somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... ইয়াহিয়া স্বায়ত্বশাসন দেয়ার পদক্ষেপ নিয়ে সেটাকে বিপ্লবে রূপান্তর করেছেন অনুবাদ: আ-আল মামুন

পিটার প্রিস্টন

ইয়াহিয়া সম্পর্কে সবসময় দুটো ধারণা প্রচলিত ছিল। হয়ত নিজের সম্পর্কে যা বলছেন তিনি তাই: মেজাজী ও কুটিলতাহীন- কর্তব্য পালন করছেন, জাতীয় দায়িত্ব পালন শেষ হলে ব্যারাকে ফিরে যেতে চান; কিংবা তার বিরুদ্ধবাদীদের সন্দেহ অনুযায়ী তিনি একজন ধান্দাবাজ: জেনারেল হিসেবে ক্ষমতা হাতিয়ে নিয়েছেন, কিন্তু এখন কিছুটা গণতান্ত্রিক লেবাস ছাড়া ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারছেন না। গত ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর রাজনীতিতে পাকিস্তানী প্রভাবের নতুন রূপ অনিবার্য্য হয়ে উঠেছে; ইয়াহিয়ার সমর্থকরা সমঝোতার পক্ষে, তারা চায় মুজিব এবং ভুট্টো সমঝোতা করুক এবং ইয়াহিয়াকে সম্মানিত ও মহিমান্তিত প্রেসিডেন্ট পদে আহ্বান করুক।

আসলে, ইয়াহিয়ার দু’ধরনের চারিত্রিক বিশ্নেষণের কোনোটাই সন্তোষজনক নয়। নতুন ঘটনাবলী দু’ধরনের বিশ্লেষণকে মিশ্রিত করে তাকে একটি রক্তঝড়ানো ট্রাজিক ব্যাক্তিতে পরিণত করেছে। সম্ভবত ইয়াহিয়া ক্ষমতার মোহে আবদ্ধ; নির্বিচার বাঙালি হত্যাকাণ্ড সম্ভবত একজন ছদ্ম স্বৈরশাসকের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার চুড়ান্ত প্রচেষ্টা ছিল। বস্তুত, এসব একজন সাধারণ, কিংবা বলা যায় জড়বুদ্ধি, সৈনিকের চরিত্রকেই ফুটিয়ে তোলে। কারণ কোন্ বুদ্ধিমান স্বৈরাচার নেতৃত্বের জন্য সাধারণ নির্বাচনের অনুমোদন দেয়, নির্বাচিত নেতার সাথে তিন সপ্তাহ উন্মুক্ত আলোচনায় রত হয় এবং আকস্মাৎ পরিস্থিতির মৌলিক কোনো পরিবর্তন না হলেও নির্বাচিত নেতাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ দায়ে অভিযুক্ত করে এবং অস্ত্রধারীদের আহবান করে? একজন হৃদয়হীন সার্জেন্ট মেজরের পক্ষেই নির্বিচার হর্তাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব।

যে জাতির খুব কম জিনিসই স্বাভাবিকভাবে চলে, সেখানেই সামরিক অস্ত্রের প্রতি আস্থা ও প্রযুক্তি-মুগ্ধতা পরিলক্ষিত হয়; মাত্রতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেটের মাধ্যমে যোদ্ধাদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও উন্নত বেতন-ভাতাদির ব্যবস্থা করা হয়। তারা জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করে- করাচীর বস্তীগুলো পাশ কাটিয়ে পাঁচমিনিট পথ গেলেই দেখা যাবে সেনা অফিসারদের আরাম-আয়েশের জন্য নির্মিত আক্ষরিক অর্থেই সুরম্য ‘সানসেট বুলভার্ড’ ভিলাগুলো। কিন্তু এসব অফিসারদের মেধা গণ্ডীবদ্ধ, অবিমিশ্র এবং প্রশ্নসাপেক্ষ। ধনী পাঞ্জাবী পরিবারগুলো এখনও তাদের সম্ভাবনাময় সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ও আইনের ওপর উচ্চ শিক্ষার্থে পাঠায়। উচ্চশিক্ষায় প্রত্যাক্ষ্যাত, যাদের কাঁধে স্কুলের বই কারাগারের মতো ভারী ঠেকে, তারাই সামরিক জীবনে চলে আসে। এয়ার মার্শাল উর খান এবং আসগার খানদের মতো সত্য সত্যই মেধাবী অফিসাররা এলে তারা দ্রুতই পদোন্নতি পায় এবং অল্পবয়সেই চাকুরী ত্যাগ করে রাজনীতি বা বড় ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটা লেগে থাকার চাকরী, অতিসাধারণ সৈন্যরাই কেবল দীর্ঘদিন ধরে এই চাকরিতে ঝুলে থাকে।

রাওয়ালপিন্ডীতে এরকম স্বল্পবুদ্ধির সামরিক ভদ্রলোকেরা গিজগিজ করে। সাধারণভাবে যে পরিমাণে তাদের থাকার কথা বর্তমান সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি (ইয়াহিয়া দু’বছরেই পদোন্নতি দিয়ে তাদের সংখ্যা দ্বিগুণ করেছেন)। তারা সংকীর্ণচেতা, তাদের অধিকাংশই ধর্মভীরু মুসলমান এবং ভারতীয় শত্রুতা সম্পর্কে কট্টর মনোভাবের। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে যখন নিশ্চিত জয়ের দৃঢ়তা অতি অল্প কদিনেই শান্তির আবেদনে পরিণত হলো তখন তারা খুব ন্যাক্কারজনকভাবে মর্মাহত হয়েছিল। তারা এর চেয়েও গভীরভাবে মর্মাহত হলো যখন তারা বুঝতে পারলো যে তাদের নেতৃত্বদানকারী ‘লৌহমানব’ আইয়ুব খান ধূর্ত ভূট্টোর দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফলত, কিছু কিছু পূর্বানুমান গভীর বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে, আলাপচারিতার সময় তারা স্বাদেশপ্রীতি ও ঐস্লামিক ঐক্যকে শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রতিপালন করার সাথে এক করে দেখেন, যদিও বাজেটের ৬০% ক্ষয় হয়ে যায় প্রতিরক্ষা খাতে, ‘সানসেট বুলেভার্ড’ এবং আমেরিকার ট্যাংক নিয়ে কাশ্মীর ইস্যুতে তাদের বারুদ নিয়ে খেলার সারম্বর ব্যর্থ প্রয়াসে। তারপরও চিন্তাহীন, প্রশ্নহীন, সামরিক ব্যবস্থার পক্ষে তারা। তারা রাজনৈতিক নেতাদের একেবারে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দেখে। তারা মনে করে যে, এসব রাজনৈতিক নেতাদের দেশ পরিচালনায় একটা সুযোগ দেয়া দরকার বটে! কিন্তু তারা এটাও বিশ্বাস করে যে, কয়েক মাসের রাজনৈতিক শাসনের পরই রাজনৈতিক কৌশলের মারপ্যাঁচেই সামরিক বাহিনীর কাছে কৃতজ্ঞ পাকিস্তান দেশ পরিচালনার জন্য আইয়ুব প্রশাসন তোষণকারী ফিল্ড মার্শাল ও দক্ষ সিভিল সার্জেন্টদের ডেকে আনবে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে ইয়াহিয়ার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সঙ্গতিপূর্ণ বলেই মনে হয়। মুজিবের সাথে আলোচনায় তিনি একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত ধর্মীয় রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের পক্ষে কাজ করেছেন। তিনি যখন জিন্নাহর ‘পবিত্র স্বদেশ’ রক্ষা এবং কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক সেনাবাহিনীর ভরণপোষণের পক্ষে কথা বলেন তখন কেই-বা তার এরূপ আপত্তিজনক কথার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে পারবে? পাঞ্জাবীরা বাঙালিদের জাতিগতভাবে হীন চোখে দেখে। “দিনের কয়েক ঘণ্টা তারা কাজ করতে পারে, কিন্তু খাঁটি মানুষ কাজ করে সারাদিন,” ইসলামাবাদের এক আমলা একথা বলেন। সুতরাং, বিদ্রোহীরা তিন সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশেও স্বাধীনতা পেয়েছিল এবং কয়েক থাপ্পরেই বিদ্রোহীদের আবার পূর্বাবস্থানে ফিরিয়ে দেয়া হবে।

পাকিস্তানের সর্বত্রই মারাত্মক শক্তিশালী, যদিও ভ্রান্ত, এসব অনুমানের বিস্তার ঘটছে। ইয়াহিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা বস্তুত অক্ষম: পাশ্চিম পাকিস্তানের কেউই নির্বাচনে শেখ মুজিবের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন প্রত্যাশা করেনি। ইয়াহিয়ার সামরিক বাহিনী আত্মগরিমায় পরিপূর্ণভাবে ডুবে গেছে; বন্যার সময় ত্রাণ বিতরণে অদক্ষতার অভিযোগ ইয়াহিয়া যেভাবে অবজ্ঞাভেবে অস্বীকার করেছিলেন, সেটা হয়তো ঠিকই, কিন্তু সাথে সাথে এটাও সত্য যে কার্যকরী পাকিস্তানী ত্রাণ পৌঁছানোর পূর্বেই বৃটিশ ত্রাণ বন্যার্তদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। আর, তিন সপ্তাহ আগেই সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন থাকলেও সেনাবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানে বসে বসে সম্ভাব্য ভারতীয় অগ্রাসনের বিরুদ্ধে কেবল তর্জন-গর্জন করছিল।

রাওয়ালপিন্ডী থেকে সবসময় পূর্ব পাকিস্তানের অবক্ষয় ও দূর্নীতির কথা বলা হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্তি সম্পর্কে মুল্যায়নে গলদ ছিল; কারণ এখনও পাকিস্তানের উচ্চ মহলে মনে করা হয়, বাঙালি জীবনে ক্ষণস্থায়ী যে আধুনিকতার আভাস দেখা যায়, পাক-ভারত যুদ্ধের পরে পাশ্চিমী অসন্তোষ কমিয়ে আনতে, তা নিয়ে এসেছেন আইয়ুব খান এবং পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদ তিনিই উস্কে দিয়েছিলেন- ঐক্যের প্রতি হুমকি বলে সেটাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। এর মধ্যে সত্যতাও হয়ত ছিল। মুজিব তার সংঘাতপূর্ণ সাহসী রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছিলেন এবং এজন্য অলঙ্কারপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাই, অসহোযোগ আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্ত পর্যন্ত, নির্ভেজাল অর্থে বলতে গেলে, ঢাকা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়নি। শব্দের চাতুর্য্যে সবসময় স্বাধীনতার ঘোষণাকে আড়াল করে রাখা হয়েছে, কারণ শেখ মুজিব ঘোষণা দিতে চাননি। এখন অবশ্য যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতা-চেষ্টার নিয়তি নির্ধারিত হয়ে গেছে।

হাজার মাইল ভারতীয় সীমান্তের বাধা অতিক্রম করে সেনাবাহিনী সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে দমায়ে রাখতে পারবে- কেবল নির্বোধরাই এমন ভাবতে পারে। মুজিবের মতো খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বকে কি বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়া করানো যাবে? তিনমাস আগেই পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন। ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্ত মূলতঃ অবমুল্যায়ন ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাবের ফল। তিনি একজন গুণী রাজনীতিবিদকে নিয়ে খেলতে চেষ্টা করছেন এবং তাকে স্বদেশের জন্য আত্মাৎসর্গ করিয়েছেন। তিনি সতর্কতার সাথে স্বায়ত্বশাসন দেয়ার কৌশলী পদক্ষেপ নিতে গিয়ে সেটাকে একটি বিপ্লবে রূপ দিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু ইয়াহিয়ার এসব পদক্ষেপের পিছনে যে মনোভাব কাজ করেছে তা হাওয়া থেকে পাওয়া নয়। যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাসহ যে অভিজাত শ্রেণী বছরের পর বছর মেকী অবাস্তাব জগতে বাস করছে এটা তাদেরই সৃষ্টি। দু'টো ট্রাজেডি ঘটলো: প্রথমত, বন্যা বিধ্বস্ত গাঙ্গেয় বদ্বীপে ইয়াহিয়া যে গতিতে চিকিৎসা সরবরাহ পাঠিয়েছিলেন তার চেয়ে দ্রুতগতিতে চট্টগ্রামে বন্দুকবাজ পাঠিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, করাচীতে একজন নৌ-কমান্ডার আমাকে যা বলেছিল তা আমার মনে উদয় হলো। সে বলেছিল, “দীর্ঘদিন যাবত আমাদের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। এখন আমি আমার পরিপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারব।” গত কয়েকদিনের মধ্যেই হয়ত সে তার পরবর্তী চাকুরী জীবনের জন্য একজন চিহ্নিত ব্যক্তিতে পরিণত হবেন: একজন পূর্বাঞ্চলীয়।

দ্যা গর্ডিয়ান
২৯ মার্চ, ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৫
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৬
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৭
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৮
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৯
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১০
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১৪
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১৫
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29516330 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29516330 2012-01-04 22:03:30
যে কারণে মুজিবের স্বাধীনতার প্রচেষ্টা আপাতত ব্যর্থ হলো অনুবাদ: আ-আল মামুন

মার্টিন এডিনি

ঢাকা থেকে সবেমাত্র ফিরে তিনি আলোচনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন যা ক্রমে গৃহযুদ্ধে রূপ নিয়েছে।

একক পাকিস্তান এর নাম করে সামরিক সরকার সর্বতোভাবে নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্মম আক্রমণ চালিয়ে নিশ্চিত করেছে যে পাকিস্তানের দুই শাখা আর একসাথে থাকতে পারবে না। দুবছর লাগুক, পাঁচ বছর লাগুক কিংবা দশ বছর লাগুক দেশটি বিভক্ত হতে যাচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে সম্ভত চট্টগ্রাম ছাড়া পুরো এলাকাই সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আধুনিক স্বয়ংক্রিয় রাইফেলে সজ্জিত এবং এই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যাবহারে তারা খুব একটা দ্বিধা করছে না। সেনাবাহিনী জনগণের ব্যাপক প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু অসংগঠিত জনগণের হাতে খুব কম আগ্নেয়াস্ত্র আছে। এদের মধ্যে সম্ভবত আঞ্চলিক আধা সামরিক বাহিনী ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলের কয়েকটি ইউনিট রয়েছে যারা ১৯৩৯ মডেলের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে। এই আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় ২৭,০০০। যাদের ৮০ শতাংশই বাঙালি। কিন্তু এই বাহিনীর অফিসারদের ৮০ শতাংশই পাশ্চিম-পাকিস্তানী। ২৫ মার্চ রাতেই ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের কিছু পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসারকে নিরস্ত্র করা হয়েছে। কিছু কিছু ইউনিট সেনাবাহিনীর অবস্থানের নিকটবর্তী স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে সতর্কতার সাথে সেনাবাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।

পূর্ব বাংলায় এখন সক্রিয় নক্সালবাদী গেরিলা গ্রুপের সংখ্যা খুবই কম, অসংগঠিত এবং তাদের হাতে খুব সামান্যই আগ্নেয়াস্ত্র আছে। সেখানে এমন সব লোকের দেখা পাওয়া যাবে যারা চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল বা বার্মা সীমান্ত দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের চালান চোরাপথে আসছে বলে আলোচনা করছে এবং অনেকেই আধুনিক অস্ত্র আদান-প্রদান করে বলে দাবী করে প্রতারণা করছে। কিন্তু এখনও ব্যাপক অস্ত্রশস্ত্র দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেনি বলেই অনুমান করা হচ্ছে। ২৫ মার্চ শ্রমিকদের মিছিল আয়োজন করেছিল এমন একটি নক্সালবাদী দলের একজন নেতৃস্থানীয় সদস্য তার দল কর্তৃক সংঘটিত সামান্য কয়েকটি সশস্ত্র লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত আমার কাছে তুলে ধরতে পারল এবং স্বীকার করল যে, “আমরা এখনও খুব দুর্বল।” এমনকি সীমান্তের ওপারে পশ্চিম বাংলায়, যেখানে রাজনৈতিক সহিংসতায় এবছর প্রতিদিন গড়ে আধ ডজন করে লোক নিহত হয়েছে, লক্ষণীয় যে, সেখানে পুলিশ কর্তৃক যে সব অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে তার মধ্যে মাত্র দু’একটা আধা-আধুনিক অস্ত্র রয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে বর্শা, হাতে তৈরি পাইপ গান যা দিয়ে পনেরো ফুট দূরে পর্যন্ত কিছু করা যায় এবং হাতে তৈরি বোমার বারুদ। অবশ্য এতে কোনো সন্দেহ নেই যে গেরিলা কার্যক্রম বৃদ্ধি পাবে এবং অস্ত্রের সরবরাহও বৃদ্ধি পাবে, তবে তা ঘটবে খুব ধীর গতিতে।
অন্যদিকে, গত একমাস ধরে সেনাবাহিনী সংগ্রহ বাড়িয়ে চলেছে। পিআইএ বিমানের প্রতিদিন তিনটি নিয়মিত ফ্লাইট, সম্ভবত প্রতিবার ১৩০ জন করে সৈন্য নিয়ে আসছে; পিআইএ বিমানে এসেছে এমন কিছু লোক আমার চেনা। মালবাহী প্লেনও নিয়মিত আসছে। ঢাকার বেসরকারি পেট্রল ব্যবসায়ীদেরও অতিরিক্ত পেট্রল সরবরাহের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

গুরুতর সংকট
পূর্ব পাকিস্তানে এখন আনুমানিক তিন ডিভিশন সৈন্য সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। ঢাক, কুমিল্লা (একটি আর্টিলারি রেজিমেন্টসহ), রংপুর (অতিরিক্ত একটি আর্মারড রেজিমেন্টসহ) এবং যশোরে এক ব্রিগেডের বেশি সৈন্য রাখা হয়েছে। ঢাকা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী জয়দেবপুরে এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য রাখা হয়েছে। প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী সবচেয়ে বড় বাধার সম্মুখীন হয়েছে, সেখানে পাকিস্তানী সেনাশক্তি বেশি নেই। মার্চের প্রথম দিকে যখন শহরটিতে ভীষণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয় তখন সেনাবাহিনী প্রায় দুহাজারের মতো লোককে হত্যা করে এবং শত শত কলোনি উচ্ছেদ করে। এরপর সেনাবাহিনীকে অবাঙালি পরিবারগুলোর প্রতিরক্ষার কাজে নিয়োগ করা হয়। ২৪শে মার্চ বাঙালিরা শহরের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে বন্দর থেকে সামরিক সরবরাহ আনার ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীকে বাধা দেয়; শহরজুড়ে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়। প্রায় একমাস ধরে সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে জাহাজটি বন্দরে অপেক্ষা করছিল। পরদিন সকাল নাগাদ সৈন্যরা সামরিক সরঞ্জাম খালাস করতে সক্ষম হয়, তবে জনগণ চট্টগ্রাম-ঢাকা সংযোগ রোড বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

দৃশ্যত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ধৈর্য্য ভেঙ্গে পড়ার ক্ষেত্রে এই ঘটনাই হয়তো চূড়ান্ত ইন্ধন জুগিয়েছে। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে অসহযোগ আন্দোলন চলার পুরো সময় ধরেই সামরিক বাহিনী শেখ মুজিবের রাজনৈতিক অনানুগত্যের সামরিক সমাধানের পরিকল্পনা করছিল। জয়দেবপুর, সৈয়দপুর এবং সবশেষে চট্টগ্রামের ঘটনা সেনাবাহিনীর কাঙ্ক্ষিত আক্রমণ চালানোর অজুহাত তৈরি করে দিল। আর সেনাবাহিনী এই পদক্ষেপ নেয়ায় পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু ও পাঞ্জাব প্রদেশের শক্তিশালী দলের নেতা ভূট্টো, যার সাথে সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে, এখন ঈশ্বরের কাছে শুকরিয়া আদায় করছে।

আওয়ামী লীগ নিজে থেকে এসব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কতোটা ইন্ধন জুগিয়েছে সেটা বিবেচনা করা জরুরি। স্বীকার করতেই হবে যে শেখ মুজিব তার জাতীয়তাবাদী এবং কিছুটা উগ্র স্বাদেশীক আন্দোলন চালানোর সময় অবাঙালির ওপর এর প্রভাব যে পড়তে পারে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা চেষ্টা করেননি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ভারতীয় উপমাহাদেশের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানী শোষকরাই ছিল না, অযৌক্তিকভাবে এটা বিহারী উদ্বাস্তুদের ওপরেও পরিচালিত হয়েছে। মুজিব এসব ঘটনায় নিন্দা প্রকাশ করেছেন এবং ইয়াহিয়ার পূর্ব পাকিস্তানে আগমনের দিন একজন পাঞ্জাবীর মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগের তৈরি রোডব্লক ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

সার্বিকভাবে বলা যায়, আওয়ামী লীগ পর্যাপ্ত মাত্রায় আইন-শৃঙ্খলা বজায়ে রেখেছিল। মার্চের প্রথম দিকে চট্টগ্রামে পরিস্থিতি শান্ত করতে অবশেষে আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবী দল সহায়তা করেছিল। ঢাকায় সন্ধ্যাবেলায় সেচ্ছাসেবী দলের নিরাপত্তা প্রহরা অনেক সময় ক্লান্তিকর হয়ে উঠত যখন তারা গাড়ীগুলো থামাতো; কিন্তু কদাচিৎ তাদের ব্যবহার বিদ্বেষপারায়ন ছিল, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনুরোধে তারা কোনো কোনো অবাঙালির নিরাপত্তাও দিয়েছে। আওয়ামী লীগের চার সপ্তাহব্যাপী শাসনে কিছু ফ্যাসিস্ট উপাদানেরও আভাস পাওয়া গেছে। তারা লাঠিসোঁটাসহ গুণ্ডাদের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে, ছাত্রলীগের সদস্য পরিচয় দিয়ে কেউ কেউ ফোন করে অবাঙালিদের হুমকি দিয়েছে। এই চার সপ্তাহে একদলীয় দেশে আওয়ামী লীগের ফান্ডে অর্থদাতাদের তালিকা করে চাঁদা চাওয়া হয়েছে।

পূর্ণ ঐক্যমত্য
“পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আর একটাও আন্দোলন দেখা যায়নি। কোনো দেশের মানুষ এতোটা ঐক্যবদ্ধ হয়নি।” ঢাকার যে অনুষ্ঠানেই আমি গিয়েছি, আমার অসংখ্য বন্ধু এবং অপরিচিত ব্যক্তিরা এসব কথা বলেছে আমাকে, “সেনাবাহিনী যদি সত্যি সত্যিই অভিযান শরু করে তবে তাদের সহযোগী কোনো বিশ্বাসঘাতক এখানে পাওয়া যাবে না।” অসহযোগ আন্দোলনের সেই চার সপ্তাহে অফিস ও কারখানাগুলোতে আওয়ামী লীগারদের বাধা দেয়া অবশ্যই সুবিবেচনাপ্রসুত হতো না। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের কাছেই অনুমতি চাওয়া হয়েছে গ্রামের উদ্দেশ্যে জলযানগুলো চলাচল করবে কিনা। কেউ সন্ধিহান হতে পারেন বটে, বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিদের একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তিতে বিরক্ত হতে পারেন বটে, কিন্তু এটাই সত্য যে অসহযোগের চার সপ্তাহেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা নিজেদের শাসনাধীনে বাস করছে বলে মনে করেছে। সবসময় একটা ভয় ছিল সামরিক বাহিনীর ওপর আস্থা রাখা যাবে না; যদিও জনগণ বার বার বলছিল যে তাদের দাবী আদায়ের পথ এবং তাদের অধিকার আদায়ের চেতনায় তারা সামরিক সমাধানে বিশ্বাসী নয়, তবু ভয় ছিল যে সামরিক বাহিনী যেকোনো সময় হস্তক্ষেপ করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করলো। হতে পারে যে সমঝোতায় পৌঁছাতে মুজিবের ব্যর্থতার কারণ ছিল এই যে তিনি আসলে সমঝোতায় পৌঁছাতে চাননি। দশ বছর বা অনুরূপ সময়ের লক্ষ্য নিয়ে তিনি হয়ত আশা করছিলেন এ সময়ের মধ্যে ঘটনা তাঁর পক্ষে মোড় নেবে। এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে নিজেকে তিনি দেশের জন্য উৎসর্গীকৃত বিবেচনা করতেন। আমার সাথে এবং অন্যান্য সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে সবসময় তিনি বলতেন, “তারা যদি আমাকে গ্রেপ্তার করতে আসে, আমি এখানেই থাকব, অন্যান্য বিপ্লবী নেতাদের মতো আমি পালাব না।” তিনি দুহাত পিঠের দিকে ঘুরিয়ে দেখাতেন, যেন বাঁধা হয়েছে। তিন যেটা আশঙ্কা করেছিলেন এখন তাই ঘটল। তিনি জীবিত থাকুন কিংবা সামরিক বাহিনীর হাতে নিহত হন- যাই হোক না কেন এখন নেতৃত্ব এমন লোকদের হাতে চলে যাবে (আর এই পরিস্থিতিতে কে-ই বা যুক্তি দিয়ে তাদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করবে) যাদের বিবেচনায় সহিংসতাই একমাত্র পথ। আপাতত এখানকার পরিস্থিতি ভিয়েতনামের চেয়ে সাইপ্রাসের সাথেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। জনপ্রশাসন আবার পরিচালিত হতে থাকবে, লোকজন চাপা ক্রোধ নিয়ে অফিসে ফিরে যাবে। গত চার সপ্তাহের ক্ষয়ক্ষতির কারণে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি আরও মন্দাভাবে চলতে থাকবে এবং চেকোস্লোভাকিয়ার মতো এখানকার জনগণের অনীহার করণে উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।

বস্তুত, প্রাকৃতিক সংকটগুলো - জনসংখ্যার চাপ, বন্যা ও ঘূর্ণীঝড়ের প্রাবল্য - পূর্ব পাকিস্তানকে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান নৈরাশ্যজনক স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ‘আমার স্বপ্নের বাংলা’ হিসেবে শেখ মুজিব যে দেশকে আখ্যায়িত করেন সে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে গেলে জনগণের মতোই তারও স্বপ্নভঙ্গ ঘটবে। আর একারণেই তিনি হয়তো সমঝোতায় না গিয়ে নিজেকে উৎসর্গ করে দিলেন।

দ্যা গর্ডিয়ান
২৯ মার্চ, ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৫
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৬
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৭
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৮
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৯
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১০
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১৪
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29515646 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29515646 2012-01-03 21:53:13
পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় বন্যা অনুবাদ: আ-আল মামুন


ফোকাস
ডেভিড হোলডেন পূর্ব পাকিস্তানে সংঘাতময় পরিস্থিতি গড়ে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত এর ফলে অশান্ত সংকটে পৌঁছানোর পেছনে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবকের অনুসন্ধান করেছেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যদি সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে না পারেন এবং রাষ্ট্রের সংহতি দ্রুত ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হন তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে আরেকবার দেশ বিভাজনের চেতনা প্রবল হয়ে উঠবে।



পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ট্রাজেডি ২৫ বছর আগে বৃটিশ শাসন অবসানের মাধ্যমে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তারই যৌক্তিক পরিণতি। সে সময় একটি স্বতন্ত্র এবং সুনির্দিষ্টভাবে মুসলমানদের জন্য রাষ্ট্র তৈরী করতে গিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নহ ও তার সহযোগী মুসলিম লীগ নেতারা উদ্ভট এক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল হাজার মাইল শত্রুভাবাপন্ন ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন দুটি এলাকা জনগণকে নিয়ে, যাদের ভাষা আলাদা, সংস্কৃতি আলাদা; শুধুই ইসলামী বন্ধনের দ্বারা দুটি এলাকা এক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হলো।

যা ঘটেছে তা হলো, সিকি শতাব্দী পর বিশ্ব নাট্যাশালায় ক্রমাবর্ধমান হারে টালমাটালভাবে চলতে চলতে পশ্চাদবর্তী অংশ পূর্ব পাকিস্তান অবশেষে অগ্রবর্তী অংশ পাশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছন্ন হয়ে গেল। একক পাকিস্তান এই সপ্তাহান্ত পার করতে পারলো না! ইয়াহিয়া খানের সহযোগী বাহিনী ও ট্যাংক বহরের তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছে না যে তারা দু’টুকরো হয়ে যাওয়া পাকিস্তান আবার সংযোজিত করতে পারবে। এই মুহূর্তে যদি সেখান থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্বাস করা যায় তবে বলতে হবে প্রেসিডেন্ট ও তার বাহিনীই প্রভাব বিস্তার করে আছে। পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানা গেছে। পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারী করা হয়েছে এবং শুক্রবারে ঢাকায় জারীকৃত সান্ধ্য আইন গতকাল সকাল থেকে নয় ঘণ্টার জন্য রহিত করা হয়েছে। পাকিস্তানের সরকারি রেডিও কোনোরকম ভনিতা ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নির্দেশনামা সম্প্রচার করছে। এবং পূর্ব পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলের কোনো এক জায়গা থেকে সম্প্রচার করা গুপ্ত রেডিও কেন্দ্রটি সম্পর্কে সামান্যই জানা গেছে। এই কেন্দ্র থেকেই শুক্রবার ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার’ ঘোষণা দেয় বলে খবর পাওয়া গেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই পূর্ব-প্রদেশকে ‘বাংলাদেশ’ নামেই আখ্যায়িত করেছে। গতকাল পর্যন্ত ভারত হয়ে আমাদের কাছে যেসব খবর এসে পৌঁছাচ্ছে তাতে দেখা যায় পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ শহরে ব্যাপক যুদ্ধ চলছে এবং চট্টগ্রামে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ও বাঙালি রেজিমেন্টের সৈন্যরা ঘিরে রেখেছে; পাকিস্তান বাহিনী পরাজিত প্রায়- এসব খবরের সত্যাসত্য সম্পর্কে নিশ্চিত কিছুই জানা যায়নি।

পশ্চিম-বাংলা বর্ডার দিয়ে ভারতে উদ্বাস্তু হয়ে আসা পূর্ব পাকিস্তানীদের মাধ্যমে ভারত থেকে পাওয়া আরেক খবরে জানা গেছে ইতোমধ্যে দশ হাজার নিরীহ বাঙালি নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে দেড় হাজার কৃষক যারা যশোর বিমানবন্দর দখল করতে গিয়ে সেনা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। কিন্তু এই খবরকেও একটু সংযমের সাথে বিবেচনা করতে হবে। কারণ ভারতীয় পার্লামেন্টের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া থেকেই বুঝা গেছে যে তার প্রতিবেশী সম্পর্কে তাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপটাই বিশ্বাস করার প্রবণতা বিরাজ করছে। কিছু ভারতীয় সাংসদ ইতোমধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করেছে। পাকিস্তান বিরোধী যুদ্ধের পুরনো সমর্থক কৃষ্ণ মেনন তো অতিসত্ত্বর ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার আহবান জানিয়েছেন।

অন্যাদিকে, পাকিস্তান রেডিও কঠোর নির্দেশনামা জারী করেছে। যেকোনো সামরিক আইন অমান্যকারীর জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ডের ঘোষণা দেয়া হয়েছে; প্রেসের ওপর পূর্ণ সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে; সকল মিটিং-মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং সেনাবাহিনীর চলাচলের ক্ষেত্রে কোনোরূপ গতিরোধক তৈরি বা বাধাদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব নির্দেশনা থেকেই বুঝা যায় পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ কতোটা প্রতিরোধের আশঙ্কা করছে। শেখ মুজিবের পক্ষে প্রায় ১,০০,০০০ সশস্ত্র সামরিক সদস্য সংগঠিত হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে এবং আরও ১২-১৫,০০০ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস্ সদস্য স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে যোগ দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। সুতরাং শুরু থেকেই সশস্ত্র প্রতিরোধ মোকাবিলায় ইয়াহিয়া বাহিনীকে ব্যাপক কষ্ট পোহাতে হবে। এর সাথে আবার নিশ্চিতভাবেই বলা যায় পূর্ব-পাকিস্তানের সমগ্র সাড়ে সাত কোটি জনতাই শেখ মুজিবের পক্ষে রয়েছে। ফলে, প্রেসিডেন্টের নির্দেশ বলবৎ করার জন্য পশ্চিম-পাকিস্তানী ৭০,০০০ সৈন্য রয়েছে বলে যে খবর পাওয়া গেছে তা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যএকেবারেই নস্যি মনে হয়।

গোরিলা অঞ্চল
ইয়াহিয়া বাহিনীর জন্য যেকোনো প্রকার চলাফেরা করাই ঝুঁকিপূর্ণ হবে। অধিকন্তু পূর্ব পাকিস্তানীদের আবাসস্থলের নদ-নদী ও জলাভূমি পরিপূর্ণ এলাকা গেরিলা প্রতিরোধের জন্য খুবই উপযোগী। অন্যদিকে, পশ্চিম-পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে পর্যাপ্ত সৈন্য সমাবেশের জন্য একমাত্র সমুদ্রপথই খোলা আছে। কিন্তু করাচী থেকে ভারতের দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে চট্টগ্রামে জাহাজ পৌঁছাতে ছয়দিন সময় লেগে যায়। একটি ভারতীয় বিমান ছিনতাই করে পাকিস্তানে অবতরণের পর থেকে গত কয়েক সপ্তাহ ভারতীয় আকাশসীমা দিয়ে পাকিস্তানী বিমান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টির যদিও মনে হয় যে চীনা তিব্বত হয়ে পাকিস্তানী বিমান পূর্ব পাকিস্তানে আসতে পারে। কিন্তু ব্যাপক সৈন্য সমাগম ও যন্ত্রপাতি এই পথে বিমানযোগে পরিবহণ পাকিস্তানের আর্থিক সামর্থ্যে কুলোবে না।

সেহেতু, কেবলমাত্র অতিদ্রুত কিছু লোককে হত্যা করে এবং এর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী যদি জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলতে না পারে তাহলে সেনাবাহিনীকে অবনতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখী হতে হবে। আর তখন তারা শুধু কৌশলগত অবস্থানগুলোতে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য হবে এবং দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যাবে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ প্রধান বিমানবন্দরগুলো, সড়কপথ এবং রেডিও কেন্দ্র তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ক্ষেত্রগুলোর বাইরে বিস্তৃত এলাকায় যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে।

অবহেলিত প্রান্ত
পূর্ব পাকিস্তানে ইয়াহিয়ার পুনঃকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আশু বাস্তব ফলাফল যাই হোক না কেন, মানসিকভাবে পাকিস্তানীরা আলাদা হয়ে গেছে। এই বিচ্ছিন্নতার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হতে এতোদিন সময় লাগলো সেটাই বিস্ময়ের। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরুর বছরগুলো থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা নিজেদেরকে পাশ্চিম-পাকিস্তানী শাসকবর্গের কাছে অবহেলিত হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। আইয়ুব খানের উচ্চাভিলাষী সামরিক একনায়কতন্ত্রের এক দশকে বাঙালিদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না করে বরং তীব্রভাবে দমন করা হয়। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খান যখন অপসারিত হলো বাঙালিদের এসব আশা-আকাঙ্ক্ষা আকস্মাৎ বিক্ষোভরূপে প্রকটিত হয়ে উঠলো। প্রতি বর্গমাইলে ১৩০০ বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তান পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং এটি পৃথিবীর নিম্নতম জীবনমান সম্পন্ন এলাকাগুলোর অন্যতম। এক হাজার মাইল দূরবর্তী রাওয়ালপিন্ডী ও করাচীর কেন্দ্রীয় শাসনের সাথে তারা খুব সামান্যই একাত্মতা বোধ করে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে চলা পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধও তাদের আবেগকে খুব কমই স্পর্শ করে। যদিও এই যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানের যে সামরিক ব্যায় হয় তার সিংহভাগ বহন করে পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র পাট রপ্তানী থেকেই পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক মূদ্রার অর্ধেক অর্জিত হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট বরাদ্দের তিন ভাগের এক ভাগেরও কম পায় পূর্ব পাকিস্তান। বাঙালিরা দেখলো কোনোরূপ আর্থিক ব্যায়ের হিসাব ছাড়াই পশ্চিম পাকিস্তানে নতুন রাজধানী রাওয়ালপিন্ডীকে ঐশ্বর্যমণ্ডিতভাবে গড়ে তোলা হলো, অন্যদিকে তাদের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও সরকারি ব্যায় বৃদ্ধির কারণে।

আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে বাঙালি কেরানী ও ব্যবস্থাপক শ্রেণীর সাথে পাঞ্জাবী যুদ্ধবাজ শ্রেণীর মধ্যে বিদ্যমান পুরনো বিদ্বেষ প্রবল হয়ে ওঠে। এই বাঙালি কেরানী-ব্যবস্থাপক শ্রেণীটি বৃটিশ আমলে প্রশাসনের প্রধান অবলম্বন ছিল। অন্যদিকে পাঞ্জাবী যুদ্ধবাজ শ্রেণীটিও বৃটিশ ভারতে যেমন সেনাবাহিনীতে প্রতাপশালী ছিল তেমনই পাকিস্তান আমলেও প্রতাপশালী হয়ে ওঠে। ১৯৬৫ সালে ভারতের সাথে কাশ্মির নিয়ে অমিমাংশিত যুদ্ধ শেষে বাংলার দুর্দশা আরও বৃদ্ধি পায় কারণ কেন্দ্রীয়ভাবে ভারতের সাথে সকল বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়। এর ফলে নিকটস্থ কোলকাতা বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানী বাণিজ্য পরিচালনা এবং শিল্প-কারখানার জন্য ভারতীয় সুলভ কয়লা আমদানী করা থেকে তারা বঞ্চিত হয়।

মুজিবের প্রচারণা
প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান গণতন্ত্র প্রত্যার্পণের ওয়াদা করেছিলেন, তার পতনের পর অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই পথই সুগম হলো। পূর্ব পাকিস্তনের আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে কাশ্মীর যুদ্ধের পরপরই ১৯৬৬ সালে গ্রেপ্তার করা হয় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসনের জন্য ছয়-দফা দাবীনামা পেশ করার দায়ে। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনে এটা চতুর্থবারের মতো কারাবরণ। তার এই গ্রেপ্তার বাঙালিদের কাছে তাকে দেশমাতৃকার জন্য আত্মোৎসর্গকারী নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল এবং তার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে পালিত ধর্মঘট ও আন্দোলন ছিল আইয়ুব খানের পতনের প্রধান কারণ। জেল থেকে শেখ মুজিব যখন মুক্তি পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি বিচ্ছিন্নতাবাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন এবং ইয়াহিয়া খান যখন ডিসেম্বরে দেশব্যাপী সংসদ নির্বাচন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তখন বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারা, তার ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাকে স্ব-শাসনের পক্ষে নির্বাচনে প্রচারণা চালাতে বাধ্য করল যার ফলাফল ছিল তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

শেখ মুজিব কোনো অর্থেই বিপ্লবী নন। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল এবং শক্তি অর্জন করছিল। আর এই জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রভাব দেশের পশ্চিমাংশেও পড়েছিল। বিভাজন রোধকল্পে এবং পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম-পাকিস্তানের সকল প্রদেশকে আইন, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বায়ত্বশাসন দেয়ার ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু এই ওয়াদার সাথে সাথেই সঙ্গোপনে বিশেষত সেনাবাহিনীর মধ্যে এই আতংক জেগে উঠেছিল যে, যদি এই ওয়াদা পূরণ করা হয় তাহলে সামরিক বাহিনীতে পাঞ্জাবীদের প্রধান্যশীল ভূমিকা হ্রাস পাবে এবং গোপনে এই হুমকিও বিরাজ করছিল যে প্রেসিডেন্ট এই ওয়াদা পালন করতে গেলে সামরিক বাহিনী আবার ক্ষমতা দখল করে নেবে।

সাধারণ নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত প্রথম তারিখ অর্থাৎ গত অক্টোবরে নির্বাচন হলে হয়তো কোনো প্রকার সমঝোতায় পৌঁছান যেত যদিও তখনও বাঙালি বিচ্ছিনতাবাদী আন্দোলোন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু সমঝোতায় যে সম্ভাবনাই থাক না কেন তা হেমন্তের প্রলয়ঙ্করী প্রাকৃতিক বন্যায় ভেসে যায়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন স্থগিত করেন। কিন্তু বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসন নিয়ে সমস্যা ঘনিভূত হয়। বিধ্বংসী বন্যার ব্যাপকতা সামাল দেয়া পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও আর্থিক সামর্থ্যর বাইরে চলে যায়। গাঙ্গা উপত্যকার বাংলায় অসংখ্য মৃত্যু ও ধ্বংস ঘটে এই বন্যায় এবং প্রতিদিনই এই বন্যা মোকাবিলায় সরকারের দুর্নীতি ও অদক্ষতা প্রকটিত হয়ে ওঠে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, বন্যাকবলিত বাঙালিদের দুর্দশায় পাশ্চিম-পাকিস্তানী প্রশাসন একেবারে নির্মোহ ভাব প্রদর্শন করে যা বাঙালিদের পাকিস্তানবিরোধী আবেগকে দুর্বার করে তোলে।

অবশেষে গত ডিসেম্বরে পুনরায় যখন সাধারণ নির্বাচন হলো তখন শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ স্বশাসনের পক্ষে প্রচারণা চালালো যেখানে পরিপূর্ণ বিচ্ছিন্নতার একটু নিচের অবস্থানে থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতি রাখর কথা বলা হলো। আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল অভাবনীয়। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ১৫৩টি আসনের মধ্যে ১৫২টি লাভ করে আওয়ামী লীগ। শেখ মুজিব অদ্ভুত এক অবস্থায় পড়লেন। তিনি একদিকে আপাতদৃষ্টিতে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনীতিবিদ ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হলেন, কিন্তু এমন একটি দেশে যেখানে তার কর্মসূচি ও দল দেশটি ভাঙ্গার চেষ্টা করছে বলে প্রতীয়মান। একইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভূট্টোর নেতৃত্বাধীন পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৩৮ আসনের মধ্যে ৮১টি আসন লাভ করল, যা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে কম গুরুত্ববহ। এই প্রথমবারের মতো দেশের দুই শাখার বিচ্ছিন্নতাবাদী ভাবধারা পরস্পরের মুখোমুখী হলো। ইসলামী ভাতৃত্বের পুরনো বন্ধন স্পষ্টতই অন্য এক আবেগ দ্বারা বিচ্ছিন্ন হলো এবং দুই অংশের সমন্বয় বা বিচ্ছিন্নতার জন্য সামরিক ভয়ভীতি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না।

চরমপন্থীদের প্রতীক্ষা
সমঝোতার সকল পথ রুদ্ধ হয়েছে এবং বলপ্রয়োগ ছাড়া এখন আর কোনো পথ খোলা নেই। সব প্রচেষ্টাই যেখানে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে বলপ্রয়োগ সফলতা আনবে এটা আশা করা বাতুলতা। কয়েক হাজার মৃত্যুর বিনিময়ে বাঙালিদের এখনকার মতো দমিত করা গেলেও যে চেতনা দেশটিকে বর্তমান ট্রাজেডির দিকে ধাবিত করেছে সেই চেতনা আরও গভীরতর হবে। অনিশ্চিত সরবরাহ লাইনের ওপর নির্ভর করে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে দমিয়ে রাখার আর্থিক ও আবেগগত মূল্য দেয়া পাকিস্তানের পক্ষে শেষ পর্যন্ত সম্ভব হবে না। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের বিক্ষোভ মেটানোর জন্য শেষ পর্যন্ত কোনো পথ খোলা আছে এমন বলা যায় না।

সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই গৃহযুদ্ধ পরিপূর্ণ স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত করবে যদি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সামরিক অধিগ্রহণের মাধ্যমে দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখেন। কারণ শেখ মুজিব জেলে থাকুন বা বাইরে থাকুন তার পিছনে রয়েছে আরও কট্টরপন্থী ব্যক্তিবর্গ। এই কট্টরপন্থীদের কেউ কেউ তার নিজের দল আওয়ামী লীগের সদস্য, যারা সম্ভবত শেখ মুজিবের ইচ্ছার তোয়াক্কা না করে তাকে গত কয়েকমাসে বিচ্ছিন্নতাবাদের দিকে অগ্রসর করিয়েছে। আর, আওয়ামী লীগের বাইরের অন্যরা কট্টর বিপ্লববাদী দলগুলোর সদস্য।

বয়োবদ্ধ কিন্তু এখনও সকলের শ্রদ্ধার পাত্র মওলানা ভাষানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গত ডিসেম্বরের নির্বাচন বয়কট করেছিল এবং তার দল এখন কিছু উপদলে বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু এখনও হাজার না হলেও কয়েকশত দক্ষ নেতা রয়েছেন যারা ইতোমধ্যে পশ্চিম বাংলার নকশাল আন্দোলনের নির্দেশনা অনুসরণ করে কৃষক বিপ্লব ঘটানোর জন্য প্রস্তুত হয়েছে এবং সম্ভবত তারা মাওবাদী চীনের সহায়তা নেবে। পূর্ব পাকিস্তানে দীর্ঘদিন সামরিক দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকলে তা বিপ্লবীদের শক্তি বাড়াতেই সহায়তা করবে। আর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সংক্ষিপ্ত অভিযান শেষে বিকল্প স্থানীয় নেতৃত্ব বের করে পুনঃসংহতিবিধানের যে আশা করেছিলেন তা এখন চন্দ্রের চেয়েও দূরবর্তী বলে মনে হচ্ছে।

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে কী?
বাঙালি কৃষকদের যুদ্ধ করার মতো বুকের পাটা নেই- ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীর যুদ্ধবাজরা এরূপ মনে করলেও তা যথার্থ নয়। ভারতে ইতোমধ্যে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে গণঅভ্যুত্থান গড়ে তোলার মতো শক্তি কৃষকদের রয়েছে। যাহোক, যতোই হতবুদ্ধিকর বা বিভ্রান্তিকর মনে হোক না কেন, পাকিস্তান বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে তাদের অবস্থান যতো দীর্ঘায়িত করবে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম বাংলার বিপ্লবীরদের একই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ততো বেশী সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এই আশঙ্কার ব্যাপারে রাওয়ালপিন্ডী ও নয়াদিল্লী উভয়পক্ষেরই সতর্ক হওয়া দরকার। দুই দেশের বাঙালি ঘনবসতিপূর্ণ এই প্রান্তে যে বিপ্লবী তৎপরতা শুরু হয়েছে তা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসনের দাবীর ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানে জনমতের ভিতরেও বিভাজন পরিলক্ষিত হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানকে বলপূর্বক একীভূত রাখতে গিয়ে যদি দেশটি ক্ষমতার অপচয় করে তাহলে পশ্চিম পাকিস্তানে এই বিভাজন আরও বেড়ে যাবে। বিশেষত পাঞ্জাবী সামরিক নেতাদের নির্দেশে যদি দেশের শক্তিক্ষয়ের নীতি গৃহীত হয় তবে জনমতের বিভাজন বেড়ে যাবে। পশ্চিম পাকিস্তানীরা অসঙ্গত যুদ্ধনীতি গ্রহণ করবে না কারণ পাঞ্জাবী কর্তৃত্ব সেখানেও জনপ্রিয় নয়।

