লেখাটি একান্তই ব্যাক্তিগত দিনযাপনের কাহিনী। কেউ রিল্যাক্স মুডে থাকলেই কেবল ঢুকতে পারেন।
রাতেই থানা সভাপতি ফোন দিলেন, কাল সকালে অমুক ওয়ার্ডে ইসলামী শিক্ষা দিবসের আলোচনা সভা। থানার সব সদস্য ব্যাস্ত থাকবেন কোরআন স্টাডি ক্লাসে, সুতরাং আপনাকেই সে প্রোগ্রামে মেহমান হিসেবে যেতে হবে। আমি আমতা আমতা করে বললাম, মেহমান হিসেবে আমি গেলে দূর্বল হয়ে যায়না? . . . অবশেষে নির্দেশনা মেনে নিলাম।
সকালে উঠেই পড়তে বসলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরপর চিন্তা জাগছে- প্রোগ্রামে কি বলবো। এক পর্যায়ে কয়েকটি পয়েন্ট নোট করে নিলাম। এবার স্বস্তি পেলাম। সকাল ৯ টা বাজতেই নাস্তা পানি সেরে প্রোগ্রামের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লাম।
অনুষ্ঠানস্থলে এসে দেখি ২৫/৩০ জন হাজির। মেহমান নেই, তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার বক্তৃতা। স্টেজে আমরা তিনজনই ঢাবির ছাত্র। একজন আইনের, একজন পিচ এন্ড কনফ্লিক্ট এবং আমি। বক্তৃতার শুরুতেই শ্রোতাদের একটি সংক্ষিপ্ত ডাটা নিয়ে নিলাম। প্রত্যেকের গ্রামের বাড়ি, ইসলামী শিক্ষা দিবস ও শহীদ আব্দুল মালেক সম্পর্কে কার কতটুকু ধারণা, ইত্যাদি। দর্শক শ্রোতারাও এর মাধ্যমে মনোযোগি হয়ে উঠলো। আমি খেয়াল করেছি, শুরুতেই একটু অফ টপিক কথা বললে শ্রোতারা মনোযোগী হয়ে ওঠে।
কথা শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রোগ্রাম পরিচালকের স্লিপ এলো, ভাই, নাস্তা আসছে, ২০ পচিশ মিনিট লাগবে, আপনাকে চালিয়ে যেতে হবে। আমি মনে মনে হাসলাম, দেখি চেষ্টা করে। কথার গতি স্লো করে দিলাম। শুরুতেই শহীদ আব্দুল মালেকের জীবন থেকে কয়েকটি আকর্ষণীয় ঘটনা বললাম। অতপর, আব্দুল মালেক ভাইয়ের লেখা থেকে একটি অংশ শুনিয়ে দিলাম। এরপর বললাম সেই ঘটনা, যে ঘটনায় তিনি শাহাদাৎ বরণ করেছেন। তার সে বক্তৃতা আমি রেকর্ডে শুনেছি। একটি অংশ মনে পড়ে, তিনি বলেছিলেন, যদি -এডুকেশন ইজ দ্যা হারমোনিয়াস ডেভলপমেন্ট অফ বডি মাইন্ড এন্ড সোল- হয় তবে এই সুসামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নতির জন্য ইসলামই হচ্ছে সর্ব শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা। . . .।
এরপর ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা কি ও এর প্রয়োজন কি সে সম্পর্কে বললাম। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা কি ধরণের মানুষ উপহার দেবে সমাজে। সর্বশেষ, ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আমাদের করণীয় বললাম। দেখতে দেখতে সময় পার। পুরো সময় শ্রোতাদের চোখের দিকে নজর রেখেছিলাম। মনে হল তারা মোটামোটি উপভোগ করেছে। তবে প্রতিটি পয়েন্টে উপলব্ধি করলাম আমার কি পরিমাণ জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। শ্রোতারা হয়তো বুঝতে পারেনি, কিন্তু আমি তো নিজের কাছে পরিষ্কার, কোন কোন পয়েন্টে আমি তাদের ফাকি দিয়েছি। প্রয়োজন ছিল আরো ডিপ নলেজের, প্রচুর তথ্য ও যুক্তির। আসলে প্রচুর পড়ালেখা করা দরকার, যার সামান্যই আমরা করি।
০২.
