TED বৈলা একটা কনফারেন্স হয় আম্রিকাতে । সেইটার ভিড্যুগুলা ইনতারনেতে পাওন যায় । কনফারেন্সটা মজার । শত শত বিষয়ের এক্সপার্টরা নিজ নিজ ফিল্ডের উপর লেকচার, বক্তৃতা, ডেমোনসট্রেশন দেন । এবং যেহেতু মোটামুটি সাধারণ শ্রোতার উদ্দেশ্যে দেয়া সেইজন্য বক্তৃতাগুলা সহজবোধ্য , রসাত্নক এবং একই সাথে জ্ঞানগর্ভ হয় । অত্যন্ত দুরুহ একটা কম্বিনেশন ।
ইসাবেলা সামথিং নামে একজন ফেমিনিস্ট রাইটারের বেশ মজাদার বক্তৃতা শুনতাছিলাম । উনি বক্তৃতা শুরুই করেন , আমি একজন গল্প-কথক এই বাক্য দিয়া । তাই শুরুতেই নইড়া চইড়া বসি । মনোযোগ দিয়া দেখলাম । বলতাছিলেন, নরমাল , লজিকাল পার্সনরা সাধারণত ভালো এক্স-স্পাউজের বেশী কিছু হয় না । তাই তাগোরে নিয়া গল্প বৈলা বা শুইনা মজা নাই । গল্পের ক্যারাকটার তারা হৈতে পারে না । গল্পের ক্যারাকটার হৈতে হয় প্যাশিওনেট হৃদয়ের, অসম্ভব কোয়েস্টে নামা, পিঠ দিয়া পাহাড় ঠেলা লোকজন । যেমন কেনিয়ার এক মহিলার কথা আসল যেই মহিলা তিন কোটি গাছের চারা লাগাইয়া পুরা একটা অঞ্চলের জলবায়ুই পরিবর্তন কৈরা দিছিলেন ।
ছোট আর কিঞ্চিৎকর যাই হই, নিজেরে গল্পকথক আমিও মনে করি । কিন্তু সবসময় সুপারম্যান ওম্যানের প্রায়-অসম্ভব কোয়েস্ট নিয়াই গল্প বলতে হৈব, বা ঐগুলাই সার্থক গল্প হৈব এইটা নিয়া সন্দেহ আছে ।
মানুষের , সাধারণ, যন্ত্রণাদগ্ধ, পলায়নপর, অলস, অদৃঢ়চেতা মানুষের জীবনেও ঘটনার পর ঘটনা সাজানো থাকে । মূলত ঘটনার পরম্পরাই জীবনি । টোটাল পৃথিবীতে গল্প বলার মালমশলার পরিমান মূলত অসীম । কিন্তু তার মধ্যে সবার গল্প সবাই শুনতে চায় না । সবার গল্প দিয়া আসর জমানি যায় না । কিন্তু আসর জমানিই একটা গল্পের একমাত্রতো না-ই, এমনকি চূড়ান্ত সফলতা এইটাও আমার মনে হয় না । কিছু গল্প হুট কৈরা মাথায় বাড়ি খাইয়া দুনিয়াদারি আউলাঝাউলা কৈরা দেয় । তাৎক্ষণিক ভাবে আবেগে ভাসাইয়া নিয়া যায় । আবার কিছু গল্প ধীরে ধীরে , গোপনে-গোপনে , অবচেতনে ভিতরে ঢুকে । কোনএকটা মূহুর্তে হঠাৎ কৈরাই কয়েক-বছর আগে শোনা বা পড়া গল্প , এপিফিনির মত মাথায় জাইগা উঠে । এই দ্বিতীয় শ্রেণীর গল্প বলা বা শোনার প্রতিই আমার আগ্রহ প্রবল ।
সাধারণ, কিঞ্চিৎকর মানুষের জীবন নিয়া প্রবল আগ্রহ তার কারণ হৈতে পারে । সাধারণ মানুষ আমার ক্যান জানি মনে হয় সাধারণতই অলস হয় । একটা তীব্র কোয়েস্ট সহ্য বা ধারণ করার মত মানসিক দৃঢ়তা সাধারণ মানুষ পোষণ করে না । তাই সাধারণ মানুষের গল্প মূলত পরাজয়ের গল্প । বস্তুগত এবং ভাবগত । দুইদিক থাইকাই । ক্রমাগত পরাজয়ের গল্প শুনতে যেমন ভালো লাগার কথা না , তেমনি বলতেও কথকের ভালো লাগার কথা না । আবার ক্রমাগত পরাজয়ে, অথবা পরাজয় মাইনা নেয়াতে জীবনও চলে না । তাই সাধারণের গল্পে জয়ও আসে । সেইগুলা আসে খুবই ছোট ছোট সাইজ এবং ব্যপ্তিতে । ভারতীয় ধনকুবের কোটি ট্যাকার মাগিরে বিলিয়ন ট্যাকার বাড়ি উপহার দিয়া সংবাদ-মাধ্যমে মাইন্ড ব্লোয়িং গল্পের তৈরী করলেও, মাস দুই পরে হোক আর সত্তর বছর পরে হোক, সিংহভাগ সাধারণ গল্পশ্রোতার মনে ভুস কৈরা সেই গল্প ভাইসা উঠে না । কারণ সিমিলার দৃশ্যকল্পে , নায়কের ভূমিকায় কখনই শ্রোতা আসে না । কিন্তু লুকাইয়া ট্যাকা জমাইয়া বউরে নতুন শাড়ি কিন্যা দিয়া বউয়ের মুখে উচ্ছাস না দেইখা , জীবনেরে অর্থহীন মনে হওয়া রিকশাঅলার যন্ত্রণাটা , বিশ বছর পরেও অনেকের জীবনে নতুন কৈরা দেখা দেয় । হয়ত এক্কেবারে রিকশাঅলা হিসাবে না । কিন্তু এমন একটা আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেইটা রিকশাঅলা থাইকা খুবেকটা দূরেও না । অর্থাৎ অনেকঅনেক পরে কোন একসময় হঠাৎ কৈরা মনে হৈতে পারে সেই বিশ বছর আগের কিঞ্চিৎকর রিকশাঅলার যন্ত্রণা প্র্যাকটিকালি বুঝলাম এইমাত্র ।
