somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ম্যাগনিফাইং গ্লাস (গল্প)

২৮ শে মে, ২০০৯ রাত ৯:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

হতাশাবাদীদের চোখের দৃষ্টিকে আমি সমীহ করি- সেখানে তপ্ত আশাকে বাষ্পীভূত হতে দেখে নিজের শীতল আশাগুলোকে অনেক বেশি লাবণ্যময় মনে হয়।

অন্তত আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের জন্য হলেও চিত্রনাট্য লেখার কাজটি পাওয়া দরকারী ছিল; সেই সেকেন্ড ইয়ার থেকে বিভিন্ন জনের দরজায় ধরনা দিচ্ছি একটা সুযোগের আশায়- বলা বাহুল্য প্রায় সর্বত্রই ঋণাত্মক অভিজ্ঞতা হয়েছে। ওদিকে বোনাস হিসেবে পরিচিতজনদের টিপ্পনি এবং শ্লেষাত্মক উপদেশনামা তো আছেই- “এইসব লেখালেখি হচ্ছে জড়মস্তিষ্কের অথর্ব মানুষদের কাজ, এগুলো বাদ দিয়ে MBA কর, মোটা মাইনের চাকরি বাগাতে পারবে। হবেনা , হবেনা ; নাটক-উপন্যাস লিখে কিচ্ছু হবেনা”।- এই স্বপ্রণোদিত হিতাকাঙ্ক্ষীদের(!) শুভকামনা চুইয়ে চুইয়ে পড়ে আমার আত্মবিশ্বাসের দেয়ালে এমন ঝুকিপূর্ণ ফাটল তৈরি করছিল যে, সেই দেয়ালচাপা পড়ে যে কোন মুহূর্তে নিজেই নিহত হতে পারতাম! এমনই অবস্থায় গত মঙ্গলবার হঠাৎ পত্রিকার মাঝের পৃষ্ঠার একটি বিজ্ঞাপন চোখে চরকা ঘোরালো- “চিত্রনাট্য রচনা প্রতিযোগিতা। সেরা চিত্রনাট্যটি অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হবে ‘কমপ্রেস টেলিফিল্মের’ ব্যানারে এবং চিত্রনাট্যকারকে ২ লক্ষ টাকা পুরস্কৃত করা হবে”। বিজ্ঞাপনটা পড়েই শ্যামাসঙ্গীত শুরু হল মনের মাঝে, অসুরিক এক আত্মবিশ্বাস ভর করল- এই পুরস্কারটা আমিই পাব! টাকার পরিমাণটা বিবেচ্য নয় ; ভাবনার মূল ব্যাপারটা হচ্ছে ক্রিয়েটিভ কাজের একটা প্লাটফরম পাওয়া- যেহেতু চাকরি করার ন্যূনতম ইচ্ছাও আমার নেই।

আজ ১৫ই মার্চ, চিত্রনাট্য জমাদানের শেষ সময় ৩০শে এপ্রিল বিকেল ৫টা পর্যন্ত- অর্থাৎ প্রায় ৪৫দিনের মত সময় পাচ্ছি আমি। কিন্তু লিখতে গিয়ে অযাচিত এক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি গতকাল থেকে- লেখার বিষয়বস্তু ঠিক করতে পারছিনা, ২-১টা বিষয় নির্বাচন করে কয়েক পৃষ্ঠা লেখার পর দেখা গেল সংলাপগুলো মঙ্গাপীড়িত হয়ে যাচ্ছে, চরিত্রগুলোর দশাও অনেকটা বানভাসী মানুষের মত সহায়-সম্বলহীন। ১যুগের বেশি বয়সী লেখালিখি জীবনে ভাল-মন্দ যা-ই লিখি, লিখতে গিয়ে কখনোই এ ধরনের উদ্ভট পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি, অথচ জীবনের সম্ভাব্য মোড় ঘুরানো একটি সুযোগের সামনে এসে হাতের আঙ্গুলগুলো টিউনিক ফর্ক হয়ে কাঁপছে, মস্তিষ্কও যোগান দিচ্ছে যত্তসব গতানুগতিক-ক্লিশে গল্পের প্লট।

