[ সকল জীবিত অথবা মৃত আত্মার নামে শপথ করে বলছি আমি এক চুড়ান্ত নৈরাশ্যবাদী , নির্বান্ধব মানুষ। অথচ বন্ধুত্বের বাহুডোরই যেন আমায় নিঃশব্দে অনুসরণ করে চলে। যদিও “৭” সংখ্যাটিকে নিজের প্রতিকৃতি ভাবি, তবুও হিসেব করলে ৭জন কাছের মানুষ খুজে পাওয়াই দুষ্কর। ২২বছরের নাতিদীর্ঘ জীবনে আমার অন্তর্মুখী স্বভাব মাত্র ১জনই ঘনিষ্ঠ বন্ধু জোগাড় করতে পেরেছে এবং স্বভাবে আমরা যথারীতি পরস্পর বিপ্রতীপ কোণ। স্কুলজীবনে সার্বক্ষণিক সঙ্গী হলেও এস,এস,সি পাশের পর রেজাল্টের বিশাল তারতম্যের কারণে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। কিন্তু এই ইন্টারনেটের যুগে পাশাপাশি না থেকেও কাছাকাছি থাকা যায় অবাধ ই-মেইল- চ্যাট সংস্কৃতির বদেীলতে। আমরাও সেভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতাম ই-মেইলের মাধ্যমে! আজ হঠাৎ mail box এ নজর পড়তেই চোখ ছলছল করে উঠল ।... কেন? তার তদন্তভার প্রকৃতির উপরই অর্পিত রইল!! ]
প্রিয় সণ্নাসী,
বেশতো ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে গেলে। তোমাদের মত গ্রন্থকীটদের নিয়ে এই এক সমস্যা ; আরে ভাই, “ই” থেকে “উ”-র কতটুকু-ই বা দুরত্ব । কিন্তু তোমার অতি “ই” প্রীতিতে আশঙ্কা হয় এ জীবনে “ব”-র পাশে “উ” স্থান পাবে তো, অথবা পেলেও আমাকে আবার তোমার proxy দিতে না হয়! আমার যাযাবর GPA' র দৈন্যতা তোমার অজানা নয়। তাই দ্বিতীয়বার চিন্তা না করেই প্রাইভেটে ভর্তি হয়ে গেলাম। যড়হবংঃষু বলছি, জীবনে যদি কোন অসাধারণ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তবে এটি তার শীর্ষস্থানীয়। ওরে বাপস, এখানকার জগৎটাই প্রথাগত পরিবেশের কল্পনার আধার। বাইরে থেকে দেখতে যতই বাসা-বাড়ি-বিপণন কেন্দ্র লাগুক, আদতে এটিই আমাদের campus—জা,বি র দুনিয়াজোড়া campusই তো যত অনিষ্টের মূল, তাই আমরা সাবধানী। পড়তে এসেছি , ক্লাসরুম থাকলেই হল। কখনো কখনো1st year--2nd year এর একই রুমে ক্লাস হয়...এই অপার আনন্দ থেকে তোমরা বঞ্চিত ভাবতেই কেমন লাগছে।আমাদের পড়ায় কারা জানো?তোমরা যাদের চন্দ্রবদন দেখে ধন্য হও, আমরা তাদের উচ্চ সম্মানীতে রপ্তানী করে নিয়ে এসে তাদেরকেই ধন্য করি। বুঝলে ইয়ার, আমাদের campusএর আকাশটাও অর্থের চাকচিক্যে অনেক বেশি নীল তোমাদের চেনা আকাশ থেকে।
অতঃপর “লাল তরমুজ”...,
