somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইতিহাসের এক স্বর্ণালী বিস্ময়।

২৬ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৫:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আকাশের তারকারা মিটিমিটি আলো দিয়ে যায়। রাত পেরিয়ে দিবস আসে। সকলে প্রতিক্ষায়, অতিথি এসে পড়েছেন। উৎসুক মানুষগুলো তাকিয়ে আছে অতিথি কার বাসার আতিথ্য গ্রহণ করেন। মনে এক আকুল কামনা- যদি তিনি আমার বাসার মেহমান হতেন! বাহনে চড়ে তিনি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। বললেন তোমাদের চিন্তা করতে হবেনা, আগ্রহ দেখানোরও প্রয়োজন নেই। এ বাহনকে উপর থেকে নির্দেশনা দেয়া আছে। এটি নিজেই তোমাদের কারো ঘরের সামনে থেমে যাবে। আমি তারই অতিথি হব।

হ্যা, এই সম্মানিত মেহমান আর কেউ নন। মানবতার মুক্তির মহান দূত, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (স.)। আর সে সৌভাগ্যবান ব্যাক্তিটি হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) - মানব ইতিহাসের আকাশের আরেক উজ্জল তারকা। তার বাসাতেই মেহমান হলেন রাসুল সা.।

রাসুল স. গৃহের নিচতলায়, আর ওপরতলায় হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর (রা.) পরিবার। সেটি ছিল শীতের রাত, এক অসতর্কতায় পানির কলস ভেঙ্গে পানি গড়িয়ে পড়ল। এ ঠান্ডা পানি কাঠের মেঝে চুইয়ে নিচের তলায় কর্মক্লান্ত রাসুলের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবে! শংকিত হলেন স্বামী-স্ত্রী। একমাত্র কম্বলটি দিয়ে দ্রুত মুছে নিলেন পানি, শীতের সাথে সংগ্রাম করে অতিবাহিত করলেন রাত। কিন্তু অন্তরে এক অপার্থিব তৃপ্তি। কালের প্রবাহ থমকে দাঁড়ায়, নেতার প্রতি ভালবাসা আর শ্রদ্ধার এক উজ্জল ঘটনা কালের বুকে স্থান করে নেয়।

ইতোমধ্যে নদীর অনেক পানিই মিশেছে সাগরে। সময় কিছু অতিক্রান্ত হয়েছে। মদীনার বুকে একটি স্বর্ণালী সমাজ নির্মাণের প্রচেষ্টায় এগিয়ে আসা বাধাগুলোকে মোকাবেলা করতে হয়েছে বার বার। রাসুল স. মসজীদে নববীর পার্শ্বস্থীত কক্ষে। ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন। প্রচন্ড গরমের দিন। পথে দেখা হল প্রিয় সাহাবী, পরবর্তীকালের অর্ধ-পৃথিবীর দুই মহান শাষক, হযরত আবুবকর ও হযরত ওমর ফারুক রা. দের সাথে। কি ব্যাপার তোমরা এ অসময়ে? তারা জবাব দিলেন, ইয়া রাসুলাল্লহ, দুঃসহ ক্ষুধা আমাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। রাসুল স. বললেন, যার হাতে আমার জীবন সেই সত্তার শপথ, আমিও ক্ষুধার তাড়নায় ঘরে থাকতে পারিনি। এসো আমার সাথে।

তিনজন হাঁটতে হাঁটতে আবু আইয়ুবের বাড়ির দরজায় পৌঁলেন। আবু আইয়ুবের অভ্যাস ছিল প্রতিদিন রাসুলে কারীমের (সা.) জন্য খাবার তৈরী রাখা। তিনি না এলে নিজেরাই খেয়ে ফেলতেন। দুনিয়া ও আখিরাতের নেতা মুহাম্মদ স. ও সাথে দুই মর্যাদাবান সাহাবীকে গৃহে পেয়ে আর মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সব কিছু বুঝে ফেললেন। দ্রুত খাবারের ব্যাবস্থা করলেন। নিজ হাতে বাগান থেকে খেজুর পেড়ে আনলেন, বকরী জবাই করলেন, রুটি তৈরী করলেন। অতপর সামনে পেশ করলেন। রাসুল স. খাবারের একপর্যায়ে গোশতের এক টুকরা একটি রুটির উপর রেখে বললেন- আবু আইয়ুব, এই টুকরোটি ফাতিমাকে দিয়ে এসো, বহুদিন সে এমন খাবার দেখেনা। ইতিহাস আরেকবার হোচট খেল।
রসুল স. আবু আইয়ুবকে পরের দিন দেখা করতে বললেন। আবু আইয়ুব রা. পরেরদিন যথারীতি রাসুল স. এর নিকট হাজির হলেন। রাসুল সা. ছোট্ট এক দাসীকে তার হাতে সোপর্দ করে বললেন, তার সাথে ভাল ব্যাবহার করবে, আমার কাছে যতদিন ছিল, তার মধ্যে ভাল বৈ খারাপ কিছু দেখিনি। দাসীকে নিয়ে তিনি ঘরে ফিরলেন। স্ত্রীকে সব কথা বললেন, বললেন রাসুল সা.এর উপদেশের কথা। স্ত্রী বললেন, মুক্তি দেয়া ব্যাতিত রাসুল সা. এর উপদেশ বাস্তবায়নের আর তো কোন উত্তম পন্থা নেই। মুক্ত করে দেয়া হলো তাকে। যেমন সাহাবী , তেমনই তার স্ত্রী।

