somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৯.৪.২০০৯ (গল্প)

১২ ই জুলাই, ২০০৯ ভোর ৬:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই গল্পটি কেমন হতে পারে?
হতে পারে তাজুলের সাময়িক প্রশ্নহীনতা , মিশার মনস্তাত্ত্বিক বিস্ফোরণ, উর্মির শৌখিন নিঃসঙ্গতা, পিয়ার হু কেয়ারস জীবনযাপন, কিংবা সুমাইয়ার ডাহুকের মত বেঁচে থাকার গতানুগতিক গল্প, এমনকি পুরো গল্পটাই হয়ে উঠতে পারে নিরর্থক শব্দবিন্যাসের প্রয়াস। একটি গল্প তো শেষ পর্যন্ত নিছক গল্পই- যা না লিখলে বা না পড়লেও নতুন কোন বোধের জন্ম বা মৃত্যু ঘটবেনা।

গতরাতে তাজুলের ঘুমুতে ঘুমুতে সাড়ে ৩টা বেজে গিয়েছিল- সেইসাথে দৈনন্দিন জীবন থেকে আরও একটি অসৎ দিনের পরিসমাপ্তি।

অফিসে আসার একটুপরই চিন্তাটা তার মাথায় এল- অনেকদিন তো বাঁচা হল, এবার আত্মহত্যা করি! কিন্তু আত্মহত্যা করার জন্য একটি গ্রহণযোগ্য কারণ খোজা দরকার। এই চিন্তায় নিজেরই হাসি পেল- আজ বোধহয় কাজের চাপ একটু কম, তাই সাবকনশাস মাইন্ড সক্রিয় হতে চাইছে!

টেবিলের পেপারওয়েটটাকে অনেক্ষণ ধরে বর্তুলাকারে ঘুরাচ্ছে সে; একটু আগের ভাবনাটা আবার ফিরে এসেছে, তবে এবার একটু অন্যভাবে- আত্মহত্যার কারণ না খুঁজে বেঁচে থাকারই একটা যৌক্তিক কারণ কী হতে পারে! এখানেও বিপত্তি- এমন কোন যুক্তি সে পাচ্ছেনা যার ভিত্তিতে জীবনটাকে প্রলম্বিত করতে পারে। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এরকম , মারা যাবার মত কোন কারণ নেই, বাঁচারও তাড়না নেই- এমন সাম্যাবস্থায় মৃত্যুর দিকেই তার পক্ষপাত।

এই ৩৭বছরের জীবনে তার অনুতপ্ত হওয়ার মত নিয়ামক অগণিত- ভার্সিটি জীবনে বন্ধুর থিসিস পেপার নিজের নামে চালানো, পেশাগত সাংবাদিক জীবনে অর্থের বিনিময়ে প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার, নরসিংদির সেই অসহায় মেয়েটিকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গর্ভসঞ্চার ঘটানো, বড়বোনের বান্ধবীর সঙ্গে পরকীয়া- অনুশোচনায় দগ্ধীভূত হওয়ার জন্য এর সিকিভাগ কারণই যথেষ্ট, কিন্তু এর কোনটিই তাকে ভাবিত করেনা- বার্ধক্যে ইবাদত-বন্দেগীটা দস্তুরমত পালনের জন্য হলেও যৌবনে কিছু পাপ করা নাকি আবশ্যক! সুতরাং আরও নিকৃষ্ট কিছু পাপ করে অনুতপ্ত হতে হবে, নইলে সহসাই আত্মহত্যাটা করা যাচ্ছেনা যে; এবার তাহলে দিনের কার্যসূচী শুরু হোক।

প্রতিদিন এই একই নাটকের মাধ্যমে তাজুলের তথাকথিত সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। এই নাটকের একমাত্র নির্দেশক, অভিনেতা, দর্শক সে স্বয়ং, তবুও এটাই চলে- হয়তবা নিজের কুৎসিত কর্মকাণ্ডগুলোকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার হীন প্রয়াস থেকেই এর উদ্ভব।