এটা অবশ্য সত্য যে পশ্চিম পাকিস্তানে ইসলামী রক্ষণশীল ধারা এখনও শক্তিশালী। নবীর প্রতি গভীর আস্থা ও মহম্মদ আলী জিন্নাহর পবিত্র স্মৃতির প্রতি আস্থাশীল পশ্চিম পাকিস্তানীরা একক পাকিস্তান রক্ষা করাকে পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করে। কিন্তু প্রাদেশিক বিক্ষোভ মেটাতে এটাই যথেষ্ট নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে বাংলার মনস্তাত্বিক বিচ্ছিন্নতা যদি বাড়তেই থাকে তাহলে আইনানুগভাবে দুই অংশের পৃথক হয়ে যাওয়ার পক্ষেও পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকের সংখ্যা বাড়তে পারে। পূর্ব পাকিস্তানের পাট অত্যান্ত মূল্যবান কিন্তু সেখানকার সীমাহীন দরিদ্রকেও অস্বীকার করবার উপায় নেই। আর এ কারণেই তারা হয়তো পূর্ব পাকিস্তানকে তার ‘নিজের ভাগ্যমতো ধ্বংস হতে দাও’ এই মতের পক্ষে রায় দিতে পারে।

বাংলাকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যে সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছেন, অনুরূপ সঙ্কটে সাম্প্রতিক নির্বাচনী জয়ের পরে ভারতের ইন্দিরা গান্ধীও পড়তে পারেন। যখন দেখা যাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানের পশ্চিম-পাকিস্তানের সাথে একত্রে থাকার সম্ভাবনা একেবারেই নেই তখন ভারতের স্বার্থেই, যত দ্রুত সম্ভব শেখ মুজিবের কর্তৃত্ব থাকতে থাকতেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি অর্জন করাতে হবে। কারণ শেখ মুজিব যদি দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ থাকেন তাহলে পূর্ব পাকিস্তানের গণজোয়ারের প্রভাবে ভারতীয় অংশের বাংলায়ও শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা হ্রাস পাবে। তদুপরি, পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে গেলেও ভারত নিশ্চিন্ত হতে পারবে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শুধু বাংলায় নয়, অন্যান্য প্রদেশেও যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছে তা নির্বাচন বিজয়ী মিসেস গান্ধী দীর্ঘদিন হয়ত গোপন রাখতে পারবেন না। সর্বোপরি, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যদি বাধাগুলো অতিক্রম করতে না পারেন তাহলে এই সপ্তাহান্তে অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে থাকবে। বৃটিশ শাসনের অবসানের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেভাবে যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানো গিয়েছিল, সেরকম কোনো সমাধানে না গিয়ে বরং ভারতীয় উপমহাদেশ আঞ্চলিক বিভাজনের দীর্ঘ পথে যাত্রা শুরু করবে।

দ্যা সানডে টাইমস
২৮ মার্চ, ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৫
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৬
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৭
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৮
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৯
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১০
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১৩ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29511756 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29511756 2011-12-28 21:13:44
শেখ মুজিব সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন অনুবাদ: আ-আল মামুন

আমাদের বিদেশ সংবাদদাতা

বাঙালি বিদ্রোহের নেতা কোথায় আছেন সে ব্যাপারে গতকাল পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে পরস্পর বিরোধী খবর পাওয়া গেছে। পাকিস্তানের সরকারি রেডিও থেকে বলা হয়েছে যে ঢাকার মধ্যবিত্ত অঞ্চলের বাসভবন থেকে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এখন তিনি বন্দী হয়ে আছেন। আবার ভারত থেকে একটি রেডিও সম্প্রচার শোনা গেছে যার কণ্ঠস্বর শেখ মুজিবের বলে দাবী করা হয়েছে। এতে বলা হয় ‘আমি এখন চট্টগ্রামে অবস্থান করছি এবং বাংলাদেশের মতোই মুক্ত স্বাধীন রয়েছি। শুক্রবারে স্বাধীনতা ঘোষণাকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের নাম দেন: বাংলাদেশ।

চট্রগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সমূদ্রবন্দর এখন শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে বলে খবর পাওয়া গেছে, তারা এখন নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সংগঠিত করছে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভারতের দক্ষিণ ঘুরে দীর্ঘ সমুদ্র পেরিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য প্রেরণের প্রধান পথই চট্টগ্রাম বন্দর। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে তার ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম শহর ভারী গোলাবর্ষণ ও ট্যাংক আক্রমণের শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।

‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার’ পরিচয় দেয়া সম্প্রচারকেন্দ্রটি থেকে শেখ মুজিব নিজে সম্প্রচার করছেন বলে দাবী করা হয়েছে। বক্তা বলেন, “ট্যাংক কিংবা বোমা দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের চেতনাকে রুদ্ধ করা যাবে না।” তিনি তার অনুসারীদেরকে পাকিস্তানী দখলদারদের খুঁজে বের করে ধ্বংস করার আহ্বান জানান। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন। বিপ্লবী রেডিও থেকে জাতিসংঘের কাছেও সাহায্যের আবেদন জানানো হয়েছে। এছাড়া সকল রাষ্ট্রের কাছে, বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনে সাহায্য করার জন্যও অনুরূপ আবেদন জানানো হয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতই এই আবেদনে সাড়া দিতে সক্ষম। একমাত্র ভারতেরই পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে এবং কোলকাতা থেকে উত্তর দিকে কুচবিহার পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তনের সাথে সীমান্ত সংযোগ আছে। আর, একশ মাইল দূরে তিব্বতের সুউচ্চ হিমালয় রেঞ্জে কম্যুনিস্ট চীনের সৈন্যবাহিনী আছে।

পূর্ণ সেন্সরশিপের কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে অল্প, ছোট ছোট সংবাদ আসছে এবং সম্ভবত সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়। একটি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে যে প্রথমদিকে মৃতের সংখ্যা ছিল ১০,০০০। কিন্তু পাকিস্তান রেডিও বলেছে যে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক যুদ্ধের খবর ভিত্তিহীন এবং দাবী করা হয়েছে, পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের অবস্থা খুব দ্রুত স্বাভাবিক হয়েছে আসছে। কিন্তু এই সন্দেহজনক পরিবেশের মধ্যেই ভারতীয় পার্লামেন্ট থেকে তীক্ষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে এবং পূর্ব-বাংলায় সাহায্য পাঠানোর দাবী জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় হস্তক্ষেপের পক্ষে দৃঢ় ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি জাতির একসুরে গৃহীত গণতান্ত্রিক পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই’। তিনি মূলত গত ডিসেম্বরের নির্বাচন সম্পর্কে একথা বলেন, যে নির্বাচনে শেখ মুজিব ও তার আওয়ামী লীগের প্রায় পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন নীতিমালার পক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল।

মিসেস গান্ধী আরও বলেন, ‘ভারত সরকার পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ সজাগ এবং সঠিক সময়েই পদক্ষেপ নেবে। শুধু তত্ত্বীয় ভিত্তিতে কথা বলা যাবে না; আমাদেরকে আন্তর্জাতিক আইনকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। অবশ্য এটা সত্য যে একটি নিরস্ত্র জাতির ওপর সাঁজোয়া আক্রমণ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে’। বিদেশ মন্ত্রী স্মরণ সিং এর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সংসদে যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল তার পরপরই প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্য দেন। স্মরণ সিং তার বক্তব্যে পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য বলেছিলেন, ভারত সরকার আশা করে যে ‘পরিস্থিতির এই পর্যায়েও পাকিস্তান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করতে সক্ষম হবে।’ যদিও, প্রেসের রিপোর্টগুলোর ওপর নির্ভর করে বিদেশমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে দমন করার জন্য দুই ডিভিশনের বেশী পাকিস্তানী সৈন্য নিয়োগ করা হয়েছে,’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাপক নির্যাতনভোগকারী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জন্য আমাদের হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে।’

ভারতের প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী কৃষ্ণ মেনন জেনোসাইড কনভেনশন বিধি প্রয়োগের ব্যাপারে ভারতকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও আশা করেন, বাংলাদেশের নতুন সরকার স্বীকৃতির আবেদন জানালে ভারত স্বীকৃতি দেবে। এদিকে, ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান শ্যাম মানেক্ষো (Sam Manekshow) দ্রুত পুনে সফর শেষ করে দিল্লী ফিরে এসেছেন।

বিশেষত ভারতীয় সংবাদ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে কিছু সন্দেহজনক রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও নিঃসন্দেহে বলা যায় যে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক অভ্যুত্থান চলছে। এ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ যে চিত্র পাওয়া গেছে তা থেকে অনুমান করা যায়, ঢাকাতে রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে, এবং ভারতীয় বর্ডার সংলগ্ন শহরসমূহ ও চট্টগ্রাম যাওয়ার প্রধান সড়ক বরাবর প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রগুলো বিস্তৃত।
এটা একেবারে স্পষ্ট যে ইয়াহিয়ার সৈন্যবাহিনীর মনোযোগ প্রধানত ভারতের হস্তক্ষেপের অনুকূল পূর্ব পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল এবং সৈন্য আনা নেয়ার প্রধান মাধ্যম চট্টগ্রাম সড়ক বরাবর কেন্দ্রীভূত। যশোরে লুঙ্গিপড়া আওয়ামী লীগের যোদ্ধারা শুধুমাত্র বল্লম ও তলোয়ার সজ্জিত হয়ে বিমান বন্দর দখলের চেষ্টা করেছে বলে জানা গেছে। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা শেখ মুজিবের পক্ষে গণজোয়ারে সামিল হয়েছে। ঢাকা থেকে সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকরা সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের জেনারেল ইয়াহিয়ার প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খানের গৃহ আক্রমণ করে তাকে হত্যা করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ মাসের প্রথমদিকে যখন শেখ মুজিবুর রহমান তার সফল অসহযোগ আন্দোলন শুরু করলেন তখন জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ইচ্ছে ছিল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর হিসেবে দায়িত্ব দেবেন কিন্তু পূর্ব বাংলার দেশপ্রেমিক বিচারপতি টিক্কা খানকে শপথ গ্রহণ করাতে অস্বীকৃতি জানান।

সারাক্ষণ ধরে পাকিস্তান রেডিও সযত্নে এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে যে পরিস্থিতি ইয়াহিয়ার সামরিক সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে । নতুন সামরিক বিধানগুলো সবসময় সম্প্রচার করে সরকারি কর্মচারীদেরকে অফিসে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে এবং অফিসে যোগদানে ব্যর্থ হলে গ্রেপ্তার করার হুমকি দেয়া হচ্ছে। আজ দিনের বেলা ৯ ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে রেডিওতে। আর সাংবাদিকদেরকে সব সময়ের জন্যই কারফিউয়ের আওতামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

পূর্ব পাকিস্তানের এখনও অনুন্য ছয় শতাধিক বৃটিশ নাগরিক অবস্থান করছেন এবং ঢাকাস্থ বৃটিশ হাইকমিশন অফিসের সাথে তারা সংযোগ বিচ্ছিন্ন বলে জানা গেছে। কিছুদিন আগে বৃটিশ মহিলা ও শিশুদেরকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। এখনও যেসব বৃটিশ নাগরিক পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করছেন তাদের অধিকাংশই দূতাবাস কর্মী, ব্যবসায়ী ও চা-বাগান কর্মী। অষ্ট্রেলিয়া সরকার অবিলম্বে অষ্ট্রেলীয় নারী ও শিশুদের অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে। এরা সকলেই কলম্বো পরিকল্পনার বিশেষজ্ঞ ও মিশনারীদের পরিবারবর্গ।

কোলকাতা থেকে পাওয়া এক খবরে প্রকাশ পাকিস্তানী সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচার জন্য ২০০ পূর্ব পাকিস্তানী পশ্চিম বাংলার সীমান্ত দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বন্যার মতো পূর্ব পাকিস্তানী শরণার্থী আগমনের আশঙ্কা করছে। দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেস পার্টির চারজন সাংসদের নেতৃত্বে সহস্রাধিক ভারতীয় নাগরিক পাকিস্তান দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। তারা জেনারেল ইয়াহিয়া ও টিক্কা খানের ছবিতে অগ্নি সংযোগ করে এবং পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অগ্রাসন বন্ধের দাবী জানায়। পাকিস্তান রেডিও বলেছে, ‘পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতের নির্লজ্জ উদ্দেশ্য-প্রণোদিত হস্তক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইয়াহিয়া সরকার।’ অবশ্য ভারত কীভাবে হস্তক্ষেপ করছে সে ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।
দ্যা অবজারভার
২৮ মার্চ, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

জবরদস্থির ঐক্য চলবে না

বিশ্বের কাছে অবিভক্ত পাকিস্তানের গুরুত্ব অপরিসীম। পাকিস্তানের বিভক্তি এশিয়ায় অধিকতর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা রোধ করা কিংবা ঐক্য পুনপ্রতিষ্ঠা করা যাবে না। বরং এই প্রক্রিয়া দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে; বাঙালি জাতীয়তাবাদ আরও তীব্রতা পাবে এবং যেকোনো সমঝোতার সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে তুলবে। সহনশীল এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে খ্যাত জেনারেল ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্রের চালে আত্মঘাতী পথ বেছে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগকে দমন করতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের স্বতস্ফুর্ত সমর্থনপুষ্ট ও নেতৃত্ব দানকারী দলটিকেই ধ্বংস করার পদক্ষেপ নিয়েছেন।

তদুপরি, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ- বাঙালিরা অধিকহারে পাকিস্তানকে ‘ঔপনিবেশিক প্রভু’ হিসেবে বিবেচনা করতে শরু করেছে। আওয়ামী লীগ এবং এর নেতৃত্বদানকারী শেখ মুজিবকে ধ্বংস করার জন্য জেনারেল ইয়াহিয়া ঔপনিবেশিক কায়দায় যে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন এবং বক্তব্য প্রদান করছেন তাতে করে বাঙালিদের এই চেতনা আরও দৃঢ়বদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু গত নির্বাচনের বিজয় শেখ মুজিবকে পুরো পাকিস্তানের নেতৃত্বদানের অধিকার দিয়েছিল। শেখ মুজিবকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করা জেনারেল ইয়াহিয়ার সবচেয়ে বড় বোকামী হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে। যদিও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর পথ দুরূহ হয়ে উঠেছে, তবু একটি যুক্তিসঙ্গত সমঝোতার আশা কেবল অবিরত ঐক্যমত্যে পৌঁছার চেষ্টার দ্বারাই করা যেতে পারে। আর যদি আবিভক্ত পাকিস্তান রক্ষা করা একেবারেই অসম্ভব প্রমাণিত হয় তবে সকলের মঙ্গলের স্বার্থেই জনগণকে গৃহযুদ্ধে ঠেলে না দিয়ে এবং আগামী দিনগুলোতে বাঙালিদের তীব্র আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে একক পাকিস্তানে বাস করতে বাধ্য না করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পাকিস্তানকে দুটি বন্ধুসুলভ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ভাগাভাগি করে নেয়া উচিত।

দ্যা অবজারভার
২৮ মার্চ, ১৯৭১


মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৫
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৬
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৭
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৮
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৯
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১০
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১২
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29511122 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29511122 2011-12-27 21:54:21
মুজিব যেভাবে বাংলার জননায়ক হলেন অনুবাদ: আ-আল মামুন

ক্রিল ডান

শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে বিশ বছরের অধিক সময় ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে রাজনৈতিকভাবে তার সাম্প্রতিক চূড়ান্ত শীর্ষারোহনে। তবু সবসময়ই তাঁর লক্ষ্য ছিল মাতৃভূমি বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশবাদী আচরণ থেকে ‘মুক্ত’ করা। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আর যা কিছু অভিযোগ আনা গেলেও তাকে রাজনৈতিক সুযোগসন্ধানী বলা যায় না। বালক বয়সে তিনি কখনও কখনও বৃটিশ রাজের পুলিশ বাহিনীর প্রতি পাথর নিক্ষেপ করেছেন বটে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বৃটিশ রাজের বিরোধিতাকারী স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন না তিনি। বৃটিশ রাজনৈতিক ইনস্টিটিউশনগুলোকে তিনি প্রশংসা করেন। আভ্যন্তরীণ মুক্তি অর্জনের জন্যই তিন তাঁর বেশিরভাগ প্রচেষ্টা নিবেদিত করেছেন- প্রথমত ভারতের হিন্দু আধিপত্য থেকে মুসলমান স্বার্থরক্ষা করতে, এবং পরে পাকিস্তান আমলে পাঞ্জাবী ও পাঠানী আধিপত্য থেকে পূর্ব বাংলাকে মুক্ত করার কাজে।

শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার স্থায়ী বাসিন্দা। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় যে অগনিত মুসলমান উদ্বাস্তু ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিল শেখ মুজিব তাদের অন্তর্ভুক্ত নন। ঢাকার পশ্চিমে ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে ১৯২০ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মধ্যবিত্ত ভূস্বামী পরিবারের সন্তান। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। পশ্চিম বাংলার সাথে এটাই ছিল তার একমাত্র সংযোগ। এসব ১৯৪২ সালের ঘটনা এবং এসময়ই তিনি বিবাহিত ছিলেন।

পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মুজিব, জনগণ তাঁকে এই নামেই ডাকে, বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম শুরু করেন। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের ছাত্র মুজিব রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দূর বিরুদ্ধে এবং বাংলার পক্ষে ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত করতে থাকেন। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠন পরবর্তীতে আইয়ুব খান সরকারকে উৎখাত করতে ব্যাপক ও বিধ্বংসী ভূমিকা পালন করে।

এসব কার্যক্রমের জন্য মুজিবকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং প্রথমবারের মতো পাকিস্তানী শাসকদের হাতে তিনি ৬ দিনের জন্য কারাবরণ করেন। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি পূর্ব বাংলার বঞ্চিত শ্রমিকদের স্বার্থে ধর্মঘটের আয়োজন করতে থাকেন। অপরাধমূলক কার্যক্রমের অভিযোগে, যে অপরাধের প্রকৃতি এখনো দুর্বোধ্য, তাঁকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। এবার তাঁর কারাবাস হয় আড়াই বছর। এ সময় বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক সৌভাগ্যের অধিকারী যুক্তবংলার শেষ মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর পাকিস্তানভিত্তিক আধিপত্যবাদী মুসলীম লীগের প্রতি মোহভঙ্গ ঘটে এবং তিনি আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই শেখ মুজিব এই নতুন রাজনৈতিক দলের সেক্রেটারি নির্বাচিত হন।

মন্ত্রীত্বের অভিজ্ঞতা তাঁর সীমিত। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে যোগ দেন। ৫৪’র নির্বাচনে বাঙালিরা মুসলিম লীগকে ছুঁড়ে ফেলে। এই সময়কালে তিনি বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন কিন্তু সবসময়ই তিনি ছিলেন দলের একজন দক্ষ সংগঠক। ১৯৫৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত গণজমায়েতের বৃহত্তর শক্তি যুগিয়েছিলেন তিনি। এর তিন বছর পরে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে আনুষ্ঠানিক রেজুলেশন পাশ করার পেছনেও তিনিই কাজ করেন। আর এই গণ-জমায়েত ও রেজুলেশনে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য প্রায় পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের যে দাবি করা হয়েছিল, অনুরূপ দাবিই আজ পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার দ্বারপ্রান্তে উপনীত করেছে।

১৯৫৮ সালে ক্ষমতা দখলের সময় থেকেই আইয়ুব খান শেখ মুজিবকে অন্যতম শত্রু হিসেবে বিবেচনা করেন, তার ভাষ্য অনুযায়ী, মুজির পাকিস্তানের ঐক্যের প্রতি হুমকীস্বরূপ। জন-নিরাপত্তা আইনের আওতায় প্রথম দিকে গ্রেপ্তারকৃতদের অন্যতম ছিলেন শেখ মুজিব। বিনা বিচারে তাঁকে দেড় বছর জেলে আটকে রাখা হয়। ১৯৬২ সালে সোহরাওয়ার্দীর মতো সাহসী দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে তিনিও ‘পরবর্তী পাঁচ বছর রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো যাবে না’ এই মর্মে আইয়ুব খানের কাছে মুচলেকা দিতে অস্বীকৃতি জানান, যদিও পাকিস্তানের অধিকাংশ নেতা তখন পরবর্তী পাঁচ বছর রাজনীতি করবেন না এই মর্মে মুচলেকা দিয়েছিলেন। ফলত, শেখ মুজিবকে আবারও ছয় মাসের জন্য জেলে যেতে হয়।

মুক্তি পেয়ে তিনি অতীতের চেয়ে আরও জোরেশোরে বাংলার মুক্তির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সুকঠিন সামরিক একনায়কতন্ত্রের দ্বারা সন্ত্রস্ত দেশে তিনি বিস্ময়কর সাহসিকতার পরিচয় দেন। পুরো পূর্ব পাকিস্তান ঘুরে ঘুরে তিনি সরকার বিরোধী বক্তৃতা দিতে থাকেন। এতে তিনি ঘন ঘন কারারুদ্ধ হন। কিন্তু বেইলে ছাড়া পেলেই তিনি সরকারবিরোধী বক্তৃতা দিতে থাকেন এবং সম্পূর্ণ বেপরোয়াভাবে বিদেশী পত্রিকার সাংবাদিকদের কাছে পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানীদের ঔপনিবেশিক ব্যবহার এবং এ থেকে বাংলাকে মুক্ত করার জন্য তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এসব সময় তাকে খুব স্বতস্ফূর্ত দেখাতো এবং তাঁর বিশ্বাস ছিল যে বৃহত্তর বাঙালি সমাজ তার পক্ষে রয়েছে।

আইয়ুব খান কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে ডিটেনশন থেকে ছাড়া পাওয়ার পরপরই সৈন্যরা তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তাঁকে কুর্মিটোলা সেনানিবাসে নিয়ে গিয়ে পাঁচ মাস নির্জন স্থানে বন্দী করে রাখা হয়। এ সময় সামরিক প্রশাসন ছাড়া আর কেউই জানতো না তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে। তারপর তাঁকেসহ আরও ৩৫ জনকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামী করে বিচারের সম্মখীন করা হয়। অভিযোগ আনা হয় যে, শেখ মুজিবের নের্তৃত্বে তারা ভারতীয় সহায়তা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে দাঙ্গা বাধানোর এবং আইয়ুব খানের সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা করেছিলেন। এই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলায় মুজিবের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এর পূর্ব পর্যন্ত, বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সত্ত্বেও শেখ মুজিবকে গুরুত্বপূর্ণ নেতা মনে করা হতো না। এই মামলাই তাঁকে বাঙালির জতীয় বীরে পরিণত করে। জঙ্গী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান দাবি হয়ে ওঠে তাঁর মুক্তি। সহিংস ধ্বংসাত্বক ছাত্র আন্দোলনের চাপে এই মামলা প্রত্যাহার করা হয়। এদিকে ১৯৫৬ সালেই শেখ মুজিব পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে তাঁর ছয়-দফা কর্মসূচি প্রদান করেছেন যা ১৯৫৩ সালে ঢাকার গণজমায়েতে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল- এসব দাবিনামা নিয়েই শেখ মুজিব বর্তমানে আইয়ুব খানের উত্তরসূরী সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানকে মোকাবিলা করছেন।

নাটকীয় অতীত জীবন সত্ত্বেও শেখ মুজিবকে বেপরোয়া বলা যায় না, যদিও বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি তাৎক্ষণিকভাবেই জনগণকে জাগ্রত করে তুলতে পারেন। উইলসন পাইপ মুখে বিদেশী সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় তাকে বৃটিশ লেবার পার্টির নেতাদের চেয়ে কোনো অংশেই বেশী আকর্ষণীয় মনে হয় না। লেবার পার্টির নেতাদের তিনি পছন্দ করেন। স্ট্যালিনের চেহারার সাথে মিল আছে তাঁর। তিনি লম্বা ও সুদর্শন। তিনি পাঁচ সন্তানের জনক। ঢাকার মধ্যবিত্ত এলাকায় তাঁর বাড়ি, সেখানে ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংঘাতের যদি নিস্পত্তি কখনও ঘটে এবং তিনি যদি সুযোগ পান তাহলে তিনি একজন খাঁটি এবং বুদ্ধিমান রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই নিজেকে প্রাকাশ করবেন।

দ্যা অবজারভার
২৮ মার্চ, ১৯৭১


রাশিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে পারে

দেব মুখাজী

মস্কো, ২৭ মার্চ: সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে। যদিও মস্কো তাড়াহুড়ো করে কোনো ভূমিকা নেয়ার প্রস্তাব করছে না, তবু তারা মনে করছে যত দ্রুত সম্ভব বৃহৎ শক্তিগুলো স্বীকৃতি দিলে পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধে গণহত্যা কমানো যাবে। বাংলাদেশকে - পূর্ব পাকিস্তান যে নামে নিজেকে পরিচয় দিতে চায় - স্বীকৃতি দিলে তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ নিতে সুবিধা হবে এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়ার সামরিক বাহিনীর হাত থেকে পূর্ব বাংলাকে রক্ষা করা যাবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বীকৃতি প্রদান কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রথম এবং প্রধান যে বিষয়টি বিবেচ্য তা হলো, বিপ্লবের নেতা শেখ মুজিবের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি যেকোনো অবস্থাতেই পূর্ব বাংলা কর্তৃক পশ্চিম পাকিস্তানকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা। অন্যদিকে, ইয়াহিয়া খান যদি এতো ক্ষতি সাধনের পরও নতুন করে শান্তি প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নেয় তাহলে স্বীকৃতি দানের বিষয়টি বিলম্বিত হতে পারে। এখন অবশ্য ইয়াহিয়া খানের পক্ষে সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অন্যান্য বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর এ-ব্যাপারে গৃহীত রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোও মস্কো বিবেচনা করবে।

রাশিয়ানরা খুব ভালভাবেই সচেতন যে, পশ্চিম পাকিস্তানের সাথেই তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ব্যাপকভাবে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু মস্কো পূর্ব বাংলায় নিপীড়ন চালনাকারী পশ্চিম পাকিস্তানের অপরাধের অংশিদার হতে চায় না, বিশেষত বিষয়টি যদি কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থিত হয়। তারা যুক্ত পাকিস্তানের পক্ষে থাকাতেই বেশি আগ্রহী ছিল। কিন্তু অবস্থা পর্যালোচনা করে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে প্রকৃত অর্থে যুক্ত পাকিস্তানের মৃত্যু ঘটেছে। দৈব্যবশত এ যাত্রা যদি যুক্ত পাকিস্তান টিকেও যায় তবে তা থাকবে শুধু নামে মাত্র- অস্ত্রের মুখেই কেবল তা টিকে থাকবে।

দ্যা অবজারভার ২৮ মার্চ ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৫
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৬
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৭
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৮
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৯
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১০
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১১
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29510510 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29510510 2011-12-26 18:36:55
নিরস্ত্র বাঙালি জাতির উপর ভারী অস্ত্রের আঘাত অনুবাদ: আ-আল মামুন

সিডনি এইচ. সেহেনবার্গ

পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা থেকে গতকাল সকালে বহিস্কৃত হওয়ার পর নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সিডনি এইচ. সেহেনবার্গ বোম্বে থেকে এই রিপোর্ট পাঠিয়েছেন।

পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানী সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে। সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই প্রদেশের স্বায়ত্বশাসনের দাবি সমূলে ধ্বংস করার জন্য সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ভারী কামান ও শক্তিশালী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী কোনোরকম ইঙ্গিত ছাড়াই আক্রমণ শুরু করেছে। পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা, যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সংখ্যাগুরু অংশ, স্বাধীনতা আন্দোলনের সুদৃঢ় ঘাঁটি প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা দখল করার জন্য রাস্তায় নেমে আসে। স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের একটি শক্তিশালী অবস্থান ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রথমদিকে বিক্ষিপ্তভাবে গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু রাত একটা নাগাদ ভারী গোলাবর্ষণ শুরু হয় এবং পরবর্তী তিনঘণ্টা অবিরাম গোলাবর্ষণ চলতে থাকে। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আটক রাখা বিদেশী সাংবাদিকরা ভারী কামান থেকে ব্যাপক গোলাবর্ষণের শব্দ শুনতে পেয়েছে এবং দেখেছে। ঢাকা শহরের উত্তরাংশে অবস্থিত ইন্টারকন্টিনেন্টাল [বর্তমান শেরাটন] হোটেল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পূর্ব পাকিস্তানী বাঙালিদের নিয়ে গঠিত প্যারামিলিটারি বাহিনী ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদর দপ্তরসহ ঢাকার বিভিন্ন অংশে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ড দেখা গেছে।

শনিবার সকালে ৩৫ জন বিদেশী সাংবাদিককে যখন ঢাকা থেকে বহিষ্কার করা হয় তখনও কিছু কিছু জায়গায় আগুন জ্বলছিল এবং বিক্ষিপ্তভাবে গুলির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। সামরিক ভ্যানে প্রহরা দিয়ে বিদেশী সাংবাদিকদের বিমান বন্দরে নিয়ে যাওয়ার সময় সাংবদিকরা দেখতে পায় যে রাস্তার আশেপাশের দরিদ্র বাঙালিদের বস্তিগুলোতে সৈন্যরা আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। এই দরিদ্র বাঙালিরা অনেকেই স্ব-শাসনের কট্টর সমর্থক।

“বাংলাদেশ সাবাড় হয়ে গেছে, অনেক মানুষ নিহত হয়েছে,” বিমানবন্দরে একজন পাকিস্তানী সৈন্য অবলিলায় বলে গেলেন। বাংলাদেশ বলতে বুঝায় ‘বাঙালি জাতি’- পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন আন্দোলনকারীরা এই নাম দিয়েছে। ১০০০ মাইল ভারতীয় সীমানা দ্বারা পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন।

আমাদের বিদেশ সংবাদদাতা

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে পূর্ব পাকিস্তানীদের নিয়ে শেখ মুজিবের নতুন রাষ্ট্র গঠন প্রচেষ্টার ভাগ্য গতরাত পর্যন্ত অনিশ্চিত ছিল। বিশ্ববাসীর কাছে পরস্পর-বিরোধী সংবাদ এসে পৌঁছাচ্ছে। গৃহযুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের রেডিও থেকে বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছনতাকামী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বৃহস্পতিবার রাত ১.৩০টায় প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকাস্থ তার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু গুপ্ত রেডিও থেকে দাবি করা হয়েছে যে শেখ মুজিব এখনও মুক্ত রয়েছেন এবং চট্টগ্রামে তার সদর দপ্তর স্থাপন করেছেন।

ঢাকা থেকে কোলকাতা ও দিল্লি হয়ে আমাদের কাছে এসে পৌঁছানো খবর অনুযায়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই ১০,০০০ নিরস্ত্র বাঙালি নিহত হয়েছে। কিন্তু কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকগণ এরূপ অনির্ভরযোগ্য দাবিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। অন্য একটি অনির্ভরযোগ্য সূত্র বলেছে বর্শা ও ছুরি সজ্জিত ১,৫০০ বাঙালি যশোরে একটি বিমান বন্দরের দখল নিতে গেলে মেশিনগানের গুলিতে নিহত হয়েছে।

দ্যা টাইমস ২৮ মার্চ ১৯৭১

সম্পাদকীয়

পাকিস্তান: সোচ্চার হবার সময় হয়েছে

সানডে টাইমস-এর গত দুই সংখ্যায়, পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত আমাদের নিজস্ব প্রতিনিধি এবং অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা সেখানকার অবস্থা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছি। এসব রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের বৃহত্তর স্বায়ত্বশাসনের গণতান্ত্রিক দাবিকে অস্ত্রের মাধ্যমে দমন করার সিদ্ধান্তের ফলে সেখানে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক রক্তক্ষয় শুরু হয়েছে। বিপরীত পাতায় একই সংবাদদাতা পশ্চিম পাকিস্তান সফর করে সেখানে ক্রিয়াশীল প্রভাবক ও ধারণাগুলো বর্ণনা করেছেন। সন্দেহের অবকাশ না রেখে যে সত্যটি প্রকাশিত হয়েছে তা হলো যে একটি নিদারুণ ভুল একটি নিদারুণ ট্রাজেডির জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশ এর পূর্বেও সকরুণ দৃষ্টিতে বিভিন্ন জাতি কর্তৃক গণহত্যা দেখেছে। কিন্তু ভারতীয় উপমাহাদেশ বা অন্য কোথাও সাম্প্রতিক ইতিহাসে গণহত্যার এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই, যেমনটি বর্তমান পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার অসীম গণহত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যত বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সমূলে উৎপাটনের সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা নিয়েছে। নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে বলা যায়, জেনারেল ইয়াহিয়া খান খুবই সংকটময় পরিস্থিতির সম্মুখীন। পাকিস্তানে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার প্রশংসাযোগ্য সদিচ্ছার ফলেই গত ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে শেখ মুজিব ও তার নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। বাঙালি বিচ্ছিন্নতাবাদের উত্তাল অভিঘাত মোকাবেলায় রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে ইয়াহিয়া খানের স্পষ্টতই দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তানের ঐক্য সমুন্নত রাখা। মুজিবের কট্টর সমর্থকরা তীব্রভাবে স্বাধীনতা চাইলেও আলোচনা চূড়ান্তভাবে ভেস্তে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কখনোই কিন্তু তিনি আলাদা হয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করেননি।

এটা কোনোক্রমেই বিশ্বাসযোগ্য নয় যে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের সাম্প্রতিক সাফল্য অর্থাৎ বাঙালিদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও নতুন প্রশাসন ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষাকে সামরিক শক্তি দমন করতে পেরেছে বা ভবিষ্যতেও দমন করতে পারবে। ব্যাপক রক্তক্ষয় ছাড়াও ইয়াহিয়া খানের বর্তমান চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আরেকটি ফল হলো এই যে পূর্ব পাকিস্তানে মাওবাদী, নক্সালবাদী ও অন্যান্য ঘোলাপানিতে মাছ শিকারীদের বাইরে শেখ মুজিবকে একমাত্র ন্যায়সঙ্গত নেতার প্রতীকে পরিণত হওয়ার পথ করে দিয়েছে।

ইসলামাবাদে এখন ন্যাক্কারজনক পরিতৃপ্তির পরিবেশ বিরাজ করছে। বৃটিশ সরকারসহ অন্যান্য সরকারের এখন উচিত হবে এই পরিতৃপ্তির পরিবেশকে আঘাত করা। স্যার এলেক ডগলাস হোমের মতো করে পূর্ব পাকিস্তান নাটকীয়তা ‘আভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ বলে দায়িত্ব শেষ করলেই চলবে না। পূর্ব পাকিস্তানে এখন যা ঘটছে তেমন আভ্যন্তরীণ ঘটনা অনেক সময় ন্যায় ও মানবিকতার বিরুদ্ধে অপরাধের সামিল। ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট ভারত, চীন ও রাশিয়া ছাড়া অন্যান্য দেশগুলো কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তান ঘটনাকে ক্ষুদ্র আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করাটা হাস্যকর ভনিতা।

পূর্ব পাকিস্তান ঘটনাক্রমের প্রতি পূর্বের চেয়ে অনেক দৃঢ় কণ্ঠে বৃটিশ সরকারের অসোন্তষ প্রকাশ করার সময় হয়েছে। অবশ্য, অনেক আগেই বৃটিশ সরকারের সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল। প্রথাগত প্রাইভেট ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইয়াহিয়া খানকে এখনই জানতে দেয়া উচিত যে তিনি কতো ভয়ঙ্কর ভুল নীতি গ্রহণ করেছেন (যদি এখনও কোনো পদক্ষেপ না নেয়া হয়ে থাকে)। যদিও পাকিস্তানের শাসকবর্গ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি নন- এই হিসেবে বৈদেশিক সাহায্য বন্ধ করা সাধারণ জনগণের প্রতি অবিচারেরই সামিল। তবু প্রয়োজন হলে পাকিস্তানের বৈদেশিক সাহায্যদাতা দেশগুলোকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর পদক্ষেপ নিতে হবে। চূড়ান্তভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে যেকোনো ভাবে আলোচনার আয়োজন করতে হবে। আর যথাদ্রুত ইয়াহিয়া এই সত্য উপলব্ধি করে শেখ মুজিবকে ঢাকায় ফেরত পাঠালে পাকিস্তানের অধিকতর মঙ্গলের জন্য আলোচনাযোগ্য একজন প্রতিনিধি পাওয়া যাবে।

দ্যা টাইমস
২৮ মার্চ ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৫
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৬
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৭
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৮
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৯
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১০
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29509993 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29509993 2011-12-25 20:10:31
পূর্ব পাকিস্থানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর ব্যাপক সংঘর্ষ অনুবাদ: আ-আল মামুন

আমাদের বিদেশ সংবাদদাতা

শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন স্বাধীকার আন্দোলন দমন করার জন্য সরকারি বাহিনী নামিয়ে দেয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে ব্যাপক সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার হিসেবে দাবিকারী একটি গুপ্ত রেডিও থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সীমান্ত সংলগ্ন ভারতীয় শহর আগরতলা থেকে গুপ্ত রেডিওর এই সংবাদ মনিটর করা হয়। এই রেডিও থেকে দাবি করা হয়েছে, চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য কয়েকটি স্থানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও সমস্ত পুলিশ বাহিনী পাকিস্তানী সৈন্যদের ঘিরে রেখেছে। রেডিও থেকে বল হয় যে যুদ্ধ চলছে। এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সৈন্যদের প্রতিরোধ করার জন্য যার যা অস্ত্র আছে তাই নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ার জন্য জনগণকে আহবান জানানো হয়।

রেডিওতে শেখ মুজিবুর রহমান নিজে এই ঘোষণা দেননি। তিনি গুপ্ত স্থানে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। রেডিওর ঘোষণাকারী বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ‘স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ঘোষণায় বলা হয়, “বাংলাদেশের জনগণের একমাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। পশ্চিম পাকিস্তানী নিষ্ঠুর স্বৈরশাসকদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে সবাইকে শেখ মুজিবের প্রতিটি নির্দেশ পালন করতে হবে। শত্রু বাহিনীর শেষ সৈন্যটি নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত জনগণকে স্বাধীনতার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।”

সীমান্ত থেকে প্রাপ্ত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে অল ইন্ডিয়া রেডিও বলেছে, ঢাকা শহর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দু’পক্ষেই ব্যাপক হতাহত হয়েছে। কুমিল্লা, যশোর, বরিশাল এবং খুলনাতে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কোলকাতা থেকে প্রাপ্ত সংবাদ অনুযায়ী আরও অন্তত ১০,০০০ পাকিস্তানী সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরে অবতরণ করেছে; ফলে পূর্ব পাকিস্তানে এখন পশ্চিম পাকিস্তানের মোট সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ালো ৭০,০০০-এ। পূর্ব পাকিস্তান জোনের মার্শাল ’ল প্রধান লে. জেনারেল টিক্কা খান ঢাকা রেডিও থেকে সম্প্রচারিত এক ঘোষণায় স্বীকার করেছেন যে, “পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।” কিন্তু তিনি যুদ্ধের বিস্তারিত কোনো বিবরণ দেননি। অবশ্য পরবর্তীতে ঢাকা রেডিও থেকে সম্প্রচারিত এক ঘোষণায় দাবি করা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

অপরিহার্য্য

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশোদ্রোহিতার অভিযোগ আনার পরপরই শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। প্রেসিডেন্ট রেডিওতে সম্প্রচারিত এক ভাষণে বলেন, “পরিস্থিতি খুব নাজুক হয়ে পড়েছে, আর তাই অতিদ্রুত আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য্য হয়ে উঠেছিল। তিনি বলেন, “শেখ মুজিব সরকারি কর্তৃপক্ষের সাথে প্রতারণা করেছেন এবং দেশের স্বার্বভৌমত্বকে আঘাত করেছেন।” তিনি বলেন, “শেখ মুজিবের এই অপরাধ ক্ষমা করা হবে না।” পাকিস্তানের সকল নাগরিককে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, “আমার উদ্দেশ্যে একটাই- জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। উপযুক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেই আমি এই লক্ষ্য পুরণে নতুন করে পদক্ষেপ নেব।” তিনি বলেন, “কিন্তু দেশে আজ যে সংকটময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে আমি দেশে সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

প্রেসিডেন্ট বলেন, “দেশের ঐক্য ও সংহতিকে শেখ মুজিব আঘাত করেছে; তার অসহযোগ আন্দোলন শুরু করাটা ছিল দেশোদ্রোহিতা। শেখ মুজিব ও তার দল গত তিন সপ্তাহ ধরে আইসম্মত কর্তৃপক্ষকে অবমাননা করেছে। তারা পাকিস্তানী পতাকার অসম্মান করেছে এবং জাতির পিতার ফটোগ্রাফ সরিয়ে ফেলেছে। তারা একটি বিকল্প সরকার প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার চেষ্টা করেছে। তারা নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।”

ক্ষমতার লোভ

ক্রোধান্ধ কণ্ঠে প্রেসিডেন্ট বলে, “কোনো ক্ষমতালোভী স্বৈরাচারকে তিনি পাকিস্তান ধ্বংস করতে এবং এর ১২ কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা করতে দিতে পারেন না। সরকারের কর্তৃত্ব পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে সেনাবাহিনী কী পদক্ষেপ নেবে কিংবা সেনাবাহিনী কী ধরনের বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছে সেসব ব্যাপারে তিনি কিছু বলেননি।

পাকিস্তানের অধিক উন্নয়ন সুবিধাভোগী পশ্চিম অঞ্চলগুলোর বিরুদ্ধে পূর্বাঞ্চলের ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির ঐক্যের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করেছিল। দেশের প্রশাসনিক রাজধানী ইসলামাবাদ পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত এবং পশ্চিম পাকিস্তন সব সময়ই সরকারের কাছ থেকে অধিক সুযোগ-সুবিধা লাভ করেছে। নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য ঢাকা জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক বাতিলের ঘোষণা সাম্প্রতিক বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সৃষ্টি করেছে। পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। গত ডিসেম্বরের নির্বাচনে তাদের ছয় দফা দাবির অন্যতম দাবি ছিল- স্ব-শাসন।

গত সপ্তায় শেখ মুজিবের সাথে আলোচনার উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা গমন করেছিলেন এবং এ সপ্তায় পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টির নেতা ভূট্টো তার সাথে যোগ দিয়েছিলেন। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে- আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। সরাসরি ঢাকা থেকে পাওয়া শেষ খবর অনুযায়ী রংপুর ও চট্টগ্রাম জেলায় পাকিস্তানী সৈন্যদের হাতে অন্তত ৩৫ বাঙালি নিহত এবং ১০০ বাঙালি আহত হয়েছে।

দি গার্ডিয়ান ২৭ মার্চ, ১৯৭১



পাকিস্তান ভারতকে উভয়-সঙ্কটে ফেলেছে

ইন্দোর মালহোত্রা

বোম্বে মার্চ ২৬: ভারতের বিধান সভায় বিরোধী দলীয় নের্তৃবৃন্দ গতকাল পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। তবে, ভারত সরকার এ ব্যাপারে এখনও নিশ্চুপ থাকার পথ অবলম্বন করছে। পূর্ব পাকিস্তানে হত্যাযজ্ঞ রোধের জন্য কিছু সাংসদ চান যে ইন্দিরা গান্ধী জাতিসংঘকে হস্তক্ষেপ করতে বলুক। অন্য সাংসদরা বলেন, ভারতের উচিত শ্রীলঙ্কাকে পূর্ব পাকিস্তানে পাশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য পাঠানোর ট্রানজিট সুবিধা না দিতে সম্মত করানোর জন্য। বাঙালির স্বায়ত্বশাসন আদায়ের সংগ্রামকে অধিকাংশ ভারতীয়ই ন্যায়সঙ্গত মনে করে। দু’একজন কট্টরপন্থী ছাড়া ভারতের কেউই চায় না যে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাক কিংবা সেখানে নৈরাজ্য বিরাজ করুক। পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত ভারতেও সংক্রমিত হতে পারে তাই এই প্রবণতা নিরুৎসাহিত করা দরকার। তথাপি, দিল্লীর দৃষ্টিতে পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের জন্য সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের ক্ষমতালোভী চক্রটিই দায়ী এবং তাদের কারণেই আজ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে শেখ মুজিবের সাথে সমঝোতা করতে এগিয়ে আসতে হয়েছে।

ইয়াহিয়া খানের বিশ্বাসঘাতকতার পর শেখ মুজিব ও তার আওয়ামী লীগের সামনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করা অথবা সমূলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না। শেখ মুজিব যদি প্রতিবেশীদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানান তাহলে ভারত খুব জটিল ও বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা ভারতের মৌলনীতির পরিপন্থী। আর ভারত হস্তক্ষেপ করলে পূর্ব পাকিস্তান এমনকি কাশ্মীরেও চীনের উপস্থিতির আশঙ্কা বেড়ে যাবে। আবার পূর্ব পাকিস্তানীরা যখন নির্বিচারে নিহত হচ্ছে তখন নিশ্চুপ থাকাও দুরূহ। কারণ, পশ্চিম পাকিস্তানীদের মধ্যে না থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানীদের মধ্যে ভারতের প্রতি আস্থা রয়েছে।

বিভ্রান্তিকর সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানী সৈন্যরা ত্রিপুরায় ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করেছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু কোলকাতা ও দিল্লীর সামরিক কর্তৃপক্ষ তৎক্ষণাৎ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

দি অবজরভার ২৭ মার্চ, ১৯৭১


রেড ক্রসের পরিদর্শন
আমাদের বিদেশ সংবাদদাতা

জেনেভায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির প্রধান কার্যালয় থেকে গতকাল জানিয়েছেন যে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি তারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মানবিক সাহায্য প্রদানের বিষয় বিবেচনা করছেন। একজন মুখপাত্র জানালেন পূর্ব পাকিস্তানে বর্তমানে রেডক্রসের কোনো প্রতিনিধি নেই, তবে লীগ অব রেডক্রস কমিটির অফিসের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। লীগ অব রেডক্রস সোসাইটির একজন প্রতিনিধি গত বছরের প্রলঙ্করী বন্যার পর থেকে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তার কাছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অন্যান্য সাহায্যের সাপ্লাই আছে বলে জানা গেছে।

আশাহত

পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা জুলফিকার আলী ভূট্টো কলম্বোতে জানিয়েছেন যে ঢাকায় আলোচনা ভেঙ্গে যাওয়ায় তিনি আশাহত হয়েছেন। করাচী যাওয়ার পথে কলম্বো বিমান বন্দরে যাত্রাবিরতিকালে সাংবাদিকদের সাথে আলোচনাকালে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, শেখ মুজিবের অনড় অবস্থান গ্রহণের ফলে আলোচনা ভেঙ্গে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রস্থ পূর্ব পাকিস্তান লীগের সভাপতি কে. এস. আহমেদ পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের জন্য প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অনুরোধ জানিয়েছেন। একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রায় পাঁচজন আমেরিকান ও আমেরিকায় অবস্থানরত পূর্ব পাকিস্তানী নিয়ে এই প্রতিনিধিদল গঠিত।

প্যারিস থেকে জানা গেছে যে ফ্রান্সের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চারদিনের পূর্ব পাকিস্তান সফর বাতিল করতে বলেছে পাকিস্তান সরকার, যা আজ থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। ফ্রান্স কর্তৃপক্ষ বলেছে ‘সংকটজনক পরিস্থিতিই এর কারণ’।

দি অবজারভার
২৭ মার্চ, ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৫
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৬
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৭
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৮
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৯
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29509310 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29509310 2011-12-24 18:59:06
সংঘাতের মাঝে যে জাতির জন্ম অনুবাদ: আ-আল মামুন

