বর্তমানে বাংলাদেশের চলমান বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে নারীর রাজনৈতিক অধিকারের বিষয়টি আরেকবার আমাকে ভাবিয়েছে । এর পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের নারী নীতি থেকে সৃষ্ট জটিলতা। নারী নীতির বিরোধীরা সরকারকে বিভিন্ন ধারা সংশোধনের পাশাপাশি সংসদে নারীর সংরক্ষিত আসন উঠিয়ে দেবার পক্ষে মত দিয়েছে বলে প্রথম আলোতে এসেছে। নারী নীতির বিরোধীদের সহিংস আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রে সরকার কিছুটা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে তবে আপাতত নারী নীতি মূলতবি অবস্থায় রয়েছে। যার ফলে নারী নীতি প্রনয়ন হচ্ছে না বলে ধরে নিতে হচ্ছে।
দ্বিতীয় ঘটনাটির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ন আলাদা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমত পোষনকারী সীমা ইসলাম নামের ছাত্র লীগের এক নারী কর্মী তারই সহকর্মীদের দ্বারা নিতান্ত বর্বরভাবে শারীরিক আক্রমনের শিকার হন। কিন্তু এক্ষেত্রে আশ্চর্যের ব্যপার হল সীমার ঘটনার মূল নায়কদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ রহস্যময় নীরব ভূমিকা অবলম্বন করেছে। পত্র পত্রিকাসহ গনমাধ্যম এ ব্যপারে তেমন একটা দায়িত্বশীল আচরন দেখায় নি। নারী নীতির বিরোধিতা নিয়ে যতটা কভারেজ হয়েছে, সীমার ঘটনা নিয়ে সে তুলনায় কিছুই হয় নি। অথচ নারী নীতি তো নারীদের অধিকারের জন্যই। নীতি প্রনয়ন করে তো কোন লাভ নেই যদি না তা বাস্তবায়ন হয়। বাস্তবে সীমার মত নারী কর্মীদের যদি ভিন্নমত পোষনের দায়ে এভাবে শারীরিক আক্রমনের শিকার হতে হয় তবে হাজারটা নীতি প্রনয়ন করে নারীর অবস্থা পরিবর্তন সম্ভব নয়।
উপরের দুটো ঘটনার পেছনের শক্তির আদর্শিক অবস্থান দুই মেরুতে হলেও ঘটনা দুটি নারীর রাজনীতিকে কেন্দ্র করে। পৃথিবীর ইতিহাসে রাজনীতিতে নারীর পদচারনা নূতন কিছু নয়। রাজনীতির পথে এই বাধা বিপত্তির মুখোমুখি নারীকে এখনকার মত অতীত কালে হতে হয়েছে, কুসুমাস্তীর্ন পথ তার জন্য কখনই ছিল না। তা সত্ত্বেও আদিমকাল থেকে আজ পর্যন্ত যুগে যুগে প্রাসাদ রাজনীতির ইতিহাস নারীর পদচারনায় মূখর। আজকের বাংলাদেশ সেই ধারাকেই অনুসরন করছে মাত্র। আদিম পৃথিবীর অপরিসীম ক্ষমতাধর নারী ক্লিওপেট্রা থেকে শুরু করে আধুনিক পৃথিবীতে গোল্ডা মেয়ার পর্যন্ত হাজারো নারী রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন বুদ্ধি এবং কৌশলের মাধ্যমে। কেউ কেউ হয়ত পরবর্তীতে উচ্চাভিলাষের কারনে পরাজিত হয়েছেন - যার উদাহরন হতে পারেন ক্লিওপেট্রা। আবার গোল্ডা মেয়ারের মত নারী রাজনীতিবিদেরা স্বীয় মেধা, জনসম্পৃক্ততা আর কৌশলের কারনে তাদের মানুষের কাছে বরনীয় হয়ে থেকেছেন।
কিংবদন্তী রানী ক্লিওপেট্রার উথ্থান ও পতন দুটোই অত্যন্ত ঘটনা বহুল। মিশরের শেষ ফারাও ক্লিওপেট্রাকে যখন তার পিতা টলেমী উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান তখন তার বয়স মাত্র ১৮। মিশরের আইনে পুরুষ সংগী ছাড়া কোন নারী একক ভাবে শাষক হতে পারত না। ফলে তাকে বিয়ে করতে হয় তারই ১২ বছরের বয়সী ছোট ভাই টলেমীকে। কিন্তু উচ্চাভিলাষী ক্লিওপেট্রা মসনদ পেয়েই সরকারী নথি পত্রে টলেমীর নাম বাদ দিয়ে এককভাবে নিজের নাম বসান। ফলশ্রুতিতে উচ্চ পর্যায়ের পরিষদদের বিরাগ ভাজন হন। এক পর্যায়ে ক্লিওপেট্রাকে সরিয়ে তারা টলেমীর একক ক্ষমতা নিশ্চিত করেন। ক্লিওপেট্রা পালিয়ে যান। কিন্তু তাই বলে তিনি দমে থাকেন নি। নিজের সেনা গড়তে থাকেন। অবশেষে রোম সম্রাট সীজারের প্রেমময় দৃষ্টি আকর্ষন করেন এবং তার সাহায্যে ক্ষমতা ফিরে পান। সীজারের মৃত্যুর পর তিনি এন্টনীর সহায়তায় নিজের সাম্রাজ্যকে আবারো কন্টকমুক্ত করেন। উচ্চাভিলাষী ক্লিওপেট্রার পরিনতি হ্য় খুবই করুন - কোবরার বিষকে বরন করতে হয় তাকে। তার মৃত্যুর সাথে শেষ হয় ফারাও বংশের ইতিহাস।
