somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বনু কুরায়জার হত্যাকান্ড বিষয়ে একটি লেখা

০৮ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১১:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বনু কুরায়জার ৯০০ ইহুদীকে হত্যা করা হয়েছিল রাসুল (সা) এর নির্দেশে - এটা একটি প্রচলিত কথা। এরকম হত্যাকান্ডের বর্ননা অমুসলিমদের তো বটেই, বরং মুসলিমদেরকেও কিছুটা থমকে দেয়। বিশেষত ইসলাম বিদ্বেষীরা যে কোন ইস্যুতে মুসলিমদের কাবু করতে বনু কুরাইজার ঘটনা টেনে আনার সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না।

এখানে উল্লেখ্য রাসুল(সা) এবং সাহাবাদের জীবন খুব সুখকর ছিল না। আক্রমন, যুদ্ধের আশংকা ছিল নিত্য নৈমিত্যিক ঘটনা। প্রতিটি মুহুর্তে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতেন। সীরাত গ্রন্থ ইবনে ইসহাক আমার টাটকা পড়া নেই, তবে যা মনে পড়ছে তাতে ইবনে ইসহাকের বনু কুরায়জার ঘটনার বর্ননা ছিল অনেকটা এরকম (স্মৃতিচারনে ভুল থাকলে শুধরে দেবেন):


"বনু কুরায়জা সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল মুসলিমদের সাথে। মুসলিমরা আক্রান্ত হলে বনু কুরায়জা মুসলিমদের পক্ষে থাকবে এবং বনু কুরায়জা আক্রান্ত হলে মুসলিমরা তাদের পক্ষে থাকবে। কিন্তু কুরাইশরা যখন খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের আক্রমন করে তখন বনু কুরায়জা কুরাইশদের সাথে সহযোগিতা করে। খন্দকের যুদ্ধে আল্লাহর রাসুল (সা) পরীখা খনন করে রাখেন যাতে কুরাইশরা সহজে আক্রমন করতে না পারে। মুসলিমরা সেসময় বেশ অসহায় অবস্থায় পতিত হয়। কারন বহিঃশত্রু হিসেবে ছিল কুরাইশরা এবং ভেতরের শত্রু ছিল বনু কুরাইজা। আল্লাহর রাসুল(সা) দুঃখিত হয়ে আলী(রা)কে পাঠান আসল খবর নেবার জন্য। তিনি গিয়ে দেখলেন অবস্থা আসলেই মারাত্মক। বনু করায়জার তখন প্রকাশ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এই বলে যে, " না, মুহাম্মাদের সাথে আমাদের কোন চুক্তি নেই।" এদিকে মুনাফিকরা মুসলিমদের টিটকারী ইয়ার্কি শুরু করেছে, "মুহাম্মদ তোমাদের কিসরার প্রাসাদ দখলের স্বপ্ন দেখায়, এদিকে এখন তো আমরা বাথরুমেও যেতে পারছি না।" হঠাৎ এসময় শুরু হয়ে যায় প্রবল শৈত্য প্রবাহ, ঝঞ্চাবায়ু, যার ফলে কুরাইশরা বাধা প্রাপ্ত হয়। বিরূপ প্রকৃতির বিরূপতার ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়ায় সেবার কুরাইশরা আর মুসলিমদের আক্রমন করতে পারে নি। তারা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কুরাইশরা চলে যাওয়ার পরে মুসলিমরা এবার বনু কুরায়জার দুর্গ ঘেরাও করে। বনু কুরায়জা আত্ম সমর্পন করে। বনু কুরায়জার অনুরোধে রাসুল (সা) সাদ(রা)কে (যাকে তারা নিজেদের মিত্র ভাবত)তাদের ভাগ্য নির্ধারনের দায়িত্ব দেন। আল্লাহ রাসুল (সা) বনু কুরায়জার কাছে প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি সাদের বিচার মেনে চলবেন। সাদ তখন এই যুদ্ধে আহত হয়ে শয্যাশায়ী। যুদ্ধের ভয়াবহতা তিনি দেখেছেন এবং তিনি তার ভূক্তভোগী। সাদ এদের সমস্ত পুরুষ যোদ্ধাদের হত্যার নির্দেশ দেন এবং নারী শিশুদের দাসত্বের নির্দেশ দেন।"

