৯১ এর নির্বাচনই বাংলাদেশে আমার দেখা সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য নির্বাচন। সেটা এজন্য যে, সেটাই প্রথম নির্বাচন ছিলো যেটাতে সাধারন ভোটাররা লাইন ধরে ভোট দিতে পেরেছে। এর আগে ছিলো ভোটকেন্দ্র দখলের রাজনীতি। সেসব নির্বাচনে আমাদের ভোট দেয়া বা না দেয়া - দুটোই ছিল সমান। ৯১ তে প্রথম আমরা বুঝলাম আমার ভোটের একটা গুরুত্ব রয়েছে। আমাদের ভোট নির্ধারন করে জাতীয় ইস্যু। সেবারই প্রথম আমি ভোটার হলাম এবং ভোট দিলাম।
সে নির্বাচন যে গ্রহনযোগ্য একটি নির্বাচন তাতে সন্দেহ নেই। তবে "সুষ্ঠু" কিনা তা বলতে আমার দ্বিধা আছে। কারন আমার বাসায় শুধু ভোটার হই আমরা দুইজন। আর কারো নাম ভোটার লিস্টে আসেনি। কি তাজ্জব কথা। অগুনতি মানুষ ভোটার লিস্ট থেকে বাদ!! খালেদা জিয়া এ ব্যপারে কথা বললেও শেখ হাসিনা এটা নিয়ে কোন কথা বলেন নি। ফলে তৎকালীন সরকার শাহাবুদ্দিন, যিনি সৎ এবং দায়িত্বশীল হলেও কিছুটা আওয়ামী মানসিকতা সম্পন্ন ছিলেন, তিনি বেশী নজর দেন নি এ ব্যপারে। যার ফলে চাদের কলন্কের মত সে নির্বাচনেও রয়ে যায় খুত।
৯১তে বি এন পি অপ্রত্যাশিত ভাবে জয় লাভ করে। আমরা কেউ ভাবতে পারিনি বি এন পি এভাবে বিজয়ী হবে। আওয়ামী লীগ ছায়া মন্ত্রীসভা পর্যন্ত গঠন করে রেখেছিল। হাসিনার উক্তি ছিলো, "বি এন পি ১০ টি আসনও পাবে না।" সমস্ত জরিপ সহ সবকিছু ছিল আওয়ামী লীগের অনুকূলে। আওয়ামী লীগ তৃনমূল পর্যায়ের একটি দল। অন্যদিকে বি এন পিতে জিয়ার সময়ের অধিকাংশ নেতাই এরশাদের দলে ভিড়েছিলো। ফলে নেতৃত্ব শূন্যতা বি এন পিতে ছিলো স্পষ্ট।
কেন বি এন পি সেবার জয় লাভ করেছিলো? মূল কারন, বি এন পিতে তখনও ছিল জিয়ার ইমেজ। এছাড়া বাম ধারা তখন আওয়ামী লীগে ছিল বেশ প্রভাবশালী। এখনকার চেয়ে অনেক বেশী। কারন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতন হলে সেক্যুলার মতাদর্শীরা আওয়ামী লীগে মিশে যায়। যার বিপরীতে বি এন পিকে সবাই মধ্যপন্থী দল হিসেবে জানত। ৮৬ এর নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় খালেদা জিয়ার ইমেজও ছিল বেশ শক্তিশালী। এ ছাড়া দেশ জুড়ে ছাত্রদলের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সহ সব কিছু বি এন পিকে এনে দেয় এই অপ্রত্যাশিত জয়।
সেবারের নির্বাচনের একটি স্মৃতি আমার মনে জ্বাজল্যমান। আমার ছোট কাজিন ছিল আবার আওয়ামী লীগের সমর্থক। সারা রাত সে তার প্রার্থীর সমর্থনে পোস্টারিং, প্রচার করে খুব আশা করে আছে বিজয় দেখার জন্যে। কিন্তু আশা ভংগের বেদনা তাকে এতটাই ভেংগে দেয় যে সে রীতিমত বিছানায় পড়ে যায়। আমরা এ নিয়ে তখন সমবেদনার পরিবর্তে উল্টো হাসি তামাশা শুরু করি। পরবর্তীতে অবশ্য সে আর আওয়ামী সমর্থক থাকে নি। জয়নাল হাজারীর কীর্তিকলাপে আর তাতে হাসিনার সায় থাকায় সে আওয়ামী সমর্থন বাদ দেয়।
