somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাঠক সমীপেষু (গল্প)

০১ লা মার্চ, ২০০৯ রাত ১০:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোন এক শকুন্তলা-সন্ধ্যায় “নীটসে-ফুকো”সদৃশ আজিজ সুপারের দোতলায় সিগারেট-চা’য়ের প্যারেড হচ্ছিল।তাতে অংশগ্রহণকারী সাহিত্যিক, সাহিত্য সমালোচকসহ ৭-৮ টি সাংস্কৃতিক কণ্ঠস্বর অকস্মাৎ ব্যাঙের মত ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ জুড়ে দিয়েছিল; ফলশ্রুতিতে “জনপ্রিয় সাহিত্য কখনই প্রকৃত সাহিত্য নয়” , কিংবা ‘জনপ্রিয় লেখকরা দিগম্বর লেখক”- জাতীয় ভী..ষণ(!) গুরুত্বপূর্ণ এক বিতর্ক শুরু হয়েছিল নিজেদের মধ্যে। বিতর্কে মূলধারার লেখকদের প্রতিনিধি “ক”, “খ”, “গ”, পক্ষান্তরে জনপ্রিয় লেখকদের হয়ে ডিফেণ্ড করছিল “প”, “ফ”, “ব”। ইদানীং বিতর্কের “সংসদীয় ধারাটি” বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বিধায় তাদের বিতর্কে এই ধারাটিই অনুসৃতই হচ্ছিল, যদিও জনপ্রিয়তার প্রতি বীতস্পৃহ তথাকথিত মূল ধারার লেখকেরা একেও অগ্রাহ্য করে সনাতনী পদ্ধতিতেই বিতর্ক করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল।কিন্তু “জনপ্রিয় লেখকেরা’ বাগড়া দেয়ায় ‘টস’ হয় উভয় দলের মধ্যে: যারা জিতবে, তাদের পছন্দের পদ্ধতিতেই বিতর্ক হবে! উল্লেখ্য, এই বিতর্কে সঞ্চালক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব ‘স’, যিনি একটি শীর্ষস্থানীয় সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা করেন। বিতর্কটা শুরু হয়ে গিয়েছিল চা-সিগারেটের অবাধ গণতন্ত্রকে সচল রেখেই:

ক: ধন্যবাদ। আমরা জনপ্রিয় লেখকদের প্রকৃত লেখকের স্বীকৃতি দিতে অনাগ্রহী, কারণ আমরা বিশ্বাস করি জনপ্রিয় সাহিত্য কখনোই প্রকৃত সাহিত্য হতে পারেনা। প্রকৃত সাহিত্য বলতে আমরা বোঝাচ্ছি, সেই উচ্চমার্গীয় লেখনীশিল্প, যেখানে সন্নিবেশিত হবে বহুমাত্রিক জীবন-দর্শন, যৌক্তিক আবেগ, প্রগাঢ় দৃষ্টিভঙ্গি, স্বচ্ছ বাস্তবতা_ অর্থাৎ যার মাধ্যমে একটি বিশুদ্ধ সত্যের সঙ্গে আমাদের পরিচিতি ঘটবে, আমাদের অনুভূতির সেই কোমলতম অংশে তা স্থান করে নেবে যার “নিঃশব্দ অস্তিত্ব” আজীবন অনুভূত হবে। একইসঙ্গে আমাদের দৃষ্টিতে জনপ্রিয় সাহিত্য হচ্ছে সাহিত্যের একটি অপসংস্করণ, যেখানে শিল্পকে উপেক্ষা করে প্রধান লক্ষ্য থাকে চটকদারিতায় পাঠক হরণের দিকে, কিংবা বলা যায় যেগুলোর স্থায়িত্ব-পরিব্যাপ্তি একটি নির্দিষ্ট সময়সাপেক্ষ (হঠাৎ পয়েণ্ট অব ইনফরমেশন চায় “ফ” কিন্তু “ক” তাতে কর্ণপাত না করে বলে চলেন)। দুই সংজ্ঞায়নের সম্মিলনে, প্রকৃত লেখক হচ্ছেন তারাই যারা শিল্পের প্রশ্নে নিরাপোসকামী, বস্তুবাদীতা যাদের লেখায় উপজীব্য হয়েও ভাববাদীতার অপেক্ষক, আর সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে যারা লেখাকে নির্দ্বিধায় দিগম্বর করে, তারাই জনপ্রিয় লেখক। (এবার পয়েণ্ট অব ইনফরমেশনে “ব” প্রশ্ন করার সুযোগ পেলেন)
আপনি চটকদারিতা বলতে কী বোঝাতে চাইছেন এবং সময়সাপেক্ষতার যে প্রশ্নটি তুলেছেন সে ব্যাপারে আপনি কতটুকু নিশ্চিত?”