১৯৪৭ সালে হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম। তারপর থেকেই এই অঞ্চলের ইতিহাস উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে আছে। ভারতীয় উপমাহাদেশ থেকে দুটি মুসলিম প্রধান অংশ পাকিস্তান নামের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বেরিয়ে এলো এবং ভারতও সেসময় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করল। নিম্নে ঘটনাক্রম:

১৯৪৭: মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে আগস্ট মাসে বৃটিশ শাসন এলাকার আলাদা সত্তা হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সূত্রপাত করলেন। তিনি প্রথম গভর্নর জেনারেল হলেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দশ লক্ষাধিক লোক নিহত হল।

১৯৫১: পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান রাওয়ালপিন্ডীতে গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত হন, যা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

১৯৫৬: মার্চ মাসে পাকিস্তানের নতুন সংবিধান অনুযায়ী দেশটিকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। জেনারেল মীর্জা হলেন প্রেসিডেন্ট।

১৯৫৮: ব্যাপক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝামেলার মধ্যে অক্টোবর মাসে প্রেসিডেন্ট মির্জা সংবিধান বাতিল করেন এবং মার্শল ’ল জারী করেন। তিন সপ্তাহের মধ্যে তিনি পদত্যাগ করেন এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল আইয়ুব খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২৮ অক্টোবর এক ঘোষণার মাধ্যমে আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট হলেন।

১৯৫৯: জুন মাসে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থার সূচনা করেন। এই ব্যবস্থায় আইয়ুব খান পেয়ে যান ৮,০০০ নির্বাচন সহযোগী। আর তাদের মাধ্যমেই জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়।

১৯৬০: ভোটের মাধ্যমে আইয়ুব খানের রাষ্ট্রপতিত্ব নিশ্চিত হয়। ফেব্রুয়ারি ১৭ তারিখে তিনি শপথ গ্রহণ করেন।

১৯৬২: আইয়ুব খান নতুন সংবিধান পেশ করেন, যা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে আরও বৃদ্ধি করে এবং এই সংবিধানে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমান অংশিদারিত্বে এক কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের বিধান দেয়া হয়।

১৯৬৫: আইয়ুব খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। বিতর্কিত কাশ্মীরের অধিকার নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে খণ্ড যুদ্ধ হয়ে যায়।

১৯৬৯: পাকিস্তানের দুই অংশে কয়েক মাসের ব্যাপক রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও দাঙ্গার প্রেক্ষিতে আইয়ুব খান মার্চ মাসে পদত্যাগ করেন। সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট পদ অধিগ্রহণ করে সামরিক শাসন জারী করেন, নভেম্বর মাসে তিনি এক ব্যক্তি এক ভোট ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

১৯৭০: পূর্ব পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের দাবি মিটিয়ে জাতীয় পরিষদে জনসংখ্যার অনুপাতে আসন বণ্টনের জন্য মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঘোষণা করেন যে জাতীয় পরিষদের ৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৯ আসন থাকবে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য। ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ১৬০টি আসন লাভ করে। পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলীর পিপলস পার্টি লাভ করে ৮৩টি আসন।

১৯৭১: পাকিস্তানের দুই অংশের নের্তৃবৃন্দ নতুন সংবিধানের গঠনতন্ত্র সম্পর্কে একমত হতে না পারায় ২২ মার্চ দ্বিতীয় বারের মতো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিল করেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রয়েছে। এই মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দুই নেতার মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় ঢাকা এসেছেন এবং শেখ মুজিবই মূলত এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন পূর্ব পাকিস্তান।

রয়টার্স
দ্যা গার্ডিয়ান
২৭ মার্চ, ১৯৭১


সম্পদকীয়
পাকিস্তানের ট্রাজেডি

সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানে শেষ পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত দু’পক্ষ আলোচনার টেবিলে ছিল ততক্ষণ তবু সমঝোতার কিছু সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আলোচনা ভেঙ্গে যাওয়ার সাথে সাথেই সন্দেহজনক দ্রুতগতিতে জাহাজে করে সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়ে সাঁজোয়া অভিযান চালানো হলো। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে এবং সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার অভিসন্ধি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে তিনি পাকিস্তানের ঐক্য অক্ষুন্ন রাখতে বদ্ধপরিকর। প্রেসিডেন্টের এরূপ অবস্থান শেখ মুজিব কর্তৃক বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণাকে অপরিহার্য্য করে তুলেছিল। গত ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর থেকেই দ্রুতগতিতে উত্তেজনা বাড়ছিল। পাকিস্তানের বিভক্তি ঠেকাতে প্রেসিডেন্ট যে সংকল্প নিয়েছেন তা হয়তো সফল হবে না। কিন্তু এর ফলাফল যাই হোক না কেন দুর্দশা, রক্তপাত ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা অনিবার্য্য।

পাকিস্তান থেকে বাংলার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মাধ্যমে পবিত্র ইসলামী আদর্শে যে যুক্ত পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল তার অযৌক্তিকতাকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করা। বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক আঞ্চলিক উত্তেজনার পরও যে একক পাকিস্তান এতোদিন টিকে ছিল সেটাই বিস্ময়ের ব্যাপার। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানে যে বিপুল অসন্তষ্টি জমে উঠেছে তাতে এবারের গণজোয়ার যেকোনো সমঝোতা অসম্ভব করে তুলতে পারে। পূর্ব পাকিস্তান মনে করে যে, পাকিস্তানের অর্থনীতিতে তাদের অবদান, বিশেষত পাট রফতানির মাধ্যমে, প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা বাজেটের জন্য ব্যয় করা হয়েছে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পশ্চিম পাকিস্তান ভারতের সাথে যে দীর্ঘ সংঘাতে লিপ্ত তার প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের খুব সামান্যই সমর্থন আছে। পশ্চিম পাকিস্তানের বঞ্চনার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ এবং নিজেদের আত্মপরিচয়ের দাবিতে পূর্ব পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস শেখ মুজিবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দানের মাধ্যমে প্রশাসন পরিচালনা করছে বা বন্ধ রাখছে। ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর সমঝোতার যে একমাত্র পথ খোলা ছিল তাও প্রশাসনের এই জুয়াখেলা বাধাগ্রস্ত করেছে; যদিও শেখ মুজিবের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার পদাধিকার পূর্ব পাকিস্তানীদের পক্ষ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের চেতনায় সরাসরি প্রভাব ফেলার এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অধিক সুযোগ-সুবিধা আদায়ের পথ করে দিত। প্রেসিডেন্ট, শেখ মুজিবুর রহমান এবং সম্ভাব্য বিরোধী দলীয় নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এই প্রধান তিন রাজনৈতিক চরিত্রই হিসেবে ভুল করেছেন এবং বিকল্প সমাধানে না পৌঁছাতে পারার ব্যাপারটি অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছেন। গত নির্বাচন রাজনৈতিক বিভেদকে এমনভাবে প্রকটিত করেছে যা দেশের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার সাথে খাপে খাপে মিলে যায়। এরূপ স্পষ্ট রাজনৈতিক ফলাফল নিশ্চিতভাবেই সামরিক হস্তক্ষেপকে ত্বরান্বিত করেছে; কারণ এই রাজনৈতিক ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অশক্ত কোয়ালিশন সরকারই গঠন করা সম্ভব। নির্বাচনের পূর্বেও পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রীক বিজয় রাজনৈতিক নেতাদের সম্পূর্ণ বিস্মিত করে দিয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমান তার কঠোর ছয় দফা দাবি নিয়ে উপস্থিত হলেন এবং আওয়ামী লীগের সমঝোতা প্রয়াসী সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কট্টর স্বাধীনতাবাদীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গেল। বাঙালি জাতীয়তাবাদ শেখ মুজিবের প্রবৃত্তি ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোর বাইরে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান রক্ষার দৃঢ়তা অনিশ্চয়তায় দুলতে লাগল যখন তিনি দেখলেন নিরপেক্ষভাবে নির্বাচিত দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা রয়েছে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করাকে পূর্ব পাকিস্তানীদের কাছে তাদের স্বার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষারই মৃত্যুর সামিল গণ্য হলো। জুলফিকার আলী ভূট্টোর স্বার্থ প্রায় সম্পূর্ণভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর এটা বিভেদকে আরও তরান্বিত করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের তোয়াক্কা না করে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শেখ মুজিবুর রহমান সফলভাবে বাংলার শাসন পরিচালনা করছে- এটা হজম করা প্রেসিডেন্টের কাছে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। তিনি সমঝোতার পথ পরিহার করলেন এবং এখন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এক অস্বাভাবিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চেষ্ট করছেন।

এই রক্তক্ষয়ের তাৎক্ষণিক ফল হলো যে পশ্চিম পাকিস্তানের পরিকল্পনা সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তানের অবিশ্বাস আরও তীব্র হবে। কিন্তু সমস্যার এখানেই সমাপ্তি ঘটছে কী! শেখ মুজিবের মতো একজন সহৃদয় সমঝোতাকামী কি বিপ্লবের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? নিজ দলের কট্টর সদস্যদের সামলে রেখে তিনি নিজের অবস্থান সংহত রাখতে পারবেন কি? কিংবা নির্বাচন বয়কটকারী বামপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিকে সামলাতে পারবে কিনা তাও অনিশ্চিত। গণআন্দোলনের প্রথমদিকেই তার দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ ছিল। আর এখন স্বাধীনতা প্রশ্নে তার সামনে আর দ্বিধাদ্বন্দ্বের কোনো অবকাশ নেই, প্রাকযুদ্ধকালেই পাকিস্তানের অর্থনীতি ছিল চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত। আর এই গৃহযুদ্ধ অর্থনীতিকে আরও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ভারতের পশ্চিম বাংলা প্রদেশ গভীর আগ্রহের সাথে দেশটির বিচ্ছিন্ন-বিভক্ত হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে। পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক নেতাই পাকিস্তানের আজকের দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়ার ট্রাজেডিতে অবদান রেখেছে। পরিতাপের বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট বাংলার স্বতন্ত্র পরিচয়কে স্বীকৃতি দানের কোনো বিকল্প পথ বের করে রক্তক্ষয় কমাতে পারলেন না।

দ্যা গার্ডিয়ান
২৭ মার্চ, ১৯৭১


মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৫
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৬
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৭
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৮

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29508102 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29508102 2011-12-22 21:45:31
পাকিস্তান যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে অনুবাদ: আ-আল মামুন

পূর্ব পাকিস্তানে গতকাল থেকে ব্যাপক সহিংসতা এবং গুরুতর রাজনৈতিক নাটকীয়তা শুরুহয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রদেশের সর্বজনস্বীকৃত জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান নায়কোচিতভাবে সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করার আহবান জানিয়ে প্রদেশটির স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাংবিধানিক আলোচনা ভেঙ্গে যাওয়ার ব্যাপারে তার সিদ্ধান্তের কথা ব্যাখ্যা করে প্রদেশটিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ‘ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক হয়ে আসছে’। যেনবা শেখ মুজিব ও তার জাতীয়তাবাদী সমর্থকরা যাই করুক না কেন, সামরিক কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি আগাম বলে দিতে পারছে, যদিও বিভক্ত বাংলার খবরাখবর থেকে স্পষ্টতই গৃহযুদ্ধেরই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অবস্থা বেশ গোলমেলে- প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দ্রুত সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে যে ফলাফল আশা করছেন তার পরিবর্তে গৃহযুদ্ধ বা অনুরূপ কোনো পরিবেশই সৃষ্টি হবে।

আর গৃহযুদ্ধই যদি শুরু হয় তবে এর ফলাফল কী হবে বলা যায় না। গৃহযুদ্ধের সময় সামরিক সাফল্য খুব ঘনিষ্টভাবে উভয়পক্ষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে যেকোনো সামরিক বিশ্লেষণই হবে অনুমাননির্ভর। এর সাথে রয়েছে সামরিক বাহিনীর কোন্ ইউনিট কোন পক্ষ অবলম্বন করবে সেই অনিশ্চয়তা এবং কোনো একজন কমান্ডার কোনো একপক্ষ অবলম্বন করলে তার ইউনিটের মধ্যে কোনো অসন্তোষ তৈরি হবে কিনা সেই অনিশ্চয়তা। অনুমান করা যায় পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত সামরিক বাহিনীর প্রাধান ইউনিটগুলো প্রেসিডেন্টের প্রতি বিশ্বস্থ থাকবে। এই ইউনিটগুলোর সৈন্যসংখ্যা এখন প্রায় ৭০,০০০ এবং নিশ্চিতভাবেই পূর্ব পাকিস্তানে এটাই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠিত শক্তি। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে শেখ মুজিব সিভিল সার্ভিস ও পুলিশ বাহিনীর সক্রিয় সমর্থন পাচ্ছে। সামরিক বাহিনীর বাঙালি রেজিমেন্টগুলোর সৈন্যরাও যে শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করবেন এ ব্যাপারে প্রচুর প্রমাণ রয়েছে। আওয়ামী লীগের নিজস্ব যে সংগ্রাম পরিষগুলো (Liberation commitees) আছে তারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্রামগুলোতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সুতরাং একটি সংগঠিত বিচ্ছিন্নবাদী সংগ্রাম চালানোর ভিত্তি রয়েছে এবং এরা দেশের অভ্যন্তরভাগে ও গ্রামগুলোতে সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলো রক্ষায় সুদক্ষ সেনা নিয়োগ করা সেনাবাহিনী জন্য একটি প্রধান সমস্যা হবে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রসদ সরবরাহ ও সৈন্য প্রবাহ নিশ্চিত করার স্বার্থে দুটো সমুদ্র বন্দর ও বিমান বন্দরগুলো প্রধান কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্ব পাবে। ভারতের আকাশসীমা ব্যবহারের অধিকার না-পাওয়া পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করবে, তবে তা সাফল্য ব্যর্থতায় খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না। কারণ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামই আসবে জলপথে। পাকিস্তানের মতো স্বল্পোন্নত দেশের রসদ ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহণের মতো পর্যাপ্ত কার্গো বিমানও নেই। ভারত এই যুদ্ধে খুব গুরুত্বর্পূণ ভূমিকা পালন করবে। পূর্ব পাকিস্তানের সাথে ভারতের বিশাবল সীমান্ত রয়েছে; প্রকাশ্যে বা গোপনে ভারত ব্যাপক সামরিক সরবরাহ দিতে পারে। সরকারিভাবে ভারত সরকার অবশ্য কোনো সংশ্লিষ্টতা রাখবে না। কিন্তু তাৎক্ষিণকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, সীমান্তেরর দু’পাশের বাঙালিদের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম আদান-প্রদান সরকারের জ্ঞাতসারেই চলবে।

যুদ্ধ যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে তাহলে পদাতিক সৈন্যদের জন্য যুদ্ধ করা অবিশ্বস্যরকম কঠি হয়ে উঠবে। পূর্ব পাকিস্তানে অনেক দুরতিক্রম্য নদী রয়েছে এবং এগুলোর মাধ্যমেই ট্যাংক ও আর্টিলারীর সাহায্যে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে বাধা দেয়া হবে। সরবরাহ নিশ্চিত থাকলে বিমান শক্তি একটি মনস্তাত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এর প্রভাব হবে ক্ষণস্থায়ী। অন্যদিকে, সেনাবাহিনী যদি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান চিহ্নিত করতে পারে এবং সেগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব ধরে রাখার আশা করা যায়। জনগণের চরিত্র ও ঐতিহ্যের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের ওপরই প্রেসিডেন্ট বেশি ভরসা করতে পারে।

তবে, সাময়িকভাবে বাঙালিদের দাবি দমন করা গেলেও তাদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করা যাবে না। তাছাড়াও, ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিভেদ বিবেচনায় নিলে আধাখ্যাঁচরা স্বায়ত্বশাসন আদৌ সম্ভব কিনা সে ব্যাপারে গত তিন সপ্তাহের ঘটনাবলী প্রশ্ন তোলে। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয় তখন দুই অঞ্চলের যে সাদৃশ্যের ভিত্তিতে ঐক্য স্থাপন করা হয় তা হলো দুই অঞ্চলই বৃটিশ ভারতের মুসলমান এলাকা। কিন্তু বর্তমানে পূর্ব বাংলা ধর্মীয় এই ভিত্তিকে অস্বীকার করতে চায় বা সংস্কার করতে চায়। গত কয়েক সপ্তাহে স্বায়ত্বশাসন প্রশ্নে যে বিতর্ক হচ্ছিল তাতেও এ-চিত্র ফুটে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তানীদের একটি অন্যতম অভিযোগ হলো যে তাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ তাদের দেয়া হয় না, এবং বৈদেশিক অনুদানেও তাদের ন্যায়সঙ্গত ভাগ দেয়া হয় না। তাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের অধিকার যদি স্বীকার করে নেয়া হয় তাহলে এর সাথেসাথেই আসবে মূদ্রা, ব্যাংক, ট্যাক্স ও এরকম অন্যান্য বিষয় নির্ধারণের প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকার কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীনভাবে বৈদেশিক বাণিজ্য করতে দেয়ার অর্থ ভারতের সাথে বাণিজ্য করতে দেয়া এবং এক সময় হয়তো দেখা যাবে পূর্ব পাকিস্তানের চাহিদা ও ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনুযায়ী ভারতের সাথে প্রদেশটির সম্পর্ক গড়ে উঠছে। প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে আলগা হবে - এবং তার চূড়ান্ত পরিণতি হবে একমাত্র স্বাধীনতা।

যদিওবা জোড়াতালি দেয়া একটা সমাধানের পথ খোলা ছিল এখন তার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার আশা তিরোহিত। যে আদর্শ ও ঘটনাবলীর মাধ্যমে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল তার থেকে বেরিয়ে এসে ক্রমান্বয়ে একটি স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে হয়। ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা এটাকে একটা অশনি সংকেত হিসেবে দেখতে পারে। পূর্ব বাংলায় মওলানা ভাষানীর নেতৃত্বে বিপ্লবী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি - যদিও তার অতীত প্রতিপত্তি কমে এসেছে এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি অন্তত তিনটি উপদলে ভাগ হয়ে গেছে তবু এদের মধ্যে অনেকেই চীনকে অনুসরণ করে। পূর্ব পাকিস্তানে যদি গৃহযুদ্ধ শুরু হয় তবে তা দীর্ঘদিন ধরেই চলবে এবং সময়ের সাথে সাথে শেখ মুজিবের নিয়ন্ত্রণও কমে আসতে পারে। আর এই পরিস্থিতিতে হয়ত কৃষক গোরিলা রণনীতির প্রবক্তারা প্রভাব বিস্তার করে ফেলবে। পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এবং দেশটিকে বিপ্লবী লড়াই থেকে রক্ষা করতে হলে দেশের সমগ্র অঞ্চলে শেখ মুজিবের প্রভাব টিকে থাকতে থাকতেই স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে।

পরিস্থিতি শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে বাধ্য করেছে। সেনাবাহিনীর আভ্যন্তরীণ চাপও হয়ত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে, যার সাথে ব্যক্তিগতভাবে তিনি হয়তো একমত নন। পাকিস্তানের জন্মকালে এটাকে ঘিরে যে জাতীয় পরিচয়ের রাজনীতি জড়িত ছিল তা এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে, এমনকি ভরতেও। ঢাকার রাস্তায় সমাবেশগুলোতে দেখা গেছে জিন্নাহর কুশপুত্তলিকা দাহ করতে। কেউই বলতে পারে না এই ভাবাবেগ দেশটিকে কোথায় নিয়ে যাবে।

দ্য টাইমস ২৭ মার্চ, ১৯৭১


লন্ডনে দিনটি ছিল পাকিস্তানের যুদ্ধবাদীদের

আমাদের বিদেশ সংবাদদাতা

বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা গিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে আলোচনায় ব্যাস্ত রাখতে। আর এই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আগ্রাসনের সমস্ত প্রস্তুতি চলছিল। এ সময় পশ্চিম পাকিস্তান এবং অন্যান্য স্থানে যেসব বাঙালি গুরুত্বপর্ণ পদে ছিল তাদেরকেও অপসারণ করা হয়। সম্ভবত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বহুল প্রচারিত সমঝোতার উদ্যোগ নেয়ার আগেই এই সামরিক সরকারের সম্প্রসারণবাদীরা কাজ শুরু করেছিল। ইয়াহিয়া খান যেদিন আলোচনার উদ্দেশ্যে ঢাকা গেলেন সেদিন লন্ডনে গুরুত্বপূর্ণ পদধিকারী একজন বাঙালিকে স্বল্প সময়ের নোটিশে অপসারণ করা হয়। তিনি লন্ডনে পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপক। করাচি থেকে টেলিফোন একেএম মহিউদ্দীনকে তার অধীনস্ত পাঞ্জাবী ডেপুটি ম্যানেজারের কাছে শাখার দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়। লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাই কমিশনে কর্মরত সিনিয়র বাঙালি অফিসারগণ জনাব মহিউদ্দীনকে এই নির্দেশ না মানতে বলেছিলেন। কিন্তু জনাব মহিউদ্দিন করাচির নির্দেশ পালন করে দু’ঘণ্টার মধ্যে অফিস ত্যাগ করেন। তিনি পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করছেন। পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংকের লন্ডনস্থ শাখার মাধ্যমে সেদেশের সকল বৈদেশিক মূদ্রার লেনদেন হয়, যার পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড। অধিকাংশ বৈদেশিক সাহায্য এই শাখার মাধ্যমে পাকিস্তানে পৌঁছাত। ভয় ছিল যে জনাব মহিউদ্দীন তার পদাধিকার বলে এসব বৈদেশিক সাহায্য স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানে সরবরাহ করতে পারেন। কারণ যেকোনো লেনদেনের জন্যই জনাব মহিউদ্দিনের স্বাক্ষরের প্রয়োজন। এই ব্যাংক শাখায় পূর্ব পাকিস্তানী কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য তাকে সন্দেহ করা হতো।

পদোন্নতি
জনাব মহিউদ্দীনের অপসারণের খবর লন্ডনস্থ পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ে। ছাত্র ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট একরামুল হক বেশ কিছু সংবাদপত্রকে এই তথ্য জানিয়ে দেন। কিন্তু রিপোর্টাররা এই তথ্য পেয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক অফিসে ফোন করলে তাদের জানানো হয় যে জনাব মহিউদ্দীনকে জয়েন্ট ম্যানেজিং ডাইরেক্টর পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে এবং তিনি বদলির অপেক্ষায় আছেন।

লন্ডনস্থ পাকিস্তান হই কমিশনে দুটো বিবদমান গোষ্ঠী কাজ করছে। হাই কমিশনার জনাব সালমান আলী কারো সাথে একা একা কথা বলছেন না। একজন বাঙালি অফিসার এবং একজন সেনা কর্মকর্তা সবসময়ই তার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে। হাই কমিশনের ফাস্ট সেক্রেটারি জনাব রিয়াজুল করিম এবং অডিট ও একাউন্টস ডিপার্টমেন্টের প্রধান বাঙালি।

গত কয়েকদিন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমাদের লন্ডন অফিসে আসা খবর থেকে দেখা যাচ্ছে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী অসংখ্য বাঙালি অফিসারকে অপসারণ করা হয়েছে কিংবা ক্ষমতাশূন্য করে দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক এবং অন্যান্য আধাসরকারী ব্যাংক, যেমন পকিস্তান শিল্প উন্নয়ন ব্যাংক যাদের ঢাকাতে কেন্দ্রীয় অফিস রয়েছে, বেশিরভাগ লিকুইড এ্যাসেট করাচিতে ইতোমধ্যে স্থানান্তর করেছে বলে অনুমান করা হচ্ছ।

লন্ডনে অভিবাসিত পূর্ব পাকিস্তানীরা, যারা মনে করেন ইয়াহিয়া খানের সমঝোতার প্রচেষ্টা আন্তরিক ছিল না, গতকাল তারা এর প্রমাণ হিসেবে দেখান যে সমঝোতার প্রচেষ্টা ভেঙ্গে যাওয়ার সাথে সাথেই কয়েক জাহাজ ভর্তি সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে পৌঁচেছে। দ্য গার্ডিয়ান
২৭ মার্চ ১৯৭১

মুক্তযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৬

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29507347 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29507347 2011-12-21 20:12:44
শেখ মুজিব: শহীদ হবার পথে যে সংকটের আশঙ্কা করেছিলেন এখন তারই মুখোমুখি শেখ মুজিবুর রহমান

পল মার্টিন
অনুবাদ: আ-আল মামুন

পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি পাকিস্তানের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে জনগণকে একতাবদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছেন, নিজেই এখন প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। গত বিশ বছরে তার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে। বর্তমানে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীকার সংগ্রামের সবচেয়ে সংকটময় সময়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং পূর্ব বাংলার যে ৯৬ শতাংশ ভোট তাকে জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতায় পরিণত করেছিল, এখন যেন তার চেয়েও বেশি জনসমর্থন রয়েছে তার পিছনে। সম্প্রতি নিজ বাসভবনে আমাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “সেনাবাহিনী আসুক এবং আমাকে জেলে নিক্ষেপ করুক। নিজে থেকেই দেখ, আমাকে পাহারা দেয়ার জন্য কেউ নেই। তাদের হাতেই সব সমরাস্ত্র রয়েছে। তারা আমাকে হত্যা করতে পারে। এমনকি তারা আমার পরিবারের সব সদস্যকেই হত্যা করতে পারে। কিন্তু তাদেরকে জানাও যে তারা ৭৬ মিলিয়ন বাঙালির চেতনাকে হত্যা করতে পারবে না। জনগণ আমার ওপর আস্থাশীল এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তারা প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। তারা সেটা প্রমাণও করেছে। অস্ত্র দিয়ে বাংলার মানুষের কণ্ঠস্বর কখনোই রুদ্ধ করা যাবে না।”

গত তিন সপ্তাহ ধরে শেখ মুজিবের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ছে। দুই দিক থেকে তাকে এই চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সাধারণ নির্বাচনের ফলে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের সমাধান করা যাবে- এরকম তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে বিরামহীনভাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে বাঙালির মুক্তির যে আভা গতমাস থেকে জনতার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে তা প্রদেশব্যাপী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে পূর্ণ গণ-অসহযোগ রূপে প্রকাশ পাচ্ছে এবং তার রাজনৈতিক মর্যাদাকে চাপের মুখে ফেলেছে। একইসাথে তাকে দলের ভিতরের কট্টর স্বাধীনতাবাদীদেরও মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তবে, পাকিস্তানের সাংবিধানিক সমস্যা সমাধানে সামরিক বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানের সুবিধা নিশ্চিত করে বাঙালিদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটাই হয়তো যুক্ত পাকিস্তানের সমাপ্তি টানবে। যদিও শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন তবু বলা যায়, সামরিক জান্তার যুদ্ধাংদেহী অবস্থানের পক্ষে যেসব পশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দ রয়েছেন তাদের চেয়ে নিশ্চিতভাবেই তিনি অনেক বেশি দেশপ্রেমিক।

দীর্ঘদেহী সুদর্শন ৫১ বছর বয়সী শেখ মুজিবুর রহমানকে অনেকটা সফল ব্যবসায়ীর মতো দেখায়। মুসলিম সমাজের গোত্রপতিদের মতো তিনি তাঁর রাজনৈতক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। জাতীয় পরিষদ অধিবেশন বাতিলের মাধ্যমে এ মাসের শুরুতে যে সংকটের শুরু হয়েছে তখন থেকেই তিনি অসামান্য ধৈয্যের পরিচয় দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সাথে তাকে ঘন ঘন বসতে হচ্ছে, নীতি নির্ধারণ করতে হচ্ছে এবং প্রদেশের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করতে হচ্ছে। তদুপরি, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সংকট সমাধানের প্রস্তাব নিয়ে আসছেন, তাদের সাথেও বসতে হচ্ছে। সব কিছুর ওপরে তার বাড়ি বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদীদের আন্দোলন পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

স্বাধীনতার উল্লেখ না করার যে কৌশল তিনি আগে থেকেই নিয়েছেন সেটা অক্ষুন্ন রেখে বললেন, ‘আমি যা চাই তা হলো আমার জনগণের মুক্তি।’ তিনি আরও বললেন, “আসুন সত্যের মুখোমুখি হই। বৃটিশরা যখন ভারত শাসন করেছে তখনও আমাদের ওপর এতো ট্যাক্স আরোপ করা হয়নি। তারা এই প্রদেশের সম্পদ ভোগ করেছে, কোনো ট্যাক্স আরোপ করেনি। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিম পাকিস্তানীরা আমাদেরকে কেবল কলোনি ও বাজার হিসেবে ব্যবহার করে। আমাদের অধিকার আছে এবং গত নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমেই সেটা প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই মিসেস ইন্দিরা গান্ধি প্রধান মন্ত্রী হিসবে শপথ গ্রহণ করেছেন। আর, আমি নির্বাচনে জয়ী হয়েছি গত বছর অথচ এখনও শপথ গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করছি।”

মিশনারী স্কুল শেষ করে ভারত-পাকিস্তান ভাগের পূর্বেই তিনি কোলকাতা ইসলামীয়া কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশন ও পরে মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে চল্লিশের দশকের শুরুতেই তার রাজনৈতিক জীবন শুরু। যাহোক, দেশ ভাগের পর মুসলিম লীগ পূর্ব বাংলায় ক্ষমতায় আসে। তিনি মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আসেন। বাংলা ভাষা আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে মুসলিম লীগ শাসনামলেই প্রথমবারের মতো তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। পরবর্তী পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীগুলোর শাসনামলে তাকে আরও চারবার কারাবরণ করতে হয়েছে।

১৯৬৬ সালে পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনের আওতায় সামরিক সরকার প্রধান আইয়ুব খান তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। এই ঘটনাই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠার সূচনা করে এবং তিনি ক্রমান্বয়ে পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে শেখ মুজিব ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করার পরই তাঁকে আবার কারারুদ্ধ করা হয়। ২১ মাস সাধারণ কারাগারে আটক থাকার পর তাঁকে সামরিক তত্ত্ববধানে সরিয়ে নেয়া হয় এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। অভিযোগ আনা হয় যে তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তাঁর গ্রেপ্তারের পর থেকে গত বছর বিচার শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট ও স্বতস্ফূর্ত গণআন্দোলন চলতে থাকে। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। কোনো সন্দেহ নেই যে, সরকার শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং মামলা অমিমাংসিত ভাবে শেষ হয়ে যায়। আর এর ফলে দেশব্যাপী যে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয় সেটাই আইয়ুব খানের পতন ঘটায়। তার পতনের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান আবার সামরিক সরকার গঠন করেন।

গত তিন সপ্তাহ যারা শেখ মুজিবকে কাছে থেকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন তারা বুঝেছেন যে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুর বছরগুলোতে পশ্চিম পাকিস্তানীরা যে দৈন্যতা চাপিয়ে দিয়েছিল তিনি তা ভুলে যাননি। দীর্ঘদিন থেকে যারা শেখ মুজিবের সাথে রয়েছেন তারা জানেন তিনি সব সময় কারাভোগের দিনগুলোর কথা এবং যেকোনো সময় তাকে হত্যা করা হতে পারে- এমন বলতেন। অবশ্য, সবসময় যে ভয় পেতেন তার মুখোমুখি হয়তো তাকে হতে হবে না, এমনটাই তাঁর বিশ্বাস ছিল। এ বিষয়ে তিনি নিজেই সবসময় বলতেন, “আমি আশাবাদী। সবচেয়ে ভালোটার জন্য আমি চেষ্টা করে যাই কিন্তু সব সময় মন্দটার জন্যও প্রস্তুত থাকি।”

দ্য টাইমস

২৭ মার্চ ১৯৭১


মুক্তযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৫
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29506097 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29506097 2011-12-19 22:00:39
শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণা: পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক যুদ্ধ অনুবাদ: আ-আল মামুন

পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রদেশটিকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ঘোণা করায় প্রদেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ দলটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং শেখ মুজিবকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, “তার অপরাধ ক্ষমা করা হবে না।”

পাকিস্তানে সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হয়েছে এবং সংবাদপত্রের ওপর পূর্ণ সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের সাথে সারা বিশ্বের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। শুধু ঢাকা থেকে একটি গুপ্ত রেডিওর বুলেটিন সম্প্রচার থেকে এবং সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় নিতে আসা লোকদের কাছ থেকে সেদিনের নাটকীয় ঘটনাবলির সংবাদ জানা গেছে।

ভারত-পূর্ব পাকিস্তান সীমান্ত থেকে গুপ্ত রেডিওর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শেখ মুজিবের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তারা আরও জানিয়েছে, ছয়টি শহরে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদেরকে ঘিরে রেখেছে পূর্ব পাকিস্তানী সৈন্য ও পুলিশ বাহিনী।

বিশ্বাসঘাতকদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে- প্রেসিডেন্ট
দিল্লি, মার্চ ২৬: পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তের কাছে মনিটর করা গুপ্ত রেডিওর সম্প্রচার অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান গতরাতে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ঢাকা থেকে প্রায় ৫৬ মাইল পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় গুপ্ত রেডিওর সম্প্রচার মনিটর করে এই সংবাদ প্রেস ট্রাষ্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) ছেপেছে। পিটিআই বলেছে শেখ মুজিব নিজে রেডিওতে এই ঘোষণা দেননি। ঘোষণা দিয়েছেন এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি।

সম্প্রচারে বলা হয়, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস্ এর পূর্ব পাকিস্তানী সৈনিক এবং পুলিশ বাহিনী চট্টগ্রাম, কুমিল্লা সিলেট, যশোর, বরিশাল এবং খুলনা শহরে পাকিস্তানী সৈন্যদের অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ব্যাপক যুদ্ধ চলছে। সম্প্রচারে আরও বলা হয় পাকিস্তানী সৈন্যরা শেখ মুজিবকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই তিনি গোপন অবস্থানে চলে গেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

সম্প্রচার থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণকে “শেষ শত্রু সৈন্য নির্মূল না করা পর্যন্ত” স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়ে যেতে আহবান জানানো হয়েছে। সম্প্রচারে আরও বলা হয়, পশ্চিম পাকিস্তানের নির্দয় স্বৈরশাসন থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে “স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের একমাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের” নির্দেশ মেনে চলতে হবে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আজ রাতে জাতির উদ্দেশ্যে সম্প্রচারিত এক ভাষণে শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন। গত ডিসেম্বরে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে তার দল পূর্ব পাকিস্তান থেকে অভাবনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। তিনি বলেন, শেখ মুজিব সরকারি কর্তৃপক্ষকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করেছেন এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতাকে আঘাত করেছেন। তিনি বলেন, “তার এই অপরাধ ক্ষমা করা হবে না।” তিনি শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলনকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি আরও বলেন, সে এবং তার দল গত তিন সপ্তাহ ধরে আইনাসিদ্ধ কর্তৃপক্ষকে অগ্রাহ্য করেছে, পাকিস্তানের পতাকা অবমাননা করেছে এবং জাতির পিতার ফটোগ্রাফ সরিয়ে ফেলেছে। তারা একটা সমান্তরাল সরকার পরিচালনার চেষ্টা করেছে। তারা বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।

তার কন্ঠে ক্রোধ ঝড়ে পড়ছিল। তিনি ঘোষণা করলেন, কোনো ক্ষমতালোভী স্বৈরাচারকে পাকিস্তান ধ্বংস করতে এবং ১২০ মিলিয়ন মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না। শেখ মুজিবের সাথে ঢাকায় সা¤প্রতিক আলোচনাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানের ঘটনা থেকে শুধু একটা উপসংহারেই পৌঁছানো যায়: “শেখ মুজিব ও তার দল পাকিস্তানের শত্রু। তারা পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ ছিন্ন করতে চায়।” তিনি পাকিস্তানের অধিবাসীদের নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন, তার লক্ষ্য আগের মতোই রয়েছে, সেটা হলো: “জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিবর্গের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। যখনই অবস্থার উন্নতি ঘটবে আমি এই লক্ষ্য পূরণের জন্য নতুন করে পদক্ষেপ গ্রহণ করব।”

তিনি বলেন, পাকিস্তানে সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকবে। প্রেসের ওপর পূর্ণ সেন্সরশিপ আরোপ করা হবে এবং ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য শহরে কার্ফিউ বলবৎ থাকবে। প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া পূর্ব পাকিস্তানের গুপ্ত রেডিও’র উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের মধ্যে তীব্র লাড়ইয়ে ব্যাপক হতাহত হয়েছে। ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য কিছু অঞ্চলে ব্যাপক যুদ্ধ চলছে।

কলকাতা থেকে প্রাপ্ত এক সংবাদ মতে, অন্তত ১০,০০০ পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরে অবতরণ করেছে। এনিয়ে প্রদেশটিতে সর্বমোট পাকিস্তানী সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ালো ৭০,০০০। সংবাদ থেকে জানা যায়, সৈন্যরা কয়েকশত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে এবং কৌশলগত অবস্থানগুলো দখল করে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ওয়াশিংটনে জানিয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানে আমেরিকান দূতাবাসে আসা মর্কিনীরা জানিয়েছে যে সেনাবাহিনী এবং ট্যাংক ব্যবহার করা হচ্ছে।

গতকাল পাকিস্তানে অবস্থার অবনতি ঘটে যখন চট্টগ্রাম ও রংপুরে সৈনিকরা জনতার উপর বিক্ষপ্ত গুলিবর্ষণ করে ৩৫ জনকে হত্যা ও ১০০ জনকে আহত করে। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমান আগামিকাল সর্বাত্মক হরতালের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি সকল সামরিক অভিযান বন্ধ করার জন্য প্রেসিডেন্টকে আহবান জানিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সংকট দূর করতে পশ্চিম-পাকিস্তান থেকে ঢাকা গিয়েছিলেন বিলম্বিত আলোচনা চালাতে। কিন্তু “সেখানে তারা পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।” পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা ভূট্টোও এই প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করেছে। তার বামপন্থী পিপলস পার্টি ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

পশ্চিম পাকিস্তানেও গতকাল সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পাঞ্জাব প্রদেশের শিল্প শহর লালপুরে বামপন্থী আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে দিনব্যাপী সংঘর্ষের পর দশ ঘণ্টা সান্ধ্য আইন জারী করা হয়েছে। লাহোর থেকে চার মাইল দূরবর্তী এই টেক্সটাইল শহরে অন্তত ৩০ জন পুলিশ গুরুতর আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পিপলস পার্টির জঙ্গী সমর্থকগোষ্ঠী পিপলস গার্ড রাস্তায় মিছিল শুরু করলে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়।

-রয়টার্স, ইউপিআই ও এপি
দ্য টাইমস ২৭ মার্চ ১৯৭১

মুক্তযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29505505 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29505505 2011-12-18 21:48:59
লিংক শেয়ার করতে পারছি না কেন?
একটু আগেই কিন্তু অন্য একটা সাইট থেকে একটা লিংক আমার ওয়ালে পোস্ট দিলাম। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29504828 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29504828 2011-12-17 21:44:26
পাকিস্তানে বিদ্রোহ গুঁড়িয়ে দিয়েছে ট্যাংক পাকিস্তানে বিদ্রোহ গুঁড়িয়ে দিয়েছে ট্যাংক ৭০০০ নিহত: বাড়িঘর ভস্মীভূত

সাইমন ড্রিং
[ঢাকায় সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারচেষ্টা ফাঁকি দিয়ে তিনি ব্যাংককে এসে পৌঁছেছেন]

অনুবাদ: আ-আল মামুন


এক ঈশ্বর এব এক পাকিস্তানের কসম করে বলছি, ঢাকা আজ একটা বিধ্বস্ত শঙ্কিত জনপদে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৪ ঘণ্টাব্যাপী ঠাণ্ডা মাথায় নৃশংস গোলাবর্ষণের ফলে অন্তত ৭০০০ লোক নিহত; শহরের ব্যাপক এলাকা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। দেশের সামরিক সরকার-প্রধান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যদিও দাবি করেছেন যে অবস্থা এখন শান্ত হয়ে এসেছে, তবু হাজার হাজার লোক শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে পালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার রাস্তাগুলো প্রায় জনশূন্য এবং প্রদেশটির অন্যান্য অঞ্চলে এখনও হত্যাকাণ্ড চলছে।

নিঃসন্দেহে বলা যায়, সেনাবাহিনী কমবেশি সবগুলো শহর ও প্রধান জনবসতিকেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বাঙালিদের পক্ষ থেকে তারা নামমাত্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে। আর, এপর্যন্ত সীমিত প্রতিরোধের ব্যবস্থাও ব্যর্থ হয়ে গেছে। তবুও সামান্যতম উস্কানিতেই জনগণকে গুলি করা হচ্ছে, বিল্ডিংগুলো নির্বিচারে ধ্বংস করা হচ্ছে এবং প্রতিদিন যেন সামরিক বাহিনী ৭৩ মিলিয়ন বাঙালির ওপর আরও কড়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর হচ্ছে।

নিরীহ জীবন

এপর্যন্ত কতো নিরীহ জীবন নিভে গেলো তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা কঠিন। তবে ঢাকার বাইরের অঞ্চল থেকেও রিপোর্ট আসতে শুরু করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর ও কুমিল্লা মিলিয়ে অন্তত ১৫,০০০ লোক নিহত হয়েছে। সামরিক আঘাতের বিভীষিকা সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে- ছাত্ররা তাদের বিছানাতেই নিহত হয়েছে, দোকানের মধ্যেই কসাই নিহত হয়েছে, নারী এবং শিশুরা তাদের ঘরের মধ্যেই পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে, হিন্দুধর্মী লোকদের ধরে নিয়ে গিয়ে গণহারে হত্যা করা হয়েছে, হাট-বাজার-মার্কেট আগুনে ভষ্মীভূত হয়েছে এবং ঢাকা শহরের প্রতিটি বিল্ডিং-এ এখন উড়ছে পাকিস্তানী পতাকা।

সামরিক বাহিনীর হতাহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি, তবে অন্তত একজন অফিসার নিহত হয়েছে এবং দুজন সৈনিক আহত হয়েছে। বাঙালি অভ্যুত্থান সাময়িকভাবে অবদমিত হয়েছে। শেখ মুজিবকে সেনাবাহিনী উঠিয়ে নিয়ে যেতে দেখা গেছে এবং তার আওয়মী লীগের প্রায় সকল শীর্ষস্থানীয় নেতাকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রথম টার্গেট

নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, অনেক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে এবং শেখ মুজিবের আন্দোলনকে সমর্থন করার দায়ে দুটো সংবাদপত্র অফিস ধ্বংস করা হয়েছে। ২৫শে মার্চ রাতে সেনা ট্যাংকগুলো যখন ঢাকার রাস্তায় নেমে এলো তখন তাদের প্রধান টার্গেট ছিল মূলত ছাত্ররা। এক হিসেব অনুযায়ী, ঢাকা আক্রমণের জন্য তিন ব্যাটেলিয়ান সৈন্য ব্যবহার করা হয়েছে - একটা ট্যাংক বাহিনী, একটা গোলন্দাজ বাহিনী ও একটা পদাতিক বাহিনী। রাত ১০টার কিছুক্ষণ আগে তারা ব্যারাক ত্যাগ করে শহরের দিকে যাত্রা করে। রাত ১১টা নাগাদ গুলিবর্ষণ শুরু হয়। যেসব ব্যক্তি তরিঘরি করে গাড়ি উল্টিয়ে, গাছের গুঁড়ি ফেলে বা কংক্রিটের পাইপ ফেলে ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করেছিল যাতে সেনাবাহিনী শহরে ঢুকতে না পারে, তারাই প্রথম শিকারে পরিণত হয়েছে।

২০০ ছাত্র নিহত

মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পরই আমেরিকার সরবরাহকৃত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এম-২৪ ট্যাংকের নেতৃত্বে একদল সৈন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যাত্রা করে। সৈন্যদল বৃটিশ-কাউন্সিল-লাইব্রেরি দখল করে সেটাকে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে গোলাবর্ষণের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। ছাত্ররা সম্পূর্ণ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। সরকার-বিরোধী জঙ্গী ছাত্র ইউনিয়নের প্রধান ঘাঁটি ইকবাল (বর্তমান জহুরুল হক হল- অনুবাদক) হলে প্রায় ২০০ ছাত্র নিহত হয়েছে।

দুদিন পরও অগ্নিদগ্ধ কক্ষগুলোতে ছাত্রদের মৃতদেহ একটু একটু করে পুড়ছিল। অনেক মৃতদেহ বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। অবশ্য হলের পার্শ্ববর্তী পুকুরেই বেশিরভাগ মৃতদেহ ভেসে ছিল। চারুকলার এক ছাত্রের মৃতদেহ পড়ে ছিল তার ইজেলের পাশেই হাত-পা ছড়িয়ে। ৭ জন শিক্ষক নিহত হয়েছে। বাইরের ঘরে লুকিয় থাকা ১২ সদস্যের এক পরিবারের সকলকেই হত্যা করা হয়েছে। সৈনিকরা অনেক মৃতদেহ সরিয়ে ফেলেছে। ইকবাল হলে এখনও ৩০টা মৃতদেহ পড়ে রয়েছে। এই হলের করিডোরে যে-পরিমাণ রক্ত জমাট বেঁধে আছে তা নিশ্চিতভাবেই এই ৩০ জনের চেয়ে অনেক বেশি মৃতদেহের শরীরের। অন্য একটা হলে (জগন্নাথ হল-অনুবাদক) মৃতদেহগুলো দ্রুত গণকবর খুঁড়ে পুঁতে রেখে তার ওপর ট্যাংক চালিয়ে মাটি সমান করে দেয়া হয়েছে।

বাজার এলাকা ধ্বংসপ্রাপ্ত

বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে বসবাসকারীদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণের সময় রেললাইন বরাবর ২০০ গজ জুড়ে গড়ে ওঠা কুঁড়েঘড়গুলো ধ্বংস করা হয়েছে। টহলদার সেনাবাহিনী এখানকার একটা বাজার ধ্বংস করেছে এবং এর ঘুমন্ত দোকানমালিকদেরও হত্যা করেছে। দু’দিন পর যখন রাস্তায় বেড়িয়ে এসব দেখার সুযোগ ঘটলো তখনও অনেক মানুষের মৃতদেহ ছড়িয়ে আছে- তাদের পড়নের কাপড় গলার কাছে উঠে এসেছে।

একই এলাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজে সরাসরি বাজুকা দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। একটা মসজিদ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ধ্বংসলীলা চলছে তখন একদল সৈন্য শহরের অন্য প্রান্তে পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের হেডকোয়ার্টার রাজারবাগ আক্রমণের জন্য চলেছে। প্রথমে ট্যাংক থেকে ভারী গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। তারপর সৈনিকরা কামান দেগে পুলিশের ঘুমন্ত কোয়ার্টারগুলোকে মাটির সাথে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। রাজারবাগ হেডকোয়ার্টারের পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজনও জানে না ঠিক কতোজন পুলিশ নিহত হয়েছে। ১১০০ পুলিশের মধ্যে খুব কমসংখ্যকই হত্যা এড়াতে পেরেছে বলে মনে হয়।

