ছবিগুলো হচ্ছে আমাদের কলেজ র্যাগ ডে-র। দু'টাকেক-এর ছবি, একটা (চকলেট কেক) আমাদের ব্যাজ-এর আরেকটা আমার হাউজ "অপরাজিতা"-র মডেলে অর্ডার করা (আমাদের চারটা হাউজ; অপরাজিতা, কৃষ্ণচূড়া, দোলনচাঁপা আর কনকচাঁপা)। মোট আটটা কেক ছিল সবমিলিয়ে। আরেকটা ছবি আমাদের র্যাগ টি-শার্ট এর।
আজকে এস.এস.সি. পরীক্ষার রেজাল্ট দেখতে গিয়েছিলাম ভিকারুননিসা, আমার খালাতো বোন দিলো এবার। আমাদের ফ্যামিলি-র সব মেয়ে ভিকারুননিসায় পড়ে! আমার বোন-ও পড়ছে ক্লাস নাইনে। যাই হোক, আমার বোনকে আনতে গিয়েছি সিদ্ধেশ্বরী কোচিং থেকে। তখন সে বলে, "আপুনি প্লিজ স্কুলে চলো, রেজাল্ট দিচ্ছে। মিম আপুর (আমার কাজিন) রেজাল্ট দেখে আসি।" আমি প্রথমে না করলাম তারপর হাটতে হাটতে ভিকারুননিসার সামনে গিয়ে শুনি ড্রাম বাজছে আকাশ কাঁপিয়ে। রক্তে তিন বছর আগের নেশা চেপে গেল! বোনের হাত ধরে বল্লাম, "দৌড় দে! স্কুলে চল! নাচতে হবে!!!" আমার বোন খুশিতে প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে আমার পেছন পেছন দৌড়াতে লাগলো।
আমার এস.এস.সি.-র রেজাল্ট আমার জীবনের সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট। বললে হয়তো অনেকে অহংকারি বলে নাক শিটকাবে। তাও বলি আমি ছিলাম বেস্ট ফোর লিস্ট-এ। সকাল থেকে টেনশন-এ পাগল হয়ে ছিলাম। গিয়ে শুনি স্কুলে তখনো রেজাল্ট আসে নি, থরথর করে কাঁপছি আর আল্লাহ-র সাথে কথা বলছি। তারপর রেজাল্ট পেয়ে-ও তাজ্জব হয়ে গিয়েছি। আমার স্যার এসে জিজ্ঞেস করলেন কি রেজাল্ট, বলার পর স্যার বললেন, "আরে পিচ্চি!!! দাড়ায় দাড়ায় কি করিস! নাচতে যা !!!" তারপর স্যার আমার সব বান্ধব দের ডেকে বললেন, "এইটাকে তুলে স্টেইজ এ আছাড় দে সবাই! হাইয়েস্ট পেয়ে বসে আসে!" পাগল হয়ে নেচেছিলাম ড্রামের সাথে সাথে! কাঁদছি, নাচছি আবার টিচাররাও এসে প্রায় কোলে তুলে নাচ দিচ্ছে !!! কি অসাধারণ দিন ছিল !!! স্বপ্নের চে-ও অনেক বেশি সুন্দর, অনেক বেশি আকাঙ্ক্ষিত !!!
আমাদের ভিকারুননিসা অসাধারণ কিছু ব্যপার চিনিয়ে দিয়েছে! আমি শিখেছি কিভাবে খুব নিয়ম মেনে চলতে হয় আবার শিখেছি কিভাবে মাঝে মাঝে সব নিয়ম ভেঙে পাগল হতে হয় বাঁধ ভাঙা আনন্দে। আমাদের অনুষ্ঠান গুলোতে যেমন নেচেছি "ঐ ধিতাং ধিতাং বোলে", "ময়না ছলাৎ ছলাৎ" বা "আমার মাইঝ্যা ভাই, সাইঝ্যা ভাই" ঠিক তেমন-ই ক্লাস পার্টিতে পাগল নাচ দিয়েছি "ইশক্ কামিনা", লাস্ কেচাপ" বা "ইটস্ রেইন আমেন"-তে। আবার পহেলা বৈশাখে শাড়িটা কোনো মতে সামলে-সুমলে উন্মাদ হয়েছি বাউলদের ঢোলের মাতাল তালে !!! বর্ষার প্রথম দিনটায় সব টিচার সহ নেমে গিয়েছি বৃষ্টিতে ভিজতে। ক্লাস ক্যানসেল করে সব টিচাররাও ভিজে ভিজে আমাদের সাথে বৃষ্টির গান গেয়েছেন! আর ভিকারুননিসার যেকোনো অর্জনে আমরা ড্রামারদের নিয়ে বের হয়ে যেতাম অডিটোরিয়াম বা মাঠে। তারপর তো "ধুম ধুম ধুম ধু-ধুম"...আর সে কি নাচ একেকজনের !!!
