ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ঘটনায় সারাদেশে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়ার নেপথ্যে কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জয়নাল হাজারীর ইন্ধন ছিল। অনুসন্ধান ও তদন্তে নেমে গোয়েন্দা সংস্থা এসব তথ্য পেয়েছে বলে তারা জানিয়েছে। এছাড়া গ্রেফতারকৃত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মুক্ত করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সৃষ্টি, আওয়ামী লীগে ভাঙ্গন রোধে দিল্লী সফররত লেখক শাহরিয়ার কবির মধ্য আগস্টে এক মন্ত্রীর সাথে গোপন বৈঠক করেছেন। সূত্র জানায়, জয়নাল হাজারী দিল্লী, আগরতলা, কলকাতা ও বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই যাতায়াত করেন। সম্প্রতি তিনি কলকাতা শহরে ‘বিরাটি’ এবং বনগাঁ সড়কের পাশে ‘দুর্গানগরে’ একটি বাড়ি ভাড়া করেছেন। এই দু’টি বাড়িতে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। জয়নাল হাজারী তার ভাড়া করা বাড়িতে আশ্রয় নেয়া নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত শলাপরামর্শ করে দেশে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির নেপথ্যে কলকাঠি নাড়াচাড়া করছেন। ঢাবি ক্যাম্পাসের তুচ্ছ ঘটনাকে বড় আকারে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে জয়নাল হাজারী পুরনো ঢাকার আরেক সাবেক আওয়ামী লীগ এমপি হাজী সেলিমের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা বিতরণ করেছেন বলে গোয়েন্দা জানতে পেরেছেন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, দিল্লী সফররত লেখক শাহরিয়ার কবির ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর সাথে গোপন বৈঠক করেছেন মধ্য আগস্টে। বৈঠকে শেখ হাসিনাকে মুক্ত করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা, আওয়ামী লীগে ভাঙ্গন ঠেকানোর ব্যাপারে শাহরিয়ার কবির আলোচনা করেন। প্রণব মুখার্জীর পক্ষ থেকে তাকে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিলুপ্ত হতে পারে এমন প্রক্রিয়াকে ভারত সমর্থন করবে না। আর ভাঙ্গন ঠেকাতে ইতোমধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। শাহরিয়ার কবির ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর কাছে আওয়ামী লীগের ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন।
এদিকে একটি সূত্র জানায়, শেখ হাসিনার মুক্তি ও বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনের ব্যাপারে ভারত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর যথোপযুক্ত চাপ প্রয়োগ করছে না। ভারত নিষ্ক্রিয় থাকার ফলে আওয়ামী লীগে ভাঙ্গন দেখা দিচ্ছে। অপরদিকে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়ছে। বর্তমান অবস্থায় আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। আওয়ামী লীগের ব্যাপারে ভারতের বর্তমান ভূমিকায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীরা ভীষণ উদ্বিগ্ন। বৈঠকে শাহরিয়ার কবিরের এসব কথাবার্তার প্রেক্ষিতে প্রণব মুখার্জী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকারের ওপর ভারত সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে অন্যান্য সকল পন্থায় চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। ভারতের আশা ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার আর যাই করুক শেখ হাসিনাকে জামিনে মুক্তি দেবে।
সূত্র আরো জানায়, গোয়েন্দা অনুসন্ধানে গোপন বৈঠকের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগে ভাঙ্গন ঘটাতে সংস্কারবাদি নেতারা জড়িত হবেন না এমন পরামর্শ আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদকে দেয়া হয়েছে। প্রণব মুখার্জী বর্তমান অবস্থা পরিবর্তন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে বিরাজমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলন সৃষ্টির জন্য শাহরিয়ার কবিরকে পরামর্শ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে ভারত শুধু সহায়কের ভূমিকাই পালন করতে পারে। লেখক সালাম আজাদের মত অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভারতে আশ্রয় নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছেন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কলকাতায় সিপিএম-এর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সেলিম পহেলা আগষ্ট দিল্লীতে জয়নাল হাজারীকে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেন। আর এই সাক্ষাৎ পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর জ্ঞাতসারেই হয়েছে। শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার-পরবর্তী বাংলাদেশকে চাপে রাখার জন্যই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট রয়েছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় সিপিএম নেতা মোহাম্মদ সেলিমের মধ্যস্থতায় কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়ার সাথে জয়নাল হাজারীর সাক্ষাৎ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক হুইপ মোস্তফা রশীদ সুজাকে সপরিবারে এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মানু মজুমদারকে সরকারি আতিথেয়তায় সরকারি সার্কিট হাউসে থাকার ব্যবস্থা করার নেপথ্যে সিপিএম নেতা সেলিমের হাত রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সার্কিট হাউসের ঠিকানা হচ্ছে ৯/১, হাংগারফোর্ড স্ট্রীট, কলকাতা-২০। টেলিফোন নম্বর ২২৪০৫২৪২। গত ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করার পরদিন থেকেই তারা সার্কিট হাউজে অবস্থান করছেন। তবে কেউই প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন না।
।। ইত্তেফাক : ২৯.০৮.২০০৭ ।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