গৃহপরিবেষ্টিত

এসব যখন ঘটছে তখন সেনাবাহিনীর অন্য একটা ইউনিট শেখ মুজিবের বাড়ি ঘিরে ফেলে। রাত ১টার কিছুক্ষণ আগে তার সাথে যখন আমাদের কথা হয় তখন বলছিলেন, তিনি যেকোনো মুহূর্তে আক্রমণের আশঙ্কা করছেন এবং কর্মচারী ও দেহরক্ষী ছাড়া সকলকেই নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তাঁর একজন প্রতিবেশী জানালো রাত ১:১০টায় একটা ট্যাংক, একটা সাঁজোয়া যান ও এক ট্রাকভর্তি সৈনিক বাড়িটির দিকে এগিয়ে আসে ফাঁকা গুলি করতে করতে। সৈন্যবহর বাড়িটির বাইরে এসে থামলে একজন অফিসার ইংরেজিতে ডাক দিল, “শেখ সাহেব, আপনি বেরিয়ে আসুন”। এই আহ্বানের জবাবে তিনি ব্যলকনিতে বেরিয়ে এলেন এবং বললেন, “হ্যাঁ। আমি প্রস্তুত। কিন্ত গুলিবর্ষণের কোনো প্রয়োজন নাই। টেলিফোনে আহ্বান করাই যথেষ্ট ছিল। আমি নিজে গিয়ে হাজির হতাম”। এরপর অফিসারটি বাড়ির বাগানের মধ্যে হেঁটে গিয়ে বললেন, “আপনাকে গ্রেপ্তার করা হলো”।

তিনজন কর্মচারী, একজন সহযোগী ও একজন দেহরক্ষীসহ তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো। দেহরক্ষীকে বেদম প্রহার করা হলে তিনি অফিসারটিকে গালি দিতে শুরু করলেন। পার্শ্ববর্তী বাড়ির নৈশ্যপ্রহরী প্রাচীরের আড়ালে লুকোতে গেলে তাকে গুলি ছুঁড়ে হত্যা করা হলো।

গুলি করে পতাকা নামিয়ে ফেলা হয়েছে

সম্ভবত সেনা সদরদপ্তরের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবকে গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পরই সৈন্যরা তাঁর গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করে। সকল ডক্যুমেন্ট সরিয়ে ফেলা হয়, দৃষ্টিগোচর সবকিছু ভেঙে গুঁড়ো করা হয়, বাগানের দরোজায় তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয় এবং সবুজের বুকে লাল-হলুদ ‘বাংলাদেশ’ পতাকা গুলি করে ভূপাতিত করা হয়, এবং অতঃপর সৈন্যরা চলে যায় ২টা নাগাদ। শুক্রবার সকালে সারা নগরজুড়েই আগুন জ্বলছিল; সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকা দখল করে রেখে লুকিয়ে থাকা ছাত্রদের খুঁজে বের করে হত্যা করতে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে দিতে ব্যস্ত থাকে।

কিছু কিছু এলাকায় তখনও ভারী গোলাবর্ষণ করা হচ্ছিল। তবে গোলাগুলির গতি অনেক হ্রাস পেয়েছিল। ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমান শেরাটন হোটেল-অনুবাদক) হোটেলের উল্টোদিকে গণকণ্ঠ সংবাদপত্রের ফাঁকা অফিসে একদল সৈন্য ঝড়ের বেগে ঢুকে পড়ে। এই অফিসসহ আশেপাশের অনেক বাড়িই জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং একজন নৈশ্যপ্রহরীকে হত্যা করা হয়। ভোর হওয়ার কিছুক্ষণ আগে সব গোলাগুলি থেমে যায় এবং যখন সূর্য উঠে আসে, এক রহস্যময় নীরবতা শহরটিকে ঢেঁকে রাখে। কাকের কর্কশ ডাক কিংবা মাঝেমধ্যে বাঙালি নির্মূল অভিযানে সামরিক কনভয় বা দু’তিনটি ট্যাংকের ঘরঘর করে এগিয়ে চলার শব্দ ছাড়া পুরো শহরটি জনশূন্য এবং একবারেই মৃত হয়ে থাকে।

অবস্থার আরও অবনতি হবে

কিন্তু ঘোর সংকট আসতে তখনও বাকি ছিল। দুপুর ২টায় কোনোরূপ সতর্কীকরণ ছাড়াই সৈন্যরা পুরোনো ঢাকায় অভিযানে নামলো। ঘিঞ্জি গলি-উপগলির এই পুরনো ঢাকা দশ লক্ষাধিক লোকের বাস। পরবর্তী ১১ ঘণ্টাব্যাপী তারা সুশৃঙ্খলভাবে ব্যাপক এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালালো। ঢাকার অধিবাসীদের মধ্যে পুরনো ঢাকাতেই শেখ মুজিবের সমর্থন সবচেয়ে বেশি ছিল।

ইংলিশ রোড, ফ্রেন্স রোড, নয়া বাজার, সিটি বাজার- অর্থহীন কিছু নামের সমষ্টি, কিন্তু এখানেই হাজার হাজার লোকের বসতি। সবকিছু আগুনে পুড়িয়ে ধূলিস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে। নয়া বাজার এলাকার একজন অধিবাসী জানালেন, “হঠাৎ করেই রাস্তার মাথায় সৈন্যদের গাড়ি দেখা গেল। অতপর প্রতিটি বাড়ি তাক করে গুলি করতে করতে তারা এগিয়ে এলো”। অগ্রবর্তী বাহিনীর পিছনে ক্যানভর্তি পেট্রল নিয়ে আরেকটি দল আসছিল। যারা পালাতে চেষ্টা করলো তাদেরকে গুলি করা হলো। আর যারা গৃহাভ্যন্তরে থেকে গেল তারা জীবন্ত পুড়ে কয়লা হয়ে গেল। ১২টা থেকে ২টার মধ্যে সেখানে ৭০০ নারী-পুরুষ-শিশু নিহত হলো। অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হলো অন্তত আরও তিনটি এলাকায়।

পুলিশ আক্রান্ত

একস্থানে অভিযান শেষ করে যতোগুলো পারা যায় মৃতদেহ ট্রাকে নিয়ে সৈন্যরা তাদের পরবর্তী লক্ষ্যে আঘাত হানতে অগ্রসর হচ্ছিল। পুরনো ঢাকার পুলিশ ফাঁড়িগুলোতেও আক্রমণ চালানো হয়। শনিবার সকালে একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর একটা বাজারে তার লোকেদের খুঁজে বেড়াচ্ছিল; বলল, “আমি আমার কনস্টেবলদের খুঁজছি। আমার থানায় ২৪০ জন কনস্টেবল ছিল। এপর্যন্ত আমি ৩০ জনকে খুঁজে পেয়েছি। বাকিরা নিহত হয়েছে”।

ঢাকার অভিযানগুলোর মধ্যে নৃশংসতমটি ছিল পুরনো ঢাকার হিন্দু এলাকায়। সেখানে সৈন্যরা অধিবাসীদেরকে প্রথমে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াতে বলে। তারপর তাদেরকে দলবদ্ধভাবে গুলি ছুঁড়ে হত্যা করে। বাড়িগুলোও এরপর ধ্বংস করা হয়। সৈন্যরা বাঙালি ইনফর্মারদের সাথে নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যকাণ্ড চালাতে শুক্রবার প্রায় রাত ১১টা পর্যন্ত পুরনো ঢাকায় অবস্থান করে। সৈন্যরা সংকেত দিলেই বাঙালি ইনফর্মাররা আওয়ামী লীগের গোঁড়া সমর্থকদের বাড়ি চিনিয়ে দেয়। সাথে সাথে বাড়িটি ধ্বংস করা হয় ট্যাংক চালিয়ে দিয়ে, রিকয়েলস্ রাইফেলের গুলিতে কিংবা এক ক্যান পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে।

এদিকে, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদেরকে ঢাকার শিল্প এলাকা হিসেবে খ্যাত নারায়নগঞ্জ ও টঙ্গীর দিকে অভিযানে ব্যবহার করা হয়েছে। ঢাকা থেকে প্রায় দশ মাইল দূরবর্তী এই দুটো উপশহরই শেখ মুজিবের বামপন্থী সমর্থকদের কেন্দ্রস্থল।

টার্গেট সংবাদপত্র

শনিবার সকালেও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গুলিবর্ষণ চলছিল। তবে অভিযান শুরু করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ শুক্রবার মধ্যরাতের মধ্যেই অভিযানের বৃহদাংশ শেষ হয়েছিল। অভিযানের শেষের দিকের একটা টার্গেট ছিল বাংলা ভাষার সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাক। গোলাগুলি শুরু হলে প্রায় চার’শ লোক ইত্তেফাক অফিসে আশ্রয় নিয়েছিল। শুক্রবার বিকেল ৪টায় ইত্তেফাক অফিসের উল্টেদিকের রাস্তায় এসে দাঁড়ায় চারটি ট্যাংক। বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ বিল্ডিংটি নরককুণ্ডে পরিণত হয়। শনিবার সকালে দেখা গেল অফিসের ভেতরের কক্ষে মৃতদেহগুলোর দগ্ধ অবশিষ্টাংশ শুধু পড়ে আছে।

সৈন্যরা যেমন দ্রুত এসেছিল তেমন দ্রুতবেগেই চলে যায়। শনিবার সকালে রেডিওতে ঘোষণা করা হয়, বিকেল চারটে থেকে কারফিউ উঠিয়ে নেওয়া হবে। পুনঃপুনঃ ঘোষণা দেয়া হতে থাকে: মার্শাল ’ল রেগুলেশান সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে। প্রেস সেন্সরশিপের ঘোষণা দেওয়া হয়, সকল সরকারি কর্মচারীকে কর্মস্থলে যোগদানের এবং সকল ব্যক্তিগত অস্ত্র কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ জারি করা হয়।

আতঙ্ক বাড়ছে

ভোজবাজির মতো শহরে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এলো এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। সকাল দশটা নাগাদ শহরের রাস্তাগুলো মানুষে মানুষে ভরে উঠলো। সবাই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে; আর তখনও পুরনো ঢাকার ব্যাপক অংশে আকাশজুড়ে কালো ধোঁয়া ভেসে বেড়াচ্ছে এবং শহরের বাইরের শিল্প এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠছে। মোটারযান ও রিক্সায় করে লোকজন শহর ছেড়ে যাচ্ছে। তবে অধিকাংশ লোকই জিনিসপত্র সাথে নিয়ে পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। ঢাকার লোকজন পালাচ্ছে। দুপুর নাগাদ হাজার হাজার লোক শহর ছেড়ে যেতে থাকলো। “আমি একজন বুড়ো মানুষ, দয়া করে গাড়িতে আমায় একটু জায়গা দিন”, “আমার সন্তানগুলোকে দয়া করে নিয়ে যান”। কেউই হাসছে না তারা। নীরবে জনতার ঢল শহর থেকে চলে যাচ্ছে। আর যেতে যেতে দেখছে সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ- এক নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ, সযত্নে পরিকল্পিত এবং অনুসূক্ষ্মভাবে বাস্তবায়িত ধ্বংসলীলা। তারা চারপাশ দেখতে দেখতে হাঁটতে থাকলো।

একটা বাজারের কাছে গুলির শব্দ শোনা গেল। সেকেন্ডের মধ্যে আতঙ্কগ্রস্ত ২,০০০ লোক দৌড়াতে শুরু করলো। তবে, সৈন্যবহরে যোগদিয়ে অস্ত্র নেয়ার সময় হঠাৎ গুলি বেড়িয়ে গেলে এই শব্দ হয়েছিল। সরকারি অফিসগুলো প্রায় জনশূন্য। অফিসে যোগদানের নির্দেশ অমান্য করে অধিকাংশ কর্মচারীই নিজ গ্রামে যাওয়ার জন্য শহর ত্যাগ করছে।

সাংবাদিক গ্রেপ্তার এড়ালো
শেখ মুজিবুর রহমানের ২৫ দিনের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ধূলিস্যাৎ করতে সেনাবাহিনী যখন অভিযানে নামে সেই সময় থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত সকল বিদেশী সাংবাদিককে অস্ত্রের মুখে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এবং পরে সবাইকে ধরে প্লেনে উঠিয়ে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়।
ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার সংবাদদাতা সাইমন ড্রিং হোটেলের ছাদে লুকিয়ে থেকে গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হন, যদিও তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য অবিরাম চেষ্টা চালানো হয়েছে। সাইমন ড্রিং ছাড়া কেবল এ্যসোসিয়েটেড প্রেস-এর ফটোগ্রাফার মাইকেল লরেন্ট গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাইমন ড্রিং জ্বলন্ত ঢাকা শহরে ব্যাপকভাবে ঘুরে দেখার সুযোগ পান। গতকাল একটা প্লেনে করে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে আসতে সক্ষম হন। দু’দুবার তার বস্ত্র উন্মোচন করে তল্লাশী চালানো এবং তার লাগেজ পরীক্ষানিরীক্ষা করা হলেও, কৌশলে তিনি ঢাকায় নেয়া নোটগুলোসহ সোমবার সকালে ব্যাংকক পৌঁছে এই রিপোর্ট পাঠান।

দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ ২৭শে মার্চ ১৯৭১

[২৫শে মার্চ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে সাংবাদিকরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। সরেজমিনে ঘুরে দেখা সাইমন ড্রিংয়ের এই রিপোর্টটিই প্রথম বিদেশের পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং পাকিস্তানী শাসকবর্গের মিথ্যাচারের বিপরীতে বাঙালি গণহত্যার বিভীষিকাময় চিত্র তুলে ধরে। সম্ভবত এখানে টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপানোর তারিখ ভুল দেয়া আছে- অনুবাদক, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।]


মুক্তযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৪

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29504755 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29504755 2011-12-17 19:46:42
মার্টিন এডিনির তিনটি প্রতিবেদন, গতকাল ঢাকা থেকে তিনি লন্ডনে ফিরেছেন অনুবাদ: আ-আল মামুন

পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনী কার্ফিউ শিথিল করেছে

গত বৃহস্পতিবার সেনবাহিনী প্রদেশটি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর পূর্ণ শান্তি বিরাজ করছে বলে দাবি করা হয়েছে এবং গতকাল আরও একঘণ্টার জন্য কার্ফিউ শিথিল করা হয়। কিন্তু প্রদেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দরনগরী খুলনায় ব্যাপক অরাজকতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, সেখানে বাম সংগঠনগুলো সবচেয়ে বেশি সংগঠিত। সরকার দাবি করেছে একদল ‘বিশৃঙ্খলাকারী’ (miscreants) কিছু সমস্যা সৃষ্টি করেছে। সরকার আরও দাবি করেছে যে প্রদেশের প্রধানতম বন্দরনগরী চট্টগ্রামে জনতা রাস্তায় ব্যরিকেড দিয়ে গত বুধবার সেনাবাহিনীকে বাধা দিয়েছে। তবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে এবং নিয়ন্ত্রণে আছে। পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবের মুক্ত থাকার দাবি করা হলেও পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে যে তিনি ঢাকায় নজরবন্দি রয়েছেন।

গতকাল আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির চার সদস্যের একটি দল জেনেভা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকবার চেষ্টায় যাত্রা শুরু করেছে। তাদের কাজ হবে যুদ্ধ উপদ্রুত জনগণের রিলিফ চাহিদা যাচাই করা। সুইজারল্যান্ডের এই চার সদস্যের প্রতিনিধিদল করাচির উদ্দেশ্যে প্লেনে যাত্রা করেছে এবং আশা করা হচ্ছে করাচি থেকে তারা ঢাকা পৌঁছাবে। সংকটের সময় পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার দায়ে ভারতকে অভিযুক্ত করে পাকিস্তান সরকার বলেছে যে কলকাতার অদূরে হুগলি নদীতে একটি জাহাজ থেকে গুপ্ত রেডিও ‘ভয়েস অব বাংলাদেশ’ এর সম্প্রচার চালানো হচ্ছে। ভারত এই অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও অনৈতিক’ আখ্যায়িত করে অস্বীকার করেছে।

প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, আজ গুপ্ত রেডিও থেকে আরও কম বুলেটিন সম্প্রচার করা হয়েছে। এই বুলেটিনের একটিতে দাবি করা হয়েছে যে শেখ মুজিবের মুক্তিবাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাদের সাথে তীব্র লড়াইয়ের পর উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ শহর রংপুর দখল করে নিয়েছ। গুপ্ত রেডিও থেকে আরও বলা হয়, সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার’ থেকে দাবি করা হয়েছে যে সেনা কমান্ডার মেজর জিয়া খানের নেতৃত্বে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়েছে। তিনি কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।

জনতা রংপুর সেনাদপ্তর দখল করে নিয়েছে, প্রেস ট্রাস্টের এই রিপোর্টের সত্যাসত্য নির্ণয় করা দুরূহ। এ রিপোর্ট বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না, কারণ রংপুর শুধু ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারই নয়, সেখানে ট্যাংকবহরসহ একটি রেজিমেন্ট রয়েছে। অন্য একটি রিপোর্টে বলা হয়, ঢাকা রেডিও ঘোষণা করেছে যে মার্শাল ’ল হেডকোয়ার্টার থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আরও সেনা নিয়োগের আহবান জানিয়েছে, কিন্তু পরবর্তী রেডিও বুলেটিনে এ সংক্রান্ত আর কোনা সংবাদ সম্প্রচার করেনি। এ ধরনের রিপোর্ট সরকার নিয়ন্ত্রিত রেডিওর জন্য চমকদার খরব হলেও বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে।

ছাত্রাবাসগুলোয় গোলা বর্ষণ করা হয়েছে

যুদ্ধের এই বর্ণনা গত শুক্রবার ঢাকা শহরেরই একটি হোটেলে বসে লেখা। সে সময় আমাদের প্রতিনিধিকে হোটেল ত্যাগ করতে সেনাবাহিনী বাধা দিয়েছে এবং টেলিফোন লাইনও কেটে দেয়া হয়েছিল। শনিবার সকালে পূর্ব পাকিস্তানের বাইরে থেকে এই রিপোর্টটি গার্ডিয়ান অফিসে তার করা হয়।

বৃস্পতিবার রাত ১১:৩০টায় সেনাকনভয়গুলো যখন ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যা শুরু করে তখন বাঙালি গণজাগরণ থেমে যায়। সেনাদের অস্ত্র উঁচিয়ে চলা আজ সকালে আমি দেখেছি। একটি জীপের পিছে ট্রাকে বিশাল পাকিস্তানী পতাকা উড়িয়ে তারা যাচ্ছিল। গত চার সপ্তাহে বাংলায় এতো বড় পতাকা খুব কমই দেখা গেছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে এখনও আগুন জ্বলছে। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস এলাকা এখনও দাও দাও করে জ্বলছে। সেখানে রাত ১:২০টায় রকেট লাঞ্চার গর্জন করে ওঠে। নয় ঘণ্টা পরও সেখান থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যাচ্ছে।

যে মেইনরোড ক্যান্টনমেন্টের দিকে গেছে তার উপরই আমার হোটেল এবং শহরের একটু বাইরেই বিমান বন্দর। আমার হোটেল থেকে যা কিছু ঘটেছে সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। গত রাত ১১টা থেকেই আর্মি গার্ডরা আমাদেরকে হোটেলের বাইরে যেতে দেয়নি। মূলত হোটেলে অবস্থানরত পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তার জন্যই সেনা সদস্যরা পাহারায় রয়েছে। স্বংয়ক্রিয় অস্ত্রের গুলিবর্ষণ ঘণ্টাখানেক ধরে অবিরত চলছে। আর ২:১৫টার দিকে আর্টিলারির গোলাবর্ষণ প্রথম অনুভব করা গেল। হোটেলের ফ্লোর কেঁপে উঠল। হোটেলের এক কর্নারে একটা মোড়। মোড়ের উল্টো দিকে ছোট ছোট দোকনের একটি দোতলা মার্কেটের পাশের গলি দিয়ে দুটি কার টেনে আনা হচ্ছিল। মেশিন গান
এলাকাটা শান্ত। আধামাইল বা তারও দূরবর্তী অঞ্চলে গুলিবর্ষণের শব্দ শুনছিলাম। এমন সময় মেশিনগান তাক করে দুটি জিপ মোড়ের উপর এল এবং জনশুন্য রাস্তায় গুলিবর্ষণ করল, তারা কার দুটিতে এবং গলির মোড়ের দোকানে আগুন ধরিয়ে দিল। মার্কেটটির ছাদ থেকে কিছু সোরগোল শোনা গেল এবং সাথে সাথে একতালার কর্ণার জানালা বরাবর গুলি করা হলো। একদল সৈন্য বিল্ডিংটি লক্ষ্য করে একটি বাজুকা নিক্ষেপ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। ইনফ্যান্ট্রির দুটি দল কার দুটিকে ভেঙে গুড়ো করে রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলল এবং ফাঁকা রাস্তা ও পার্শ্ববর্তী পতিত জমি লক্ষ্য করে মাঝে মাঝেই গুলি বর্ষণ করতে থাকল। প্রবেশদ্বার ভেঙ্গে তারা গণকণ্ঠ সংবাদপত্র অফিসের ক্ষুদ্র উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালো। অফিসের দিকে না গিয়ে তারা গুলিবর্ষণ শুরু করল। ‘গণকণ্ঠ’ সংবাদপত্রটি বাঙালির স্বাধীনতা এবং সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতা নিয়ে সবসময় সোচ্চার ছিল।

যারা অফিসের ভিতর ছিল তাদেরকে বাইরে চলে আসতে বলা হলো যাতে তারা প্রাণে বাঁচতে পারে (যদিও এখানকার ভাষা বাংলা, তারা উর্দূতেই এই নির্দেশ দিল)। সেনারা তারপর জোর করে ভিতরে ঢুকে দ্রুত পুরো একতলা বিলিডংটিতে আগুন ধরিয়ে দিল। যখন এসব ঘটছিল তখন কিছু দূরে রাস্তায় প্রায় পনের জন যুবককে দেখা গেল। তারা স্লোগান দিল। সেনারা তাদের দিকে মেশিনগান তাক করে গুলি করতে শুরু করল। তারা ইতস্তত ছড়িয়ে পড়ল। ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ও ‘নারায়ে তকবির’ ধ্বনি দিয়ে সৈন্যরা গলির মধ্যে তাদেরকে তাড়া করল।

সেনারা যখন দলবদ্ধভাবে এসব করছিল তখন তাদের দিকে কোনো দিক থেকেই কোনো গুলি বর্ষিত হয়নি, কেউ আহতও হয়নি। লড়াই শুরু হতে পারত কারণ তারা ছাদে মানুষের আভাষ পেয়েছিল। তাদের এই কাজ শেষ হলো। যত্ন করে আগুন দেয়া দুটো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দাও দাও করে জ্বলতে থাকল এবং বিল্ডিংয়ের একটা ব্লক বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝড়া হয়ে গেল। একটি রাস্তার মোড়েই যদি এতকিছু ঘটতে পারে তাহলে সহজেই অনুমান করা যায় গতরাত ১১টার দিকে যেসব স্থানে জনতা ব্যারিকেড দিয়েছিল সেখানে কী ঘটেছে।

একজন সাংবাদিক এক নৈশভোজে যোগদান শেষে হোটেলে ফেরার পথে দেখতে পান বিমানবন্দরের আশেপাশের মোড়গুলোতে ততক্ষণে জনতা রোডব্লক তৈরি করেছে। তার বাহন লক্ষ্য করে ইট ছোঁড়া হয়। রাত তিনটার দিকে সে অঞ্চলে ব্যাপক আগুন জ্বলতে দেখা যায়। সকাল ৭টার দিকে রাস্তা থেকে সব ট্যাংক উধাও, তার পরিবর্তে দেখা গেল ক্রেন। সম্ভবত রোডব্লক সরিয়ে ফেলার জন্যই ক্রেন নামানো হয়। রাতে সবচেয়ে তীব্র গুলিবর্ষণের শব্দ আসছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর দিক থেকে। মহসিন হল এবং মেয়েদের হোস্টেলের দিকে অন্তত এক ডজন ট্যাংকের গোলা বর্ষণ করা হয়েছে। রাত ২:৩০টার দিকে ইকবাল হল দাও দাও করে জ্বলে উঠতে দেখা যায়।

রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টারের দিক থেকেও গুলিবর্ষণের শব্দ পাওয়া যায়। এর আগে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে টেলিফোনে জানানো হয়েছিল যে তাদের বিল্ডিং সেনাবাহিনী ঘেরাও করে রেখেছে। সঠিকভাবে হতাহতের সংখ্যা নিরুপণ করা দুরূহ। তবে এ সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই হাজার অতিক্রম করে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছে বলে যে অনুমান করা হয়েছিল, হয়ত দেখা যাবে এর পরিবর্তে তারা স্কুলের বালক ক্যাডেটদের মতো খেলনা রাইফেল ও বাঁশের লাঠি নিয়েই প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

সেনাবাহিনী এখন প্রদেশটির উপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে বলে বিশ্বাস করছে। একজন ক্যাপ্টেন আজ সকালে এভাবে বললেন, “এখন অবস্থার উন্নতি ঘটবে। এখন আর কেউ সামনে এসে কথা বলতে পারবে না। প্রথমদিকে আমরা বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিইনি, কিন্তু এখন খুবই গুরুত্ব দিচ্ছি।” অন্য একজন ক্যাপ্টেন আমাদেরকে হোটেলের সামনের আঙ্গিনা দিয়ে লবির দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে যেতে বলল, “আমার নিজের লোকদের যদি আমি হত্যা করতে পারি, তাহলে আমি আপনাকেও হত্যা করতে পারি। এক সেকেন্ডের মধ্যেই আপনার ব্যবস্থা করতে পারি।” তিনি আমাকে সেই সামরিক জনসংযোগ কর্মকর্তার উক্তি স্মরণ করিয়ে দিলেন যিনি দু’সপ্তাহ আগে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন, “আমরা যদি নির্দেশ পাই তাহলে এভাবে গুঁড়িয়ে দিতে পারি।”

আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে এটা স্পষ্ট হওয়ার সাথে সাথেই সেনাবাহিনী পদক্ষেপ নিয়েছিল। বুধবার সকালে ঢাকায় জেনারেলদের এক মিটিংয়ের পরই অভিযানের প্রস্তুতি নেয়া হয়। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে সামরিক বাহিনী একটি সুসমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে অভিযান চালায় এবং অন্যদিকে শেখ মুজিবকে সুকৌশলে আলোচনা চালিয়ে যেতে প্ররোচিত করা হয়। চট্টগ্রাম এবং ঢাকার উত্তরে অবস্থিত রংপুর জেলার সৈয়দপুরের ঘটনাবলী অবস্থার অবনতি ঘটায়। চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যারিকেড নির্মাণের মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে কার্গো খালাস করতে বাধা দেয়ার ঘটনা পুরো শহরটিকে অচল করে দেয় এবং ঢাকার সাথে চট্টগ্রামের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম এবং সৈয়দপুর উভয় জায়গাতেই সৈনিকদের সাথে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন লোক মারা যায়। দেখে মনে হচ্ছে, সেনাবাহিনীর প্রধান টার্গেট ছিল রাজনৈতিক মহল, বাঙালি সামরিক জওয়ান ও প্রেস। আজ সকালে মার্শল ’ল কর্তৃপক্ষ ঢোল পিটিয়ে সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কাঠের লাঠির মতো অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে চলাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে।

অন্যান্য বিদেশী সাংবাদিকের সাথে আমাকেও আজ করাচির উদ্দেশ্যে প্লেনে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। একজন সেনা মুখপাত্র আমাদেরকে দেশ ত্যাগের জন্য মার্শাল ’ল কর্তৃপক্ষের অনুরোধ পৌঁছে দিল। তিনি বললেন, সেনাবাহিনীকে খুব সামান্যই প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছে। রকেট লাঞ্চারের অধিকাংশ গোলাবর্ষণই করা হয়েছে ব্যারিকেড লক্ষ্য করে। কিন্তু যখন আমি দেশটি ত্যাগ করি তখন আকাশে ব্যাপক ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেসে বেড়াচ্ছিল। পুরনো ঢাকার যে অঞ্চলে বস্তিগুলো সেদিক থেকে ঘন ধোঁয়া ভেসে আসছিল। সেনা মুখপাত্রটি বলল, তাদের জানা ছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়েছে। তাই সে এলাকা থেকে ব্যাপক বিষ্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘সত্যিই কি?’ আমি হাতের আঙ্গুল মটকে হত্যার ইঙ্গিত করে আরও জিজ্ঞাসা করলাম, “এভাবেই তাদের ব্যবস্থা করলেন?” সে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হল, বলল: “হ্যাঁ। তারা অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলেছিল।” সে আরো বলল, “আমাদের উদ্দেশ্য ছিল মূলত একটি অনৈতিক ডিফ্যাক্টো সরকার উৎখাত করা।”


সৈনিকরা ‘দেখামাত্র গুলি করো’ কৌশল নিয়েছে
প্রায় নিরস্ত্র জনগণের ওপর সামরিক বাহিনীর হামলা শুরু করার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর আমি এবং অন্যান্য বিদেশী সাংবাদিক যখন ঢাকা ত্যাগ করছি তখনও শহরটি জ্বলছিল। ভোরের আবছাঁয়া সরিয়ে পৌর ভবনগুলোর দক্ষিণ দিক থেকে দুই সারি কালো গভীর ধোঁয়া ঢাকা শহরের আকাশ ছেয়ে যাচ্ছিল। একজন বাঙালি অনুমানের ওপর জানালো যে পুরনো ঢাকার বস্তি এলাকা থেকে এই ধোঁয়া উঠছে। এই এলাকা থেকেই শেখ মুজিবের নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ বিপুল একনিষ্ঠ সমর্থক পেয়েছিল। বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে আমরা আরও অগ্নিসংযোগের প্রমাণ পেলাম। পতিত জমিতে অনেকগুলো বাঁশের চালাঘর তখনও একটু একটু জ্বলছিল। আয়তক্ষেত্রাকার একটি মার্কেটের দোকানগুলোতে কিছুক্ষণ আগেই আগুন দেয়া হয়েছে। বিক্ষিপ্ত গুলিবর্ষণ

সামরিক বাহিনীর অভিযান সম্পূর্ণ সফল হয়েছে দাবি করা সত্ত্বেও সারাদিন ধরে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের বিক্ষিপ্ত গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা যায়। আর, মাঝে মাঝে আবার ভারী গোলাবর্ষণের শব্দও পাওয়া যায়। যাওয়ার পথে আমরা ক্যান্টনমেন্ট ও ঢাকা শহরের মধ্যকার প্রধান সড়কে জনতার ব্যারিকেড দেয়ার করুণ প্রচেষ্টা দেখতে পেলাম। কিছু গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। ট্যাংক কিংবা বুলডোজার দিয়ে সেগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলার চিহ্ন দেখা গেল।

যে কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে ঢাকা শহর দখলে নিতে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে এবং প্রতিশোধ নিতে কিছু টার্গেট আগে থেকেই চিহ্নিত করা হয়েছিল। যেমন ‘গণকণ্ঠ’ সংবাদপত্র টার্গেট করা হয়েছিল। দেখামাত্র গুলি চালিয়ে তারপর জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারেও আগে থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া ছিল। সেনাবাহিনীর আচরণ থেকে বুঝা গেল যে তারা নিরীহ কোনো গলি দিয়ে যাওয়ার সময়ও নিরাপত্তার জন্য ব্যাপক গুলিবর্ষণ করতে করতে অগ্রসর হয়েছে। এটাও সত্য যে কিছু কিছু ভবনে উদ্দেশ্যেমূলকভাবে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী সরাসরি না করলেও শুক্রবার দুপুরে কারফিউ চলাকালে আগুনের বেগ আরও বেড়ে গিয়েছিল। একজন সরকারি মুখপাত্র দাবি করলেন, জনগণ ব্যারিকেডগুলোর আশেপাশে কেরোসিন জমা করে রেখেছিল সৈনিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য। তাই অনেক জায়গায় আগুন ধরে গেছে। কিন্তু এই দাবি অবিশ্বাস্য। নির্বিচার

গণকণ্ঠ সংবাদপত্রের বেলায় এমন দাবি খাটে না- পত্রিকাটির প্রথম পাতায় ছাপা আদর্শবাণী ‘জনগণকে সবসময় তুমি বোকা বানাতে পারো না।’ মার্কেটের দোকানগুলো সম্পর্কেও এমন দাবি সত্য নয় বলে আমার বিশ্বাস। সেখানে এখন কোনো লোক নেই, একেবারেই পরিত্যাক্ত হয়েছে। বেসামরিক জনগণের সাথে সেনাবাহিনী কী আচরণ করছে তা পরিমাপ করা দুরূহ। একজন রাশিয়ান সাংবাদিক গাড়ি চালিয়ে হোটেলে ফিরে জানালো, সৈন্যভর্তি কিছু জিপ থেকে বাড়িগুলোর জানালা লক্ষ করে নির্বিচারে মেশিনগানের গুলি চালাতে দেখেছে সে। রাস্তার সব লোকের উপর সেনাবাহিনী গুলি চালাচ্ছে কিনা এক ব্রিগেডিয়ারকে এই প্রশ্ন করা হলে উত্তর দিলেন, “নারী এবং শিশুদের ওপর নয়।”

শুক্রবার পূর্ব পাকিস্তান সময় বিকেল ৫:৩০টার মধ্যে মার্শাল ’ল কর্তৃপক্ষ আমাকে এবং অন্যান্য প্রায় ৩০ জন বিদেশী সাংবাদিককে ঢাকা ত্যাগ করার অনুরোধ করলো। তখনও ঢাকার আকাশে দুই সারি ভারি ধোঁয়া উঠছিল এবং গুলিবর্ষণ চলছিল। সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সালিকের কাছে ব্যাখ্যা চাইলে বললেন, “কিছু কিছু অনুরোধ আছে যা পালন করা বাধ্যতামূলক”! শেষ পর্যন্ত আমি তার ব্যাখ্যাকেই সঠিক ধরে নিলাম। কারণ গত ছয় সপ্তায় ভারত ও পাকিস্তানে আমি রিপোর্ট করার জন্য যে সব নোট নিয়েছি সেগুলো; বেশ কিছু বই ও প্যামপ্লেট, কিছু বন্ধুর ঠিকানা, ডেইলি মিরর এর একটা কাটিং যার বিষয়বস্তু ছিল সম্ভবত ‘অভিবাসীর জন্য ক্রিড়াবিদ হিসেবে পোজ দিয়েছি’ বা এরকম উদ্ভট বিষয় সবই এখন মার্শাল 'ল কর্তৃপক্ষ বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছে। আর এই মার্শাল ’ল কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সাথে আমাকে গত ৪৮ ঘণ্টার ১৩ ঘণ্টাই কাটাতে হয়েছে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না কেন আমাদেরকে ঢাকা থেকে বহিষ্কার করা হলো। হতে পারে যে কর্তৃপক্ষ আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিল। দু’একবার ফটোগ্রাফাররা ফটো তোলার জন্য জানালার বাইরে ক্যামেরা তাক করতে গেলেই সৈনিকরা গুলি করার হুমকি দিয়েছে। কিন্তু পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবিদার সেনাবাহিনীর আমাদেরকে নিয়ে এতো ভয় পাওয়া উচিত ছিল না। আবার মনে হয় তাদের এই সতর্কতার কারণ হলো তারা পূর্ব পাকিস্তানে আজ যা ঘটছে সে সম্পর্কে বিশ্বাবাসীকে জানতে দিতে চায় না।

রাত ৮:১৫টায় আমাদেরকে আর্মি ট্রাকে করে এয়ারপোর্টে নিয়ে যাওয়া হলো। বেশ কিছু অ-বাঙালি পরিবারের সাথে ভোর চারটে পর্যন্ত আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হলো। অ-বাঙালি পরিবারগুলোকে আমাদের চেয়েও বেশি ভীত সন্ত্রস্থ দেখা গেল। তারা তাদের দেশেরই একটা অংশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। শুধুমাত্র বাঙালি না হওয়ার কারণেই এখানে তাদের জীবন নিরাপদ নয় বলে তারা মনে করছে। রাত ১টা থেকে বিমানবন্দর পানিশুন্য। একজন সুইপার তার নিজের পকেটের পয়সায় আমাদেরকে দু’টো করে বিস্কুট খেতে দিল। আর্টিলারির একজন ক্যাপ্টেন আমাদের প্রত্যেকের কাগজ-পত্র আধাঘণ্টা ধরে পরীক্ষা করল। আমার কাছ থেকে দিনের ঘটনাবলি লেখা একটা নোটবুক, একটা ফর্ম এবং বাংলার পুঁজি বিকাশের উপর একটি লেখা বাজেয়াপ্ত করা হলো।

ছয় ঘণ্টা বিমান ভ্রমণের পর সকাল ১১:৩০টায় আমরা করাচি পৌঁছালাম। কলম্বোয় যাত্রাবিরতিকালে আমাদের ছয়জন বিমান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করলো। করাচি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরই আমাদেরকে কাস্টমস্ পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হলো। ৩টা নাগাদ যখন ছাড়া পেয়ে বেরোলাম তখন আমার পকেট থেকে এবং আমার লাগেজের বিভিন্ন জায়গায় যে নোটগুলো ছিল সব বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। এমনকি পাকিস্তানের নাম উল্লেখ আছে এমন সব পেপারই হারাতে হয়েছে। ভারতের সেনাবাহিনীর আকার সম্পর্কে একটা ভাষ্য দীর্ঘক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পেরেছিলাম। যখন কাস্টমস অফিসার সেই কাগজটি পেল তখন আনন্দে চিৎকার করে উঠে বলল, “এযে দেখছি মেশিনগান তাক করে আছ!!” আমার সব সহকর্মীর ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটলো। এমনকি একজনের স্ত্রীকে বিবস্ত্র হয়ে দেখাতে হলো সে কোনো ডকুমেন্ট লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না। ফ্রান্স টেলিভিশনকে কলম্বিয়া থেকে আনা ৮০০০ ডলারের অব্যবহৃত ফিল্ম হারাতে হলো। এবিসি টেলিভিশনের ক্ষতি হলো ২০০০ ডলার।

দ্য গার্ডিয়ান
২৬ মার্চ, ১৯৭১

মুক্তযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ৩
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29504207 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29504207 2011-12-16 20:41:34
বাঙালিরা যেকোনো উপায়ে স্বাধীনতা অর্জনে প্রস্তুত ঢাকায় ছাত্ররা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, আর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে গ্রামবাসীরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধে প্রস্তুত হচ্ছে
পল মার্টিন
অনুবাদ: আ-আল মামুন

সম্প্রতি ঢাকা থেকে আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে র‌্যাডিকাল ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের অনেক গ্রামে গণবাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাদের কাজ হবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করা। ইতোমধ্যে গত সপ্তাহে ল্যাবরেটরিগুলো থেকে কেমিক্যাল চুরি করে পেট্রল বোমা এবং অন্যান্য হাতবোমা তৈরি করা হয়েছে। বাঙালিদের সাথে যেকোনো বিষয়ে আলোচনাই শেষ পর্যন্ত ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ বিষয়ে গড়ায়। ছাত্ররা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফুর্থ গণঅভ্যুত্থান নিয়ে কথা বলছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা বস্তুত পশ্চিম পাকিস্তানী। এদেরকে তারা দখলদার বাহিনী মনে করে। এমনকি নিরীহ প্রকৃতির মানুষগুলোও স্বাধীনতার চিন্তায় প্রবলভাবে আলোড়িত হয়েছে, তাদের বক্তব্য: যদি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা না আসে তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হবে।

পাকিস্তানের গণআন্দোলন প্রতিবাদী ধর্মঘট থেকে রাতারাতি পূর্ণ বিকশিত ও সুনিয়ন্ত্রীত গণ-অসোহযোগ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে, যার একমাত্র দাবি- পূর্ণ স্বাধীনতা। অবশ্য গত তিন সপ্তাহ ধরে পূর্ব পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ (বাংলা রাষ্ট্র) এক ধরনের স্বাধীনতাই ভোগ করেছে। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান উপদেষ্টাদের নিয়ে ঢাকার মধ্যবিত্ত এলাকায় তার ছোট ছিমছাম বাড়িটি থেকে প্রদেশটির প্রশাসনিক কার্যক্রম একপ্রকার নিজেই পরিচালনা করছেন।

বিচার বিভাগ পূর্ণ সমর্থন প্রদান করেছে, শেখ মুজিবের নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি অফিসগুলো বন্ধ রয়েছে, জরুরি সেবাখাতগুলো তার নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে, ব্যাংকগুলো বিশেষ সময়সীমায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কাজ চালাচ্ছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আলোচনার জন্য ঢাকার উদ্দেশ্যে প্লেনে উঠবার পূর্বে শেখ মুজিবর রহমানের কাছে থেকে আশ্বস্ত হবার প্রয়োজন বোধ করেছেন যে তার অবস্থানকালে ঢাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। যদিও শেখ মুজিব জনসম্মুখে এবং ব্যক্তিক পর্যায়ে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি সতর্কভাবে এড়িয়ে গিয়ে ‘বাংলার মুক্তি’ প্রত্যয়টি ব্যবহার করছেন, তবু সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, গত সপ্তাহের ঘটনাবলী প্রদেশটিকে সুনিশ্চিতভাবেই স্বাধীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যদি শেখ মুজিবের আন্দোলনের লক্ষ্য হয় দুই শাখার মধ্যে অসমতা দূর করা, তবু শেষ পর্যন্ত এর ফলাফল দাঁড়াবে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।

একজন বাঙালি নেতা আমাকে জানালেন, “পাকিস্তান রাষ্ট্রসীমার মধ্যে থেকেই আমাদের প্রাপ্য আদায়ের একটা ফর্মূলা ছিল ছয় দফা কর্মসূচি।” কিন্তু গত তিন সপ্তাহ ধরে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান পরস্পরের সান্নিধ্য কীভাবে পরিহার করা যায় সেই সঙ্কটেরই সম্মুখীন হয়েছে। বাঙালিদের এ বিষয়ক চিন্তাভাবনা বুঝতে হলে কিছু অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র অনুধাবন করা প্রয়োজন। যেমন, পূর্ব পাকিস্তানের পাট রপ্তানির মাধ্যমে দেশের পঞ্চাশ ভাগ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলেও গত বিশ বছরের হিসাবে দেখা যায়, পাঁচ ভাগের চার ভাগ সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যয় হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে জনসংখ্যায় কম হলেও সিভিল সার্জেন্টদের ৮৫ শতাংশ এবং সেনা অফিসারদের ৯০ শতাংশ পশ্চিম পাকিস্তানী।

দুই অঞ্চলের মধ্যে অসমতা এমনকি সাদা দৃষ্টিতেও চিহ্নিত করা যায়। পশ্চিম পাকিস্তানের নগরীগুলোতে পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে সুদৃঢ় অবকাঠামো এবং নতুন নতুন সুদৃশ্য ভবন, অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার গা থেকে প্রাদেশিক শহরের গন্ধটুকুও মোছা যায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে দারিদ্র খুবই প্রকটভাবে দৃশ্যমান, বস্তি সমস্যা যেন চিরকালীন এবং শিক্ষার সুযোগ পাওয়াদের সংখ্যা খুবই নগন্য। অন্যদিকে, শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বানিজ্যের সম্প্রসারণের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানীদের জীবন অনেক বেশি নিরাপদ। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদরা দাবি করেন যে পাকিস্তান সৃষ্টির সময় দুই অঞ্চলে পণ্য উৎপাদন একই স্তারে থাকলেও বর্তমানে পশ্চিম পাকিস্তান ৬০ শতাংশ বেশি এগিয়ে রয়েছে। তারা এই বৈষম্যের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করেন। তাদের অভিযোগ, বৈষম্য বেড়েছে পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানী থেকে প্রাপ্ত বৈদেশিক মূদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যবহার এবং পূর্ব পাকিস্তানী ব্যবসায়ীদের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানী ব্যবসায়ীদের উদারভাবে ব্যাংক ঋণ দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। অবশ্য বৈষম্য কিছুটা কমিয়ে আনার একটা প্রচেষ্টাও দেখা যায়। সাম্প্রতিক ১৯৭০-৭৫ পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যায়ের ৫৩ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও, এর আগের দুটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাজেটের ৩০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হতো।

যারা পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের পক্ষে তাদের অভিমত হলো যে, স্বাধীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে। স্বাধীন দেশের সূচনালগ্নে তারা পাট রপ্তানী থেকে প্রাপ্ত অর্থ পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে পারবে। পাট শিল্প যে বর্তমানে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি- এধরনের ভাবনাকে তারা একেবারেই গুরুত্ব দিচ্ছে না। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান জনসংখ্যা ৭৩ মিলিয়ন যা আগামী ২৪ বছরে দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা। ২০০০ সাল নাগাদ পূর্ব পাকিস্তানে জনসংখ্যার ঘনত্ব হবে একর প্রতি ১১.৫ জন। তদুপরি, জন্মনিয়ন্ত্রণের হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম। যাহোক, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সাথে ছয় দফা দাবির ভিত্তিতে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন এবং অর্থনীতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার শর্তে শেখ মুজিব যদি সমঝোতায় পৌঁছায়ও তবু গত তিন সপ্তাহ ধরে জনগণ স্বাধীনতার যে দাবি উঠিয়েছে নিশ্চিতভাবেই তা তৃপ্ত হবে না।

দ্যা টাইমস
২৫ মার্চ ১৯৭১

মুক্তযুদ্ধের প্রতিবেদন ১
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ২
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29503479 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29503479 2011-12-15 18:33:44
বাংলার দামাল ছেলেরা - মার্টিন এডিনি
প্রায় পঞ্চাশটা গ্রাম। ধানক্ষেতগুলোর মধ্যে মাটির ভিটে করে তৈরি। বাড়িগুলোর খড়ের বেড়া আমগাছ ও কলাবাগানে ঢেঁকে আছে। ঢাকা থেকে ২০ মাইল দূরে আমিনপুর ইউনিয়ন যেতে হয় ফেরিতে পদ্মা পার হয়ে। আমরা যখন পৌঁছালাম তখন আওয়ামী লীগ ইউনিয়ন কমিটির সদস্যরা চায়ের দোকানে কাঠের বেঞ্চে বসে ছিল। দোকানের দেয়ালে সংবাদপত্র ও ‘দেশ বিদেশের গল্প’র প্রুফ সাঁটা ছিল। সারা প্রদেশে প্রতিষ্ঠিত সংগ্রাম পরিষদের মতো তাদেরটাও একটি সংগ্রাম পরিষদ। পূর্ব বাংলাকে তারা স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে ধরেই নিয়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছে। ৫৮টি গ্রামে তাদের তিনশত সক্রিয় কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে ১০০ জনকে নিয়ে সংগ্রাম পরিষদ (action committee) গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। ইতোমধ্যে একজন গ্রামবাসী তাদের প্রশিক্ষণও দিয়েছে। তিনি ভারতের রয়াল আর্মির ল্যান্স কর্পোরাল ছিলেন বলে দাবি করেন। অত্যন্ত সাহসের সাথেই তারা জানালো, তাদের কাছে শুধুই দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র যেমন লাঠি, রামদা ও তীর-ধনুক আছে। তবু তারা আত্মবিশ্বাসী যে শত্রুদের অস্ত্রসস্ত্র কেড়ে নিতে পারবে। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, সেনাবাহিনী সরাসরি আক্রমণ করলে আপনারা কী করবেন? প্রথমেই তারা নৌ পারাপার বন্ধ করে দেবে বলে জানালো। তারা সড়কপথ বন্ধ করে দেবে এবং এ্যামবুশ করবে। ভূমি থেকে উঁচু সংকীর্ণ মহাসড়কগুলোতে শত্রু পরিবহন এ্যামবুশ করা খুব সহজ।

