somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পকথকের কৈফিয়ত

২৭ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ১১:১৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

TED বৈলা একটা কনফারেন্স হয় আম্রিকাতে । সেইটার ভিড্যুগুলা ইনতারনেতে পাওন যায় । কনফারেন্সটা মজার । শত শত বিষয়ের এক্সপার্টরা নিজ নিজ ফিল্ডের উপর লেকচার, বক্তৃতা, ডেমোনসট্রেশন দেন । এবং যেহেতু মোটামুটি সাধারণ শ্রোতার উদ্দেশ্যে দেয়া সেইজন্য বক্তৃতাগুলা সহজবোধ্য , রসাত্নক এবং একই সাথে জ্ঞানগর্ভ হয় । অত্যন্ত দুরুহ একটা কম্বিনেশন ।

ইসাবেলা সামথিং নামে একজন ফেমিনিস্ট রাইটারের বেশ মজাদার বক্তৃতা শুনতাছিলাম । উনি বক্তৃতা শুরুই করেন , আমি একজন গল্প-কথক এই বাক্য দিয়া । তাই শুরুতেই নইড়া চইড়া বসি । মনোযোগ দিয়া দেখলাম । বলতাছিলেন, নরমাল , লজিকাল পার্সনরা সাধারণত ভালো এক্স-স্পাউজের বেশী কিছু হয় না । তাই তাগোরে নিয়া গল্প বৈলা বা শুইনা মজা নাই । গল্পের ক্যারাকটার তারা হৈতে পারে না । গল্পের ক্যারাকটার হৈতে হয় প্যাশিওনেট হৃদয়ের, অসম্ভব কোয়েস্টে নামা, পিঠ দিয়া পাহাড় ঠেলা লোকজন । যেমন কেনিয়ার এক মহিলার কথা আসল যেই মহিলা তিন কোটি গাছের চারা লাগাইয়া পুরা একটা অঞ্চলের জলবায়ুই পরিবর্তন কৈরা দিছিলেন ।

ছোট আর কিঞ্চিৎকর যাই হই, নিজেরে গল্পকথক আমিও মনে করি । কিন্তু সবসময় সুপারম্যান ওম্যানের প্রায়-অসম্ভব কোয়েস্ট নিয়াই গল্প বলতে হৈব, বা ঐগুলাই সার্থক গল্প হৈব এইটা নিয়া সন্দেহ আছে ।

মানুষের , সাধারণ, যন্ত্রণাদগ্ধ, পলায়নপর, অলস, অদৃঢ়চেতা মানুষের জীবনেও ঘটনার পর ঘটনা সাজানো থাকে । মূলত ঘটনার পরম্পরাই জীবনি । টোটাল পৃথিবীতে গল্প বলার মালমশলার পরিমান মূলত অসীম । কিন্তু তার মধ্যে সবার গল্প সবাই শুনতে চায় না । সবার গল্প দিয়া আসর জমানি যায় না । কিন্তু আসর জমানিই একটা গল্পের একমাত্রতো না-ই, এমনকি চূড়ান্ত সফলতা এইটাও আমার মনে হয় না । কিছু গল্প হুট কৈরা মাথায় বাড়ি খাইয়া দুনিয়াদারি আউলাঝাউলা কৈরা দেয় । তাৎক্ষণিক ভাবে আবেগে ভাসাইয়া নিয়া যায় । আবার কিছু গল্প ধীরে ধীরে , গোপনে-গোপনে , অবচেতনে ভিতরে ঢুকে । কোনএকটা মূহুর্তে হঠাৎ কৈরাই কয়েক-বছর আগে শোনা বা পড়া গল্প , এপিফিনির মত মাথায় জাইগা উঠে । এই দ্বিতীয় শ্রেণীর গল্প বলা বা শোনার প্রতিই আমার আগ্রহ প্রবল ।

সাধারণ, কিঞ্চিৎকর মানুষের জীবন নিয়া প্রবল আগ্রহ তার কারণ হৈতে পারে । সাধারণ মানুষ আমার ক্যান জানি মনে হয় সাধারণতই অলস হয় । একটা তীব্র কোয়েস্ট সহ্য বা ধারণ করার মত মানসিক দৃঢ়তা সাধারণ মানুষ পোষণ করে না । তাই সাধারণ মানুষের গল্প মূলত পরাজয়ের গল্প । বস্তুগত এবং ভাবগত । দুইদিক থাইকাই । ক্রমাগত পরাজয়ের গল্প শুনতে যেমন ভালো লাগার কথা না , তেমনি বলতেও কথকের ভালো লাগার কথা না । আবার ক্রমাগত পরাজয়ে, অথবা পরাজয় মাইনা নেয়াতে জীবনও চলে না । তাই সাধারণের গল্পে জয়ও আসে । সেইগুলা আসে খুবই ছোট ছোট সাইজ এবং ব্যপ্তিতে । ভারতীয় ধনকুবের কোটি ট্যাকার মাগিরে বিলিয়ন ট্যাকার বাড়ি উপহার দিয়া সংবাদ-মাধ্যমে মাইন্ড ব্লোয়িং গল্পের তৈরী করলেও, মাস দুই পরে হোক আর সত্তর বছর পরে হোক, সিংহভাগ সাধারণ গল্পশ্রোতার মনে ভুস কৈরা সেই গল্প ভাইসা উঠে না । কারণ সিমিলার দৃশ্যকল্পে , নায়কের ভূমিকায় কখনই শ্রোতা আসে না । কিন্তু লুকাইয়া ট্যাকা জমাইয়া বউরে নতুন শাড়ি কিন্যা দিয়া বউয়ের মুখে উচ্ছাস না দেইখা , জীবনেরে অর্থহীন মনে হওয়া রিকশাঅলার যন্ত্রণাটা , বিশ বছর পরেও অনেকের জীবনে নতুন কৈরা দেখা দেয় । হয়ত এক্কেবারে রিকশাঅলা হিসাবে না । কিন্তু এমন একটা আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেইটা রিকশাঅলা থাইকা খুবেকটা দূরেও না । অর্থাৎ অনেকঅনেক পরে কোন একসময় হঠাৎ কৈরা মনে হৈতে পারে সেই বিশ বছর আগের কিঞ্চিৎকর রিকশাঅলার যন্ত্রণা প্র্যাকটিকালি বুঝলাম এইমাত্র ।