এইটাই সাধারণের গল্প বলার এবং শোনার মোহ তৈরীর চূড়ান্ত কারণ হিসাবে মনে হয় আমার ।
গভীর আগ্রহ নিয়া সাধারণের জীবন দেখার ঝক্কিঝামেলা অনেক । অতি তুচ্ছ জিনিসে ব্যাপক আগ্রহ সবসময়ই অতি-ভক্তি চোরের লক্ষণ জাতীয় সমস্যা তৈরী করে । এর মাঝখান দিয়াও পর্যবেক্ষণ চালাইয়া যাওয়াই হয়ত একটা গল্প । সেই গল্প কৈতে চাই না । আমি এইখানে মূলত আমার কওমি হুজুরের কাহিনী নিয়া কিছু কৈফিয়ত দিতেই চাইছিলাম । ইসপিসিফিকলি না দিয়া আমার গল্পবলা দর্শন নিয়া জেনারালাইজড কৈরা বলার কারন, সবগুলা কাহিনী পইড়া নিজেরই মনে হৈল এইগুলা একটা ক্যাটাগরিতেই পড়তাছে । এবং নিজের পাঠক সত্তার কথা মনে কৈরাও মনে হৈল শেষ পর্যন্ত এই ক্যাটাগরির গল্পগুলাই আমারে টানে ।
কওমি হুজুরের কাহিনী একটা গোত্রের কিংবা একটা জীবনধারার কাহিনী না । এইটা একটা মানুষের একটা জীবনের কাহিনী । এইখানে আংরেজি হৈলে 'একটা' শব্দডারে ক্যাপিটাল হরফে লেখতাম । কৈফিয়ত হিসাবে এইখানে একটা কথা বৈলা রাখতে চাই । সেইটা হৈল , আমার গল্পে সাধারণ, ভগ্ন, অদৃঢ়চেতা, মাইল্ড-লোভী, যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের মধ্যে মাদরাছায় যাওয়া টুপি পড়া মুল্লার সংখ্যা একটু বেশি থাকতে পারে । তার সাথে আমার ধর্মবিরোধীতারে দুই দুই চার যোগ কৈরা একটা গোত্রবিদ্বেষী মোটিভের ছায়া দেখাটা খুব বেশি ফার-ফেচড মনে হয় না । কিন্তু এইটারে এইভাবে দেখা ঠিকনা । কারণ এইটা গোত্রবিদ্বেষের চাইতে বেশি জড়িত, কোন ল্যান্ডস্কেপ, ডেমোগ্রাফি থাইকা আমি উইঠা আসছি সেইটা ।
আমার ল্যান্ডস্কেপের কারণে, যেই লোকগুলার গল্প আমি চোখে দেখি, যাদের কনফেশন আমি দিনের পর দিন মনোযোগ দিয়া শুনি , অথবা ভাসা ভাসা দেখার সাথে অভিজ্ঞতা মিলাইয়া যেই ধরণের ছবি তৈরী করি আমি সাধারণ মানুষের তার মধ্যে টুপি পড়া মুল্লার সংখ্যা বেশি হয় । গল্প বলায় সেইটারে সচেতনে এড়াইয়া যাওয়া হয়ত সম্ভব । কিন্তু সেইটা আমি করতে চাই না, কারণ তাতে গল্পের সততা নষ্ট হয় । গল্পের মূল থাইকা পাখনা বেশি দূরে চৈলা যায় । তাতে সাধারণের সাধারণ জীবন নিয়া ধীরে ধীরে ভিতরে ঢুকা গল্প লেখনের যেই ফিলসফিতে আমি মশগুল সেইটারে কন্ট্রাডিক্ট করা হয় ।
দাগকাটা-ফ্যান্টাসি, অথবা কবিতার চাইতে কথাসাহিত্য, গল্পসাহিত্য লেখাটা সহজ বৈলা দেখা যায় । টোটাল পৃথিবীর লেখা গল্পের ভল্যুমও বোধহয় সেইটা দৃষ্টিভঙ্গিরে সমর্থণ করে । কিন্তু গল্প লেইখা বা গল্প বৈলা নিজেরে তৃপ্ত করতে এখনও পারি নাই । লেখা সহজ বৈলাই হয়ত সফল করা কঠিন । সফলতার মাপকাঠি কি সেইটাতো বল্লামই ।
-------------------------------------------------------------------------
গল্প বলা এবং শোনা নিয়া আলোচনা মোস্ট-ওয়েলকামড ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

