ধড়াম করে মাঝারী সাইজের একটা খাদে গাড়ীটা পড়ল। দুলে উঠল পুরো গাড়ী। আমি ভয় পেয়ে আতকে উঠলাম। হায় হায়। চাকা কি পাংচার হল? চাকা পাংচার হলে বাসায় যাব কি করে?
কিছুদুর ড্রাইভ করে বুঝলাম আমার আশংকা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। চাকা পাংচার হয়েছে মাঝ রাস্তায়। একটা ঠান্ডা শীতল স্রোত আমার ভেতর দিয়ে বয়ে গেল। কি করে বাসায় ফেরব এবার। এই এক বছরের কম বয়েসী মেয়ে নিয়ে? সাড়ে পাচের ছেলে নিয়ে?
কোন মতে রাস্তার একপাশে গাড়ীটা পার্ক করলাম। আল্লাহ আল্লাহ করে পার্স চেক করলাম। "ট্রিপল এ"র কার্ডটা পাওয়া যায় যদি। সেটা পাওয়া গেলে তাও একটা গতি হয়। সেক্ষেত্রে ওদের কল করে গাড়ীর একটা হিল্লা করা যায়। কিন্তু হতাশ হলাম। নাহ, কপাল সব দিক দিয়ে খারাপ। পার্সে কার্ড নেই। কার্ডটাও ফেলে এসেছি। এমন কি সেল ফোনও আনিনি। আহাম্মকীর চূড়ান্ত।
মাথা ঠান্ডা রেখে ভাবতে চাইলাম। কি করতে পারি এখন? দেখলাম, একটা অসম্ভব সম্ভাবনাই শুধু সামনে একমাত্র অপশন। হেটে কারো বাড়ী যাওয়া। সবচেয়ে কাছের যে প্রতিবেশী তার বাসায় যেতেও কমপক্ষে আধা ঘন্টা নেবে। এই গাড়ীবহুল ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে কি করে আমি দুই বাচ্চা নিয়ে হাটব। ভাবতে ক্লান্ত বোধ করলাম। কিন্তু উপায় নেই। সেটাই করতে হবে। রওনা হবার প্রস্তুতি নিলাম। মেয়েকে কোলে নিলাম। ছেলেকে বললাম, আমার জামা ধরে হাটতে।
শুরুর প্রস্তুতি নিতেই একটা কান্ড ঘটল। সাই করে একজন আমার পাশে এসে গাড়ী পার্ক করল। গাড়ীর দরজা খুলে বলল, "কি, চাকা পাংচার?"
"হ্যা" আমি মাথা নাড়লাম।
"তোমার স্পেয়ার চাকা আছে।"
"থাকতে পারে। আমি চেক করিনি।" জবাব দিলাম।
"চাবি দাও। ট্রাংক খুলব।"
চাবি দিলাম। সে স্পেয়ার চাকা বার করল। আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, "আধা ঘন্টা লাগবে চাকা বদলাতে। অপেক্ষা কর।"
"কি বলছ? তুমি বদলাবে? এত কষ্ট করবে?"
"তুমি আমার বোনের মত। তোমার জন্য না হয় এইটুকু করলাম।"
আমাকে বিষ্ময়ে ফেলে দিয়ে সে ম্যানুয়ালী চাকা বদলানো শুরু করল!!! কি কষ্টের সে কাজটি। একটা অজানা অচেনা কারো জন্য কেউ এরকম করতে পারে - এ তো শুধু নাটক গল্পেই হয়ে থাকে। বাস্তবে কি কখনও হয়?
বাস্তবে হল। কোন উল্লেখ যোগ্য টুলস ছাড়া ম্যানুয়াল লেবারে সে স্পেয়ার চাকা লাগাল। আমি দাড়িয়ে দেখলাম। কথার ফাকে ফাকে জানলাম আফ্রিকা থেকে এখানে সে এসেছে ভাগ্যের সন্ধানে। মুসলিম। এখনও খুজছে কাজ। সুবিধা করতে পারেনি।
পেরিয়ে গেল বেশ খানিক ক্ষন। লাগানো হয়ে গেল চাকা। এবার বলল, "তুমি যাও আমি পেছনে পেছনে আসছি। আগে চালিয়েছ স্পেয়ার চাকা।"
"না।"
"তিরিশের উপরে স্পীড উঠাবে না।"
আমি মাথা নাড়লাম। আস্তে আস্তে স্টার্ট দিয়ে চালানো শুরু করলাম। ভেতরে ধুক ধুক শব্দ হতে লাগল। কতক্ষন পরে বাসায় পৌছলাম। দেখলাম, বাসায় শেষ পর্যন্ত পৌছুতে পেরেছি। কেমন অবিশ্বাস্য মনে হল।
নেমেই দেখলাম ছেলেটার গাড়ীও পেছনে এসে থেমেছে।
ধন্যবাদের কথা প্রথমে মনে এল। কিন্তু পারলাম না তাকে ধন্যবাদ দিতে। ছোট খাটো সাহায্যে ধন্যবাদ দেয়া যায়। কিন্তু জনবহুল রাস্তায় গড়ী থামিয়ে টুলস ছাড়া ম্যানুয়ালী স্পেয়ার চাকা লাগিয়ে যে ছেলে পিছে অনুসরন করে আসে আমি ঠিকভাবে পৌছেছি কিনা তা দেখার জন্য, সে ছেলেকে ধন্যবাদ জানানো যায় না। তাকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম কি তা আমার জানা নেই।
এবার বাসায় ফেরার পালা। "চল আমার বাসায়", বলতে চাইলাম।
কিন্তু বাধা দিল আজন্ম লালিত সংস্কার। খালি বাসায় এই পচিশ ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলেকে নেয়া যায় না। ইতস্তত করলাম। খানিকটা ক্লান্ত, হতাশ আর হতবিহ্বল লাগছিল। শেষে আমার ভদ্রতা বোধ বিজয়ী হল। আমি বললাম, "বাসায় এসে চা খাও। ওদের বাবাকে কল দিচ্ছি। ও এখনই চলে আসবে।"
কিন্তু সমস্যার সমাধান দিল সে নিজেই।
"আমি ভীষন ব্যস্ত। স্যরি। তোমার বাসায় যেতে পারছি না।"
আমিও চাপাচাপি করলাম না। কি দরকার। সে তো আমাকে স্বার্থহীনভাবেই সাহায্য করেছে।
আবারো চাইলাম ধন্যবাদ দিতে।
পারলাম না। মুখে আটকে গেল। চেয়ে চেয়ে দেখলাম তার প্রস্থানকে।
শুধু হৃদয়ের ভেতরটাতে রয়ে গেল এক অপরিসীম কৃতজ্ঞতাবোধ। যার প্রকাশ শুধু নীরব প্রার্থনায়। হে করুনাময়, তুমি তোমার অপরিসীম করুনাধারা তার উপরে ঢেলে দাও। তোমার অনুগ্রহে তাকে সিক্ত কর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

