না, ধন্যবাদ নয়, রইল হৃদয় নিংড়ানো অব্যক্ত শুভ কামনা
১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৮ সকাল ১০:৫৭
ধড়াম করে মাঝারী সাইজের একটা খাদে গাড়ীটা পড়ল। দুলে উঠল পুরো গাড়ী। আমি ভয় পেয়ে আতকে উঠলাম। হায় হায়। চাকা কি পাংচার হল? চাকা পাংচার হলে বাসায় যাব কি করে?
কিছুদুর ড্রাইভ করে বুঝলাম আমার আশংকা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। চাকা পাংচার হয়েছে মাঝ রাস্তায়। একটা ঠান্ডা শীতল স্রোত আমার ভেতর দিয়ে বয়ে গেল। কি করে বাসায় ফেরব এবার। এই এক বছরের কম বয়েসী মেয়ে নিয়ে? সাড়ে পাচের ছেলে নিয়ে?
কোন মতে রাস্তার একপাশে গাড়ীটা পার্ক করলাম। আল্লাহ আল্লাহ করে পার্স চেক করলাম। "ট্রিপল এ"র কার্ডটা পাওয়া যায় যদি। সেটা পাওয়া গেলে তাও একটা গতি হয়। সেক্ষেত্রে ওদের কল করে গাড়ীর একটা হিল্লা করা যায়। কিন্তু হতাশ হলাম। নাহ, কপাল সব দিক দিয়ে খারাপ। পার্সে কার্ড নেই। কার্ডটাও ফেলে এসেছি। এমন কি সেল ফোনও আনিনি। আহাম্মকীর চূড়ান্ত।
মাথা ঠান্ডা রেখে ভাবতে চাইলাম। কি করতে পারি এখন? দেখলাম, একটা অসম্ভব সম্ভাবনাই শুধু সামনে একমাত্র অপশন। হেটে কারো বাড়ী যাওয়া। সবচেয়ে কাছের যে প্রতিবেশী তার বাসায় যেতেও কমপক্ষে আধা ঘন্টা নেবে। এই গাড়ীবহুল ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে কি করে আমি দুই বাচ্চা নিয়ে হাটব। ভাবতে ক্লান্ত বোধ করলাম। কিন্তু উপায় নেই। সেটাই করতে হবে। রওনা হবার প্রস্তুতি নিলাম। মেয়েকে কোলে নিলাম। ছেলেকে বললাম, আমার জামা ধরে হাটতে।
শুরুর প্রস্তুতি নিতেই একটা কান্ড ঘটল। সাই করে একজন আমার পাশে এসে গাড়ী পার্ক করল। গাড়ীর দরজা খুলে বলল, "কি, চাকা পাংচার?"
"হ্যা" আমি মাথা নাড়লাম।
"তোমার স্পেয়ার চাকা আছে।"
"থাকতে পারে। আমি চেক করিনি।" জবাব দিলাম।
"চাবি দাও। ট্রাংক খুলব।"
চাবি দিলাম। সে স্পেয়ার চাকা বার করল। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, "আধা ঘন্টা লাগবে চাকা বদলাতে। অপেক্ষা কর।"
"কি বলছ? তুমি বদলাবে? এত কষ্ট করবে?"
"তুমি আমার বোনের মত। তোমার জন্য না হয় এইটুকু করলাম।"
আমাকে বিষ্ময়ে ফেলে দিয়ে সে ম্যানুয়ালী চাকা বদলানো শুরু করল!!! কি কষ্টের সে কাজটি। একটা অজানা অচেনা কারো জন্য কেউ এরকম করতে পারে - এ তো শুধু নাটক গল্পেই হয়ে থাকে। বাস্তবে কি কখনও হয়?