সেই নির্বাচন ছিলো আমাদের জন্য মাইল ফলক। ৯৬, ০১, কিংবা আজকের ০৭ এর নির্বাচন - কোনটাই ৯১ এর নির্বাচনের সমকক্ষ হবে না। এর কারন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্বপালন করেছিলেন। যেরকম দৃষ্টান্ত আর কোন দিন কারো পক্ষে রাখা সম্ভব হবে কিনা কে জানে। আদর্শিক ভাবে বিপরীত মূখী হয়েও বি এন পিকে স্বীকার করতে হয়েছে শাহাবুদ্দিনের পেশাগত সততাকে। আমরা তখন বলতাম, "শাহাবুদ্দিন যেদিন ভোট দিলেন সেদিনই তার নিরপেক্ষতা হারালেন।"
মানুষ প্রথমবারের মত নিজের ভোটের অধিকার ফেরত পায় ৯১তে। সে অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার মহড়া চলে ১৫ ই ফেব্রুয়ারীর একটি সাজানো নির্বাচনে। মানুষ অসম্ভব বিরক্ত হয় বি এন পির উপরে। এছাড়াও বি এন পি ভংগ করে অনেক প্রতিশ্রুতি, যেমন, রেডিও টিভির সায়ত্বশাসন ইত্যাদি। সন্ত্রাসের অভিযোগও অনেক সাংসদের বিরুদ্ধে ছিল। ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগকে আমরা সবাই সমর্থন দেই। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যায় সাধারন সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। চমক ছিলো এখানেও। আমরা ভাবিনি বি এন পি এত ভাল করবে। কারন বি এন পি ইমেজ সংকট ছিলো তীব্র। দীর্ঘ দিনের মিত্র জামাতও সেবার তাকে পরিত্যাগ করে। সে নির্বাচনে আরো একটা চমক ছিলো জামাত। মাত্র তিনটি আসন সেবার পায়।
৯৬-০১ এ আওয়ামী লীগ ছিলো ক্ষমতায়। এর মধ্যে ভাল কাজ বলতে ছিল বাংলাদেশে সমাজকল্যানমূলক ভাতার প্রবর্তন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা, মোটামুটি চলনসই অর্থনীতি, যা আবার শেষ ছয় মাসে অতিরিক্ত ব্যাংক লোন নেয়ায় হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত, আর বন্যা মোকাবেলা। কিন্তু প্রশাসন দলীয় করনে তারা অতীতের সমস্ত সরকারের রেকর্ড ভংগ করে। দুর্নীতি এর আগে হত আড়ালে আবডালে। কিন্তু তারা প্রথম বারের মত দুর্নীতিকে রীতিমত প্রাতিষ্ঠানিকীকরন করে। আর সবার উপরে চলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাস। ইকবালের শান্তি মিছিল থেকে গুলি বর্ষন, যাকে গাফফার চৌধুরী ক্যামেরা ট্রিক বলে দাবী করেছিলেন, জয়নাল হাজারী, শামীম ওসমান , আবু তাহেরদের সন্ত্রাস আর তাতে হাসিনার সাফাই ছিল খুব সাধারন ঘটনা। বি এন পি এসব প্রতিটা ঘটনাকে নির্বাচনী প্রচারনায় কাজে লাগায়। বি এন পির প্রচারনায় হাইলাইট হয়, প্রকাশ্য রাস্তায় পুলিশ কতৃক বি এন পি কর্মী মনি বেগমের বস্ত্র হরন এবং তাতে শেখ হাসিনার উক্তি, "এক মহিলা রাস্তায় কাপড় খুলে