আবু আইয়ুব আনসারী রা. পৃথিবীতে বেঁচে ছিলেন অনেক দিন। আল্লাহর জমীনে তারই মনোনিত জীবন ব্যাবস্থাকে প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর ৮৬ বছরের এক বৃদ্ধের শেষ জীবনের কাহিনী পৃথিবীর সব বিপ্লবীর জন্য এক নির্বাক করা নমুনা। তখন মুয়াবিয়া রা. এর শাসনকাল। ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া সেনাপতি। কন্সানটিনোপল তথা তুরস্কের ইস্তাম্বুল অভিযানে শরীক হলেন ৮৬ বছরের 'তরুণ' মুজাহিদ আবু আইয়ুব আনসারী রা. । শেষ নিশ্বাস ফেলব আল্লাহর দীনের পথে এই ছিল কামনা। রাসুল স. কন্সট্যান্টিনোপল বিজয়ের যে ভবিষ্যতবানী করে যান, সেই বিজয় অভিযানের একজন সঙ্গী হওয়ার সে এক প্রবল আকাঙ্খা! সৈন্যরা ঘেরাও করলো কন্সট্যান্টিনোপল। দীর্ঘ এক বছর অবরোধ চললো।এ সময় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন বৃদ্ধ আবু আইয়ুব আনসারী। শায়ীত হলেন মৃত্যু শয্যায়। ছুটে এলেন সেনাপতি। পরম শ্রদ্ধাভরে শেষ ইচ্ছা জানতে চাইলেন। আবু আইয়ুব আনসারী রা. বললেন- বলে লাভ কি, তোমরা কি তা পূরণ করবে? সেনাপতি ইয়াজিদ নাছোড়বান্দা। বললেন, কেন নয় চাচাজান- আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করবো। মুমূর্ষু মুজাহিদ বুজুর্গ সাহাবী আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, আমি চাই আমার মৃত্যুর পর আগামীকাল কনস্ট্যান্টিনোপলের প্রবেশ পথের ওপর আমাকে কবর দিয়ে আসবে। শেষ ইচ্ছা শুনে হতবাক ইয়াজিদ জানতে চাইলেন, তাঁর এই শেষ ইচ্ছার কারণ কি। আবু আইয়ুব আনসারী রা. জানালেন, আমি জানি কন্সট্যানটিনোপলে একদিন কুরআনের শাসন কায়েম হবেই, উড়বে কালেমার পতাকা, কিন্তু আমি তো তখন থাকবোনা। আমি চাই বিজয়ের দিনে বিজয়ী মুসলিম সৈনিকেরা যেন আমার কবরের ওপর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে রোমান রাজধানীতে প্রবেশ করে।
এই সম্মানিত সাহাবীকে ইস্তাম্বুলে প্রবেশকারী সড়কের ওপর দাফন করা হয়। আল্লাহ তায়ালা তার এই আকাঙ্খা কবুল করে নেন। এই ঘটনার সাড়ে সাতশ বছর পর এই সড়কের উপর দিয়েই ওসমানী খলিফা দ্বিতীয় মুহাম্মদের বিজয়ী বাহিনী ইস্তাম্বুলে প্রবেশ করেছিল। সালটি ছিল ১৪৫৪ খৃষ্টাব্দ।
বর্তমান ইস্তাম্বুলের আইয়ুপ সুলতান মসজিদ টি হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রা. এর মাজারকে ঘিরেই। তুরস্কবাসী তাকে স্মরণ করে আইয়ুপ সুলতান নামে।

ইতিহাসের এক স্বর্ণালী বিস্ময়।

৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×