somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চারপাশে নীল হলুদ সবুজ মানুষ ( শেয়ার করলাম)

০৬ ই আগস্ট, ২০০৮ সকাল ১০:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চার পাশে নীল হলুদ সবুজ মানুষ

ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ

এই গল্পের কুশীলব হলো চারপাশের মানুষ। গুলমোহর মধ্যমণি চরিত্র। আম্মা গুলবদনের নামের সঙ্গে মিলিয়ে প্রথমা মেয়েটির নাম আব্বা গুলমোহর রেখেছিলেন। বিয়ের পর স্বামী তাকে রিনা নামে ডাকে। গুলমোহর আজ পতিগৃহে যাচ্ছে। ওকে নিয়েই গল্প। সন্ধ্যারাত থেকে শিহরিত এক ঘোরের মাঝে কাটছে গুলমোহরের।

বাবার ঘর থেকে স্বামী ওমর তাকে কর্মস্থল ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে। সারারাত ছুটছে ‘উপবন’ ট্রেনটি। এর ধাতব শব্দ কানে যেন ঝিঁ-ঝিঁ পোকার একটানা গুঞ্জনের মতো আঘাত হানছে। দু’পাশের সবুজ বন-প্রান্তর রাতের কালি মেখে আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। নিঝুম ঘরবাড়ি আর নিঃসীম আঁধারের মাঝে গুলমোহরের খোলস ছেড়ে রিনা নামের মেয়েটির জন্ম হচ্ছে। বিয়ে নামক দু’অরের শব্দ গুলমোহরের মনটি অন্যরকম করে বদলে দিচ্ছে।

স্বামী হিসেবে পরিপূর্ণ এক যুবককে কাছে পেয়েছে রিনা। সালোয়ার-কামিজ ছেড়ে সবে শাড়ি পরতে শিখেছে। বিয়ের আগে তাই হাতেগোনা শাড়ি ছিল। বিয়ের সময়কার উপহার পাওয়া শাড়িতে এখন স্যুটকেস উপচে উঠেছে। গভীর রাতে ট্রেনের আলো-আঁধারি আর ছন্দের দুলুনিতে আনন্দ যেন বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে ওকে। ওমরের হাতের মুঠোর মধ্যে ওর হাতটি বাঁধা পড়েছে।

সমাজের চারপাশের মানুষগুলো বাস্তব সমস্যা একেবারেই বুঝতে চায় না। কিংবা বুঝেও না বোঝার ভান করে। দীনতা আর হীনতার কষ্টকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আরও রক্তাক্ত করে তোলে। ব্যাংকের সাধারণ মানের চাকুরে ওমর, বেশি টাকা দিয়ে ঢাকায় বাড়ি ভাড়া করা তার পক্ষে কতোটুকু সম্ভব, তা আর কেউ না বুঝুক মোহর তা বোঝে।

আত্মীয়-স্বজন প্রশ্ন করতো, কি গো মোহরের মা, জামাই চিঠিপত্র দেয় তো? এখনও সংসার হলো না ওদের। এই বয়সে দু’জন দু’জায়গায় থাকা ঠিক নয়। গুলমোহর এসব কথা শুনে হেসেছে। ভেবেছে মুরুব্বীদের শুধু শুধু ভাবনা ওসব, আজ তো স্বামীর সঙ্গে সে নিজের সংসারে যাচ্ছে। এ ওর বিজয় বৈকি!
আসার সময় মায়ের গলা জড়িয়ে ধরেছে। দু’চোখ ছাপিয়ে কান্না নেমেছে। ছোট ভাইদের ছেড়ে আসতে ভীষণ কষ্ট হয়েছে। তবু দুঃখের পাশাপাশি এক ধরনের সুখ ওকে ভরিয়ে দিয়েছে।

হেমন্ত শেষের ভোরে শতদলের পাপড়ির মতো ফুটে ওঠা কমলাপুর রেলস্টেশনটি কলরোলে ভরে উঠেছে। গুলমোহর অবাক চোখে চারপাশে তাকায়। সাত সকালেই আনকোরা খবরের কাগজ নিয়ে ফেরিওয়ালা হাঁক দিচ্ছে।

