কিন্তু এই পোস্টটা সেইসব ঈর্ষা সম্পর্কে কিছু না । পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অন্য কিছু করতে পারি না পারি শিক্ষার ক্ষেত্রে আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে সঠিক জিনিস শিক্ষা দেয়াতে । এবং যতটা সম্ভব বিনামূল্যে । বাংলাদেশে অন্যসব শিক্ষা যাই হোক, গণিত আর বিজ্ঞান শিক্ষার অবস্থা ভয়াবহ । আমাদের পাঠ্যপুস্তকের মান কিন্তু বেশ ভালো । কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এইগুলা যারা পড়ায় । আমাদের সমাজে যারা অন্য কোন পেশায় কিছু করতে পারে না তাদের প্রবণতা থাকে শিক্ষকতায় যাওয়ার । যদিও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এটা এরকম নয়, কিন্তু মূলত ভালো শিক্ষক সবচে বেশি দরকার প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে । সেইখানের শিক্ষকদের অবস্থা ভয়াবহ । দেশে থাকতে কয়েকটা কোচিং সেন্টারের সববিষয় পড়ানো শিক্ষকদের জ্ঞানের পরিধি আর যৌক্তিক চিন্তার দৈন্য দেখে শিউরে উঠেছিলাম ।
মূলত গণিত বলি পদার্থবিদ্যা বলি, বা মানব জ্ঞানের যেকোন শাখার কথাই বলি (নন্দনতত্ত বা শিল্পকলা বাদে) দুইটা হাঁড়ের উপর প্রতিষ্ঠিত । যুক্তি এবং গাণিতিক পদ্ধতি । এই দুইটাকে এক করে গাণিতিক যুক্তি বলা যায় । এইকারণে অনেক উন্নত দেশে কেবল গণিত পারলে যেকোন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ভর্তি হওয়া যায় ।
গণিত উপরের দিকে যেতে যেতে কঠিন থেকে কঠিনতর হইতে থাকে । কিন্তু যেকোন শাস্ত্রে অন্তত জ্ঞানার্জন করতে পারার জন্য বা নূন্যতম বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা বুঝার জন্য যতটুকু গণিত বুঝতে হয় সেইটা খুব কঠিন কিছু না , এবং এটা মোটামুটি শিক্ষিত সবারই বুঝা উচিৎ । না বুঝলে এখন থেকে বুঝার চেষ্টা করা উচিৎ । সবচে বেশি উচিৎ শিক্ষকদের । কারণ পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক বৈজ্ঞানিক চিন্তার পদ্ধতি শিখাইতে না পারলে দিন দিন পিছন দিকে হাঁটা বাধ্য ।
যাইহোক, এই পোস্ট লেখার প্রেরণা দুইটা পোস্ট থেকে । একটা আকাশ_পাগলার ছাগলামি মার্কা পোস্ট , "বিজ্ঞানের থিওরি, টাইম মেশিনের সম্ভাবনা, নাস্তিকদের অনেক প্রশ্নের উত্তর" , আরেকটা লেসার নামে এক ব্লগারের E=mc2 এর বীজগাণিতিক প্রমাণ । মেজাজ খারাপ হৈছে বেশি টাইম মেশিনের পোস্ট শত শত লোকের প্রিয় পোস্টের তালিকায় দেইখা । ছাগল পাগল বাদ দিলেও বেশ কিছু ডিসেন্ট লোকের প্রিয় তালিকায়ও দেখলাম ।
