চৌধুরী সাহেবের মুহুর্তমাত্র অবসর নেই। ব্যবসার কাজে তাকে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকতে হয়। তার উপর আজ আবার ফরেন ডেলিগেটসদের সাথে মিটিং। আজকের মিটিংটা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ন। বেশ বড় একটা ডিল। সকাল সকাল সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে।
"মতি মিয়া, চা নিয়ে আসো।"
"আনতাছি বড় সাব।"
আপন মনে ব্রিফকেসে সব ফাইল গুলো আবার দেখতে থাকেন। না, কাগজ পত্র সব ঠিক আছে। যা যা দরকার সবই আছে। ব্রিফকেসটা একটু উচিয়ে ধরলেন। ঠিক তখনি ঘটল অঘটনটা। চা পুরোটা ছলকে পড়ল ব্রিফকেসে। সাথে সাথে নষ্ট হয়ে গেল কাগজপত্র গুলো। এক মিনিটের ব্যাপার। অথচ ধ্বংস করে দিল মাসের পর মাসের প্রস্তুতিকে।
মতি মিয়া কখন পিছনে এসে দাড়িয়েছিল টের পান নি চৌধুরী সাহেব। তাই অসাবধানে এ ঘটনা ঘটতে পারল। প্রথমটা তিনি বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেন। সম্বিত ফিরে আসতে প্রথম যে কথাটি মনে এল তা হল, "এখন মিটিং এর ফলাফল কি হবে?" চোখের সামনে বার বার কল্পিত মিটিং ভাসতে লাগল। এত বড় ডিলটা মিস হয়ে যাবে? কাগজ পত্র না দেখাতে পারলে কি অর্ডারটা পাবেন? সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
প্রাথমিক ধাক্কাটা কেটে যাবার পরে চৌধুরী সাহেব তাকালেন মতি মিয়ার দিকে। মতি মিয়া ভয়ে কাপছে। মৃদু কন্ঠে তিনি বললেন,"মতি মিয়া, তুমি নিজেও জানো না আমার কত বড় ক্ষতি তুমি করেছ। তুমি এখনই এই বাসা থেকে বের হয়ে যাও। বলা যায় না, অফিস থেকে এসে আমি তোমাকে খুনও করে ফেলতে পারি।"
মতির গা কাপতে থাকে। বড় সাহেব এসব কি বলছেন। বড় সাহেব আবারো গর্জে উঠলেন, "কথা কানে যায় না? বার হও বাসা থেকে?"
এবার হাউ মাউ করে কেদে উঠে মতি মিয়া। ধপ করে চৌধুরী সাহেবের পায়ের কাছে বসে যায়, "সাহেব, আমারে মাফ কইরা দেন। আমারে বাইর কইরেন না। আমার কুনু ঘর নাই।"
"আর একটা কথা না বলে বেরোও। নতুবা পুলিশে দেব।"
বেগম সাহেবার কাছে হাজারো কান্নাকাটি করল মতি। লাভ কিছু হল না। মাথা নীচু করে ভগ্ন হৃদয়ে মতি বেরিয়ে গেল চৌধুরী সাহেবের বাড়ী থেকে। কোথায় গেল কেউ জানেনা। জানার প্রয়োজনও কেউ মনে করেনি।
এই অর্থহীন ঘটনাটিকে ভুলে যায় সবাই। বড় সাহেব কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সেদিনের বড় ডিলটা মিস হওয়ার ক্ষতিকে যাতে পুষিয়ে নেয়া যায় তার সর্বাত্মক চেষ্টায় নিজেকে নিয়োগ করেন। মতি নামের কেউ যে তার বাসায় কখনও ছিল সেটাই এক সময় তার মন থেকে হারিয়ে যায়।
এর পর কেটে যায় দশ বছর।
চৌধুরী সাহেবের জীবনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। অতীতের সেই জৌলুস এখন আর নেই। হঠাৎ স্ত্রী অসুস্থ হওয়ায় জলের মত টাকা খরচ হতে থাকে চিকিৎসায়। একই কারনে ব্যবসাতেও মনোযোগ দিতে পারলেন না। সেখানেও নামল ধ্বস। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে স্ত্রী মারা গেলেন। ব্যথিত হলেন ঠিকই তবে সে শোক সামলে নিয়ে আবার ব্যবসা দাড় করাতে মনস্থির করলেন চৌধুরী সাহেব।
কিন্তু অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে যায়। বিপদ যখন আসে তখন চারিদিক থেকে আটঘাট বেধেই আসে। চৌধুরী সাহেবের একমাত্র পুত্র সন্তান মায়ের অভাবে অযত্ন অবহেলায় দিন দিন শুকিয়ে যেতে থাকে। এটা ওটা অসুখ লেগেই থাকে। একসময় গুরুতর অসুস্থতায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। এই রোগ ভাল হবে কিনা চিকিৎসকরা কেউ বলতে পারেনা। এদিকে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও যেন নেই। প্রায়ই ডাক্তারের ভিজিট বাকী পড়ে।
"আমার আর সয় না।", এই বলে সেজদায় কান্নায় ভেংগে পড়েন, "হে আল্লাহ, এই নাদানকে তুমি আর কত পরীক্ষা করবে। আঘাতে আঘাতে আমি তো জর্জরিত। আর আঘাত নেয়ার ক্ষমতা, শক্তি কোনটাই অবশিষ্ট নেই। রহম কর। আমার ছেলেটাকে ভিক্ষা চাইছি।"
জায়নামাজ ভিজে যায় প্রতি রাতের কান্নায়। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কেটে যায় এই জায়নামাজে। "ও আল্লাহ, আমার ছেলের জান ফিরিয়ে দাও। আর কিছু চাই না।" ইবাদতে ডুবে থেকে এই একটি দোয়া তিনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বারপুনরাবৃত্তি করতে থাকেন।
এমনি একদিন নামাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে জায়নামাজে ঘুমিয়ে যান চৌধুরী সাহেব। কিছুক্ষন পরে একটি অদ্ভূত স্বপ্ন দেখে উঠে গেলেন তিনি। কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলেন অদ্ভূত স্বপ্নটির কথা ভেবে। একটা আলোক বিন্দু। সেই আলোক বিন্দু থেকে ভারী গলায় কে যেন তাকে বলছে, "আজ তুমি যেমন করে কড়জোড়ে তোমার সৃষ্টিকর্তার কাছে অনুগ্রহ ভিক্ষা করছ, ঠিক তেমনি করেই দশ বছর আগে একজন মানুষ তোমার কাছে অনুগ্রহ ভিক্ষা করেছিল। তুমি তাতে সাড়া দাওনি। তার ব্যথিত বুক ভাংগা আর্তনাদ তোমার হৃদয়কে স্পর্শ না করলেও তা আল্লাহর আরশকে স্পর্শ করেছে। সে জন্যই তোমার আজ এত দুর্দশা।"
"এর কি কোন প্রতিকার নেই? আমি কি সেই ভুলের জন্য একেবারেই ধ্বংস হয়ে যাব?"