ট্রেন থেকে নেমে রিকশা নেয় ওমর। মাথার ওপর স্নিগ্ধ নীল আকাশ, প্রভাতী হাওয়া ওদের ঘিরে রেখেছে। রাস্তার ওপর কাঁচাবাজার, টমেটো, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপিতে শিশির মাখা। যা কিছু দেখে তাই ভালো লাগে ওর। মালিবাগ পার হয়ে এগিয়ে চলছে রিকশা। এখনও বাড়িতে বাড়িতে মানুষের কলরোল পুরোপুরি জাগেনি। কচি ছেলেমেয়েরা মা-বাবার হাত ধরে স্কুলে যাচ্ছে।

হিম হিম মিষ্টি হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে গুলমোহরকে। ওমর সংকোচের সুরে বলে, বাসাটা কিন্তু ছোট রিনা। কি জানি-তোমার পছন্দ হয় কি না।
রিনা হাসে। গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে। ‘নীড় ছোট তি নেই, আকাশ তো বড়।’
সব ভুলে গুলমোহরের হাতে আলতো চিমটি কাটে ওমর।
-ওরে দুষ্টু!

খুনসুটি আর গুনগুন গানের আওয়াজে রিকশাওয়ালা পেছন ফিরে তাকায়। উদাস ভঙ্গিতে বলে, হাল্লায় রংবাজ সিনেমা আর কতোই দেখাইবো।
রিকশাওয়ালার নগ্ন কথায় দুজনে কিছুটা মিইয়ে গেলেও পর মুহূর্তে গুলমোহর ওসব কথা ভুলে যায়। বলে, পথ যে শেষ হচ্ছে না। অনেক দূর বুঝি?

এই প্রভাতী আকাশ, সদ্য জেগে ওঠা শহরে পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে শিশুদের ছুটে যাওয়া- সব কিছু একাকার হয়ে ওর দু’চোখে এক স্বপ্নজগৎ তৈরি হয়। রেলগেট পার হবার পর ওমর বলে, এই তো এসে গেছি। ছয় তলায় দুটি কামরা। লাগোয়া বাথরুম, একপাশে রান্নাঘর।

বাড়িতে ঢুকে ওমর মনমরা হয়ে বলে, বাড়িটা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল তো?
-মোটেও নয়। এই তো বেশ!
-সত্যি বলছো?
-হ্যাঁ, হ্যাঁ। সত্যি সত্যি সত্যি তিন সত্যি।

উৎসাহে ওমর বলে, এদিকটাতে তাও বাসা ভাড়া কম। পুরানা পল্টন, সিদ্ধেশ্বরী, শান্তিনগর হলে আরও টাকা গুনতে হতো।
গুলমোহর খুব খুশি, ছয় তলায় ছোট্ট দু’টি ঘর। তাতে কি? মাথা গোঁজার ঠাঁই তো। নিজের স্বপ্নের সংসার। আব্বা শিখিয়েছেন, জীবনে অ্যাডজাস্টমেন্টটাই বড় কথা। আম্মা বলেছেন, সংসারের শান্তিতেই আসল সুখ। ওমরের জন্য এক এক সময় খুব কষ্ট হয়। ওকে আরামে-আয়াসে রাখতে পারছে না বলে এক ধরনের আপে থাকে ওর কথায়। কোনো মানে হয়?

গুলমোহর গলায় খুশি মেখে বলে- বা রে! মানুষ তো আমরা দু’জন। সাতমহলা বাড়ির দরকারটা কি শুনি?
ওর খুশির তোড়ে ওমরের মনের দৈন্যতা, গ্লানি আর অপারগতার জ্বালা নিমেষে ধুয়ে-মুছে যায়। কাছের মেয়েটি যদি অভয় দেয় তবে আর ভয় কি?

