আমার প্রিয় পোস্ট

আমার সকল স্পর্ধা সৃষ্টিকর্তাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করছি

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক: ভাবতে হবে নতুন করে

১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ৯:৪০

শেয়ার করুন:                   Facebook

আবু রুশদ

গত বছর অক্টোবর মাসে একটি প্রতিনিধিদলের সাথে পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলাম। ওটাই ছিল আমার প্রথম পাকিস্তান সফর। প্রায় দুই সপ্তাহ ছিলাম সেখানে। ঘুরেছি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ,উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ার, করাচী ও বালুচিস্তানে। গিয়েছি দুর্গম খাইবার পাসের আফগান সীমান্ত লাগোয়া মিচনী পোষ্টে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর স্মৃতি বিজড়িত বালুচিস্তানের জিয়ারতে। এসময় সেদেশের সরকারী পর্যায় থেকে বিরোধী দল ও বিভিন্ন পেশার মানুষের সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশী দিন কাটিয়েছি ইসলামাবাদে। অত্যন্ত পরিকল্পিত শহর এই ইসলামাবাদ। লোকসংখ্যা ৯ লাখের মতো। পাহাড় ঘেরা গাছ পালা শোভিত এই মহানগরী দেখে যে কারোই চোখ জুড়িয়ে যাবে। চিরাচরিত অভ্যাস মতো আমি সভা সেমিনারের ফাকে অবসর সময়ে বড় বড় শপিং মলগুলোতে ঘুরে বেড়াতাম। জিন্নাহ মার্কেট, সুপার মার্কেট-এ গিয়েছি প্রতিদিন। পিজা হাটে বসে বার্গার, কফি খেয়ে কোনদিন বইয়ের বিশালাকৃতির দোকানে ঢু মেরেছি, নয়তো ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোতে সাজিয়ে রাখা চোখ ধাঁধাঁনো বিলাস সামগ্রী দেখেছি, কখনো বা কিনেছিও। যেহেতু ওখানকার ট্যাক্সিক্যাব চালকরা এখানে যাবো না, ওখানে যাবো না বলে যাত্রী ফিরিয়ে দেয় না তাই কোন দুশ্চিন্তাও ছিল না। এছাড়া ছিনতাইকারী বা ঐ জাতীয় কোন সমস্যা না থাকায় মধ্যরাতেও ঘুরে বেরিয়েছি যত্রতত্র। অবাক ব্যাপার হলো পাকিস্তানের ইসলামাবাদ ও করাচী শহরে হাজার হাজার মহিলাকে দিনে তো বটেই মধ্যরাতেও গাড়ি ড্রাইভ করতে দেখেছি। এমনকি রাত ১২টার দিকে একলা গাড়ি নিয়ে মহিলাদের যাতায়াত করার দৃশ্য প্রতিরাতেই চোখে পড়েছে। ইসলামাবাদের মার্কেটগুলো বেশ রাত পর্যন্ত খোলা থাকায় নারী পুরুষ, শিশুদের আনাগোনাও মূলত: শুরু হয় সন্ধ্যার পর।

