*(যাদের হার্ট খুব দূর্বল তাদের না পড়ার জন্য অনুরোধ!)
মৃত্যুর নিয়তিকে মেনে নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর পাঁচ খুনি। তাই ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে তাঁরা নিশ্চুপ ছিলেন। মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও স্বাভাবিক গতিতেই তাঁরা হেঁটে গেছেন ফাঁসির মঞ্চের দিকে। তবে একজন মুহিউদ্দিন (আর্টিলারি) ফাঁসির মঞ্চে যেতে কিছুটা বিলম্ব করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
বুধবার রাত ১২টা পাঁচ মিনিট থেকে একটা পাঁচ মিনিট পর্যন্ত দুজন দুজন করে এবং শেষে একজনের ফাঁসি কার্যকর হয়। প্রতিটি ফাঁসি কার্যকরের পরই ঢাকার ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন মুশফিকুর রহমান নাড়ির স্পন্দন পরীক্ষা করেন। ফাঁসি কার্যকর করার পর লাশগুলো ঢোকানো হয় কফিনে। এরপর নেওয়া হয় অ্যাম্বুলেন্সে।
ফাঁসি কার্যকর করার সময় স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুস সোবহান সিকদার, কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশরাফুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার এ কে এম শহীদুল হক, ঢাকার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জিল্লার রহমান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অমিতাভ সরকার, ভারপ্রাপ্ত সির্ভিল সার্জন মুশফিকুর রহমান, ডিআইজি প্রিজন গোলাম হায়দার ও কারা তত্ত্বাবধায়ক তৌহিদুল ইসলাম উপস্থি ছিলেন। এই কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ফাঁসি কার্যকরের মুহূর্ত সম্পর্কে জানা গেছে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পুলিশ কমিশনার শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমি জানতে পারি, আজ (২৭ জানুয়ারি) রাতেই খুনিদের ফাঁসি কার্যকর হবে এবং আরও কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আমাকেও সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। ফাঁসি কার্যকর করার আগে ১১টার দিকে কারা তত্ত্বাবধায়ক তৌহিদুল ইসলাম উপস্থিত সব কর্মকর্তার উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। এরপর ফাঁসির মঞ্চ পরীক্ষা করা হয়। ১২টার দিকে দুই খুনিকে হাতকড়া পরিয়ে কয়েদির পোশাকে আনা হয়। মাথায় ছিল কালো জমটুপি। এই টুপি পরলে কিছু দেখা যায় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘটনাস্থলে উপস্থিত আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, রাত ১১টায় কারা তত্ত্বাবধায়ক তৌহিদুল ইসলাম ফাঁসির প্রস্তুতি সম্পর্কে উপস্থিত কর্মকর্তাদের অবহিত করেন। এরপর ৪২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি শাহজাহানের নেতৃত্বে তিন জল্লাদ মঞ্চের সামনে আসেন। তাঁরা ফাঁসির রশি টেনে পরীক্ষা করেন এবং এক ধরনের পিচ্ছিল পদার্থ লাগান।
ওই কর্মকর্তা বলেন, রাত সাড়ে ১১টায় কারা মসজিদের ইমাম মনির হোসেন ও দুই জল্লাদ ফাঁসির সেলে যান। তাঁরা খুনিদের সঙ্গে কথা বলে মানসিকভাবে প্রস্তুত করেন। ইমাম পাঁচজনকেই তওবা পড়ান। একপর্যায়ে দুই হাত পেছনে নিয়ে হাতকড়া ও কালো রঙের জমটুপি পড়ানো হয়।
এরপর ফাঁসির সেল থেকে দুই সহকারী জল্লাদ প্রথমে সৈয়দ ফারুক রহমানকে আনেন। তিনি জল্লাদদের সহযোগিতায় স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে মঞ্চে ওঠেন। কিছুক্ষণ পর আনা হয় শাহরিয়ার রশিদকে। মঞ্চে তোলার পর দুজনের পা বেঁধে গলায় ফাঁসির রশি পরানো হয়। রাত ১২টা পাঁচ মিনিটে সব প্রস্তুতি যখন শেষ, তখন কারা তত্ত্বাবধায়ক তাঁর হাতের রুমালটি ফেলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে জল্লাদ মঞ্চের লিভার টান দিলে দুই খুনির পাঁয়ের নিচের পাটাতন সরে যায়। দুজনেই ঝুলতে থাকেন মঞ্চের কূপে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, প্রায় ১৫ মিনিট পর কূপের দরজা খুলে সিভিল সার্জন মুশফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল সেখানে যান। সিভিল সার্জন নাড়ির স্পন্দন দেখেন। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ রশি থেকে নামানো হয়। এরপর লাশ পাশের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই কর্মকর্তা জানান পরের ঘটনা প্রবাহ। তাঁদের মতে, ‘রাত ১২টা ৩৫ মিনিটে একইভাবে কয়েদির পোশাক ও কালো জমটুপি পরিয়ে আনা হয় এ কে এম মহিউদ্দিন (ল্যান্সার) ও বজলুল হুদাকে। তাঁদের মঞ্চে এনে একইভাবে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। রাত একটায় মুহিউদ্দিনকে (আর্টিলারি) আনতে দুই জল্লাদ সেলে গেলে তিনি বলেন, ‘সময় দেন। বাঁচতে চাই। ক্ষমা করা যায় না?’ এ কথা বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপর তাঁকে এক প্রকার জোর করে নিয়ে যাওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চে। সেখানেও চিত্কার করে কান্নাকাটি করেন তিনি।
ফাঁসির মঞ্চে উপস্থিত দুই কর্মকর্তা জানান, সবার ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে লাশগুলোর হাত ও পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়। সিভিল সার্জন খুনিদের মৃত্যু নিশ্চিত করে প্রতিবেদন তৈরি করেন। এরপর লাশগুলো একে একে কফিনে ঢুকিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়।
সব প্রক্রিয়া শেষ করে রাত তিনটার দিকে একে একে বেরিয়ে আসেন কর্মকর্তারা। গাড়িতে ওঠার সময় সিভিল সার্জন মুশফিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ফাঁসির আগে সব আসামির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন। সবার শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় কয়েদিরা একেবারেই নিশ্চুপ ছিলেন।
কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরিয়ে রাত তিনটায় স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুস সোবহান সিকদার সাংবাদিকদের বলেন, কারাবিধি মেনেই পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।
ফাঁসি কার্যকর করার আগে পরিবারের স্বজনদের রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। এ সময় কয়েদি ও স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। বজলুল হুদার পরিবার তাঁর লাশ হেলিকপ্টারে করে গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর জন্য আবেদন করে। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে দেয়।
সূত্রঃ
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৩:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