দিন চলে যায় মাদকতার ঘোরে। তবু শুধু হাসি গান আর শারীরিক সুখে ডুবে থাকলে তো চলে না। পেটে পাথর বেঁধে থাকা যায় না। ডেকচি, কড়াই, সসপ্যান, খুন্তি কেনাকাটা করে দু’জন মিলে। আনন্দের হৈ চৈ-এ সংসার বাসর ঘর হয়ে ওঠে। ওমর বলে, এবার বাকি রইল শুধু ননস্টিক প্যান।

-না না- ওসব কিনতে হবে না। ভীষণ দাম। ওমর বলে, না না ওটা তোমাকে দেবই আমি। বিবিকে পেয়ার করলে ননস্টিক প্যান কিনে দিতে হয়। সেদিন টিভিতে অ্যাড দেখনি?
-অ্যাড?
-হ্যাঁ হ্যাঁ অ্যাড-বিজ্ঞাপন।
গুলমোহর মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, না না, আর কোনো খরচ নয়। অনেক হয়েছে।
মা গুলবদন বরাবর ডেকচিতে রেঁধেছেন। পাকা রাঁধুনি বলে শহরে তার খুব সুনাম। ননস্টিক প্যানে রাঁধেননি বলে তো রান্নার মান কমেনি।

ওমর অফিসে গেলে এলোমেলো ঘর গুছানো, দু’একটা শাড়ি-শার্ট কাচাকাচি, কিছু রান্না এইতো কাজ। কাছের বস্তি থেকে ঠিকে বুয়া আসে। ছ’টায় এসে কড়া নাড়ে। বাসি বাসন-কোসন ধোয়, ঘর মোছে। এ সময়টাতেই একটু কাজের ঝামেলা। হট-ক্যারিয়ারে ওমরকে দুপুরের ভাত-তরকারি-ডাল গুছিয়ে দিতে হয়।

ওমর অফিসে চলে গেলে একেবারে একা হয়ে যায় সে। অফুরন্ত সময় বুকে বরফের চাঁই-এর মতো চেপে বসে। চারপাশে নতুন নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে কাছের ফ্যাটগুলোর আধুনিক জীবন যাপনের ভগ্নাংশ। এসব দেখেও ক্ষোভের কুয়াশা ওর বুকের ভেতরে এতটুকু জমে না।

গুলমোহর আপন মনে উচ্চারণ করে, আমি সুখী, আমি সুখী। যত্ন করে সে ওমরের জন্য রাঁধা-বাড়া করে। কিছুই নষ্ট করে না। লাউ-এর খোসা যত্ন করে ভাজা, ঝিরি ঝিরি করে কেটে লাউঘণ্ট করে, বিচি দিয়ে ভাজি করে। তরুণী স্ত্রীর কর্মদক্ষতা দেখে ওমর হতবাক হয়ে যায়।

ওর দিনগুলোও এখন অন্যরকম হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেও অফিস ছুটির পর ঘিঞ্জি মেসবাড়িতে ফেরার ইচ্ছে একেবারেই মরে যেত। এখন টেবিল স্তুপ করা জরুরি, অতি জরুরি ফাইল-যেগুলো ঊর্ধ্বতন অফিসারের কাছে পাঠাতে হবে- সেসব কাজে ভালো করে মন বসাতে পারে না। ঘরে ফেরার চোরাটান অনুভব করে। মাঝে মধ্যে ওরা বেড়াতে যায়। একদিন যায় ওমরের অফিস বস আবেদ হোসেনের বাসায়।

খুব স্নেহ করেন ওমরকে। প্রায়ই বলতেন, বউ নিয়ে বাড়িতে এসো। রিনাকে ভেতরের ঘরে নিয়ে গেলেন আফসানা। প্রেসার কুকার, টোস্টার, ব্লেন্ডার, মিক্সি, মাইক্রোওয়েভ ওভেন সাজানো ঝকঝকে ডাইনিং স্পেস। এ জায়গাটুকুও ওদের বাসার জায়গা থেকে অনেক বড়। তাতে কি? খুব ভালো আছি আমরা। মনে মনে বারবার এ কথাটি উচ্চারণ করে গুলমোহর। আফসানা জিজ্ঞেস করেন, নতুন সংসার কেমন লাগছে রিনা?