গত দেড়দিনে গুণে গুণে ৪৩টি সিগারেট শেষ করেছি, কিন্তু তাতে রুমে সিগারেটের বধ্যভূমি তৈরি হওয়া ছাড়া বিশেষ কোন কার্যসিদ্ধি হয়নি- আইডিয়া,..আইডিয়া; they readily left me alone. চিত্রনাট্যটি অবশ্যই ভিন্নধর্মী হতে হবে, কাহিনীতেও থাকবে অভিনবত্ব, কিন্তু আমার মননশীলতা যে ধর্মঘট আহ্বান করে বসেছে! দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত কোন রোগীকে ডাক্তার আয়ুসীমা বেধে দিলে তার মানসিক অবস্থাটা যেমন হয়, সৃজন অক্ষমতার ক্রমাগত পীড়নে আমিও সেই মৃত্যুপথযাত্রী রোগী হয়ে উঠছিলাম - সিগারেটের ছাইগুলিকে ফ্যানের বাতাসে রুমময় ছড়িয়ে পড়তে দেখে।

আমার প্রতি সময়ে-অসময়ে পাপড়ির প্রযুক্ত শর্তগুলোকে যদি লিখে রাখা যেত, তবে নির্দ্বিধায় বলতে পারি- সেই শর্তনামা কবি ফেরদৌসীর শাহনামা গ্রন্থের চেয়ে কোনক্রমেই ছোট হতনা আকারে। আমাদের সম্পর্কটাকে অনিঃশেষ ভালবাসারই বলব, কিন্তু শর্তাবলীর ঘনত্বে তার প্রকাশটা প্রায়শই আরোপিত লাগে। মাঝে মাঝে বিরক্তিরও সঞ্চার হয়, আবার ভাবি এই আরোপিততাটাই সম্পর্ককে চিরাচরিত ছকবদ্ধ না করে উন্মুক্ততা দিয়েছে- প্রাত্যহিকতাকে রূপায়িত করেছে অণুবীক্ষণিকে।
লেখালিখির বখাটেপনায় ফার্স্ট ইয়ারে ৩সাবজেক্ট ফেল করার পর লেখকসত্তাকে সমাহিত করার যাবতীয় বন্দোবস্ত প্রায় সম্পণ্নই করে ফেলেছিলাম ; সেসময় একমাত্র পাপড়ির নিরন্তর উৎসাহেই লেখক আলভি বেঁচে যায়। লেখাটা যেহেতু চিত্রনাট্যে পাচ্ছেনা সহসাই, সুতরাং অহেতুক কলমের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ না বাড়িয়ে পাপড়ির কাছে গিয়ে আপাতত নিথর চিন্তাগুলোকে স্বাবলম্বী করাটাকেই সমীচীন বোধ হল। এই চিত্রনাট্য লেখায় অবচেতনভাবেই তার যে একটা নিউক্লিয়াসসুলভ ভূমিকা থাকবে, আমার দীর্ঘক্ষণ প্লটহীন থাকা মাথা এই তত্ত্বটি বুঝতে একটুও দেরি করেনি- আমাদের যৌথ প্রচেষ্টায় খণ্ড খণ্ড শব্দের শিশিরে ভরে যাবে চিত্রনাট্যের সরোবর, সেই শিশিরের শরীর ছুয়ে থাকবে সম্পর্কের প্রতিকৃতি!

