
শায়লা এর সাথে আমার পরিচয় হয় বইমেলায়।
৩ বছর আগের কথা। বই মেলায় যাবো ঠিক করে বাসা থেকে বেরিয়েছি। বিকেলে বলা নাই কওয়া নাই তুমুল বৃষ্টি শুরু হল। ফাল্গুনের বৃষ্টি, আগে থেকে বোঝার কোন উপায় নেই।
একবার ভাবলাম ফিরে যাই। পরক্ষনেই মনে হল, ফেরত যেয়ে কি হবে ? বৃষ্টি কিছুক্ষনের মধ্যেই থেমে যাবে। মেলাতে আজ সেরকম একটা লোক ও হবেনা, শান্তি মতো বই দেখা যাবে।
বইমেলাতে যেয়ে দেখি অবস্থা আসলেই খারাপ। গর্তগুলোতে পানি জমে আছে, রাস্তাগুলো কাদায় মাখামাখি। পুরাই বেড়া ছেড়া অবস্থা। এর মাঝে সাবধানে হাঁটলেও টেনে আছাড় খাওয়ার সম্ভবনা একেবারে কম না। তারপরেও বেশ সতর্ক হয়েই হাঁটছিলাম। কিন্তু সবাই তো আমার মতো সতর্ক না।
ছপাৎ করে পিছে কিছু একটা পড়লো। প্যান্টের নিচের দিকটা ভেজা ভেজা ঠেকলাম। পিছে ফিরে দেখি প্যান্ট কাদায় মাখামাখি। আমার পিছনে যিনি ছিলেন তিনি গর্তে পা দিয়ে ফেলেছেন। কাদা ছিটকে তার মেরুন শাড়িও খয়েরী হয়ে গেছে, আমার প্যান্টটাও গেছে।
তরুণী অত্যন্ত বিব্রত গলায় আমাকে বলল– আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি। আমায় মাফ করবেন।
আমি কোন কথা না বলে মুখ ঘুরিয়ে হাটা শুরু করলাম।
কি ভাবছেন? আমি অভদ্র? হ্যা, অভদ্র তো বটেই। এভাবে কারো সরি এর প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে আসাটা অবশ্যই অভদ্রতা। আমি জানি মেয়েটি যথেষ্ট অবাক হয়েছে। কিন্তু অবাক এর চেয়েও বেশি যে জিনিসটা তাকে পোড়াবে, সেটা হল একজন মানুষের উপেক্ষা, তার নির্লিপ্ততা।
আমি কিন্তু তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যে এটা করিনি। তার দিকে তাকিয়েই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়েছিলো একটা। প্রকৃতির কিছু চাওয়া পাওয়া মাঝে মাঝে বোঝা যায়। আমি বুঝেছি প্রকৃতি কি চাইছে। আমি তাই নিশ্চিত হতে চেয়েছি। যদি সত্যি সত্যিই প্রকৃতি এটা চেয়ে থাকে, তবে সে আবার আমাদের দেখা করাবে।
আমাদের সত্যিই আবার দেখা হয়ে গেলো। এবার দেখা হল একটা আর্ট এক্সিবিশনে। শায়লা আমাকে দেখে চিনল। টুকটাক কথা বার্তা বললাম। দ্বিতীয়বার দেখা হওয়ার এক মাসের মাথায় আমাদের প্রেম হল। কিভাবে প্রেম হল সেটাও ইন্টারেস্টিং। তবে এখন বলতে ইচ্ছা করছে না।
শায়লার বাসায় আমার প্রায়শই যাওয়া হয়।
বাড়ির নাম আনন্দধারা। বিশাল বাড়ি, তবে বাড়িতে মানুষ খুব কম। শায়লার বাবা নরওয়ে থাকেন। মাসে একবার কিংবা দুবার দেশে আসেন। শায়লার মা এর সাথে শায়লার বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে ৭ বছর আগে। তারই বন্ধুর হাত ধরে শায়লার মা পাড়ি জমিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়। বাড়িতে তাই মানুষ বলতে শায়লা একাই থাকে। কাজের লোক, মালী ,দারোয়ান মিলিয়ে ৬-৭ জনের বেশি না।
শায়লার বাবা শায়লাকে বিদেশে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। শায়লা রাজি হয়নি। বিদেশ তার ভালো লাগেনা। এ দেশেই সে থাকতে চায় নিরিবিলি, নীরবে, নিভৃতে।
আমিও শায়লাকে চলে যেতে বলেছিলাম। শায়লা শুনে নি। গাঢ় স্বরে আমায় বলেছিল, “আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না”।
আমি শায়লার চোখের দিকে তাকিয়েই বুঝে গিয়েছিলাম এটি সত্যি নয়। আজ হোক, কাল হোক, শায়লাও একদিন মুক্তি খুঁজবে। শায়লা আর বাকি ১০ টা সাধারণ মেয়ের মতো না।
শায়লাদের বাড়িটা বেশ সাজানো গোছানো। হঠাৎ করে ড্রয়িং রুমে ঢুকলে চোখ ধাধিয়ে যায়। বিশাল হলঘরের মতো লম্বা ড্রয়িং রুমের দেয়ালে অজস্র পেইন্টিং, রুমের মাঝে বিশাল এর ঝাড়বাতি। হুলুস্থুল কারবার। শায়লার বাবা দেশে থাকতে এককালে বেশ আকিঝুকি করতেন, চিত্রশিল্পের প্রতি তার অনুরাগ তার মেয়ের মাঝেও প্রবাহিত হয়েছে। আমি শায়লাদের বাসায় গেলেই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখি। সবগুলো ছবিই আভিজাত্যে পরিপূর্ণ। বিশাল হলঘরে এতো ছবি থাকার অবশ্য একটা মজা আছে । নিজেকে কখনোই একা মনে হয়না।
তবে যে ছবিটার সামনে এসে আমি সবসময়ই থমকে দাড়াই সেটি একটি ঘুমন্ত সুন্দরীর ছবি। মুগ্ধ চোখে আমি শুধু তাকিয়ে দেখি। যতই দেখি ততোই ভালো লাগে।
কি নাম এই ছবিটার?