দিলো সেই ছবি কি করে আপনারা সাংবাদিকরা পত্রিকায় ছাপালেন", জন নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে বিরোধী দলের উপর অকথ্য নির্যাতন, ডলারের বিপরীতে টাকার ১৮ বার অবমূল্যায়ন, শেষ ছয় মাসে ব্যাংক থেকে ৫০০০ কোটি টাকা লোন, টি আই বির রিপোর্টে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে প্রথম, গনভবনকে নিজের নামে লিখিয়ে নেয়া, শিক্ষাক্ষেত্রে বই প্রদানে বিলম্ব, আওয়ামী এম পি কামাল মজুমদারের ছেলে জুয়েল কতৃক শিপলু খুন, ফুল হ্ত্যা মামলার প্রধান আসামী কাদের আওয়ামী নেতা বলে মামলার ডেট বার বার পরিবর্তন সহ আরো অনেক অপশাসনের প্রমান। সুচতুর নির্বাচনী প্রচারনা আর ঐক্যবদ্ধ থাকার ফলে ভূমিধ্বস বিজয়ের মাধ্যমে ঐক্যজোট আসে ক্ষমতায়। এটাও ছিলো আমাদের জন্য অন্যতম চমক। আমরা ভাবতে পারিনি আওয়ামী লীগের এত বড় ভরাডুবি নির্বাচনে হবে। সমস্ত জরিপ এবং ভাবনাকে মিথ্যে প্রমান করে দেয় বাংলাদেশের মানুষ।
ঐক্যজোট ক্ষমতায় এসেই হরিলুটের ভাগাভাগির মত ৬০ সদস্যের মন্ত্রীসভা করে। এসব মন্ত্রীরা পৈতৃক তালুকের মত যথেচ্ছাচার শুরু করেন। যে দুর্নীতির কথা বলে ক্ষমতায় আসে, তাতে তারাই নিমজ্জিত হয় নজীর বিহীনভাবে। এছাড়াও প্রথম দুই বছর আইন শৃংখলা পরিস্থিতি ছিলো অত্যন্ত নাজুক। নিহত হন বি এন পির ওয়ার্ড কমিশনার বিনা, নিউটন, আওয়ামী লীগের সাংসদ আহসানউল্লাহ মাস্টার, অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া, সাহিত্যিক হুমায়ূন আজাদ। ঘটে যায় স্মরনকালের ভয়ংকর সন্ত্রাসী ঘটনা ২১ শে অগাস্ট। পরবর্তীতে রেব গঠন করে শেষ দুই বছরে মোটামুটি চমৎকার নিয়ন্ত্রনে থাকে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি। প্রবল দুর্নীতি থাকলেও জোট সরকার জংগীবাদ দমন করায় সাফল্যের পরিচয় দেয়। এছাড়া জিডিপি প্রায় ৭ শতাংশে উন্নীত হয় এবং দারিদ্র বিমোচনের হারও থকে বেশ উপরের দিকে। অনেক উল্লেখ যোগ্য উন্নতি থাকলেও দুর্নীতি বি এন পি সরকারের দিকে ফিরে আসে বুমেরাং হয়ে। যার কর্মফল ভোগ করতে হয় গত দুই বছরে সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে।
এবার অবশেষে অনেক চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে আবার আসছে নির্বাচন। অনেকেই অনেক জরিপ দিচ্ছেন। বলছেন মহাজোটের সুবিধাজনক অবস্থানের কথা। অঘটন না ঘটলে মহাজোটের ক্ষমতায় যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে এদেশে আবার অঘটনটা খুব বেশী ঘটে। তাই আমার ভবিষ্যৎবানী হবে অঘটনের উপর ভিত্তি করে। সে ভবিস্যৎবানী হল: চার দলীয় জোটকে আবার ক্ষমতায় দেখার ভবিষ্যৎ বানী।
দেখা যাক, কি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