‘মুক্ত’
অনুমান করা যায়, সেনাবাহিনী অগ্রসর হতে শুরু করলে বাংলার পুরাতন রাজধানী সংলগ্ন এই আমিনপুরে অভিযান চালাবে এবং ধ্বংস্তুপে পরিণত করবে। এখানে আমরা যে আলাপচারিতা শুনলাম তা ঢাকায়ও চলছে। তবে নিজেদের আলাপচারিতা সমর্থন করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এরা দেখতে পারছে না। যে বন্ধু আমাদেরকে আমিনপুরে নিয়ে গিয়েছিল সে বলল, ‘সেনাবাহিনী যদি দমননীতি গ্রহণ করে তাহলে সে নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে গ্রামটিকে ‘মুক্ত এলাকা’ ঘোষণা করবে।

জনশুণ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কংক্রিট বক্সের একটি দেয়ালে .২২ বোরের দুর্বল রাইফেল সাজিয়ে রেখেছে ছাত্র নেতারা। তাদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতোমধ্যে এসে গেছে। ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট নুরে আলম সিদ্দীকি জানালো, ইয়াহিয়া যদি আসে তাহলে সে আসবে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে। “পাকিস্তান নিয়ে আমাদের আর কোনো মোহ নেই। আমরা পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে দিয়েছি। আপনি কি এখানে একটাও পাকিস্তানী পতাকা দেখেছেন?” ছাত্ররা স্বল্পতম সময়ের নোটিশে ব্যাপক সংখ্যক বিক্ষোভকারী সংগ্রহ করতে পারে। তারা অন্যতম সংঘবদ্ধ শক্তি। তারা শেখ মুজিবকে সমঝোতার পরিবর্তে অন্যকিছু করতে চাপ দিচ্ছে। ছাত্ররাই পেছনে থেকে শেখ মুজিবকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে দিয়েছে, যদিও তিনি স্পষ্ট করে স্বাধীনতার কথা বলছেন না। শেখ মুজিবকে তারা সকল সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা প্রদান করেছে এবং দু’একজন বাদে সকলেই তার যেকোনো নির্দেশ পালন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সকলে একস্বরে কথা বলছে, সে কণ্ঠস্বর শেখ মুজিবের। গ্রামের চায়ের দোকানের লোকজন আর চেম্বার অব কমার্স অফিসের ব্যক্তিদের কথার মধ্যে কোনো ফারাক নেই। এখানকার ছাত্রদের স্বাধীনতা চাওয়ার পেছনে বিশেষ স্বার্থ আছে। তারা অভিযোগ করে যে তাদের সাত কোটি জনগণের চাকরির সুযোগ একেবারেই শূন্য। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে তারা হয়ত পোস্ট অফিসের কেরানী বা শিক্ষকতার চাকরী পেতে পারে। সরকারি এবং অন্য সকল ভালো চাকরী পশ্চিম পাকিস্তানীদের জন্য সংরক্ষিত। মাসে ২০ পাউন্ড পাওয়া যায় এমন একটা চাকরী জোটাতেও তাদের অত্যন্ত বেগ পেতে হয়।

কর্মসূচি

তাদের কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়তবা বাইবেলে বর্ণিত ইহুদিদের ‘প্রমিজড ল্যান্ড’ এর মতোই কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু সে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এখনও অনেক পথ পড়ি দিতে হবে। ছাত্রদের মধ্যে একক জাতীয় চেতনা থাকলেও তারা আদর্শগতভাবে একেবারে ভিত্তিহীন। তারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কিংবা পূর্ব বাংলার পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজতন্ত্রে কথা বলে। কিন্তু আপনি যখন তাদের বলবেন যে এই উপমাহাদেশে সমাজতন্ত্র এমন একটি অমনিবাস শব্দে পরিণত হয়েছে যে তা দ্বারা সবকিছুই বুঝানো সম্ভব। তখন তারা পাট এবং অন্যান্য ভারী শিল্পগুলো জাতীয়করণের কথা বলবে যা সংখ্যায় একেবারেই নগণ্য। সমাজতন্ত্র বলতে তারা এসব শিল্প জাতীয়করণের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেবে। বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাকে এশিয়ান কমিউনিজমের ককপিট হিসেবে বিদেশি প্রভাবগুলোর কাছে কাঙ্ক্ষিত করে তুলেছে। তারপরও পূর্ব বাংলার পথ নির্ধারণ হওয়া এখনও বাকি রয়ে গেছে। একজন ছাত্রনেতা বললেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘সকলের সাথে বন্ধত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’। তার সহযোগীরা আবার বললেন, সকল বিদেশি প্রভাবকে উৎখাত করা হবে এবং প্রতিটি স্বাধীনতা আন্দোলনকেই সমর্থন করা হবে। এই আন্দোলনকে তারা স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং মনে করে যে বিশ্ববাসী এই সংগ্রামকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছে না। কী ঘটতে পারে সে ব্যাপারে তারা খুব বেশি ভাবছে না এবং সেনাবাহিনীকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে দিচ্ছে বলে মনে হয়। ছাত্র, গ্রামবাসী এবং যারা ঢাকা ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে গেছে তারা ইতোমধ্যে অনুমান করতে শুরু করেছে যে তাদের সাহসী বক্তব্যগুলো হয়ত অচিরেই পরীক্ষিত হবে।

দ্য গর্ডিয়ান ২৩ মার্চ, ১৯৭১


মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১ - মার্টিন এডিনি
প্রায় পঞ্চাশটা গ্রাম। ধানক্ষেতগুলোর মধ্যে মাটির ভিটে করে তৈরি। বাড়িগুলোর খড়ের বেড়া আমগাছ ও কলাবাগানে ঢেঁকে আছে। ঢাকা থেকে ২০ মাইল দূরে আমিনপুর ইউনিয়ন যেতে হয় ফেরিতে পদ্মা পার হয়ে। আমরা যখন পৌঁছালাম তখন আওয়ামী লীগ ইউনিয়ন কমিটির সদস্যরা চায়ের দোকানে কাঠের বেঞ্চে বসে ছিল। দোকানের দেয়ালে সংবাদপত্র ও ‘দেশ বিদেশের গল্প’র প্রুফ সাঁটা ছিল। সারা প্রদেশে প্রতিষ্ঠিত সংগ্রাম পরিষদের মতো তাদেরটাও একটি সংগ্রাম পরিষদ। পূর্ব বাংলাকে তারা স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে ধরেই নিয়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছে। ৫৮টি গ্রামে তাদের তিনশত সক্রিয় কর্মী রয়েছে। এর মধ্যে ১০০ জনকে নিয়ে সংগ্রাম পরিষদ (action committee) গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করা যায়। ইতোমধ্যে একজন গ্রামবাসী তাদের প্রশিক্ষণও দিয়েছে। তিনি ভারতের রয়াল আর্মির ল্যান্স কর্পোরাল ছিলেন বলে দাবি করেন। অত্যন্ত সাহসের সাথেই তারা জানালো, তাদের কাছে শুধুই দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র যেমন লাঠি, রামদা ও তীর-ধনুক আছে। তবু তারা আত্মবিশ্বাসী যে শত্রুদের অস্ত্রসস্ত্র কেড়ে নিতে পারবে। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম, সেনাবাহিনী সরাসরি আক্রমণ করলে আপনারা কী করবেন? প্রথমেই তারা নৌ পারাপার বন্ধ করে দেবে বলে জানালো। তারা সড়কপথ বন্ধ করে দেবে এবং এ্যামবুশ করবে। ভূমি থেকে উঁচু সংকীর্ণ মহাসড়কগুলোতে শত্রু পরিবহন এ্যামবুশ করা খুব সহজ।

‘মুক্ত’
অনুমান করা যায়, সেনাবাহিনী অগ্রসর হতে শুরু করলে বাংলার পুরাতন রাজধানী সংলগ্ন এই আমিনপুরে অভিযান চালাবে এবং ধ্বংস্তুপে পরিণত করবে। এখানে আমরা যে আলাপচারিতা শুনলাম তা ঢাকায়ও চলছে। তবে নিজেদের আলাপচারিতা সমর্থন করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এরা দেখতে পারছে না। যে বন্ধু আমাদেরকে আমিনপুরে নিয়ে গিয়েছিল সে বলল, ‘সেনাবাহিনী যদি দমননীতি গ্রহণ করে তাহলে সে নিজ গ্রামে ফিরে গিয়ে গ্রামটিকে ‘মুক্ত এলাকা’ ঘোষণা করবে।

জনশুণ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কংক্রিট বক্সের একটি দেয়ালে .২২ বোরের দুর্বল রাইফেল সাজিয়ে রেখেছে ছাত্র নেতারা। তাদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ইতোমধ্যে এসে গেছে। ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট নুরে আলম সিদ্দীকি জানালো, ইয়াহিয়া যদি আসে তাহলে সে আসবে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে। “পাকিস্তান নিয়ে আমাদের আর কোনো মোহ নেই। আমরা পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে দিয়েছি। আপনি কি এখানে একটাও পাকিস্তানী পতাকা দেখেছেন?” ছাত্ররা স্বল্পতম সময়ের নোটিশে ব্যাপক সংখ্যক বিক্ষোভকারী সংগ্রহ করতে পারে। তারা অন্যতম সংঘবদ্ধ শক্তি। তারা শেখ মুজিবকে সমঝোতার পরিবর্তে অন্যকিছু করতে চাপ দিচ্ছে। ছাত্ররাই পেছনে থেকে শেখ মুজিবকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে দিয়েছে, যদিও তিনি স্পষ্ট করে স্বাধীনতার কথা বলছেন না। শেখ মুজিবকে তারা সকল সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা প্রদান করেছে এবং দু’একজন বাদে সকলেই তার যেকোনো নির্দেশ পালন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো সকলে একস্বরে কথা বলছে, সে কণ্ঠস্বর শেখ মুজিবের। গ্রামের চায়ের দোকানের লোকজন আর চেম্বার অব কমার্স অফিসের ব্যক্তিদের কথার মধ্যে কোনো ফারাক নেই। এখানকার ছাত্রদের স্বাধীনতা চাওয়ার পেছনে বিশেষ স্বার্থ আছে। তারা অভিযোগ করে যে তাদের সাত কোটি জনগণের চাকরির সুযোগ একেবারেই শূন্য। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে তারা হয়ত পোস্ট অফিসের কেরানী বা শিক্ষকতার চাকরী পেতে পারে। সরকারি এবং অন্য সকল ভালো চাকরী পশ্চিম পাকিস্তানীদের জন্য সংরক্ষিত। মাসে ২০ পাউন্ড পাওয়া যায় এমন একটা চাকরী জোটাতেও তাদের অত্যন্ত বেগ পেতে হয়।

কর্মসূচি

তাদের কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়তবা বাইবেলে বর্ণিত ইহুদিদের ‘প্রমিজড ল্যান্ড’ এর মতোই কাঙ্ক্ষিত, কিন্তু সে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এখনও অনেক পথ পড়ি দিতে হবে। ছাত্রদের মধ্যে একক জাতীয় চেতনা থাকলেও তারা আদর্শগতভাবে একেবারে ভিত্তিহীন। তারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কিংবা পূর্ব বাংলার পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজতন্ত্রে কথা বলে। কিন্তু আপনি যখন তাদের বলবেন যে এই উপমাহাদেশে সমাজতন্ত্র এমন একটি অমনিবাস শব্দে পরিণত হয়েছে যে তা দ্বারা সবকিছুই বুঝানো সম্ভব। তখন তারা পাট এবং অন্যান্য ভারী শিল্পগুলো জাতীয়করণের কথা বলবে যা সংখ্যায় একেবারেই নগণ্য। সমাজতন্ত্র বলতে তারা এসব শিল্প জাতীয়করণের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেবে। বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাকে এশিয়ান কমিউনিজমের ককপিট হিসেবে বিদেশি প্রভাবগুলোর কাছে কাঙ্ক্ষিত করে তুলেছে। তারপরও পূর্ব বাংলার পথ নির্ধারণ হওয়া এখনও বাকি রয়ে গেছে। একজন ছাত্রনেতা বললেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘সকলের সাথে বন্ধত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’। তার সহযোগীরা আবার বললেন, সকল বিদেশি প্রভাবকে উৎখাত করা হবে এবং প্রতিটি স্বাধীনতা আন্দোলনকেই সমর্থন করা হবে। এই আন্দোলনকে তারা স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং মনে করে যে বিশ্ববাসী এই সংগ্রামকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিচ্ছে না। কী ঘটতে পারে সে ব্যাপারে তারা খুব বেশি ভাবছে না এবং সেনাবাহিনীকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে দিচ্ছে বলে মনে হয়। ছাত্র, গ্রামবাসী এবং যারা ঢাকা ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে গেছে তারা ইতোমধ্যে অনুমান করতে শুরু করেছে যে তাদের সাহসী বক্তব্যগুলো হয়ত অচিরেই পরীক্ষিত হবে।

দ্য গর্ডিয়ান ২৩ মার্চ, ১৯৭১


মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন ১ ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29502817 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29502817 2011-12-14 17:23:31
মুক্তিযুদ্ধের প্রতিবেদন যাহোক, এই গ্রন্থটিতে অক্টোবর ১৯৬৯ সাল থেকে ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালের মধে প্রকাশিত প্রায় সাড়ে তিনশত রিপোর্ট, সম্পাদকীয় নিবন্ধ, কলাম ইত্যাদি কালানুক্রমে গ্রন্থিত করা হয়েছে। ফলে সে সময়ে প্রতিদিনের, প্রতি সপ্তাহের ঘটনাবলী সবরকম খুঁটিনাটিসহ চোখের সামনে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে- যা পাঠককে নিজে থেকেই মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটা সিদ্ধান্তে আসবার সুযোগ পান। আর, যে যুদ্ধ আমরা বর্তমান প্রজন্ম দেখিনি সেই যুদ্ধের প্রাত্যহিক অস্থিরতা, আবেগ, রক্ত, মৃত্যু ও চেতনার সাথে একধরনের ছদ্ম-আংশগ্রহণও আমাদের ঘটে যায়।
সংকলনগ্রন্থটি প্রকাশিত হবার পরে, এটি পাঠ করে আমি এতোটাই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম যে একদিন আমার শিক্ষক প্রফেসর গোলাম রহমানকে প্রস্তাব করেছিলাম এর একটা বাংলা ভাষ্য প্রকাশ করার। তিনি এবং প্রফেসর এলাহী রাজী হয়েছিলেন। এই সংকলনটি তিন ভাগে ভাগ করে একটা ভাগ অনুবাদ করে দিতে সম্মত হয়েছিলাম আমি এবং করে দিয়েছিলাম সেই ২০০১ সালের দিকে। কিন্তু তার পরে এক দশক পার হয়ে গেলেও সংকলনগ্রন্থটির বাংলা ভাষ্য আলোর মুখ দেখেনি। তাই, স্যারের সাথে আলাপ করে আমার অনূদিত অংশটুকু ব্লগে প্রাথমিকভাবে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছি যার ভিতরে রয়েছে ২২ মার্চ – ২০ মে ১৯৭১ এবং ৫ সেপ্টেম্বর – ১ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদন, কলাম ও সম্পাদকীয়। এগুলো প্রতিদিন একটা করে পোস্ট দেয়ার ইচ্ছে আছে আমার, অন্তত এটা নিশ্চত করে বলতে পারি, ক্রমান্বয়ে আমার অনূদিত অংশটুকু পাঠকের সামনে তুলে ধরবো।
আজ ১৪ই ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে এগুলো প্রকাশ করতে শুরু করছি বিশেষভাবে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের জন্য তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে।
গত ৯ ডিসেম্বর আমার ভাই মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন হঠাৎ মাঝরাতে স্ট্রোক করে মারা গেলেন। যুদ্ধ শেষে তিনি পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। সারাজীবন আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেশের সেবা করে গেলেন তিনি। মৃত্যুর পরেই তিনি অস্ত্র সমর্পণ করলেন। মৃত ভায়ের গর্বিত মুখের দিকে যুদ্ধ-পরবর্তী আমি তাকিয়ে থাকি আর ভাবি সেই দিনগুলোর কথা: ত্রিপুরায় প্রশিক্ষণ শেষে জুলাই মাসে তিনি দেশে ফিরেছিলেন, কুষ্টিয়ার কুমারখালী অঞ্চলে সক্রিয় ছিলেন। একটা এল.এম.জি ছিল তাঁর সঙ্গী। ১৬ই ডিসেম্বরের পর তিনি বাড়ি ফেরেন। আনন্দে আমাদের ঘরের টিনের চালে একটা গুলি ছুঁড়েছিলেন। ছোটবেলায় সেই গুলিসৃষ্ট গর্ত আমাকে যুদ্ধদিনের কল্পনারাজ্যে নিয়ে যেত, যখন বারান্দায় শুয়ে শুয়ে সেদিকে তাকিয়ে ভাবতাম সেই দিনগুলোর কথা। এই অনুবাদ প্রকাশনা তাঁকেই উৎসর্গ করলাম।
...

রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া পুনরায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেছেন
পিটার হেজেলহার্স্ট

করাচি, মার্চ ২২: দীর্ঘ প্রতিক্ষিত জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন আজ আবার হঠাৎ স্থগিত করা হয়েছে। স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং ঢাকায় গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানকারী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জাতীয় পরিষদ সংকটের কোনো সমাধান বের করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ঘটনা দেশটিকে বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গত বছর নির্বাচনের পর এই প্রথমবারের মতো পূর্ববাংলার নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং পশ্চিম পাকিস্তানী নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আলোচনার টেবিলে আনার কিছুক্ষণ পরই একজন সরকারি মুখপাত্র জাতীয় পরিষদ অধিবেশন বাতিলের ঘোষণা দেন।
ঘণ্টাব্যাপী তৃপক্ষীয় আলোচনার টেবিল থেকে পাকিস্তনের দুই শাখার নেতৃদ্বয় বের হয়ে আসার কিছুক্ষণ পরই প্রেসিডেন্টের বাসভবনে একজন মুখপাত্র ঘোষণা করেন, “দুই শাখার নেতৃদ্বয়ের সাথে আলোচনার মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার সীমা আরও বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে” প্রেসিডেন্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেছেন। অনুমান করা হচ্ছে, এ সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসবে; এবং প্রেসিডেন্ট ও সকল রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এমন একটা ফর্মুলা বের করতে পারবেন যার সাহায্যে গণভোটে নির্বাচিত নেতাদের নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক কোয়ালিশন সরকার গড়ে তোলা যাবে।
আজ সকালে শেখ মুজিব আরেক দফা আলোচনার জন্য যখন প্রেসিডেন্টের বাসভবনের দিকে যাচ্ছিলেন তখন হাজার হাজার বাঙালি তাদের নেতাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে উৎসাহ জোগায়। অন্যদিকে, পশ্চিম পাকিসত্মানী নেতা ভুট্টো যখন ব্যাপক সামরিক প্রহরায় প্রেসিডেন্টের বাসভবনে যাচ্ছিলেন তখন ঢাকায় তার রাস্তার পাশে দাঁড়ানো জনতা কালো ব্যাচ ধারণ করে ছিল এবং ভুট্টো-বিরোধী শ্লোগান দিচ্ছিল। সকালে আলোচনা থেকে ফিরে শেখ মুজিব সাংবাদিকদের সাথে মিলিত হয়েছেন। তিনি প্রেসিডেন্টের অধিবেশন স্থগিতাদেশের প্রেক্ষিতে ভবিষ্যত সাংবিধানিক আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে সামরিক শাসন উঠিয়ে নেয়ার দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “আমি সুস্পষ্টভাবে বলেছি যে আমাদের চারটি দাবি না মানা পর্যন্ত আমি অধিবেশনে বসবো না।” কিছুটা আশার বানী শুনিয়ে শেখ সাহেব বলেন, ‘যদি কোনো অগ্রগতিই না হবে তাহলে আমি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি কেন? সপ্তম দফা আলোচনার জন্য তিনি আগামী কাল অথবা আগামী বুধবার আবার প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করবেন।
ব্যাপক নৈরাশ্য ও অনিশ্চয়তার পরিবেশে পাকিস্তান আগামীকাল ১৫তম প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করতে যাচ্ছে। যেকারো পক্ষেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্ব চিহ্নিত করতে পারা সম্ভব। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিরা লাহোর রেজুল্যুশনের ৩১তম বাষির্কী পালনের পরিকল্পনা করছে। এই রেজুল্যুশনে স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নিয়ে ফেডারেল পাকিস্তান গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানীরা প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করছে, যা দেশটিকে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের আওতায় নিয়ে এসেছে।
এই প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে ৭ কোটি বাঙালির উদ্দেশ্যে এক বার্তায় শেখ মুজিব সুনির্দিষ্টভাবে লাহোর রেজুল্যুশনের কথা উলেস্নখ করে তার সমর্থকদের বলেছেন, “মুক্তির সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।” আমাদের উদ্দেশ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, সুতরাং বিজয় আমাদের পক্ষেই। তিনি বলেন, “আমাদের জনগণকে আর রাইফেল, গুলি, বেয়নেট দিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে না। বাংলাদেশের প্রতিটি বাড়িকে এক একটা শক্তিশালী দূর্গে পরিণত করা হবে।”
একই সময়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশ্যে তার বার্ষিক ভাষণ সম্প্রচার করেন। তিনি বলেন, “কোনো সন্দেহ নেই যে বর্তমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে আমরা সফল হব। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের যন্ত্রণাময় যাত্রাপথে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় উদ্ভুত হয়েছে। কিছুই হারায় না, যদি আমরা আমাদের নিয়তিতে আস্থা না হারায়।” প্রেসিডেন্ট সকল প্রদেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এখন ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এই নেতৃবৃন্দ এমন একটি ফর্মূলা বের করবে যার আওতায় দুই শাখার বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা শেখ মুজিব তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করবেন।
আওয়ামী লীগের একজন সংবিধান বিষয়ক উপদেষ্টা বিখ্যাত আইনজীবী এম. এ. ব্রোহী আজ করাচি এসে পৌঁচেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের তিন দফা ফর্মূলা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
ঢাকা, মার্চ ২২: শেখ মুজিবের মারমুখী সমর্থকদের কাছে আগামীকাল প্রজাতন্ত্রের ১৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী প্রতিরোধ দিবস হিসেবে গণ্য হবে। ঢাকাতে তারা প্রতিটি বাড়িতে নতুন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানাচ্ছে। ভুট্টোর প্রতি তাদের তীব্র ঘৃণার প্রকাশ গতরাতে দেখা গেছে। ভূট্টো তার হোটেলের একটা লিফটে আটকে গেলে ক্রুদ্ধ জনতা ছুটে আসে। তাদের প্লাকার্ডে লেখা ছিল ‘ভুট্টো রাজনৈতিক জারজ’। অটোমেটিক রাইফেল হাতে সেনাবাহিনী রাজধানীর পথে পথে হাঁটছে।
দ্য টাইমস
২৩ মার্চ, ১৯৭১
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29502438 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29502438 2011-12-14 02:03:38
বেশরা ফকির লালন সাঁইকে নিয়ে ভদ্দরলোকদের সূক্ষ্ম প্রেমের মর্ম বোঝা ভার!! http://arts.bdnews24.com/?p=4041|'মনের মানুষ' চলচ্চিত্র নিয়ে আমার একটা লেখার লিংক ] ]]> http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29470734 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29470734 2011-10-22 19:41:42 আজ বসন্ত- স্মরণ করছি আমার দেশের বেশিরভাগ মানুষের বাঙালিত্বকে
এখানে কোলকাতায় আজ শিবরাত্রি পালন হচ্ছে। এখানে 'স্বার্বজনীনত্ব' আর 'হিন্দুত্ব' একাকার। উৎসবগুলোতে কোনা-না-কোনোভাবে হিন্দুত্বের ধর্মীয় আচার-প্রথা যুক্ত থাকে। সবচে উদ্ভট হলো দুর্গোৎসবের 'স্বার্বজনীনত্ব' ও 'সেকুলারিটি' ধারণা। আজ বসন্ত বরণ করে নিতে কোথাও দেখলাম না, বসন্তের পোশাকে কাউকে দেখলাম না।

এখানে বাঙালিত্ব শুধু ধার্মিক-রোমানিটক স্মৃতিচারণার পর্যবসিত- এখানে ধর্মও সেকুলার নাকি!! কিন্তু তাদের হিন্দুত্ব আর বাঙালিত্বের গতায়ত আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে- এখানকার পপুলার এমনকি কখনোবা ক্রিটিকাল ডিসকোর্সেও আমি 'মুসলমান', আমার বাঙালীত্ব প্রশ্নসাপেক্ষ। তাদের জবানে আমি পরিচয় ধারণ করি বহিরাগত 'মুসলমান' ও সেইসাথে উপহাসদ্রব্য অসংস্কৃত 'বাঙাল'!! প্রতিদিন ধমীয় আচার পালন করে, এবং প্রতিদিন জাতপাত বিচার করেও, তাদের সেকুলারিত্ব বজায়ে রাখতে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু তাদের 'অপর' মুসলমান কখনোই সেকুলার নয়, সে ধর্মবিযুক্ত হলেও। আর মুসলমানের ধর্মীয় আচার পালন ও পোশাক উন্মত্ত মৌলবাদের প্রতীক- যা কেবলই দুষিত করে।

আজ শিবরাত্রি পালন হচ্ছে, বসন্ত বরণ করে নিতে কোথাও দেখলাম না। আর আমার দেশে বাঙলা ও বাঙালিত্বের কতো পার্বণ, কতো উৎসব। সেকুলারিটির চর্চায় আমার দেশের মানুষ অনেক বেশি পরিপক্ক- অনেক সেকুলার বাঙালিত্বের পরিসর আছে আমাদের। তবু এই 'হিন্দু'-ভারতীয় পণ্ডিত আর নীতিনির্ধারকেরা আমাদেরকে সেকুলারিটির শিক্ষা দেন সবসময়- যে সেকুলারিত্ব তারাই অর্জন করতে পারেন নাই, বস্তুত চর্চা করতেও চাননি কখনো!! তাই, তাদের 'হিন্দুত্ব' রাষ্ট্র ও সাংস্কৃতিক পরিসরে কখনোই সমস্যা হয়ে ওঠেনা, বরং সকল চিন্তা-চর্চায় পাটাতন হিসেবে কাজ করে। কিন্তু তাদের চেখে, রাষ্ট ও সাংস্কৃতিক চর্চায় আমাদের 'মুসলমানত্ব' সবসময় সমস্যাজনক- আমাদের বিপুল বাঙালিত্বের পরিসর থাকা সত্ত্বেও। তারা এক উদ্ভট সেকুলার লেন্স দিয়ে 'বাংলাদেশ' দেখেন, দেখতে চান।

তাদের হিন্দুত্বের পাটাতনে প্রতিষ্ঠিত বাঙালিত্ব আমাকে 'অপর' করে, আমাকে বহিরাগত মুসলমানত্বে সঙ্কুচিত করে। কিন্তু আমার দেশেই বিপুল সমারোহে বসন্তবরণ হয়, বৈশাখবরণ হয়, বাংলা-ভাষাকেন্দ্রিক প্রাণমাতানো উৎসব হয়। আর, এখানে শিবরাত্রি পালন হয়, তথাকথিত 'স্বার্বজনীন' দুর্গোৎসব হয়। বসন্তকে বরণ করে নিতে আজ কোথাও দেখলাম না।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29097896 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/29097896 2010-02-14 23:03:47
৪র্থ কিস্তি: মেরিল-প্রথম আলো চলচ্চিত্র ‘সমালোচক পুরস্কারের’ রাজনৈতিক অর্থনীতি এইবার সবগুলো কিস্তি একসাথে পড়বার অনুরোধ জানাই...

১ম কিস্তি: Click This Link
২য় কিস্তি: Click This Link
৩য় কিস্তি: Click This Link

অন্তটীকা:
১) ২০০৭ সালের এপ্রিলে পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলে ১৯শে এপ্রিল প্রথম আলোর ‘আনন্দ’ পাতায় ফলাও করে তা নানা ঢঙে প্রচার করা হয়। আমার নজর কাড়ে চলচ্চিত্র বর্গে সমালোচনা পুরস্কারের জন্য আয়না ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচনের বিষয়টি। চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ কিংবা বিকারপ্রাপ্তি কেবল চলচ্চিত্রের গুণমানের ওপরই নির্ভরশীল নয়- চলচ্চিত্রের সাথে অপরাপর গণমাধ্যমের আন্তসম্পর্ক, অন্যান্য গণমাধ্যম চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে কীভাবে বিচার করছে, পরিবেশন করছে তার ওপরও নির্ভর করে। ৫ই এপ্রিল ২০০৭ ‘আনন্দ’ থেকে জানতে পারি, ‘সমালোচকদের দৃষ্টিতে’ সেরা চলচ্চিত্রের প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিল তিনটি ছবি- অন্তর্যাত্রা, আয়না এবং নন্দিত নরকে। অবশেষে এই তিনটির মধ্যে ‘সমালোচকদের রায়ে’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জয়মাল্য ওঠে আয়নার গলায়। কোন মানদণ্ডে শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করা হলো তা মূল্যয়নের বাসনা সেসময়ে জাগলেও করতে পারিনি। ‘সুস্থ’ ধারার চলচ্চিত্র নিয়ে মিডিয়ায় গড়ে-ওঠা আন্দোলন, গবেষক-পণ্ডিত-‘সুশীল’ সমাজের সে আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং বাংলাদেশে জনপরিসর সঙ্কুচিতকরণ, সমালোচনাত্মক চিন্তারহিত ও ডিপোলিটিসাইজড ভোগবাদী সংস্কৃতি বিকাশের মধ্যে যে আন্তসম্পর্ক রয়েছে বলে অনুমান করি তা অনুসন্ধানেই এই লেখাটি নিবেদিত। এই অনুমিত আন্তসম্পর্ক প্রমাণের জন্য ইতোপূর্বে আমি দুটো ‘সুস্থ’ চলচ্চিত্রর - হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত চন্দ্রকথা ও মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ব্যাচেলর - টেক্সট বিশ্লেষণ করেছি। বর্তমান লেখাটি সেই ধারাবাহিকতায় তৃতীয় অনুসন্ধান।
২) গবেষণা-প্রবন্ধ লেখার একটা চলতি ছাঁচ আছে, যেখানে ধরেই নেয়া হয় যে লেখক তার বিশ্লেষণ ‘নির্মোহভাবে’ করবেন এবং ফলাফল ‘বস্তুনিষ্ঠভাবে’ ‘তুলে’ ধরবেন; বিশেষ এক ভাষাকাঠামোতে লিখবেন। ‘পজিটিভিস্টিক’ এসব ধারণা এখনও আমাদের দেশে প্রবল প্রতাপশালী। যদিও বাস্তবে ‘নির্মোহভাবে’ অনুসন্ধান চালানো বা ‘বস্তুনিষ্ঠভাবে’ বিশ্লেষণ ও ফলাফল পেশ কোনোটাই সম্ভব নয়। যেকোনো বিষয় অনুসন্ধানের বেলাতেই ব্যক্তি তার নিজস্ব মূল্যবোধ নিয়ে হাজির হয় - যে মূল্যবোধ সমাজ ও সংস্কৃতি নির্ধারিত। মূল্যবোধমুক্ত কোনো অনুসন্ধান, মূল্যায়ন বা পরিবেশনা আদৌ সম্ভব নয় - এমনকি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান অনুসন্ধানের বেলাতেও। তাই আজকাল সামাজিক বিজ্ঞানের তথাকথিত ‘বৈজ্ঞানিক’ অনুসন্ধান পদ্ধতি ও পরিবেশনা রীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, গুণগত-ব্যাখ্যামূলক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে, অনুসন্ধানে ও পরিবেশনায় ব্যক্তির উপস্থিতিকে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে। (দেখুন, এন্ড্রু স্যাইয়ার, মেথডস অব সোস্যাল সায়েন্স [রাউটলেজ: লন্ডন ও নিউইয়র্ক: ১৯৯২]; ডেভিড সিলভারম্যান সম্পা. কুয়ালিটেটিভ রিসার্স: থিওরি মেথড এন্ড প্রাকটিসেস [সেজ পাবলিকেশন্স: লন্ডন, থাইজেন্ট ওক, নয়া দিল্লি: ১৯৯৭]) আমি নির্মাণবাদী ধারায় বিশ্বাসী। কোনো কিছুই ‘এ্যজ-ইট-ইজ’ তুলে ধরা যায় না। আমরা অর্থ নির্মাণে অংশগ্রহণ করি। অনুসন্ধান ও তার ফলাফল পরিবেশনা একটা ব্যক্তিক অভিজ্ঞতা, পূর্ব অভিজ্ঞতার সম্প্রসারণও। তাই গবেষণা প্রবন্ধের প্রচলিত ‘বিশেষ ভাষাশৈলী’ আমি অনুসরণ করবো না। আমার সক্রিয় উপস্থিতি থাকবে।
৩) আমার বক্তব্য হলো, পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক, যেমন সুস্থতা নির্ধারণের তৎপরতাও রাজনৈতিক। ‘বাংলা সিনেমা উদ্ধারপ্রকল্প: চন্দ্রকথা ব্যচেলরদের পোয়াবারো’ লেখাকালে আমার নজরে আসে, চন্দ্রকথা ও ব্যাচেলর-এর জন্মসময় থেকেই তাদের ‘সুস্থতা’র সার্টিফিকেট দিয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে ঢোলসহরত নিয়ে তুমুল প্রচারে নেমেছিল আমাদের বাজার-মুনাফাকেন্দ্রিক মূলধারা মিডিয়াগুলো। এইসব মিডিয়া অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে বেনসন এন্ড হেজেজ স্টার সার্চ, গোল্ডলিফ ভয়েস অব ডিসকভারি, লাক্স-আনন্দধারা ফটোজেনিক প্রতিযোগিতা, ক্লোজ-আপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ, ফেয়ার এন্ড লাভলি রূপলাবন্য ইত্যাকার পণ্য-সংস্কৃতিকে প্রমোট করে, পক্ষ নেয়। সুতরাং তারা ‘সুস্থতা’র সাফাই গাইতে থাকলে সংশয় জাগে। মিডিয়াগুলোর সাথে অনেকটা একতানে গলা মিলিয়েছিল ‘সুশীল সমাজের’ নানান কিসিমের এক্সিকিউটিভরা। মূলধারা মিডিয়া ও তাদের সৃষ্ট-মদদপুষ্ট তথাকথিত এই ‘সুশীল সমাজ’ সাক্ষাৎ মতাদর্শ ও স্বার্থগত ঐক্যের অবস্থান থেকে এসব সিনেমার গুণগান করেন এবং এই গুণগান করাটাকে তাদের কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিকও মনে হয়একবাক্যে একথা বলা যায়। তাই, তাদের মতাদর্শ-স্বার্থগত অবস্থানের পোলিটিক্যাল ইকোনমি বিচার করা, আমার বিবেচনায়, একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। [যোগাযোগ, সংখ্যা ৮, ২০০৭: ১৩৬]
৪) এসম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন, অরবিন্দ সিংহাল ও সুইটি ল-এর ‘উন্নয়ন যোগাযোগের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত: এভারেট এম. রজার্সের সঙ্গে কথোপকথন’ [অনুবাদ, আ-আল মামুন, যোগাযোগ, সংখ্যা ৩: জানুয়ারি ২০০১। মূল উৎস: ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশন জার্নাল, সংখ্যা ২, বর্ষ ৮, ১৯৯৭: কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া।]
৫) ২০০২ সালের ১০ই জুলাই প্রথম আলো’র সংবাদকর্মী মশিউল আলমের ‘সংবাদপত্রের ব্যবসা ও সামাজিক দায়িত্ব’ শিরোনামের লেখাটি প্রকাশিত হয় এ পত্রিকাতেই। সেখানে তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়িকভাবে সফল না হলে পত্রিকার কোনো উদ্দেশ্যই সফল হয় না। ...ব্যবসায়িকভাবে অসফল হলে পত্রিকাকে হয় মালিক, নয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। তখন তাদেরই ইচ্ছা পূরণ করতে সম্পাদক ও সংবাদকর্মীরা বাধ্য হন। ‘...সংবাদপত্র একটা ব্যবসায়িক ভেন্সার হতে বাধ্য। সফল ও টেকসই সংবাদপত্র মানেই প্রথমত ব্যবসায়িকভাবে সফল সংবাদপত্র। আর সংবাদপত্রের ব্যবসায়িক সাফল্যের লক্ষণ হচ্ছে পর্যাপ্ত বিজ্ঞাপন পাওয়া। ...আর সেই সংবাদপত্রই সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন পায় যার পাঠকসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, সংবাদপত্রের পাঠকপ্রিয়তা আর ব্যবসায়িক সাফল্য পাশাপাশি যাচ্ছে।’ এই কথাগুলো একেবারেই ঠিক নয়। কারণ বসায়িকভাবে সফল পত্রিকাও সরকার, সমাজের বিভিন্ন ক্ষমতাগোষ্ঠী ও মালিকগোষ্ঠীর সাথে মিথোজীবিতামূলক সম্পর্কের মধ্যে থেকে কাজ করে। প্রথম আলোই এর উৎকৃষ্ঠ উদাহরণ। বর্তমান সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে ও টিকিয়ে রাখতে প্রথম আলোর ভূমিকা যাচাই করে দেখা যেতে পারে। প্রথম আলোর মালিকগোষ্ঠীর প্রধান লতিফুর রহমানের কন্যা শাজনীন নিহত হলে, এবং হত্যা মামলার, রিপোর্ট নিয়মিত প্রথম ও শেষ পাতায় ছাপা হয়েছে- এমনকি এই মামলা নিয়ে যখন অন্য সব পত্রিকা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে তখনও, এবং মজার বিষয় হলো প্রথম আলোও অন্যান্য হত্যকাণ্ড নিয়ে অন্য পত্রিকাগুলোর মতো নিয়মিতই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, আর হত্যাকাণ্ডের শিকার যদি নিম্নবর্গের কেউ হয় তাহলে কোনো পত্রিকাতেই আগ্রহ এক’দুদিনের বেশি স্থায়ী হয় না। র‌্যাঙ্গস ভবনে শ্রমিকদের লাশ কতোদিন ঝূলে ছিল, বলুনতো! তদুপরি, এখানে প্রশ্ন রাখা যায়, ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে হলে কি অন্য কারো ওপর নির্ভরশীল হতে হয় না? তাহলে, বিজ্ঞাপনদাতাগোষ্ঠীর ওপর মিডিয়ার নির্ভরতাকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব? এই সম্পর্ক কি শুধু বিজ্ঞাপন পাওয়া ও ছাপানোর মধ্যেই সীতিম? না। ব্যাবসায়িকভাবে সফল হতে হলে যা সাধারণ মানদণ্ডেও সংবাদ নয় সেগুলোকে এবং কোম্পানির বিজ্ঞাপনকেও অনেক সময় সংবাদ-রূপে ছাপতে হয় (যেমন জন প্লেয়ারের ভয়েস অব ডিসকভারির ‘সংবাদমূল্যহীন’ রিপোর্ট প্রথম আলোতেই সমানতালে ছাপা হয়েছে)- এটাকে কি সংবাদপত্রের স্বাধীন ভূমিকা বলা যায়? ‘সেই সংবাদপত্রই সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন পায় যার পাঠকসংখ্যা সবচেয়ে বেশি’ এ বক্তব্যও ঠিক নয়। ডেইলি স্টার-এর পাঠকসংখ্যা নিশ্চিতভাবেই ইনকিলাব-এর তুলনায় কম। একইসাথে এটাও নিশ্চিত করে বলা যায় যে, ডেইলি স্টর-এর বিজ্ঞাপন আয় ইনকিলাব-এর তুলনায় বেশি। কেন এটা ঘটে? এটা ঘটে টার্গেট অডিয়েন্সের কারণে। ইনকিলাব-এর পাঠক এদেশের অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে বিরল। কিন্তু ডেইলি স্টর-এর পাঠক মূলত এদেশের বিকাশমান অভিজাত শ্রেণী। তাই সাধারণত, বহুজাতিক ও তাদের এদেশীয় এজেন্টদের ভোগ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন ইনকিলাব-এ নয়, ডেইলি স্টার-এ বেশি ছাপা হয়। কারণ ডেইলি স্টার-এর পাঠকদের ওইসব পণ্য কেনার ক্ষমতা ইনকিলাব-এর পাঠকের তুলনায় বহুগুণে বেশি। বস্তুত পণ্য ক্রয়ক্ষমতা, পাঠকের বৈশিষ্ট্য এবং বিজ্ঞাপনের মধ্যে একটা ওতপ্রোত সম্পর্ক আছে। তদুপরি, বেন বাগডিকিয়েন দুটো জরিপের কথা উল্লেখ করে জানাচ্ছেন, “সংবাদপত্র সম্পাদকদের ওপর ১৯৯২ সালে মারকুট্টি বিশ্ববিদ্যালয়ের করা এক জরিপে সম্পাদকদের ৯৩ শতাংশ বলেন যে বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের সংবাদকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ... কিছুদিন আগের নিলসেন জরিপে দেখা যায়, ৮০ শতাংশ টেলিভিশন ডাইরেক্টর বলেন, তারা ‘প্রতি মাসে কয়েকবার করে’ কর্পোরেশনগুলোর জনসংযোগ ফিল্মকে সংবাদ হিসেবে স¤প্রচার করেন।” (১৯৯৭: মুখবন্ধ) এমনকি, বাগডিকিয়েন আরও বলছেন, “আজকাল বড় বড় মিডিয়ার কর্তারা তাদের সাংবাদিকদেরকে বিজ্ঞাপনদাতা ও মালিকদের অন্যান্য অসাংবাদিকীয় স্বার্থের প্রতি নজর রেখে সংবাদ বানাতে বলেন। নিউজ পেপার্স এ্যসোসিয়েশন অব আমেরিকার ১৯৯৫ সালের সম্মেলনে একজন বড় বিজ্ঞাপনদাতা রিপোর্টারদেরকে সমালোচনা করেন বিনোদনের অংশ হিসেবে সংবাদকে পুনঃসংজ্ঞায়িত না-করার দায়ে। [বাগডিকিয়েন, বেন এইচ. (১৯৯৭: মুখবন্ধ)। দ্য মিডিয়া মনোপলি। বস্টন: বেকন প্রেস।]
৬) প্রথম আলোর ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে (৪ নভেম্বর ২০০৫) মতিউর রহমান মন্তব্য প্রতিবেদনে পরিতৃপ্তির সুরে বলেন, ‘যে বস্তুনিষ্ঠতা ও দলনিরপেক্ষতার অঙ্গীকার নিয়ে প্রথম আলো যাত্রা শুরু করেছিল, শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও আমরা আমাদের সেই সংকল্পে দৃঢ় থাকব।’ আমরা যদি বস্তুনিষ্ঠতার রাজনৈতিক-অর্থনীতি বিচার করি তাহলে দেখা যাবে, গণযোগাযোগের উপায়গুলোর পুঁজিবাদী মালিকানা ও প্রাত্যহিক সাংবাদিকতা চর্চার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে ‘বস্তুনিষ্ঠতার সংস্কৃতি’ যাকে জেমস ক্যারে ‘সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক অভিপ্রায়’ হিসেবে সমালোচনা করেছেন। জেমস ক্যারে ‘বস্তুনিষ্ঠতা’র আবির্ভাবকে সুনজরে দেখেননি। তিনি এ-সম্পর্কে বলেন, উনবিংশ শতকের শেষ দিকে ‘বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিংয়ের’ আবির্ভাবে সাংবাদিক এমন একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে থাকেন যাকে অবশ্যই ‘মানের নিম্নগমন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা চলে, এটা এমন এক প্রক্রিয়া যাতে তার ভূমিকার অবুদ্ধিবৃত্তিকীকরণ ও যান্ত্রীকীকরণ ঘটে। [ক্যারে, জে, ডব্লিউ (১৯৬৯: ৩২)। দ্য কমিউনিকেশন রেভ্যুলুশন এন্ড দ্য প্রফেশনাল ম্যাস কমিউনিকেটর্স। উদ্ধৃত, জেমস এস. এটেমা, ডি. চার্লস হুইটনি এবং ড্যানিয়েল বি. ওয়েকমান (১৯৯৭)। “প্রফেশনাল ম্যাস কমিউনিকেটর্স”। ড্যান বার্কোভিজ (সম্পা.)। সোশ্যাল মিনিং অব নিউজ। লন্ডন: সেইজ পাবলিকেশন্স।] ‘কোনটাকে বলি সংবাদ?’ লেখায় আমি বলেছিলাম: ‘বস্তুনিষ্ঠতার মূল্যবোধ সংবাদকাহিনীকে খেলার ধারাভাষ্যের মতো করে তোলে। রিপোর্টার সকল পক্ষের মধ্যে ‘ব্যালান্স’ করতে গিয়ে মূল সমস্যাটা আর গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে পারেন না। আবার ‘বস্তুনিষ্ঠতা’র মূল্যবোধের কারণে, সাংবাদিক তথ্যের জন্য সবসময় সমাজের অধিপতি-ক্ষমতাবান-অফিসিয়াল সূত্রগুলোর ওপর নির্ভর করে, তাদের মুখের বাণীর মালা গেঁথে ঘটনার ধারাভাষ্য দেয়। আর ‘আনঅফিসিয়াল’ দরিদ্র-ক্ষমতাহীন-আনাকাঙ্ক্ষিতরা প্রত্যক্ষভাবে ঘটনার সাথে জড়িত থাকলেও, ঘটনার ভূক্তভোগী হলেও ‘বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষা করতে যেয়ে সংবাদকাহিনী থেকে হারিয়ে যান। মূলকথা, ঘটনা সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব নয় এবং ‘বস্তুনিষ্ঠতা’ উদ্দেশ্যমূলক। [যোগাযোগ, সংখ্যা ৮, ২৯৯৭: পৃ. ১৬৩]
৭) প্রথম আলোর ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে (৪ নভেম্বর ২০০৫) মতিউর রহমান মন্তব্য প্রতিবেদনে বলেন, ‘গত ১২ বছরে তিনটি সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেলেও দেশে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারেনি। বরং সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকারের জায়গায় আমরা পেয়েছি নির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক সরকার। সহনশলিতার বদলে অসহিষ্ণুতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতিই এখন প্রধান হয়ে উঠেছে। এ রকম এক অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতিতে দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছে এক প্রবল হতাশা।’ একইসাথে তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন, ‘দেশের এমন হতাশাজনক পরিস্থিতিতে অতীতের মতো লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবী তথা বৃহত্তর নাগরিক সমাজের ভূমিকার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সামনে চলে আসে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও আমরা হতাশার সঙ্গে দেখতে পাচ্ছি যে, নাগরিক সমাজও প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে সক্ষম হচ্ছে না। তার একটি প্রধান কারণ, আমাদের বুদ্ধিজীবী বা নাগরিক সমাজও দেশের বিভক্ত রাজনীতির ধারাতেই বিভক্ত।’ তিনি আরও বলছেন, ‘অন্যদিকে সংবাদপত্র জগতের পরিস্থিতিও খুব ভালো নয়। দেশে এখন সংবাদপত্রের সংখ্যা অনেক। পত্রপত্রিকাগুলোর মধ্যে কোনো সমঝোতা নেই। রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের জরুরি প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতেও কোনো ঐক্যমত্য নেই।...এসব কিছুর পেছনে সক্রিয় রয়েছে দেশের রাজনৈতিক বিভক্তির প্রভাব। আর, যারা সংবাদপত্রের বস্তুনিষ্ঠতা ও দলনিরপেক্ষতার নীতি মেনে পত্রিকা করার চেষ্টা করছেন, তাদের নানামুখী চাপের মুখে থাকতে হয়।’ মতিউর রহমান তাঁর ‘সংবাদপত্র কেন? সংবাদপত্র কার জন্য?’ (প্রথম আলো, ২৫ জুন ২০০২) লেখায়, সেহেতু, বলতে পারেন, ‘ ‘সাধারণ নাগরিকদের অনেকেই আজকাল মনে করেন তাদের সর্বশেষ ভরসা ও আশ্রয়স্থল হচ্ছে সংবাদপত্র।’ আর প্রথম আলোর ৬ষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে (৪ নভেম্বর ২০০৪) মতিউর রহমান ‘স্বাধীন সংবাদপত্রের বন্ধু ও পাঠকদের জন্য ভালোবাসা’ শিরোনামের এক কলামের শেষ অনুচ্ছেদে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র নিয়ে দেশে যেসব সমস্যা বিরাজমান, তাতে করে স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষ সংবাদপত্রকে সব সময়েই নানা চাপ আর হুমকির মধ্যে থাকতে হয়। এ অবস্থায় সংবাদপত্রের পাঠক, শুভানুধ্যায়ী, বিজ্ঞাপনদাতা এবং এজন্ট-হকার্সরাই হয়ে ওঠেন স্বাধীন ও দলনিরপেক্ষ সংবাদপত্রের বড় ও প্রধান সহায়, আন্তরিক বন্ধু।’ মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর তাঁর মিডিয়া ভাবনায় ‘সামাজিক পরিবর্তনে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ (প্রথম আলো, ৯ আগস্ট ২০০৫) কলামে লেখেন, ‘প্রথম আলোর যারা নিয়মিত পাঠক তারা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন পত্রিকাটি দৈনন্দিন খবর বা ভাষ্যের চাহিদা মিটিয়েও নানা মানবিক ও সামাজিক ইস্যুতে একটা অবস্থান নিয়েছিল। আমাদের অনেক পত্রিকা রাজনৈতিক ইস্যুতে অবস্থান নেয়। কারণ এসব পত্রিকার মালিক বা সম্পাদক কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল বা দর্শনের পৃষ্ঠপোষকতা করে। বিশেষ কোনো দলকে তারা ক্ষতমায় দেখতে চায়। এটা প্রকৃত সংবাদপত্রের কাজ নয়; দলীয় সংবাদপত্রের কাজ হতে পারে। রাজনীতির প্রশ্নে সংবাদপত্র হবে দলনিরপেক্ষ।’ প্রথম আলো সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম আলো পত্রিকা এ পর্যন্ত কয়েকটি বিষয়ে একটা শক্ত অবস্থান নিয়েছে। যেমন- এসিড সন্ত্রাস, মাদকের অপব্যবহার, এইচআইভি/এইডস, ধর্মীয় চরমপন্থা ইত্যাদি।...দুর্নীতি, সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রথম আলো বিভিন্ন সময়ে সোচ্চার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।’
৮) রাষ্ট্র-বিজ্ঞাপনদাতা-বণিক সম্প্রদায়-মিডিয়া ও তাদের বুদ্ধিজীবীদের পারস্পরিক লেনদেন সম্পর্কে জানতে দেখুন, নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস. হারম্যান-এর সম্মতি উৎপাদন: গণমাধ্যমের রজনৈতিক অর্থনীতি, আ-আল মামুন অনূদিত, সংহতি প্রকাশন, ঢাকা: ২০০৮। বিশেষত ভূমিকা ও প্রথম অধ্যায়ে বর্ণিত প্রচারণা মডেলের ফিল্টারগুলো।
৯) গৌতম মণ্ডল, এসিড সন্ত্রাস: একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট, নিউজ নেটওয়ার্ক, ঢাকা: ২০০১।
১০) দেখুন সেলিম রেজা নিউটন, ‘বাজরের যুগে সাহিত্য ও সাংবাদিকতার আম্মু-আব্বু-সমাচার অথবা বাংলাদেশে বিদ্যমান মহাজনী মুদ্রণের পোলিটিক্যাল ইকোনমি’ যোগাযোগ, সংখ্যা ৫, জানুয়ারি ২০০৩; উদিসা ইসলাম, ‘হাঁড়ির একটি ভাত: প্রথম আলোর সংবাদ, বিজ্ঞাপন সংবাদে নারীর চিত্র’ যেগাযোগ, সংখ্যা ৬, ডিসেম্বর ২০০৩; খ. আলম, ‘কোটাভিত্তিক নারীপাতা: পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিতন্ত্রের এক কোটারি ব্যবস্থা’ যেগাযোগ, সংখ্যা ৭, ফেব্র“য়ারি ২০০৫; সুস্মিতা চক্রবর্তী, ‘প্রথম আলোর নকশা পাতায় নারী-সংবাদ উপস্থাপন ও প্রদর্শনের রাজনীতি’ যেগাযোগ, সংখ্যা ৭, ফেব্রুয়ারি ২০০৫; উদিসা ইসলাম, ‘নারীর স্বপ্নপূরণ এবার ফেয়ার এন্ড লাভলীর টিউবে বন্দি’ যেগাযোগ, সংখ্যা ৮, ফেব্রুয়ারি ২০০৭।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28996153 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28996153 2009-08-19 01:30:29
কিস্তি ৩: মেরিল-প্রথম আলো চলচ্চিত্র ‘সমালোচক পুরস্কারের’ রাজনৈতিক অর্থনীতি Click This Link
২য় কিস্তি: Click This Link

