somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দুর্নীতির বিস্ময় বিচারপতি ফজলুল

১২ ই জুন, ২০০৭ ভোর ৪:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাত্র দুই মাস ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বিচারপতি ফজলুল হক দুর্নীতির যে নজির স্থাপন করে গেছেন তা নিয়ে রীতিমতো বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। বিচারাঙ্গনের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফজলুল হক তার বিচারক জীবনেও বিভিন্ন সময়ে অসততার আশ্রয় নিয়েছেন। জীবন সায়াহ্নে রাষ্ট্রের একটি গুর"ত্বপূর্ণ পদে মাত্র তিন মাসের জন্যে ‘ট্রাস্টি’র দায়িত্ব পেয়েও লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠতে না পারায় তার নৈতিকতাবোধের স্তর ভেবে হতবাক হচ্ছেন তারই ঘনিষ্ঠ জনরা।
বিচারপতি ফজলুল হক উপদেষ্টা হিসেবে ৩১ অক্টোবর শপথ গ্রহণ করার পরদিনই তৎকালীন ১৪ দল সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে বিতর্কের সৃষ্টি করেন। উপদেষ্টা পরিষদকে কড়া নজরে রাখবে ১৪ দলের এমন ঘোষণায় উপদেষ্টা ফজলুল হক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছিলেন, আমরা কি জীবজš' না অন্য দেশের লোক যে আমাদের নজরে রাখা হবে? তিনি উল্টো ১৪ দলকে নজরে রাখার জন্য সাংবাদিকদের পরামর্শ দেন। বিচারপতি ফজলুল হকের এই মন্তব্যে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তার বির"দ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন ও নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগ আনে আওয়ামী লীগসহ আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলো। ২ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের এক সভায় ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, ড. এম জহির, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদসহ সিনিয়র আইনজীবীরা রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি সম্পর্কে উপদেষ্টা ফজলুল হকের বিরূপ মন্তব্যের নিন্দা জানান। তারা উপদেষ্টা পরিষদ থেকে তার পদত্যাগও দাবি করেন। মূলত বিতর্কের মধ্য দিয়েই শুর" হয় উপদেষ্টা ফজলুল হকের যাত্রা।
উপদেষ্টা বিচারপতি ফজলুল হককে দায়িত্ব দেওয়া হয় ৩টি মন্ত্রণালয়ের। এগুলো হলো আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের। ৩ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে তিনি হাতে আসমান পেয়ে যান। ২ নভেম্বর তিনি সচিবালয়ে প্রথম অফিস করেন। কিš' প্রথম দিনেই তিনি স্বজনপ্রীতির নজির স্থাপন করেন। সব নিয়মকানুনের উপক্ষো করে উপদেষ্টা ফজলুল হক তার ছেলে ডা. রাজ ও ছেলের বন্ধুকে নিয়ে সারাক্ষণ অফিস করা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানাবিধ প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। সূত্র মতে, সরকারি টাকায় প্রথম দিনেই তিনি দামি হোটেল থেকে দুপুরের খাবার কিনে আনেন। সচিবালয়ে গিয়ে তিনি প্রথমেই পরিবর্তন করেন তার জনসংযোগ কর্মকর্তাকে (পিআরও)। পিআরও হিসেবে নিয়ে আসেন তার পছন্দের একজনকে। এরপর থেকেই শুর" হয় তার ছেলের নেতৃত্বে তদবির বাণিজ্য। দায়িত্ব গ্রহণ করেই উপদেষ্টা ফজলুল হক টাকা কামাইয়ের পথ খুঁজতে থাকেন। প্রথমেই হাত দেন সাব রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্যে। ঢাকা মহানগরী ,সাভার ও আশপাশের গুর"ত্বপূর্ন সাব রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে হাত দেন তিনি। ছেলের মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রার বদলি করে তিনি কোটি টাকার ওপর কামাই করে ফেলেন । এর মধ্যে গুলশান থানার সাব রেজিস্ট্রার বদলি নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। শুধু গুলশানের সাব রেজিস্ট্রার বদলির জন্যই ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয় বলে উপদেষ্টা ফজলুল হকের বির"দ্ধে অভিযোগ ওঠে। আইন মন্ত্রণালয়ে তখন মুখরোচক আলোচনা ছিল জোট সরকারের আমলে ৫ বছর আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ সাব রেজিস্ট্রার নিয়োগ-বদলিতে যে দুর্নীতির রেকর্ড করেছিলেন, সেই রেকর্ড ১৫ দিনেই ভেঙে দেন উপদেষ্টা ফজলুল হক।
