(আগের পর্বগুলো পড়া না থাকলে এটি পড়াও নিষ্প্রয়োজন)
রাবণের তত্ত্বাবধায়ক সরকার
দায়িত্ব পাওয়ামাত্র রাবণ প্রবল হুঙ্কারে স্বর্গকে প্রকম্পিত করে ফেলল প্রায়, এমনকি দু'একটি মৃদু ভূমিকম্পও অনুভূত হল কোথাও কোথাও। "দুর্নীতিমুক্ত স্বর্গের" স্লোগান দিতে দিতে তার মুখে ফেনা উঠে যাওয়ার দশা, এবং ভাই বিভীষণকে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েসেই ফেনা কিছুটা প্রশমিত করার একটা উপায় করল। বিভীষণের মস্তিস্ক সুপার কম্পিউটারের আধুনিক সংস্করণ, তাই ১+১-২=০ ফলাফল হিসেব কষতে তার সময় লাগল কয়েক ন্যানো সেকেণ্ড! সুতরাং কালবিলম্ব না করে লক্ষণ-ফিরোজ শাহ সহ দুই দলের শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দী করা হল, রাম-তুঘলক হল গৃহবন্দী। তবে বিভীষণ জানে আগাছাকে লালন করলে একদিন তা মূল গাছটিকেই গ্রাস করে ফেলে, আর এই সূত্রটি মাথায় রেখেই সুগ্রীব এবং নুসরাত শাহ'র মত ২য় সারির নেতাদের প্রতি তার বিশেষ সুদৃষ্টি বরাদ্দ রাখল। এই সুদৃষ্টি সুগ্রীব-নুসরাত শাহ'র মধ্যে নিজ নিজ দলে সংস্কারের ধারণাটি প্রসব করল। আদতে এই সংস্কারের নামে রাম-তুঘলককে স্বর্গের রাজনীতিতে অপাঙক্তেয় করার এই বিভীষণীয় পরিকল্পনাটি তারা বুঝতে পারলেও নিজের গা বাঁচাতে তারা প্রয়োজনে ১০জনের গা পোড়াতেও রাজি।অন্যদিকে, মীরজাফরের সঙ্গে রাবণের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব_জিউসের শাসনামলে একবার এক প্রমোদ উদ্যানে সরাব পান করার সময় তাদের প্রথম আলাপ হয়, এরপর সরাব আর অপ্সরাই একসময় দুজনের মাঝে অভিন্ন হৃদয় গড়ে তুলে।
রাবণ যেহেতু সরকারপ্রধান এখন, তাই বলার অপেক্ষা রাখেনা মীরজাফরের প্রতিপত্তি অক্ষুণ্ন রইল, যদিও ধুরন্ধর রাবণ নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণের অংশ হিসেবে মোহাম্মদী বেগসহ কয়েকজন শীর্ষ জঙ্গিকে নরকে নির্বাসন দিল।
সেনাবাহিনী প্রধান মেঘনাদ এখন বলা চলে স্বর্গের একচ্ছত্র অধিপতি। যদিও জনসমক্ষে রাবণ এখনো সরকারপ্রধান, কিন্তু মূলত শাসনক্ষমতা পরিচালিত হয় মেঘনাদের খেয়ালে, আর এতে করে মেঘনাদের অশূর বাহিনী বেপরোয়া হয়ে উঠল । এমনকি কোন অশূরের মুখের দিকে সরাসরি তাকানোও তাদের দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে গণ্য হল। সেই অপরাধের শাস্তি থেকেই ঘটল বিপত্তি_ একদিন এক সহজ-সরল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র কথা বলার সময় হঠাৎ করে এক অশূরের মুখের দিকে তাকাতেই তিন অশূর প্রকাশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে নির্মম লাঠিপেটা শুরু করল, ব্যস বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠল_ সমবেত ছাত্ররা তিন অশূরের মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে নিজেদের ক্ষোভের বহিপ্রকাশ ঘটাল। অশূরের আত্মসম্মানে এত বড় আঘাত মেঘনাদ কিভাবে সহ্য করবে?সুতরাং নারকীয় তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল_ যে কোন যুবককে রাস্তায় দেখামাত্র তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সন্দেহ করে মহাসমারোহে মাথা ন্যাড়াকরণ প্রক্রিয়া চলতে থাকল।রাম-তুঘলকের অনুসারীরাও যেন এমন একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। দলীয় ক্ক্যাডাররা সব রাতারাতি ছাত্র পরিচয় নিয়ে অশূরবাহিনীর সঙ্গে দাঙ্গায় লিপ্ত হল, এবং ছাত্র হয়রানির প্রতিবাদে রাবণের পদত্যাগ এবং স্বর্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করল। রাবণ অবস্থা বেগতিক দেখে স্বর্গের সকল বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করল।