খুব তো উচ্চমেধার বড়াই কর। শোন, ক্লাস- assignment করি আর না-ই করি, GPA তোমার চেয়ে অনেক ভালো আসবে, এমনকি যদি পরীক্ষাতে অংশগ্রহণ নাও করি। সেসব কথা থাক, তোমাকে দিয়েই মোটামুটি পাবলিক ভার্সিটির ছেলে-মেয়েদের চিনে নিয়েছি : যতসব unsmart মহিষদের খোয়াড়। আচ্ছা , এই যে যৌবনের শ্যামবর্ণ সময়গুলো হলুদাভ হয়ে যাচ্ছে , এর মধ্যে কখনো কি ভেবে দেখেছো “fashion world” থেকে তোমাদের দুরত্ব রীতিমত ইউরেনাস- বুধ পর্যায়ের!শুধুমাত্র চুল-দাড়ি নিয়েই যে ১০৭ রকম fashion হতে পারে, কখনো আমাদের এখানে এলেই তার চাক্ষুষ প্রমাণ পাবে। রম্ভা-মেনোকা-উর্বশীরা শুধু স্বর্গকেই উষ্ণ রাখেনা, অবকাশ যাপনের জন্য হরহামেশাই দলবেধে চলে আসে আমাদের পরিমণ্ডলে !পোশাকে এরা কেউ মনিকা বেলুচ্চি, নিদেনপক্ষে মল্লিকা শেরওয়াত। মফঃস্বল থেকে আসা যেসব মেয়ের চুলজুড়ে জুই নারিকেল তেলের সুবাস থাকত, তারাও সহসা শহুরে মডার্নিকাদের সঙ্গে স্টাইলের দ্বৈরথে লিপ্ত!এই সেমিস্টারে ৪টি course নিয়েছি, পড়াশোনার খরচটা একটু বেশিই বেড়ে যাচ্ছে। আমরা যে মধ্যরাত অবধি গরীব রাষ্ট্র-গরীব রাষ্ট্র করে মূর্ছা যাই, প্রাইভেট ভার্সিটির এত দ্রুত উত্থান দেখার পর তার যৌক্তিকতা নিয়ে সংশয় প্রকাশে বাধ্য হচ্ছি।এখনো সময় আছে,smart হও; নয়তো চাকুরি বাজারে আমাদের সামনে দাঁড়াতেই কিন্তু থরথর কাপবে।
Mr উজবেকিস্তান,
এই দেশ-আলো-আবহাওয়া সবই ছোটলোকদের জন্য, এখানে থেকে নিজের caliber নষ্ট করার কোন মানে হয়? নাহ, “মধূসূদন বায়ু” ভর করেনি , আমি আমাতেই আছি। তাইতো সিদ্ধান্ত নিয়েছি credit transferকরে summer semester এ লন্ডন চলে যাব। আরে, ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই তো IELTS এ 6পাওয়া যায়! তবুও বাড়তি সতর্কতা হিসেবে কোচিং করছি। ওদের বিজ্ঞাপনের ভাষা শুনলে সাহারাতেও হয়ত শৈত্যপ্রবাহ হবে - কাউকে বলবে ইংলিশের cancer এ ভুগছে, কাউকে আবার Aids....। দোয়া রেখো আর কি! তোমার mail গুলো এত সংক্ষিপ্ত হয় কেন?আর, আমার সাথে ইংলিশের পাণ্ডিত্য না দেখিয়ে mail গুলো d-juice style এর বাংলায় লিখবে। এতে তোমাকে কেউ উপহাস করবেনা, কারণ এটাই তোমার smart হওয়ার প্রাথমিক পাঠ!!
সুবোধ বাল্যবন্ধু,
countdown শুরু হয়ে গেছে;সামনে মাসে ফ্লাইট। কেন এদেশের জীবনব্যবস্থাকে চণ্ডালীপনা বলি পাসপোর্ট অফিসে গেলে বুঝবে। এমন হেরেমীদশা যদি সব প্রতিষ্ঠানেই থাকে , দেশ এর চেয়ে আর কতটুকু ই বা সম্ভ্রান্ত হবে!পাসপোর্টের জন্য লাইনধারী হলেই ১সপ্তাহের ফের। অবশ্য ভাগ্যদেবী extra ordinary প্রসণ্ন হলে সামান্য এইটুকু কাজের জন্য দেড়মাস সময় লাগাও অস্বাভাবিক নয়। যাই হোক, মা’ র এক দুঃসম্পর্কের ভাইয়ের বাসায় paying guest থাকব। আমায় মনে রাখার চেয়ে ভুলে যাওয়াটা অনেক সহজ। সহজ কাজের তো অভাব নেই, দু-একটা কঠিন কাজ করলে অর্থহীন জীবনটা যদি কিছুটা অর্থপূর্ণ হয় - ক্ষতি কি!