যাহোক, সেখানকার জিন্নাহ মার্কেটে একরাতে প্রায় ১১টার দিকে কোনায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলাম। এসময় লক্ষ্য করি দুজন যুবতী একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। তাদের আবার মাথায় হিজাব। বেশ শালীন পোশাক পরনে। দেখে বোঝা যায় ধনীর মেয়ে। এই দৃশ্য দেখে তো আমার আক্কেল গুড়ুম। ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তানে নারীরা প্রকাশ্যে ধুমপান করছে! ভাবাই যায় না। যুবতীদ্বয়ের সিগারেট টানা শেষ হলে আমি তাদের কাছে গিয়ে সরাসরি নিজের পরিচয় দিয়ে প্রশ্ন করি- নারী হয়েও এই ইসলামী প্রজাতন্ত্রে প্রকাশ্যে তোমরা ধুমপান করছো কিভাবে? স্মার্ট যুবতীদের একজন সাথে সাথেই পাল্টা প্রশ্ন করলো- কোরআন হাদিসে কোথায়ও কি লেখা আছে পুরুষরা সিগারেট খেতে পারবে আর মহিলারা পারবে না? আমি বললাম- না এ জাতীয় কোন কথা লিখা আছে বলে আমার জানা নেই। যুবতীদের আরো প্রশ্ন- তোমাদের দেশে মেয়েরা সিগারেট খায় না? হ্যা খায়, বনানী গুলশানের অনেক রেষ্টুরেন্টে গেলে দেখা যাবে জিন্স- টি শার্ট পরা মেয়েরা বয়ফ্রেন্ডদের সাথে ধুমছে ধোঁয়া টানছে। বনানীর কিংস বেকারীর পিছনে যেখানে নিরিবিলি বসার জায়গা সেখানে এজাতীয় দৃশ্য সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। যুবতীদ্বয় চুপচাপ আমার কথা শুনে বললো- ভাই আমরা দুজনই ধর্মভীরু পরিবারের মেয়ে, তবে ইসলাম নিয়ে অযথা গোঁড়ামি আমাদের মাঝে নেই। আমরা নামাজও পড়ি আবার গাড়িও চালাই, সিগারেটও খাই। অবশ্য কোন অশালীন ড্রেস কখনো পনি না, বেলেল্লাপনাও করি না।

জানতে পারলাম দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তাদের আরো জিজ্ঞাসা করলাম বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের অনুভূতি নিয়ে, ১৯৭১ সালের অমানবিক ঘটনাবলী নিয়ে। তারা বেশ আন্তরিকতার সাথেই বললো - দেখো ভাই, তুমি হয়তো মুক্তিযুদ্ধের আগে জন্মেছো। কিন্তু আমরা দুজনই '৭১-এর পরে জন্মেছি। তোমাদের ওপর যে জুলুম করা হয়েছে তা আমরা ইতিহাস পড়ে জানতে পারছি। এখনো পাকিস্তানে অনেক লেখক এ নিয়ে লেখেন। আমরা ঐ ঘটনার জন্য অনুতপ্ত। তবে সেই সময়কার যুদ্ধ যেন আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে পারস্পপরিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তারা আরো বললো যে - ইয়াহিয়া,ভুট্টো ও তদানীন্তন সামরিক জান্তার সদস্যদের জন্য বাংলাদেশীদের উপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার নির্যাতন চালানো হয়েছে তার দায়ভার তাদের পূর্ব পুরুষদের,তাদের নয়। এজন্য আমিও তাদের চোখে দায়ী নই। সত্য কথা কি আমি রীতিমতো অভিভূত হলাম যুবতীদ্বয়ের কথায়,তাদের আন্তরিকতা দেখে। তারা আমাকে অনুরোধ করে বললো- ভাই এসো, আমরা নতুন প্রজন্ম তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা ভুলে নতুনভাবে বন্ধুত্ব গড়ে তুলি।

একইরূপ ঘটনা ঘটেছে বালুচিস্তানের গভর্নর ওয়াইস আহমদ ঘনির দেয়া ডিনারে । অভিজাত কোয়েটা ক্লাবে এজন্য ছিল জমকালো আয়োজন। সেখানে ডিনার টেবিলে আমার বা পাশে বসেছিলেন এক ভদ্রলোক। খাওয়ার ফাকে তিনি পরিচয় দিয়ে জানালেন যে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার। আর্টিলারী বা গোলন্দাজ কোরের অফিসার ছিলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারী কোরের অনেক কর্মকর্তা - যেমন সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. এম আতিকুর রহমান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল হাফিজ, মেজর জেনারেল এম এ মতিনের নাম স্মরণ করলেন তিনি। আমি ছোট পদবীর হলেও একসময় সেনা কর্মকর্তা ছিলাম । তাই তার সাথে ভাব জমলো বেশ। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কে তার অনুভূতির কথা জানালেন। বললেন, কতগুলো বর্বরের জন্য তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে জঘন্য সব ঘটনা ঘটানো হয় যা তারা পরে জানতে পেরেছেন। খাওয়া শেষে বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। কেন 'দুই ভাই একসাথে থাকতে পারলো না?' এই প্রশ্ন নিজেই নিজের কাছে করলেন বারবার। এ জাতীয় আরো অভিজ্ঞতা হলো পাকিস্তান সফরের সময়।

পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কি হবে বা দুইদেশের মধ্যে কি কি বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা হবে তা নীতি নির্ধারকদের ব্যাপার। যে পাকিস্তানকে পরাজিত করে আমরা স্বাধীন হয়েছি তার সাথে অবশ্যই আমরা সবসময় নিজেদের বিজয়ী হিসাবে বিবেচনা করেই মিশবো। তবে কথিত স্বাধীনতার চেতনার কথা বলে আজীবন তাদের সাথে বৈরীতা চালিয়ে যেতে হবে তা কোনভাবেই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না। কারণ ১৯৭১ বা তার পূর্বে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক শ্রেনী, আমলা, ব্যবসায়ী বা জনগণ কি আচরণ করেছে তাকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে একাত্তর পরবর্তি পাকিস্তানকে দূরে ঠেলে দেয়া কখনোই যৌক্তিক বলে বিবেচিত হবে না। ইয়াহিয়া, ভুট্টো, টিক্কা খান, নিয়াজী বা সামরিক জান্তার সদস্য যারা গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষনের সাথে জড়িত ছিল তারাতো পুরো পাকিস্তানকে রিপ্রেজেন্ট করে না। যদি তাদের অপকর্মের কথা বিবেচনা করে সমগ্র পাকিস্তানকে বিবেচনা করতে হয় ও বছরের পর বছর একই দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের শত্রু হিসাবে দেখতে হয় তাহলে হয়তো ভুল করা হবে।