'আচ্ছা আলভি, তুমি কি লেখালিখির ব্যাপারে কখনই সিরিয়াস হবেনা? তোমার অমন ভোতা চাহনিই বলে দিচ্ছে - লেখা থেকে দূরে আছো। সেদিন কিন্তু পত্রিকায় ঐ বিজ্ঞাপনটা পড়ে তোমার প্রতিক্রিয়া দেখে আশাবাদী ছিলাম- প্রতিযোগিতাটা সিরিয়াসলি নিচ্ছো।'- পাপড়ির বক্তব্যের বাহুল্যে কথা বলার ফ্লোরই পাচ্ছিলাম না; অনেকটা ভীড়ের মধ্যে শরীর ঠাসাঠাসি করার মত কথাকেও একফাকে ঠেসে দিলাম- এই প্রশ্নের মীমাংসা তো ফার্স্ট ইয়ারেই হয়ে আছে; যতদিন নিজের খুশিতে লিখতাম, ততদিন লেখাটাকে সাবান-টুথপেস্ট এর মতই তুচ্ছ নিত্য ব্যবহার্য জ্ঞান করতাম , কিন্তু যখন থেকে তোমার জন্য লিখি , তখন থেকেই লেখা সরাসরি ধমনীতে লীন হয়ে গেছে।
পাপড়ি আমার কথাটাকে কেড়ে নিল, রোদেলা বৃষ্টির মত ক্ষণস্থায়ী হাসি আছড়ে পড়ল তার মুখের মালভূমিতে- ' তোমার প্রতিটি লেখার পরতে পরতে আমার মতামত নাও, কাহিনীর আগ্রগতি-অধোগতি জানাও ; কই , চিত্রনাট্যের ব্যাপারে তো কিছুই বললে না এখনো। এমনকি তুমি যে কোন্ থিমে কাহিনী সাজাচ্ছো সেটা পর্যন্ত জানিনা।'
আমি অর্ধবৃত্তাকারে মাথা ঝাকালাম- to be very honest, আমিও জানিনা। ২দিন ধরে ঝিম বসে আছি- কোন এক্সট্রা অর্ডিনারী প্লট পাইনি এখনো- মরুভূমির প্রচণ্ড গরমের মধ্যে পিপাসায় যে অনুভূতি হয়, ধরে নাও আমিও তেমন বিভৎস তৃষ্ণায় নাভিশ্বাস তুলছি।
পাপড়ি খানিকটা বিরক্তই হল- 'এই হামবড়া কল্পনাই তোমার লেখার প্রধান ত্রুটি । চ্যানেলে চ্যানেলে দেদারছে স্ক্রিপ্টবিহীন নাটক-সিনেমা হচ্ছে, অথচ তুমি এক্সট্রা অর্ডিনারী প্লট নামের হীরার হরিণের আশায় সিগারেট নিধন করে যাচ্ছো।
আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হলাম- তুমি তো জানই, যূথবদ্ধতা আমার অসহ্য লাগে, তাই চিরায়ত চেনা দৃষ্টিসীমাকে সযত্নে এড়িয়ে গিয়ে নতুন দৃষ্টিসীমা নির্মাণেই আমার যত ঝোক। সেক্ষেত্রে একই কাহিনী-একইচরিত্র-একই উঠাবসা- নাহ, আমার পক্ষে অসম্ভব।