- যে কোন ধরনের শিল্পঘাটতিই চটকদারিতা; সহজভাবে বললে মনাঙ্কনের পরিবর্তে মনোরঞ্জনের প্রাধান্য। এটিতো স্থিরসত্য যে, আপনি একটানা হাসতে অপারগ ; তাই আজকের তুমুল জনপ্রিয় সাহিত্য দিনের শেষেই আস্তাকুড়ে আশ্রয় নেবে নিদারুণ শিল্পসংকটের কারণে।আমি বলব, জনপ্রিয় সাহিত্য অনেকটা রঙিন ফানুসের মত : উড্ডয়নকালে চোখে ধাধা লাগিয়ে দেয় ; কিন্তু ভুপতিত হওয়ামাত্র তাকে নিয়ে কারো কোন মাথাব্যথা থাকেনা।

“স”: এবার বক্তব্য প্রদানে অনুরোধ করছি জনাব ‘প’ কে।

প : জনাব “ক”, এটা কোন পরীক্ষার খাতা নয়, তাই দয়া করে মুখস্ত বুলি না আউড়ে বাস্তবসম্মত কথা বলুন। আপনি সাহিত্যের যে চিত্রটি উপস্থাপন করতে চেয়েছেন সেটি একটি পক্ষপাতমূলক ধারণা; এর মাধ্যমে সাহিত্যকে শুধুমাত্র মোটাফ্রেমের চশমাধারীদের ক্রীড়ানকে রূপান্তরের প্রতি আপনার আকাঙ্ক্ষার সাথে সাথে সাহিত্যের সর্বজনীনতাকে প্রচ্ছন্নভাবে অবজ্ঞার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়। (পয়েন্ট অব ইনফরমেশনে “গ” এর প্রশ্ন)“ যে কোন সর্বজনীন বিষয়ে মান আরোপের ক্ষেত্রে যে গড়পড়তা নীতি অনুসরণ করা হয় আপনি কি সেটি স্বীকার করেন; সেক্ষেত্রে সর্বজনীনতা কি সাহিত্যের কেীলিন্য খর্ব করছেনা?”
-এইধরনের হাস্যকর প্রশ্ন করে প্রকান্তরে আপনি সাহিত্যকেই অপমান করলেন। দেখুন, সাহিত্য একটি অসংজ্ঞায়িত “সাংস্কৃতিক-মানসিক মাধ্যম”, সংজ্ঞার মাধ্যমে একে সংকীর্ণ করা হয়। এক্ষেত্রে মান আরোপটাও তাই বালখিল্যতা। সাহিত্য কি twin tower ,অথবা Buckingham palace? নইলে কৌলিন্যর প্রশ্নটি আসে কিভাবে?সাহিত্য কখনো গ্রামের মেঠোপথে হাটবে, তো পরক্ষণেই শহরের সবথেকে উচু টাওয়ারে উঠে ভড়ং নাচবে।জনাব “ক” , বহুমাত্রিক জীবন দর্শন, যৌক্তিক আবেগ, স্বচ্ছ -বাস্তবতা সহ বিশেষণের চর্বিতে মেদবহুল যে শব্দগুলো ব্যবহার করলেন তা-ও নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় ; দর্শন কি কোন ধ্রুবধারণা যে আপনি এমন সরলীকরণ করবেন? আপনার-আমার চেহারায় যেমন মিল নেই দৃষ্টিভঙ্গিটাই তেমন ভিন্ন হবে, সেক্ষেত্রে জীবনদর্শন মানে কী? একই কথা আবেগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আপনি যাকে জীবন-মরণ কোন ইস্যু ভাবছেন, হযত আমার কাছে সেটি ধর্তব্যই নয়।বাস্তবতার কথা বলছেন? আমি জানি, আপনি একজন ঘরকুনো মানুষ, মানুষের সংস্রব এড়িয়ে চলেন_ আপনি বাস্তবতার কী বুঝেন? অথচ, আপনি একটা কিছু লিখে সেটিকেই বাস্তব হিসেবে চালিয়ে দেবেন পাঠক মহলে, এটা কি contradictory+ hypocrisy হয়ে গেলনা? সেক্ষেত্রে “দায়বদ্ধতা”কে কিভাবে এড়াবেন?