যদি একাত্তরের পাক শাসকদের অপকর্মের জন্য সেই দেশকে চিরদিন শত্রু হিসাবে গণ্য করতে হয় তাহলে তো বলতেই হবে যে যেই জাপান ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হার্বার-এ হামলা চালিয়েছিল সেই জাপানের সাথে কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সখ্যতা হতে পারে না। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রও তো জাপানের হিরোশিমা নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বর্ষণ করেছে। লাখ লাখ নিরপরাধ জাপানীর জীবনহানি ঘটিয়েছে। এ প্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে কোন সময়ই সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যেসব যুদ্ধবাজ জাপানী জেনারেল ও রাজনীতিবিদ পার্ল হারবার আক্রমণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন সেই জান্তার পতনের পর জাপানের সাথে মার্কিনীদের অকৃত্রিম বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভিয়েতনামের সাথেও মার্কিনীদের কোন যোগাযোগ থাকার কথা ছিল না। অথচ যারা ডিসকভারী চ্যানেল দেখে থাকেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন যে ঐ চ্যানেলে ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নেয়া মার্কিন সৈনিকেরা এখন ভিয়েতনামে আসছেন ও যে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন সেই রণাঙ্গনের ভিয়েতকং বাহিনীর সদস্যদের খুজে বের করে তাদের সাথে একত্রে যুদ্ধের স্মৃতি হাতড়ে বেরাচ্ছেন। তারা যোদ্ধা হিসাবে এখন একে অপরের বন্ধুতেও পরিণত হয়েছেন। কয়েক বছর পূর্বে তদানীন্তন ফরাসী প্রেসিডেন্ট তার ভিয়েতনাম সফরের সময় দিয়েন বিয়েন ফু রণাঙ্গন দেখতে গিয়েছিলেন যেখানে একসময় ফরাসী বাহিনী ভিয়েতকংদের প্রবাদ পুরুষ জেনারেল গিয়াপের বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়েছিল। এরও পূর্বের ঘটনাবলী যদি স্মরণ করি তাহলে বৃটেনের সাথে মার্কিনীদের ও ফ্রান্সের সম্পর্ক নিয়ে বলতে হয়। একসময় মার্কিনীরা বৃটিশদের যুদ্ধে পরাজিত করে স্বাধীনতা লাভ করেছে। ইউরোপিয়ান ইতিহাস যারা পড়েছেন তারা জানেন বৃটিশদের সাথে ফ্রান্সের কেমন দা-কুমড়া সম্পর্ক ছিল। তারা বছরের পর বছর যুদ্ধ করেছে। কিন্তু পরবর্তিতে ঐসব দেশ একে অপরের অকৃত্রিম বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। তারা আর পূর্বের শত্রুতা মনে পুষে রাখেনি। কারণ তারা দেখেছে যে একসময় বৃটিশদের যে প্রজন্ম মার্কিনীদের সাথে যুদ্ধ করেছে তাদের অপরাধের কোন সাথী তো বর্তমানের বৃটিশ প্রজন্ম নয়। একই কথা ফ্রান্সের সাথে বৃটিশদের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এরকম একই যুক্তিতে কি বলা যাবে না যে ১৯৭১ সালের পাক সামরিক জান্তা ও ভুট্টোর অপরাধের জন্য বর্তমান প্রজন্মের কোন পাকিস্তানীকে বাংলাদেশীদের উপর গণহত্যার দোষে দোষী করা ঠিক হবে না। আর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ যিনি নিজে '৭১-এর যুদ্ধে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তিনি বাংলাদেশে এসে ক্ষমা চেয়েছেন দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তার ক্ষমা চাওয়াকে অফিশিয়ালি ক্ষমা চাওয়া বলা যায়। অবশ্য পাকিস্তানের সাথে আমাদের কিছু অমিমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে। হিসাবমতো আমরা পাকিস্তান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা পাব। বিহারীদের নিয়েও রয়েছে সমস্যা। আবার এওতো বলা যাবে যে ১৯৭৫ সালের পট-পরিবর্তনের পর এই পাকিস্তানীরাই আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনকালে আমাদের সেনাবাহিনীর দুটি ডিভিশনের জন্য প্রয়োজনীয় হালকা অস্ত্র সরবরাহ করেছিল ত্বরিতগতিতে। পরবর্তিতে এরশাদের সময়কালেও তারা ৪০টি জঙ্গী বিমানসহ অনেক সমরাস্ত্র নিঃস্বার্থভাবে বাংলাদেশকে দিয়েছে। এখনো সেই সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। অবশ্য আমাদের দেশে কিছু মানুষ সবসময়ই সকল যুক্তিতর্কের বাইরে একচেটিয়াভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বলেই যাচ্ছে। তারা সেই একাত্তরের দোষের কারণে ঢালাওভাবে সকল পাকিস্তানীকেই দোষী করতে চান। চান না নতুন প্রজন্মের পাকিস্তানীদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে। কেন তারা এমন করেন তা তারাই ভাল বলতে পারবেন।

