টানা জিজ্ঞাসাবাদে তারেক রহমান ও গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের বিদেশে অর্থ পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। একই সঙ্গে বিদেশে ফুর্তি করারও নানা কাহিনী ফাঁস করেছেন। এসব তথ্যের সপক্ষে ঘন ঘন বিদেশ যাওয়ার ট্রাভেল চেক, ভিসা, কিছু ছবি, ভিডিও এবং আš-র্জাতিক ক্রেডিট কার্ডও তিনি দেখিয়েছেন। এছাড়া বিএনপি হাইকমান্ডের নির্দেশে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার তদš- তিনি ঘুরিয়ে দেন বলে বাবর স্বীকার করে বলেন, বিএনপি হাইকমান্ডের পরামর্শে শীর্ষ সন্ত্রাসী আরমানকে দিয়ে আওয়ামী লীগের কাউকে কাউকে জড়িয়ে একটি নাটক সাজানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এজন্য আরমান গ্রেফতারের পর র্যাব হেফাজতে থাকা অবস্থায় তার সঙ্গে দেখাও করেছিলেন বাবর। কিš' শেষ পর্যš- তা সফল হয়নি। জোট সরকারের পাঁচ বছরে প্রবল ক্ষমতাধর এই প্রতিমন্ত্রী গত কয়েকদিনের টানা জিজ্ঞাসাবাদে মুষড়ে পড়েছেন। টিএফআই সেলে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা তাকে একেক সময় একেক স্থানে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েকদিনের জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর হাওয়া ভবনের দুর্নীতি, তারেক-মামুনের কুকীর্তি, পুলিশে দলীয়করণ, টাকার বিনিময়ে চাঞ্চল্যকর মামলা প্রভাবিত করাসহ পুলিশ বিভাগে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পোশাক ক্রয়ে নানা দুর্নীতি সম্পর্কে অজানা সব তথ্য দিয়েছেন। সূত্রগুলো বলেছে, শুধু গ্রেনেড হামলার মামলা নয়, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে বাবর অš-ত অর্ধশত চাঞ্চল্যকর মামলা মনিটরিংয়ের নামে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। তার নির্দেশে চাঞ্চল্যকর এসব মামলার প্রকৃত আসামিদের আড়াল করে পুলিশ চার্জশিট অথবা ফাইনাল রিপোর্ট দিতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক অর্থমন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা এসএএমএস কিবরিয়া, সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার, জুরাইনের শিল্পপতি আলম, বসুন্ধরা গ্র“পের পরিচালক সাব্বির, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী জামালউদ্দিন, সিদ্ধেশ্বরীতে প্রধান শিক্ষিকা সাবেরা, যুবদল নেতা সাগির, মিরপুরে ব্যবসায়ী আফতাবউদ্দিন, কয়েকজন ওয়ার্ড কমিশনারের খুনের মামলা ছাড়াও বিডি ফুডসের ৭৫ কেজি হেরোইন পাচার ও চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের মামলা অন্যতম।
টাস্কফোর্স ইন্টেলিজেন্স (টিএফআই) সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে বাবর বলেছেন, তার উদ্যোগেই চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো মনিটরিংয়ের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি স্বতন্ত্র সেল খোলা হয়। দেশের কোথাও চাঞ্চল্যকর কোন ঘটনা ঘটলে সে মামলা মনিটরিংয়ের জন্য ওই সেলে আনা হতো। সেলের কার্যক্রম সরাসরি মনিটরিং করতেন বাবর। এছাড়া পুলিশের বর্তমান ও সাবেক ১২ কর্মকর্তাকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি। পদোন্নতি, নিয়োগ, বদলি, পুলিশের বিভিন্ন ক্রয় ছাড়াও মনিটরিং সেলে মামলা তদারকির মাধ্যমে ১২ সদস্যের ওই সিন্ডিকেট স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে কোটি কোটি টাকা এনে দিত। ওই টাকার একটি অংশ চলে যেত হাওয়া ভবনে তারেক রহমান ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের কাছে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছের লোক হিসেবে পরিচিত পুলিশের ওই ১২ কর্মকর্তাও গত ৫ বছরে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। তাদের পরামর্শে পুলিশের অর্গানোগ্রাম পরির্বতন করে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর দুই শতাধিক নতুন পদ সৃষ্টি করে তার পছন্দের কিছু কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেন। ওই কর্মকর্তাদের বেশ কয়েকজন এখনও পুলিশ বাহিনীতে বহাল তবিয়তেই আছেন। টিএফআই কর্মকর্তারা ওই কর্মকর্তাদের তালিকা করে তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন।
সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর আরও বলেছেন, বিএনপি হাইকমান্ডের নির্দেশে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তিনি র্যাব হেফাজতে শীর্ষ সন্ত্রাসী আরমানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনায় আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে তাকে দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়েরও চেষ্টা করেছিলেন তিনি। বিনিময়ে তাকে দেয়া হয়েছিল স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রলোভন। সেভাবেই সবকিছু চলছিল। আরমানের কথামতো ওই মামলায় জজ মিয়া নামে একজনকে গ্রেফতার করে তার কাছ থেকে স্বীকারোক্তিও আদায় করে পুলিশ। কিš' ওই স্বীকারোক্তি নিয়ে দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় প্রশ্ন তোলা হলে শেষ পর্যš- সে চেষ্টা সফল হয়নি। বাবর জানান, তিনি মগবাজারে বড় হয়েছেন। ওই সময়ে মগবাজারকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী আরমানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। ওই সম্পর্কের সূত্র ধরে তিনি আরমানকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। ২০০৫ সালের ৩ জুন ধানমণ্ডি থেকে গ্রেফতার হয় সরকার কর্তৃক পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী আরমান।
গত ২৮ মে যৌথ বাহিনী গুলশান ২ নম্বরের ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কের পেছনে ১০৭ নম্বর রোডের সিলভার ম্যাটনে কনকর্ড অ্যাপার্টমেন্টের ৬ তলায় অভিযান চালিয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে গ্রেফতার করে। এ সময় তার বাসা থেকে ৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, একটি শক্তিশালী ওয়াকিটকি, একটি লেক্সাস পাজেরো গাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। এছাড়া তার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ৬০০ শার্ট, কিছু পারফিউমের বোতল এবং জেল। এসব শার্টের প্রতিটির সর্বনিæ মূল্য আড়াই হাজার এবং সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী উদ্ধারকৃত ৪টি অস্ত্রের মধ্যে একটির কোন কাগজ দেখাতে না পারায় ২৯ মে গুলশান থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। ওই মামলায় ২৯ মে তাকে প্রথম দফায় ৪ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। ৩ জুন দ্বিতীয় দফায় অস্ত্র মামলায় গুলশান থানা পুলিশ লুৎফুজ্জামান বাবরকে আবারও ৪ দিনের রিমান্ডে নেয়। সর্বশেষ ৮ জুন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও ৩ দিনের রিমান্ডে নেয় গুলশান থানা পুলিশ। তবে গুলশান থানা পুলিশ রিমান্ডে নিলেও তাকে মূলত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে টিএফআই সেলে।
।। যুগান্ত-র : ১০.০৬.০৭ ।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