স্টাডি টুর এ গেলাম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর; সেখানে রাখা জিনিসগুলোর বৃত্ত্বান্ত শুনে আমাদের মতো লাফালাফি করা গ্রুপ-ও পুরোপুরি শান্ত হয়ে গেলাম। যুদ্ধের ডকুমেন্টারি (অন্যতম হিসেবে বলা যায় জহির রায়হানের "স্টপ জেনোসাইড") দেখার পর কাঁদতে কাঁদতে দেশের গান গাইতে গাইতে স্কুলে এসেছিলাম। আমাদের শান্ত করতে এসে কেঁদেছেন আমাদের সাথে যাওয়া আপারাও! খাঁটি একটা দেশপ্রেমে ভরে গিয়েছিল ভেতরটা! কি অসাধারণ ছিল সেই দিনগুলো! কি অসাধারণ সব মানুষ পেয়েছিলাম আমাদের পাশে!
আর আমরা পাগল-পাগল কিছু মেয়ে একসাথে হয়েছিলাম; যারা একটা মিনিট শান্ত হয়ে বসতে পারতো না, লুকিয়ে সব টিচারদের নাম দিতো, ক্লাস ভাল না লাগলে বাংক করে মাঠে-ক্যান্টিনে ঘুরে বেড়াতো, সারাক্ষন পিটি মিস-এর শাস্তির লিস্টে নাম থাকতো... এতকিছুর পর-ও আমরাই টিচারদের খুব প্রিয় ছেলাম। আমাদের টিচাররাও আমাদের মতো-ই পাগল ছিলেন। তারা-ও কেন যেন শান্ত-শিষ্ট মেয়েদের পছন্দ করতেন না। আমাদের ফাজিল গ্রুপটা বেশ লাই পেয়েছিল তাদের কাছে। আমরা হোমিকনোমিক্স ক্লাসগুলোতেও কম ফাজলামি করি নাই। মিসকে একজন ব্যস্ত রাখতো কথা বলে আর আমরা বাকিরা আলনায় রাখা আচারের বয়মটা চুরি করে মাঠে পাচার করে দিতাম। মিস আচার না পেয়ে প্রায়-ই চিল্লাচিল্লি করতেন, তখন আমরাই আবার বলতাম,,,"ইস! মেয়েগুলা যে কি আপা! কোন এটিকেট নাই! এদের কি বাসায় আচার খেতে দেয় না! চুরি করে কেনো! ছিঃ !!!"। আপা আমাদের-ই একজনকে আচার চোর খুঁজার দায়িত্ব দিয়ে বেশ আস্বস্ত হতেন! আবার খুব একঘেঁয়ে ক্লাস হলেই আমরা আমাদের বিল্ডিং এর মেইনসুইচটা অফ করে দিতাম। আর টিচারের সাথে ঘ্যনর-ঘ্যনর শুরু করতাম..."আপা! এই গরমের মধ্য কিভাবে ক্লাস করি!!!" তারপর আপা ক্লাস থেকে চলে গেলেই আবার কারেন্ট চলে আসতো! ... এ ধরনের অকাজ-কুকাজ ছিল আমাদের নিত্যদিনের রুটিন। ভিকারুননিসার কাহিনী শুরু করলে কখনো শেষ হবে না! হয়তো এমন নস্টালজিক হয়ে বারবার বলবো নতুন নতুন কিছু কাহিনী!
আজকে আমার সেই শিকড়ের কাছে গিয়ে প্রিয় ড্রাম বিটটা শুনে রক্তে সেই মাদকতা টের পেয়েছি যা ঢুকিয়ে দিয়েছিল ভিকারুননিসার প্রচন্ড প্রিয় মুহুর্তগুলো। আজকে গিয়ে এক আপার সাথে দেখা হতেই আপা জড়িয়ে ধরলেন! তার নাম দিয়েছিলাম "টুনি"-আপা। উনি আমাদের "হাজার বছর ধরে" পড়াতেন আর ঠিক টুনির মতোই অস্থির আর মিষ্টি ছিল আপা, তাই ঐ নামকরণ। আপার সাথে আজকেও নেচেছি সেই ড্রামবিটে। আমার নৃত্যরত পায়ের নিচে কথা বলছিল রঙিন প্রিয় একটা অতীত!
আমাদের র্যাগ-ডের টি-শার্ট এ দেয়া লেখাটা দিয়েই শেষ করবো আজকের লেখা...
"no matter from where we make
our start - we are VIQIS
will be VIQIS
even if we stay apart!"
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৩:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