ফ্লেমিং জুন। ফ্রেদেরিক লেইতন এর আঁকা ছবি। এটা যদিও একটা রেপ্লিকা। সুন্দর না?
হু। পেলে কোথায়?
বাবা পাঠিয়েছে।
ছবিটার প্রতি তৈরি হওয়া আমার এই মুগ্ধতার অবশ্য আরও একটা কারন আছে। ছবির মেয়েটা দেখতে অবিকল শায়লার মতো। শায়লার ঠোট,নাক,চিবুক,সবকিছু। মাঝে মাঝে মনে হয় চিত্রকার শায়লাকে মডেল রেখেই ছবিটা একেছে। আনিস সাহেবও কি এটা বুঝেই ছবিটা তার মেয়ের কাছে পাঠিয়েছেন?
আমি যদিও এই মিলটির কথা শায়লাকে বলিনি। কিছু কিছু জিনিস মানুষকে বলার জন্য তৈরি হয়না, লুকিয়ে রাখার জন্যই তৈরি হয়। গুপ্ত রহস্যের মাঝেই লুকিয়ে থাকে কিছু সৌন্দর্য।
শায়লার দিকে তাকাই, সে আমার তাকানোর অর্থ বোঝেনা। তার কৌতূহলী চোখ সব সময়ই আমাকে নাড়া দিয়ে যায়।
"কি হল, অমন করে তাকিয়ে আছো কেন? চা খাবে? চা এনে দেই?"
আমার শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। শায়লা চা বানাতে উঠে যায়। মেয়েটাকে আমার বড় ভালো লাগে।
মানুষকে আকৃষ্ট করার সহজাত ক্ষমতা নিয়ে আমি পৃথিবীতে এসেছিলাম। আমার মা এটা জানতেন। জানতেন বলেই তিনি আমাকে কারো সাথে খুব একটা মিশতে দিতেন না। শায়লাও আমার আকর্ষণের বলয়ে আটকা পড়েছিলো। অবশ্য শায়লার নিজেরও আকর্ষণী ক্ষমতা প্রবল। আমি জানি আমি ভয়ংকর ভাবে শায়লার প্রেমে পড়েছি। দুজনকে মাঝে রেখে এক ধরনের ঘোরের একটা বলয় তৈরি হয়েছে। একজন ঘোর থেকে বের হয়ে আসবে, একজন ঘোরে হারিয়ে যাবে। এটা একটা খেলা। সমানে অসমানে কোন খেলা হয়না, খেলা হয় সমানে সমানে। প্রকৃতি হয়তো সে কারনেই একই রকম দুজনকে সামনা সামনি দাড় করিয়েছে।
তবে খেলায় আমি হেরে যাচ্ছি। আমি শায়লার চোখের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। শায়লা আমাকে ভালোবাসতো ,এখনো ভালবাসে ,কিন্তু সে ভালবাসায় অংশদারিত্ব আছে। শায়লার জীবনে আমি বাদেও অন্য কোন পুরুষ এসেছে। যে এসেছে ,সে সম্প্রতিই এসেছে। আসাটাই স্বাভাবিক। যার সম্মোহনী ক্ষমতা এতো বেশি, তার দিকে আর কোন পুরুষ আকৃষ্ট হবেনা, এটা ভাবার কোন কারন নেই। তাই ড্রয়িং রুমের অ্যাশ ট্রেতে ছাই আর সোফার কোনায় উল্টানো প্লে বয় ম্যাগাজিন দেখে খুব একটা অবাক হইনি।
আজ শায়লার জন্মদিন। পুরো সন্ধ্যাটা আমি শায়লার সাথে কাটাবো। ভাবতেই আনন্দ লাগছে। যতক্ষণ আমি শায়লার সাথে থাকি, নিজেকে অসম্ভব সুখী মনে হয়। আলমারি খুলে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকে সযত্নে তুলে নিলাম। এটার জন্যেও আমার বড়ই মায়া। তবু শায়লার জন্মদিন বলে কথা। শায়লা আমার সব।
গুনে গুনে ২৬ টা সতেজ কালো গোলাপের অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম আগেই। যাবার পথে ছোট একটা কেক নিয়ে গেলেও খারাপ হয়না। নিবোই যখন একটা রেড ওয়াইন ও নিয়ে যাই।
কলিং বেলের মিষ্টি শব্দের সাথে সাথেই দরজা খুলে দিলো শায়লা। আমার দেওয়া কমলা রঙের রোবটা পরেছে আজ ও। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। গানের মিষ্টি সুর পুরো বাড়িটাকেই ভরিয়ে রেখেছে।আমি ফুলগুলো এগিয়ে দিলাম।
বার্থ ডে উইশ করতে ইচ্ছা করছে না এখন। শুধু শায়লার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম।
“আর কাউকে বলনি জন্মদিনের কথা?”