এসময় গাড়ির হর্ন বাজিয়ে কাকতালীয়ভাবে উকিল আপাও দৃশ্যপটে হাজির হন। চানমিয়া বলে, ‘আহেন উকিল আপা আহেন, তামশাটা দ্যাহেন। এরা আইছে আমার ভাড়াইট্টা মাইয়াডারে তুইলা নিতে।’ আফরোজা বলে: ‘এরা কারা?’ এসময় রমিজ আগ বাড়িয়ে বলে, ‘আমরা বউ আপা, রাগের মাথায় বকছিলাম বইলা ঘর ছাইড়া পালাইয়া আসছে।’ কুসুম আফরোজার পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে, বলে যে ওর ডরেই সে বাড়ি থেকে পালিয়েছে, ও তার বাবারেও খুন করেছে। এসময় দোলনও এসে পড়ে। সে রমিজের উদ্দেশ্যে বলে, তুমি যে ওরে বিয়ে করছো, কোনো প্রমাণ আছে। রমিজ বলে, আছে। আফরোজা বলে, ‘বিয়ে করলে নিশ্চয় কাবিননামাও আছে।’ রমিজ বলে, ‘হ, দ্যাহান যাইবো।’ আফরোজা উকিল সিদ্ধান্ত দেয়, তাহলে তিন দিনের মধ্যে রমিজকে কাবিননামা নিয়ে হাজির হতে হবে, এ-কয়দিন কুসুম তার হেফাজতেই থাকবে। এরপর রমিজ, চানমিয়া, কুসুম সকলকে নিয়ে উকিল আপা থানার দিকে রওয়ানা দেয় জিডি করতে এবং স্ট্যাম্পপেপারে রমিজসহ অন্যদের সই নেয়ার জন্য। তিনদিন পার হয়, রমিজ-খালেকরা আর আসে না। উকিল আপা চানমিয়াকে পরামর্শ দেন দোলনের সাথে কুসুমের বিয়ে দিয়ে দিতে। কারণ ধাপ্পাবাজি দিয়ে কুসুমকে নিয়ে যেতে এসেছিল রমিজরা। কিন্তু স্ট্যাম্পপেপারে সই করার ফলে এখন আর প্রতারণার সুযোগ নাই, সেহেতু রমিজ আর এমুখো হবে না- উকিল আপা এব্যাপারে নিশ্চিত। তিনি এরকম কেস আগেও অনেক দেখেছেন।
বেশ জাঁক করে বিয়ে সম্পন্ন হয়। একটা গান ও নাচানাচির দৃশ্যের মধ্য দিয়ে বিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। এরপর বাসর রাতে কুসুম জানালা বন্ধ করতে গেলে, পাশে লুকিয়ে থাকা খালেক ও রমিজ তার মুখে এসিড ছুঁড়ে পালিয়ে যায়। কুসুমকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ফাতেমা ও অন্য একটি মেয়েকে কুসুমের পাশে বসিয়ে রেখে উকিল আপা দোলনকে নিয়ে ডাক্তারের কক্ষে যান। ডাক্তার বলেন, ‘একচুয়ালি এসিডদগ্ধ বা পোড়া যায়গায় যদি পানি দেওয়া যায় তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কম হয়।’ ...এখন আপনাদের কিছু করার নাই, রোগী যেহেতু আমাদের কাছে এসে গেছে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো রোগীকে ভালো করে তুলতে।’ পত্রিকায় রিপোর্ট ছাপা হয়, পুলিশ রমিজ-খালেককে খুঁজতে থাকে। এরকম দুইটা দৃশ্যের পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ‘বার্ন ভবন’ তার দেয়ালে সাঁটা পোস্টার ও কয়েকটি এসিড আক্রান্তের ফ্রেমবদ্ধ ছবি দেখানো হয়। কুসুমকে রিলিজ দেওয়া হয়েছে। এসিড-দগ্ধ ও প্রথম আলোর কল্যাণে সুস্থ হয়ে-ওঠা বাস্তবের তিনটি মেয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কুসুমকে উদ্দেশ্য করে বলে: ‘তোমাগো রিলিজ দিছে? বাড়ি যাইতাছো?’ কুসুম ওদের মুখের চেহারা দেখে নিজ অবয়বের কথা ভেবে আঁৎকে ওঠে। কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে যায়? যাহোক, কুসুম বস্তিতে ফেরে। ঘরে দোলন বসে, কুসুম আয়নাতে নিজের মুখ দেখে বিকার বকতে থাকে, আয়নাটা ছুঁড়ে ভেঙ্গে ফেলে। আর দোলন সান্তনা দেয় সব ঠিক হয়ে যাবে, আয়নায় দেখা রূপই কি আসল। কিন্তু কুসুমের মন কিছুতেই বাধ মানে না। রাতে সিঙ্গেল বিছানায় দোলন-কুসুম শুয়ে আছে, দোলন পূর্ববৎ জিন্স ও সার্ট পড়া। দূরাগত ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়। কুসুম সন্তর্পণে বিছানা ছেড়ে ওঠে এবং একটু পরেই রেললাইন ধরে তাকে দৌড়াতে দেখি আমরা- সে আত্মহত্যা করবে। এদিকে দোলন বিছানায় পাশ ফেরে, হাতড়িয়ে দেখে কুসুম নেই, সেও ট্রেনের হুইসেল শোনে এবং ‘কুসুম...দাঁড়া কুসুম’ চিৎকার করতে করতে কুসুমের পিছু নেয়। ট্রেন এগিয়ে আসছে। কুসুম আগে, পিছে দোলন- একেবারে শেষ মুহূর্তে দোলন কুসুমকে নিয়ে ছিটকে পড়ে রেললাইন থেকে, আর গাড়িটা পর্দাজুড়ে ঝমাঝম করে বেরিয়ে যায়।
এরূপ পরিস্থিতিতে আত্মহননের আকাঙ্ক্ষা জাগা খুবই স্বাভাবিক। সেটা নিয়ে প্রশ্ন নেই। বিরক্তি লাগে পরিস্থিতির স্টিরিওটাইপ দৃশ্যায়ন নিয়ে। এটাও দর্শক-মনে নাটকীয় অভিঘাত সৃষ্টির অতি-পুরনো সিনেমা-স্ট্যাইল। বাংলা সিনেমায় বহু পরিস্থিতিতেই নায়িকা/নারী আত্মহত্যা করতে যায়, রেললাইনে দৌড়াতে থাকে এবং প্রায় ব্যতিক্রহীনভাবে শেষ মুহূর্তে নায়ক/পুরুষ তাকে উদ্ধার করে, রেলগাড়ি ঝমঝমিয়ে বেরিয়ে যায়।
দোলন কুসুমকে নিয়ে উকিল আপার অফিসে যায় ভালোমতো বুঝানোর জন্য। উকিল আপা ওকে বুঝায়, এটা করা কুসুমের একদম উচিত হয়নি, কারণ তার বর দোলন তাকে অত্যন্ত ভালোবাসে। পুরুষ যেমন নারীকে উদ্ধার করে ব্যতিক্রমহীনভাবে, তেমনই যেহেতু পুরুষ/দোলন তাকে ভালোবাসে তাই যেন তাকে বেঁচে থাকতে হবে, নিজের জীবনের নিজস্ব লড়াইয়ের জন্য নয়- এসব প্যাট্রিআর্কিক ভাবনা আফরোজার মতো প্রগতিশীল সমাজকর্মীর মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে। আর তাছাড়া তিনি বলেন, ‘আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কল্যাণে তোমার মতো অনেক দুর্ভাগা মেয়ে আবার বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।’ আফরোজা বলে সে কালই কথা বলবে, মাস দুয়েক আগে একটা এনজিও কয়েকজন এসিডদগ্ধ মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়ে প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে এনেছে, তারা এখন দিব্যি কাজকর্ম করে বেড়াচ্ছে।
পরের দৃশ্যে আমরা দেখি আফরোজা শুভ্রর স্টুডিওতে, যে শুভ্রকে আমরা প্রথম দৃশ্যে পেয়েছিলাম- গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে যে কুসুমের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। এবং তারপর একটা দৃশ্যের আমরা শুভ্রকে দেখেছি তুলি নিয়ে এক নারীর পোর্ট্রেটে পোঁচ দিচ্ছে। তখন তার এক বন্ধু এসে বলেছিল, ‘বাহ সুন্দর তো।’ সে ছবিটা কিনতে চায় কিন্তু শুভ্র বলেছিল ‘নো মাই ডিয়ার, ছবিটা আমি বিক্রি করব না, এটা আমার স্বপ্নের ছবি।’ পোর্ট্রেটটা ছিল কুসুমের। যাক, আফরোজা বলে, একটা এগজিবিশনের কথা বলছিলে না...কোনো পার্টিকুলার থিমের ওপর?’ জবাবে শুভ্র জানায়, তারা তিন বন্ধু মিলে এগজিবিশন করছে, তার থিম ‘গ্রাম বাংলা’ তার আরেক বন্ধুর থিম ‘ঢাকার বস্তি’ এবং অন্য বন্ধু পপির থিম ‘ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভবন’।
দোলন অধিরভাবে পায়চারি করে উকিল আপার বাড়ির সামনে, কুসুমের ব্যাপারে কিছু করতে পারলো কিনা জানতে চায়। আফরোজা জানায়, ইতোমধেই অনেকদূর এগিয়েছে, বেশকিছু প্রতিশ্র“তি পেয়েছেন, আর লাখ দুয়েকের ব্যবস্থা হলেই কুসুমকে বিদেশে পাঠানো যাবে। দোলন জানায় সেও কিছু টাকা জোগাড় করেছে, গার্মেন্টস মালিক ৫০ হাজার টাকা ডোনেট করবেন, কথা দিয়েছেন।
পরের দৃশ্যে প্রতীক্ষারত কুসুমকে কয়েক মুহূর্ত দেখা যায়। তার পরেই আরেকটা দৃশ্যে হন্তদন্ত দোলন আফরোজার ঘরে ঢোকে একটা ব্যাগ হতে, বলে, ‘উকিল আপা, এই ব্যাগে অনেক টাকা আছে, কুসুমরে আপনি কাইলই বিদেশ পাঠানের ব্যবস্থা করেন।’ আফরোজা বলেন, ‘এই ব্যাগ তুমি কোথায় পেলে?’ দোলন বলে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছে। রাস্তায় পড়ে ছিল, তারও টাকা দরকার তাই তুলে এনেছে। আফরোজা বলেন, ‘এই ব্যাগের ওপর তোমার আমার কারো অধিকার নেই, ব্যাগটা প্রকৃত মালিকের কাছে অথবা তাকে না পেলে থানায় জমা দেওয়া আমাদের কর্তব্য।’ দোলন হতাশ হয়, স্বীকার করে কুসুমের চিকিৎসার জন্য সে ব্যাগটা হাইজ্যাক করেছে। আফরোজা ব্যাগ হাতড়িয়ে পরিচয়পত্র বের করে বলেন, ‘একটা অন্যায় অসুন্দর কাজের মাধ্যমে অর্জিত টাকায় কুসুমের সুন্দর মুখ তুমি ফিরিয়ে আনতে চাও? ওই মুখ দেখে তুমি শান্তি পাবে?’ দোলন ক্ষমা চায়, বলে কুসুমের চিকিৎসা ছাড়া আর কিছু সে ভাবতে পারছে না, তার বিবেক মনুষত্ব্য সব হারিয়ে গেছে।
কাকতালীয়ভাবে এই ব্যাগটাও ছিল শুভ্রর, এবং শুভ্র তার এগজিবিশন থেকে পাওয়া টাকা থেকে এক লক্ষ টাকা দান করেন দোলনের স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য। তখন আফরোজা এই মহানুভবতার প্রশংসা করার ভাষা খুঁজে পান না, বলেন ‘শিল্পী হিসেবে তুমি সত্যি একটা অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলে।’
একটা বিমান উড়ে যায়, বুঝা গেল কুসুমকে বিদেশ পাঠানো হলো, এবং তারপর চানমিয়া দোলনকে চাঙ্গা-হওয়ার-মতো একটা খবর দেয়, রমিজ ও খালেক ধরা পড়েছে। আফরোজা উকিল বাদি পক্ষের হয়ে লড়েন। বিচারে এসিড নিক্ষেপ ও খুনের অপরাধে রমিজের ফাঁসি হয় এবং তাকে সহযোগিতা করায় খালেকেরও ফাঁসির রায় দেয়া হয়। আবারও ‘এসিড নিক্ষেপের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড’ পোস্টার দেখানো হয়। যারা আদালতে গেছেন তারা বুঝবেন, বাস্তবের আদালত আর বাংলা-সিনেমার আদালতের মধ্যে কতোখানি ফারাক থাকে। এখানেও সেই ফারাক চোখে পড়ে।
সর্বশেষ দৃশ্যে একটা বিমান অবতরণ করে। অবিকল আগের চেহারায় কুসুম ফিরে আসে- যদিও প্লাস্টিক সার্জারি করে আমাদের প্রক্তন প্রধানমন্ত্রীও অবিকল চেহারায় ফিরতে পারেননি, তার সব আলোকচিত্র একপাশ থেকে তুলতে হতো। শুভ্র এবং দোলন দূরে দাঁড়িয়ে। ভিতর থেকে আফরোজা কুসুমকে সাথে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ায়, বলে ‘ওই যে দোলন তোমাকে নিতে এসেছে।’ শুভ্র বোঝে এই তার স্বপ্নের সেই মেয়েটি। কুসুম হাতের ব্যাগ ফেলে দিয়ে এক দৌড়ে দোলনের বুকে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। স্লো-মোশনে এই দৃশ্য দেখানো হয়, ব্যকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকে ‘কাছে আসবে বলে ভালোবাসবে বলে...’। এভাবে মধুর মিলনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে আয়না সিনেমার।

ছবির নাম আয়না কেন
আয়না একটা রূপক। ধরা হয় আয়নাতে ফুটে ওঠে বাস্তব। ‘সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ’ একথা অনেকেই বলেন। হালে বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী-আরোপিত ‘জরুরি পরিস্থিতি’কালের সংবাদমাধ্যমকে কোনো কোনো উপদেষ্টা এবং সেনাপ্রধান পার্লামেন্ট বলেও ঘোষণা দিচ্ছেন। প্রথম আলোর সমালোচক বর্গে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় আয়না। প্রথম আলো নিজেকেও সমাজের আয়না মনে করে- যদিও সে আয়নাতে কেবল তাদের কাক্সিক্ষত ইমেজই ফুটে ওঠে। আয়না চলচ্চিত্রের নামকরণে সংবাদপত্রের ‘বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতা’ পরিবেশনার মতো আপ্তবিশ্বাসের ছাপ পাওয়া যায়।

তিনটি ছবির মধ্যে প্রতিতুলনা
পপুলার ফিল্মের একটা মৌল উপাদান হলো দ্বন্দ্ব- ভালো এবং মন্দের দ্বন্দ্ব, শুভ এবং অশুভর দ্বন্দ্ব। ভালোমন্দ মিলে জীবনের যে বহমানতা তা পপুলার ফিল্মে বিশেষ দেখা যায় না। বরং অশুভ শক্তি প্রবল এক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়, জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। কিন্তু শেষপর্যন্ত শুভশক্তির জয় হয়। মিলনের অনাবিল আনন্দে পরিসমাপ্তি ঘটে। ভালো এবং মন্দের এই দ্বন্দ্বে দর্শক-শ্রোতার মন দ্রুত সাড়া দেয়, অশুভের বিনাশ চায়। প্রপাগান্ডার জন্যও এই কৌশল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। যেমন মার্কিন সরকার- ও মিডিয়াগুলো সেদেশের জনসাধারণের মনে সবসময় অশুভ শক্তির ভয় জাগিয়ে রাখে। নিজেদের ‘গণতন্ত্র’ ‘মানবাধিকার’ ইত্যাদি ‘শুভ’ শক্তির সাপেক্ষে বহির্দেশে ‘অশুভ শক্তি’ নির্মাণ করতে থাকে, যারা কিনা মাকিনি ‘গণতন্ত্রের’ জন্য হুমকিস্বরূপ। আর এভাবেই বিদেশে মার্কিনি যুদ্ধগুলোর পক্ষে জনমত আদায় করে নেয়। নন্দিত নরকে এবং অন্তর্যাত্রায় আমরা শুভ-অশুভের এরূপ দ্বন্দ্ব দেখি না। কিন্তু আয়নার জোড়াতালি দেওয়া কাহিনী পুরোটাই শুভ-অশুভের দ্বন্দ্বের চাকায় ভর দিয়ে এগোয়।
কাহিনী, সংলাপ ও চিত্রনাট্যের দিক থেকে নন্দিত নরকে ও অন্তর্যাত্রা যতোটা সবল, আয়না সেতুলনায় ততোটাই দুর্বল। দৃশ্যায়ন ও সম্পাদনায় অন্তর্যাত্রা অনন্য, ডিটেইলের ব্যবহারেও। নন্দিত নরকের কাহিনী সবচে শক্তিশালী হলেও সম্পাদনার ত্র“টি চোখ এড়ায় না। কিন্তু এসব কোনো দিক থেকেই আয়না অন্য দুটি চলচ্চিত্রের কাছে ভিড়তে পারে না। আয়নাতে আমরা মেক-আপের অতিরঞ্জিত ব্যবহার দেখি, আলোর সিনেমাটিক ব্যবহার একটুও দেখি না। অভিনয়ের দিক থেকে আয়নায় অতিনাটকীয়তা আছে, অবাস্তব নাচ-গান আছে। কিন্তু নন্দিত নরকে ও অন্তর্যাত্রায় অভিনয়ে কোনো চরিত্রকে অস্বাভাবিক লাগে না, হঠাৎ খাপছাড়া নাচগান শুরু হয় না। নন্দিত নরেকে ও অন্তর্যাত্রার কাহিনী ও নির্মাণে সৃজনশীলতার ছাপ পাওয়া গেলেও আয়নায় তা একেবারে নাই- আয়না এককথায় প্রেসক্রিপশনমাফিক নির্মিত এবং প্রেসক্রিপশনদানে নিয়োজিত।

আয়নাকে শ্রেষ্ঠত্ব দানের পোলিটিক্যাল ইকোনমি

আয়না বাংলালিংক নিবেদিত নারী নির্যাতন বিষয়ক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান হতে পারতো। আয়নায় কাহিনী বা চরিত্রগুলোর অস্বাভাবিক-খাপছাড়া প্রকাশ আছে, বিকশিত হয়ে-ওঠা নেই। দেখে মনে হয় নারী নির্যাতন, বিশেষত এসিড নিক্ষেপ, সম্পর্কে একগুচ্ছ বক্তব্য প্রকাশের জন্য চলচ্চিত্রটি বানাতে বসেছেন কেউ এবং যেহেতু কাহিনী দরকার তাই যেনতেন বাজার-চলতি একটা কাহিনীর মধ্যে বক্তব্যগুলো ঠেলেঠুলে ঢুকিয়ে দিয়েছেন; কাকতালীয়তা ও ফর্মুলা তাই এতো সক্রিয়। অকাতরে উপদেশবাণীও বর্ষণ করা হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে উন্নয়ন ডিসকোর্সে ‘এন্টারটেইনমেন্ট-এডুকেশন’ নামক একধরনের কনটেন্টের আবির্ভাব ঘটেছে গত শতকের শেষের দিকে।৪ আয়না তারই অ-পটু অনুসরণ, বার্তা এবং/বা উপদেশবাণীর ভারে কাহিনী ও চরিত্রগুলোর বিকাশ রূদ্ধ হয়ে যায়, ফলে তা কিছুতেই সিনেমা হয়ে ওঠে না। তবে, চলচ্চিত্রকে যদি আমরা সংজ্ঞায়িত করি ‘চলমান যে চিত্র’ তাহলে অন্য যেকোনো অডিও-ভিস্যুয়াল টেক্সট যেমন চলচ্চিত্র, আয়নাও তেমন চলচ্চিত্র বটে।
তবু ‘সমালোচকদের রায়ে’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র আয়না, এর নায়িকা ‘নবাগতা’ সোহানা সাবা শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী (নারী) নির্বাচিত হন। কিন্তু কেন? এখানে আয়নার সাথে প্রথম আলোর এজেন্ডাগত সম্পর্কসূত্র আমরা অনুসন্ধান করতে পারি।
রুম্মান রশীদ খান ‘আর মাত্র আট দিন! কাণ্ডারি এবার আফজাল হোসেন’ (৫ই এপ্রিল) কাহিনীতে বলেন: ‘সবাই জানেন, দেশের দুই নারী তারকা সম্মানজনক সহ-উপস্থাপিকা হিসেবে পুরো অনুষ্ঠান আলোকিত করে রাখেন। এবারের সহ-উপস্থাপিকাদের নাম আবারও আপনাদের অনুমানের ওপর ছেড়ে দিলাম। দুজনেই এবার পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন। একজন পাঠকের ভোটে, অন্যজন সমালোচকদের ভোটে।’ ১৯শে এপ্রিলের ‘আনন্দ’ পাতায় পার্থ সরকার লিখিত “ধন্যবাদ ‘ব’ ধন্যবাদ ‘ভ’” কাহিনী থেকে আমরা ‘অনুষ্ঠান আলোকিত করে রাখা’ ‘দুই নারী তারকা সম্মানজনক সহ-উপস্থাপিকা’ সম্পর্কে জানতে পারি: ‘অবশেষে সব জল্পকা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে যখন সাবা ও প্রভা মঞ্চে ঢুকলেন তখন দর্শকেরা অনেকেই মন্তব্য করে উঠলেন, হ্যাঁ, খাসা পছন্দ বটে। ...কালো রঙের নেটের শাড়িতে সাবা এবং ক্রিমের সঙ্গে ইট-কমলা রঙের শাড়িতে প্রভা।’ এই ‘আনন্দ’ রিপোর্টারপ্রবর কিন্তু জানালেন না এই ‘খাসা’ পছন্দের দুই নারী তারকার মাঝখানে অবস্থানরত তারকা পুরুষ আফজাল কী পরিধান করেছিলেন! সুতরাং নারী মূল্যায়নের মানদণ্ড কতোটা শরীরকেন্দিক, সহজেই অনুমেয়। এই ‘খাসা’ সোহানা সাবা সামলোচক পুরস্কারপ্রাপ্ত নারী নির্যাতন বিষয়ক সিনেমা আয়নায় অভিনয় করে সেরা অভিনয়শিল্পী (নারী) নির্বাচিত হন সমালোচকদের রায়ে। আর তাই্ ‘অল্প স্বল্প গল্প’-এর লেখক খাসা কথাটাও বলে ফেলেন, ‘পুরস্কার পাওয়ার কথা চিন্তাও করেননি সাবা। যখন সমালোচক পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর নাম ঘোষণা করা হলো, সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো সাবার কান্না। কাঁদতে কাঁদতে সাবার সাজগোজের বারোটা বেজে গেছে।’ (‘আনন্দ’ প্রথম আলো ১৯শে এপ্রিল) কান্না পাওয়ারই কথা বটে!
প্রথম আলো সূত্রেই আমরা জানতে পারি, ‘সমালোচকদের দৃষ্টিতে’ সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে প্রাথমিক মনোনয়নে যেমন অস্তর্যাত্রার স্থান মিলেছিল, তেমনই ‘সমালোচকদের দৃষ্টিতে’ সেরা পরিচালক হিসেবে প্রাথমিক মনোনয়নে তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদেরও স্থান মিলেছিল। তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের বরাতে বলা হয়: ‘পুরস্কারের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে তিরস্কৃত হয়েই আমি অভ্যস্ত। প্রথম আলোর মাধ্যমেই আমি ঘোষণা দিয়েছিলাম, দেশীয় কোনো পুরস্কার বিতরণী আয়োজনে আমি আমার ছবি দেব না। তবে আমার অভিনয় শিল্পীদের স্বীকৃতিকে তো আমি দমিয়ে রাখতে পারি না। এ কারণে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে আমাদের ছবি অন্তর্যাত্রা জমা দিয়েছিলাম। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার আমাদের সবার জন্যই বিশেষ কিছু। যেহেতু তিন বছর আমি চলচ্চিত্রের জুরিতে এবং এবার নাটকের জুরিতে ছিলাম, আমি জানি এই পুরস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা।’ (‘আনন্দ’ ৫ই এপ্রিল ২০০৭) উদ্ধৃত অংশ থেকে বুঝা যাচ্ছে কথাগুলো বলেছেন তারেক মাসুদ, ক্যাথরিন মাসুদ নয়। আর এই বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ যেহেতু তিনি করেননি সেহেতু ধরা যায় যেকোনো ‘স্থানীয় ও জাতীয়’ পুরস্কারের তুলনায় মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারকে অনেক উর্ধ্বে স্থান দেন তিনি। তবু আয়না যখন সমালোচকদের রায়ে শ্রেষ্ঠ সিনেমা নির্বাচিত হলো তখন তিনি ভ্র“ কুঁচকে তাকিয়েছিলেন কিনা ভাবতে ইচ্ছে করে। অবশ্য, তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদকে মোরিল-প্রথম আলো একেবারে বঞ্চিত করেনি। ২০০৬ এর মোরিল-প্রথম আলো ‘শীর্ষ তালিকা’য় ‘উজ্জ্বল দম্পতি’ হিসেবে তাদের স্থান মিলেছে। (‘আনন্দ’ ১৯শে এপ্রিল ২০০৭)
প্রথম আলো একটা বিজ্ঞাপন-নির্ভর ‘ব্যবসাসফল’ দৈনিক পত্রিকা।৫ প্রথম আলো ‘বস্তুনিষ্ঠ’ সাংবাদিকতার চর্চা করে।৬ প্রথম আলোর ধারণানুযায়ী দলনিপেক্ষ সাংবাদিকতা মানেই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা।৭ অর্থাৎ, যে-সংবাদপত্রের কোনো রাজনৈতিক দলীয় অবস্থান নেই কিংবা পক্ষপাত নেই- তারা নিরপেক্ষ। কোনো রাজনৈকিত দলের উৎসাহী সমর্থক না-হওয়া মানেই নিরপেক্ষ অবস্থান নয়। বাণিজ্যিকতার সংস্কৃতি ও বণিক শ্রেণীর পক্ষে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার চেয়েও প্রভাবশালী ‘রাজনৈতিক’ অবস্থান। তাই বিচিত্র নয় যে, এখন মূলধারা মিডিয়াগুলো জন্ম নিচ্ছে জাতীয়-বহুজাতিক কর্পোরেশনের পেট থেকে এবং এসব মিডিয়া ‘নিরপেক্ষতা’ দাবি করছে। কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষা ও বাণিজ্য-অনুকূল মতাদর্শ জারি রাখা এসব মিডিয়ার প্রধান কাজ- একাজকে তারা ‘নিরপেক্ষ’ কাজ বলে জাহির করে। এবং রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাজনৈতিক শক্তি যদি তাদের স্বার্থ না-দেখে তাহলে তারা রাষ্ট্রযন্ত্র ও দলীয় রজনৈতিক শক্তির খোলনলচেও বদলে দিতে সক্ষম, আজকের বাংলাদেশই তার প্রমাণ। রাষ্ট্র ও আধিপত্যকারী রজনৈতিক দল বস্তুত বণিক শ্রেণীর কোনো না কোনো অংশেরই প্রতিনিধিত্ব করে, জনগণের নয়। তাদের ‘নিরপেক্ষতা’ বা নিরপেক্ষতার দাবি পাবলিক ডিসকোর্সে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে তাই গুরুতর তাৎপর্যপূর্ণ। বাজার-মুনাফাকেন্দ্রিক মিডিয়া ও বণিকগোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান ও মূল্যবোধের বৈধ্যতা তৈরি করতেও সক্ষম। কারণ সেই উপায়গুলো তাদেরই করায়ত্বে থাকে। তারা নিজেদের স্বার্থে পেশাদার বুদ্ধিজীবী নিয়োগ করতে এমনকি তারকা বুদ্ধিজীবী তৈরি করতেও সক্ষম।৮ এই সূত্রেই, তারা ‘সুস্থ’ সিনেমার একটা বর্গ তৈরি করতে সক্ষম হন- যার মধ্যে স্থান পায় হুমায়ূন আহমেদের চন্দ্রকথা ও মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ব্যাচেলর-এর মতো সিনেমা। এই ‘সুস্থ’ বর্গের ভিতর থেকে তারা নিজেদের সিনেমাকে শ্রেষ্ঠত্বের পদকও দিতে পারেন, তার নির্মাণ যে মানেরই হোক না কেন- যেমন আয়না।
আয়না চলচ্চিত্রের যে এজেন্ডাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো প্রথম আলোরও এজেন্ডা। (৭ নং টীকা দেখুন) প্রথম আলো বিশেষত ‘এসিড সন্ত্রাস’ নিয়ে ক্রুসেড ঘোষণা করে। এসিড দগ্ধদের সহায়তা করতে ২০০০ সালের ১৯শে এপ্রিল প্রথম আলো গঠন করে একটি সহায়ক তহবিল।৯ অনেক নারীকে এই তহবিল থেকে সহায়তা করা হয়েছে। যদি প্রশ্ন করি, প্রথম আলোর এই ক্রুসেড কেন চালায়? প্রথমত, এতে প্রথম আলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রকাশিত হয়। এই ক্রুসেডের কোনো মূল্য নেই, আমি তা বলছি না। কিন্তু একদিকে অতি মনোযোগদান, অন্য অনেক সামাজিক সংকটকে আড়ালও করেসেগুলো এজেন্ডা বহির্ভূত হয়ে যায়। দায়বদ্ধতার প্রকাশ আবার পত্রিকাটির জন্য প্রমোশনের কাজও করে। নারী নিপীড়নের প্রতি, বিশেষত এসিড সন্ত্রাসের প্রতি মনোযোগদান, মেরিল-প্রথম আলোর ‘আধুনিক পণ্যায়িত’ নারী তৈরির স্কিমকে আড়াল করে।১০ ব্যক্তিক সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নের ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ কাঠামোগত সন্ত্রাসকে আড়াল করে। গার্মেন্টস মালিকের মহত্ব, মালিকের বিশ্বস্ত কর্মচারীর দায়বদ্ধতা ও পদোন্নতি, শ্রমশোষণের বৃহত্তর আয়োজনকে, শিশুশ্রমের ব্যবহারকে আড়াল করে। মালিক আর মাত্র হাজার-বারো’শ টাকা মাইনে পাওয়া শ্রমিকের এজেন্ডা এক হয়ে ওঠেতারা গার্মেন্টসের উন্নতিতে এবং এর মাধ্যমে জতীয় উন্নতিতে এককাতারে একসাথে অবস্থান নেয়। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরী, ওভারটাইমের ন্যায্য প্রতিদান, এমনকি একটা বাস্তবসম্মত নিম্ন-মজুরী কাঠামোও আলাদাভাবে এজেন্ডা হয় না প্রথম আলোয়, বরং মালিকের স্বর বেশি প্রবল হয়ে ওঠে মজুরী-কাঠামো নির্ধারণের বেলায়।
প্রান্তিক পুঁজিবাদী দেশ হওয়ার কারণে এবং স¤প্রতি বিশ্বায়নের প্রকোপে পড়ে এদেশের সাংবাদিকতা-জগতে সকল কিছুর উর্ধ্বে মুনাফামুখিতা ও ভোগবাদী সংস্কৃতিকে আশ্রয় দেয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ-ধারা জনগণের জন্য কল্যাণকর কিনা সেটা ভেবে দেখা জরুরি দরকার। জনমুখী সাংবাদিকতার নামে, জনগণের বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়ে পাঠককে বিজ্ঞাপনদাতদের কাছে বেচে দেয়ার, তাদের মনোজগতকে বড়লোকের বৈখকখানা বানানোর, সংবাদের সংজ্ঞাকেই আমূল বদলে দেয়ার যে-পাঁয়তারা চলছে তা রুখতে হবে। সে-জন্য সবার আগে দরকার ‘জনসেবা’র তক্মা গায়ে ওঠাতে তারা যে-কলাকৌশল ব্যবহার করে সেগুলো চিনে নেয়া এবং পাঠকের সামনে তুলে ধরা।
আয়না প্রথম আলোর এডেন্ডা অনুকৃত একটা চলচ্চিত্র। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের মালিক ফরিদুর রেজা সাগর চ্যানেল আই-য়েরও কর্তা ব্যক্তি। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান চ্যানেল আই-এ স¤প্রচার করা হয়। চ্যানেল আই প্রথম আলোর প্রধান মিডিয়া পার্টনার। মতাদর্শও অভিন্ন। সুতরাং নিজেদের কলাই তো তারা দেখাবেন, সমাজসেবার মুখোশের আড়ালে মুখটাও আড়াল করবেন। আর শিল্পী-লেখক-বুদ্ধিজীবীবা ভাড়া খাটবেন!
এসব কারণে আয়না যখন প্রথম আলোর নিয়োজিত-নির্মিত বুদ্ধিজীবী ‘সমালোচকদের রায়ে’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় তখন অবাক হবার কিছু থাকে না। তেমনই সোহানা সাবার ‘শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পী (নারী)’ নির্বাচনও অবাক করে না।

[আ-আল মামুন, সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।]
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28996144 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28996144 2009-08-19 01:09:27
২য় কিস্তি: মেরিল-প্রথম আলো চলচ্চিত্র ‘সমালোচক পুরস্কারের’ রাজনৈতিক অর্থনীতি এককথায় বলা যায়, সিনেমাটির টার্গেট অডিয়েন্স বাংলাদেশের গণমানুষ নয়- বাংলাদেশের অভিজাত শ্রেণী এবং পশ্চিমা ‘মানবতাবাদী’ দর্শকদের জন্যই এই কাহিনী। যাদের সহায়তায় ফিল্মটি নির্মিত হয়েছে সেই নাম থেকেই কিছুটা আন্দাজ করা যায়। এ-আন্দাজ পোক্ত হবে যখন জানবেন যে প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতার কারণে (ডলবি ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম) প্রথম সপ্তাহে অন্তর্যাত্রা কেবল স্টার সিনেপ্লেক্স-এ মুক্তি দেওয়া সম্ভব হয়, এবং পরে চাইলে ঢাকার বলাকা ও মধুমিতা হলেই কেবল মুক্তি দেয়া সম্ভব। বাংলাদেশের আর কোথাও প্রেক্ষাগৃহে এটি চালানো সম্ভব নয়। শুধু এই নয়, সিনেমার ন্যারেটিভ থেকেও বোঝা সম্ভব এর টার্গট অডিয়েন্স কারা হতে পারেন। ‘আদিগন্ত প্রসারিত সবুজ’ উন্মোচিত হতে থাকা, দাদার বৃটিশপ্রীতি, কিংবা ‘ফিউশন মিউজক ব্যান্ড’ বাংলার আনুশেহ ও বুনোর খাপছাড়া উপস্থিতি খটকা তৈরি করে।
তবু, নিটোল কাহিনী, দৃশ্যায়নের উৎকর্ষতা, মিউজিকের ব্যবহার, সম্পাদনা এবং সর্বোপরি বিকাশমান মাল্টিকালচারাল পরিবেশে বেড়ে ওঠা উন্মুল মানুষের মূলে ফেরার তাগাদা, তা সে কাল্পনিক হলেও, অন্তর্যাত্রাকে একটি তাৎপর্যময় চলচ্চিত্র করে তোলে।

সিনেমার নাম আয়না

আয়না ছবিটি বাংলালিংক নিবেদিত ও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত। কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা এককালের জনপ্রিয় নায়িকা কবরী সরোয়ারের। ছবিতে কবরী একটা কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন - উন্নয়ন ডিসকোর্সে ‘চেঞ্জ এজেন্ট’-এর যে ভূমিকা থাকে এই চলচ্চিত্রে কবরীর ভূমিকাও তদ্রুপ - তার মাধ্যমেই কাহিনীর সূত্রপাত ঘটে, তিনিই কাহিনীর সমাপ্তি টানেন। এককথায় এই চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু নারী নির্যাতন, যেখানে একটা কেন্দ্রীয় অনুসঙ্গ হিসেবে নারীদের মুখে এসিড নিক্ষেপ, তার চিকিৎসা ও বিচার-প্রক্রিয়া উপস্থিত। নির্যাতনের ইস্যুগুলো একে একে প্রস্ফুটিত হয়েছে কাহিনী ধরে। আমি উল্টোদিক থেকে, ইস্যুগুলোকে নির্দেশক ধরে কাহিনীর গড়ে-ওঠা ও চরিত্র নির্মাণ দেখবো।

ইস্যু ১: নারী-নির্যাতন প্রতিরোধকারী এনজিও-কর্মী ও দোররা
আয়নার প্রথম দৃশ্যেই আমরা দেখি এক যুবক নৌকায় আসছে, ট্রেন ধরে শহরে ফিরবেন- এটাকে নদী বলা যাবে কিনা সে-সন্দেহ জাগা খুবই স্বাভাবিক, কোনো স্রোত নাই, শ্যাওলা ও পদ্মফুলে ঠাসা। তার নাম শুভ্র, গ্রামবাংলার ওপর এগজিবিশন করবে, তাই গ্রামে গ্রামে ঘুরছে। আঁকিয়ে। আর দুঃস্থ মহিলাদের জন্য সেবামূলক সংগঠন অঙ্গনা-পরিচালক আফরোজা একজন মহিলা-কর্মী নিয়ে চলেছেন বৌডুবি গ্রামের উদ্দেশ্যে, কারণ ‘কিছু ফতোয়াবাজ এক মহিলাকে দোররা মেরেছে’। তিনি ওই ‘ইনসিডেন্ট’-এর ব্যাপারে খোঁজ নিতে চলেছেন। নদীর ঘাটে তাদের দেখা, তারা পূর্বপরিচিত। আলাপচারিতা থেকেই তাদের পরিচয় ও কর্মক্ষেত্রের এই আন্দাজ পাওয়া যায়। আলাপ শেষে আফরোজারা নৌকায় ওঠে। দৃশ্যান্তর ঘটে, দেখা যায়, সুপ্রচুর তালগাছ-ঘেরা গ্রামের পথ দিয়ে শুভ্র হেঁটে চলেছেন। সূর্য অস্তাচলে। এসময় এ-ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র কুসুমের দেখা মেলে তালগাছের মাঝে, সেও সূর্যাস্ত দেখছে। কুসুমকে দেখে শুভ্র মুগ্ধ হয়, কুসুমও। কিন্তু তাদের কথা হয় না, কুসুম নৃত্যের ভঙ্গিতে হেঁটে-দৌড়ে ফিরে যেতে থাকে গ্রামের দিকে, শুভ্র মুগ্ধ-দৃষ্টিতে চলে যাওয়া দেখে।

কুসুমকে ঘিরেই আয়না ছবির এগিয়ে চলা। ছবিতে কুসুম নির্যাতিত নারীর প্রতিনিধিত্ব করে। তার বাবা গায়েন। বাবা-মেয়ে মিলে দুজনের সংসার- হতদরিদ্র। পরের দৃশ্যটিতেই, সে গ্রামের অন্য বাড়িতে ফুটফরমাশ খেটে চাউল নিয়ে বাড়িতে ফিরে দেখে তার বাবা হাটে চলেছেন কাঁঠাল বেচতে, কারণ ঘরে কিছুই নাই। তার কাঁধে দোতারা ঝুলানো। মেয়ে বলে, ‘তোমার তো খাওয়া হয় নাই। চারটা ভাত ফুটাইয়া দিই’। বাবা বলেন, ‘আমি খাইছিরে মা, তুই যে পান্তাভাত আর সুটকি রাইখ্যা গিছিলি ওইটা খাইছি।’ এই বলে সে ঢেকুর তোলে খাওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করতে এবং অস্বাভাবিক নাটকীয় মূদ্রায় হাতের তালুতে কাঁঠালের ঝুড়ি নিয়ে হাঁটা দেয়, হাঁটা না-বলে বরং বলা যায়, দৌড়-হাঁটার মাঝামাঝি একটা ছন্দোময় গতিতে সে রওয়ানা দেয়। এরকম নাটকীয়তা আমরা পুরো সিনেমাতেই দেখতে পাবো, দৃশ্যায়ন ও কাহিনী বর্ণন উভয় বিচারেই।

ইস্যু ২: কালো মাইয়া কেউ নিতে চায়না, অনেক টাকা চায়...
এ-গ্রামের মেয়ে তুলির বিয়ে, কালো বলে বেশ কয়েকবার তার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। এবার বরপক্ষ রাজি হয়েছে, তবে টেলিভিশনসহ অনেককিছু দাবি মেটাতে হবে কনে পক্ষকে। চার সখিসহ কুসুম তুলিদের বাড়িতে হাজির হয় পরিস্থিতি জানতে। সবার কোমরে শাড়ি পেঁচিয়ে বাঁধা, হাতায় কুঁচি দেওয়া ব্লাউজ পড়া, আর নাকে নাকফুল। গ্রামীণ নারীর এ এক ইস্টিরিওটাইপ ইমেজ। আজকাল গ্রামের অল্পবয়স্ক মেয়েরা কী পোশাক পরে, আর গ্রামের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে সেদিকে পরিচালক যথাযথভাবে নজর দেননি। নাটক, গল্প এবং বিশেষত ঢাকাই সিনেমা গত কয়েক দশক এই ইমেজই পুনরুৎপাদন করে চলেছে।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা চলছে, কুসুমরা নাচছে, তার বাবা গান গাইছে, এসময় বরের বাবা চিৎকার করে গান থামাতে বলেন। ছেলেকে সে উঠে আসতে নির্দেশ দেন, কারণ মেয়ের বাবা টেলিভিশন দেবে বলে কথা দিয়েছিল। মেয়ের বাবা কয়েকদিন সময় চায়। ছেলের বাবা রাজী নয়, তিনি বলেন, মহল্লার মানুষকে বলে এসছেন টিভি নিয়ে যাবেন, এখন টিভি না-পেলে মুখ দেখাবেন কী করে ... টিভি পাওয়ার জন্যই তো কালো মেয়ের সাথে ছেলেকে বিয়ে দিতে রাজী হয়েছেন। কুসুম প্রতিবাদ করে, ‘ইহ্! বিয়া যেন কুরবানীর গরুর হাট, পোলারে বিয়ার বাজারে বেচতে আসছে’। ছেলের বাবা আরও চেতে ওঠে, ‘ওই মাইয়্যা তুমি কেডা? বড় মাইনষের কথার মধ্যে বাম হাত ঢুকাইতে আহো, বিয়াদ্দপ কোথাকার, লাজশরম কি ধুইয়া খাইছ!’ এ-পরিপ্রেক্ষিতে কুসুম মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, ‘তালুই সাব, লাজশরম ধুইয়া খাইছেন আপনে ... আমাগো গেরামের মাইয়ারে কালো বইলা গালাগালি করতেছেন, তারে কালো বানাইছে কেডা? তার বাপ-মায় নাকি আল্লায়? নিজের পোলার দিকে চাইয়া দ্যাহেন...কোন সাবান মাখাইয়া তারে ধলা বানাইবেন?’ এসময় গ্রাম্য মাস্তান ড্রাগ-ব্যবসায়ী রমিজ উপস্থিত হয়। তার হস্তক্ষেপে বিয়েটা সুসম্পন্ন হয়। এ-দৃশ্যে ছেলের বাবা চরিত্রের অভিনয় ভীষণভাবে দুর্বল; তার অঙ্গসঞ্চালন ও বচন দুটোই অসঙ্গত ঠেকে, ক্লিশে লাগে। একইভাবে, কুসুমের বাবা চরিত্রে অভিনয়কারীর অতিনাটকীয়তা, মুখের অভিব্যাক্তিতে বারবার শহুরে অভিজাতপনা প্রকটিত হয়ে ওঠে। এখানে কুসুমের একটা দৃঢ় ইমেজ আমরা পাই। কিন্তু এই বলিষ্ঠতা সিনেমাজুড়ে অটুট থাকে না। বরং ‘মেয়েলিপনা’র যে ইস্টিরিওটাইপ ইমেজ দেখে দর্শক অভ্যস্ত এবং দেখতে চায় বারবার, কুসুম চরিত্র সেইসব চাহিদা পূরণ করে।