এই ছিল ইবনে ইশহাকের ভার্সন। কোরানে সুরা আহজাবে এই ঘটনা এসেছে এভাবে:

[33:9] হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল, অতঃপর আমি তাদের বিরুদ্ধে ঝঞ্চাবায়ু এবং এমন সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলাম, যাদেরকে তোমরা দেখতে না। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।

[33:10] যখন তারা তোমাদের নিকটবর্তী হয়েছিল উচ্চ ভূমি ও নিম্নভূমি থেকে এবং যখন তোমাদের দৃষ্টিভ্রম হচ্ছিল, প্রাণ কন্ঠাগত হয়েছিল এবং তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা বিরূপ ধারণা পোষণ করতে শুরু করছিলে।

[33:11] সে সময়ে মুমিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং ভীষণভাবে প্রকম্পিত হচ্ছিল।

[33:12] এবং যখন মুনাফিক ও যাদের অন্তরে রোগ ছিল তারা বলছিল, আমাদেরকে প্রদত্ত আল্লাহ ও রসূলের প্রতিশ্রুতি প্রতারণা বৈ নয়।

[33:13] এবং যখন তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরেববাসী, এটা টিকবার মত জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চল। তাদেরই একদল নবীর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, আমাদের বাড়ী-ঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, পলায়ন করাই ছিল তাদের ইচ্ছা।

[33:14] যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সাথে মিলিত হত, অতঃপর বিদ্রোহ করতে প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং তারা মোটেই বিলম্ব করত না।

[33:15] অথচ তারা পূর্বে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।

=============================================


এবারে আসা যাক ইবনে ইসহাকের বর্ননা প্রসংগে। নিম্নোক্ত সাইটের লেখাটিতে ইবনে ইসহাকের এই ভার্সনকে দুর্বল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তথ্য সহ পুরো বর্ননা সেই সাইটে পাবেন। সময়ের অভাবে আমি অল্প কিছু শুধু অনুবাদ করে দিচ্ছি।


Click This Link




উপরোক্ত সাইটে ইবনে ইশহাকের বনু কুরায়জার ঘটনার বর্ননাকে নির্ভরযোগ্য নয় বলে দাবী করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ইমাম মালিক এবং ইমাম ইবনে হাজার দুজনেই ইবনে ইসহাকের বর্ননার বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সীরাত গ্রন্থকার যেখানে যেসব গল্প শুনেছেন তাই তুলে দিয়েছেন বলে দাবী করেন ইমামবৃন্দ। ইমাম মালিক ইবনে ইসহাক প্রসংগে বলেন, "মিথ্যাবাদী এবং জালিয়াত যে শুধু শুনে গল্প লিখে থাকে।" ইমাম মালিক ইবনে ইসহাকের সীরাত রচনার পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দেন নি।

ইবনে হাজার পরবর্তীতে ইমাম মালিকের দৃষ্টিভংগিকে সমর্থন করেন। যতটা সতর্কতা সীরাত রচনায় স্থান পাওয়া উচিত ছিল, ততটা সতর্কতা ইবনে ইসহাকের ক্ষেত্রে অবলম্বন করা হয় নি। বিশেষত: বনু কুরায়জার হত্যাকান্ড বিষয়ে কুরানে বর্ননা শুধু এটুকু: "কিতাবীদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল, তাদেরকে তিনি তাদের দূর্গ থেকে নামিয়ে দিলেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি নিক্ষেপ করলেন। ফলে তোমরা কতককে হত্যা করছ এবং কতককে বন্দী করছ। [৩৩:২৬]", যা ইবনে ইসহাকের বর্ননার সাথে তা খুব বেশী খাপ খায় না। হুয়াই ইবনুল আখতাব, কাব ইবনে আসাদ সহ অনেককে মৃত্যদন্ড দিলেও এরকম ৯০০ লোককে হত্যা করার কোন ক্লু পাওয়া যায় না। সেজন্যই ইবনে ইসহাকের বনু কুরাইজার বর্ননা সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায় না।


সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জানুয়ারি, ২০১০ সকাল ৭:২৫
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×