এরপর , আপনি সময়সাপেক্ষতার প্রসঙ্গ তুলেছেন। দেখুন, ১০০% গ্রহণযোগ্যতা স্বয়ং ঈশ্বরেরও নেই বলেই পৃথিবীতে নাস্তিকতাবাদের সৃষ্টি হয়েছে, এর সাপেক্ষে একটি বই খুবই ক্ষুদ্র একটি উপকরণ। দস্তয়ভস্কি-সার্ত্র কেউই কিন্তু বহুল পঠিত লেখক ছিলেন না, কোনদিন হবেনও না, বরং প্রতিযুগেই অল্প কিছু মানুষ তাদের লেখা পড়বেন, শুধুমাত্র সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই তারা কালজয়ী লেখক।এখন, আমিও যদি নিজেকে দস্তয়ভস্কি-সার্ত্র ভাবতে শুরু করে সেই ঘরানার লেখা লিখতে শুরু করি, তাহলে সর্বোচ্চ একজন অন্ধ অনুকরণকারী “বানর’ হওযা সম্ভব, কখনোই লেখক নয়। তারচেয়ে বরং এই কুচিন্তার ঢেকিটিই ভেঙ্গে ফেলি দু-কলম লেখার চেষ্টা করি।তাই,আমাদের দর্শনও খুব সাধারণ : জীবদ্দশায় যা কিছু পেলাম সেটিই বিবেচ্য, মৃত্যুর পর আমার নামে কয়টা মনুমেণ্ট হল, আমার লেখা কতহাজার ভাষায় অনুদিত হল এধরনের ফালতু ফ্যান্টাসিতে ভুগে নিজের মধ্যে যা কিছু সৃজনশীলতা আছে তাকে অপচয় করতে চাইনা। ধন্যবাদ।

“স”: এবার বক্তব্য প্রদানে অনুরোধ করছি জনাব ‘খ’ কে।

‘খ’: জনাব “প”, জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সাথে সাথে বুদ্ধিমত্তাও যে আশঙ্কাজনকহারে হ্রাস পায়, সম্ভবত আপনিই তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।আপনি সাহিত্যের সংতজ্ঞায়নের বিপক্ষে, অর্থাৎ আপনি বলতে চাইছেন – “ আমার মুখে ঝাল, মেয়েটির ঠোট লাল, আনন্দে দেই ফাল, সে আসবে কাল, টোল পড়া তার গাল, বাড়ির পাশে খাল, সেথায় মাছের জাল, পথটা একটু ঢাল, সময়ের নেই তাল, নৌকায় তুলি পাল, দারুণ সস্তা ডাল, দাবায় দিচ্ছি চাল, ছাড়াবো তোমার ছাল, মদের নেশায় টাল, হাতে ভিক্ষার থাল, মেয়েটির গায়ে শাল, মাথায় উঠছে মাল, তুমি একটা বাল”...এরকম কিছু একটা লিখলাম, আর তা সাহিত্য হয়ে গেল? এখানে বেশকিছু সুড়সুড়িমূলক লাইন আছে, তাই হয়তো অনেকেরই ভাল লাগতে পারে। কিন্তু আমার কি ভাল লাগছে?এই না ভাললাগা সুলভ উশখুশ থেকেই সাহিত্যকে একটি কাঠামো মেইনটেইন করতে হবে, তার মধ্যে একটি বার্তা থাকতে হবে। ( পয়েণ্ট অব ইনফরমেশনে “ফ” এর প্রশ্ন)
-আপনি বলেছেন, “আমার কি ভাল লাগছে?” তাহলে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য কী বলে মনে করেন, বা “কাঠামো” শব্দটির মাধ্যমে আপনি কোন্ ধরনের কাঠামোর বলতে চাইছেন?
