চন্দ্রপাড়া (রঃ), শাহবাবা ফরিদপুরী (রঃ), শর্র্ষীনা পীর (রঃ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ পীরদের কথিত কিছু খাদেম নামধারী সহযোগী দানবাক্স প্রথা চালু করেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায় উন্নতির জন্য পীরের দোয়া কামনায় এ দানবাক্সগুলো নিজ উদ্যোগেই দেখাশুনা করছেন নগরীতে বসবাসরত দেশের উপকূলবর্তী জেলার নদীভাঙ্গনকবলিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। পীরের প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে তারা এসব করছেন। যদিও ইসলাম ধর্ম কখনো মাজার সংস্কৃতিকে অনুমোদন করে না, তারপরও ধর্মকে পুঁজি করে আর সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণীর ধর্ম ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের পকেট থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। জানা যায়, ঘর থেকে বের হওয়া খেটে খাওয়া মানুষ প্রতিদিন বাজার শেষে পাঁচ টাকা থেকে শুরু করে যে যার মতো করে আল্লাহর ওয়াস্তে দানবাক্সে টাকা ফেলে যান।
দানবাক্সে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা উঠলেও এ টাকার সিংহভাগই যায় কথিত খাদেমদের পকেটে। দানবাক্সে উঠা এসব টাকায় পীরের মাজার উন্নয়নে ব্যবহারের নজির খুবই কম। সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর তেজগাঁও রেল স্টেশন, কারওয়ান বাজার কাঁচাবাজার এলাকায় বেশকিছু দানবাক্স রয়েছে। এসব দানবাক্স পরিচালনাকারীরা বরিশাল গ্রুপ, ফরিদপুর গ্রুপ, কুমিল্লা গ্রুপ বলে পরিচিত। এ এলাকায় যারা দানবাক্স চালু করেছে, তারা সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ হিসেবে ব্যবসা শুরু করলেও অনেকেই এখন মহাজন বা আড়তদার হয়েছে। নগর জুড়ে এসব দানবাক্স বসিয়ে রীতিমতো বাণিজ্য চলছে। আর এখান থেকেই মাস শেষে আয় হচ্ছে কোটি টাকা। মানুষের পকেট খালি করে নেয়া দানবাক্সের টাকা থেকে সরকারও কোনো রকম লাভবান হচ্ছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তেজগাঁও এলাকা ছাড়া রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায়ও বেশকিছু দানবাক্স রয়েছে। এ এলাকায় দানবাক্সের সংখ্যা হবে ৮০টির মতো। এরমধ্যে দারুল কোরআন জামেয়া-এ মোহাম্মদীয়া (দঃ) দানবাক্স, মির্জাগঞ্জের ইয়ার উদ্দিন (রাঃ) দানবাক্স এবং পাঁচ বাড়ি, হাজী বাড়ি জামে মসজিদের দানবাক্স উল্লেখযোগ্য। মজার বিষয় হচ্ছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতে দানবাক্স বাণিজ্য বসেছে তার কোনোটিই ঢাকার নয়। বাইরের বিভিন্ন জেলা ও গ্রামাঞ্চলের প্রতিষ্ঠান এগুলো। অথচ টাকা তোলা হচ্ছে রাজধানী থেকে। চাঁদপুরের মুন্সিরহাট বাজারের পাঁচ বাড়ি, হাজী বাড়ি জামে মসজিদের টাকা তোলেন গিয়াস উদ্দিন। পুরানা পল্টন কারী রেস্তোরাঁর সামনে দানবাক্সের দায়িত্বে নিয়োজিত গিয়াস উদ্দিনের সাথে কথা হয়। তিনি জানান, এটি তাদের পারিবারিক মসজিদ। তারা বংশ পরম্পরায় এই মসজিদের টাকা তুলে আসছেন। তাদের মসজিদের সেক্রেটারি জলিল মাস্টার তার চাচা। দানবাক্স এবং মানি রিসিটের মাধ্যমে তারা টাকা উঠান। আয়কর দেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধর্মের কাজে সংগৃহীত টাকার কোনো আয়কর দিতে হয় না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভোলার ইলিশা দারুল মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিং দানবাক্সের টাকা তোলেন মোহাম্মদপুরের জহুরী মহল্লার দারুল জান্নাত জামে মসজিদের ইমাম রুহুল আমিন। তার নামেই চলে এ দানবাক্স। অবশ্য মসজিদে গিয়ে তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। জানা যায়, বর্তমানে তিনি ইমাম হিসেবে কাজ করেন না। তবে তার একটি খতিব চেম্বার ও দাওয়াইখানা রয়েছে। খতিব চেম্বারে বসে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, ঢাকায় তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক থেকে দেড়শ’ দানবাক্স রয়েছে। এরমধ্যে পল্টন, মতিঝিল, উত্তরা, মোহাম্মদপুরেই রয়েছে প্রায় ২১০টির মতো। সংগৃহীত এই টাকার কোনো ধরনের রাজস্ব দিতে হয় না বলে জানান তিনি।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মির্জাগঞ্জ মরহুম ইয়ার উদ্দিন খলিফা (রঃ) ওয়াকফ স্টেট কমিটির সভাপতি মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান মোবাইলে জানান, ‘ইয়ার উদ্দিন খলিফা (রঃ) মাজারের দানবক্সের টাকা সংগ্রহের জন্য সারাদেশে ৯২ জন লোক নিয়োগ করা আছে। সব মিলিয়ে মাসে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার মতো আসে। এ টাকা মাজার ও এতিমখানার কাজে ব্যয় করা হয়।’
সংশ্লিষ্ট খাদেম জিন্নাত আলী মল্লিক জানান, ‘যারা আমাদের দানবক্সে টাকা তুলেন তাদেরকে আমরা ২৫% কমিশন দেই। তারা সবাই পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের লোক।’
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মে, ২০০৯ সকাল ১০:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


