somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধূসর মধ্যরাত্রি

০১ লা আগস্ট, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বসে বসে Enrique Iglesias এর গান শুনছি আর কম্পিউটার টেপাটেপি করছি, ফোন এল। আমার দুইমাত্র বন্ধুর একজন-শশী। গান pause দিয়ে উঠে গেলাম। মনের মধ্যে Enrique লাফালাফি করছে, এদিকে ওর কথা শেষ করার কোন লক্ষণ নেই।
কিছুক্ষণ কথা বলার পর মনে হল ও কিছুটা অসংলগ্ন কথা বলছে। মাথা থেকে Enrique তাড়ালাম। বললাম,'এই তোর কি হইসে বল তো?'
কিছুক্ষণ নিরবতা। হঠাৎ কান্নার শব্দ শুনলাম।
'কি হইসে বলবি তো। কি আন্টি বকেছে?'
আবার কান্না।
ও ফোন রেখে দিল।
আমি ভেবে বের করতে পারলাম না কি হয়েছে ওর। বিষন্ন মনে
Enrique বাদ দিয়ে একটা ধীর গান দিলাম।
নাহ! এটা ঠিক হল না । কম্পিউটার বন্ধ করে উঠে গেলাম। ওর কি হল দেখে আসি।
মাকে বলে বের হলাম। শশীদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে ওকে কল দিলাম। 'নিচে নেমে আয়।' ও দোতালার বারান্দা থেকে মাথা বাড়িয়ে দিল, 'তুই উঠে আয়।'
-'না তুই নাম।'
আমার কথা ওকে মানতেই হল, ও নেমে এল।
-'চল।'
-'কোথায়?'
-'আরে চল তো।'
ধানমন্ডী লেকে বসে বাদাম কিনলাম পাঁচ টাকার।কলেজের বেশ কাছে হওয়ায় এটা আমাদের friend দের মিটিং প্লেস। দেখা করার জন্য আমরা এখনো এখানে জড় হই। বাদাম খেতে খেতে বললাম,'বল।'
-'কি?'
-'কি হইসে সত্যি করে বল। গত কয়েকদিন ধরে আমার মনে হচ্ছে তোর যেন কি হয়েছে। আজকে বল।'
-'কিছু না.... ওই পুরনো ব্যাপার আরকি। আম্মা...'
আমি মাথা নাড়লাম,'আমার কাছে মিথ্যা বলিস কেন? আমি টের পাই। আসল কথাটা বল।'
আবার সেই কান্না! আমার দিকে ও ওর হাতটা বাড়িয়ে দিল, 'থাপ্পড় দে।' আমি ওর হাতটা নিজের হাতে নিলাম।
ও চুপ করে রইল।...................
আমার মনে পড়ল, সেসব অনেক পুরনো কথা... আমরা ক্লাস টু-তে পড়ি। ওর মা কথায় কথায় ওকে মারে। একবার ১০০ তে ৯৭ পাবার পর ওকে মেরেছিল-কেন ১০০ পেল না!
আমি পেয়েছিলাম ৭৯। মা আমাকে নতুন পেন্সিল বক্স কিনে দিল। শেষে আমাদের মধ্যে কথা ঠিক হল ওর কান্না পেলে আমি ওর হাতে থাপ্পড় দেব (আমি খুব জোরে থাপ্পড় দিতে পারতাম- এখনো পারি )। কারণ মার খেলে ওর নাকি কান্না চলে যায়। সে কথাটাই ও বলছিল।
-'তোকে ইফতির কথা বলেছিলাম না? ও...'
-'হ্যাঁ'
-'ও... দেখ... আমার দোষটা কি আমার সাথে এভাবে প্রতারণা...' কান্নায় ওর গলা বুজে এল। আমি ঝট করে ওর দিকে ফিরলাম,'কি বললি?আমি ওর...'
-'প্লিজ, ওকে কিছু বলিস না। দোষটা আমারই।আমার ফ্যামিলিতে এতপ্রব্লেম তা আমি ওকে আগে বলিনি। তাছাড়া..'
আমি উঠে বসলাম,'তুই বলিস নাই, আমি বলেছি। দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলে একটা।দাঁড়া... ওর ঠ্যাং আমি... ' তীব্রস্বরে শশী চেঁচিয়ে উঠল,'তুই ওকে কতটুকু বলেছিস? বলেছিস-আমি আমার চোখের সামনে আমার বাবাকে দেখেছি আমার মাকে মেরে রক্তাক্ত করে দিতে? তুই জানিস কেন মার খেলে আমার কান্না বন্ধ হয়ে যায়? এইজন্য। বাবা সবসময় তার রিসিপশনিস্টকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে,বাসায় আসে না, আমার মায়েরও একটা বয়ফ্রেন্ড আছে-বলেছিস এসব?...' একদমে অনেক কথা বলে ও হাঁপাতে লাগল।
আমি চুপ করে থাকলাম। আমি জানি এসব কথা।কিন্তু যার সাহস নেই, সত্যিকারের অনুভূতি নেই, তার প্রেম করতে আসা কেন? খারাপ লাগতে লাগল শশীর জন্য, সাহিত্যে 'জনমদুঃখী' বলে যে কথাটা আছে, সেটা মনে হয় ওর জন্যই। আমি আমার হাতে ওর হাতটা তুলে নিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে রইলাম.....