ব্যস, পেপারওয়েটটা যথাস্থানে রেখে পকেট থেকে বন্ধ ৩য় মোবাইলটা বের করে চালু করল সে। এই নম্বরটা শুধু তার নিজস্ব কর্মীদের জন্য, যারা বিভিন্ন কর্পোরেট হাউস, মন্ত্রণালয় কিংবা বিদেশী দূতাবাস ও চোরকারবারীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যম । আজ বিশেষ কোন আপডেট নেই, শুধু মায়ানমার থেকে অস্ত্রের একটা বিরাট চালান আসবে রাতে, এর ছোট্ট একটা অংশ পুলিশ ধরবে- এমনটাই প্রাথমিক পরিকল্পনা; তার দায়িত্ব হচ্ছে এ বিষয়ে একটা তোলপাড় সৃষ্টিকারী রিপোর্ট লেখা, যাতে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলতে থাকে সপ্তাহখানেক, আর সেই সুযোগে আস্ত্রের চালানটি নির্বিঘ্নে মালিকের কাছে পৌছে যায়। এধরনের রিপোর্ট লিখে লিখেই সে আজ প্রথিতযশা সাংবাদিক- এতে রোজগার হয়, খ্যাতিও বাড়ছে, পক্ষান্তরে অনুশোচনা হচ্ছেনা একটুও, তাই আত্মহত্যাও করতে হচ্ছেনা!
৩য় ফোনটা অফ করে বৃটিশ ট্যাবলয়েড খুলে বসল সে- এঞ্জেলিনা জোলির কিছু এক্সক্লুসিভ ছবি ছেপেছে; এ নিয়ে নিশ্চিত মামলা হবে, জোলি একটা বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পাবে- এটাও তার রিপোর্ট লেখার মত কোন পাতানো খেলা নয়তো!

আজ মন বেশ প্রফুল্ল, এমন দিনেই সাধারণত তার ২য় ফোনটা সচল হয়। এই নম্বরটা অনেকেই জানে, তবে একজনের কাছে এই নম্বরের ফোন বিশেষ অর্থবাহী- তার সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হয়, ১নম্বর ফোন থেকে কথাও হয়, তবুও এইফোনে তাকে ডাকলেই ধরে নিতে হবে আজ বিশেষ দিন। তবে ইদানীং বিশেষ দিন এত নিয়মিত আসছে যে, ক্রমেই তা বিশেষত্বহীন হয়ে পড়ছে। নম্বর বদলাবে, নাকি নম্বরের মানুষটাকে বদলাবে সেই সিদ্ধান্তহীনতার কালেই তার মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে প্রস্তুত হচ্ছে রিপোর্টের খসড়া।

সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কখনই দোটানায় ভুগতে হয়না বলে মিশার অধিকাংশ সিদ্ধান্তই ভুল সিদ্ধান্তের বলি হয়, আজ সকালের সিদ্ধান্তটাও তেমন এক ভুলের দৃষ্টান্ত- নতুন চাকরিটা সে ছেড়ে দেবে। গত ২বছরে এটা তার ৫ম চাকরি ; খুব ভাল না হলেও মাঝারি মানের চাকরি জুটাতে তার খুব বেগ পেতে হয়না, কিন্তু কোথাও স্থির হতে ইচ্ছা করেনা- স্থির হতে গেলেই নিজের অক্ষমতা আর বিকারগ্রস্ততার অতীত তাকে রেটল স্নেকের ক্ষিপ্রতায় আক্রমণ করে। একই কারণে পরিবারের মানুষদের সাথেও প্রকাশ্য দুরত্ব তৈরি হয়েছে, অথচ মাত্র ২বছর আগে এই মানুষটিই পরিবার অন্ত:প্রাণ ছিল, এরপরই সেই নির্মম ছন্দপতন। কিছুদিন সবাই মিলে তাকে নানাভাবে ছন্দোবদ্ধ করতে চেয়েছে, কিন্তু তার একগুয়েমিতে তারা নিস্পৃহ হয়ে পড়েছে- তার স্বাধীন ইচ্ছায় কেউ হস্তক্ষেপ করেনা আর ; এখন সে ছাদের ছোট্ট চিলেকোঠায় একা থাকে, কাজের বুয়া সেখানে খাবার দিয়ে যায়, হয়তবা সপ্তাহে বা মাসে একদিন মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে নিচে নামে , এবং চাকরি খুঁজে- চাকরি ছাড়ে।