পাক-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আরো কিছু কথা বলা যায়। অনেকেরই হয়তো স্মরণ আছে যে গত বছর জুনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডি-ডে বা নরম্যান্ডি ল্যান্ডিং এর স্মরণে ফ্রান্সে ব্যাপক আয়োজন করা হয়। এতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য বা ইংল্যান্ডের সশস্ত্র বাহিনীর জীবিত সেনা সদস্য ছাড়াও রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশ নেন। প্রতিবছরই অবশ্য এই দিনটি পালন করে ফ্রান্স ও বৃটেন। যুক্তরাষ্ট্রও এতে যোগ দেয়। তবে সেবারের ব্যতিক্রম ঘটে অনুষ্ঠান পালনে। কারণ সেখানে প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর প্রতিপক্ষ দেশ জার্মানীর চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডার তারই দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নরম্যান্ডি ল্যান্ডিং-এ অংশগ্রহণকারী ফ্রান্স, বৃটিশ ও মার্কিন প্রতিপক্ষের সাথে একই কাতারে দিনটিকে স্মরণ করেন। এমনকি ফরাসী প্রেসিডেন্ট শিরাকের পাশাপাশি মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বক্তৃতা করেন এবং মিত্রবাহিনীর বীর সেনানীদের সাথে দেখা করেন। এনিয়ে বিবিসি, সিএনএন ব্যাপক প্রচারণা চালালেও তা ইউরোপবাসীদের বিস্মিত করেনি। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর মুহূর্ত থেকে যখন হিটলার ও নাত্‍সীবাদের পতন ঘটে তখন থেকে জার্মানী (এক অংশ ন্যাটোতে ও অপর অংশ ওয়ারশ জোটে) বিজয়ী মিত্রবাহিনীর বন্ধুতে পরিণত হয়। জার্মান কোন নাগরিককে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া বিচারে কাঠগড়াতেও দাঁড়াতে হয়নি বা জার্মান জাতিকে বৃটিশ, ফরাসী, রম্নশ ও মার্কিনীরা ঢালাওভাবে নাত্‍সীবাদী হিসাবে চিহ্নিত করেনি। বরং যুদ্ধশেষে মার্কিনী ও রাশিয়ানরা পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানীকে বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে পুণর্গঠনে সর্বোতভাবে সহায়তা করে। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্র ও অক্ষ বাহিনীর দেশগুলোর সাধারণ জনগণ পরষ্পর পরষ্পরের আজীবন শত্রুতে নয় মিত্রতে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে উভয়পক্ষের নেতৃবৃন্দ ও জনগণ এটাই ভেবেছে যে হিটলার, মুসোলিনী যা করেছেন বা যেভাবে বিশ্বযুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছেন এবং লাখ লাখ ইহুদী সহ বিপুল হারে গণহত্যা চালিয়েছেন তার জন্য তো সেসব দেশের সাধারণ নাগরিকেরা দায়ী থাকতে পারেন না। এছাড়া সেসব দেশের নেতৃত্ব ও আদর্শে বা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন ঘটার পর সেসব দেশে নাত্‍সী বা ফ্যাসিবাদেরও পতন ঘটে। ফলে নতুন ব্যবস্থাপনায় যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে তাতে এক দেশ আর পূর্বের শত্রুদেশের শত্রু থাকে না। আর উল্টো ঘটনার দেখা পাওয়া যাবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে। অবশ্য সবজায়গাতেই ব্যাপার ঐ একটি। তাহলো হয়তো একসময় একে অপরের শত্রু ছিল এই দেশগুলো বা একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছে, নিহত হয়েছে দুপক্ষেরই লাখ লাখ মানুষ। কিন্তু যেই যুদ্ধ শেষ ও পৃথিবী নতুন বলয়ে প্রবেশ করেছে বা বদলেছে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ঠিক তখনই তারা আবার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছে, প্রতিষ্ঠিত করেছে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এসব বিষয় আমাদেরও মনে রাখা দরকার। বিশ্ব প্রেক্ষিত ও এই উপমহাদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য বিবেচনা করেই বাংলাদেশের মানুষকে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক দেশ এবং সামরিক শক্তিতে সবচেয়ে শক্তিশালী পকিস্তানের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।।

..................................................

লেখক ডিফেন্স এনালিস্ট, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং সাংবাদিক।

লেখাটি নতুন ঢাকা ঢাইজেস্ট-এর জুলাই ২০০৫ সংখ্যায় প্রকাশিত।

 

 

  • ২২ টি মন্তব্য
  • ৪২৪ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৪ জনের ভাল লেগেছে, ১০ জনের ভাল লাগেনি
১. ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১০:০৩
comment by: মাহমুদ রহমান বলেছেন: ভাল। আবু রুশদ অনেক সাহসী লেখক। পছন্দ করি। এরকম সাংবাদিক আজকাল কমই দেখা যায়।
২. ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১০:১২
comment by: নাজিম উদদীন বলেছেন: কেন 'দুই ভাই একসাথে থাকতে পারলো না?' এই প্রশ্ন নিজেই নিজের কাছে করলেন বারবার। ....।