বাসায় ফিরতে ফিরতে দুপুর। জুমার আগেই ছোট চাচাকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম এক আত্মীয়ের বাসার দাওয়াত রক্ষা করতে। সেই বাড়ির চাচি বড় জাদরেল মহিলা। কেউ না গেলে মাইন্ড করবেন। তাই ঘরের প্রতিনিধি হিসেবে বাধ্য হয়ে গেলাম। সাড়ে তিনটায় ইসলামী শিক্ষা দিবসের আরেকটি প্রোগ্রামে এ্যাটেন্ড করতে হবে। সুতরাং তাড়া রয়েছে।
দুপুরে পোলাও গোশত কোল্ড ড্রিংকস সাবার করে চুপচাপ বসে আছি। হঠাৎ সে ঘরের চাচি এসে হাক ডাক শুরু করলেন। আমার সাথে আসা চাচাকে অর্ডার দিলেন, ভেতরে আস, মেহমানদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই, ভাতিজা বউকে তো চেননা। পিছনে বসা ছিলাম। আমাকে বললেন, ওঠ, ভিতরে আস, ভাইয়ের বউর সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। আমি গা করছিনা দেখে তিনি ঘুরে দাড়ালেন, মুখোমুখি হয়ে বললেন, বড় ভাইয়ের বউ, ছোট ভাইয়ের বউ না, ওঠ!
জাদরেল মহিলা, হাক ডাকে আতকে উঠলাম। এ বিষয়ে আমার কথা বলার মত পরিবেশ এ ঘরে নেই। তবে তার ফতোয়ায় বেশ মজা পেলাম। বউ যদি বড় ভাইয়ের হয়, দেখা করা যাবে, ছোট ভাইয়ের হলে নাজায়েজ! মানুষ কত কি যে নিয়ম নিজেরা তৈরী করে।
ফেরার পথে রিক্সায় চাচাকে বললাম, ফতোয়া শুনলেন তো?
কি ফতোয়া?
ওই যে চাচি বললো, বড় ভাইয়ের বউ, ছোট ভাইয়ের বউ না।
চাচা হাসলেন, বললেন, কেন গ্রামে গঞ্জে তো কথাই আছে ভাসুরের সাথে দেখা দেওয়া যাবেনা, দেবরের সাথে দেখা করা যাবে।
রিক্সায় চলতে চলতে দুলতে দুলতে বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করলাম। পথিমধ্যে নেমে পড়লাম। শহীদ আব্দুল মালেক ভাইয়ের উপর আরেকটি প্রোগ্রামে যোগ দিতে হবে। অন্য থানার প্রোগ্রাম, কিন্তু থানা সভাপতি দুদিন আগেই আমাকে কনফার্ম করে রেখেছেন তাই না যেয়ে উপায় নেই। না, ব্ক্তৃতা দেওয়ার জন্য নয়।
০৩.