এই চাকরিটা ছিল ইনস্যুরেন্স কোম্পানীর- তার অধীনে কয়েকজন কর্মী থাকবে, তারা ক্লায়েন্ট নিয়ে আসবে, সে তাদেরকে বীমা করতে প্রলুব্ধ করবে, সেই অনুযায়ী কমিশন পাবে। প্রথম ২মাস কাজটা উপভোগ্য ছিল- অনেকেই বীমা করতে আগ্রহী হয়েছে, কিন্তু এ মাসেই হঠাৎ বিবেকের কাছে সে প্রশ্নবিদ্ধ; প্রশ্নটা রুচিবোধের - ঢাকার বাসগুলোতে ক্যানভাসাররা যেভাবে তাদের পণ্যের গুণকীর্তন করে, নিজেকেও তেমন কেউ লাগছিল, কারণ ৩মাস আগে ডেসটিনি কোম্পানীর কাজে ইস্তফা দেয়ার নেপথ্যেও ছিল ক্যানভাসার শব্দটি। ডেসটিনির প্রোডাক্ট বিক্রি করার জন্য তো ভার্সিটি থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেয়ার কোন প্রয়োজন ছিলনা, গুলিস্তানের কোন হকারের অধীনে ১মাসের প্রশিক্ষণই যথেষ্ট- এ কাজে টাকা যতই আসুক।

চাকরি ছাড়াটা যেমন অভ্যাস, তেমনি আগে থেকে বিকল্প প্রস্তুতিও নেয়া থাকে তার। সাংবাদিক তাজুল ইসলামের ছোট ভাই তার ভার্সিটি জীবনের বন্ধু। ওর সূত্র ধরেই তাজুলের সঙ্গে কথা হয়েছে গতমাসে, লোকটাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করে সে। এমনিতে সাংবাদিকতায় আগ্রহ তার নেই বললেই চললে, তবুও যতদিন না অন্যকোন গতি হচ্ছে, মন্দের ভালো হিসেবে এই পেশায় লেগে থাকাই যায়; তাছাড়া এমন একজন আদর্শবান মানুষের অধীনে কাজ করার সুযোগটাও হাতছাড়া করা উচিৎ হবেনা।আজ বিকালে ইন্টারভিউ।

Nero fiddled while Rome was burning, এই প্রবচনের বঙ্গানুবাদ কারো পৌষমাস, কারো সর্বনাশ, কিন্তু মিশার সাপেক্ষে এটিকে ‘যার সর্বনাশ, তারই পৌষমাস’ লিখে দেয়া যায়।২বছর আগে তার জীবন দিগভ্রষ্ট হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই দিকভ্রষ্টতা কি নতুন দিক উন্মোচন করেনি? অফিস-বাসা-পরিজনের সেই গণ্ডিবদ্ধ জীবনকে উপেক্ষা করে সে এখন প্রকৃতির কাছে চলে যেতে পারছে অহর্নিশি- এতবড় দেশের কয়টা অঞ্চলই বা তার চেনা ছিল! মাত্র ২বছরে ২৫টি জেলা ঘুরা শেষ, সামনের চাকরিটা কোনরকমে ৬মাস চালানো গেলে একবার দার্জিলিং ভ্রমণের ইচ্ছা আছে। সত্যজিত পড়তে পড়তে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর দার্জিলিং কে নিজের মহল্লা বলে মনে হয়, বাস্তবে দেখাটাই কেবল বাকি।