হঠাৎ আলোচনায় ছেদ পড়ল বাদামওয়ালার আবির্ভাবে- পাপড়িই ডেকে এনেছে; ৫টাকার বাদাম কিনে বিদায় করল তাকে।
-আচ্ছা, এই বাদামওয়ালাটিকে কোন ধরনের মানুষ মনে হল তোমার?- জানতাম এ ধরনের প্রশ্ন সে করবেই।
-সাধারণ মানুষ যেমন হয়।
-তোমার দাবা খেলার প্রতিপক্ষ ফাহিম ভাই, কিংবা আমাদের গীতিকার-বন্ধু রিয়াদকে?- প্রশ্ন যেন তৈরিই ছিল তার।
-অধিকাংশ সময়ই সাধারণ লাগা দুজন অসাধারণ মানুষ।
- আর নিজেকে?- এই প্রশ্নটিরই আশঙ্কা করছিলাম শুরু থেকে। ‘অবান্তর প্রশ্ন’- বলে দ্রুত প্রশ্নের বলয় ছিন্ন করতে চাইলেও তার ঠোটের ট্রাপিজিয়াম আকৃতির স্মিত হাসিতে বুঝলাম - বেশকিছু অম্লীয় সত্য হজম করতে হবে চরম অরুচি সত্ত্বেও।
-‘জমির মায়া’ নামের সেই রুশ গল্পটা মনে আছে? ওই যে, নব্যধনী পাখনকে বলা হল- সে সূর্যাস্তের আগে যতটুকু জায়গা ঘুরে শুরুর জায়গায় ফিরতে পারবে, পুরোটাই তার জমি হবে! কিন্তু সে এতটা পথ চলে গেল যে সূর্যাস্তের আগে প্রাণপণে নির্ধারিত স্থানে ফিরতে গিয়ে মারাই পড়ল বেচারা।- শুনতে অপ্রিয় হলেও , তোমাকে একজন উচ্চভিলাষি পাখনই মনে হচ্ছে আমার। আসলে, সাধারণ আর গতানুগতিকতার পরিসরটা এত বড় যে সমগ্রজীবন ধরে গুটিকয়েক মানুষই কেবল সেই পরিসর ভাঙতে পারে। তাই তোমাকে গতানুগতিকতাকে সারথি করেই কাজে নামতে হবে। তার চেয়ে বরং চিত্রনাট্যে প্রেজেন্টেশনের স্টাইলটা ভিন্নধর্মী করার আইডিয়াটা ভাবতে পার- এর জোরেই অনেক সীমাবদ্ধতা উৎরে যাবে।
অযৌক্তিক কিছু বলেনি সে, তবুও মানতে কষ্ট হচ্ছিল- এই দোটানার সময়গুলোতে আমি সিগারেটের শরণাপণ্ন হই, কিন্তু পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করতেই পাপড়ির ডান হাতটা বাঁজপাখি হয়ে উঠল- ছো মেরে প্যাকেটটা কেড়ে নিল- কী ব্যাপার, শর্ত নম্বর ১৭ ভুলে যাওয়া হচ্ছে?’
নতুন কথা শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে একটু বিরতি নিল সে। এরপর আবার শুরু করল - ' কমপ্রেস টেলিফিল্ম থেকে যেহেতু সিনেমা হবে, তাহলে তো চিত্রনাট্যের ধরন সম্পর্কে অব্যর্থ ধারণা করাই যায়- শম্বুকগতির কাহিনী, কলাকুশলীরা প্রায় সবাই টিভি মিডিয়ার, সঙ্গে বিশেষ আকর্ষণ দু-একজন চলচ্চিত্র তারকা, এই তো! এর বাইরের অবশ্যম্ভাবী বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে- সিনেমাটি পুরো ৩ ঘণ্টা দেখার পরও একে টেলিছবিই মনে হবে। ব্যস, এজন্য তো ‘ব্রেভহার্ট’ মানের কোন স্ক্রিপ্ট লেখার প্রয়োজন নেই!

আমার আজ পাপড়ির চেয়ে বিমর্ষতাকেই বেশি আবেদনময়ী লাগছে, তাই তার প্রার্থিত সঙ্গকে উপেক্ষা করে অনায়াসেই বিমর্ষ থেকে বিমর্ষতর হতে পারছি। মনে মনে সে-ও কি বিমর্ষতাকে প্রতিপক্ষ ভাবছিল? সেজন্যই বোধহয় আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে মৃদু টান দিল- চলতো, সিনেপ্লেক্সে যাব; পিসিতে মুভি দেখে দেখে চোখে হাইপারটোমিয়া হয়ে যাচ্ছে- কতদিন সিনেপ্লেক্সে যাওয়া হয়না , অথচ আমাদের এ সংক্রান্ত একটা প্রতিশ্রুতি ছিল- সেটা ভুলেই গেছ, তাইনা?
-এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিম্নমানের রসিকতাই আমার ভরসা। এবারও ব্যত্যয় ঘটলনা- আচ্ছা বলতো কাক পাখি নাকি পক্ষী?সে যা-ই হোক, এই কাক প্রাণীটিকে একদিন আমি উচিৎ শিক্ষা দেব- ওর কর্কশস্বর শুনেই ঘুম ভাঙ্গে প্রতিদিন ; ব্যস, প্রতিশ্রুতিও ভুলে যাই!- কথাটা বলে অনেকটা জোর করেই হেসে ফেললাম।

বেশ বুঝতে পারছি- আজ লেখা আসবে। আলোর কোয়াণ্টাম তত্ত্বের আদলে গুচ্ছ গুচ্ছ সংলাপ বেরিয়ে আসবে নিরবিচ্ছিন্নভাবে।