-ভালোই ভাবী।
গুলমোহরের মুখে আলোর আভা।
গল্পে-কথায় বেশ কিছু সময় কেটে যায়। গুলমোহর আফসানা ভাবীর কাছে সহজ হয়ে বলে, এখন তো গরম পড়েছে ভাবী। দুপুরে তরকারি, ভাত সেদিন রান্না করে রেখেছি- ওমা সন্ধ্যারাতেই সব নষ্ট হয়ে গেছে। তার চেয়ে বরং শীতের দিনগুলো অনেক ভালো। তাই না ভাবী!

আবেদ সাহেবের সঙ্গে অফিস পলিটিক্স নিয়ে গল্প বেশ জমে উঠেছে ওমরের। গুলমোহরের কথাগুলো কানে এসে সজোরে ধাক্কা দেয়। ও এত সহজ সরল হলো কেন? সব কিছু কি সবাইকে বলতে হয়? নিম্ন মধ্যবিত্ত আর অভাবী মানুষের ওপর প্রকৃতিও বড় নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। কতো কষ্ট, কতো অসুবিধে ওমরের সংসারে।

আফসানা ভাবীর বাড়িতে বরফের হিম হিম শীতলতা ছড়ানো। সেভেন পয়েন্ট ফাইভ ওয়েস্টিং হাউস ফ্রিজের ভেতর অগুনতি কোমল পানীয়। ঘরে ঘরে এয়ার কন্ডিশনার, কুলার। শীতল কোল্ড কফি ওমরের হাতে তুলে দিতে দিতে আফসানা হাসেন।
-আপনার বউ খুব সংসারী ওমর। দুপুরের ভাত, তরকারি এখন নাকি সন্ধ্যারাতেই নষ্ট হয়ে যায়।
আবেদ ঠা ঠা করে হাসেন।

-তাই নাকি ওমর? দুপুরের ভাত সন্ধ্যায় খারাপ হয়ে যায় নাকি আফসানা? দারুণ ইন্টারেস্টিং খবর তো! এ্যা ভেরি স্কুপ নিউজ।
আবেদ হোসেনের সঙ্গে ওমরের যে সস্নেহ সম্পর্ক তা মুছে গিয়ে অফিসের প্রাধান্যতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। দু’জনের মুখেই করুণা আর তাচ্ছিল্য ঝিলিক দিয়ে যায়। লজ্জায় ওমরের মুখ লুকোতে ইচ্ছে করে।
গুলমোহর বিব্রত, ওমরের মুখে কালির ছোঁয়া। মাথা নিচু করে বসে থাকে গুলমোহর। কথায় কথায় হঠাৎ কি বলে ফেলেছে, এ যে মজাদার টপিক হয়ে যাবে তা সে একেবারেই বুঝতে পারেনি।

কোনরকমে বিদায় নিয়ে রিকশায় ওঠে ওরা। ওমর একেবারে চুপচাপ। গুলমোহর ওর কাঁধে মুখটি রেখে বলে-বা রে! কথা বলছো না কেন? রাগ করেছো?
- না করবো না। রান্নাঘর ছাড়া আর কোন কথা তুমি বলতে পারো না রিনা? মানুষের হাসির খোরাক হতে ভালো লাগে? অভিমানে গুলমোহরের চোখে পানি এসে যায়। আর কি বলবে সে? এসব কথা বলা কি খুব অপরাধের? খুব হাসির ব্যাপার? ও তো তা জানে না।

কিশোরী বয়স থেকে আম্মাকে সে ঘরের কাজে সাহায্য করেছে, ঘর গুছিয়েছে, মেহমান এলে নাশতা বানিয়েছে- এই তো জানে। ঢাকায় দু’একবার খালার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। একটানা বসবাস বলতে যা বোঝায় তা হয়নি। এখন ঢাকায় থাকবে সে। কোথায় কি বলতে হবে ধীরে ধীরে রপ্ত করে নেবে।
ওমরের খালাতো ভাই ইমরান একদিন ওদের বাড়ি আসে। এসেই অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসে।
- কি রে! আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নিতে হয় না? ঢাকায় এসেছিস ঠিকানাও দিসনি। ব্যাংকে গিয়ে এ্যাড্রেস নিয়ে এলাম।