মেঘনাদ বুঝতে পারল তার দীর্ঘদিনের আরাধ্য সময় উপস্থিত। স্বর্গের পরিস্থিতি প্রতিকূল এই অজুহাতেই শাসনক্ষমতা দখল করা যেতে পারে। কিন্তু পার্শ্ববর্তী স্বর্গরাজ্যের সমর্থন ছাড়া এমন পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অসম্ভব।তবে সবচেয়ে আগে যে কাজটি করা তার উচিৎ বলে সে মনে করল তা হচ্ছে বিভীষণকে হাত করা; ক্ষমতালোভী বিভীষণকে দলে আনতে মোটেই বেগ পেতে হলনা তার_ প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রস্ত্তাব পাওয়ামাত্র সে তো প্রায় মেঘনাদের কোলে উঠে গিয়েছিল। বাকি রইল পাশের স্বগরাজ্যের অধিপতি পসেডন। মেঘনাদ পার্শ্ববর্তী রাজ্য সফরে যাওয়া মনন্থির করল।
পসেডনের অনেক দিন থেকেই প্রতিবেশী রাজ্য দখলের একটা কুমতলব ছিল। মেঘনাদের প্রস্ত্তাবে সে এবার মোক্ষম চালটা দিল_
পসেডন: আপনার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করছি জেনারেল মেঘনাদ। রাম-তুঘলকের যুগে আপনাদের ফিরে যাওয়ার কোন মানেই হয়না, আবার রাবণের মত মোটাবুদ্ধির শাসকও স্বর্গের অনুপযুক্ত। সবকিছু বিবেচনায় আপনিই হতে পারেন
প্রকৃত শাসক।
মেঘনাদ: আপনার কথা শুনে একধরনের মানসিক প্রশান্তি অনুভব করছি। সত্যি আপনি আমায় নির্ভার করলেন।
পসেডন:(মুচকি হাসি) তাহলে এবার আমাকেও আপনার নির্ভার করতে হয় যে,...give and take policy অনুসারে তাইতো হওয়া উচিৎ,তাই না?
মেঘনাদ: মানে?
পসেডন: বুঝতে পারলেন না? সেজন্যই তো লোকে বলে সেনা কর্মকর্তাদের বুদ্ধি থাকে নাকে, সর্দির সঙ্গে ঝরে যায়! আরে, আপনি আপনার রাজ্যের শাসক হবেন, ক্ষমতা ভোগ করলেন তাতে আমার কি লাভ বলুনতো?রাম-তুঘলক হলেও তো আমার কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু আছে। আপনি শাসক হন, সর্কপ্রকার সহায়তা পাবেন। শুধু বিনিময়ে আমার রাজ্যের অঙ্গরাজ্য হয়ে থাকতে হবে আপনাদের, রাজি?
মেঘনাদ: কেন নয়? অবশ্যই অবশ্যই। সারাজীবন তো রাম-লক্ষণ-তুঘলক-রাবণকে স্যার বললাম, এথন থেকে নাহয় শুধু আপনাকেই বলব। আমি রাজি, আমি রাজি।
(মেঘনাদ এবং পসেডন মহানন্দে সরাব পান করতে থাকল, এবং পানের ফাকে ফাকে মদ্যতার প্রতিক্রিয়ায় একে অন্যকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগল)
নির্ঘণ্ট:
জেনারেল মেঘনাদ এখন স্বর্গের কর্ণধার, বিভীষণ তার প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছে মীরজাফর। রাবণের বিরুদ্ধে সম্পদ লুণ্ঠনের মামলায় মীরজাফর রাজসাক্ষী হওয়ায় মেঘনাদ তাকে সততার পুরস্কারস্বরূপ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করে নিয়েছে। আর রাম-লক্ষণ-তুঘলক-রাবণসহ সকল হোমড়াচোমড়া ব্যক্তিবর্গকে স্বর্গের শেষপ্রান্তে নির্মত বিশেষ কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে। পক্ষান্তের, পসেডনের সঙ্গে জিউসের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক থাকায় মেঘনাদ জিউসের সম্মানে সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণ করে জিউসের মনোবাঞ্ছা অনুযায়ী সীতাকে তার সঙ্গে রাখার অনুমতি দিয়েছে।
স্বর্গরাজ্যে এখন একটিমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল আর একটি সংবাদপত্র রেখে বাকিগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় মেঘনাদের প্রাতঃরাশের ছবি ছাপা হয়, টেলিভিশনে বিভীষণের ছেলের বিবাহনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়........বেশ ভালোই চলছে স্বর্গরাজ্য। শুধু দিনশেষে মেঘনাদকে পসেডনের কাছে সকল কাজের জবাবদিহি করতে হয়, এই একটি ব্যাপারেই তার মধ্যে কিছুটা সংকোচ কাজ করে এখনো_ শাসন ক্ষমতা দখল করেও শাসক হওয়ার অধিকারটা তার পাওয়া হলনা!! (সমাপ্ত)........................

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