ক্লাসে আমার এ্যাবসেন্ট থাকাটা এতটাই অবধারিত যে ভুলক্রমে ২-১দিন ক্লাসে গেলে সেটাই একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে উঠে। কিন্তু পাপড়ি মোটামুটি নিয়মিত ছাত্রী, তাই ক্লাস বাদ দিয়ে তাকে আমার ফ্ল্যাটে চলে আসতে বলে অস্বস্তিবোধ করছি। অবশ্য এই অস্বস্তিটাই আমাকে পরম স্বস্তি দিবে এটাও অনুমেয়্- মাথায় কেবল চরিত্রের বহুরূপী বেলুন উড়ছে; সেই বেলুনগুলোকে সর্বোচ্চতায় পৌছতে হলে ‘পাপড়ি’ নামের হিলিয়াম গ্যাসটির কোন বিকল্প যে আমার জানা নেই!

-‘ভাবছি নায়কচরিত্রটি শেষের কবিতার অমিত রায়ের সেমিক্লোন করবো; আইডিয়াটা কেমন?’-এই প্রশ্নে পাপড়ির কাছ থেকে তেমন আশাব্যঞ্জক সাড়া পেলাম না- ‘প্রাগৈতিহাসিকযুগীয় আইডিয়া। অমিত রায় চরিত্রটি আদ্যোপান্তই আত্মম্ভরীতায় পূর্ণ, যে কিনা সর্বক্ষণ নিজেকে ব্যতিক্রম সাজানোর অপেচষ্টায় মত্ত। সেই তুলনায় লাব্ণ্য চরিত্রটি যথেষ্টই নিষ্প্রভ- শেষপৃষ্ঠার ‘হে বন্ধু বিদায়’ চিঠিটার আগ পর্যন্ত তার চরিত্রটাকে বলব ইতালীয়ান রক্ষণাত্মক ফুটবলের প্রতিমূর্তি।‘

একটু পরেই তার মধ্যে নতুন করে উন্মাদনা দেখলাম চরিত্রের ব্যাপারে- আচ্ছা, দি ট্রায়ালের জোসেফ চরিত্রটি তো বিবেচনায় রাখা যায় – সম্পূর্ণ স্বাধীন জীবনযাপন করা সত্ত্বেও, সমাজের আইন বলছে তাকে নাকি গ্রেফতার করা হয়েছে, যদিও গ্রেফতারের সংবাদ নিয়ে আসা অফিসাররাও জানেনা তার অপরাধ কী। অদ্ভুত অভিযোগে প্রাণদণ্ডও হল, কিন্তু সে নির্বিকার! (আবার বিরতি দিয়ে) তবে তুলনামূলকভাবে আউটসাইডারের নায়ক চরিত্রটিই নির্মোহতার নিরিখে বেশি আকর্ষণীয়- মায়ের লাশের পাশে বসে নৈশপ্রহরীর সঙ্গে সিগারেট শেয়ার করছে, মায়ের শবযাত্রায় শরিক হয়েও কান্না আসছেনা একটুও- জীবনকে সে শুধুই একটা পর্যবেক্ষণ হিসেবে দ্যাখে, যে নিজে একজন প্রতিক্রিয়াশূন্য পর্যবেক্ষক!

পাপড়ির স্ববিরোধী কথা-বার্তায় হতাশই হলাম; সেটা সরাসরি বলেও ফেললাম- ধুর, কাম্যুর গল্পের চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্বিক জটিলতা বাঙালির ফ্যান্টাসি লালিত মস্তিষ্কে ধরবেনা, বরং দূরবীনের ধ্রুব টাইপ অপ্রকৃতিস্থ চরিত্রগুলো এদের স্বপ্নের ক্যানভাস।

-আমার কথায় পাপড়ি সম্ভবত বাস্তবতায় প্রত্যাবর্তন করল- তাহলে কবি উপন্যাসের নিতাইচরণকে নিয়ে ভাবতে পার- এত কষ্ট, এত গঞ্জনা আর বিচ্ছেদে জর্জরিত হয়েও জীবনের সাধ তার মেটেনা। তাই তো বারেবারেই সে বলে- ‘জীবন এত ছোট ক্যানে?’

আমার উগ্র মননশীলতা আমার মাথায় কষে চপেটাঘাত করল- আমি কেন কালজয়ী চরিত্রের ছায়া অবলম্বনে চরিত্র সৃষ্টি করতে চাইছি?

