উপজেলার সর্ববৃহৎ গ্রাম সৈয়দপুর। বেশিরভাগ লোক বিলাত প্রবাসী। এখন অন্য এলাকার লোকসহ মিশ্র বসবাস। গ্রামে একটি দাখিল-আলিম মাদ্রাসা এবং কওমি, হাফিজ ও মহিলা মাদ্রাসা মিলে মাদ্রাসা রয়েছে ১০টি, প্রাইমারি স্ট‹ুল দুটি, হাই স্ট‹ুল একটি ও কলেজ রয়েছে একটি।
গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতসহ কট্টর ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর স্ট’ানীয় নেতা-কর্মীরাই তাহরিকুল উলামা নামের সংগঠন গড়ে তুলেছে। সৈয়দপুরের এ সংগঠনের সভাপতির দায়িÍ^ পালন করছেন মুফতি নোমান আহমদ। অধ্যক্ষ সৈয়দ রেজোয়ান আহমদ তারই ভাই।
তাহরিকুল উলামা নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ স¤ক্সর্কের সহৃত্রে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি) শীর্ষ জঙ্গি নেতা বর্তমানে কারাবন্দি মুফতি হান্নান ২০০৪ সালের প্রথমদিকে সৈয়দপুর সফরে এসেছিলেন। মুফতি হান্নান ও মুফতি নোমান এক সময় পাকিস্টøানের মাদ্রাসায় সহপাঠী ছিলেন। হুজি জঙ্গি সৈয়দ হাফিজ নাঈম আহমদ আরিফ ২০০৬ সালে ৩ সেপ্টেল্টল্ফ^র রাতে সৈয়দপুর থেকে গ্রেফতার হন। এরপর তার মুক্তির দাবিতে রেজওয়ানের নেতৃত্বে এলাকায় মিছিল হয়। স্ট’ানীয় প্রশাসন বা পুলিশ তাহরিকের এসব কার্যকলাপের প্রতি নজর দেয়নি।
এখন এ সংগঠনের মতের বিরু™েব্দ কেউ কিছু বললেই তাকে ‘ইসলাম-বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে শাস্টিø দেওয়া হয়। অধ্যক্ষ সৈয়দ রেজওয়ান স্ট’ানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনি®দ্বতা তৈরি করেন। গত ক’বছরে তার বাড়িতে দাওয়াত কবুল করা সরকারি কর্মকর্তাদের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।
গত বছরের শেষ দিকে সৈয়দপুর গ্রামের আকিকুর রহমানের পুত্র আরশাদের (২৪) বিরু™েব্দ চুরির অভিযোগ এনে তাহরিকুল উলামার সদস্যরা তাকে তওবা করতে বলেন। আরশাদ অভিযোগ অস্ট^ীকার করলে তার ওপর এমন শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় যে দু’দিন পর তিনি মারা যান। মামলা করার সাহস পায়নি আরশাদের পরিবার।
২০০৫ সালের প্রথম দিকে সৈয়দপুর গ্রামের মৃত সৈয়দ আবরু মিয়ার পুত্র সৈয়দ আনিছ আহমদকে (৩২) গুম করা হয়। তিনি নিহত হয়েছেন বলে এলাকায় লোকে মনে করে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, আনিছের ভহৃ-স¤ক্সত্তি এখন অধ্যক্ষ রেজওয়ানসহ তাহরিকুলের ক’জন নেতার দখলে।
তাহরিক সদস্যরা সšúাসের অভিযোগ এনে নিজেরাই বিচার করে মরহুম আরজ উল্কèাহর পুত্রদের গ্রাম থেকে বের করে দেন। তাদের পৈত্রিক ভিটা প্রায় দু’বছর ধরে খালি পড়ে আছে।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, তাহরিকুল উলামা ও স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে মাওলানা রেজওয়ান ধনবান হয়েছেন। গত তিন বছরে তিনি সিলেট নগরের জিন্দাবাজারে এলিগ্যান্ট শপিং সিটির পরিচালক ও জগন্নাথপুরে নলজুড় প্রপার্টিজের পরিচালক হয়েছেন; সিলেটের অভিজাত বিপনীবিতান আল-হামরা শপিং সিটিতে ‘শাড়িমেলা’ নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সৈয়দপুর বাজারে ফার্মেসি ও জুতার দোকানের মালিক হয়েছেন। দ্র“ত তাঁর এরকম ব্যবসা হওয়ায় এলাকাবাসী বিস্টি§ত।