এইটাই সাধারণের গল্প বলার এবং শোনার মোহ তৈরীর চূড়ান্ত কারণ হিসাবে মনে হয় আমার ।

গভীর আগ্রহ নিয়া সাধারণের জীবন দেখার ঝক্কিঝামেলা অনেক । অতি তুচ্ছ জিনিসে ব্যাপক আগ্রহ সবসময়ই অতি-ভক্তি চোরের লক্ষণ জাতীয় সমস্যা তৈরী করে । এর মাঝখান দিয়াও পর্যবেক্ষণ চালাইয়া যাওয়াই হয়ত একটা গল্প । সেই গল্প কৈতে চাই না । আমি এইখানে মূলত আমার কওমি হুজুরের কাহিনী নিয়া কিছু কৈফিয়ত দিতেই চাইছিলাম । ইসপিসিফিকলি না দিয়া আমার গল্পবলা দর্শন নিয়া জেনারালাইজড কৈরা বলার কারন, সবগুলা কাহিনী পইড়া নিজেরই মনে হৈল এইগুলা একটা ক্যাটাগরিতেই পড়তাছে । এবং নিজের পাঠক সত্তার কথা মনে কৈরাও মনে হৈল শেষ পর্যন্ত এই ক্যাটাগরির গল্পগুলাই আমারে টানে ।

কওমি হুজুরের কাহিনী একটা গোত্রের কিংবা একটা জীবনধারার কাহিনী না । এইটা একটা মানুষের একটা জীবনের কাহিনী । এইখানে আংরেজি হৈলে 'একটা' শব্দডারে ক্যাপিটাল হরফে লেখতাম । কৈফিয়ত হিসাবে এইখানে একটা কথা বৈলা রাখতে চাই । সেইটা হৈল , আমার গল্পে সাধারণ, ভগ্ন, অদৃঢ়চেতা, মাইল্ড-লোভী, যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের মধ্যে মাদরাছায় যাওয়া টুপি পড়া মুল্লার সংখ্যা একটু বেশি থাকতে পারে । তার সাথে আমার ধর্মবিরোধীতারে দুই দুই চার যোগ কৈরা একটা গোত্রবিদ্বেষী মোটিভের ছায়া দেখাটা খুব বেশি ফার-ফেচড মনে হয় না । কিন্তু এইটারে এইভাবে দেখা ঠিকনা । কারণ এইটা গোত্রবিদ্বেষের চাইতে বেশি জড়িত, কোন ল্যান্ডস্কেপ, ডেমোগ্রাফি থাইকা আমি উইঠা আসছি সেইটা ।

আমার ল্যান্ডস্কেপের কারণে, যেই লোকগুলার গল্প আমি চোখে দেখি, যাদের কনফেশন আমি দিনের পর দিন মনোযোগ দিয়া শুনি , অথবা ভাসা ভাসা দেখার সাথে অভিজ্ঞতা মিলাইয়া যেই ধরণের ছবি তৈরী করি আমি সাধারণ মানুষের তার মধ্যে টুপি পড়া মুল্লার সংখ্যা বেশি হয় । গল্প বলায় সেইটারে সচেতনে এড়াইয়া যাওয়া হয়ত সম্ভব । কিন্তু সেইটা আমি করতে চাই না, কারণ তাতে গল্পের সততা নষ্ট হয় । গল্পের মূল থাইকা পাখনা বেশি দূরে চৈলা যায় । তাতে সাধারণের সাধারণ জীবন নিয়া ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকা গল্প লেখনের যেই ফিলসফিতে আমি মশগুল সেইটারে কন্ট্রাডিক্ট করা হয় ।

দাগকাটা-ফ্যান্টাসি, অথবা কবিতার চাইতে কথাসাহিত্য, গল্পসাহিত্য লেখাটা সহজ বৈলা দেখা যায় । টোটাল পৃথিবীর লেখা গল্পের ভল্যুমও বোধহয় সেইটা দৃষ্টিভঙ্গিরে সমর্থণ করে । কিন্তু গল্প লেইখা বা গল্প বৈলা নিজেরে তৃপ্ত করতে এখনও পারি নাই । লেখা সহজ বৈলাই হয়ত সফল করা কঠিন । সফলতার মাপকাঠি কি সেইটাতো বল্লামই ।

-------------------------------------------------------------------------
গল্প বলা এবং শোনা নিয়া আলোচনা মোস্ট-ওয়েলকামড ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১০ দুপুর ১:৩৬
২১টি মন্তব্য ২০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×