বাস্তবে হল। কোন উল্লেখ যোগ্য টুলস ছাড়া ম্যানুয়াল লেবারে সে স্পেয়ার চাকা লাগাল। আমি দাড়িয়ে দেখলাম। কথার ফাকে ফাকে জানলাম আফ্রিকা থেকে এখানে সে এসেছে ভাগ্যের সন্ধানে। মুসলিম। এখনও খুজছে কাজ। সুবিধা করতে পারেনি।
পেরিয়ে গেল বেশ খানিক ক্ষন। লাগানো হয়ে গেল চাকা। এবার বলল, "তুমি যাও আমি পেছনে পেছনে আসছি। আগে চালিয়েছ স্পেয়ার চাকা।"
"না।"
"তিরিশের উপরে স্পীড উঠাবে না।"
আমি মাথা নাড়লাম। আস্তে আস্তে স্টার্ট দিয়ে চালানো শুরু করলাম। ভেতরে ধুক ধুক শব্দ হতে লাগল। কতক্ষন পরে বাসায় পৌছলাম। দেখলাম, বাসায় শেষ পর্যন্ত পৌছুতে পেরেছি। কেমন অবিশ্বাস্য মনে হল।
নেমেই দেখলাম ছেলেটার গাড়ীও পেছনে এসে থেমেছে।
ধন্যবাদের কথা প্রথমে মনে এল। কিন্তু পারলাম না তাকে ধন্যবাদ দিতে। ছোট খাটো সাহায্যে ধন্যবাদ দেয়া যায়। কিন্তু জনবহুল রাস্তায় গড়ী থামিয়ে টুলস ছাড়া ম্যানুয়ালী স্পেয়ার চাকা লাগিয়ে যে ছেলে পিছে অনুসরন করে আসে আমি ঠিকভাবে পৌছেছি কিনা তা দেখার জন্য, সে ছেলেকে ধন্যবাদ জানানো যায় না। তাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম কি তা আমার জানা নেই।
এবার বাসায় ফেরার পালা। "চল আমার বাসায়", বলতে চাইলাম।
কিন্তু বাধা দিল আজন্ম লালিত সংস্কার। খালি বাসায় এই পচিশ ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলেকে নেয়া যায় না। ইতস্তত করলাম। খানিকটা ক্লান্ত, হতাশ আর হতবিহ্বল লাগছিল। শেষে আমার ভদ্রতা বোধ বিজয়ী হল। আমি বললাম, "বাসায় এসে চা খাও। ওদের বাবাকে কল দিচ্ছি। ও এখনই চলে আসবে।"
কিন্তু সমস্যার সমাধান দিল সে নিজেই।
"আমি ভীষন ব্যস্ত। স্যরি। তোমার বাসায় যেতে পারছি না।"
আমিও চাপাচাপি করলাম না। কি দরকার। সে তো আমাকে স্বার্থহীনভাবেই সাহায্য করেছে।
আবারো চাইলাম ধন্যবাদ দিতে।
পারলাম না। মুখে আটকে গেল। চেয়ে চেয়ে দেখলাম তার প্রস্থানকে।
শুধু হৃদয়ের ভেতরটাতে রয়ে গেল এক অপরিসীম কৃতজ্ঞতাবোধ। যার প্রকাশ শুধু নীরব প্রার্থনায়। হে করুনাময়, তুমি তোমার অপরিসীম করুনাধারা তার উপরে ঢেলে দাও। তোমার অনুগ্রহে তাকে সিক্ত কর।
লেখক বলেছেন: আমারও সেরকম হয়েছিলো। কখনও কখনও কথা খুজে পাওয়া যায় না।
লেখক বলেছেন: অন্তত একজনকে দেখেছিলাম যে সত্যিই এই বিশ্বাস হৃদয়ে লালন করে।
সাহোশি৬ বলেছেন:
কোথায় থাকেন আপনি?ভালো কথা মনে করিয়েছেন। AAA এর মেম্বার হতে হবে। সমস্যা হলো দেখা যাবে $৫০ / ৬০ দিয়ে এক বছর মেম্বার থাকব, গাড়ী ভালোই চলবে, যে মাসে মেম্বারশিপ শেষ হয়ে যাবে তার পরের মাসেই কিছু একটা ঘটবে।
কিছুদিন পরপরই আমাকে চাকা বদল করতে হয়। একবার একদম নতুন গাড়ী কিনে বউ বাচ্চা সহ লাস ভেগাস গেলাম, সেখানে টায়ার পাংচার, বলুন কেমন লাগে? লাস ভেগাস আর ঘোরাই হলো না।
লেখক বলেছেন: আমারও এরকম হয়েছে। এক জায়গায় বেড়াতে গিয়ে নূতন গাড়ীর চাকা পাংচার। কি যে ঝামেলা। অবশ্য প্রবাসে কি ঝামেলার কমতি আছে।
ঘাসফুল বলেছেন:
অরজিনাল দুই পায়া রে .....
লেখক বলেছেন: আমারও তাই মনে হয়।
পারভেজ বলেছেন:
মানুযের উপর বিশ্বাস রাখতে পারাটা বড় একটা প্রশান্তির ব্যাপার। সেই সাথে ভবিষ্যতের জন্য একটা সাবধানতারও শিক্ষা পেলেন। এরপর কি আর এমন হয়েছিল?