-আমি মনে করি, সাহিত্যের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ সৌন্দর্যবোধ সৃষ্টি করা, একটি বিষয়কে যতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব তদসত্ত্বেও নতুন আর একটি উপায়ে বিশ্লেষণের কৌশল শেখানো, ৩য় চক্ষু বিষয়ক ধারণার সৃষ্টি, কল্পনাকে জাগিয়ে তোলা, কয়টি বলব? শুধু সাহিত্যের উদ্দেশ্য লিখতে গেলেই কয়েকশো পৃষ্ঠার বই হয়ে যাবে, কিন্তু সেটিও ভূমিকা অংশেই নিবদ্ধ থাকবে, “বর্ণনা” অংশ তো বাকী-ই রইল! এরপর, কাঠামো ও বার্তা প্রসঙ্গ। কাঠামো শব্দের মাধ্যমে বোঝাতে চাইছি, আপনার লেখাটি একটি রীতি মেনে চলবে, আর সে সূত্রেই শুরুর ছড়াটির অবতরণ।অন্যদিকে, আপনার লেখাটি পড়ার পর পাঠক যদি কোন শিক্ষণীয় বক্তব্য না-ই পেল , তাহলে লেখাটিই বৃথা পণ্ডশ্রম।দুঃখজনক হলেও আপনাদের লেখায় এই বিষয়টির নিদারুণ অভাব। জনাব “প” এর বক্তব্য প্রসঙ্গে বলতে চাইছি। আপনি শিল্পের ব্যাপারটি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন, কারণ এই বিষয়ে বলতে গেলে আপনাদের লেখালীখি বন্ধ করে সিডি ব্যবসায়ী হতে হবে।তাই, আপনি সরাসরি জনাব “ক” এর বাস্তবতাজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দেখুন, বাস্তবতা বোঝার জন্য সারাদিন পথে পথে হাটা যেমন নিরর্থক, তেমনি কয়েকশো বন্ধু থাকাটাও নিষ্প্রয়োজন। বাস্তবতা বুঝতে হবে ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে, বিভিন্ন লেখকরা যেটা করে থাকেন প্রতিনিয়ত।একইসঙ্গে দস্তয়ভস্কি-সার্ত্রের উদাহরণ টেনে আপনি চরম নির্বুদ্ধিতার প্রমাণ দিয়েছেন। তারা লেখেন লেখকের জন্য, পাঠকদের জন্য তো অন্য লেখক আছেই। যতক্ষণ না আপনি দস্তয়ভস্কি পাঠ করছেন, তার আগে লেখক হিসেবে একটি শব্দ লেখাও ধৃষ্টতার পর্যায়ে পড়ে। ধন্যবাদ।

“স”: এবার বক্তব্য প্রদানে অনুরোধ করছি জনাব ‘ফ’ কে।

ফ: জনাব “খ”, আপনার “ল” এর ছন্দ উপভোগ করলাম, সত্যি বলতে কী আমার একে সাহিত্য বলতে কণামাত্রও আপত্তি নেই। কারণ, আমাদের দৃষ্টিতে সাহিত্যের প্রধান উদ্দেশ্য আনন্দ দান, আপনি যেটি উল্লেখই করেননি। এই আনন্দের শর্তেই আপনার তথাকথিত “কাঠামোর” ধারণাও বাতিল। এতকিছু মেইনটেইন করে জ্যামিতি হয়-মেকানিক্স-ফিজিক্স-কেমিস্ট্রি-হিস্ট্রি হয়, কোনভাবেই সাহিত্য হয়না। সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যক্তিমানুষ স্বেচ্ছাচারীতায় ঈশ্বেরের কাছাকাছি।তাই, “শেষের কবিতা”, “পথের পাচালি”কে যতই ক্লাসিক-ক্লাসিক করুক সবাই, আমার ভাল না লাগলে সেটি নিকৃষ্টতম সাহিত্য, পক্ষান্তরে ‘স্যাটানিক ভার্স” বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, ভাল লাগলে এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ হবে আমার কাছে। সেইসঙ্গে, আপনার “অবশ্যপাঠ্য নীতিকেও” দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।