২০০১ সালে রেজওয়ান সৈয়দপুরের মাদ্রাসাটিতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। এটি এমপিও ভুক্ত। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছাড়া কেউ অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেতে পারেন নাÑ এই বিধান অগ্রাহ্য করেই রেজওয়ান আহমদ অধ্যক্ষ হন। এই অনিয়মের প্রশু তুলে তিন দফা নোটিশ করা হয়। কিন্তুমাদ্রাসার গভনিং বর্ডির সভাপতি জগল্পুাথপুরের ইউএনও রায়হান কাওছার রেজওয়ানকে রক্ষা করে চলেছেন। অধ্যক্ষের সঙ্গে তার গভীর সখ্য বলে এলাকায় জানা যায়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হান কাওছার সমকালকে বলেন, পদাধিকারবলে তিনি গভর্নিং বডির সভাপতি হলেও শিক্ষা অধিদপ্টøরের বিধিবিধান স¤ক্সর্কে তিনি ততটা অবহিত নন। তিনি চেনেন কেবল, তার সঙ্গে অধ্যক্ষের বিশেষ কোনো ঘনি®দ্বতা নেই বলে তিনি দাবি করেন।
সৈয়দপুরে ‘তাহরিকুল উলামা’র নির্দেশে এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একুশে ফেব্র“য়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ কোন জাতীয় দিবসেই অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয় না। কোনো বাড়িতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অথবা গান-বাজনা হয় না। বিয়ে উপলক্ষে তোরণ নির্মাণ, মাইক বাজানো, আলোকসজ্জা করা যায় না। গ্রামের যারা তাদের শাসন মানতে চান না, তারা সিলেট শহরে গিয়ে আͧীয়গৃহে বা হোটেলে বিয়ের সামাজিক অনুষ্ঠান করে থাকেন। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় কিছু তরুণ সৈয়দপুর গ্রামে স্যাটেলাইট কেব্লের লাইন টানা শুরু করলে অধ্যক্ষ রেজওয়ানের নেতৃত্বে তাহরিকুল উলামা তাদের বাধা দেয়। এছাড়া বেসরকারি সংস্থা আশা ও ব্র্যাক তাদের কার্যত্রক্রম এলাকা থেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
স্যাটেলাইট কেবলের ঘটনা নিয়ে গত ৮ মে তাহরিকুল উলামার সমালোচনা করে কথা বলায় সৈয়দপুর আদর্শ কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আবুল আহমদকে ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে ‘ধর্মদ্রোহী ও মুরতাদ’ ঘোষণা করা হয়। তিনি ‘মহানবীর (দঃ) বিরু™েব্দ কটহৃক্তি করেছেন’ Ñএমন অপবাদ পরদিন মাইকে প্রচার করে অধ্যক্ষ আবুল আহমদকে মসজিদে ডেকে আনা হয়। সে সময় সহস্রাধিক মানুষের সামনে তাকে তওবা করিয়ে কলেমা পড়িয়ে ‘নতুন করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত’ করা হয়। সমকালসহ জাতীয় কয়েকটি দৈনিকে চাঞ্চল্যকর এই খবরটি প্রকাশ পেলে ফতোয়াবাজরা ক্ষিপ্টø হয়ে অধ্যক্ষ আহমদকে কলেজের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। তারা মাথা মুড়িয়ে ৪০ দিনের চিল্কèায় যাওয়ার নির্দেশ দেয় ফতোয়াবাজরা।
এ বিষয়ে জানার জন্য তাহরিকুল উলামার সভাপতি মুফতি নোমান আহমদের মোবাইলে ফোন করলে তিনি বলেন, পত্রপত্রিকায় তাদের বিরু™েব্দ অপপ্রচার হচ্ছে। তারা মহৃলত মানুষকে শরীয়ত মোতাবেক চলার জন্য উ™^ু™ব্দ করেন, ইসলাম ও সমাজগর্হিত কাজের বিরোধিতা করেন, যারা মানে মানল, যারা মানে না তাদের বিরু™েব্দ কোনো বক্তব্য থাকে না তাদের।
অবশ্য তাহরিকুল উলামার কর্মী হাফিজ শাহজাহান জানান, তারা অধ্যক্ষ আবুলকে ডেকে আনেননি, আবুলের বড় ভাই আবুল কালাম অধ্যক্ষ সাহেবকে তাদের সামনে হাজির করে তওবা করিয়ে মুক্তি দেওয়ার কথা বলায় সবাই ক্ষমা করেছেন।