লেখক বলেছেন: ফ্লাট টায়ারের সমস্যা আর হয় নি। তবে বরফে গাড়ী আটকে গিয়েছিল। তবে সেখানে অনেকের গাড়ী আটকে যাওয়ায় সাহায্য পেতে অসুবিধা হয় নি।
মেহরাব শাহরিয়ার বলেছেন:
যারা তাঁর উপর ভরসা রাখেন , তিনি তাদের ভরসার প্রতিদান দেন
লেখক বলেছেন: ঠিক তাই। তিনিই বিপদের বন্ধু।
হলদে ডানা বলেছেন:
পড়লাম। ভাল লাগলো আবারো। আগেই পড়েছিলাম।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আবার পড়ার জন্যে।
বিবেক সত্যি বলেছেন:
"তুমি আমার বোনের মত। তোমার জন্য না হয় এইটুকু করলাম।" -উফ, কী সুন্দর মনের মানুষ... !!!হে করুনাময়, তুমি তোমার অপরিসীম করুনাধারা তার উপরে ঢেলে দাও। তোমার অনুগ্রহে তাকে সিক্ত কর। - আমিন...
লেখক বলেছেন: আমিন।
লেখক বলেছেন: মানুষটি বাইরে থেকে আসা বলেই হয়ত বা এখনও পুরো যান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারেনি।
ঠিক এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটে বলেই বা এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটার লোভেই আমি, অন্তত আমি বেঁচে থাকতে চাই।
সুন্দর কিছু স্মৃতির জন্য খুব লোভ হয়।
লেখক বলেছেন: চমৎকার মন্তব্য। তার চেয়ে বড় কথা অনেক দিন পরে দেখলাম। কি যে ভাল লাগল।
এবারে নিয়মিত দেখতে চাই।
ফারজানা মাহবুবা বলেছেন:
আপু, এখানে সেদিন আমাদের এক পরিচিত'র চাকা রাস্তার মাঝখানে এরকম পাংচার হয়ে গিয়েছিল। বেচারা নিজে নিজে অনেক্ষন চেষ্টা করেও পারছিলেন না। ওদিকে আবার রাস্তার মোড়ে আড্ডা মারছিলো লেবানিজ পোলাপাইন। এই লেবানিজ ছেলেগুলোকে সবাই খুব ভয় পায়। কারন চান্স পেলেই এরা হাইজ্যাক করে। ...একটু পর দেখা গেলো লেবানিজগুলো দল বেঁধে ওনার দিকে আসছে! ওনিতো ভয়ে... একদিকে গাড়ী নষ্ট, নির্জন রাস্তা, আরেকদিকে এই বিপদ! ... কিন্তু হলো কী জানেন? ঐ পুরা দল মিলে মাত্র চার/পাঁচ মিনিটে গাড়ী ঠিক করে দিলো!! তারপর বললো- নাউ ইউ গট ইট ব্রাদার!
এখন ওনি লেবানিজদের কথা উঠলেই বলেন- 'এই বদনাম করবানা, ওরা হইলো আমগো ব্রাদার!'
লেখক বলেছেন: এ তো আরো বেশী চমৎপ্রদ অভিজ্ঞতা।
শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।
মু্ক্ত মানব বলেছেন:
ভালো লাগলো পড়ে। মানুষের (এবং অন্যদেরও) বিপদে এগিয়ে আসার মতো মানুষ যেন কখনো না ফুরায় এই পৃথিবী থেকে!শুভেচ্ছা নিন।
লেখক বলেছেন: আমারও একই প্রার্থনা আপনার মত।
শুভেচ্ছা আপনার জন্যেও রইল।
ত্রিভুজ বলেছেন:
একজন প্রকৃত সৎ এবং ভদ্রলোকের সন্ধান পেয়েছেন দেখা যায়......
লেখক বলেছেন: অবশ্যই। তবে তাকে দেখে মনে হল তার দেশে/পরিবারে এইরকম পরিবেশ প্রচলিত।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ জানানোর জন্য। সামহোয়ারে কিছুটা কম আসা হয়। তবে এখন সিরিজ পড়ার জন্য আসতে হবে নিয়মিত।
লেখক বলেছেন: দিল্লি বহু দূরে!!!!!
নীরব পাঠক বলেছেন:
ইমারসন বলেছেন:"মানুষকে বিশ্বাস কর সে তোমার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবে"!
লেখক বলেছেন: মানুষের মত আজব প্রানীর জন্য সব সময় তা সত্য নয়। তবে অধিকাংশ সময়েই সত্য।
ধন্যবাদ।


