এইখানে ক্ল্যারিফাই করে নেই, এই পোস্টের বিরুদ্ধে আমার নাস্তিকতা উদ্ভূত কোন অভিযোগ নাই । অনেস্টলি । ত্যানা প্যাঁচায়া পিছলাইয়া কেউ বিশ্বাস আঁকড়াইয়া থাকলে সেইটারে অত গুরুত্ব দেয়ার কিছু নাই । একবার একটা প্যারোডি লেখছি (যেটা আসলে পোস্টের কন্টেন্টের কারণে না, বরং কমেন্টে পর্বতপ্রতিম অজ্ঞতা আর মহাশূণ্যিক ছাগলামির জন্য) সেইখানেই শেষ হইতো । কিন্তু এই পোস্ট এবং তার সাথে সম্পর্কিত আরো অনেকের প্রতিক্রিয়া আরো গভীর জিনিসের সাথে সম্পর্কিত । আমাদের দেশের বিভিন্ন বালছাল কোম্পানি, ডেস্টিনি, ইউনিপেটু ইউ এবং আরো শতশত প্রতারক কোম্পানির দ্বারা মানুষের প্রতারিত হওয়া , মেট্রিকে চমৎকার রেজাল্ট করা ছাত্র/ছাত্রীটা ইন্টারে অনেক পড়ালেখা করেও সেকেন্ড ক্লাস পাওয়া, বা ভার্সিটিতে গিয়া পুরাই আব্দুল হইয়া যাওয়া, এইগুলার অনেকগুলার পিছনেই সবচে বড় কারণ যৌক্তিক বা গাণিতিক চিন্তার একেবারে মৌল জিনিসগুলা না বুঝা ।
টাইম মেশিনের পোস্টে মূল ঘাপলা জায়গা হৈলো
এইখান থেকে দেখা যাইতেছে গতি বাড়াইতে থাকলে দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য যেই সময় লাগে সেইটা কমতে থাকে । যেটা ঠিক । এখন, বেগের বিপরীতে সময়ের গ্রাফ আঁকলে সেটা কিরকম হয় দেখা যাক ।
এইগ্রাফ থেকে দেখা যাইতেছে বেগ বাড়তে থাকলে সময় কমতে থাকে কিন্তু এক্স অক্ষে যত দূরেই যাওয়া যায় এইটা কখনোই শূণ্য বিন্দুতে পৌঁছায় না । তার মানে যত জোরেই যাওয়া হোক কখনোই শূণ্য সময়ে কোথাও যাওয়া তো সম্ভবই না , ঋণাত্নকতো পরের ব্যাপার । (আপেক্ষিকতা তত্তের আলাপে পরে আসা যাক)
এখন অন্য অনেক রকম সম্পর্কেই বেগ বাড়ার সাথে সময় কমতে পারে , যেমন নিচের উদাহরণ দেখা যাক ।
এইখানে মাঝখানে গোল্লাটা পার হৈলে V এর বিপরীতে t এর মান ঋণাত্নক হৈতে থাকে । কিন্তু এইখানে সম্পর্কটা ধরা হৈছে এইরকম t = K-V [K ধ্রুব], যেটা টোটাল ননসেন্স ।
এই পার্টটুক পার হৈলে এরপর যা খুশি তা বলা যায় । এইজন্য এর পরে সান্তা ক্লস, স্প্যাগেটি মনস্টার, বালছালবাবা, সবকিছুরে সম্ভাব্য ধরা যায় , সেইটা কেউ ধরতে চাইলে যাক । কিন্তু শিশুদের ভুল শিখাবেন না প্লিজ । গাণিতিক যুক্তি সঠিকভাবে শিক্ষা দিন । কোনকিছু নিয়া ডিলুশনে ভুগতে চাইলে ভুগেন । সেইটারে গণিত বলবেন না । কেউ বললে তার ভুলটা তারে ধরায়া দেন ।
এইবার আসা যাক , লেসার এর পোস্টে । এই লোক প্রথমেই আকাশ থেকে ডিম পাড়ছে , স্থিতিশক্তি নাকি এইরকম
এইখানে দুই নম্বর সমীকরণে বস্তুর বেগের জায়গায় আকাশ থেকে নিয়া আসছে আলোর বেগ c
ঐটা বাদ দিলেও শেষের দুইলাইনে দেখানো হইছে সে প্রথম সমীকরণটা কিভাবে নিয়া আসা হইছে । এইখানে ভুল হৈলো
১ । ত্বরণ a=v/t হৈলে যে কন্ডিশন কল্পনা করা হৈতাছে সেইখানে বাই ডিফল্ট আদিবেগ = ০, শেষ বেগ v এবং এই বেগে পৌঁছাইতে সময় লাগছে t এবং বস্তুটা সমত্বরণে চলতেছে । কিন্তু আবার প্রতিপাদনের জায়গায় ব্যবহার করা হৈছে v=s/t
