জ্ঞানই শক্তি। সমাজ বিকাশের প্রধান চলক জ্ঞান এবং শিক্ষা। একটি সমাজের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে জ্ঞান এবং তথ্যনির্ভর করে তোলার অর্থই হলো জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কেবলমাত্র মূলধন এবং পুঁজিকেন্দ্রিক যেনতেন প্রকারে মুনাফা তৈরির এক বিশ্বায়নের জালে আমরা আটকে আছি। যা মানুষকে তার নিজের জায়গায় স্থির থাকতে দিচ্ছে না। বাণিজ্য, ঋণ আর নির্ভরতার বেড়াজালে অক্টোপাসের মত বেঁধে তাকে উত্যক্ত করছে সারাক্ষণ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মানুষের মাঝে যে গণজাগরণ তৈরির প্রয়োজন তা নিশ্চিত করতে হলে তথ্য ও প্রযুক্তিকে সাধরণের দোরগোড়ায় পৌছে দিতে হবে। বিশ্বায়ন মানে, জ্ঞান ও অর্জিত সম্পদের একক ব্যবহার নয়; বিশ্বায়নকে ধাবিত হতে হবে মানবতার কল্যাণের জন্য। আর তা নিশ্চিত করতে হলে বিজ্ঞানমনস্ক জ্ঞানের সাধনা নিশ্চিতভাবে জরুরী। বাণিজ্যের সাথে অবশ্যই থাকতে হবে প্রযুক্তির বিশ্বায়ন। আর তা নিশ্চিত করতে পারে জ্ঞান, মেধা ও মননের বাধাহীন সমন্বয়। জ্ঞান পরিচর্চার মাধ্যমে আরও বিকশিত হয়। নিরবিচ্ছিন্ন জ্ঞানচর্চার প্রক্রিয়ায় নানা বিস্ময় এসে উপস্থিত হয়, হুমকির মুখে পড়ে পুরাতন জরাজীর্ণ ধারণা; সৃষ্টি হয় নতুন নতুন জ্ঞান। গৌতম বুদ্ধের ‘বোধি’ প্রাপ্তি, সক্রেটিসের আত্মত্যাগ, প্রাচীন মিশরে নারী গণিতজ্ঞ হাইপেশিয়ার কীর্তিগাঁথা, অষ্টাদশ শতকে মহান ‘ফরাসি বিপ্লব’, ইউরোপের ‘পুনর্জাগরণ’, রাশিয়ায় ‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব’ ইত্যাদি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
গত ২০ জুলাই ২০০৯ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে দেয়া এক বিশেষ বক্তৃতায় ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম বলেন, “টেকসই উন্নয়নের জন্য আগে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রধান লক্ষ্য হতে হবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন। কারণ আগে ক্ষমতার উৎস হিসেবে প্রাকৃতিক সম্পদকে বিবেচনা করা হলেও বর্তমানে জ্ঞানকে বিবেচনা করা হচ্ছে”। বিখ্যাত এই বিজ্ঞানীর দেয়া ৩৫ মিনিটের বক্তৃতা ও পাওয়ার পয়েন্টে উপস্থাপনার কেন্দ্রে ছিল এই জ্ঞানভিত্তিক সমাজের প্রয়োজনীতার কথা। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে একসময়ের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তে বর্তমানে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্বের কথা। তিনি বলেন, যোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে সৃষ্টিশীলতা দিয়ে জ্যেষ্ঠতা দিয়ে নয়।
ইউরোপের রেঁনেসা, ফরাসি বিপ্লব এবং আলোকময়তার কাল অতিক্রম করে আমরা এখন ধাবিত হচ্ছি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ হবে সেই সমাজ যেখানে মানুষের যোগ্যতার মাপকাঠি হবে তার জ্ঞান এবং দক্ষতা। সমাজের নেতৃত্ব থাকবে জ্ঞানী মানুষের হাতে। সমাজ পরিচালনায় ব্যক্তি নয়, গুরুত্ব পাবে সকল মানুষ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ করা হবে। বরং ব্যক্তির সর্বোচ্চ স্বাধীনতা, সৃষ্টিশীলতার প্রতিপালন এবং জ্ঞানচর্চা ও মুক্তবুদ্ধির বিকাশের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের বৈশিষ্ট্য। জ্ঞানভিত্তিক সমাজের দক্ষতার মানদণ্ডে সকল পেশার সম্মান নিশ্চিত করা হবে। আমাদের মানসজগৎ আজও ঔপনিবেশিক ভাবনা এবং অধস্থনতার সংস্কৃতি দ্বারা আচ্ছন্ন। এই সমাজে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিচারক -এর পেশাকে সবচেয়ে সম্মানজনক বলে একপ্রকার ভ্রান্ত ধারণা আছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পেশাকে আবার অসম্মানজনক বলে মনে করা হয়। অথচ আমরা ভেবে দেখি না যে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পেশায় কেউ না কেউ না থাকলে এই সমাজ এবং সভ্যতা ভেঙে পড়বে। কারণ ইঞ্জিনিয়ার, বিচারক বা ডাক্তার পরিচ্ছন্নতারকর্মীর কাজগুলো পালনে নিশ্চিতভাবেই দক্ষতার পরিচয় দিতে পারবেন না। একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজে শ্রমের বিভাজন অবশ্যই থাকবে কিন্তু সেখানে কোন পেশাকে অসম্মান করা নৈতিকতার পরিপন্থী বলে বিবেচিত হবে।
আমাদের মত পিছিয়ে পড়া একটি দেশে জ্ঞানভিত্তিক দক্ষতানির্ভর সমাজের চাহিদা বর্তমানে প্রকট হয়ে উঠেছে। সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, প্রতিকূল আবহাওয়া, জনসংখ্যার চাপে ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থার এই দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবিধা সর্বসাধারণের নিকট পৌছে দেয়ার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে পাঠের অভ্যাস সৃষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ। 'পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার চাই' শ্লোগানটি অতিক্রম করে আমাদের এখন ঘরে ঘরে পাঠক চাই। যে জাতি জ্ঞানার্জনে যত বেশি সচেষ্ট সেই জাতি তত বেশি উন্নত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