একথা সত্যি যে, ২বছরের আগে স্ত্রী ছেড়ে যাওয়ার পরই তার সাবস্ট্যান্ডার্ড জীবনের শুরু, তবে দু:খতাড়িত হয়ে নয়, নিজের প্রতি নিদারুণ বিতৃষ্ণাই এতে ভূমিকা রেখেছে। গ্লোবালাইজেশন জোয়ার সর্বত্র- সেজন্য সংসারও মুক্ত বাজার অর্থনীতি হয়ে উঠতেই পারে। হয়ত সেকারণেই, স্ত্রী তার সামনে দিয়েই হেটে চলে গেছে- সে পিছু ডাকেনি, এমনকি আর কখনো যোগাযোগেরও চেষ্টা করেনি, উপরন্তু এই ঘটনায় তার উপলব্ধি হল, শেয়ারিং ইনস্টিংট টাই ঈশ্বর তাকে দেননি, ফলশ্রুতিতে একলা বাঁচো নীতি গ্রহণ।
এ ঘটনার ১সপ্তাহের মধ্যে সে সফটওয়ার কোম্পানীর দামী চাকরিটা ছেড়ে দেয়, কারণ যাওয়ার সময় স্ত্রী তার কোনকিছু স্পর্শ না করলেও একটি জিনিস অযাচিতভাবেই নিয়ে গেছে- তার সিরিয়াসনেস

তবে তার প্রতিটি ভ্রমণ শুরু হয় শেষের জন্য উদগ্র ব্যাকুলতায়- উপভোগ করতে চেয়েও করা হয়না, একটা অজানা দীর্ঘশ্বাস তার ভ্রমণসঙ্গী হয়ে থাকেই- তখনই স্ত্রীর অভাববোধটা জেগে উঠে; হয়ত সে সঙ্গে থাকলে এই দীর্ঘশ্বাসটাই খুনসুটি হয়ে উঠত। কিন্তু ৩বছরের দাম্পত্যের অসংখ্য টুকরো স্মৃতির ব্যবচ্ছেদে এমন কোন মুহূর্ত সে পায়না, যেখানে ভালবাসা ছিল; শরীরে শরীর ছুঁয়েও আত্মার ছোঁয়া থেকে তারা ক্রমশ দূরে সরে গেছে - অনর্থক দুটি মানুষের তবে সময়কে বয়ে বেড়ানো কেন!

কাঞ্চনজঙ্খা সিনেমায় একটি বিশেষ দৃশ্য আছে- ঠিক পাহাড়ের সামনে স্বামী-স্ত্রীর তিক্ত কথোপকোথন। তার মনে হল- কাঞ্চনজঙ্ঘা ভ্রমণে তাকে সঙ্গে নিলে কেমন হয়! যোগাযোগ না থাকলেও তাদের ডিভোর্স হয়নি, তাই ধূসর-কাগুজে সম্পর্কের জোরে তাকে এই নিমন্ত্রণটা দেয়া যায়, তবে এখানেও কোন আকর্ষণ নেই- ঐ দৃশ্যটা বহুবার দেখতে দেখতে নিজের জীবনে দৃশ্যটার প্রয়োগ দেখার একটা সাধ, এর বেশি কিছু নয়।
সে কি রাজী হবে? আজ ইন্টারভিউ শেষে হঠাৎ তার অফিসে চলে গেলে খুব কি অসঙ্গত হবে, এমন ভাবতে গিয়ে ছাত্রজীবনে পড়া একটি লাইন মনে পড়ল- আমাদের গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে?

উর্মির সময় দিনে প্রতিসরণ , রাতে গাণিতিক আরোহ বিধি মেনে চলে যাচ্ছে স্বস্তিদায়ক নিঃসঙ্গতায়- মিশার সঙ্গে বিয়েটা যদি আকস্মিক ধরা হয়, তবে বিচ্ছেদ ছিল অনিবার্য পরিণতি । দায়টা অবশ্যই মিশার- স্বামী হিসেবে নিজের অযোগ্যতা সম্পর্কে সে ছিল চুড়ান্ত উদাসীন, তদসত্তেও উর্মির ব্যাপারে তার মনোভাব এমন, তোমাকে পেয়ে বাধিত হইনি, হারালেও ব্যথিত হবনা। উর্মি বরাবরই রাজলক্ষী কিংবা শকুন্তলার মত পুতুল-চরিত্রকে ঘৃণা করে, তাই শাখা-প্রশাখা বিস্তারের আগেই সম্পর্কের নটে গাছটিকে মুড়িয়ে ফেলে এখন সে পরম নির্ভার।