ওমর খুশি হয়ে বলে, মেজভাইয়া ওয়েলকাম, ওয়েলকাম। অ্যাই রিনা, রিনা- শোন, দেখে যাও কে এসেছে।
রিনা ছুটে আসে। কোনদিন দেখেনি, তবুও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।
-ইস্-স্ ভাইয়া আপনি এসেছেন, কী মজা হবে! আজ কিন্তু খেয়ে যাবেন। না না, কোন ওজর আপত্তি শুনব না। দু’জনের আনন্দ উচ্ছ্বাসের মাঝে ইমরান যেন পানি ঢেলে দেয়।

-কি খুপড়ি ঘর নিয়েছিসরে ওমর! একটা স্ট্যান্ডার্ড মেনটেন করবি না? ছাদের ওপর ঘর নিয়েছিস, সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে পা-ই ভেঙে আসে। কেন লিফ্ট দেখে আসবি না? লাইফ স্টাইল চেঞ্জ কর রে বুদ্ধু। তুই বরাবরের বোকাই রয়ে গেলি।
ওমরের মুখের আলো দপ্ করে নিভে যায়। বলে, আমার সঙ্গে না হয় রিলেশন রেখ না মেজ ভাইয়া।
ইমরান মুখিয়ে ওঠে।

-এতে রাগ করার কি আছে? কি এমন খারাপ কথা বলেছি রিনা? চাকরি করার সঙ্গে সঙ্গে বিজনেস কর। ব্যাংকের লিমিটেড টাকায় কিছু হয়?
চাকরি করে অন্য কোন অকুপেশন নেয়া যায় না এ কথা কি মেজভাইয়া জানে না? আমি নিয়মের পথেই চলব, কখণো অনিয়ম করব না। মনে মনে বলে ওমর। হঠাৎ করে পিউ পিউ করে ইমরানের বুক পকেটে মোবাইল ফোন বেজে ওঠে।
এ যে অবাক করা কান্ড! হাসতে হাসতে গুলমোহরের চোখে পানি এসে যায়। হাতের পেয়ালা থেকে পিরিচে চা ছলকে পড়ে।

- আমি তো একেবারে কেঁপে উঠেছি মেজভাই।
একটু আগের অপমানের কথা কি বেমালুম ভুলে গেছে রিনা? কি সহজ হয়ে হাসছে, কথা বলছে।
ওমর চোখ বড় বড় করে রিনার দিকে তাকায়? এই সহজ-সরল মেয়েটিকে কি করতে যে ইচ্ছে করে।
তারপর কথা আর জমে না। স্বামীর গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে রিনা কুঁকড়ে যায়।

বাড়িতে আপনজন এলে খেয়ে যাবে। এই তো স্বাভাবিক। বড়রা যদি দু’একটি কথা বলে তাতে কি হয়? এতো অভিমান থাকলে কি সংসারে চলা যায়?
খুপড়ি রান্নাঘরে গুলমোহর যত্ন করে রাঁধে। লাউ ঝিরি ঝিরি করে কুচিয়ে ঘণ্ট, খোসা কুচিকুচি করে তরকারি, বিচি আর বেসন মিশিয়ে ভাজি, মুরগির ঝোল।

ইমরান খেতে খেতে শাসনের সুরে বলে, এই সিস্টেমটা তুমি পাল্টাও রিনা। কেউ বাড়িতে এলে চা-নাশতা দাও, খানা দাও। এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকলে কথা বলবে কখন?
খেয়ে দেয়ে ইমরান চলে গেলে ওমর রিনাকে নিয়ে বসে।

-সারাক্ষণ তো ঝুলিভরা উপদেশ দিয়ে গেল- ওকে এত কষ্ট করে রেঁধে খাওয়াবার কি দরকার ছিল রিনা? ও আমাদের ছোট করে দেখল- তুমি তাকে যত্ন করে খাওয়ালে, কী অদ্ভুত চরিত্র তোমার!
ওমর কেমন মানুষ! হাসি এলে হাসবে না? আবেগ উচ্ছ্বাস ও যে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে রাখে- কে জানে?
গুলমোহর অপরাধীর মতো বলে, কি করব বলো তো। বাড়িতে এসে আমাদের বলেছে বলে আমরা কি খারাপ ব্যবহার করতে পারি? যতই হোক আমাদের বাড়িতে এসেছে।

-হোয়াট রাবিশ! তুমি কি কিছুই বুঝবে না রিনা? মান-অপমান বোধটুকুও তোমার নেই? মোবাইল ফোন বাজল আর তুমি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লে, যেন খুব মজার ব্যাপার ঘটেছে। ওফ্ হোপলেস।
যারা নিজেদের উঁচু ভাবে, তাদের সামনে রিনা বুঝে শুনে চলবে না?