এ ব্যাপারে গত ১৩ মে বিকেলে তাহরিকুল উলামা নেতা অধ্যক্ষ সৈয়দ রেজওয়ান আহমদের মতামত ফোনে জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর না দিয়ে সমকালের সিলেট ব্যুরো প্রধান মো. হাবিবুর রহমানকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। পরে অন্য একাধিক নল্ফ^রের মোবাইল ফোন থেকে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা। এ ব্যাপারে সিলেট কোতয়ালি মডেল থানায় জিডি করা হয়েছে।
গত ৯ মে সৈয়দপুর দরগা জামে মসজিদে গোলযোগ হতে পারেÑ এমন খবর পাওয়ার পর ওইদিন সকালে ইউএনও রায়হান কাওছার সেখানে ফোর্স পাঠান। কিন্তু মসজিদে কি হয়েছে, সে ব্যাপারে কেউ তাকে কিছু অবহিত করে নি বলে তিনি সমকালের জিজ্ঞাসার জবাবে জানান। সেদিনের ঘটনার শিকার অধ্যক্ষ আবুল আহমদ তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।
সৈয়দপুর আদর্শ কলেজ ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখানে সাংস্ট‹ৃতিক কর্মকা- হয় না। সৈয়দপুর আদর্শ কলেজে সাংস্ট‹ৃতিক অনুষ্ঠান বল্পব্দ করতে না পারায় আগে থেকেই তাহরিকুল উলামার সদস্যরা অধ্যক্ষ আবুল আহমদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন বলে জানা যায়।
গত ৭ মে গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি সাবির আহমদের মেয়ের বিয়ের আগের দিন গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান হয়েছে অনেকটা লুকিয়ে, ঘরোয়াভাবে। তার পরিবারের মানুষজন ছাড়া অন্য কাউকে এ অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হয়নি।
সাবির আহমদ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, কারো বাধায় কিংবা ভয় পেয়ে নয়, ™^›™^ ও সমালোচনা এড়ানোর জন্য সংক্ষিপ্টø আয়োজন করেছিলেন তিনি।
স্ট’ানীয় এক যুবকের মšøব্য, সাবির আহমদ স্ট’ানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, তাই তিনি মেয়ের গায়ে হলুদ করাতে পেরেছেন। অন্য কেউ হলে তাও করতে পারত না। ওই যুবক জানায়, তাহরিকুল ওলামার আদেশে সৈয়দপুরের ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া মেয়েটিকেও বোরকা পরতে হয়।
জগল্পুাথপুর আদর্শ কলেজের প্রভাষক মোহাল্ফ§দ শাহেদ রহমান সমকালকে বললেন, ‘সিলেট বিভাগের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম সৈয়দপুরকে ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, মহৃল্যবোধের ভিত্তিতে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে আলোকিত করতে চাই আমরা, অথচ একটি মহলের জন্য আমরা সবাই দায়ী হয়ে পড়ছি।’
গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ লাল মিয়া ও সৈয়দ মনোয়ার আলী বললেন, সৈয়দপুরের অনেক গুণী মানুষ জš§ নিয়েছেন। গ্রামের ২০ হাজার মানুষের বেশিরভাগই গোঁড়ামি, ফতোয়াবাজির পক্ষে নয়। কিন্তু সংগঠিত না থাকায় পছন্দ করেন না এমন অনেক কিছুরই প্রতিবাদ করতে পারছেন না তারা। তিনি জানান, কলেজের অধ্যক্ষের হেনস্টøার পর সা¤ক্স্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে অনেকেই কথা বলতে শুরু করেছেন।
সূত্রঃ সমকাল নিউজ ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