যেটা হবে ঐ ক্ষেত্রে যেখানে কোন ত্বরণ নাই, অর্থাৎ সমবেগের জন্য একটা বস্তু সমবেগ আর সমত্বরণে একসাথে চলতে পারেনা । ত্বরণ থাকা মানেই বেগ সময়ের সাথে পরিবর্তন হচ্ছে । আর সমবেগ মানে হচ্ছে বেগের কোন পরিবর্তন নাই ।
২ । স্থিতিশক্তি জমা হয় বলের বিপক্ষে (ঘর্ষণ ছাড়া, ঘর্ষণের পক্ষে বিপক্ষে যেভাবেই কাজ করা হোক না কেন স্থিতিশক্তি জমা হবে না) কাজ করা হৈলে , বল দিয়া কাজ করলে স্থিতিশক্তি জমা হয় না । যেমন অভিকর্ষের বিপরীতে কিছু একটাকে উপরে উঠানো হৈলে তার মধ্যে স্থিতিশক্তি জমা হবে, কিন্তু উপর থেকে কিছু একটা অভিকর্ষের কারণে নামলে সেখানে কোন স্থিতিশক্টি জমা হবে না ।
এখন পরের পার্টে আসা যাক । এই লোক প্রথম থেকে কমেন্টে ক্যালকুলাসে ভুল আছে এইসব বালছাল কমেন্টে বলছে । অথচ সে বীজগাণিতিক যেই প্রতিপাদন বলতেছে সেইখানে ক্যালকুলাসের একটা ফান্ডামেন্টাল উপপাদ্য প্রয়োগ করতেছে, সেইটা হৈলো টেলরের উপপাদ্য
যেটার একটা অনুস্বিদ্ধান্ত এইরকম
1/1-x = 1+x+x^2+x^3+x^4+.............
যেখানে শর্ত হচ্ছে x এর পরমমান একের চাইতে ছোট হৈতে হবে । এখন এক্স যদি একের চাইতে খুবই ছোট হয় তখন 1+x রেখে বাকিগুলা বাদ দিয়ে দেয়া যায় । কারণ একের চাইতে ছোট সংখ্যা যত ছোট হৈতে থাকে ততই তার ঘাতগুলার মান কমতে থাকে এবং ঘাতগুলাতেও স্কয়ার এর চাইতে কিউবের মান অনেক কম, কিউবের চাইতে ফোর্থ পাওয়ারের মান কম । ইনফ্যাক্ট স্কয়ার থেকে শুরু করে পরের সবগুলা যোগ করলেও শূণ্যের কাছাকাছি কিছু হবে । এইজন্য ঐগুলারে বাদ দেয়া ।
যাইহোক, এত কথা বলার কারণ হৈলো , শিক্ষার ক্ষেত্রে নিজস্ব কুসংস্কার, নিজে না বুঝে কারো কাছ থেকে শুনা কথা এইসব জিনিস সহ্য করার কোন উপায় নাই । আজকে ঘোরপ্যাঁচ দিয়া আপনার আল্লার পক্ষে বা ভগবানের পক্ষে কেউ যুক্তি দিয়া দিলে সেইটা বৈলা কালকেই আপনি ভরা মজলিশে হাসির পাত্র হৈবেন ।
কিন্তু আমার এত কষ্ট করার কারণের মধ্যে উপরের কারণটা মাত্র ১ ভাগ । বাকি ৯৯ ভাগ হৈলো সবার কাছে গাণিতিক, যৌক্তিক চিন্তার কাঠামোর ভয়াবর প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব উপলব্ধ করার জন্য । নিজেদের সন্তান, ছোটভাইকে ভুলজিনিস শিখাবেন না, শিখায়া তার জীবনের সাফল্যের হারকে সূচকীয় হারে কমায়া দিবেন না । আমাদের দেশের তেমন কোন সম্পদ নাই আরব বিশ্বের মত যে আমরা খালি বৈসা বৈসা বেঁচে খাবো । আমাদের যদি কিছু করতে হয়, করতে হবে মেধা আর প্রযুক্তির জোরে । আর এইগুলা স্বচ্ছ যৌক্তিক চিন্তা আর গণিত ছাড়া অকল্পনীয় ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