তুমি-আমি একই গ্রহের লোক, সেই আমাদের শেষমাত্র মিল/ তবুও বন্ধু তোমার আকাশে হব শঙ্খচিল/ যত দুর হোক দুরত্বকে করে নিও একতিল/ বৈপরীত্য তোমার-আমার সুখের চলনবিল//
আলোকিত মানুষ,
বহুদিন আগে রাতের বেলা একটা সোয়েটার কিনেছিলাম; নিয়ন আলোয় সেটি এতই বর্ণিল লাগছিল যে দরদাম ভুলে কিনে ফেলি। পরদিন সকাল বেলা আবি®কৃত হল সেই ক্ষণপ্রভার পুরোটাই নিয়ন আলোর ধোকা !হঠাৎ স্মৃতি খননের বিলাসিতায় অবাক হচ্ছো?স্বপ্নিল তেপান্তরে কাল্পনিক সুখ কতটা কপটতার ডানা মেলে এখানে এসে তা- ই দেখতে পাচ্ছি। দেশে একগ্লাস পানিও নিজ হাতে তুলে খাইনি, অথচ সেই একই আমি একটা রেস্টুরেন্টে সালাদ-পেয়াজ কেটে নির্ঘুম রাত কাটাই।যে বাড়িতে থাকি সেখানেও সবকাজ নিজের।ননীর পুতুলকে যদি কোন প্রস্ত্ততি ছাড়াই কয়লা খনিতে চালান করা হয়, তার পরিণতি কি ভাবতে পার?অপ্রয়োজনে বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে কথা বলে একসময় নিজেকে স্মার্ট ভাবতাম, কিন্তু দিনমান ইংরেজির কৃত্রিমতায় এখন বাংলাকে বড্ড মিস করি!স্তম্ভিত হয়োনা বন্ধু; তোমাদের চেনা সেই গিটার বাদক-কবিতা পাঠক দাম্ভিক ছেলেটা রান্নার সামগ্রীর মাঝে জীবনের বাস্তবতায় হারিয়ে গেছে। বোধহয় এটাই জীবনের গাণিতিক নিয়ম।
এইপাড়ে বসে থাকা নিমগ্ন আমি- চেয়ে দেখি টেমসের নীরব স্রোত
দূরপ্রান্তে তুমি বসে -স্পর্শে নিয়ে কাব্যিক রোদ
স্যামন ফিশে মিশে গিয়ে আমি- হাবুডুবু খাই টেমসের জলে
হয়ত তখন অন্য তুমি - প্রাণ খুঁজে চল প্রিয়ার চুলে
সময়ের ভুলে সময় আসে ; পৃথিবী তবু অট্টহাসে.....
আমার শোকে, তোমার সুখে... তার আর এমন যায় কি আসে//
লন্ডনের মতই ভীষণ লণ্ডভণ্ড এখানকার লাল-নীল অমৃতসুধা। তুমিতো জান নৈতিকতার বাধন আমার যক্ষের ধন নয়; পুরোদস্তুর বিলেতি সাহেব না হতে পারি , সিকিসাহেব হওয়ার চেষ্টায় অমৃতপান এমন কী অপরাধ!তাছাড়া শীতপ্রধান দেশে শরীর-মন চাঙ্গা রাখার ব্যাপারটাতো আছেই। এতকিছু করতে গিয়ে প্রকৃত ছাত্র পরিচয়টাই বিলীন হবার উপক্রম, কেননা এখানকার পড়ানোর স্টাইলে নিজেকে কেবলই এলিয়েন মনে হয়।তাছাড়া টিউশন ফি ’র আকাশচুম্বীতায় উপার্জিত অর্থের সিংহভাগই খরচের তহবিলে চলে যায়।তবে, এতসব অপ্রাপ্তির খাখা দুপুরেও কোমল পানীয় হয়ে এসেছে এলিসিয়া; ওর দেশ ডেনমার্ক; এ কদিনেই বোঝাপড়াটা দারুণ আমাদের- weekend এ দুজনে দুরে বেড়াতে গিয়ে একত্রে রাত্রিযাপন করে পরদিন কাজে যোগ দেই! বলতে পার এলিসিয়া আছে বলেই হয়ত এত কষ্ট স্বীকার করে এদেশে এখনো পড়ে আছি।ওর একটা ছবি পাঠাচ্ছি তোমায়। মা-বাবা জানে আমি এক ফাস্টফুড কোম্পানীর সেলসম্যান, কিন্তু একমাত্র তুমি-ই জান আমার নিঃশেষিত আত্মার বেদনাবৃত্তান্ত। তুমি কি সেই আত্মার গোঙানী শুনতে পাও??