ভাল লেখা। কিভাবে দুই ভাই ? পাকিস্তানেএখনও ইতিহাস ঠিকমত পড়ানো হয় না। তারা ভাবে ৭১ এ যুদ্ধ হয়েছিল ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে।
৩. ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১০:১৪
comment by: নিরপরাধ বলেছেন: মাহমুদ, আবু রুশদ বর্তমানে যায়যায়দিনে আছেন। কিন্তু লিখেন কম।
৪. ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১০:২০
comment by: আলী বলেছেন: ১৯৭৫ সালের পট-পরিবর্তনের পর এই পাকিস্তানীরাই আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনকালে আমাদের সেনাবাহিনীর দুটি ডিভিশনের জন্য প্রয়োজনীয় হালকা অস্ত্র সরবরাহ করেছিল ত্বরিতগতিতে ( আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নাকি ভারত ঠেকাতে ?) পরবর্তিতে এরশাদের সময়কালেও তারা ৪০টি জঙ্গী বিমানসহ অনেক সমরাস্ত্র নিঃস্বার্থভাবে বাংলাদেশকে দিয়েছে
(নিঃস্বার্থভাবে ?)
৫. ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১০:৩০
comment by: নিরপরাধ বলেছেন: হুমম ... ভালো পয়েন্ট ধরছো তো আলী!
৬. ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১০:৩৩
comment by: দিগন্ত বলেছেন: মানুষে মানুষে বন্ধুত্বের কথাটা আমি মেনে নিচ্ছি, ওটা রেগে থেকে লাভ নেই। কিন্তু আপনি আর যে যে উদাহরণ গুলো দিলেন তাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুল বোঝাবুঝি মিটেছে দোষীর ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে। পাকিস্তানিরা যখন সত্যই এত বন্ধুত্ব চায়, তখন তারা একটা সংক্ষিপ্ত ঘোষণা দিক না, যে তারা ৩০ লক্ষ মানুষের জীবন নিয়ে ভুল করেছে ...
৭. ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১০:৩৪
comment by: ডাক্তার আইজউদ্দিন বলেছেন: না না ছি ছি আমগো ৩৫০০০ কোটি টাকাটা ফেরত দিলেই পারে
৮. ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১০:৫১
comment by: নিরপরাধ বলেছেন: দিগন্ত, লেখাটা আমার না। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিৎ। ক্ষমা চাওয়া উচিৎ রাজাকারদেরও। এবং যুদ্ধোপরাধীদের বিচার হওয়া উচিৎ। সমস্যা হলো কোনোটাই আমার এখতিয়ারভূক্ত না।
৯. ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১০:৫৩
comment by: দিগন্ত বলেছেন: আমি আপনাকে বলি নি, আমি লেখাটার বিপরীত্মুখী মতবাদকে দেখিয়েছি ...
১০. ১৫ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১১:৫৩
comment by: নেই মানুষ বলেছেন: আবু রুশদ, আপনি কি কখনো সুন্দরবন গিয়েছিলেন একদল সাংবাদিক এর সাথে?

i think india is far big a problem for us than is pakistan. india is a serpent in grass ৫ (sorry for using english in ur blog)