পৃথিবীর ইতিহাসে ক্লিওপেট্রাকে সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী হিসেবে গন্য করা হয় তবে তিনি একমাত্র নারী রাজনীতিবিদের উদাহরন নন। আরো বহু ক্ষমতাবান নারীর উদাহরন অতীত ও বর্তমানের রাজনীতিতে উপস্থিত রয়েছে। এমন কি ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাস নারীর গৌরবময় পদচারনায় সমৃদ্ধ। ইসলাম পরবর্তী যুগে নারীর রাজনীতি সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ঘটনাটি বোধ করি জামাল যুদ্ধ। জামাল যুদ্ধের একাংশের নেতৃত্ব দেন আয়েশা (রা)। জংগে জামাল যুদ্ধে হযরত আয়েশা (রা) র অংশ গ্রহন ছিল বেশ চ্যালেন্জ্ঞিং। তিনি, তালহা (রা), যুবাইর (রা) সহ বিপুল সাহাবাদের সহায়তা পেলেও তাকে মোকাবেলা করতে হয় প্রচুর প্রভাবশালী প্রতিপক্ষ সাহাবাদেরকে। এদের একজন ছিলেন আম্মার বিন ইয়াসির (রা)। তিনি আলী (রা) এর পক্ষে ছিলেন এবং তার স্বপক্ষে অবস্থান নেবার জন্য মানুষদের আহ্বান করতেন। তার বক্তব্য ছিল, "আমি নিশ্চিতই জানি জীবনে ও মরনে আয়েশা আল্লাহর রাসুলের সহধর্মিনী। কিন্তু আল্লাহ দেখতে চান তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, নাকি আয়েশার আনুগত্য কর?"
যুদ্ধের ময়দানে তুমুল যুদ্ধের এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে আলী (রা) বুঝতে পারেন আয়েশা (রা) এর উপস্থিতিই তার পক্ষের সৈন্যদেরকে দিচ্ছে পুনর্জীবনী শক্তি। সৈন্যরা পিছু হঠে গেলেও আয়েশা (রা) এর ঘোড়া দেখে আবার উজ্জীবিত হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন এই ঘোড়া থাকা অবস্থায় যুদ্ধ বন্ধ হবার কোন সম্ভাবনা নেই। তিনি ঘোড়ার পা কেটে দেবার সিদ্ধান্ত নেন। পা কাটা ঘোড়া মাটিতে বসে পড়ে। আয়েশা (রা) এর পক্ষের সৈন্যরা ছত্রভংগ হয়ে যায় ঘোড়া না দেখতে পেয়ে। নানা রকম গুজব ভাসতে থাকে। মনোবল ভেংগে যায় সৈন্যদের। পরাজিত আর বন্দিনী হন আয়েশা (রা) এবং তার পক্ষের সবাই।
এই যুদ্ধে অংশ গ্রহনের মাশুল হযরত আয়েশা (রা) কে গুনতে হয় ভাল মতন। তিনি বিতর্কিত হয়ে যান। আলী (রা) উনার সম্পর্কে বলেছিলেন, আয়েশা (রা) এই যুদ্ধে অংশ গ্রহন দ্বারা শরিয়া লংঘন করেছেন কারন আল্লাহর রাসুলের স্ত্রীদের জন্য কোরানের আয়াত "তোমরা ঘরে অবস্থান করবে।" লংঘিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী কালের ইসলামী চিন্তাবিদরা এক বাক্যে দাবী করেন, না। এর দ্বারা শরিয়া লংঘন হয় নি। যা হোক, এই যুদ্ধ উনাকে চরম বিতর্কিত করে তোলে।
জামাল যুদ্ধে অংশ গ্রহনকারী একজন সাহাবা আবু বাকরা। তিনি যুদ্ধ করেন আয়েশার পক্ষে। তার একটি হাদীস বেশ বিখ্যাত, "যে জাতি নারীর উপর শাসনভার অর্পন করে সে জাতির উন্নতি হয় না।" এই হাদীসটা নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা করতে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। কিন্তু আবু বাকরা (রা) কেন এই হাদীস জানা সত্ত্বেও আয়েশা(রা)র পক্ষে যুদ্ধ করলেন? সে প্রশ্নই এই হাদীসের মর্যাদাকে দুর্বল করে দেয়।
