[সম্প্রতি হুমায়ূন আহমেদের বাউল ভাস্কর্য নিয়ে লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। আমার এই লেখাটি উনার লেখা পড়ার পর নিজস্ব অনুভূতির বর্ননা।]
প্রথমেই বলে রাখছি আমি হুমায়ূন আহমেদের লেখার ভীষন ভক্ত ছিলাম একটা বয়সে। বিয়ের পর পর যখন বর দেখত তার নূতন বউটি তার দিকে মনোযোগ দেবার পরিবর্তে হুমায়ূন আহমেদের বই নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়ে থাকে, তখন সে খুব বিরক্ত হত। সাহিত্যের দিকে আবার আমার কর্তার ঝোক খুব বেশী কখনই ছিল না। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ে এমন কি আছে যে সেটা নিয়ে রাতদিন পড়ে থাকতে হবে - এই ছিল তার ভাবনা। এমন কি একদিন রাগের চোটে বইসুদ্ধ ছিড়ে ফেলে। চিন্তা করুন! বাংলাদেশ থেকে আম্মা মেইল করে আমেরিকাতে আমায় বই পাঠায় আমি পড়তে ভালবাসি বলে, আর সে সেই বই বিরক্তি সহকারে ছিড়ে ফেলে!! বলা বাহুল্য আমার কর্তা হুমায়ূন আহমেদকে চরম অপছন্দ করতেন শুধুমাত্র আমি উনার বই গোগ্রাসে গিলতাম বলে। কিন্তু তার জন্য অতি দুঃখজনক এই বিরক্তি তাকে বয়ে নিতে হয়েছে বহু দিন, কারন তার ছোট ভাই বোনেরাও ছিল হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের পাগল।
সে অতীত কবেই ফেলে এসেছি। এখন হুমায়ূন আহমেদ নিয়ে সেই ক্রেজ আর নেই। বই পড়ার অভ্যাসও আগের মত নেই। অনেকটাই বদলে গেছি। এখনকার জীবনে আমি ধর্মাচরন মেনে চলার চেষ্টা করি। কতটুকু তাতে সফল জানি না। অন্তত মন মানসিকতা সেভাবেই তৈরী হয়ে আছে। এই মানসিকতা আমার পরিবারের সবার মাঝেই রয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে গত এক বছর ধরে ছেলে পড়ছে হিফজ। মেয়েও স্কার্ফ পড়ে যায় পাশের ইসলামিক স্কুলে পড়তে। সাধারন ধর্মভীরু একটি পরিবার, যাদের কর্মকান্ডে ধর্ম মিশে থাকে ওতপ্রোতভাবে। যে পরিবারে গানের ক্যাসেট বাজে না, বাজে কোরানের ক্যাসেট।
সম্প্রতি দেশে বাউল ভাস্কর্য সরানো হল। পত্র পত্রিকাসহ বিভিন্ন সংগঠনের মাঝে চলছে তুমুল আলোচনা। খুব স্বাভাবিক। কারন এটা ঠিক বাউলের মূর্তির উপর দিয়ে একা যায় নি। গিয়েছে পুরো ভাস্কর্য শিল্পের উপর। কারন এর ফলে যে প্রশ্নটি হুমকি দিয়ে মাথা তুলে দাড়িয়েছে তা হল: মুসলিম দেশে বাউল ভাস্কর্য আসলে কতটা নিরাপদ।
প্রশ্নটা খুব যৌক্তিক। কারন আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা জানি একটি দেশের সংস্কৃতি সে দেশের মানুষের মন মানসিকতা দিয়ে অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। মুসলিমদেশ গুলোতে ধর্ম জেকে আছে অনেক বেশী প্রতাপ নিয়ে। যদিও ধর্মীয় নেতাদেরকে মানুষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মর্যাদা দেয় নি, তবুও রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব সুষ্পষ্ট। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধর্মের ভূমিকাকে আমরা অস্বীকার করতে পারে না। তাই যদি হয়, তবে কি ভাস্কর্য শিল্পের কোন ভবিষ্যত আমাদের মাঝে নেই?
এটা একটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে ইসলাম পৌত্তলিকতাকে অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাদীসে কোরানে সব জায়গাতেই এর প্রতিফলন স্পষ্ট। এতবেশী মূর্তি বিরোধী বর্ননা রয়েছে যে, মুসলিম মাত্রই হয়ত ধরে নেবেন ইসলাম চিত্র, মূর্তি - এসবের চরম বিরোধী। সেরকম ধারনা পাওয়া বিচিত্র কিছু নয়, বরং স্বাভাবিক। যার ফলশ্রুতিতে আজকে যারা ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনে রয়েছেন তারা এইসব সাধারন ধর্মভীরু মানুষের সমর্থন যে পাবেন - তাতে সন্দেহ নেই। কারন এইসব ধর্মভীরুরাও বিশ্বাস করে বসে আছেন ইসলাম মূর্তির ব্যপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয়। চিত্র শিল্পকে নিরুৎসাহিত করে।
হুমায়ূন আহমেদের লেখাটি ছোট। এটি ইসলামের কোন বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করে না। কারন ইসলামের কোন বিধান প্রতিষ্ঠিত করতে চাই ব্যপক গবেষনা, ব্যপক অনুসন্ধান। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি স্বীকার করছি, উনার লেখাটি আমার মনে একটি বিরাট প্রশ্ন একে দিয়েছে। পবিত্র কাবায় মা মেরীর ছবি প্রতিষ্ঠিত ছিল এত বছর !!!!!!!!!!!!!! এটা কতটুকু সত্য!!! তাহলে আমরা যে জানি "যে ঘরে প্রানীর ছবি থাকে সে ঘরে ফেরেশতা পর্যন্ত আসে না" - এই জানা কতটুকু সত্য? কাবায় যদি মা মেরীর ছবি থাকতে পারে তবে সাধারন ছবিতে নিষেধাজ্ঞা কি করে আসতে পারে?
এই প্রশ্নটুকু দিয়ে বিশাল এক সংশয় অন্তত তিনি তৈরী করে দিয়েছেন আমার ভেতরে। তার লেখা থেকে প্রাপ্ত এই তথ্যটা আমাকে আরেকবার ভাবতে বাধ্য করল। আমি হয়ত আবারো বসব পড়ার জন্যে, জানার জন্যে। আগে চিত্র শিল্পের প্রতি যে মনোভাব ছিল, সেই একই মনোভাব এখন আর হয়ত থাকবে না। সেজন্যে উনাকে ধন্যবাদ জানানোটা প্রয়োজন বোধ করছি।
সেই সাথে আপনাদেরকেও ধন্যবাদ পোস্ট পড়ার জন্যে
[এ ব্যপারে ইনকিলাবে একটি প্রতি উত্তর লেখা ছাপা হয়েছে যাতে মা মেরী ছবি রাখা সংক্রান্ত সেই হাদীস বেত্তাকে অগ্রহনযোগ্য দাবী করা হয়েছে। Click This Link ]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

