somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্রਜ਼পুত্রের বালুতে মূল্যবান খনিজ

১৫ ই জুন, ২০০৭ ভোর ৫:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চিলমারী বন্দরের রমনাঘাট থেকে নতুন ব্রਜ਼পুত্র নদের ওপর দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ঠিক সোয়া দুই ঘণ্টা চলার পর আমরা যখন ‘অষ্টমীর চর’-এ পৌঁছাই, তখন সেখানকার বালুকাবেলার ৭৭ ফুট গভীর থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে। সাধারণ নলকুপ বসানোর প্রযুক্তিতেই পাইপ বসিয়ে এক ফুট অন্তর প্রতিটি স্তর থেকে বালুর নমুনা তুলে আনা হচ্ছে। সেই বালু পরীক্ষা করে সেখানে কর্মরত ভুতত্ত্ববিদদের চোখেমুখে ফুটে ওঠা উজ্জ্বল আভা দেখেই ধারণা করা যাচ্ছিল যে, হিমালয়বিধৌত ব্রਜ਼পুত্রের পানিবাহিত এই বালু শুধু বালু নয়, এতে বিশেষ কিছু আছে।
বিস্তীর্ণ এই চরাঞ্চলের তিন হাজার ৯৮৭ হেক্টর জায়গা সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে বালুতে ভারী খনিজের সন্ধান চালাচ্ছে ‘কার্বন মাইনিং পিএলসি’ নামের একটি ব্রিটিশ কোম্পানি। এখানে বিশেষজ্ঞ ভুতত্ত্ববিদ হিসেবে কর্মরত বাংলাদেশ ভুতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) সাবেক মহাপরিচালক মো. খুরশিদ আলমের কথায় আমরা নিশ্চিত হই, সত্যিই এ বালুতে অনেক কিছু আছে।
জনাব আলম বলেন, এই বালুতে এখন পর্যন্ত সাতটি মূল্যবান খনিজের উপস্থিতি সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন। তাঁদের ধারণা, এতে সর্বমোট ১৬টি পর্যন্ত খনিজ পাওয়া যেতে পারে। এসব খনিজ সাধারণ রং তৈরি থেকে শুরু করে উন্নত রকেট প্রযুক্তিতে পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। এ দেশে এসব খনিজ ব্যবহারের বিশেষ সুযোগ নেই। তবে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে প্রচুর। কিন্তু এই খনিজগুলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্তোলন করার মতো পরিমাণে পাওয়া যাবে কি না, সে সম্পর্কে তাঁরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নন।
চরাঞ্চলের লিজ নেওয়া জায়গায় কার্বন মাইনিং এখন পর্যন্ত ২৫টি কুপ খনন করেছে। এসব কুপ থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করানো হয়েছে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের কক্সবাজারে স্থাপিত বিশেষ পরীক্ষাগারে। পরীক্ষায় যেসব খনিজ পাওয়া গেছে তার মধ্যে আছে গারনেট। সারা পৃথিবীতে বর্তমানে গারনেটের প্রমাণিত মজুদ ছয় কোটি ৭০ লাখ মেট্রিক টন। আর ব্রਜ਼পুত্র ও তিস্তা নদীর ৪০ হাজার হেক্টর বালুচরে যে হারে এই খনিজ পাওয়া গেছে তাতে একমাত্র এখানেই ছয় কোটি ৮৯ লাখ টন মজুদ আছে বলে কার্বন মাইনিংয়ের বিশেষজ্ঞদের ধারণা। চামড়াশিল্প, জাহাজ ভাঙা, অ্যালুমিনিয়াম, পানি পরিশোধন (ফিল্টারিং) প্রভৃতি ক্ষেত্রে গারনেট ব্যবহৃত হয়।
ব্রਜ਼পুত্রের বালুতে পাওয়া আরেকটি খনিজ হচ্ছে ইলমেনাইট। পৃথিবীতে এই খনিজের প্রমাণিত মজুদ ৬০ কোটি টন। আর ব্রਜ਼পুত্র-তিস্তার বালুতে দুই কোটি ৩২ লাখ টনেরও বেশি রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। উড়োজাহাজ, কম্বাশন ইঞ্জিন ও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যের রং (টিটেনিয়াম পেইন্ট) তৈরির কাজে এই খনিজ ব্যবহৃত হয়। জাপান প্রতিবছর ছয় লাখ টন টিটেনিয়াম আমদানি করে। বাংলাদেশও আমদানি করে বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকার টিটেনিয়াম।