দুয়ো রাজা (রানী নয়!),
দীর্ঘদিন মেইল না পেয়ে উদ্বিগ্ন আছো? হোটেলের চাকরিটা চলে গেছে ; আমার মত আনাড়ি মানুষ নাকি ওদের কর্ম-অকর্মকে ব্যস্তানুপাতে পরিবর্তিত করছে।বলতে পার বেকারই এখন। যে বাসায় থাকি সেখান থেকেও পেীনে বিতাড়িত দশায় আছি অর্থসংক্রান্ত জটিলতায় । দুর্ভাবনার ঘূর্ণিপাকে কেবলই আবর্তিত হচ্ছি- পড়াটা চালিয়ে যেতে পারবো তো?এলিসিয়ার সঙ্গে মধুচন্দ্রিমাও স্থায়িত্ব পেলনা- সে নতুন মুখের সন্ধান পেয়েছে। সত্যি বলছি, বেঁচে থাকার ইচ্ছেগুলোও কেমন ক্রমশ ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে ; গত ৭দিন অর্ধাহার-অনাহারে কিভাবে পার করেছি সেই বর্ণনা দিতে গেলে রীতিমত ম্যাক্সিম গোর্কী হয়ে উঠব। হঠাৎ যদি আমার মৃত্যুসংবাদ পাও বিস্মিত না হয়ে বরং জেনে রেখো তাতে আজরাইল বেটার কোন বাহাদুরি নেই ; আমি-ই স্বেচ্ছায় তার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছি!ভয় শুধু একটাই- আমার লাশটা হয়ত টেমসে-ই ছুড়ে ফেলা হবে। আমার স্বপ্নের জলছবি তে স্বদেশ-স্বজাতি চিরকালই উপেক্ষিত, কিন্তু এই প্রথম অনুভব করছি সেই জলছবি ছিল অসম্পূর্ণ, কারণ মধুসূদন ’ রা বরাবরই অনুতপ্ততায় অনুপ্রাপ্তি চায়।আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি - তোমার পরিচিত-অপরিচিত যে কেউ যদি উচ্চমাধ্যমিকের পরই বিদেশ বিদেশ রব তোলে, তাহলে প্রয়োজনে তাকে মুদি দোকানের কাজে লাগাবে; কোনক্রমেই তার কল্পবিলাসকে প্রশ্রয় দেবে না। প্রবাসের প্রবেশদ্বারে যত্রতত্র দীর্ঘশ্বাসের মন্বন্তর অপেক্ষা করে আছে। সাধ করে কেন তার ভাগীদার হবে?হয়ত তোমাকে লেখা এটাই আমার শেষ mail,তোমাকে বহু উপহাস-বিদ্রুপ করেছি; আজ নিজের জীবন দিয়ে বুঝলাম তুমি-ই সঠিক মানুষ। যদি এই “short circuit country” তে নিভে যাই চিরতরে, আমায় স্থান দিও তোমার বইয়ের শেষপৃষ্ঠায় ২ লাইনের পঙক্তিমালায়- এখানে ছিলাম- সেখানে ছিলাম ; ছিলাম স্নেহ-প্রেমে/ কর্পুর হয়ে মিলিয়ে গেলাম -স্মৃতির মলিন ফ্রেমে//
# আমার সেই প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আমার। তাইতো এখনো প্রতিদিন ইন্টারনেটে mail check করতে গেলে আমার অনুসন্ধানী চোখ একটি বিশেষ নামে নিবিষ্ট হয়ে থাকে, সেখানে শ্রাবণের ধারা বয়ে চলে অবিরাম । হয়ত সে বেঁচে আছে পার্কের বেঞ্চিতে অথবা স্টেশনের প্লাটফরমে ভবঘুরে হয়ে। বীজগণিতে পক্ষান্তর করলে সংখ্যার চিহ্ন পরিবর্তিত হয়, কিন্তু জীবনের ভাগ্যান্তর ঘটলে....?এটাই বোধহয়...বোধহয়...বোধহয়... বোধহয়....................................(কী উত্তর দেব??)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

