রুমের ভেতর দুইটি চৌকি। মশার প্রকোপ খুব। মেহমান দুজনের স্থান হলো এ রুমে রাতটি কাটানোর জন্য। সারাদিনের ক্লান্ত সফর শেষে ঠাঁই নিলেন তারা এখানে।
দেশটি মিশর। মিশরের অন্যতম ইসলামী আন্দোলন ইখওয়ানুল মুসলিমীনের প্রতিষ্ঠাতা মুর্শিদ ই আম শহীদ হাসানুল বান্না এবং তার সংঙ্গী ওমর তিলমেসানী। ওমর তিলমেসানিও পরবর্তীতে মুর্শিদই আম হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন দাওয়াতী সফরে হাসানুল বান্নাকে ছুটতে হয়েছে দেশের আনাচে কানাচে। মোহনীয় বক্তৃতার জন্য তিনি ছিলেন বিখ্যাত। পিপড়ের মত মানুষ ছুটে আসতো তার বক্তৃতা শুনতে। কফি সপে গিয়েও তিনি বক্তৃতা করতেন। মানুষ ভীড় জমাতো। তথাকথিত ফেরকাবাজী বাদ দিয়ে ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার জন্য তার দাওয়াত ঘুমন্ত অশ্বের পিঠে চাবুকের মত কাজ করেছিল মিশরের ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য। এমনই এক বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন দেশের একটি প্রান্তে। সাথে ওমর তিলমেসানী।
রাত তখন অনেক। সারাদিনের সফর আর বিকেলের মাহফিল শেষে আয়োজকদের ব্যাবস্থা করা কক্ষে বন্দোবস্ত বিছানা দেখে ঘুম যেন ঝর্ণার পানির বেগে ধেয়ে আসছে দুচোখ জুড়ে। মশার উৎপাতে মশারী লাগাতেই হলো। দুই চৌকিতে শুয়ে পড়লেন দুজন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুর্শিদ ই আমের গলার আওয়াজ শুনতে পেলেন ওমর তিলমেসানী, 'ওমর ঘুমিয়ে পড়েছ?' জবাব দিলেন, 'এখনও ঘুমাতে পারিনি'। হয়তো পাচ মিনিট অতিবাহিত হলো। আবার ও সেই একই আওয়াজ কানে ভেসে এল, ওমর ঘুমিয়ে পড়েছ? একই জওয়াব, এখনও ঘুমাতে পারিনি। এভাবে কিছুক্ষণ পর পর প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি চলতে লাগলো। এমনকি শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটি ওমর তিলমেসানীর নিকট অস্বস্তিকর বোধ হতে লাগলো। তিনি মনে মনে ভাবলেন, যতটা ক্লান্তি আমায় অবসন্ন করে ফেলেছে তা কি যথেষ্ট নয় যে এর ওপর তিনি আরো কিছূ যোগ করছেন। তিনি কি আমাকে ঘুমুতে দিবেননা? মনের ভিতরে একটি খেয়াল উদয় হলো এবং নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন, মুর্শিদ ই আম যদি আবার প্রশ্ন করেন তাহলে নিরব থাকবো যেন তিনি মনে করেন, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। যেই কথা সেই কাজ। চুপ থাকায় শহীদ হাসানুল বান্না সত্যিই ভাবলেন ওমর ঘুমিয়ে পড়েছে। অতপর তিনি চুপিসারে সন্তর্পনে চৌকি থেকে উঠে পড়লেন এবং স্যান্ডেল হাতে নিয়ে বাথরুমের দিকে চললেন। অজু করে ফিরে এসে চৌকি থেকে একটু দূরে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন তাহাজ্জুদের নামাজে। তিনি কতক্ষণ নামাজ পড়েছেন তিনিই জানেন। অপর চৌকিতে ওমর তিলমেসানী গভীর ঘুমে অবসন্ন দেহে রাত পার করলেন। সকালে উঠে ওমর স্মরণ করলেন সেই জ্বলজ্বলে স্মৃতি যা তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। কেন তিনি এমন করলেন? নিজে নিজে ভাবলেন ওমর। বুঝলেন, ওমরের জাগ্রত অবস্থায় যদি হাসানুল বান্না নামাজের জন্য উঠতেন তবে ওমরকে অনিচ্ছা সত্বেও উঠতে হত। এমন কষ্ট তিনি ওমরকে দিতে চাননি।
আল্লাহর দ্বীনের কাজে নিয়োজিত সংগঠনের নেতৃত্বের আল্লাহর সাথে এমন গভীর সম্পর্কই ছিল সেই কার্যকরী শক্তি যা বাতিলের সমস্ত বাধা অতিক্রম করে এ কাফেলাকে যুগে যুগে সম্মুখে এগিয়ে নিয়েছে। এ কাফেলার নেতৃত্বে এমন লোকই থাকেন যারা অধস্তনের মানসিক যোগ্যতা বুঝে তাদের সাথে ব্যাবহার করতেন, অধস্তনদের কষ্ট না হয়- সেদিকে ছিল সমান দৃষ্টি। টুকরো ঘটনাটি হাজার ঘটনার ছোট্ট নমুন। এমন নেতাদেরকেই অনুরণ করা যায় স্নিগ্ধ চোখে।
হাসানুল বান্না শহীদ হয়েছেন মাত্র ৪৩ বছরে। আর ওমর তিলমেসানী দীর্ঘদিন কারাবরন করেছেন।
ঘটনাটি ওমর তিলমেসানীর আত্মজীবনী থেকে নেয়া।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