গুলমোহরের ফুফাতো বোন প্রিয়াংকা আপা গুলশানে থাকে। চিঠি লিখে ড্রাইভারকে দিয়ে খবর পাঠালো, তোরা একদিনও এলি না আমার বাসায়। আমাকে দেখে যাবি কিন্তু।
ওদের বাড়ি যাবার আগে শাড়ির কুঁচি ঠিক করছে গুলমোহর।

ওমর বলল, খবরদার রিনা, আপন মনে করে সবার কাছে গল্পের ঝুলি আর খুলে বসো না।
রিনা ভ্রূ কুঁচকে স্বামীর দিকে তাকায়।
-আচ্ছা বাবা আচ্ছা বলব না, বলব না, কিছুই বলব না। যা বলার তুমিই বলবে। আমি মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকব।
ওমর বলল, রাগ করলে? এই দ্যাখো তো তোমার নাম গুলমোহর বদলে রিনা রাখলাম। মোস্ট মডার্ন নাম। মেঘ কালো মুখে রিনা বলে, আমার গুলমোহর নামও কিন্তু পুরনো নয়। ফুলের নাম সব সময়ই সুন্দর।

ওদের বাড়িতে গিয়ে অল্প সময়ে স্বভাবজাত কারণে গুলমোহর প্রিয়াংকা আপার সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়।
-আপা তোমার বাড়িতে কী আরাম! এত গাছ গাছালি। ইস্-স্ মনে হয় বেহেশতে এসে গেছি।
-তুই তাহলে থেকে যা মোহর। তোর দুলাভাই আজ সিঙ্গাপুর থেকে ফিরবে, ওর সঙ্গেও দেখা হয়ে যাবে। তুমি কি বলো ওমর?

ঘরে এসি চলছে, তারই মৃদু গুঞ্জন। পাহাড় থেকে স্নিগ্ধ শীতলতা যেন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে প্রিয়াংকাপার ঘরে। বোনের সামনে প্রসারিত দুই হাত দেখিয়ে বলে,
- দ্যাখো না প্রিয়াংকাপু, হাতে কেমন ঘামাচি হয়েছে।
- তাইতো! ওমা আমি তো ভেবেছি রাশ।
ওমরের বুকের ভেতরে বিন্দু বিন্দু রাগ জমা হতে থাকে। ফুফাতো বোনের কাছে সব কিছু বলতে হবে? রিনার কি গোপন কথা বলে কিছু নেই?
ও বলছে, দ্যাখো না আপু-তিন চারটে হিট বয়েলও উঠেছে।

ওমরের মেজাজ আস্তে আস্তে তেতে ওঠে। এখন বৈশাখ মাস, গনগনে সূর্যের আলোয় আকাশ ইস্পাতের মতো সত্যি ঝলসে ওঠে। ওমরের বাড়ির পুরো ছাদটি আগুনের মতো গরম হয়ে যায়। ট্যাংক থেকে কলে নেমে আসা পানি এত তপ্ত হয় যে হাত ছোঁয়ানো যায় না।

সবই ঠিক, কিন্তু তাই বলে কি সবার কাছে তা বলে বেড়াতে হবে? ওফ্ হরিবল!
রিনা এত ভালো, যা পায় তাতেই খুশি- তবু সে এসব বোঝে না কেন?
প্রিয়াংকা বলে, ঢাকায় গরম এমনিতেই বেশি রে। সিজলিং হট্। বললাম তো দু’একদিন এখানে থাক। তুই কি আমার পর?