কেয়ানাইট হচ্ছে ব্রਜ਼পুত্রের বালুতে পাওয়া আরেকটি খনিজ। ইস্পাতশিল্পে বিশেষ করে ইস্পাতকে স্টেইনলেস করার কাজে এই খনিজ ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীতে এই খনিজের বর্তমান প্রমাণিত মজুদ প্রায় ৫০ কোটি টন। ব্রਜ਼পুত্র-তিস্তার বালুচরে রয়েছে প্রায় ৭৭ লাখ টন।
ম্যাগনেটাইট হচ্ছে আরেকটি খনিজ ব্রਜ਼পুত্র-তিস্তার বালুতে যার মজুদ সাড়ে সাত কোটি টনেরও বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। লোহাশিল্পের জন্য অপরিহার্য এই খনিজ অবশ্য পৃথিবীতে প্রচুর রয়েছে যার মোট প্রমাণিত মজুদ ৮০ হাজার কোটি টনের মতো।
ব্রਜ਼পুত্র-তিস্তার বিস্তীর্ণ বালুচরজুড়ে রুটাইল নামের খনিজটির মজুদ রয়েছে দেড় কোটি টনেরও বেশি। পৃথিবীতে এই খনিজের প্রমাণিত মজুদ প্রায় ২০০ কোটি টন। রুটাইল একটি বিস্নয়কর খনিজ, রং, প্লাস্টিক, কসমেটিকস, ছাপাখানার কালি, বস্ত্র ও চামড়াশিল্পসহ বহু ক্ষেত্রে যার ব্যবহার।
জিরকন হচ্ছে আরেকটি খনিজ ব্রਜ਼পুত্র-তিস্তার বালুরাশিতে যার পরিমাণ প্রায় পাঁচ লাখ টন। ইস্পাতশিল্প, বুলেটপ্রুফ কাচ তৈরি, নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকটর, নিউক্লিয়ার সাবমেরিন, গাইডেড মিসাইল প্রভৃতি তৈরিতে এই খনিজ অপরিহার্য। পৃথিবীতে এই খনিজের বর্তমান প্রমাণিত মজুদ প্রায় সাড়ে চার কোটি টন।
ভুতত্ত্ববিদ খুরশিদ আলম জানান, প্রতিটন জিরকনের দাম প্রায় ৮০০ মার্কিন ডলার। কিন্তু জিরকনের মধ্যে হাফনিয়াম নামে যে পদার্থটি রয়েছে সেটি আলাদা করতে পারলে তার প্রতি কেজির দাম ৩০০ ডলার। এ ছাড়া জিরকন জারিত করে পাওয়া যায় জিরকনিয়াম। প্রতিটন জিরকনিয়ামের দাম ২২ হাজার ডলার।
এই খনিজ অনুসন্ধান সম্পর্কে জানতে চাইলে কার্বন মাইনিং পিএলসির চেয়ারম্যান ওয়াহিদ সালাম বলেন, ব্রਜ਼পুত্র-তিস্তার বালুতে কোন কোন ধরনের খনিজ কী পরিমাণে আছে, সেগুলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উত্তোলনযোগ্য কি না, এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা লাভের জন্য তাঁরা অষ্টমীর চর থেকে সংগৃহীত বালুর নমুনা এ মাসেই অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাচ্ছেন পরীক্ষার জন্য। সেখানকার প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাঁরা এই খনিতে বিনিয়োগ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে তাঁদের কার্যক্রমের এ প্রক্রিয়া শেষ হবে।
ব্রਜ਼পুত্র-তিস্তার বালুতে মূল্যবান ভারী খনিজের উপস্থিতি সম্পর্কে খুরশিদ আলম জরিপ চালান ১৯৭৯ সালে। এর ১০ বছর পর, ১৯৮৯ সালে এ বিষয়ে পরবর্তী গবেষণা জরিপ চালান জিএসবির বর্তমান মহাপরিচালক মনিরা আখতার চৌধুরী। এসব গবেষণা জরিপের ফলাফলে যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক তথ্য পাওয়া যায়। চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি কার্বন মাইনিং পিএলসি এসব খনিজ অনুসন্ধানের জন্য সরকারের লাইসেন্স পাওয়ার পর কাজ শুরু করে। বর্তমানে এখানে খুরশিদ আলমের সঙ্গে ভুতত্ত্ববিদ হিসেবে কাজ করছেন আমিনুর রহমান।

।। প্রথম আলো : ১৫.০৬.০৭ ।।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×