তাই সহসাই সিদ্ধান্ত পাল্টে বললাম- চরিত্র রিভিউ বাদ, এবার নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ঘরের আনাচে-কানাচে কম্প্রোমাইজিংয়ের চিহ্ন- এই থিমের উপর স্ক্রিপ্ট লিখবো।
-বহুদিন বাদে পাপড়ির ঘনকাকৃতির হাসিটা আবার দেখা গেল এই প্রস্তাবে- "কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই প্লটটা মানুষকে ভাবায়না। পুরস্কারের প্রশ্ন যেহেতু জড়িত, তুমি কোন মানবিক ইস্যুকে ভিত্তি ধরে স্ক্রিপ্ট লেখো, সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। যেমন, পথশিশু; এটা মোক্ষম একটা প্লট হতে পারে। সংলাপগুলো হবে এমন, যেন শুনলেই চোখে মুষলধারে বর্ষার বৃষ্টি নামে। এই স্ক্রিপ্ট নির্বাচিত না হওয়ার কোন কারণ দেখছিনা, কারণ চক্ষুলজ্জা বা নিজেদের ঔদার্য শ্রোতামহলে সেরদরে বিক্রির এমন সুযোগ কর্তৃপক্ষ হারাতে চাইবে না ; তুমিও হারিও না। নিগূঢ় ব্যাপারটি তো সবাই বোঝে- ওরা আবেগকে পুঁজি ধরেছে, তুমিও আবেগেরই ফাকাবুলি লগ্নি করছো ; the deal is simple and vivid.

বিবেকবোধ আমার কখনই প্রবল নয়, তাই পাপড়ির এহেন নির্লজ্জ বৈষয়িক পরামর্শটাতে মোহিত হলাম পুরোমাত্রায়, আবার মনোবৈকল্যেও ভুগছি- সে ও কি আমার মতই পেশাদার হিপোক্রেট?

৩১শে মার্চ পর্যন্ত- পথশিশুদের নিয়ে লেখা স্ক্রিপ্টটা অনেকদূর এগিয়েছিল, কিন্তু ১ তারিখের প্রচণ্ড মানসিক অবসাদগ্রস্ততা লেখার প্রবাহকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে কাকড়া বিচ্ছুর মত বিষাক্ত মনে হচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার বিশেষকাজে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পর। কথা প্রসঙ্গে মা-কে বলেছিলাম এতবড় বাড়িতে এভাবে একা না থেকে বৃদ্ধাশ্রমে যাবেন কিনা, সেখানে সমবয়সী অনেক মানুষকে পাবেন, সময় ভাল কাটবে। কথাটা শুনে মা প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছেন, আমার বাকি ৪ভাইবোনেরা বলে দিয়েছে- বিশেষ প্রয়োজন না পড়লে আমি যেন আর বাড়িমুখো না হই।
বাবা মারা গেছেন প্রায় ১ যুগ , বোনেদের বিয়ে হয়ে গেছে, ভাইয়া ঘোড়াশালে চাকরি করছে, আমারও ঢাকা থেকে আর ফেরা হবেনা- বছরের পর বছর মা এই যে বাড়িতে একা পড়ে থাকেন, এটা কোন ধরনের জীবন? আমার পরিকল্পনা ছিল মা’কে বলব আরেকটা বিয়ে করেন- যৌবনে বিয়ের হয়ত অনেক অর্থ হয়, কিন্তু বৃদ্ধবয়সে বিয়ের অর্থ একটাই- পরস্পরের স্মৃতির প্রতিবিম্ব হওয়া। কিন্তু এই প্রস্তাবটা উত্থাপনের সাহস পাইনি- আমার ভাই-বোনেরা সারাবছর মায়ের খোজখবর না নিলেও, এ ধরনের কাজ করলে যে তাদের মান-সম্মান বলতে কিছু থাকবেনা, সেটা বুঝতে পারি। আমার ভাবনা আমার মাঝে নিয়েই ঢাকা ফিরলাম। সারাটা পথ, বাসের চাকার ঘূর্ণনের সাথে সাথে মায়ের সংগ্রামী জীবনের চিত্রটাও ঘুরছিল মাথায়।
নাহ, পুরস্কার পাই, বা না পাই, স্ক্রিপ্টটা মায়ের জীবন নিয়েই লিখবো।