১১. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ১:০৫
comment by: কায়েস মাহমুদ বলেছেন: অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। ধারুন লিখেছেন।৫
১২. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ২:৪৯
comment by: সেলিম বলেছেন: আমার কমেন্ট মুছ কেলা?
১৩. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ২:৫২
comment by: ওবায়েদ বলেছেন: চিন্তা করার দরকার। ভালো।
১৪. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ২:৫৩
comment by: ফারহান দাউদ বলেছেন: গ্রেট,সেলিম।আমার কমেন্টও মুছে দিসে,এ দেখি বিশাল রাজাকার।কার যেন গন্ধ পাই,মাছ মাছ লাগে।
১৫. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ৩:২০
comment by: মাশরুর বলেছেন: কাউকেই চরম শত্রু বা পরম মিত্র ভাবা ঠিক না। ৮০-তে আমেরিকা যে তালেবানদের পক্ষ নিয়েছিল, আজ সেই তালেবানরা-ই আমেরিকার ১ নম্বর শত্রু।
এসব ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ-ই মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত।
১৬. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ৩:৩৯
comment by: নিরপরাধ বলেছেন: ম্যাচিউর কমেন্ট মাশরুর।
১৭. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ ভোর ৫:২১
comment by: নিরপরাধ বলেছেন: সামহো্য়্যার ইনের দুই ভাড়-চুয়াল মুৎকিযোদ্ধা বালখান দাউদ এবং কেমিকেল খালি ওরফে ছেঃলিম আমার উপর খুবই চেতিয়া গিয়াছেন। কারণ আমি নাকি এই পোস্টে তাহাদের মহামূল্যবান কমেন্ট মুছিয়া দিয়াছি। ঘটনা সত্য! আমি আসলেই তাহাদিগের কমেন্ট মুছিয়া দিয়াছি। রামছাগলদের কমেন্ট নিজের ব্লগে সযত্নে রাখার অর্থ হচ্ছে রামছাগলদের আস্কারা দেয়া এবং অন্যান্য রামছাগল, ছাগল, পাঠা, এবং গর্দভশ্রেণীর সকলকে আমন্ত্রন জানানো। আমি আবার সেই ক্যাচালে যেতে চাইনে। তো ... রামছাগল মহাশয়রা, আমার ব্লগে কমেন্ট চোদানোর আগে আপনার বাবা-মা'র কাছ থেকে জেনে আসুন তারা কোনো রামছাগলের জন্ম দিয়েছিলেন কি না।
১৮. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ ভোর ৫:২৮
comment by: জল রঙ বলেছেন: 'দুই ভাই একসাথে থাকতে পারলো না?'

বীজ ভাল না হলে চারা ভাল হয় না ।
তেল আর পানি কোনদিন মিশে না ।

১৯. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:৫৭
comment by: ফারহান দাউদ বলেছেন: নিরপরাধ,তোমার মুখের ভাষাতেই বুঝা যায়,তোমার মা কেমন সন্তানের জন্ম দিসেন,তো কলিজায় জোর থাকলে,একটু নিজের নামে আসো বরং,নাকি তুমিও তোমার পাকি ভাইদের মত কাপুরুষ?
২০. ১৬ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ৯:৪৮
comment by: নিরপরাধ বলেছেন: ফারহান দাউদ, লজ্জা-শরম কিংবা নিজের প্রতি শ্রদ্ধবোধ থাকলে আপনি কমেন্ট করতেন না এখানে।
২১. ১৭ ই আগস্ট, ২০০৭ রাত ৮:৩৮
comment by: ফারহান দাউদ বলেছেন: নিরপরাধ,আমার নিজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আছে,তবে আপনার মত এখনো পাকিস্তানিদের দিকে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই। নিজের ব্লগে ১টা বিরোধীমত রাখার মত সাহস যার নেই,তার দিকে শ্রদ্ধা দেখালে নিজেরই অসম্মান।যাই হোক,যার যার মত তার তার কাছে,আরেকটু সাহস দেখালে নিজের কাছে ছোট হবেন না।
২২. ১৮ ই আগস্ট, ২০০৭ ভোর ৪:৫৫
comment by: নিরপরাধ বলেছেন: ফারহান দাউদ, আমারে যখন "পাকিস্তানি" লেবেল দিছেনই তাইলে একজন পাকিস্তানির ব্লগে কি হইলো না হইলো সেটা নিয়ে আপনার মাথা ব্যাথার সুষ্পষ্ট কোনো কারণ দেখিনা। "বিরোধীমত রাখার সাহস নাই" আপনার এই দাবী মিথ্যা। নাজিম উদ্দীন, আলী, দিগন্ত, জল রঙ অনেকেই এই লেখার সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের কমেন্ট কিন্তু মোছা হয় নাই। মাঝে মাঝে কিছু নির্বোধের কমেন্ট অবধারিতভাবে মুছতে হয়। সেটা নিয়ে উত্তেজিত হবার কিছু নাই।

 

 

comment by:
আসলে বিদ্রোহী।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই

সর্বমোট হিট

 ৪১৫৮