এভাবে চলে আসাটাকে মা-বাবা মোটেই সমর্থন করেনি, মিশার পরিবার থেকেও আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে কয়েকবার , কিন্তু মিশা নিজে গত ২বছরে ঘুণাক্ষরেও তার সামনে আসেনি। অবশ্য আসলেও ইতিবাচক কিছু ঘটতনা- যে চোখ আকাশ চেনেনা, সূর্য চেনেনা, সেই চোখ হৃদয় চিনবে কিভাবে! মিশার চোখকে এভাবেই মূল্যায়ন করে সে।

আজ উর্মির ২টা ক্লাস, ক্লাসশেষে সীমার গায়ে হলুদে যোগ দিতে হবে, এরপর সন্ধ্যায় প্রতিদিনকার ডিউটি - তার আজকের দিনের সম্ভাব্য সূচী। দীর্ঘদিন শুধু প্রাইভেট ভার্সিটির লেকচারারের চাকরিটাতেই সন্তুষ্ট ছিল সে, কিন্তু একটা পর্যায়ে খেয়াল হল, সময় কাটছেনা, আরও কিছু করা দরকার। সেই তাগিদ থেকেই ভার্সিটি জীবনের কয়েক বন্ধু মিলে আজিজ সুপার মার্কেটে একটা বুটিকের দোকান চালু করে ; সম্প্রতি যোগ হয়েছে এফএম রেডিও জোকি’র চাকরিটাও - সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় একঘণ্টার একটা গানের অনুষ্ঠানের সঞ্চালক, সেখানে প্রতিদিন একজন শিল্পী আসেন, তার সাথে আড্ডার ফাকে ফাকে চলে গান। আজকের অতিথি একজন নারী শিল্পী, সাম্প্রতিক কালে তার ‘ভালোবাসলে বয়স কমে’ গানটি বাজারে দারুণ হিট করেছে।

ফেলে আসা জীবন তাকে আর ডাকেনা, হয়ত ডাকবেও না কোনদিন। তবে সণ্ন্যাসীনী হওয়ার কোন ইচ্ছাই তার নেই, বিশেষত সীমার গায়ে হলুদে গিয়ে অনীহাটা প্রগাঢ় হয়েছে; চাকরি, বন্ধু বান্ধবের বাইরেও একটা বায়বীয় জীবন থাকে মানুষের - কয়েক মাস ধরেই সেই জীবনের একজন অংশীদার খুঁজছে সে , স্পষ্টভাষায় বললে, কোন মানুষ নয়, সে সংসারের প্রেমে পড়তে চাইছে। কিন্তু মিশার সঙ্গে ৩বছরের ভৌতিক সংসারকে অগ্রাহ্য করে তার পাশাপাশি হাটার জন্য কোথাও কি আদৌ কেউ প্রতিক্ষায় আছে?

প্রতিক্ষার নাকি নিজস্ব একটা ভাষা আছে, তাই প্রতীক্ষা করতে এবং করাতে , একইরকম আনন্দ পায় পিয়া। অর্থপূর্ণ আনন্দ তাকে বিচলিত করে, আর অর্থহীন আনন্দ দেয় প্রশান্তি- শেষকথার পরেও তার অনেকগুলো কথা থেকে যায় সবসময়।

স্কুলজীবন থেকেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে অভ্যস্ত সে। শিল্পী-মানুষরা একটু উড়নচন্ডী ধরনের হয়, এই প্রবচনের সত্যতা প্রমাণের জন্যই হয়ত ক্লাস নাইনে পড়া অবস্থাতেই পছন্দের মানুষের হাত ধরে ঘর ছেড়েছিল একবার। ২দিন পর তার হদিস মিলে, কারণ তার কিশোর প্রেমিকটি ছিল তার বাবার ভয়ে সন্ত্রস্ত। কিন্তু ৬ মাসের ব্যবধানে সে একই কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটালে পরিবারের মান-সম্মান রক্ষাই দায় হয়ে উঠে।
অনেকটা অনোন্যপায় হয়েই পিয়ার বাবা তার বিয়ের ব্যবস্থা করেন, পাত্রের সঙ্গে বয়সের বিশাল ব্যবধানকে সঙ্গত কারণেই গুরুত্ব দেয়া হয়নি তখন। মাত্র কয়েকবছরের ব্যবধানে সে ৩সন্তানের জন্ম দিয়ে বসলেও গানের চর্চাটা কখনই ব্যহত হয়নি, বরং বয়স্ক ব্যবসায়ী স্বামীটি তার মন জুগাতে গানকে শ্রোতামহলে পৌছানোর ব্যবস্থা করেছে নিজ উদ্যোগে।