“আর কাকে বলবো? বাবা ফোন করেছিলো একটু আগে। অনেকক্ষণ কথা হল। এই শোন, খুব টায়ার্ড লাগছে আজ আমার। তুমি খেয়ে যাবে তো আজ, নাকি?”
হ্যা, তা যাওয়া যায়।
"শোন , তোমার সাথে কিছু জরুরী কথা আছে। বাবা আজ বলল ,সামনের মাসে আসবে, আমাকে এক মাসের জন্য নিয়ে যাবে। "
হুম।
"তুমি কি হুম হুম ছাড়া আর কিছু শিখনি? বিরক্ত লাগছে!" রাগ হয়ে শায়লা উঠে গেলো।
আমি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম। আকাশে শুক্লপক্ষের চাঁদ উঠেছে। চাদের নরম আলো স্ট্রিটের উপরে এক অদ্ভুত আলো ছায়ার খেলা সৃষ্টি করেছে। শায়লাকে নিয়ে স্ট্রীটে স্ট্রীটে হেঁটে বেড়ালে কেমন হয়?
নাহ, তার চেয়ে বরং আমি একাই কল্পনাতে বিচরণ করি। আজ আমি আকণ্ঠ মদ গিলবো । মদ খেয়ে চুড় হয়ে যাবো আমি আজ।
এ ঘর থেকে ও ঘর গান বেজেই চলেছে-
Baby this a new age,
You like my new craze
Let's get together
Maybe we can start a new phase
শায়লা হাতে ওয়াইন এর পেয়ালাটা নিয়ে আমার পাশে বসলো। নরম গলায় বলল, “একটা গল্প বল। তোমার মুখ থেকে কতদিন গল্প শুনি না”।
আমি নরম গলায় বললাম ," কোন গল্প শুনবে তুমি ,শায়লা? সাত রাজার এক মনি এর গল্প বলবো? সোনার আপেল এর গল্প? যক্ষের ধনের গল্প শুনবে?"
শায়লা ঘুমিয়ে যাচ্ছে। আহ, শান্তির ঘুম। এই ঘুম তো আর ভাঙবে না। ভাঙবে কি করে? আমি তো বহু আগেই শায়লায় গ্লাসে পটাশিয়াম সায়ানাইড মিশিয়ে দিয়েছি। এতক্ষনে তা নিশ্চয়ই সায়ানেট হয়ে গেছে। শায়লার ঘুম না ভাঙানোর জন্য তা যথেষ্ট।
আমি মুগ্ধ চোখে শায়লার দিকে তাকিয়ে থাকি। শায়লা চলে গেছে মৃত্যু আর নিদ্রার মাঝামাঝি কোন জগতে। এই অবস্থা থেকে তাকে কেউ আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না। ঠিক যেন ফ্লেমিং জুন। লেইতন এসে দেখে যাক, আমি কি ছবি একেছি! আসুক, এসে দেখে যাক আমার সৃষ্টিশীলতা!
শায়লার ঘুমন্ত মুখটা দেখতে বড় মায়া লাগছে। মেয়েটাকে আমি বড় ভালোবাসি। ভালোবাসি বলেই তো এতো বড় শিল্পকর্মের সৃষ্টি হল আমার হাতে। কোথায় যেন আনন্দের এক তীব্র সুর তৈরি হচ্ছে। আহ, ধ্বংসের মাঝেই তো সৃষ্টির প্রকৃত আনন্দ।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুন, ২০১১ দুপুর ১:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