দেখুন, পাঠকমাত্রই দস্তয়ভস্কি-সার্ত্র পড়া উচিৎ , এটা আমি মানি, তবে সেটি যেন আরোপিত না হয়, কারণ সেক্ষেত্রে পাঠের স্বত:স্ফূর্ততা বাধাগ্রস্থ হবে। বুদ্ধিমত্তা লেভেলের ব্যাপারটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। আমি আর আমার বাসার দারোয়ানের পাঠরুচি নিশ্চয়ই একই হবেনা। সেক্ষেত্রে, ওর বই পড়ার আগ্রহটাকেই এপ্রিশিয়েট করা উচিৎ। ধরুন, আপনি ভীষণ জটিল ভাষা-জটিল দর্শনের মারপ্যাচে একটা কিছু লিখে গোল্ডলিফে সুখটান দিলেন , অথচ সেটি আপনি নিজে বাদে অধিকাংশ মানুষের কাছেই দুর্বোধ্য থাকল; বিশ্বাস করুন, সে মুহূর্তে আপনাকে আমার একজন বিকৃত স্বমেহনকারী ভিন্ন অন্যকিছু মনে হবেনা।এবার, একটি অপ্রিয় প্রসঙ্গে বলি। শিক্ষাজীবন শেষ করে কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, বা চাকুরীজীবী হয়; আপনি কি এমন কোন প্রতিষ্ঠান বলতে পারেন যেখান থেকে পড়াশোনা করে লেখকের চাকুরী পাবেন? এই যেমন, জনাব “খ”, মাসের পর মাস বাড়িভাড়া দিতে পারেননা, প্রতিদিন খবরের কাগজ-লিটল ম্যাগাজিনের অফিসে গিয়ে ধরনা দেন লেখা ছাপানোর তাগিদে, আর ভরদুপুরে ৬টাকার সিঙ্গারা খাবার জন্যও হাত পাতেন পরিচিতজনের কাছে; আপনার কি মনে হয়না, একজন রিক্সাওয়ালার চেয়েও আপনি নিম্নস্তরের জীবনযাপন করেন?তাছাড়া, স্বীকৃতি দেয়ার আপনারা কে?আপনাদের সঙ্গে আমাদের লেখার আঙ্গিকগত পার্থক্য কি? এই যে, দস্তয়ভস্কি-সার্ত্র এর কথা বলে বলে মুখে নোনাজলের ফোয়াড়া ফুটিয়েছেন, আপনারা নিজেরা এমন কি আহামরি সাহিত্য লিখছেন!আরও একটি বিষয় খেয়াল করতে হবে : আমরা কার জন্য লিখি? অবশ্যই পাঠকের জন্য। (পয়েণ্ট অব ইনফরমেশনে ‘গ” এর প্রশ্ন)
-আপনারা লেখায় এমন কোন শিক্ষণীয় বিষয় কি থাকে যেটি পাঠকের কোন কাজে আসে, বা দীর্ঘদিন পরও পাঠক মনে রাখবে?
-এই প্রশ্নটা তো আমি আপনার দিকেও ঘুরিয়ে দিতে পারি। শিক্ষণীয় বিষয়ের প্রসঙ্গেই যদি বলেন, সেক্ষেত্রে সরল বক্তব্য আছে। একটি বই থেকে কী শিক্ষা দিতে চান: ইতিহাস, ধর্ম, নৈতিকতা, বিজ্ঞান-দর্শন? দেখুন এগুলোর জন্য বিষয়ভিত্তিক বই আছে।একটি নিরীহ গল্পের বই থেকে সেই শিক্ষা দেয়ার কী প্রয়োজন?এরপর ধর্ম-নৈতিকতা। আমার আপন ভাবীর সঙ্গে আমার গোপন সম্পর্ক আছে, আর ভক্ত ললনাদের প্রমঙ্গে বলাই বাহুল্য,মদ ছাড়া আমার একদিনও চলেনা; আমি নিজেই তো নৈতিকতা বুঝিনা, তো পাঠককে কী বোঝাবো? একই কথা কিন্তু আপনাদের ক্ষেত্রেও সত্য।তাছাড়া, শুধুমাত্র একজন লেখকই কি যাবতীয় চিন্তা-ভাবনার ইজারা নিয়েছেন?অন্যান্য পেশাজীবীদের জন্য কিছু ছাড়ুন।এরপর কালজয়ী প্রসঙ্গ। আপনি একটা শার্ট কয়বছর পড়েন, একটা ঘড়ি কয়বছর ব্যবহার করেন, কিংবা একই সিনেমা কতবার দেখেন?