somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্রিটিশ সাংসদ জর্জ গ্যালাওয়ের সাথে আমাদের এক সন্ধ্যা

০১ লা এপ্রিল, ২০০৯ ভোর ৫:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রবিবারের মিঠে বিকেল। হালকা রোদে সারাদিনের টিপ টিপ বৃষ্টির গুমোট ভাবটা কেটে গিয়ে চমৎকার এক আমেজ বিরাজ করছে। আজকের বিকেল আমার অন্য দশটি সাদামাটা বিকেলের চেয়ে কিছুটা আলাদা। আজ রয়েছে স্থানীয় একটি পত্রিকার ফান্ড রেইজ অনুষ্ঠান যার মূল আকর্ষন বৃটেনের সাংসদ জর্জ গ্যালাওয়ে। এ অনুষ্ঠানে উনার বক্তব্য দেবার কথা। এদিকে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য সেখানে যোগ দেয়াটা আমদের পক্ষে ছিল কঠিন। আর যাত্রাপথের দূরত্বও কিছুটা বেশী। কিন্তু গ্যালাওয়ের বক্তব্য সরাসরি শোনার ব্যকুলতা আমাদের সমস্ত প্রতিকূলতাকে দমিয়ে দিল। ছেলে মেয়ে নিয়ে আমরা পুরো পরিবার সবাই তাই রওয়ানা হলাম গন্তব্য পথের উদ্দেশ্যে। ফান্ড রেইজিং এর পুরো প্রোগ্রাম না পেলেও গ্যালাওয়ের স্পীচ যাতে মিস না হয়।

গ্যালাওয়ে শেষতক আসবেন কিনা তা নিয়ে খোদ অনুষ্ঠানের আয়োজকরা বোধ করি কিছুটা দোদুল্যমানতায় ছিলেন। তাই গ্যালাওয়ের আগমনের প্রচার যতটা করা উচিত ছিলো,আয়োজকদের পক্ষ থেকে ততটা করা হয় নি। এর আগে ব্রিটিশ সাংবাদিক ইভন রিডলী আসার সময়ে বিপুল প্রচার হওয়ায় সে সময়ের অডিটোরিয়াম ছিল লোকে লোকারন্য। এবারের অনুষ্ঠানে লোক সমাগম ভালই হয়েছিল, তবে প্রচারনা কম হওয়ায় দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসে তিল ধারনের জায়গা দখল করে রাখার পুরোনো পরিচিত দৃশ্যটা দেখা যায় নি। আর সময়টাও এবার খুব অনুকূলে ছিল না। শহরে ইয়ুথ প্রোগ্রামসহ বেশ কিছু মৌসুমী প্রোগ্রাম চলছিল । যার ফলে ইভন রিডলীর সভার মত তিলার্ধ্ব ঠাই বিহীন লোক লোকারন্য এবারকার প্রোগ্রামে হয় নি।

এদিকে অনুষ্ঠানে যাবার আগেও আমরা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম এই ভেবে যে সত্যিই কি গ্যালাওয়ে সশরীরে আসবেন, নাকি পুরো বক্তব্য হবে টেলিকাস্ট। আমার এই দ্বিধা দূর হয়ে যায় গ্যালাওয়েকে দৃঢ় পায়ে স্টেজে উঠতে দেখে। মাঝারি উচ্চতার বলিষ্ঠ এবং আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ যিনি কোনভাবেই সাধারনের নজর এড়িয়ে যান না। চাইলেও কারো পক্ষে তাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আমাদের স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত গাফফার চৌধুরী যে কি করে প্রতিদ্বন্দী উনা কিং এর পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন তা ভেবে অবাক হলাম। অবশ্য চৌধুরী সাহেবের কর্মকান্ড সব সময়ই আমাদের মত গবেটদের বোধ শক্তির বাইরে। তাই অবাক হওয়াটা নেয়ায়েৎ বোকামী ছাড়া আর কিছু নয়।

তেইশ বছর ধরে পার্লামেন্টে পাচ বারের নির্বাচিত ব্রিটিশ এম পি জর্জ গ্যালাওয়ে তার বক্তব্য শুরু করলেন "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" এবং "আস সালামু আলাইকুম" দিয়ে। মুর্হুমুহু করতালিতে পুরো অডিটোরিয়াম উল্লসিত। তিনি বলে চললেন তার অভিজ্ঞতার কথা, প্যালেস্টাইনীদের প্রতি তার অকৃপন সমর্থনের কথা। তেইশ বছর ধরে যে সংসদে তার নিয়মিত পদচারনা, সে সংসদেরই একটি বিশেষ কক্ষের পাশ দিয়ে তিনি প্রতিনিয়ত হেটে যান। এটি সেই কক্ষ যেখানে স্বাক্ষরিত হয়েছিলো বেলাফোর ডিক্লারেশন - প্যালেস্টাইনীদের জমি কেড়ে নেবার সূচনামূলক দলিল। তিনি বলছিলেন তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ তার পরিচিত অনেকেই করে থাকে। তা হল প্যালেস্টাইনীদের অধিকার সংক্রান্ত বক্তব্যের সময়ে তিনি বার বার মুসলিম শব্দটি টেনে আনেন। তিনি কৈফিয়ত দেন, যত মানুষ আজ প্যালেস্টাইনীদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তার সিংহভাগই মুসলিম । দুই একজন কোলাবোরেটর আর পাপেট ব্যতীত ১.৮ বিলিয়ন মুসলিমের সবাই একবাক্যে প্যালেস্টাইনীদের অধিকারের প্রতি সচেতন। সেজন্যেই তার বক্তব্যে তিনি মুসলিমদের কথা টানেন। ইহুদী বিরোধী তিনি নন। তবে মুসলিমদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

