বিচারপতি ফজলুল হক উপদেষ্টা হিসেবে ৩১ অক্টোবর শপথ গ্রহণ করার পরদিনই তৎকালীন ১৪ দল সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করে বিতর্কের সৃষ্টি করেন। উপদেষ্টা পরিষদকে কড়া নজরে রাখবে ১৪ দলের এমন ঘোষণায় উপদেষ্টা ফজলুল হক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছিলেন, আমরা কি জীবজš' না অন্য দেশের লোক যে আমাদের নজরে রাখা হবে? তিনি উল্টো ১৪ দলকে নজরে রাখার জন্য সাংবাদিকদের পরামর্শ দেন। বিচারপতি ফজলুল হকের এই মন্তব্যে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তার বির"দ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন ও নিরপেক্ষতা ভঙ্গের অভিযোগ আনে আওয়ামী লীগসহ আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলো। ২ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের এক সভায় ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, ড. এম জহির, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদসহ সিনিয়র আইনজীবীরা রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি সম্পর্কে উপদেষ্টা ফজলুল হকের বিরূপ মন্তব্যের নিন্দা জানান। তারা উপদেষ্টা পরিষদ থেকে তার পদত্যাগও দাবি করেন। মূলত বিতর্কের মধ্য দিয়েই শুর" হয় উপদেষ্টা ফজলুল হকের যাত্রা।
উপদেষ্টা বিচারপতি ফজলুল হককে দায়িত্ব দেওয়া হয় ৩টি মন্ত্রণালয়ের। এগুলো হলো আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের। ৩ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে তিনি হাতে আসমান পেয়ে যান। ২ নভেম্বর তিনি সচিবালয়ে প্রথম অফিস করেন। কিš' প্রথম দিনেই তিনি স্বজনপ্রীতির নজির স্থাপন করেন। সব নিয়মকানুনের উপক্ষো করে উপদেষ্টা ফজলুল হক তার ছেলে ডা. রাজ ও ছেলের বন্ধুকে নিয়ে সারাক্ষণ অফিস করা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানাবিধ প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। সূত্র মতে, সরকারি টাকায় প্রথম দিনেই তিনি দামি হোটেল থেকে দুপুরের খাবার কিনে আনেন। সচিবালয়ে গিয়ে তিনি প্রথমেই পরিবর্তন করেন তার জনসংযোগ কর্মকর্তাকে (পিআরও)। পিআরও হিসেবে নিয়ে আসেন তার পছন্দের একজনকে। এরপর থেকেই শুর" হয় তার ছেলের নেতৃত্বে তদবির বাণিজ্য। দায়িত্ব গ্রহণ করেই উপদেষ্টা ফজলুল হক টাকা কামাইয়ের পথ খুঁজতে থাকেন। প্রথমেই হাত দেন সাব রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্যে। ঢাকা মহানগরী ,সাভার ও আশপাশের গুর"ত্বপূর্ন সাব রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে হাত দেন তিনি। ছেলের মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার ও রেজিস্ট্রার বদলি করে তিনি কোটি টাকার ওপর কামাই করে ফেলেন । এর মধ্যে গুলশান থানার সাব রেজিস্ট্রার বদলি নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। শুধু গুলশানের সাব রেজিস্ট্রার বদলির জন্যই ২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয় বলে উপদেষ্টা ফজলুল হকের বির"দ্ধে অভিযোগ ওঠে। আইন মন্ত্রণালয়ে তখন মুখরোচক আলোচনা ছিল জোট সরকারের আমলে ৫ বছর আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ সাব রেজিস্ট্রার নিয়োগ-বদলিতে যে দুর্নীতির রেকর্ড করেছিলেন, সেই রেকর্ড ১৫ দিনেই ভেঙে দেন উপদেষ্টা ফজলুল হক।
সূত্র মতে, ৩টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে বিচারপতি ফজলুল হক মোটামুটি সব ক্ষেত্রেই তার দুর্নীতির নজির রেখে আসেন। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীন বন অধিদপ্তরেও তিনি অভিযান চালান। বর্তমানে যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারকৃত প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনি তার ভাগের টাকা পরিশোধ করেন উপদেষ্টার ছেলে ডা. রাজের মাধ্যমে। তবে সবচেয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয় চট্টগ্রাম উত্তর বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শামসুল আজমের বদলি কেলেঙ্কারীতে। শামসুল আজমের বির"দ্ধে একটি প্রকল্পের ১ কোটি ৮ লাখ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে ঠিকাদারকে পরিশোধ এবং আত্মসাৎ করায় ২০০৬ সালের ১৭ জুলাই তৎকালীন বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সভায় শামসুল আজমকে চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং তার বির"দ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনি, প্রকল্প পরিচালক ইকলিল মন্ডল এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক সালাউদ্দিন আহমেদের বির"দ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। কিš' প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনির নেতৃত্বে দুর্নীতিবাজ চক্রটি হাওয়া ভবনকে ম্যানেজ করে শাস্তি এড়াতে সক্ষম হয়। জোট সরকারের আমলে তাদের গায়ে কোনো আঁচড় পড়েনি। বহাল তবিয়তেই থাকে ওসমান গনি ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে শামসুল আজমকে ১১/১০/০৬ তারিখে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বন অধিদপ্তরে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ উইং-এ উপবন সংরক্ষক হিসেবে বদলি করা হয়। (মন্ত্রণালয়ের যার স্মারক নং পবম/শা-২(গো
শামসুল আজম তার এই বদলির আদেশ স্থগিত রাখার জন্য উপদেষ্টা ফজলুল হককে নগদ ৩০ লাখ টাকা দিয়েছিলেন বলে সম্প্রতি গ্রেপ্তারকৃত প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনি যৌথবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মতো উপদেষ্টা ফজলুল হক ভূমি মন্ত্রণালয়কেও দুর্নীতির হাত থেকে রেহাই দেননি। বসুন্ধরা গ্র"পকে ৮৪ একর খাস জমি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য তিনি ৪৫ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন এটাও বলেছেন ওসমান গনি। তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের সরকারি খাস জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে দুর্নীতির পাশাপাশি উপদেষ্টা ফজলুল হক সহকারী কমিশনার(ভূমি) নিয়োগের ক্ষেত্রেও উৎকোচ গ্রহণ শুর" করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছেন তার দুই মাস শাসনামলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিয়োগে উপদেষ্টাকে ঘুষ প্রদান ওপেন সিক্রেট হয়ে পড়েছিল।
বিচারপতি ফজলুল হক তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের চেয়ে নিজের আখের গোছানোতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মাত্র দুই মাস দায়িত্ব পালন করে তিনি কামাই করে নেন কয়েক কোটি টাকা।
তার পদত্যাগের পর এসব অপকর্মের সংবাদ সংবাদ মাধ্যমে বের হয়ে আসে। দুর্নীতি দমন কমিশন উদ্যোগও নিয়েছিল উপদেষ্টা ফজলুল হকের বির"দ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের। কিš' রহস্যজনক কারণে সেই তদন্ত আর এগোয়নি। সম্প্রতি প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনি ধরা পড়ার পর উপদেষ্টা ফজলুল হকের দুর্নীতির বিষয়টি আবার আলোচনায় আসছে। যৌথবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে ওসমান গনি সাবেক উপদেষ্টা ফজলুল হকের বেশ কিছু দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
:: কাগজ : ১২.০৬.০৭ ::

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