পৃথিবীর সবকিছুই যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর অচল হয়ে যায়, বইকেও সেই সবকিছুর অন্তর্ভুক্ত করুন না। একটি বইতো শেষপর্যন্ত একটি বই-ই, তাই না? যাইহোক, পাঠক প্রসঙ্গে বলছিলাম। পাঠকের পছন্দকে প্রাধান্য দেই, সেই অনুযায়ী লিখি। এখন আপনারা যদি বলেন, নিজের জন্য লিখেন, পাঠককে থোড়াই কেয়ার করেন, তাহলে বলবো আপনারা বরং ডায়েরী লিখুন, সাহিত্যকে রেহাই দিন আপনাদের বুলিসর্বস্ব সমালোচনা থেকে।সবশেষে একটি কথাই বলবো, আমাদের লেখা পাঠক পড়ে, আপনাদেরকে আমলেই আনেনা_ এই অমোঘ সত্যটি মেনে নিলে ঈর্ষায় আপনাদের হৃৎপিণ্ড ধূসর হয়ে যাবে।সেজন্যই এইসব অর্থহীন কুযুক্তির অবতারণা করছেন।
(ক, খ, গ এর মুখ পাংশু বর্ণ ধারণ করল যেন শেষকথার প্রেক্ষিতে)

“স”: এবার বক্তব্য প্রদানে অনুরোধ করছি জনাব ‘গ’ কে।

‘গ’: আমাদের বোঝা উচিৎ ছিল মূর্খ এবং পাগলের সঙ্গে তর্ক চলেনা। জনপ্রিয়তার ধ্বজাধারী আপনাদের মত লেখকেরা হচ্ছেন একেকজন মূর্খকুলশিরোমণি-রামপাগল। তাই, আপনারা শিল্প নিয়ে কথা বলতে ভয় পান, পাঠকের ধুয়ো তুলে নিজেরা আড়ালে লুকোতে চান। আপনাদের মধ্যে কয়জন শুদ্ধবানানে “সাহিত্য” শব্দটি লিখতে পারবেন, সে ব্যাপারেও আমার ঘোরতর সংশয় আছে।(পয়েণ্ট অব ইনফরমেশনে “ফ” এর প্রশ্ন)
-আপনারা কি পাঠকের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেননা, অথবা আপনাদের রুচির সঙ্গে না মিললেই সে অপাঙক্তেয় পাঠক?এটা কি সাহিত্যের স্বৈরাচারীতা নয়?
-আপনার এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার অভিরুচি হচ্ছেনা, কেননা বইকে আপনারা শার্ট-প্যাণ্ট-ঘড়ির মত নিত্য ব্যবহার্য জিনিসের কাতারে নিয়ে এসেছেন, একটুপর যে টয়লেট পেপারের সঙ্গে মেলাবেননা এমন নিশ্চয়তাই কে দিতে পারে?
(পয়েণ্ট অব অর্ডারে “ব” এর ক্রদ্ধ হয়ে উঠা)
-দেখেন, আমি স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড মানুষ : লিখতে ভাল্লাগে, টাকা পাই, লিখি। এইসব শিল্প “োদার” টাইম নাই। আপনের এত চুলকানি থাকলে লেখা বাদ দিয়া মুদি দোকান দেন। এইসব আবাল োদা প্যানপ্যানানি বাদ দেন, নয়তো কথার লাইনে কথা কন।
( মেজাজ খারাপ করে উঠে দাঁড়াবে)- আপনি গালি দিলেন কেন?
( ততোধিক উত্তেজিত) তাইলে কি চুমা দিমু, এইসব আউল-ফাউল পণ্ডিতরে?এখনও যার গা খিকা গু’র গন্ধ আসতেছে!
(তড়িৎগতিতে “গ” উঠে এসে ‘ব’ এর কলার চেপে ধরবে) খা..র পোলা, তুই গালি দিলি ক্যান?
( সাহিত্য বিতর্ক হঠাৎ করেই অশ্লীল গালাগালি , অত:পর লেখকদের মধ্যে হাতাহাতিতে রূপ নিল। তাদের সামনের টেবিলটা উল্টে গেল, ফ্লোরে পড়ে রইল আধখোয়া সিগারেট, উল্টে যাওয়া চাযের কাপ থেকে ফ্লোরের মধ্যে সবার অলক্ষ্যেই সৃষ্টি হল চায়ের নদী.........)