ইস্যু ৩: চাঁদাবাজি চলছেই, যারা আবার নারী নির্যাতক, দালাল, ড্রাগ আশক্ত ও ড্রাগ ব্যবসায়ী
গঞ্জের হাটে একদল যুবক চাঁদাবাজি করছে, নেতৃত্ব দেয় রমিজ। একজন বিক্রেতা বলেন, ‘এই হাটেও আর আইতাম না, রক্ত পানি কইরা দুইটা পয়সা কামাই করি, সেইহানেও থাবা মারে।’ পাশের জন বলেন, ‘না আইস্যা যাইবা কই? এসব উৎপাত অহন সবখানেই আছে।’ একারণেই ‘সামাজিক অবক্ষয়’ রোধকল্পে আমাদের কিছু মিডিয়া ও ‘সুশীল সমাজ’ নিচুতলার-মধ্যতলার এসব ছিঁচকে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিল দু’দশক আগে। রাজনৈতিক দলভিত্তিক শাসকগোষ্ঠীর কাছে এ-সমস্যার সমাধান না-পেয়ে তারা দলভিত্তিক রাজনীতির ওপরেও ক্ষিপ্ত হন, ফলে চাঁদাবাজের বর্গ স¤প্রসারিত হয়। তারা ‘রাজনৈতিক দল’ ও দলের সমর্থকদেরকেও চাঁদাবাজের বর্গে ঠেলে দেয়। এবার তারা ‘সেনা-সমর্থিত’ আপাত-স্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আগমনকে স্বাগত জানায়- যে সরকার তাদের কাঙ্ক্ষিত জিহাদ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে ‘দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির’ কলুষমুক্ত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে। দুর্নীতি-চাঁদাবাজির কাঠামোগত কারণগুলো তারা এড়িয়ে যান এবং উপরতলার কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের প্রকাশ্য ডাকাতিকে ‘বাণিজ্যিক সাফল্য’ নামে আখ্যায়িত করেন। আয়না ছবিতেও এরূপ বর্গকরণের কৌশল ব্যবহৃত হয়।
রমিজ চাঁদার টাকা ও চাঁদা তোলার এলাকা ভাগ করে দিয়ে তালেব চাচার দোকানে গিয়ে বসে। সেখানে আগে থেকেই কুসুম ও তার সখি করিমন তেল কিনতে হাজির ছিল। রমিজ হা-করে ওদেরকে দেখে এবং দোকানের কর্মচারিকে তিন কাপ চায়ের অর্ডার দেয়। রমিজ বলে, ‘তোমাগোরে একটু খাতির করতে চাই, তরতাজা তেজী মানুষগোরে সম্মানকরণ লাগে।’ যাহোক ওরা চা না-খেয়ে চলে যায়। রমিজ ‘প্রেমী ও প্রেমী দেখা দিলে তুমি...’ গাইতে গাইতে ওদের চলে যাওয়া রসিয়ে-রসিয়ে দেখে- বস্তুত পরিচালক রমিজের মাধ্যমে দেখান, ক্যামেরার চোখ স্থির হয় কুসুমের পশ্চাদ্দেশে।
দোকানের মালিক তালেব এলে রমিজ জানায়, বাঁধা চাকরি তার ভালো লাগে না তাই গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসেছে। তালেব তাকে বিয়ে করে সংসারী হওয়ার পরামর্শ দেয়। সে জানায়, সংসারী হওয়ার কথাই ভাবছে। গাঁয়ের গায়েন আজম আলী চাচার মেয়েকে, মানে কুসুমকে, তার মনে ধরেছে। তালেবকে সে প্রস্তাব নিয়ে যেতে অনুরোধ করে। এখানে দৃশ্যান্তরে যেতে সম্পাদক যেভাবে কাঁচি চালিয়েছেন তা কেবল অদক্ষ সম্পাদকের পক্ষেই সম্ভব।
পরের দৃশ্য: রাত নেমেছে। আজম আলী গান গেয়ে দেড়শ টাকা রোজগার করে মেয়ের জন্য ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরছেন। পথে তালেব কুসুমের বিয়ের কথা পাড়ে। আজম আলী চূড়ান্ত কথা না-দিয়ে মেয়ের সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে বাড়ি ফেরেন। মেয়ের সামনে ইলিশটা ঝুলিয়ে চমকে দেন। বড় সাইজের ইলিশ। বলেন ‘তর কথা মনে পড়লো তাই নিয়া আইলাম...মাত্র ৫০ টাকায় দিয়া দিল’। গ্রামে যাদের নিয়মিত যাতায়াত আছে তারা জানেন, গ্রামের হাটে আজকাল ইলিশ অনুপস্থিত। নদীতে যখন ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ে তখনও গ্রামে কেবলমাত্র জাটকা গিয়ে পৌঁছায়। আর অত্তো বড় ইলিশ পাওয়াতো সম্ভবই নয়- তাও পঞ্চাশ টাকায়। স্বপ্নে অবশ্য পাওয়া যেতে পারে, কিংবা গণিতের খাতায় ‘একটা বড় ইলিশের দাম ৫০ টাকা ধরলে...’ হিসেব মেলানো সম্ভব!
বিয়ের প্রস্তাবে কুসুম ভাবনায় পড়ে। পরের দিন সে ঘনিষ্ট সখি কমিরনের সাথে পরামর্শ করে, বলে, ‘শালার কপাল! একটা প্রস্তাব আইলো তাও ওই ভাদাম্যা চাঁন্দাবাজের লগে। মাইনসে কইব চাঁন্দাবাজের বউ।’ করিমন হাসতে হাসতে বলে ‘অতো বাছাবাছি করিসনাতো। মাইয়া মাইনষের জীবন হইল ক্ষ্যাতের মতো, ফসলের গুণেই ক্ষ্যাতের নামডাক। কোন ব্যাটাই লাঙ্গল দিল সেইসব ভাবনের দরকারটা কি?’ উত্তরে কুসুম বলে, ‘লাঙ্গলের লাইগা বেচাইন হইয়া গেছস মনে হইতাছে, তাইলে ক ওই চাষারে তর ক্ষ্যাতে নামাইয়া দিতাছি।’ এরূপ রূপক দর্শককে সুরসুরি দেয়, এবং এ-উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত। এরকম কথাবার্তা আরও কিছুক্ষণ চলে। দুই বান্ধবী মাঠে-ঘাটে নাচতে থাকে, কুসুম গান ধরে - বস্তুত স্টুডিওতে রেকর্ডকৃত গানে গলা মেলায় - আর গানের মধ্যেই কয়েকবার তাদের পোশাক-বদল ঘটে। এই উপমহাদেশে, বাংলাদেশেও রেকর্ডকৃত গানের সাথে মুখ মিলিয়ে নৃত্য সিনেমার বিশেষ অঙ্গ হয়ে উঠেছে। বাজারি সিনেমার রুপালি পর্দাতেই কেবল এরকম ঘটে, বাস্তবে নয়। ফর্মুলা দাঁড়িয়ে গেছে, ছবি ‘বক্স-অফিস হিট’ হতে হলে কিছু ভালো গান এবং দৃষ্টিসুখ মেটাতে কিছু নাচের দৃশ্য অবশ্যই থাকতে হবে। নায়িকাকে রূপসী হতে হবে। আয়নাও এ ফর্মুলা অনুসরণ করে।
কুসুমের বাবা আজম আলীকে রমিজ গলায় গামছা পেঁচিয়ে খুন করে। নাহার নামের একটা মেয়েকে ঢাকায় গার্মেন্টস-এ চাকরি দিতে নিয়ে যাবে রমিজ। রাত একটায় ট্রেন। সে মেয়েটিকে আটটার মধ্যেই আসতে বলে। মেয়েটি আসে। এদিকে রমিজের সাথে বিয়ের প্রস্তাবে কুসুম রাজি হয়েছে- রমিজের ‘লাঙ্গলের’ জন্য ‘ফসলের ক্ষেত’ হতে রাজি হওয়া কুসুমের পূর্বোল্লেখিত বলিষ্ঠতার সাথে মানায় না। আমরা দেখবো গার্মেন্টসকর্মী হিসেবেও তাকে মানায় না। যাহোক, ‘শুভকাজে দেরি করতে নাই’ বলে আজম আলী রমিজের বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়। দরোজার কাছে এসেই আজম আলী ধ্বস্তাধ্বস্তি শুনে থমকে দাঁড়ায়। এসময় নাহার কোনোভাবে মুক্তি পেয়ে আজম আলীর সামনে দিয়ে দরোজা খুলে অন্ধকারে দৌড়ে পালায়। রমিজ দরোজায় মুখ বাড়িয়ে দেখে আজম আলী দাঁড়িয়ে। অপ্রস্তুত হয়ে বলে, ‘কিছু কইবেন চাচা? আজম আলী বলে, ‘যা দ্যাখলাম আর যা বুঝলাম, আমার আর কিছু কওনের নাই। মাইয়াডা রাজি হইছিল। আল্লাই বাঁচাইছে। তোমার মতো একটা ইতরের হাতে আমি আমার মাইয়ারে তুলে দিতে পারি না। ছি!’ স্থানীয় লোকভাষা আর বইয়ের ভাষা মানে ভদ্দরলোকের ভাষা আজম আলীর মুখে একাকার হয়ে যায়। ধিক্কার জানিয়ে সে ফিরতি পথ ধরে। রমিজের মাথায় আগুন ধরে যায়, সে প্রথমে বসে পড়ে, তারপর এক ঝটকায় উঠে দৌড়ে গিয়ে আজম আলীর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে। চারদিকে তাকিয়ে অনুসন্ধান করে কেউ দেখে ফেললো কিনা। তারপর ঘরে ফিরে যায়। তবে অন্ধকারে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে নাহার হত্যাকাণ্ড দেখে ফেললেও মুখ খোলে না। সবাই ভেবে নেয় বয়স্ক বৃদ্ধের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।
শোকবিহ্বল কুসুম সন্ধ্যারাতে বাবার কবরের পাশে বসে থাকে। এসময় রমিজ সেখানে হাজির হয়। সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করে। বলে, আমার সাথে তো তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছিল, চলো দুজনে মিলে চাচার শেষ ইচ্ছা পূরণ করি। এতো রাতে এখানে থাকা ঠিক না, চলো ঘরে যাই বলে সে কুসুমের হাত ধরে। কুসুম হাত ছাড়িয়ে নেয়, চিৎকার করে বলে, ‘হাত ছাড় জানোয়ার... ববার কবরের মাটি শুকাইতে না শুকাইতেই... তর মতো লুচ্চার আমি ঘর করি না’। রমিজ ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, ‘ছাইড়া দেওনের জন্য রমিজ কারো হাত ধরে না’। কুসুম: ‘আমি চিৎকার করুম’ রমিজ: ‘কোনো লাভ নাই। তর বাপেও চিৎকার করতে চাইছিল, আমি সুযোগ দেই নাই।’ রমিজ কুসুমকে ধর্ষণ করতে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলে দেয়। কুসুম হাতের কাছে পাওয়া কাঁটা-ঝোপ দিয়ে রমিজের মুখে আঘাত করে নিজেকে মুক্ত করেই গ্রামের পথ দিয়ে দৌড়াতে থাকে। একটা ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে চলে যায়। এরপর ঢাকা শহরের একটা মাস্টার শর্ট। বুঝানো হয় কুসুম ঢাকায় চলে এসেছে। এখন কাহিনীও শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়বে।
বাংলা সিনেমার এ এক নিয়মিত ইমেজ। গ্রামে কোনো একটা সংকট দেখা দেয়। সিনেমার চরিত্র গ্রাম ছাড়ে ...ট্রেন চলে যায় হুইসেল বাজিয়ে...ঢাকা শহরের একটা মাস্টার সর্ট, তারপর সিনেমার কাহিনী ব্যতিক্রমহীনভাবে ঢাকার রাস্তা ধরে এগিয়ে চলে। কিন্তু বাস্তবতা এরূপ সিনেমাটিক সরল-সিধা নয়। ভাগ্যের বদল ঘটাতে ট্রেনের ঝিকঝিক গতির ছন্দে অনেক সঙ্কটাপন্ন ব্যক্তিরই ঢাকায় চলে যাওয়া হয়ে ওঠে না, আর একজন সদ্য যুবতীর জন্য তো নয়ই।
চাঁদাবাজ-চোকারবারীর কুসঙ্গ-কু-রঙ্গের সবটুকু একসাথে পাওয়া যায় পরের দিকের দুটো দৃশ্যে। রমিজ এসেছে ঢাকায়, খালেকের সাথে দেখা করতে গার্মেন্টসে যায়। খালেক রমিজকে খালার দোকানে বসতে বলে। রমিজ খালার দোকানে বসে, চা খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করে: ‘ব্যবসাপাতি কেমন চলতেছে খালা।’ খালা: ‘চলতাছে টাইটাই, বাকি খাওন মাইনষের খাসলত হইয়া গেছে, বুঝচস।’ রমিজ: ‘হ খালা, দিনকাল যানি কেমন হয়া গেছে, কোনো ব্যবসাতেই যুইত নাই। সাদা ব্যবসায় পয়সা নাই, কালা ব্যবসায় ম্যালা ধকল।’ খালা: ‘তা এদ্দিন গায়েব হইয়া ছিল্যা কই?’ রমিজ: ‘গেরামে গেছিলাম। ডাইলের চালান পার করতে গায়া [ভুল উচ্চারণ] পুলিশের দাবরানি খাইছিলাম গো খালা ...।’ খালা: চোখের নিচে খোঁচার উপর দিয়ে পার পাইয়া গেছ, পুলিশের হাতে ধরা পড়লে বাপের নাম ভুলাইয়া দিত।’ রমিজ সিগারেট ধরায়। এসময় কুসুম দোকানের পাশ দিয়ে বাসায় ফিরে। রমিজ জিজ্ঞাসা করে: ‘খালা, নীল ছিটের সালোয়ার কামিজ পরা মাইয়াটা কি এই ফ্যাক্টরিতে ঢুকছে?’ খালা: ‘হ ওর নাম কুসুম, ...ওর দিকে চোখ বিন্দাইলা ক্যা? কুসুম ভালো মাইয়া।’
এর পরের দৃশ্যে খালেকের বিছানায় রমিজ গা এলিয়ে শুয়ে আছে। খালেক পোশাক বদল করছে। খালেক: ‘হেলালের লগে দেহা হইছে, তর কথা কইচি, আইতাছে। কিরে ঝিম মাইরা রইলি ক্যান?’ রমিজ: আমি আর তগো ধান্দাই নাই...ঐদিন পুলিশে খবর দিছিল বইল্যা, পুলিশ রেইড দিছিল।’ খালেক: ‘তর কাউরে সন্দেহ হয়?’ রমিজ: ‘...মনে হয় ঐ মাস্টারের পোলা সগীর পুলিশের ইনফর্মার।’ ...খালেক: ‘কিরে তর চোখের কোনে গাতা হইল ক্যামনে?’ রমিজ: ‘গাতায় পইড়া গেছিলাম দোস্ত।’ খালেক: ‘নেশার ঘোরে পথ চললে তো গাতায় পড়ন লাগবই।’ রমিজ: ‘হ দোস্ত, ওই নেশা আমার জিন্দেগিতেও কাটবো না, আর গাতার থেক্যাও আর উঠতে পারবো না।’ খালেক: ‘কী উল্টাপাল্টা কথা কস, এহনওতো প্যাটে মালপানি পড়ে নাই।’ রমিজ: কুসুম তোগো ফ্যাক্টরিতে কবে জয়েন দিছে রে?’ খালেক বেশ রসিয়ে অস্বাভাবিকরকম টেনে টেনে বলে: ‘ওওও ওই জয়েন দিছে দ্যাড় মাস হইল? আরে ওইযে স্টোররুমের দোলন আছে না..ওই হালার পুতে আমার লগে টেক্কা মাইর‌্যা ওরে জয়েন দেওয়াইছে। অহন আবার দুইজনের মধ্যে ইস্টিকুলুকুলু চলতাছে।’ রমিজ: ‘কুসুম আমাগো গ্রামের মাইয়া, আমার জানের জান। ওর লগে কেউ ভাঁজ খাইলে ওরে দুনিয়া থেইক্যা আমি সরাইয়া দিমু।’ খালেক বলে: ‘দোস্ত আমিও তোমার লগে আছি। ওই পুঙ্গির পুতের ওপর...অর লাইগ্যা আমি কোনো ধান্দাফিকির ঠিকমতো করতে পারতাছি না।’ এসময় হেলাল ঘরে ঢোকে বিদেশী ‘মাল’ ও একজন মেয়ে সাথে। সারারাত ‘দিল্লাগি’ করবে। রমিজকে দেখেই মেয়েটি উত্তেজিত হয়ে ওঠে, সে রমিজের কলার চেপে ধরে বলে, ‘...পাইছি তরে আজ, অই গোলামের পুত আমার ট্যাকা দে।’
বাজারী মন-ভোলানো সংস্কৃতির সিনেমাগুলোতে নায়ক চরিত্রে সমাজস্বীকৃত সব ভালো গুণের সমাবেশ ঘটানো হয়। আর নায়িকা চরিত্রের দেহজ রূপ বিপুলভাবে প্রদর্শিত হয় প্রধানত পুরুষ দর্শকের দৃষ্টিসুখ মেটাতে, কোনো গুণ থাকলেও সেটাকে ছাপিয়ে ওঠে শরীর। আয়না ছবিতেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না- কুসুম চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তোলার বদলে তাকে ‘নায়িকাসুলভ’ রূপ প্রদর্শনেই বেশি মনোযোগী দেখা যায়। দারিদ্র ও শারীরিক শ্রম রূপকে আড়াল করে, শরীরে ছাপ রেখে যায়। কিন্তু কুসুমের শরীর তার নামের সাথে বেশ মানানসই, তার কপোলে রুজ, চোখে মাসকারা সবসময় দেখা যায়। রূপ প্রদর্শনের জন্য এগুলো আবশ্যক হলেও, চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। এ-ধরনের সিনেমার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, ‘ভিলেইন’ চরিত্রে সামাজিকভাবে ঘৃণিত যাবতীয় বদগুণের আছর দেখানো হয়। যদিও চাঁদাবাজির সঙ্গে, ধর্ষকামিতা বা এসিড নিক্ষেপ বা ড্রাগ-আসক্তি বা চোরাচালান বা বহুনারী-গমনের আবশ্যিক কিংবা অনিবার্য কোনো সম্পর্ক নাই। কিন্তু এই সিনেমায় রমিজ চরিত্রে এই সকল কু-গুণের সমাবেশ ঘটানো হয়। একজন এসিড নিক্ষেপকারী আবশ্যিকভাবে একজন চাঁদাবাজ নাও হতে পারে। আবার একজন চাঁদাবাজ হয়তো বাস্তবে এসিড নিক্ষেপকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখেও দেখতে পারে। কিন্তু আয়না সিনেমার ভিলেন চরিত্র বাজার-চলতি ফর্মুলা ভেঙ্গে বেরোতে পারে না।
সব দেশেই বাণিজ্যিক ছবির ভিলেন চরিত্রের একটা বদল এখন চোখে পড়ে। ৮০/৯০ এর দশকে মারদাঙ্গা ছবির ভিলেনের সাথে এখনকার ভিলেনের একটা অমিল প্রায়শই দেখা যায়। সেসময়ের ভিলেনরা হতো বিপুলদেহী-রক্তচক্ষু-চড়া মেজাজের, এর উদাহরণ হতে পারে বাংলাদেশের জাম্বো বা হিন্দি সিনেমার অমরেশ পুরী। আর এখনকার ভিলেন অনেক ক্ষেত্রেই কোমল ভাষায় কথা বলে, হ্যাংলা-পটকা শরীর হলেও মানিয়ে যায়। ভিলেনের শরীর ও ডায়ালগের এই বদল আরও বড় ধরনের সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। আমরা আজকাল তথ্য-মহাসড়কের যাত্রী, এখন আমজনতাও বুঝে গেছে যে তথ্য/জ্ঞানই শক্তি, তথ্য/জ্ঞানই ক্ষমতা। ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট, সেলফোনের এই যুগে আমাদের বাংলাদেশেও একটা বড় অংশের মানুষের শরীরের চেয়ে মনোজগত বেশি সক্রিয়। এখন রাষ্ট্রযন্ত্র, বহুজাতিক পণ্যবিক্রেতা, বিজ্ঞাপনদাতা কিংবা জিহাদওয়ালা সকলেই মানুষের মনোজগতকেই প্রধানত টার্গেট করে- তাদের উদ্দেশ্য নিপীড়ন চালানো, পণ্য বিক্রি, মতাদর্শে দীক্ষিতকরণ যা-ই হোক না কেন। ভিলেন চরিত্রও তাই, বৃহত্তর পরিবর্তনের অন্তর্গত হয়ে, বিপুল শরীর ও কর্কষ-চড়া মেজাজ থেকে সরে এসেছে বলে আমি মনে করি।

ইস্যু ৪: নারী-শিশু নির্যাতন একটা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
ঢাকা শহরের মাস্টার শর্টের পরেই সেবামূলক সংগঠন অঙ্গনার পরিচালক আফরোজা সাংবাদিকের কাছে সাক্ষাৎকার দিচ্ছে: ‘পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর অবস্থা নিয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে বহু গান, ছড়া, কবিতা রচিত হয়েছে...মেয়েরা যেন বৃষ্টির ফোটা, কেউ জানে না পড়বে কোথায়।’ সাংবাদিক তার কাছে নারীর পাশাপাশি শিশুদের অবস্থাও জানতে চান, তিনি বলেন, ‘...শিশুরাও বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিটা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যই একটা চ্যালেঞ্জস্বরূপ।’
আমাদের মিডিয়া, এনজিও, মানবাধিকার কর্র্মী মিলিয়ে গঠিত টলায়মান ‘সুশীল’ সমাজ এদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য বহু চ্যালেঞ্জ আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানির কাছে দেশকে উদোম করে দেওয়া, শক্তিশালী বিদেশী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ, ওয়ার্ল্ডব্যাংক-আইএমএফ-এডিবি’র জাতীয় নীতিনির্ধরণে হস্তক্ষেপ কিংবা জাতীয় জীবনে সম্পদ ও উৎপাদনের উপায়গুলোর অসম বণ্টন নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ কখনোই আবিষ্কার করতে পারেনি। আমাদের ‘সুশীল সমাজ’ একটা জাতীয় বা জাতীয়তাবাদী চরিত্র পায়নি। এর কারণ প্রধানত, বর্তমান বৈশ্বিক আর্থরাজনৈতিক ক্ষমতাতন্ত্রে সেরূপ সুশীল সমাজ কাক্সিক্ষত নয়। তাই আমাদের সুশীল সমাজের ক্ষতমাশালী বড় অংশটি একটা বুর্জোয়া মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গঠনের দিকেও না গিয়ে, বরং ‘সুযোগের হাতছানিতে’ সাড়া দিয়ে ‘নয়া-উদারনৈতিক বাজারব্যবস্থায়’ ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীতে পরিণত হয়েছে। এই সুশীল সমাজের পরিগঠন ও বিকাশ এখানে বিচার করা সম্ভব নয়, তাই শুধু পর্যবেক্ষণ পেশ করছি। সামাজিক সমস্যার কাঠামোগত দিকগুলো সবসময়ই তারা উপেক্ষা করেছে। এই চলচ্চিত্রেও কোনো সমস্যারই কাঠামোগত কারণ ও সমাধানের পথ সন্ধানের প্রয়াস নাই।

ইস্যু ৫: গার্মেন্টস জীবন ও মহানুভব গার্মেন্টস কর্তা
গ্রাম থেকে পালিয়ে কুসুম আশ্রয় পেয়েছে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে কাজের বুয়া হিসেবে। কিন্তু এ-আশ্রয় কুসুমের জন্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। গৃহকর্তা এক রাতে তার গায়ে হাত দেয়...কুসুম চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘কী করেন খালুজান!’ খালুজানের আর বেশিদূর অগ্রসর হওয়া হয় না। কুসুমের চিৎকারে গৃহকত্রী দরোজায় এসে উদয় হন। লোকটা আর কিছু না করতে পেরে কুসুমের গালে একটা শক্ত থাপ্পর কষে ফিরে যায়। পরদিন গৃহকত্রী কুসুমের হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে কাজ জুটিয়ে নিতে বলেন। কুসুম মিনতি জানায়, তার কোথাও যাওয়ার নাই। সংসার বাঁচানোর জন্য তখন গৃহকত্রী বলেন, ‘তোকে আমি সাহায্য করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমিও তোর মতো অসহায় রে। তাই পারলাম না।’ মধ্যবিত্ত নারীর সঙ্কট ও সমস্যা নিয়ে আর কিছু সিনেমাটিতে দেখা যায় না, মধ্যবিত্ত কর্তাদের সুযোগ-সন্ধানী চরিত্রও আর উন্মোচিত হয় না- যদিও ছবির নাম আয়না।
রেললাইন ধরে অনেক লোক হেঁটে যেতে দেখে কুসুম দলে ভিড়ে যায়। একজন জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কবে জয়েন দিছ?’ কুসুম: ‘আমি তো কোথাও জয়েন দিই নাই।’ মেয়েটি, ‘তুমি আমাগো গার্মেন্টসে কাম কর না?’ কুসুম: ‘না।’ মেয়েটি, ‘তাহলে আমাদের সঙ্গে কোই যাইতেছ?’ কুসুম: ‘জানিনা।’ আরেক মেয়ে: ‘কামে জয়েন দেও নাই, কই যাইবা জান না, তাহলে তো এই শহরে লুটাইয়া যাইবা।’ ‘এই শহরে জোয়ান মাইয়াগো কতো কদর তখন টের পাইবা!’ কান্নাজড়িত কুসুম: ‘না আপা, আমি খুব বিপদে পইরা ঢাকা শহরে আইছি। এইখানে আমার কেউ নাই। থাকনের কোনো জায়গা নাই।’ মেয়েটির জন্য তাদের দয়া হয়। কাজের সময় হয়ে যাচ্ছে বলে তারা কুসুমকে সাথে নিয়ে গার্মেন্টসের উদ্দেশ্যে হাঁটা দেয়। অচেনা কুসুমকে গার্মেন্টসের ভিতরে থাকতে দেবে না। তাই পার্শ্ববর্তী দোকানে বসিয়ে রাখে।
সিনেমাটি জুড়ে একের পর এক কাকতালীয় ঘটনা ঘটে- কাহিনী ও কল্পনাশক্তির দুর্বলতার কারণে পরিচালককে বস্তুত জোড়াতালি দিয়ে এসব ঘটাতে হয় নারী নির্যাতনের কথা বলার জন্য।
কুসুম দোকানে বসে থাকে, এক মেয়ে গার্মেন্টস-কর্মী পাশে এসে বসে, ‘কড়া কইরা এককাপ চা দ্যাও খালা।’ পাশে বসা কুসুমের দিকে তাকিয়ে বলে ‘তুমিও লেট!’ এসময় ঝাঁকড়া চুলের এক ছেলে সিগারেট ধরিয়ে পাশে বসে বলে, ‘ও খালা গার্মেন্টসের মাইয়া বাইরে বইসা ঝিমাই ক্যা? ডিউটি নাই?’ মেয়েটি জবাব দেয়, ‘লেট হইয়া গেছে, ঢুকতে পারি নাই।’ ছেলেটি: ‘ডিউটি করতে চাইলে লও আমার সাথ, খালি খালি দিনটা বরবাদ করবা ক্যান।’ মেয়েটি: ‘তোমাগো লগে বিজনেস নাই। তোমার ওই মফস্বলের দোস্ত আমার এক হাজার টাকা বাঁকি রাইখ্যা গায়েব হইয়া গেছে।’ ছেলেটি জিজ্ঞেস করে, ‘এখন আমার লগে যাইবা নাকি কও?’ মেয়েটি হাত বাড়িয়ে বলে: ‘ট্যাকা এডভান্স’। ছেলেটি টাকা দেয়। মেয়েটি ওর সাথে যেতে যেতে বলে, ‘চলো হ্যান্ডসাম, অহন আমি তোমার ডার্লিং।’ এই ছেলেটির নাম হেলাল, আর তার মফস্বলের বন্ধু হলো রমিজ। একটু পরেই আরেকজন ছেলে গার্মেন্টস-কর্মী এসে বলে, ‘খালা, জলদি এক কাপ চা আর এক প্যাকেট সিগারেট দ্যাও।’ ওর নাম খালেক, গার্মেন্টসের সুপারভাইজার, রমিজের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। সে টাকার বিনিময়ে মেয়েদের গার্মেন্টসে কাজের সুযোগ করে দেয়। বসদের সাথে তার ভালো যোগাযোগ। কাকতালীয় সাক্ষাৎ!
কুসুমের মূল আশ্রয়দাতা ফাতেমা। তার স্বামী প্রাইভেট গাড়ির ড্রাইভার। অন্য দুজন মেয়ে আগে থেকেই থাকা-খাওয়ার টাকা দিয়ে ফাতেমাদের সাথে থাকতো। এখন কুসুম এসে জুটলো। অভাবের সংসার, কুসুমের চাকরির কথা ওঠে। তবে খালেকের কাছে তারা ধর্ণা দেয় না। কারণ দুই হাজার টাকার কথা বলে সে পাঁচ হাজার টাকা ‘ফিস’ আদায় করে নেয়। ফাতেমা বরং কুসুমকে নিয়ে সেরাতেই স্টোর সুপারভাইজার দোলনের কাছে যায়। কারণ সে ভালো মানুষ, মালিকের বিশ্বাসী লোক। দোলন একই বস্তির বাসিন্দা। কুসুমকে দোলনের মনে ধরে। ফাতেমা আগামীকালই মালিকের কাছে কুসুমের জন্য চাকরির কথা পাড়তে অনুরোধ জানায়, বেকার বসে থেকে কী লাভ। দোলন বলে, বসে থাকবে কেন তার পাকসাক করে দেবে। এ প্রস্তাবে ফাতেমা-কুসুম দুজনেই সাই দেয়।
পরদিন দোলন স্টোরের মালামালের হিসেব করছে। একজন খবর দেয়, ‘স্যার বড় স্যার আপনারে ডাকছে’। দোলন তার সহকারীকে বলে, ‘কাজ শেষ করে আমার রুমে দেখা করবেন, ওকে। সে এমনভাবে ‘ওকে’ শব্দটি উচ্চারণ করে যা অন্তত দোলনের পর্যায়ের চাকুরের মুখে বেমানান। মালিক তাকে সমাদর করে বসিয়ে বলেন, ‘আপনাকে ডেকেছি একটা জরুরি প্রয়োজনে। আমাদের পার্চেজ ডিপার্টমেন্টে বেশ কিছুদিন ধরে কিছু অনিয়ম চলছে। ... এ্যডমিন সেকশনে আপনাকে পাঠাতে চাই।’ অনেক বড় পোস্ট, বেশ কয়েকটা ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার কথাও তিনি বলেন। এসময় দোলন কুসুমের চাকরির কথা পাড়েন এবং তখনই মালিক সুপারভাইজার খালেককে ফোন করে খোঁজ নেন কোনো পোস্ট খালি আছে কিনা। তিনি তখনই দোলনের হাতে একটা নিয়োগপত্র দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। কাকতালীয় বটে! এ-নিয়ে খালেকের সাথে দোলনের এক চপট ঝগড়াও হয়। কারণ ওই পোস্টের জন্য খালেকেরও একজন ক্যান্ডিডেট ছিল, ইতোমধ্যেই সে এক হাজার টাকা আগাম নিয়েছে চাকরি দেবে বলে। দোলন হুমকি দেয়, খালেক যেন ভবিষ্যতে আর এরকম দুইনম্বরি না-করে।
মালিকের বিচক্ষণতা ও মহানুভবতা দেখে আমরা মুগ্ধ হই। তাঁর মহত্বের আরও পরিচয়: দোলনের স্ত্রী এসিডদগ্ধ হলে, অনির্দিষ্টকালের ছুটি দেয়া হয়। মালিক নিজে এসে দোলনের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘দোলন সাহেব যতোদিন আপনার স্ত্রী সুস্থ না হচ্ছে ওকে হাসপাতালে এ্যটেন্ড করুন। আপনার চাকরি ঠিক থাকবে।’ আবার স্ত্রীর প্লাস্টিক সার্জারির জন্য দোলন মালিকের কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার করতে যায়। মহান মালিক বরং দোলনকে পঞ্চাশ হাজার টাকা অনুদান দেন। দোলনের মতো ভালো কর্মীর পাশাপাশি খালেকের মতো বজ্জাত কর্মীর দেখা মিললেও, সিনেমাতে মহৎ মালিকের বিপরীত চরিত্রের কোনো মালিকের দেখা মেলে না। যদিও বাস্তবে বেশিরভাগ মালিক শ্রমিকদের অধিক খাটিয়ে নেয়, লাঞ্ছিত করে এবং বেতন-ভাতা দিতে ঠকায় বলেই জানা যায়। এরূপ নির্মাণ আবশ্যই স্বেচ্ছাকৃত- গার্মেন্টস ইসুতে প্রথম আলোর কাভারেজও এরূপ নির্মণকেই ন্যায্যতা দেয়।

ইস্যু ৬: এসিড নিক্ষেপ ও প্লাস্টিক সার্জারি
কুসুম চাকরিতে যোগ দিয়েছে দেড়মাস হলো। এরমধ্যে একদিন সে গার্মেন্টস থেকে বেরিয়ে খালার দোকানে চা খেতে দাঁড়ায়। এসময় রমিজ উপস্থিত হয়ে চেয়ারটাতে বসে, হ্যালহ্যাল করে কুসুমের দিকে তাকিয়ে থাকে এবং ভারী-গলায় বলে, ‘খালা এককাপ কড়া কইরা চা দ্যাওতো।’ রমিজের দিকে কুসুমের চোখ পড়ে। ফ্লাশ-ব্যাকে বাবার কবরের পাশে রমিজের ধর্ষণ-প্রচেষ্টা আবারও দেখানো হয় এবং কুসুম ভয়ে-আতঙ্কে দৌড়ে পালায়। রমিজ কুৎসিতভাবে হাসতে থাকে।
বস্তির মালিকের ঘরজামাই চানমিয়া আর তার স্ত্রী ফরসা খাতুন বসে ভাড়াটিয়াদের লেনদেনের হিসাব মেলাচ্ছে। এ-সময় উকিল আপা ও তার এক সহকর্মী এসে হাজির। আলাপচারিতা দেখে বুঝা যায় তিনি পূর্বপরিচিত। আয়নার প্রথম দৃশ্য শুরু হয়েছিল সেবামূলক প্রতিষ্ঠান অঙ্গনার পরিচালক আফরোজাকে দিয়ে- এখানে তিনিই হলেন উকিল আপা। তিনি এসেই বলেন ‘এলাম নারী নির্যাতনের কেস নিয়ে’। তিনি বুঝিয়ে বলেন, এটা তার প্রতিষ্ঠানের একটা প্রজেক্ট: ‘ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্তরের কর্মজীবী মহিলারা বাড়িতে, রাস্তাঘাটে, বিভিন্ন জায়গায় যেসব নির্যাতনের শিকার তার উপরে আমরা একটা জরিপ চালাচ্ছি।’ আট/দশটা বস্তিতে এ-কাজ সেরেও ফেলেছেন। ‘আপনার বস্তির মেয়েদেরকেও আমরা ফর্ম পূরণ করতে দেব। কাজটা করবে ও, আমাদের প্রতিষ্ঠানের স্টাফ সানজিদা’ বলে তিনি পাশের মেয়েটিকে দেখিয়ে দেন, এব্যাপারে চানমিয়া ও ফরসা খাতুনকে সহযোগিতা করতে বলে সহকর্মীসহ চলে যান।
পরের দৃশ্যে আমরা দেখি রাত হয়েছে, কুসুম কাজে না-গিয়ে বস্তিতে বসে আছে। সে গার্মেন্টসে যেতে চায় না রমিজের ভয়ে, ফাতেমা ও অন্যরা কাজ থেকে ফিরে এলে সে একথা জানায়। পর মুহূর্তেই আমরা দেখি রমিজ চারজনের একটা দল নিয়ে এসে হাজির। ফাতেমা ও কুসুম ঘর থেকে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। রমিজ বলে, ‘কেমন আছ কুসুম? আমি তোমারে নিয়া যাইতে আসছি, চলো লক্ষিসোনা।’ জহুরা দোলনকে খবর পাঠায়। রমিজের সাথে-আসা খালেক বলে, ‘আমরা কোনো অন্যায় কাম করতে আসি নাই। আমার দোস্ত রমিজ, ও আইছে ওর বিয়ে করা বউ কুসুমরে লইয়া যাইতে।’ কুসুম: ‘মিছা কথা ফাতেমা বু, সব মিছা কথা।’ এসময় বস্তির মালিক চানমিয়া বেড়িয়ে আছে, এতো রাতে কে মাস্তানি করতে এসেছে এটা সে মেনে নেবে না। সে হম্বিতমি করে, কুসুমকে বলে, ডরাইস না। এসময় গাড়ির হর্ন বাজিয়ে কাকতালীয়ভাবে উকিল আপাও দৃশ্যপটে হাজির হন। চানমিয়া বলে, ‘আহেন উকিল আপা আহেন, তামশাটা দ্যাহেন। এরা আইছে আমার ভাড়াইট্টা মাইয়াডারে তুইলা নি]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28996136 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28996136 2009-08-19 00:47:07
বুদ্ধিবৃত্তির বিকার: মেরিল-প্রথম আলো চলচ্চিত্র ‘সমালোচক পুরস্কারের’ রাজনৈতিক অর্থনীতি১
সংগীত, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার দেয়া হচ্ছে গত কয়েক বছর। নারী ও পুরুষ বর্গে পাঠক জরিপের মাধ্যমে সেরা কণ্ঠশিল্পী, সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রী; সেরা চিত্রনাট্যকার, সেরা পরিচালক, সেরা চলচ্চিত্র ইত্যাদি নির্বাচন করে পুরস্কৃত করা হয়। তদুপরি, একগুচ্ছ জুড়ি বোর্ডের মাধ্যমেও এসব বর্গে পুরস্কার দেয়া হয়। এ পুরস্কার ‘বিরল সম্মানজনক’- এ নিয়ে প্রথম আলো স্লাঘা বোধ করে, আর যারা পুরস্কৃত হন তারাও গর্বে ফেটে পড়েন।২ যেমন অভিনয় শিল্পী সোহানা সাবা বলেন, ‘সবচেয়ে সম্মানজনক মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিলাম।’ আর, কণ্ঠশিল্পী আসিফ বলেন ‘আগেও বলেছি, এখনো বলছি, বাংলাদেশের অস্কার হলো মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার।’ (‘আনন্দ’ প্রথম আলো ৫ এপ্রিল ২০০৭) শিল্পীদের মুখনিসৃত এরূপ ধারণা প্রথম আলোর পাতায় প্রকাশের মানে হলো পত্রিকা কর্তাব্যক্তিরাও পুরস্কারের গুণমান নিয়ে অনুরূপ ধারণা পোষণ করে সুখ পান।

এ-প্রবন্ধে অনুসন্ধানের বিষয়: মেরিল-প্রথম আলো ‘চলচ্চিত্র সমালোচক পুরস্কার’। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার-২০০৬ প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয় ২০০৭ সালের এপ্রিলে। মেরিল-প্রথম আলো নিয়োজিত ‘সমালোচকদের দৃষ্টিতে’ সেরা-চলচ্চিত্র বর্গে প্রাথমিকভাবে মনোনিত হয়: তারেক মাসুদ প্রযোজিত অন্তর্যাত্রা, ফরিদুর রেজা সাগর প্রযোজিত আয়না এবং দিদারুল আলম প্রযোজিত নন্দিত নরকে। এই ছবিগুলো থেকে ‘সমালোচকদের রায়ে’ শ্রেষ্ঠত্ব পায় আয়না। এই সমালোচকগণ সেরা চলচ্চিত্র অভিনয়শিল্পী (নারী) হিসেবেও নির্বাচিত করেন আয়নার কেন্দ্রীয় চরিত্র-অভিনয়কারী সোহানা সাবাকে। চলচ্চিত্র সমালোচক পুরস্কারের জন্য গঠিত জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন কবি-ঔপন্যাসিক-চিত্রনাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক; সদস্য ছিলেন শিবলী সাদিক, বাদল রহমান, সাইদুল আনাম টুটুল এবং শামিম আকতার।

কোন বিচারে এবং কেন আয়নাকে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচিত করা হলো তা এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় জিজ্ঞাসা।৩ অর্থাৎ, চলচ্চিত্রটির টেক্সটের কী ধরনের উৎকর্ষতার গুণে এবং/বা কোন সম্পর্কগুলোর সূত্রে আয়না প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত অন্য দুটো চলচ্চিত্রকে টপকে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পায় তাই এখানে মূল অনুসন্ধান-আগ্রহ। সেরা চলচ্চিত্র অভিনয়শিল্পী (নারী) হিসেবে আয়নার কেন্দ্রীয় চরিত্র-অভিনয়কারী সোহানা সাবাকে নির্বাচনের বিষয়টিও এই একই উদ্দেশ্য থেকে অনুসন্ধান করবো। এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমি প্রথমত চলচ্চিত্র তিনটির কাহিনী (ন্যারেটিভ, নির্মাণ শৈলী, ইমেজ) বিশ্লেষণ করবো; দ্বিতীয়ত চলচ্চিত্র তিনটির মধ্যে একটা তুলনামূলক আলোচনা করবো শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের সুলুক সন্ধান করতে; এবং তৃতীয়ত, আয়নার বয়ান ও আয়নার নির্মাতাদের সাথে মেরিল-প্রথম আলোর মতাদর্শ ও এজেন্ডার সম্পর্ক সন্ধান করবো। সহজ কেন্দ্রীয় জিজ্ঞাসাটির জটিল উত্তর বস্তুত অনেকটাই লুকিয়ে আছে চলচ্চিত্রগুলোর কনটেন্টের ভিতরে। তাই প্রথমেই চলচ্চিত্রগুলোর কনটেন্টের মাধ্যমে নির্মিত বয়ান অনুসরণ করে এগোবো। তবে, নন্দিত নরকে এবং অন্তর্যাত্রার বয়ানের খুঁটিনাটির দিকে যাব না, আয়নার বয়ান ও খুঁটিনাটি বিচার-বিশ্লেষণ করবো, যেহেতু এ-প্রবন্ধের মূল জিজ্ঞাসা ‘চলচ্চিত্র সমালোচক’ পুরস্কার এবং পুরস্কারটি পেয়েছে কবরী সরোয়ারের আয়না।

নন্দিত নরকের মানুষগুলো
বাংলাদেশের অসামান্য জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ-এর প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরকে থেকে নির্মিত হয়েছে নন্দিত নরকে চলচ্চিত্রটি। কাহিনী, সংলাপ ও চিত্রনাট্য লিখে দিয়েছেন স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদ। আর পরিচালনা করেছেন বেলাল আহমেদ। কাহিনী একজন মানসিক প্রতিবন্ধী কিশোরীর। এটুকু বললে নন্দিত নরকের কাহিনী সম্পর্কে কিছুই বলা হয় না। চার সন্তান, পিতা-মাতা ও একজন লজিং মাস্টারকে নিয়ে মফস্বলের নিম্নমধ্যবিত্ত ভদ্র পরিবারে বাবা-মার বড় সন্তান প্রতিবন্ধী রাবেয়া নিবিড়ভাবে সংলগ্ন। এই পরিবারের আটপৌরে জীবনের ক্লেদ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সাধ-আহ্লাধ, প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে সংকট সবই ফুটে ওঠে সংলাপ ও ভিস্যুয়ালের ভিতর দিয়ে- আর সব মিলে একটা দুর্দান্ত কাহিনী বিকশিত হয়ে পরিণতির দিকে এগিয়ে চলে।

অন্ধকার রাতে মাস্টার ঠকঠক শব্দে পায়চারি করেন উঠোনজুড়ে। বাচ্চা মেয়েরা ভয় পায়, বাবার গলা শোনা যায়, ‘আরে ও মাস্টার, কী করো এতো রাতে? ছেলেপেলেরা ভয় পায়, ঘুমাতে পারছে না, ...ঘরে যাও।’ মাস্টার চিরকুমার। এই পরিবারটিতে থাকে, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করায়। ছিমছাম পরিবারে চারটি সন্তান, বড় সন্তান রাবেয়া মানে রাবু, তার ছোট খোকা, মন্টু আর রুনু। পরদিন মাস্টার খোকা আর রুনুকে নিয়ে ছাদে বসে গামলার পানিতে সূর্যের প্রতিফলন থেকে সূর্যগ্রহণ দেখে। এসময় রাবু নিচে থেকে ‘সাপ সাপ, এই তোরা নিচে নেমে আয়, মন্টু একটা সাপ মেরেছে, মন্টু বিরাট একটা সাপ মেরেছে’ বলে চিৎকার করতে করতে ছাদে উঠে আসে এবং এক ছুটে ফিরে যায় সাপের কাছে। সবাই আসে সাপ দেখতে। মন্টু লাঠির ডগায় মৃত সাপটি ঝুলিয়ে দেখায়। রাবু জোরে জোরে বলতে থাকে, ‘মন্টু এটা কিন্তু তুই নিবি না, এটা কিন্তু আমার সাপ।’ তারপর সে মন্টুর হাত থেকে সাপ-ঝোলা লাটিটা নেয়: ‘এই, সাপটা আমার কাছে দে, এটা আমার সাপ।’ ‘এটা কিন্তু আমার সাপ’ বলতে বলতে অনেকক্ষণ লাফিয়ে বেড়ায়। মা রান্নায় বসেছেন, পাশে বাবা, মা বলেন, ‘এতোবড় সাপ বাড়িতে ঢুকলো কী করে!’ বাবা: ‘বাস্তু সাপ।’ মা শঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘সাপ তো জোড়ায় জোড়ায় থাকে, এর জোড়াটা তো বেঁচে আছে, সেটা যদি মন্টুকে কামড়ায়?’ একটু পরে দেখা যায়, রাবু লম্বা একটা নালা খোঁড়ে সাপটা কবর দেবার জন্য। সে জিজ্ঞাসা করে: ‘মাস্টার চাচা, এটা মেয়ে না ছেলে সাপ?’ মাস্টার উত্তর দেয়, ‘ছেলে’।