মুসলিমদেরকে হাজার বার নারী নেতৃত্ব বিরোধী সবক দেয়া হলেও মুসলিমরা নারী নেতৃত্বকে কখনই অস্বীকার করে নি। মুসলিম সাম্রাজ্যে যে নারী রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশী সফলতা পেয়েছেন তিনি হলেন ইলতুতমিশের কন্যা রাজিয়া। রাজিয়া একজন সুশাসিকা ছিলেন। ইলতুতমিশ দিল্লির বাইরে গেলে রাজিয়াকে মসনদের দায়িত্ব দিয়ে যেতেন। যেহেতু পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ভোগবাদী ছিলেন, ইলতুতমিশ রাজিয়াকে মনোনীত করেন তার মেধা ও যোগ্যতার প্রক্ষিতে। কিন্তু রাজিয়া তার অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন নি রক্ষনশীলদের বাধার কারনে। তার মধ্যে একটি ছিল অমুসলিমদের জন্য জিজিয়া কমানো। রাজিয়া রক্ষনশীলদের বাধা পাওয়ার অন্যতম কারন তার স্কার্ফের প্রতি অনীহা। তিনি মুসলিম সুলতানাদের প্রথাগত চাদর পড়েন নি। এক যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে রাজিয়ার পতন ঘটে।
একালের নারী শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে সফল বোধ করি গোল্ডা মেয়ার। তিনি ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বপ্ন দ্রষ্টা ডেভিড বেন গারেনের ছিলেন ডান হাত। বুদ্ধিমতী গোল্ডা বুঝতে পারেন আরবদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের জয়লাভ একমাত্র সম্ভব যদি আরবদের মধ্যে বিভেদকে জাগিয়ে তোলা যায়। যেহেতু আরব বিশ্বে গনতন্ত্র নেই এবং এসব দেশের রাজারা ভোগ বিলাসী, তাই বিভেদের কাজটা কঠিন হলেও অসম্ভব যে নয়, বুদ্ধিমতী গোল্ডা তা ভালই বুঝতে পারেন। সে লক্ষ্যে অবিচল থেকে তিনি জর্ডানের রাজার সাথে গোপনে দেখা করেন। জর্ডানের রাজা তাকে অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। গোল্ডা তাকে জবাব দেন, "২০০০ বছর ধরে কি আমরা অপেক্ষা করছি না?" গোল্ডার মিশন সফল হয় এবং ইসরাইল পৃথিবীর বুকে বৈধ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গোল্ডা দায়িত্ব পালন করেন।
এতো গেল বাস্তবের নারী রাজনীতিবিদদের কথা। বাস্তবের বাইরে কল্পনার রাজনীতিও নারীর উপস্থিতিতে মূখর। আমি এর আগের পর্বে আমি আদিম কালের রাজনীতিতে ক্লিওপেট্রার মত অপরিসীম ক্ষমতাধর নারীর উদাহরন টেনেছিলাম। কিংবদন্তী রাজনীতিতে অতীতের আরেকজন আলোচিত নারী ছিলেন ট্রয়ের হেলেন। ক্লিওপেট্রা বাস্তবের নারী হলেও, ট্রয়ের হেলেন একজন মিথ, বা কাল্পনিক চরিত্র। কল্পনার হলেও হেলেন আলোচিত হয়েছেন ক্লিওপেট্রার মতই। কিন্তু ক্লিওপেট্রা ক্ষমতাধর, আর হেলেন ছিলেন ক্ষমতাহীন। প্যারিসের সাথে গৃহত্যাগ করলেও তিনি ট্রয়ের রাজ পরিবারে ছিলেন কার্যত বন্দী। প্যারিসসহ ট্রোজানরা যুদ্ধে জড়ান তাদের আত্মম্ভরিতার জন্য। হেলেন একটা অজুহাত মাত্র। অবশেষে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্পার্টানরা জয়লাভ করলে, স্পার্টার রাজা মেনেলিস হেলেনকে আবারো স্ত্রী হিসেবে ঘোষনা দেন। হেলেন ফিরে যান মেনেলিসের প্রাসাদে। হেলেনের শেষ জীবন ক্লিওপেট্রার মতই করুন। তাকেও বেছে নিতে হয় আত্মননের পথ। ৩৮ বছরের পরাজিতা ক্লিওপেট্রা আত্ম হননের সিদ্ধান্ত নেন যখন বিজয়ী অক্টেভিয়ান তাকে নগরীতে চুনকালি মেখে জনসম্মুখে অপমানজনকভাবে ঘোরানোর পরিকল্পনা করেন। অন্যদিকে হেলেনকে উৎখাত করেন তার সৎপুত্র এবং তিনিও আত্মহননের পথ বেছে নেন।
বাস্তব, কিংবা মিথ - কোনটাতেই রাজনীতি নারী শুন্য ছিল না। আগামীকালের পৃথিবীও সেরকম হবে বলেই আমার বিশ্বাস। সময়ই বলবে সে বিশ্বাস কতটুকু সঠিক।
(এই লেখার মন্তব্য মডারেটেড)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