ঘুমাতে যাওয়ার আগে চয়নের কথা মনে পড়ল।দুইমাস হল ও আমার সাথে কোন যোগাযোগ করে না। কি এমন হল যে আমাদের এতদিনের বন্ধুত্ব এভাবে নষ্ট হয়ে গেল। আমি 'দোস্ত' বলে ডাকি এমন ছেলেমেয়ের সংখ্যা অনেক। কিন্তু আমার বন্ধু আসলে মাত্র দু'জন-শশী আর চয়ন। দু'জনের কেউই আমার মত না। চয়নের নামটা যেমন সাহিত্যিক, মানুষটাও ও তেমনি। ভীষণ চুপচাপ। ফুল-পাখি-বই-ছবি আর চয়ন, আমরা বন্ধুরা ওকে বলি 'পুরুষাকারে নারী'। আসলেও হয়ত তাই। রাস্তার পিচ্চি পাচ্চিদের সাথে ওর যত ভাব। কোন বাচ্চাকে ভিক্ষা করতে দেখলে ওর চোখ ছলছল করে ওঠে। যতই ওকে নিয়ে হাসি, একটা কথা আমি জানি- ওর মত মানুষই হয় না। আর সবার সাথে খেজুরে আলাপ করলেও, কেবল ওর সাথেই আমার কথাটা হয় 'একেবারে আমার মত'। একটা কথা অস্বীকার করতে পারি না, অন্য ফ্রেন্ডদের বোধ বুদ্ধিকে মনে মনে আমার চেয়ে অনেক কম ধরলেও, ওকে আমি আমার সমকক্ষ, আবার কখনো আমার চেয়ে বড় স্বীকৃতি দেই। একমাত্র ওর সাথে বসেই ঘন্টার পর ঘন্টা ম্যাক্সিম গোর্কি, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, linkin' park কিংবা পলিটিক্স নিয়ে চমৎকার গল্প চালিয়ে যেতে পারি আমি। ও ঠিক অন্যদের মত অন্তসার শূন্য না। ওর প্রতিভাও অনেক, ছবি আঁকে, কবিতা লেখে।....... এমন ছেলে কয়টা হয়?
..... কিন্তু সেই ও যখন আমাকে বলল আমাকে ওর ভালো লাগে তখন আমি হ্যাঁ বলতে পারিনি। কেন পারিনি? আমার কি সাহস কম? না তা হবে কেন? আমি গাছে চড়া, ফুটবল খেলা, বখাটেকে থাপ্পড় মারার রেকর্ডধারী মেয়ে। সাহস আমার নিতান্ত কম নয়। বাবা মাকে চিরকাল বন্ধুর মত পেয়েছি তারাও কিছু বলত না।.......
কিন্তু আমি জানি, আমরা 'অনেক এক,কিন্তু অনেক আলাদা'। আমি জীবনকে যেভাবে সাজাতে চাই, যেমন ভাবি ও তো সেরকম ভাবে না। আমার স্বপ্ন দেশের বাইরে গিয়ে উচ্চ শিক্ষা, আমার ক্যারিয়ার, সুন্দর একটা বাড়ি...। রোদ-বৃষ্টি দেখে কবিতা আমারও মনে গুনগুনিয়ে ওঠে। কিন্তু কবিতা লিখে দিন পার করার কথা আমি চিন্তায়ও আনতে পারি না। গ্রামের বাড়িতে থেকে গরীবদের জন্য স্কুল চালানোকে জীবনের উদ্দেশ্য হিসেবে আমি বাহবা দেই.... তাই বলে আমি গ্রামের স্কুল মাস্টারের স্ত্রী হতে চাই না। ওকে তো আমার ভালোই লাগে... আমি বললে ও হয়ত উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশও যাবে আমার কথা মত। কিন্তু ওর ব্যক্তিসত্তাকে খুন করতে আমার কিছুতেই ইচ্ছে হয় না। তবুও... ওকে আমার ভালো লাগে...........................

ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম জানি না। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। এত অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে কেন? গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে আছে। অনুভূতিটা একেবারেই আমার অপরিচিত।
মোবাইলটা ভাইব্রেট করছে...চয়ন.... দুইমাস পর! একেই বলে টেলিপ্যাথি!
-'হ্যালো'
-'কি রে এতদিন পর? আমি মনে করসিলাম তুই আর কখনো কল দিবি না...'
-'শশীকে বলিস ইফতিকে আমি ম্যানেজ করেছি। ওদের আর সমস্যা হবে না আশা করি।'
-'তুই দেখছি দুইমাসের মধ্যে ম্যানেজার হয়ে....'
-'ফালতু পচাল বন্ধ কর প্লিজ। আমি তোর সাথে গল্প করার জন্য ফোন দেই নাই।'
-'তাহলে কি জন্য ফোন দিলি?'
-'তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব, সোজা উত্তর দিবি।'
-'হুঁ..'
-'আমার কি নেই যে আমাকে তুই রিফিউজ করলি? শুধু এটার জবাব দে।'
-'কুল ডাউন ম্যান..'
-'ভনিতা করবি না...' এত জোরে ওকে কখনো আমি চেঁচাতে শুনিনি। এই জোর ও কোথায় পেল! আমি বললাম,'তোকে আমার বন্ধুর মত দেখেছি সব সময়...that's all '
-'এখন কি অন্যভাবে দেখা যায় না?'
-'না'
-'কেন?'
-'তোর ভালোর জন্যই..'
-'হয়েছে আর কত ভড়ং করবি? আসল কথাটা বলি, তুই অসম্ভব স্বার্থপর একটা মেয়ে। কাউকে দাম দিস না। তোকে ভুল চিনেছি আমি। তোর ভিতরটা ফাঁকা...'
-'হ্যাঁ এতদিনে চিনেছিস, আমি একটা man eater, আমাকে আর বিরক্ত করিস না..'
আমি ফোন রেখে দিলাম। চিৎকার করে রাতের আকাশটা চৌচির করে দিতে ইচ্ছা হচ্ছে-'আমি তোর ভালো চাই রে'
.......... আমার কান্না পাচ্ছে...... কান্না পাচ্ছে... আমি তো কাঁদি না....কান্না মানে পরাজয়.....
এত রাতে জোরে গান দেয়া যাবে না.... আমি উঠে গিয়ে হেডফোন কানে লাগিয়ে গান শুনতে শুরু করলাম... linkin' park.........................

I don't want to be the one
Who battles always choose
Coz inside I realize
That I'm the one confused
..................................
So, I'm breaking the habits
I'm breaking the habits tonight....
আমি চোয়াল শক্ত করে বসে রইলাম। আবার ফোন দিচ্ছে চয়ন... ধরব না....

দাঁতে দাঁত চেপে আমি শুনতে লাগলাম............
So, I'm breaking the habits
I'm breaking the habits tonight...
কি হল কে জানে, গাল বেয়ে অশ্রুর বন্যা নামল আমার......
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×