-না না, আপু। ঘরদোর এমনিতেই এলোমেলো রেখে এসেছি।
-বাব্বা! দুদিনেই কী সংসারী হয়ে গেছিস। না হয় নাই থাকলি, ডিনার খেয়ে যা।
রান্না হবে তারপর খাওয়া, উফ্ সে তো অনেক দেরি। বাড়িতে কখন ফিরতে পারব বলো তো?
মাইক্রোওয়েভে আলু সেদ্ধ হয়ে যায় চোখের পলকে। ভেটকি মাছের ফিলে গ্রিল হয় ওভেনে। মিক্সিতে অনেক ধরনের মসলা নিমেষে মিহি হয়ে যায়।

চটপটে বাবুর্চি ক্যারামেল করা পুডিং রাখে ডাইনিং টেবিলে। প্রিয়াংকা হেসে বলে, দেখলি তো- কেমন বায়োনিক ওম্যান হয়ে গেছি। গুলমোহর নির্ণিমেষ চোখে বহু চেনা আপুর দিকে তাকিয়ে থাকে। মাইক্রোওয়েভে কত ডিগ্রি ফারেনহাইটে কি রাঁধতে হবে এসব না জানলে যে কেউ মানুষ হিসেবে গণ্য করে না- বুঝতে পারে গুলমোহর।

ডিনার খাওয়ার মাঝে প্রিয়াংকার স্বামী শওকত ফিরে এলো। সঙ্গে বিশাল দু’তিনটি স্যুটকেস। এর মাঝেই প্রিয়াংকাদের পরিচিত দু’তিনজন কাপল এলেন। শওকতের বিজনেস পার্টনাররাও রয়েছেন।
জমজমাট আসর বসে, কাঁটাচামচ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ফিলে ফ্রাই খায় ওরা। দু’এক পেগ হুইস্কি ঢালে সফেদ বরফের টুকরো তাতে ভাসে।

সিঙ্গাপুর, কানাডা, ম্যানিলা আর আমেরিকার গল্পে মুখর হয়ে ওঠে প্রিয়াংকাপুর ডাইনিং স্পেস। ফিশ ফিলেতে কি কি মসলা মেখে ম্যারিনেট করতে হয় সে সব কৌশল নিপুণ জাদুকরের মতো শিখিয়ে দেয় প্রিয়াংকা।
ওমর মুড়ি-মুড়কির মতো মিইয়ে থাকে। অস্বস্তিতে বড় বিব্রত হয়ে পড়ে। গুলমোহর অবাক চোখে তাকিয়ে বিত্ত-বৈভব জগতের সব মানুষ আর তাদের পাশে দাঁড়ানো নিখুঁত মোমের পুতুলদের দেখতে থাকে।
সন্ধে রাত থেকে আকাশের ঈশান কোণে কালো মেঘ জমেছে। থমথমে হয়ে উঠেছে কাঁচা রাত। মৃদু বাতাস উতল হয়ে হয়ে উদাস বাউল হয়ে উঠেছে। মেঘে মেঘে ঘর্ষণে আকাশে জেগেছে সর্পিল বিদ্যুৎরেখা- সেসব প্রিয়াংকার জমজমাট আসরের মানুষরা কেউ টের পায়নি এতক্ষণ।

ওমর আর গুলমোহর এই অন্যরকম জগতে এসে যাবার কথা বলার আর ফুরসত পায় না। মনে হয়, ওদের যাবার কথায় যদি ছন্দপতন ঘটে যায় জলসাঘরের এই আসর। এক সময় শওকতের বিজনেস পার্টনার রায়হান বলে- মাই গড সাড়ে বারোটা বাজে, এবার ফিরতে হবে।

বাইরে কালবোশেখি ঝড়। জানালার শার্সি থরথর করে লাজুকলতার মতো কেঁপে উঠছে। এত রাতে রিকশা-স্কুটার কিছুই পাওয়া যাবে না। এরপর রাত আরো বাড়লে, ঝড়ও যদি বাড়ে, বৃষ্টির পানিতে সয়লাব হয়ে যায় যদি পথঘাট- তাহলে তো আরও বিপদ।

যাদের গাড়ি রয়েছে ওরা তড়িঘড়ি করে ছুটল। শওকতের ড্রাইভার গাড়ি বের করে। শওকত আর দু’জন কাপল ওদের গাড়িতে ওঠে।


সংগ্রহকৃতঃ বিডিইন
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×