তার স্মৃতি কথা থেকে আমাদের বললেন তার শৈশবের কথা। তিনি যখন ছোট ছিলেন, তখন তার শিক্ষক তাকে বৃটেনের পতাকা দেখিয়ে বলেছিলেন, বৃটেনে সূর্য কখনও অস্ত যায় না। বৃটিশ সাম্রাজ্যের ব্যপকতার দিকে ছিল এই ইংগিত। বাসায় গিয়ে তিনি যখন তার আইরিশ দাদার কাছে এ ঘটনা বললেন, তার দাদা তখন জবাব দিয়েছিলেন, "গড কখনো ব্রিটিশদের বিশ্বাস করেন না। তাই তিনি তাদের অন্ধকারে রাখতে চান না।" আমরা শ্রোতারা তার এই রসিকতায় হাসলাম। ইতিমধ্যে তিনি চলে এলেন টেররিস্ট প্রসংগে - আমেরিকার বিখ্যাত ওয়ার এগেইনস্ট টেরোরিজম। আবারও শুরু করলেন গল্প। আলেকজান্ডার আর জলদস্যুর গল্প। আলেকজান্ডার এক জলদস্যুকে ভৎসনা করেছিলেন তার দস্যুতার জন্য। জলদস্যু বলেছিলেন, "আমাকে বলার আগে আপনি আপনার নিজের দিকে দেখুন। সারা পৃথিবীকে পদানত করার জন্য আপনি নিজে কি কীর্তি কলাপ করছেন? আপনি নিজেকে আজকে "এমপারার" বা যা খুশী ভাবতে পারেন। কিন্তু তাতে আপনার এসব দস্যুময় কর্মকান্ডের সাফাই হয় না।" গল্পটা উপমা হিসেবে এল আমেরিকার ইসরাইল আর প্যালেস্টাইন নীতির প্রেক্ষাপটে। গ্যালাওয়ে আরো জানালেন ওবামার প্রতি তার সমর্থনের কথা। অন্য সবার সমর্থন দেয়ার আগে তিনি তাকে সমর্থন করেন। তখনো ফক্স নিউজ তার নাম বিকৃতভাবে উপস্থাপন করত। সেই ওবামার পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারীকে এখন মোকাবেলা করতে হবে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রী লিবারম্যানকে যিনি বিশ্বাস করেন কোন আরবের ইসরাইলের পাসপোর্ট ধারন করার কিংবা দখলকৃত অংশে বসবাস করার কোন অধিকার নেই।

গ্যালাওয়ে আরো জানালেন তার গাজা সফরের কথা। একটি মসজিদ পর্যবেক্ষনের কথা। মসজিদের কমপ্লেক্সে এতিমদের জন্য একটা স্কুল ছিল যা আজ বোমা বিস্ফোরনে উড়ে গেছে। বিকল্প হিসেবে সেই মসজিদের কমপ্লেক্সে বসে বাচ্চারা এখন ক্লাশ করে। মিসাইলের চিহ্ন রয়ে গেছে মসজিদের গায়ে। সে মিসাইলগুলোতে রয়েছে "মেড ইন আমেরিকা" সিম্বল।

প্যালেস্টাইনীদের প্রতি গ্যালাওয়ে শুধু সমর্থনই ব্যক্ত করেন নি বরং যথাসাধ্য হিউম্যানিটেরিয়ান সাহায্যও করেছেন। এক বিশাল গাড়ী বহর পূর্ন বিস্কিট, ন্যাপি, হুইল চেয়ার সহ প্রচুর দ্রব্য নিয়ে তাদের দল রওয়ানা দেন এক সেইন্ট ভ্যালেন্তাইন দিনে। ১০০০০ মাইলের গন্তব্য শেষে গাজা পৌছান নবী (সা) এর জন্মদিনে। সে সাহায্য প্রতুল তবে সময়ের সাথে সাথে নিঃশেষ হয়ে যায়। তাই আমাদের প্রতি তার আহ্বান আমরাও যাতে এরকমভাবে সাহায্য নিয়ে পৌছে যাই কায়রোতে, চাপ সৃষ্টি করি যাতে হোসনে মোবারক রাফার বর্ডার খুলে দিতে বাধ্য হয়।

তিনি আরো বলেন যে তিনি কখনও হামাস সমর্থন করেন নি। ইয়াসির আরাফাতের সাথেই তার সময় বেশী কেটেছে। কিন্তু তিনি এটা বিশ্বাস করেন যে, প্যালেস্টাইনীরা তাদের শাসন নির্বাচনে সম্পূর্ন স্বাধীন। সেখানে লন্ডন কিংবা ওয়াশিংটন নাক গলাতে পারেন না।

গ্যালাওয়ে খুব বেশীক্ষন বক্তব্য দেন নি। সম্ভবত পৌনে একঘন্টার মত। তবে এই অল্প সময়টুকু তিনি আমাদের মন্ত্রমুগ্ধের করে রেখেছিলেন।
একজন মানুষ জীবনে যে এত কিছু করতে পারে তা দেখেও যেন বিশ্বাস হতে চায় না। আমার ক্লান্তিকর প্রবাস জীবনে এক টুকরো মুগ্ধতা বয়ে আনল গ্যালাওয়ের এই অনন্য অসাধারন ভাষন।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই নভেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:৩৯
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×