আমার মনে হয়েছে, নন্দিত নরকের পুরো কাহিনীটাই প্রতীকায়িত হয়েছে এইটুকু টেক্সটে- এবং চমৎকারভাবে। মা রাবেয়ার শাড়ীতে সেফটি-পিন লাগাচ্ছেন, আর রাবেয়া দুলছে। রুনু স্কুলে যাওয়ার আগে মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাবেয়া মাকে বলে, ‘তুমি আমার কাপড়ে এতো সেফটিপিন লাগাও, রুনুর কাপড়ে তো লাগাও না।’ মা: ‘তুই কাপড় ঠিক রাখতে পারিস না, শরীর দেখা যায়।’ রাবেয়া: ‘শরীর দেখা গেলে কী হয়?’ মা: ‘শরীর দেখানো ভালো না রে মা।’ রাবেয়া: ‘কেন ভালো না?’ মা আর জবাব দেন না, একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার গলা দিয়ে। রাবেয়া অসংখ্য সেফটিপিন লাগানো নিজের শরীর এঁকেবেঁকে দেখে, কিন্তু তার তো জবাবটা চাই। সে অধ্যয়নরত খোকাকে গিয়ে প্রশ্ন করে, ‘খোকা বলতো শরীর দেখানো ভালো না কেন, ব...ল...না?’ খোকা পড়ায় মনোযোগ দিতে না-পেরে ‘ধ্যাত্তরি’ বলে বই-হাতে ছাদে চলে যায়। রাবেয়া ঝপ করে ফাঁকা চেয়ারটাতে বসে কী-যেন ভাবে এবং দুহাত ছুঁড়ে টেবিলের বইগুলো এলামেলো ছিটিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে ধপধপ পায়ে ছাদে উঠে যায়, দূর থেকেই খোকাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছোঁড়ে, ‘এই তুই আমার কথার জবাব দিলি না কেন? জবাব না দিলে কিন্তু তোর হাত থেকে বই নিয়ে আমি নিচে ফেলে দেব।’ বলেই সে খোকার হাত থেকে বই কেড়ে নিয়ে ফেলে দিতে উদ্যত হয়। এসময় গলিতে ট্রাকের হর্ণ বেজে ওঠে, পাশের শান্তি কটেজে নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। রাবেয়ার মনোযোগ সেদিকে সঞ্চালিত হয়।

এই বড়লোক প্রতিবেশী পরিবার তিন সদস্যের- মা, এক ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেটির নাম হারুন। ছেলেটি আসবাবপত্র নামানো তদারকি করছে। রাবেয়া ছেলেটার কাছে গিয়ে, কোনো জবাব প্রত্যাশা না-করেই হয়তো, বলে, ‘আপনারা এই বাড়িতে নতুন এসেছেন? আপনার নাম কি? আমার নাম রাবেয়া। ছাদে যে হাঁটছে সে আমার ভাই, তার নাম খোকা।’ বলেই সে ছুটে-ছুটে নানা জিনিসপত্র দেখতে থাকে। গ্রামোফোন নামানো হলে জিজ্ঞাসা করে, ‘ওটা কি?’ ছেলে বলে, ‘ওটা গ্রামোফোন।’ রাবেয়া: ‘আপনাদের গ্রামোফোন আছে! আমাদের নেই। খোকা যখন পাশ করে চাকরি করবে তখন কিনে দেবে বলেছে।’ ফিরে এসে খোকাকে ডেকে তার জেনে-আসা খবরগুলো জানায়: শান্তি কটেজে নতুন ভাড়াটে এসেছে, ওরা অনেক বড়লোক, ওদের গ্রামোফোন আছে, বড় একটা আয়না আছে। খোকার কাছে আবদার করে, ‘তুই আমাকে বড় একটা আয়না কিনে দিবি, আমি চুল আঁচড়াবো?’ খোকা চাকরি পেলে বড় আয়না কিনে দেবার আশ্বাস দেয়, আর রাবেয়ার মুখ এক অদ্ভুত বিরল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে- আমার এই প্রতীকি ভাষায় ওই হাসির সৌন্দর্য প্রকাশ করা অসম্ভব, ভিস্যুয়াল মাধ্যমে যার প্রকাশ অনায়াসসাধ্য। যারা মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন নন্দিত নরকে এবং রাবেয়া চরিত্রটির প্রকাশ-ঢঙ লক্ষ্য করেছেন তারা বুঝবেন আশা করি।

রাতে উঠোনে পাটি পেতে বসে মাস্টার তারা দেখেন, গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য করেন, আর বইয়ের সাথে মিলিয়ে নেন। বাবাকে ডেকে কাছে বসিয়ে তারা চেনান। বাবা বলেন, তারা দেখে কী হয়, সংসার দেখে কূল পাইনা, আবার তারা! মাস্টার একটা দূরবীন কিনে মজা করে তারা দেখার জন্য টাকা জমায়। বাবা হেঁয়ালী করেন, ‘কেনো, কেনো দূরবীন কেনো, তারা দেখো।’ মন্টু বাসায় ফেরে। সাইকেল তার নিত্য সঙ্গী। খোকা পড়ালেখায় ব্যস্ত, কাল থেকেই তার এমএসসি পরীক্ষা শুরু। রুনু রাবেয়ার কাপড়ে সেফটিপিন লাগায়, আর রাবেয়া ওকে প্রতিবেশীদের গল্প শোনায়- ওদের অনেক কিছু আছে, ওরা অনেক বড়লোক। প্রতিবেশীর বাড়িতে গ্রামোফোন বেজে ওঠে, ‘মদিনাবাসী প্রেমে ধরো হাত মম’। নজরুল গীতি। গানের সুর কানে যেতেই রাবেয়া শান্তি কটেজের নিকটবর্তী জানালায় ছুটে গিয়ে গভীর আগ্রহে গান শোনে।

রাবেয়া যায় পাশের বাড়ি বেড়াতে। হারুনের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করে, ‘আমাকে চিনেছেন, চেনেননি, আপনার সাথে তো আমার দেখা হয়েছিল!’ সে রাতে শোনা পুরো গানটি গেয়ে শোনায়। বিস্মিত হারুন প্রশংসা করতেই বলে, আমি খুব সুন্দর পুতুলও বানাতে পারি...। রাবেয়ার কাঁধের কাপড় থেকে একটা সেফটিপিন খুলে যায়। সে হারুনকে লাগিয়ে দিতে বলে। কারণ সেফটিপিন খুলে গেলে মা রাগ করে। সে জিজ্ঞাসা করে, বলুনতো আমার কাপড়ে কত্তোগুলো সেফটিপিন আছে? হারুন বলতে পারে না। সে তখন আনন্দে বলে, ‘ছত্রিশটা’। আবার বলে, ‘বলুনতো এত্তোগুলো সেফটিপিন কেন?’ হারুন বলতে পারে না। তৎক্ষণাৎ রাবেয়া গড়গড় করে বলে দেয়, ‘সেফটিপিন না লাগালে আমার শাড়ি খুলে যায়। সেটা খুবই লজ্জার।’ তারপর কাউকে না-বলার শর্তে হারুনকে একটা গোপন কথা বলে, ‘আপনাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে, আচ্ছা আপনার নাম কী?’ রাবেয়াকে হারুনের ভালো লাগে।

একদিন রাতে মাস্টার বারান্দায় বসে খোকার হাত দেখছে, ভূতভবিষ্যত বলছে। রাবেয়া এলামেলো পোশাকে এসে বলে, ‘মাস্টার চাচা বলুন না আজ বৃষ্টি হবে কি হবে না, আমি গরমে সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছি।’ বলেই সে নিজের ঘরে ঢুকে শাড়ি খুলে আঁচল দিয়ে বাতাস করে। মা এসে থাপ্পর কষে কাপড় ঠিক করে দেয়। প্রবল বৃষ্টি নামে, রাবেয়া বৃষ্টির মধ্যে নেচে বেড়ায়, গায়ে পাতলা কাপড় আটকে থাকে। মাস্টার তখনও খোকার হাত দেখে চলেছেন। তার ধারালো দৃষ্টি রাবেয়ার শরীরে আটকে যায়। খোকার দৃষ্টি এড়ায় না। সে উচ্চস্বরে বলে, ‘রাবু এই রাবু ঘরে যা। এই রুনু রাবুকে ঘরে নিয়ে যা।’ রুনু রাবেয়ার গায়ে গামছা পেঁচিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বোঝা যায় মাস্টারের মনের মধ্যে বিষাক্ত সাপ জেগে উঠছে, সুযোগ পেলেই ছোবল দেবে।

বৃষ্টির সময় ওবাড়িতে গ্রামোফোন বাজে, রবি ঠাকুরের ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে।’ দৃশ্যায়নের সাথে গানটা হয়তো মানানসই, কিন্তু গায়কী নয়। পরিচালক দেখান গ্রামোফোন বাজছে, কিন্তু আমরা শুনি পাপিয়া সরোয়ারের গলা। যে-সময়ের কাহিনী সে-সময় কি পাপিয়া সরোয়ার গান গাইতেন? তিনি গ্রামোফোনে আদৌ কখনো রেকর্ড করেছেন কি?

হারুনের মা ছেলেকে পাত্রীর ফটোগ্রাফ দেখান। হারুন বিশেষ উৎসাহ না-দেখিয়ে জানায় সে নিজের পছন্দের কোনো একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। মন্টু নাটাই-ঘুড়ি নিয়ে সাইকেলে বাড়ি ফিরছে, রাবেয়া সেই ঘুড়ি নিয়ে চলে আসে হারুনদের বাড়িতে, হারুন রাবেয়ার সাথে ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে যায়। গৃহকত্রীর বুঝতে বাকি থাকে না কাকে ছেলের পছন্দ হয়েছে। তিনি রাবেয়াদের বাড়িতে গিয়ে তার মাকে ‘পাগল মেয়ে’ লেলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করে যা-তা বলেন এবং আঙুল উঁচিয়ে শাসিয়ে আসেন যে এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি ছেলেকে বিয়ে দেবেন, রাবেয়াকে যেন আর ওবাড়িতে না-যেতে দেওয়া হয়। ওদিকে হারুন ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে রাবেয়াকে বলে, ‘আচ্ছা তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে?’ রাবেয়া বলে, ‘তাহলে তো আমাকে বিয়ের শাড়ি কিনতে হবে, বিয়ের শাড়ি না কিনলে বিয়ে করব কিভাবে?’ ‘নাটাই-ঘুড়ির’ স্বপ্ন আর হারুনের পূরণ হয় না।

মায়ের ইচ্ছেমাফিক হারুনের বিয়ে হয়ে যায়। রাবেয়াকে তার আত্মসম্মানবোধ-সম্পন্ন মা ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখেন। রাবেয়া বোঝে না কেন তাকে তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছে। সে বিছানা ওলটপালট করে সবাইকে ডেকে তালা খুলে দিতে বলে কান্নাকাটি করে। দেবদূতের(!) মতো আসেন মাস্টার চাচা। রাবেয়া বাইরে বেরিয়েই বলে, ‘আহ বাঁচলাম! মাস্টার চাচা আমি কি ভেবেছিলাম জানেন, আমি ভেবেছিলাম আমার দরোজা কেউ খুলবে না।’ মাস্টার বলেন, ‘আজ তোকে নিয়ে ঘুরবো। তুই কোথায় যেতে চাস বলতো? নৌকায় করে ঘুরবি, এ জার্নি বাই বোট হা হা..।’ রাবু মাস্টার চাচার হাত ধরে বেরিয়ে যায়। নৌকায় ওঠে। কিন্তু সে বোঝেনা তার মাস্টার চাচা কী কুৎসিত পরিকল্পনা এঁটে তাকে বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে। নৌকায় উঠে রাবেয়া দূরে মন্টুকে দেখে ডাকে, ‘ যাবি আমাদের সাথে বেড়াতে।’ মন্টু ‘না’ বলে চলে যায়। রাবেয়া ছইওয়ালা নৌকার ভিতরে বসে, মাস্টার অনেকখানি নৌকা বেয়ে ভেতরে ঢোকেন এবং ছইয়ের পর্দা ফেলে দেন।
এঘটনায় রাবেয়ার মন খুব খারাপ হয়। সে কাউকে বুঝাতে পারে না, নিজেও বোঝে না। খোকা, মা, মন্টু কারো কাছে পাত্তা পায় না। এরপর আমরা দেখি সে কঞ্চি হাতে বাতাসে বাড়ি মারছে আর উঠোনজুড়ে ঘুরে ঘুরে বলছে ‘আমার মন খারাপ’। হারুনের বৌ আসে রাবেয়াদের বাড়িতে, রাবেয়াকে বলে, ‘তোমার নাম রাবেয়া, না?’ রাবেয়া প্রশ্ন করে, ‘তুমি কে?’ বৌ: ‘তোমার হারুন ভাই আমাকে বিয়ে করেছে, আমি তোমাকে দেখতে এসেছি।’ বৌ বলে, আমার সাথে এসো তোমাকে সাজিয়ে দেব। রাবেয়া: ‘কিন্তু আমি তো তোমার সাথে যেতে পারব না, আমার নিষেধ আছে।’ হারুন বিদেশ চলে গেছে। বৌ বলে আর কোনো নিষেধ নাই, তোমার যখন ইচ্ছে ওবাড়িতে যাবে। তখন রাবেয়া আনন্দে লাফিয়ে ওঠে ‘এতাক্ষণ আমার মন অনেক খারাপ ছিল, এখন আমার মন অনেক ভালো’ বলে সে বৌটির সাথে ওবাড়িতে সাজতে চলে যায়।

একদিন শান্তি কটেজের ছাদে হারুনের বোন, রাবেয়া ও বৌ মিলে খেলছে। রাবেয়ার বমি আসে। সে রেলিং ধরে বমি করে, শরীর খারাপ। ‘আর খেলবো না, হু’ বলে রাবেয়া নিজের বাড়ি চলে আসে। রাতে রাবেয়া অনেক কষ্ট পায়। (লাইটের কাজ খুবই দুর্বল) রুনু জেগে বোনের বমি করা দেখে মাকে ডাকে। মা শঙ্কিত হন। বাবা চিন্তিত হন, তবু ভাবেন হয়তো কোনো কারণে শরীর খারাপ হয়েছে, ঠিক হয়ে যাবে। মাস্টার ততোদিনে দূরবীন কিনেছেন। মজা করে নিহারিকাপুঞ্জ দেখেন, বাবাকে ডেকে পাশে বসিয়ে বোঝান, ‘...আমরাও সৌরজগতের একটা পার্ট।’ কিন্তু বাবার মন মেয়ের চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।

মা ঘরে সিটকিনি তুলে দিয়ে রাবেয়াকে বিছানায় ফেলে দেয়, ‘বল কে তোর গায়ে হাত দিয়েছে’। রাবেয়া বোঝে না মায়ের প্রশ্ন, বলে ‘তুমি হাত দিয়েছ’। মা থাপ্পর মারে, কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘বল মা কে তোর গায়ে হাত দিয়েছে?’ রাবেয়া: ‘জানিনাতো’। বাইরে বসে-থাকা রুনু সব বুঝতে পেরে কাঁদে। মন্টু বাড়িতে ফিরে রুনুর গায়ে হাত দিয়ে বলে, ‘কাঁদছিস কেন, কী হয়েছে?’ সেও মায়ের গলা শুনতে পায়, বুঝে যায় রাবেয়ার কী হয়েছে। পরিবারের, মেয়ের ইজ্জত বাঁচাতে হবে। বাবা-মা মিলে এক গ্রাম্য আয়া ডেকে আনে মেয়ের পেট খালাস করতে। আয়া তার কাজ সেরে চলে যায় রাত নটায়। বাবা বাইরে বসে তসবি জপেন। কিন্তু রাবেয়ার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে, রক্তে মেঝে ভেসে যায়। রাবেয়া নিস্তেজ কণ্ঠে বলে, ‘বাবা, আমি কি মরে যাচ্ছি, আমার বুকটা খালি খালি লাগছে কেন? ...বাবা...রুনু কই, মন্টু কই বাবা...’। বাবা ছুটে যান বাইরে, মাস্টারকে ডাক্তার ডাকতে বলেন। ডাক্তার আসে, বলেন এখনই হাসপাতালে নিতে হবে। বাবা-মা মানসম্মানের ভয়ে রাজী হন না। ডাক্তার চলে যান। মাস্টার মন্টুর পাশে চেয়ারে বসে মাথায় হাত বুলান। উঠোনের একদিকে রুনু আর খোকা বসে। বাবা আবার বেরিয়ে এসে খোকাকে বড় কোনো ডাক্তার আনতে বলে মেয়ের কাছে ফিরে যান। ভোর হয়ে আসছে, ডাক্তার আনতে যাবার আগেই রাবেয়ার মৃত্যু ঘটে। বাবা শক্ত একখণ্ড পাথরের মতো বাইরে এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে ‘রাবেয়া মারা গেছে, আমার বড় মা মারা গেছে’ বলেই জ্ঞান হারান। ওদিকে মন্টু এখবর শুনেই স্থিরপ্রতিজ্ঞভাবে রান্নাঘরে চলে যায়, বটি নিয়ে ফিরে এসে মাস্টারের পাশে দাঁড়ায়, তারপর এক কোপে মাস্টারের গলা নেমে যায়। আমরা মন্টুর হাতের বটি উঠতে দেখি, একটা শব্দ, মন্টুর গালে ছিটকে পরা একটু রক্ত, আর তারপর উঠোনে পড়ে থাকা মাস্টারের নিঃশ্চল হয়ে যাওয়া পা দুটো দেখি।

বিচার চলে আদালতে। মন্টু স্বীকার করে খুন করার উদ্দেশ্যেই মাছ-কাটা বটি দিয়ে কোপ দিয়েছে। কিন্তু কেন খুন করেছে সে প্রশ্নের জবাব দেয় না। বাড়িময় শ্বশানের স্তব্ধতা, কোনো হুল্লোর নেই, বাবা পাথর, মা পাথর, রুনু কাঁদে, খোকা স্তব্ধ। মা রান্না চড়িয়ে মুখে হাত দিয়ে বসে থাকেন, পাশের গাছে কাক ডাকে, মা যেন অশনি সংকেত শুনতে পান। তিনি কাক তাড়িয়ে দেন। মন্টু কারাগারে ফেলে-আসা দিনগুলো স্মরণ করে। রাবেয়া তার স্বপ্নে এসে দেখা দেয়। আদালত ফাঁসির রায় দেয়। বাবা মার্সি পিটিশন করেন, জবাব আসে না। মা বাড়িতে কোরান পড়েন, গভীর রাতে বাবা-খোকা জেলের গেটে অপেক্ষা করেন, মন্টুর লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাবা ভাঙ্গা স্বরে জিজ্ঞাসা করেন, ‘খোকা, মন্টুর ফাঁসি কখন হবে?’ খোকা জবাব দেয় না। স্তব্ধ রাত, একসময় ঝটপট কিছু কাক কা...কা শব্দে উড়ে যায়। বাবা খোকা দুজনেই সেদিকে তাকান, বাবা-খোকা উত্তরও পেয়ে যান।

নন্দিত নরকে সিনেমায় সম্পাদনার দুর্বলতা খুবই চোখে লাগে, কখনো কখনো অতি প্রকট। ক্যামেরার কাজেও দুর্বলতা আছে, যেমন সাপ-মারা উপলক্ষ্যে রুনু পদ্য লেখে: মন্টু ভাই তো মারলেন/মস্ত বড় সাপ/চার হাত লম্বা সেটি/কী তার প্রতাপ।’ এসময় দেখা যায় রুনু খাতা-কলম নিয়ে টেবিলে বসে- খাতার ওপর ক্যামেরা ফোকাস করে, কিন্তু কিছুই দেখা যায় না। গানের ব্যবহারে অন্যায় আছে। দেখানো হয় গ্রামোফোন বাজছে, কিন্তু আমরা সাদিয়া আফরিন মল্লিকের নজরুল সংগীত আর পাপিয়া সরোয়ারের কণ্ঠের রবীন্দ্র সংগীত শুনি। তবু অত্যন্ত শক্তিশালী কাহিনীর কারণে, ডিটেইলের ব্যবহারের কারণে এবং রাবেয়া, বাবা-মা, মন্টু সবগুলো চরিত্রের অভিনয় কুশলতায় এটি সিনেমা হয়ে ওঠে- এক অপরূপ বাস্তবতা তার আনন্দ-ক্লেদ-যন্ত্রণাসহ দর্শকের পরিপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

অন্তর্যাত্রার পরিসর

অন্তর্যাত্রা তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদের দ্বিতীয় কাহিনীনির্ভর চলচ্চিত্র। চিত্রনাট্য দুজনে লিখেছেন। কাহিনীকার তারেক মাসুদ নিজে। বৃটিশ কাউন্সিল ও হুবার্ট বলস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় নির্মিত অন্তর্যাত্রা বাংলাদেশে ডিজিটাল ফরম্যাটে তৈরি প্রথম চলচ্চিত্র। আমি ন্যারেটিভ ধরেই এগোবো, এর বিন্যাস ও পরিসর পর্যালোচনা করবো। যে ডিভিডি থেকে লিখছি তার কভারে কাহিনী সম্পর্কে বলা আছে,

অন্তর্যাত্রা মিশ্রসংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা স্থানচ্যুত মানুষের শিকড় সন্ধানের গল্প। প্রাক্তন স্বামীর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে লন্ডন প্রবাসী মা ছেলে সোহেলকে নিয়ে ১৫ বছর পর দেশে ফেরে। এই ফেরার মধ্য দিয়ে সোহেলের বাবা সম্পর্কে মা-ছেলের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘ নীরবতার অবসান ঘটে। অন্যদিকে পাঁচ বছর বয়সে ছেড়ে যাওয়া প্রায় অপরিচিত নিজের বৃহত্তর পরিবার, দেশ ও সংস্কৃতির সাথে সোহেলের পরিচয় ঘটে। সিলেট ও পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠা শিরিনের জন্য এই ফিরে আসা একই সঙ্গে নস্টালজিয়া এবং ছেড়ে যাওয়া সম্পর্কগুলোর মুখোমুখি হওয়ার ভাবনায় মিশ্র অনুভূতির। পাশাপাশি এই যাত্রা- পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্ম এবং সংস্কৃতিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

শুধু এইটুকু? সিনেমার ইমেজ-শব্দে-ভাষায় যে টেক্সট হাজির তার ব্যাখ্যা কী? অন্তর্যাত্রায় উপস্থিত টেক্সট অনুপস্থিত কোন কোন টেক্সটকে সম্পৃক্ত করে? এ-কাহিনীর মাধ্যমে পরিচালকদ্বয় কী বলতে চেয়েছেন?

লন্ডনের পরিপাটি বাসায় সদ্য এক বাঙালি কিশোর ল্যাপটপে অনলাইনে চ্যাট করছে। ফোন বাজে। মা ফোনসেট থেকে দূরে, ছেলেকে ফোনটা ধরতে বলছেন। ছেলেটি জানায় সে ফোন ধরতে পারবে না, ব্যস্ত আছে। হন্তদন্ত মা এসে ফোনটা ধরেন। তার বড়ভাই খালেদ ঢাকা থেকে ফোন করে খবর দেয় ছেলেটির বাবা মারা গেছেন। ফোনালাপে উদ্বেগ আঁচ করে ছেলে সোহেল মার কাছে এসে দাঁড়ায়, প্রশ্ন করে, হোয়াট হ্যাপেন্ড? আঙ্কেলের কিছু হয়েছে? কেউ কি মারা গেছে? মা বলেন, ‘ইটস ইওর ফাদার।’ মা ছেলের মুখে হাত বুলিয়ে জানায়, ‘তোর বাবাই আর নাই...’

ছেলে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ল্যাপটপের কাছে ফিরে যায়, কম্পিউপার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, বেশ কিছুক্ষণ অব্যবহৃত কম্পিউটার-স্ক্রিনে ‘স্টার ফিল্ড’ স্ক্রিনসেভার দেখা যায়- যেন একটি নভোযান দ্রুতবেগে ছুটে চলেছে। প্লেন টেকঅফ ও ল্যান্ডিংয়ের শব্দ। এসময় ছবির নাম, পরিচালক ও অভিনয়-শিল্পীদের নাম দেখানো হয়। তারপর জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটা মাস্টার সর্ট। মা-ছেলে খালেদের সাথে বেরিয়ে আসে বিমানবন্দর থেকে। এখান থেকেই কাহিনীর শুরু, কিংবা বলা চলে, পরিচালকদ্বয় বাংলাদেশ, এর সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় সন্ধানের যে গল্প বলতে চান তার যাত্রা শুরুযে যাত্রা নতুন ঢাকা, পুরান ঢাকা হয়ে ট্রেনে চেপে সৌন্দর্যমণ্ডিত সিলেট অভিমুখী। এর পাত্রপাত্রীরা ইংরেজি ও সিলেটীর মিশ্রণে কথা বলে।

পনেরো বছর আগে দেশ ছেড়ে-যাওয়া শিরিন গাড়ি দেখে অবাক হয়: ‘এত্তো গাড়ি’। চারদিক দেখতে দেখতে সে বলে, ‘ইটস টোটালি ডিফারেন্ট কান্ট্রি ফ্রম দ্য ওয়ান আই লেফট!’ খালেদ বলেন, ‘গাড়ি বাড়ছে কিন্তু রাস্তার সাইজ আর বাড়ছে না।’ খালেদ গাড়ি চালাতে চালাতেই ভাগ্নের কাঁধ চাপড়ে বলেন, ‘...রফিক, মানে তোমার বাবা বেশ সংগীত-প্রিয় লোক ছিলেন। উই কেপ্ট ইন টাচ ইভেন আফটার ইওর প্যারেন্টস ডিভোর্স।’ ভিড়ভাট্টা ঠেলে তাদের গাড়ি এগিয়ে চলে। দেখা যায় সুবারু গাড়ি, টেম্পো, ইন্টারসিটি বাস চলছে। একসময় ঘোঁড়ার গাড়িও চোখে পড়ে, বোঝা যায় পুরান ঢাকায় তারা প্রবেশ করেছে। তারপর সরু গলি বেয়ে নিজেদের বাড়ি। সিড় দিয়ে ওাঠার সময় খালেদ শিরিনকে প্রশ্ন করে, ‘দেশে ফিরতে কেমন লাগছে?’ শিরিন বলে, ‘ভালো লাগছে।’ সারা ঘরময় বনেদিপনা। গানের যন্ত্রপাতি, মোটিফ, তৈলচিত্র। বোন ও ভাগ্নেকে নিয়ে খালেদ দোতলার বারান্দায় বসেন। শিরিন পাশের বিল্ডিং দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ওটা কবে উঠলো? খালেদ বলে, এই কিছুদিন, সব হাইরাইজ হয়ে যাবে। সন্ধ্যা ঘনায়, ‘মসজিদের শহর’ ঢাকার দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা হয়। খালেদ ব্যাচেলর, বিয়েই করেনি। লক্ষণ তার সেবাযত্ন করে।
সোহেল ল্যাপটপ খুলে বসে। তার ভাবনার প্রকাশ ঘটে ইংরেজিতে: ‘অবশেষে এখন আমি বাংলাদেশে। ভাবিনি কখনো আসা হবে। এসে মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন এই ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। আমার জনক...ঠিক বাবা ভাবতে পারি না...সে আজ মৃত অথচ ঠিক শোক অনুভব করছি না। কী করে করবো? আমার কাছে সে অনেক আগেই মৃত। মা তাকে তো মৃত করেই রেখেছে। এতোদিন এই নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি। মেনে নিয়েছি,এটাই স্বাভাবিক। অনেক কিছুই আমি জানি না! আমি এখন সবকিছু জানতে চাই। অনেক কিছুই বুঝতে চাই।’

লক্ষণ রাতের খাবার প্রস্তুত করে ডাকে, খালেদ জিজ্ঞেস করে, ‘ভাইগনা আত দিয়া খাইবার অভ্যাস আছেনি।’ শিরিন বলে: ‘আমরাতো আত দিয়াই খাই’। কিন্তু সোহেল বলে, ‘নো, নট অলয়েজ।’ যেন তার প্রশ্ন করা শুরু হয়ে গেছে, এতোদিন যা স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে, এখন তাকে প্রশ্ন করছে। কথা হয়, পরদিন খালেদ সোহেলকে রফিকের দ্বিতীয় স্ত্রী সালমার বাসায় নিয়ে যাবে। আর যেহেতু সিলেটে সালমাদের সাথে দেখা হবেই, তাই শিরিন পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করবে, শহর ঘুরে দেখবে।
সকালে খালেদ ভাগ্নেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, শিরিন রেলিঙে হেলান দিয়ে ওদের যাওয়া দেখে। শিরিন ভাবে: অবাক কাণ্ড, রফিক মারা যাওয়ার কারণে পনেরো বছর বাদে সে দেশে এসেছে কূলখানিতে যোগ দিতে, অথচ মা মারা গেলে বৃটিশ নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য তখন আসতে পারিনি...। চায়ের কাপ হাতে এইসব ভাবতে ভাবতে তার নজর পরে লক্ষণের দিকে। শিরিন ঘুরেঘুরে ঘরবাড়ি, সামনের বাগান দেখে। এটা ওটা প্রশ্ন করতে করতে সে লনে নামে, ‘তুলসি বেদীটা দেখছি এখনও আছে।’ লক্ষণ বলে, ‘হ ওই তুলসি ভীটা আর আমি লক্ষণ দাস, আদি বাড়ির ওই দুইটা চিহ্নই এখন টিকে আছে। বাড়ি বেইচা দিয়া বড় কর্তারা সবতো কইলকাতা গিয়া জানে বাঁচলো। কিন্তু লক্ষণ দাসের কপালে ওই তুলসি গাছের নিয়তিই লেখা আছে।...’

এক শেকড়-সন্ধানী মানুষের কাছে আরেক শেকড়-উপড়ানো মানুষের টেক্সট এসে হাজির হয়। শিরিন বলে, ‘শুনলাম দাসগুপ্তরা নাকি কোলকাতা থেকে বেড়াতে এসেছিলেন?’ লক্ষণ: ‘মাসিমা হের নাতিনাতনিরে লইয়া আইছিল। পুরান কথা কইতে কইতে হে কাইন্দা শ্যাষ।’ শিরিন বলে: হু, নিজের ভিটেমাটি আর নিজের দেশ ছেড়ে কেউ কি যেতে চায়!’ এই দেশ থেকে হিন্দু ধর্মীয়দের ভারত গমণের টেক্সট শিরিন-সোহেলের অন্তর্যাত্রা থেকে খুবই ভিন্ন পরিসরের, কিন্তু অনুসঙ্গ হিসেবে এসে হাজির হয়।

মামা প্রশ্ন করে, ঢাকা শহর তোমার কেমন লাগছে? সোহেল বলে, এখানে তো দেখছি লন্ডনের চেয়েও বেশি হাইরাইজ! মামা বলেন, ‘শুনে ভালো লাগছে, আমার ছাত্র-বয়সের লন্ডন এখনও বদলায়নি। আমরা পশ্চিমা শহরগুলোর ভালোটা পাইনি, খারাপটা পেয়েছি। হাইরাইজ, র‌্যাটরেস, দূষণ, যানজট...।’

গল্পের ছলে বলা হলেও, খালেদের এ-পর্যবেক্ষণের রাজনৈতিক তাৎপর্য গুরুতর। এ যেন ‘ওরিয়েন্টালিস্ট’ চোখে দেখা তৃতীয় বিশ্ব। ‘পশ্চিম দেয় আর আমরা পাই।’ এ-চোখ পশ্চিমের দায় অস্বীকার করে। একটু আগেই যেমন দেশ-ভাগের প্রসঙ্গ এসেছে, কিন্তু হিন্দু-মুসলিম রক্তারক্তিতে ইংল্যান্ডের দায় অনুল্লেখিত থেকেছে। কেন্দ্র-প্রান্তের দেশের সম্পর্ক অনেক জটিল ও ক্লেদাক্ত। মনে পড়বেই, অন্তর্যাত্রার নির্মাণ-খরচ বৃটিশ কাউন্সিল অনেকখানি বহন করেছে।

সোহেলের দেখা হয় সৎ-বোন রিনির সাথে। সালমা ওদেরকে বসতে দেয়, বলে ‘ও নিশ্চয় সোহেল।’ তারপর রিনির দিকে ঘুরে বলে, ‘ও তোমার সেই ভাই, বিদেশে থাকে।’ সালমা প্রস্তাব করে, চাইলে সোহেলরাও কাল তার সাথে এক গাড়িতে যেতে পারে। খালেদ বলে, ট্রেনে বুকিং দেয়া হয়ে গেছে...।’ সোহেল এই উঁচু ফ্লাটের জানালা দিয়ে ঢাকা শহরকে দেখে।

শিরিনও রিক্সায় বেরোয় শহর দেখতে। তার পুরনো স্কুল দেখে, স্টার সিনেমাহল এখনও আছে দেখে খুশি হয়। কিন্তু মুন সিনেমাহলের জায়গায় সুপারমার্কেট উঠেছে। সে এসব দেখে ও স্মৃতি হাতরায়। বলধা গার্ডেনে তার বান্ধবী বিথীর সাথে দেখা করে। নিজের কাহিনী বলে। স্বামী ত্যাগ করে বিদেশ যাওয়া, ছেলের জন্য আর বিয়ে না করা ইত্যাদি। বিথী জিজ্ঞেস করে এতোকিছুর বিনিময়ে শিরিন কী পেয়েছে? শিরিন বলে, ‘স্বাধীনতা’।
বাবার স্মৃতি-সান্নিধ্য থেকে ফিরে সোহেলের মন খারাপ। তার ইচ্ছে কাল রিনিদের সাথেই সিলেট যাবে। কিন্তু শিরিন বলে ‘তোমার মামাই টিকিট কাটিয়া রাখছে’ এবং সে বুঝিয়ে দেয় যে সালমাদের সাথে এক গাড়িতে যেতে অনিচ্ছুক। তখন ছেলে বলে, ‘তোমার ইচ্ছাই সব!’

খালেদ বোন ও ভাগ্নেকে ট্রেনে উঠিয়ে দেন। শহরের ইট-পাথর পেরিয়ে আদিগন্ত সবুজ বাংলাদেশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সোহেল নিবিষ্টভাবে দেখতে ও ভাবতে থাকে: ‘ক্লাসের বন্ধুরা বাংলাদেশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আমি সবসময় বিব্রত বোধ করেছি। বাংলাদেশ আমার কাছে একটা পোস্টকার্ডের বেশি কিছু ছিল না। অনেকটা বাবার মতো, যিনি আমার কাছে একটা ফ্রেমে বাঁধা ছবি মাত্র। এখন সেই পোস্টকার্ডটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সবুজ দিগন্ত নিয়ত বদলে যাচ্ছে...’

সোহেলে এ দেখা একার নয়। শেকড় সন্ধানী সোহেলের চোখ যেন পশ্চিমের চোখ হয়ে যায়। এদেশের বহুরূপতা পশ্চিমের দর্শকদের জন্য উন্মোচিত হয়। এঁকেবেঁকে সবুজ পাহাড় বেয়ে ট্রেন চা-বাগান পেরিয়ে ছুটে চলে...

শিরিন ভাবে: ‘রফিকের কাছ থেকে আমি সোহেলরে বহু দূরে সরাইয়া আনছি। কিন্তু আইজ মনে হয়...রফিক মরে গিয়ে উল্টা আমার আর সোহেলের মধ্যে নতুন এক দেয়াল তুলে দিয়েছে।’ আর সোহেল ভাবে: ‘কেন মা আমাকে বাবার কাছ থেকে দূরে রেখেছিল? আমি বুঝি মা কেন নিজেকে দূরে রেখেছিল...কিন্তু আমাকে কেন? ...আজ সত্যিই মার উপর রাগ হচ্ছে।’

শিরিনের ননদ নাজমা স্টেশনে এসে তাদের নিয়ে যায়এই যাওয়া সিলেটের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যাওয়া। রফিকের বাড়িতে যখন তারা পৌঁছায় তখন মিলাদ চলছে। দাদার সাথে সোহেলের মোলাকাত হয়, যিনি আশা করেন সোহেল একদিন ফিরে এসে বংশের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখবে। মাওলানা তখন বলছেন, ‘দীনের নবী মদিনায় হিজরতে যান, জন্মভূমির পানে নবী বারে বারে ফিরে চান।’ এভাবে শেকড়ে ফেরার তাগাদা প্রতীকায়িত হয়ে বার বার ফিরে আসে। সোহেলের ফুপু সালমা ও রিনির সাথে শিরিনের পরিচয় করিয়ে দেন। দাদা সোহেলের সাথে কোলাকুলি করেন। বলেন, তোমার বয়সে তোমার বাবা ঠিক তোমার মতো ছিল। বিকেলে দাদা নাতি সোহেলকে নিয়ে রফিকের কবর জিয়ারত করেন। তারপর বিকেলের আলোয় দাদা নাতিকে জিজ্ঞেস করেন বৃটিশরা ধর্মকর্ম করে কিনা, চার্চে যাওয়ার টাইম পায় কিনা। বলে, আমি তো বৃটিশ টাইমে চা-বাগানের ম্যানেজার ছিলাম। তখন প্রতি রবিবার তারা চার্চে যেতো। বৃটিশদের ডিসিপ্লিন নিয়ে তিনি মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। নাতিকে নিয়ে বৃটিশদের পুরনো কবরস্থান দেখান। তার মতে ‘তারা [বৃটিশরা] এখানে এসেছিল ভাগ্যান্বেষণে।’ এ ভিন্ন অন্য কোনো ভাষ্য পাওয়া যায় না। ভাগ্য অন্বেষণের সাথে সাম্রাজ্যবাদ, ক্ষমতার কী সম্পর্ক তা এই সিনেমায় আমরা দেখি না। নয়া উদারনৈতিক এই কালে পশ্চিমের সাথে আমাদের সম্পর্কও অনুচ্চারিত পুরো সিনেমায়।

রাতে সবাই একসাথে খেতে বসে। দাদা বলেন, কোই জানি পড়ছিলাম লাইফ ডিভাইডস আস, ডেথ ব্রিংস আস টুগেদার। কিন্তু সোহেলের ফুফা বলেন, ‘কথাটা সবসময় ঠিক নয় বাবা। অনেকসময় মৃত্যু আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিরোধও ডেকে আনে।’ নাজমা বিরক্ত হয় স্বামীকে বলেন, ‘কি সব অলুক্ষণে কথা, থামলাইন!’ দাদা বলেন, আনফরচুনেটলি ইকবাল ইজ নট টোটালি রং। আশা করি আমার মৃত্যু তোমাদের মধ্যে আরও বিভেদ ডেকে আনবে না।’ সবাই মুখ তুলে তাকায়। সোহেল সালাদ চায়। ফুফা ইকবাল আগে থেকেই ক্লাবে মদ খেয়ে টলোমলো ছিলেন, সালাদ দিতে গিয়ে পানিভর্তি গ্লাস ফেলে দেয়। নাজমা ক্ষেপে ওঠে, ‘বদ্ধ মাতাল!’ নাজমাকে লক্ষ করেই তার স্বামী ইকবাল বলে, ‘আমি মাতাল হতে পারি কিন্তু অসৎ নই’। নাজমা ও তার স্বামীর মধ্যে ঝসড়া প্রকট হয়। নাজমা বলে, রফিক তোমার ভাই হলে তুমি আজ এসব কথা বলতে না। ইকবালও তাচ্ছিল্য করে বলে, রফিকের জন্য তোমার আজ এতো ভালোবাসা। রফিক যখন বেঁচে ছিল তখন কোথায় ছিল তোমার এই ভালোবাসা? তুমি তো এটাই চাইছিলে। পরিবারের সংকটের দিকগুলোও উন্মোচিত হয়। বৃহৎ পরিবারের জটিল সম্পর্কসূত্র সোহেলের কাছে পরিষ্কার হতে থাকে।
রাতে উরিয়া শ্রমিকরা গান করে। আর সোহেল ল্যাপটপে বসে লেখে: ‘বাবা তুমি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছো? আমি তোমাকে অনুভব করতে শুরু করেছি। কেন তুমি চলে যাবার পরে তোমাকে অনুভব করছি?’

রাতের ট্রেনে সোহেল ও তার মা শিরিন ঢাকায় ফেরে। পথে শিরিন ছেলেকে ডেকে কাছে বসায়। রফিক প্]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28996105 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28996105 2009-08-18 23:43:57
পদ্য নয়, নাম নাই তাই বিশীর্ণ শাখাগুলো আমার চৈত্রের হাহাকারের মতো
বেদনার্ত হয়ে থাকে
বিপন্ন বিস্ময়ে...

তবু স্বপ্ন দেখি, আহা এখনো স্বপ্ন দেখি
ভোরের সুখতারার দেশে যাব একদিন চলে
আমরা সকলে...

১২ই মার্চ ২০০৯, তালাইমারী। রাজশাহী।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28925624 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28925624 2009-03-17 16:18:55
পদ্য নয়, যদিও পদ্যের মতো: এক আল্লাহ ধারণার ফ্যালাসি
নিরাকার আল্লাহর ভাবনা কীভাবে ভাববো আমি!!!
নিরাকারের সাধনায় মশগুল হতে চাই যদি
কোথায় পাবো তারে??

আমি এক উচ্চারণের চেষ্টা করি,
আমি নিরাকার উচ্চারণের চেষ্টা করি,
আমি আল্লাহ বলে জিকির ধরি ...

আল্লাহ আমার মনে আকার ধারণ করে
যেহেতু উচ্চারণ মানেই আকার।
যেহেতু ভাষা মানেই ধ্বনি-বর্ণ-বাক্য
ভাষা মানে আকার-আয়তন-ওজন এবং
বিভাজন।

ভাষা অনুপস্থিতকে উপস্থিত করে, নিরাকারকে সাকার করে
আমার সকল ভাবনা ভাষার শাসনে বন্দী, নিরাকারের ভাবনাটাও।

তাহলে আমি নিরাকারের সাধনা করবো কীভাবে, কোন মাধ্যমে?
সে কি বর্ণনাতীত,
ভাষার্ধো সদা সঞ্চরণশীল
বায়ুর মতো?
আমার শরীরে সদাই প্রবাহমাণ, প্রাণসরূপে?

যারা নিরাকার আল্লাহ প্রাপ্তির সুসংবাদ দেয়
তারা প্রতারণা করে- নিজের সাথে, পরের সাথে।
কারণ
পাওয়া মানেই তার একটা আকার থাকবে
মনের জগতে কিংবা বাস্তব পরিসরে।

তালাইমারী। ২২শে ফেব্রয়ারি ২০০৯।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28924717 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28924717 2009-03-15 17:38:33
রাতের আঁধারে যেন বিডিআর-এর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ না নেয়া হয়
এইমাত্র খবর পেলাম আমার বন্ধু মেজর রেজা জীবিত আছেন। দরবার হলের ভিতরে। দুপুর থেকে রেজার সাথে আর যোগাযোগ করতে পারিনি। রেজার পরিবার থেকে আমাকে জানানো হলো এই খবর। আর কিছু জানতে পারিনি ভিতরের অবস্থা।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28916341 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28916341 2009-02-25 20:00:53
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে উদ্বেগ কমালেন প্রধানমন্ত্রী
সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে প্রধানমণ্ত্রী বিবেচনাবোধের পরিচয় দিয়েছেন। এবার উচিত ন্যয়বিচার। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28916293 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28916293 2009-02-25 18:19:34
প্রথম কাজ দ্রব্যমূল্য নিয়্ন্ন্ত্রণে আনা, তারপর যু্দ্ধাপরাধীদের বিচার...
আর, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে মনে রাখতে হবে, বাংলার ইতিহাস পুনর্লিখিত হতে চলেছে- তারা যদি আমাদের অনুভূতির সাথে সহমত পোষণ না-করেন তাহলে আমরা র্নিদ্বিধায় বলে দিতে চাই, আমরা নৌকা প্রতীক প্রত্যাখ্যান করতে একটুও অনুশোচনা বোধ করবো না।

বাংলার মানুষেরা আম্তসম্মানবোধে আজ জাগ্রত...তাদেরকে সম্মান করুন, আর বিশ্বের মানচিত্রে আমাদেরকে মাথা উঁচু করে স্থান করে নিতে সহযোগিতা করুন...স্বাধীনতা-যুদ্ধের ৩৭ বছর পরে। আজ যেন আমরা প্রকৃত স্বাধীনতার পরশ পাই!!]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28891151 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28891151 2008-12-31 21:21:34
জনগণের এই রায় আওয়ামী লীগের পক্ষে নয়- গণতন্ত্রের পক্ষে, যুদ্ধাপরাধীমুক্ত বাংলাদেশের পক্ষে
এ-রায় অবশ্য আয়য়ামী লীগের বিজয় ঘোষণা করে না। জনগণ আওয়ামী লীগকে ভালোবেসে ভোট দেয়নি। ভোট দিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে, ভোট দিয়েছে মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে, একইসাথে সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধেও। সামরিকতন্ত্রের সাথে যে বিএনপি ও মোল্লাদের নিবিড় সম্পর্ক তা জনগণ জেনে গেছে- সামরিকতন্ত্রকে পরিছন্ন করারও সময় হয়ে এলো।

জনগণ এই রায় দিচ্ছে একটা স্বচ্ছল-সাবলীল জীবনের জন্য, গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য। আর আমার মনে হয়, জনগণের নিজস্ব এই এজেন্ডা বাজার ব্যবস্থার ক্ষমতাধর কর্পোরেশনগুলোর এজেন্ডার সাথেও মিলে গেছে। একটা অবাধ বাণিজ্যব্যবস্থার জন্য স্বচ্ছল মার্কেট দরকার। কিছুদিন আগে থেকে চলমান বাণিজ্য-ব্যবস্থায় ধ্বস সেকথা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশ সেই মার্কেট হবে। বিএনপি-জামায়াত সেপথে অন্তরায় হয়ে ছিল।
তবে তারা সহজে হাল ছাড়বে না- সামনে একটা রক্তাক্ত লড়াই অপেক্ষা করছে বলে মনে হয়।

বলছিলাম জনগণ আওয়ামী লীগকে ভালোবেসে ভোট দেয়নি। জনগণের ভালোবাসা পেতে হলে আওয়ামী লীগকে এবার জনগণের কাজ করে দেখাতে হবে। বাংলার চাষী-তাঁতী-জেলের মুখে হাঁসি ফোটাতে হবে।

এ-কাজ সহজ হবে না।

আর যারা এদেশের ভালো চান, তাদের নিয়মিত কর্তব্য হবে আওয়ামী লীগকে নজরদারীতে রাখা, তাদের স্বৈরতান্ত্রিক হওয়া থেকে বিরত রাখা। এবং সুনির্দিষ্ট কিছু এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাধ্য করা- যেমন বলছিলাম, সামরিকতন্ত্রকে সাফসুতরো করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা, শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, প্রবল হয়ে ওঠা মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক লড়াই শুরু করা...সাংস্কৃতিক ও মানবিকভাবে গর্বিত মানুষ হিসেবে বাঁচার সম্ভাবনা তৈরি করা।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28889988 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28889988 2008-12-29 22:36:39
কাকে ভোট দেব? http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28888733 http://www.somewhereinblog.net/blog/hiddenmun/28888733 2008-12-27 17:24:08