পোগ্রাম স্থলে এসে দেখি আয়োজকগণ চিন্তায় পড়ে গেছেন। একটি স্কুলে প্রোগ্রাম। লোকজন যে হারে আসছে তাতে জায়গার সংকট পড়বে। অবশেষে বাড়তি লোকের জন্য ব্যবস্থা করা হলো। মালেক ভাইয়ের উপর আলোচনা, কেন্দ্রীয় মেহমান আসবেন, শুনেই অনেকে বিনে দাওয়াতে হাজির। আমাদের ওয়ার্ডের কয়েকজন উপশাখা সভাপতি আমার মুখে শুনে উপশাখার প্রোগ্রাম বাতিল করে দলবল নিয়ে হাজির।
বিশেষ মেহমান ছিলেন শহীদ মালেক ভাইয়ের যিনি বায়তুলমাল সেক্রেটারী হিসেবে কাজ করেছেন, অধ্যাপক হারুনুর রশীদ। মালেক ভাইকে তিনি যেমন দেখেছেন, হৃদয়গ্রাহী ভাবে উপস্থাপন করেছেন। শ্রোতারা মন দিয়ে শুনল। সত্যিই মালেক ভাই ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য এক প্রেরণার বাতিঘর। যেমনি মেধাবী তেমনি বিনয়ী, বহুগুণে গুনান্বিত। একবার একটি তিনদিনের শিক্ষা শিবিরে তাকে পাওয়া যাচ্ছেনা, অবশেষে পাওয়া গেল, নর্দমার পানিতে কোমড় সমান নেমে শিক্ষাশিবিরের জন্য তৈরী কাচা টয়লেট সংস্কার করছেন। পজিশনে তিনি নেতা ছিলেন, কিন্তু ময়দানে ছিলেন এক নিরব কর্মী। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছিল যার একমাত্র কামনা। কর্মীদের নিকট তিনি ছিলেন এক বটগাছ। তার পরিধেয় বস্ত্রের মধ্যে ছিল কেবলই একটি পাঞ্জাবী ও পাজামা। রাতে ধুয়ে দিতেন, সকালে উঠে ওটাই পড়ে বেড়িয়ে পড়তেন। স্টাইপেন্ডের টাকা দিয়ে কিনতেন বিভিন্ন বিষয়ের উপর বই। ছিলেন জ্ঞানের পিয়াসী। ওই বয়সেই এমন গভীর লেখালেখি করতেন, যা সত্যিই বিস্মায়কর ছিল। তার একটি বক্তৃতাই ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির শিবিরে কাপন তুলেছিল।
কেন্দ্র থেকে প্রধান মেহমান এলেন। বক্তব্য রাখলেন। আর আমি একে একে মালেক ভাইয়ের উপর চারটি গান পরিবেশন করলোম। এজন্যই আমাকে আসতে বলা।
০৪.
মাগরীবের পর বাসায় ফিরে দেখি বাড়ি থেকে দাদীর হাতের পিঠা হাজির। বসে পড়লাম পিঠা খেতে। অন্যরকম অনুভূতি।
এশার পর আমাদের মসজিদে সাপ্তাহিক দারসুল কুরআন প্রোগ্রাম। নিয়মিত ও ধারাবাহিক আলোচনা। আমিও একজন নিয়মিত শ্রোতা। সূরা আনআমের দুইটি আয়াতের উপর আজ আলোচনা হল। ভাল লাগলো খুব। সূরা আনআম পুরোটাতেই আল্লাহর তাওহিদের কথা রয়েছে। কাল জানলাম, ইলাহ শব্দকে একর্থে প্রতিস্থাপন করা যায় 'সার্বভৌম শক্তি' হিসেবে। সার্বভৌম শক্তি হিসেবে মানতে হবে একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আলামীনকেই। পৃথিবীর আর কোন শক্তিকে সার্বভৌম শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো যাবেনা। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এটি শক্ত নির্দেশনা।
ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা। আরমোড় ভেঙ্গে ব্লগের সামনে বসলাম। ভাবলাম ব্লগারদের সাথে ব্যাক্তিগত হালচাল শেয়ার করি। পুরো দিনটি ব্যস্ততায় কেটে গেল। একপ্রকার মন্দ যায়নি। তবে আলস্যের ঘুমটা দেয়া সম্ভব হয়নি। যা হোক, সোমবার মিডটার্ম পরীক্ষা। আর নয়, পাঠ্য বই নিয়ে বসতে হবে কোমড়ে গামছা বেধে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