জীবনে এমন বৈশাখী আমেজ খুব বেশি লাগেনি। মাত্র ৪দিনেই স্ক্রিপ্টটা লেখা শেষ হয়েছে। মাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে রীতিমত ধ্যান করতে হয়েছে - মনে হচ্ছিল যাকে নিয়ে লিখছি আর যাকে চিনি- দুইজন ভিন্ন মানুষ, কিংবা মাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে অহেতুক আবেগের সুড়সুড়ি দিচ্ছি। তবুও এটিই একমাত্র লেখা, যেটি লিখে মনে অবিরল প্রশান্তি ঝরেছে।
গতকাল পাপড়ি এসে স্ক্রিপ্টটা পড়েছে- সে অভিভূত ; যাওয়ার সময় স্ক্রিপ্টটা নিয়েও গেছে- রুমমেটদের সঙ্গে এই অনির্বচনীয় অনুভূতিটা শেয়ার করতে চায়।

“তোমাকে তো অনেকদিন কিছু দেয়া হয়নি, স্ক্রিপ্টটা পড়ে এতটাই হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম যে, ভাবলাম তোমাকে কিছু না দিলে অন্যায় হয়”।– পাপড়ির হাস্যোজ্বল প্রশংসায় আমি যথাসম্ভব লাজুক হওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তাতে নিজেকে আরো বেশি বেহায়া মনে হতে লাগল । তবুও কোনমতে বললাম- দেখ, এটা আমার কাছে শুধুই একটি লেখা নয় আর, অজান্তেই হৃৎপিণ্ডের খণ্ডিতাংশ হয়ে উঠেছে।
-ব্যাগ খুলে সে যখন উপহারটি আমার সামনে রাখল, তখন মারা যাওয়াটাই সবচেয়ে সুখের পরিণতি হত আমার - পুরো স্ক্রিপ্টটাকে সে কুচি কুচি করে ছিড়েছে; কাগজের ছেড়া টুকরোগুলো আমার ক্ষতবিক্ষত লাশ!
অথচ তার মধ্যে সামান্যতম অপরাধবোধও দেখতে পেলাম না। স্বাভাবিক কণ্ঠেই সে বলতে লাগল- 'তোমাকে অনেক বড় হতে হবে আলভি। আমি জানি, তুমি এই পুরস্কারটা জিততে পারতেনা, কারণ লবিং-তদবির করে অমুক পরিচালক-তমুক প্রযোজকের কোন স্বজনের বস্তাপচা স্ক্রিপ্টই পুরস্কারটা পাবে, তোমার লেখাটার মূল্যায়ন হবেনা। তাছাড়া, এই লেখাটার জন্য তুমি জীবনভর আফসোস করবে- প্রত্যেকটা লেখা শেষ করে এর সাপেক্ষে তুলনা করতে বসবে। ছিড়ে ফেলে আমি তোমার লেখকসত্তাকে নবযৌবন দিলাম- তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ লেখাটা নাহয় অপ্রকাশিতই থাকল ।
- শেষের কথাটা বলে পাপড়ি শিশুসুলভ সরলতায় কাঁদতে কাঁদতে আমার কাধের উপর মাথা এলিয়ে দিল, কিন্তু আমি নিশ্চল বসেই রইলাম - আউটসাইডারের নায়কের চেয়েও আমি এখন অনেক বেশি প্রতিক্রিয়াশূন্য!

আশাবাদীদের চোখের দৃষ্টিকে আমি বিদ্রুপ করি- সেখানে হতাশাকে অর্ধচন্দ্র পেয়ে বিতাড়িত হতে দেখে নিজের হতাশাকে সিগারেটে ভরে সুখটান দেই।
............................................................................................

এই সিরিজের আগের গল্পগুলো
পৈসু বিন্যাস
৭দশ ১' একাত্তর
সম্পূরক কোণ
লিখি চলো
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মে, ২০০৯ রাত ১:১৭
৪৭টি মন্তব্য ৪১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×