"তাকে অথবা তার উত্তরসূরীদের খুজে বার কর। তাদের দোয়াই পারবে তোমার ছেলের জীবন ফিরিয়ে দিতে।"
আচ্ছা, এ স্বপ্ন কি সত্য হতে পারে? কে জানে। কিন্তু চৌধুরী সাহেবের তো আর কোন উপায় নেই। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। ডাক্তাররা ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিয়েছেন। কেউ আর আশাবাদী নয়।
হ্যা। তিনি যাবেন মতি মিয়ার খোজে। শেষ চেষ্টা শুধু সেটাই।
চৌধুরী সাহেব কি করে মতির বাড়ী খুজে বার করলেন সে আরেক ইতিহাস। ঝাড়া দুইটি বছর অক্লান্ত চেষ্টায় মতির বাড়ীর সামনে দাড়িয়ে কড়া নাড়লেন।
ভেতর থেকে প্রশ্ন এল, "কাকে চাই?"
জবাব দিতেই এক তরুনী বেড়িয়ে এল,"বাবা তো মারা গিয়েছেন অনেক দিন হল। আপনি তাকে তাড়িয়ে দেন। সে শোক তিনি সইতে পারেন নি। তার মন ভেংগে যায়। নিজের প্রতি মোটেই যত্ন নিতেন না। কিছুদিন পরে তিনি মারা যান।"
"আমি অত্যন্ত লজ্জিত কৃতকর্মের জন্য।" একটু থেমে বললেন, "আপনার কাছে এসেছি ভিক্ষা চাইতে।"
সব খুলে বললেন চৌধুরী সাহেব। পরে বললেন, "আমি আজ রিক্ত। শুধু একটি সন্তানই আমার রয়েছে। আপনি আমার অপরাধ ক্ষমা করে দিন। আমার ছেলেটির জন্য মন থেকে দোয়া করুন। আল্লাহ আপনার সহায় হোন।"
তরুনীর মুখ কিছুটা কঠিন হয়ে গেল, "আপনি যতটা সহজে ক্ষমা চেয়ে নিজের পাপ মোচন করতে চাইছেন, আমার বাবা তার চেয়ে অনেক বেশী আঘাত পেয়েছিলেন। আমার পক্ষে তা ভোলা সম্ভব নয়। আপনি আসুন।"
চৌধুরী সাহেব এবার বসে পড়লেন তরুনীর পায়ের কাছে। ঠিক সেভাবে যেভাবে মতি মিয়া বসেছিল একদিন তার পায়ের কাছে।
"আমি ফিরে যেতে আসিনি। খালি হাতে আমি ফিরে যাবো না। আমার একমাত্র সন্তানের মুখ চেয়ে আপনি নিজের গুনে আমায় ক্ষমা করে দিন। আপনি ক্ষমা না করলে সে সুস্থ হবে না।" হাউ মাউ করে কান্নায় ভেংগে পড়েন।
অবশেষে তরুনী কঠিন শক্ত মুখ কোমল হয়ে আসে। অশ্রু দেখা দেয় তার চোখেও, "আমি আমার বাবার কষ্ট দেখেছি। সেই একই কষ্ট আপনি পান তা চাই না। আল্লাহ যাতে আপনার ছেলেকে সুস্থ করে দিন।"
চৌধুরী সাহেব স্থির হন। তার বিশ্বাস দৃঢ় হয় তার ছেলে বেচে উঠবে। এ শুধু সময়ের ব্যপার।
আরো বছর খানেক পরে সুস্থ ছেলেকে নিয়ে চৌধুরী সাহেব আবার তরুনীর কাছে দেখা করতে এসে শুধালেন, "মতি মিয়ার কবরের কাছে আমাকে নিয়ে চলুন। আমি তার বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চাইব। আপনি এবং আপনার বাবা মহানুভবতা দিয়ে আমাকে পরাজিত করেছেন।"
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৮:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