শকুন্তলা সন্ধ্যায় বাবার হাতধরে আজিজ সুপারে এসেছে জারিফ। আজ ওর জন্মদিন, ৬ থেকে ৭ এ পড়ল এবছর।ওর বাবা বইপ্রেমী মানুষ; ছেলেকেও বইয়ে আগ্রহী করানোর উদ্দেশ্যে জন্মদিনের উপহার হিসেবে বইকেই তার শ্রেষ্ঠতম মনে হয়েছে। “বাবার হাত ধরে ৭বছরের শিশু হেটে আসছে গুটিগুটি পায়ে”- পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি অবলোকন করল আজিজ সুপার মার্কেট এই পিতা-পুত্রের সৌজন্যে। কিন্তু অদুরে হট্টগোল বেধে গেছে, সেখানে লোকে লোকারণ্য। কৌতুহলবশত তারাও ঘটনাস্থলে আসল : ৬-৭জন মানুষ অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছে নিজেদের মধ্যে, এদের কারো পাঞ্জাবী ছিড়ে গেছে চিরে যাওয়া ফুটির মত করে, কারও চুল অবিন্যস্ত হয়ে গহীন অরণ্যে রূপ নিয়েছে, এমনকি দু-একজনের শরীর থেকে রক্তও ঝরছে; উপস্থিত লোকজন তাদেরকে নিবৃত্তের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু তা খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছেনা। জারিফের বাবা ভীড়ের মধ্যে থাকা একজনকে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তর আসল “ আর বইলেননা ভাইজান। এই গাঞ্জাখোরগুলির জন্যে শান্তি নাই,মার্কেটটারে নষ্ট কইরা দিল; দৈনিক সন্ধ্যায় আইসা কী-সব হাবড়ি প্যাচাল পাড়ে, আর মাঝেমধ্যেই এইরকম গ্যাঞ্জাম লাগায়। কিছু কওয়াও যায়না অগো, অরা নাকি লেখালিখি করে। মানে, আপনেরা যাগো লেখক কন আর কি!”
লোকটির মুখে “লেখক’ শব্দটি নির্মম বিদ্রুপের মত শোনালো জারিফের বাবার কানে, তার অস্বস্তি বিবর্ধিত হল জারিফের কৌতুহলী প্রশ্নে- “আচ্ছা বাবা, লেখকেরা এমন মারামারি করে কেন”?
এ প্রশ্নের কোন জবাব তার জানা নেই। তাই ম্লান হেসে ছেলের হাত ধরে বইয়ের দোকানোভিমূখে হাটা ধরল সে। অন্যদিকে জারিফের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ফিরে ফিরে কেবল ঐ কলহের জায়গাতেই চলে যাচ্ছিল এই হাটার মধ্যেও। দুজনে একটি বইয়ের দোকানে ঢুকল; এত বই কখনো একসাথে দেখেনি জারিফ, ওর মাথা ঘুরছে। জারিফের বাবার প্রাণে আনন্দের পহেলা বৈশাখ হচ্ছে যেন, আজ ছেলেকে ইচ্ছেমত বই কিনে দেবে। কিন্তু জারিফের দিকে তাকিয়ে তার পহেলা বৈশাখ ১০ই মহররমের শোকে রূপান্তরিত হল নিমেষে : ওর চোখ অদুরের লেখকদের সেই গোলযোগস্থল থেকে কিছুতেই ফিরছেনা; একবার বই দেখে, তো পরমুহূর্তেই ভীড়ের দিকে তাকায় একলক্ষ জিজ্ঞাসা আর কয়েক কোটি বিস্ময়সূচক দৃষ্টি নিয়ে _”লেখকেরা মারামারি করে কেন” এই প্রশ্নটি ওর ছোট্ট মাথায় এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে নিশ্চিত। জারিফের বাবা মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যে করণীয় স্থির করে ফেলল। ছেলের হাত ধরে দ্রুত বেরিয়ে আসল, এখন তাদের গন্তব্য নিত্য উপহারের টি-শার্ট এর দোকান। দ্র্রুত এগিয়ে যাচ্ছে বাবা-ছেলে, প্রতি পদক্ষেপে বইয়ের দোকানের সাথে দুরত্ব বাড়ছে কয়েকশো মাইল.....!
৩৫টি মন্তব্য ৩০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×