সূত্র মতে, ৩টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে বিচারপতি ফজলুল হক মোটামুটি সব ক্ষেত্রেই তার দুর্নীতির নজির রেখে আসেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীন বন অধিদপ্তরেও তিনি অভিযান চালান। বর্তমানে যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারকৃত প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনি তার ভাগের টাকা পরিশোধ করেন উপদেষ্টার ছেলে ডা. রাজের মাধ্যমে। তবে সবচেয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয় চট্টগ্রাম উত্তর বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শামসুল আজমের বদলি কেলেঙ্কারীতে। শামসুল আজমের বির"দ্ধে একটি প্রকল্পের ১ কোটি ৮ লাখ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে ঠিকাদারকে পরিশোধ এবং আত্মসাৎ করায় ২০০৬ সালের ১৭ জুলাই তৎকালীন বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সভায় শামসুল আজমকে চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং তার বির"দ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনি, প্রকল্প পরিচালক ইকলিল মন্ডল এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক সালাউদ্দিন আহমেদের বির"দ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। কিš' প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনির নেতৃত্বে দুর্নীতিবাজ চক্রটি হাওয়া ভবনকে ম্যানেজ করে শাস্তি এড়াতে সক্ষম হয়। জোট সরকারের আমলে তাদের গায়ে কোনো আঁচড় পড়েনি। বহাল তবিয়তেই থাকে ওসমান গনি ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে শামসুল আজমকে ১১/১০/০৬ তারিখে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বন অধিদপ্তরে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ উইং-এ উপবন সংরক্ষক হিসেবে বদলি করা হয়। (মন্ত্রণালয়ের যার স্মারক নং পবম/শা-২(গো:)০৭/০৬/১০১০(১১)।) তার এই বদলির আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য ১৯ অক্টোবর মন্ত্রণালয় থেকে আরেকটি অফিস আদেশ জারি করে ১৯ অক্টোবর অপরাহ্ণের মধ্যে তাকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিভাগের বন কর্মকর্তা বদর"ল আনম ভুঁইয়ার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিš' শামসুল আজম মন্ত্রনালয়ের এই নির্দেশ স্থগিত রাখার জন্য নানামুখি প্রক্রিয়া চালান। এর মধ্যে সরকার বদল হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বিচারপতি ফজলুল হক এলে দুর্নীতিবাজরা তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। তার ছেলে ডা. রাজ ও তার কয়েক বন্ধু সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ডা. রাজের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকায় বদলি ঠেকাতে সক্ষম হন শামসুল আজম। ফলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব শাহনাজ রব ১১ অক্টোবর এবং ১৯ অক্টোবর যে দুটি আদেশ দিয়ে শামসুল আজমকে বদলি করেছিলেন সেই সিনিয়র সহকারী সচিব শাহনাজ রবই ২৯ নভেম্বর আরেক আদেশ দ্বারা ৩০ এপ্রিল ২০০৭ পর্যন্ত তার বদলির আদেশ স্থগিত রাখেন। (যার স্মারক নং-পবম/শা-২(গ:)০৭/০৬/১১১৬।)
শামসুল আজম তার এই বদলির আদেশ স্থগিত রাখার জন্য উপদেষ্টা ফজলুল হককে নগদ ৩০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন বলে সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃত প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনি যৌথবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মতো উপদেষ্টা ফজলুল হক ভূমি মন্ত্রণালয়কেও দুর্নীতির হাত থেকে রেহাই দেননি। বসুন্ধরা গ্র"পকে ৮৪ একর খাস জমি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য তিনি ৪৫ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন এটাও বলেছেন ওসমান গনি। তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের সরকারি খাস জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে দুর্নীতির পাশাপাশি উপদেষ্টা ফজলুল হক সহকারী কমিশনার(ভূমি) নিয়োগের ক্ষেত্রেও উৎকোচ গ্রহণ শুর" করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছেন তার দুই মাস শাসনামলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিয়োগে উপদেষ্টাকে ঘুষ প্রদান ওপেন সিক্রেট হয়ে পড়েছিল।
বিচারপতি ফজলুল হক তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের চেয়ে নিজের আখের গোছানোতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মাত্র দুই মাস দায়িত্ব পালন করে তিনি কামাই করে নেন কয়েক কোটি টাকা।
তার পদত্যাগের পর এসব অপকর্মের সংবাদ সংবাদ মাধ্যমে বের হয়ে আসে। দুর্নীতি দমন কমিশন উদ্যোগও নিয়েছিল উপদেষ্টা ফজলুল হকের বির"দ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের। কিš' রহস্যজনক কারণে সেই তদন্ত আর এগোয়নি। সম্প্রতি প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনি ধরা পড়ার পর উপদেষ্টা ফজলুল হকের দুর্নীতির বিষয়টি আবার আলোচনায় আসছে। যৌথবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে ওসমান গনি সাবেক উপদেষ্টা ফজলুল হকের বেশ কিছু দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।

:: কাগজ : ১২.০৬.০৭ ::
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×