প্রথম ২টা এলবামে বড়সড় একটা লোকসান খেয়ে তার ধুরন্ধর স্বামী অন্য পন্থা অবলম্বন করেন- জনপ্রিয় একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের স্পন্সর হন, বিনিময়ে তার স্ত্রীকে গান গাওয়ানোর শর্তে। এর কিছুদিন পরই ভালবাসলে বয়স কমে এলবামটি বাজারে আসে, দারুণ জনপ্রিয় হয়। দেশের প্রথমসারির মডেলরা এর মিউজিক ভি্ডিওতে কাজ করে, জনপ্রিয় না হয়ে উপায়ই বা কী!

তাজুলের বড়বোন পিয়ার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল স্কুলজীবনে, তাদের বাসায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বান্ধবীর ছোটভাই, অল্পবিস্তর কথা হত। কিন্তু সেই ছোটভাইটিই এতদিন বাদে হঠাৎ প্রিয়জন হয়ে উঠেছে। এর যোগসূত্রও গান- তাজুলের বদৌলতেই তার মত একজন নবীন শিল্পীকে নিয়ে পত্রিকায় আলাদা ফিচার হয়েছিল। তাদের নতুন করে গড়ে উঠা সম্পর্কের পরিসর এরপর ক্রমেই বেড়েছে; বাড়তে বাড়তে নিজেদের অজান্তেই একসময় ড্রইংরুম পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছে পিয়ার বেডরুমে বেডরুমে!

স্বামীর প্রতি সে আন্তরিক, তাজুলের প্রতিও একইরকম। এই বৈকল্যের কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তার জানা নেই, এজন্য সাইক্রিয়াটিস্টের শরণাপণ্নও হয়েছিল।
তাজুলের স্ত্রী ম্যাজিস্ট্রেট, সে কি ওকে সন্দেহ করেনা? সম্ভবত তার স্বামী এই সম্পর্কের ব্যাপারে অবগত, তবে সে মুখে কিছুই বলবেনা, বা বলার মত অবস্থা তার নেই- কারণ তার নিজের অতীতের বা বর্তমানের অনেক পাপের কথাই পিয়া জানে। ব্যবসায়ী বন্ধুদের সাথে প্রতিরাতেই তার চিয়ার্স করতে হয়, বাকি সময়টুকু সে পুরোপুরি বেহুশ থাকে। তখন নেশার ঘোরে অনেক অপরাধের দিয়েছে। কাহিনীই সে বলে ফেলে , এমনকি ২বছর আগে নিখোজ হওয়া তার ব্যবসায়িক পার্টনারকে আদতে যে সে-ই খুন করিয়েছে সেটাও বলে দিয়েছে।

মাঝে মাঝে পিয়ার মনে হয় তাজুলকে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ তার স্বামী-ই করে দিয়েছে- মাসে অন্তত ৩-৪বার তাকে বাড়িতে নেমন্তন করা, ঘণ্টার পর কথা বলা, এসবের কি উদ্দেশ্য হতে পারে। তাজুলকেও তার স্বামীর সঙ্গেকার আলাপচারিতার সময়ে অচেনা লাগে- তখন তার রিপোর্টিংয়ের সঙ্গে তার ব্যক্তিত্ত্বকে মেলাতে কষ্ট হয়, তাকেও তার স্বামীর মতই একজন ঝানু ব্যবসায়ী বলে ভুল হয়। তার স্বামী কি তাকে ব্যবহার করে তাজুলের মত আদর্শবান সাংবাদিককে বশে রাখতে চাইছে? এই চিন্তাটা এলেই নিজেকে বড্ড সস্তা লাগে তার, তবুও সস্তাতেই চলে তার স্বস্তির সন্ধান ।

