বাতাসে রুটির গন্ধ ।
মুখ তুলে তাকাতে ইচ্ছা করে না অসিতের , মুখ তুললেই বৃষ্টির ছিট আসছে । বছরের এই সময়টা খুব খারাপ কাটে ... পড়ার মত কোন গরম জামা নেই , অথচ এমন শীত করে যে গায়ে কিছু না দিয়ে থাকাও যায় না । মাথায় দু-এক ফোঁটা পড়ুক ঠিক আছে , কিন্তু কাঁথা ভিজে গেলে শুকাতে বেশ কষ্ট হয় ।
বাম পা অনেক কষ্টে গাড়িতে উঠিয়ে দেয় অসিত , অর্ধেকটা নাই পায়ের , কাটা অংশটা টায়ারের রাবার দিয়ে মোড়া । ছোটদের আইসক্রিমওয়ালার গাড়ির মত গাড়িটা গড়িয়ে নেবার চেষ্টা চালায় সে , পারে না ; জোর পায় না হাতে আর ।
কাঁথায় নাক গুজে রুটির গন্ধ নিতে থাকে অসিত । এই হোটেলটার মালিক বদলেছে । মাসুদ চালাতো আগে , তখন গেলে দুই একটা রুটির টুকরো পাওয়া যেত ... এখন অসিতকে কেউ চিনে না ... গেলে ফকির বলে তাড়িয়ে দেবে .. অথচ ক্ষুধাটা এমন যে অস্বীকার করা যাচ্ছে না ।
এই রাস্তাটাকে নদীর মত লাগে তার । ছেলেবেলায় বাপুর সাথে মাছ ধরার কথা মনে আসে । নরম পলিমাটিতে পা দেবে যেত .. শিকারি বিড়ালের মত সর্ন্তপনে অসিত হাত রাখত নির্ভরতায় , দুহাতের ভাঁজে ধরা দিত অসহায় কোন মীন ।
"বাপু , জবর পাইছি.... "
ছেলের আনন্দ সংক্রমিত হত পিতার ঠোঁটেও , " লইয়্যা যা , তর মারে কইস রানতে .. এই মাছ বেচুম না "
সদ্য বৃষ্টিটা থামল ... এখনো ধোঁয়া উঠছে গরম পিচ থেকে .... গন্ধটা কেমন যেন নেশাধরা .... মাথা তুলে তাকায় অসিত । গাড়িটাকে আবার রাস্তায় গড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে , হাতে জোর পায় না । গত সাতদিন এরকম চলছে । জ্বর আর বৃষ্টির যণ্ত্রণায় একবারও বের হতে পারেনি ।
" মাথা ঠান্ডা রাখো ... পুরো ঠান্ডা । হাত কাঁপলে শেষ । আমরা কেউই পেশাদার যোদ্ধা না , মনে রাখবা । যেগুলা শিখাই , ভালোমত শিখে নাও । এভাবে দাঁত দিয়ে পিনটা খুলে হাতে নাও ..গুনতে থাকো ..এক ... দুই.. "
কমান্ডার গণি ভাইয়ের গলা যেন আজও বাড়ি খাচ্ছে ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে .... উপহাস ? ... পেশাদার যোদ্ধা ? জন্মের পর থেকে আজ অবধি , যুদ্ধই তো তার একমাত্র পেশা ।
গতকাল মিছিল হয়েছে এখানে । একটা ছেঁড়া স্যান্ডেল এখনো পড়ে , একটা ভাঙা চশমা । জুলফি বেয়ে গড়ানো পানির স্রোতটাকে মুছে ফেলে অসিত ।
রুটির গন্ধটা ক্রমেই বাড়ছে । খিদেটা চাগিয়ে উঠল আবার ... মাথায় এখন শুরু গরম রুটির ঘ্রাণ , একটা কাঁচামরিচ যদি পাওয়া যেত ?
জিভে জল আসে , জুল জুল করে একদৃষ্টিতে দোকানের চুলার আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে অসিত ।
ছাত্রজীবনে শখের রেডিও ছিলো একটা , টাকা জমিয়ে কিনেছিল অসিত, পরে কাজে দিয়েছিল । ১৬ জন ঘরহারা , স্বজনহারা যোদ্ধার সাথে সেও ছিলো এক যোদ্ধা । রোজ রাতে একসাথে গোল হয়ে বসে থাকতো সবাই , মাঝখানে কথা বলে যেন ন্যাশনাল ট্রানজিস্টর .....
রোজ এক-দুইজন শ্রোতা কমে যেত ... এক একটি অক্ষর হয়ে যেন রক্তাক্ত এক একটি ফুল , সেইসব না জানা কবরে।
২৫ এপ্রিল , ইকবাল হল ... করিডোরে লাশ .. লাশ আর লাশ ।
"বাপু , আমার আর ঢাকায় পড়া হয়নি বাপু । আমারে মাফ করে দাও ।" বিড়বিড় করে অসিত , জ্বরে মাথাটা ভীষণ ভারি লাগে । ক্ষুধা লাগে , বড় ক্ষুধা ।
চারদিন হলো কিছু পেটে পড়েনি .. এমনি সময় বোঝা যায় না , কিন্তু রুটির গন্ধটা মরে যাওয়া ক্ষুধাটাকে জাগিয়ে তুলছে ।
" মনে রাখবা , তুমি যোদ্ধা । খিদা পাইলে খাবা না , খাবার পাইলে খাবা । আমাদের দেশে যুদ্ধ চলতেছে ... না খেয়ে থাকতে হবে হয়তো দিনের পর দিন । মনের জোর হারাবা না ... "
গনি ভাই , আপনি রাঙ্গানগর ব্রিজে বুকে দুইটা গুলি নিয়ে বেঁচে গেছেন । আপনাকে আর কখনোই ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদতে হবে না ... আপনার বুকে আর কেউ কখনো রাইফেলের নল ঠেকিয়ে ভয়াবহ সব প্রশ্ন করবেনা .....
" তোমার সার্টিফিকেট কই ? "
" তুমি হিন্দু না মুসলমান ? "
" কই যুদ্ধ করছিলা তুমি ? "
" কোন ডকুমেন্টে তোমার নাম নেই কেন ? "
যে কোন রাইফেলের গুলির চেয়েও বেশি ভয়াবহ এসব প্রশ্ন । যে কোন ডাস্টবিনের নোংরার চেয়েও পুতিগন্ধময় এসব প্রশ্ন । গণিভাই , আপনি মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছেন ।
আস্তে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অসিত ।
রাস্তার একটা কুকুরকে তার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে অসিতের দিকে , তার মুখভরা লালা .... তীক্ষ্ণ শ্বদন্তে তীব্র বিষ ....
ভীষণ ভয় লাগে অসিতের ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