তাজুলের সঙ্গে প্রতিদিনই দেখা হয়, ফোনে কথাও হয়, তবুও তার ২য় ফোন থেকে কল আসলে ধরে নিতে হবে আজ শুধু কথা নয়, আজ বিশেষ দিন। আগমনের পৌনপুনিকতায় বিশেষ দিন একঘেয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই, তবুও নিয়মরক্ষার মতই হয়ে গেছে বিশেষ দিনের দায়বদ্ধতা। এখনকার প্রতিটি সকালে তার ক্লান্ত মন অবসণ্ন বিবেকের কাছে আবেদন জানায় মুক্তির, আর টানতে পারছেনা সম্পর্কের ঘানি।

আজ তাজুলের ২য় ফোন থেকে কল এসেছে। কিন্ত আজ তো রেডিওতে একটা অনুষ্ঠানে যেতে হবে। রেডিওতে একটা অনুষ্ঠান না করলে তেমন কিছুই হবেনা, বিশেষ দিন আসবে আরও অনেকবার, সুতরাং আজ কোনটিই হবেনা, আজ তাই হবে সে যা চাইবে।

ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলল পিয়া, সে জানেনা এই ভরসন্ধ্যায় সে কোথায় যাচ্ছে, তবে এটা জানে পরিচিত জীবনের বাইরে কোথাও, একটা সন্ধ্যা নিজের মত করে কাটাতে যাচ্ছে; ড্রাইভারও বিভ্রান্ত, তবুও সে আপনমনে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে, আজ সত্যিই পিয়ার বিশেষ দিন.......



অবসরজনিত অবসাদে সুমাইয়া রীতিমত হাপিয়ে উঠেছে । মফ:স্বল শহরে বেড়ানোর জায়গা এমনিতেই কম, এস.এস.সি পরীক্ষা শেষে সবাই ঘুরছে, আর সে কিনা ঘরে বসে টিভিতে হিন্দি সিরিয়াল দেখছে আর বই পড়ছে। মায়ের ওপর এজন্যই মেজাজ খারাপ তার- অহেতুক শাসনের বাড়াবাড়ি দেখানো। আজ সারাদুপুরটা কাটল বারান্দায় বসে একটা উপন্যাস পড়ে । অনেক দূর পড়েও ঘটনার কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা। তাজুল, মিশা, উর্মি, পিয়া, চরিত্রগুলোকে অহেতুক জটিল বানানোর চেষ্টা, তবে এর মধ্যেও মিশার স্টাইলটা তার ভাল লাগছিল, সত্যিই সে উর্মির কাছে আসবে কিনা এই কৌতূহল তার রয়েই গেছে, যদিও গাড়ি নিয়ে পিয়ার ওভাবে উদ্দেশ্যহীন বের হওয়টাকে একটু বাংলা সিনেমার মত লাগছিল। আরও আসংখ্য প্রশ্ন তৈরি হচ্ছিল, কিন্তু কাকের উপদ্রবে তার পড়ায় ছেদ পড়ল- বারান্দায় পিঠা শুকাতে দিয়েছে মা, আজ দুলাভাই আসবে, সে বসে বসে সেটাই পাহারা দিচ্ছিল।

ওদিকে মায়ের হাকডাক বাড়ছে, পিঠাগুলো রান্নাঘরে দিয়ে যেতে। তার হাতে পিঠার সাজি, গন্তব্য রান্নাঘর, কিন্তু মাথায় তখনো তাজুল, মিশা, উর্মি আর পিয়া; আর রোদের আচে পুড়ছিল আধখোলা বইয়ের ১৯৪ নম্বর পৃষ্ঠাটি !

এই গল্পটি কেমন হতে পারত? যেমনই হোক, একটি গল্প তো শেষ পর্যন্ত নিছক গল্পই- যা না লিখলে বা না পড়লেও নতুন কোন বোধের জন্ম বা মৃত্যু ঘটবেনা!























৩৫টি মন্তব্য ৩২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×