রেনেসা শিল্পীদের তুলিতে ইবনে রুশদ:
গত পর্বে ইসলামিক জুরিসপ্রুডেন্স বিষয়ে ইবনে রুশদের অসামান্য দখল নিয়ে আলোচনা করেছি। এ পর্বে ব্যাখা করছি ইবনে রুশদ কি করে রেনেসা চিত্রকরদের দ্বারা অমর হয়ে রয়েছেন।
উপরের বিখ্যাত ছবিটি দেখছেন তার নাম "দ্য স্কুল অব এথেন্স"। রেনেসার অগ্রদূত শিল্পী রাফায়েলের অমর সৃষ্টি। শিল্পী রাফায়েল মাত্র ২৭ বছর বয়েসে এ ছবি আকে। এ ছবিতে তিনি সেই সব জ্ঞানী গুনীদের ঠাই দিয়েছেন যারা গ্রীক চিন্তাধারাকে যুগের পর যুগ ধরে প্রবাহিত করার মাধ্যমে ইউরোপে রেনেসার স্ফুরন ঘটিয়েছেন। ১৫০৯ ক্রীষ্টাব্দে পোপ জুলিয়াসের লাইব্রেরীর জন্যে আকা এই বিখ্যাত ছবিটি এখনও ঝুলছে ভ্যাটিকানের প্রাসাদে। এই ছবিতে যে দেয়াল গুলো রয়েছে তা জ্ঞানের শক্তিকে প্রকাশ করছে। অন্যদিকে একটার পরে একটা ক্রমহ্রাসমান যে অর্ধবৃত্তগুলো রয়েছে সেগুলো প্রথমে ঈশ্বরের জ্ঞান এবং সেখান থেকে উদ্ভূত দার্শনিকদের জ্ঞানকে প্রকাশ করছে।
লিওনার্ডো দ্য ভিনসির "মোনালিসা"র মত এ চিত্রকর্মটিও রহস্যে ঘেরা। ছবির সবচেয়ে মাঝের দু'জন প্লেটো এবং তার ছাত্র এরিস্টটল, কেননা এরাই গ্রীক চিন্তাধারার মূল ব্যক্তিত্ব। প্লেটো কিছুটা বৃদ্ধ যা তাকে জ্ঞানী হিসেবে প্রকাশ করছে। অন্যদিকে এরিস্টটল তারুন্য ও প্রান প্রাচুর্যে ভরপুর। ছবিটির মূল রহস্য হল শিল্পী রাফায়েল তার ছবির গ্রীক দার্শনিকদের নাম প্রকাশ করে যান নি। শিল্পী রাফায়েল নিজের মত করে গ্রীক দার্শনিকদের একেছেন, যার ফলে পরবর্তীকালে এই দার্শনিকদের পরিচয় উদ্ধার করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাড়ায়। উদাহরন হিসেবে হাইপেশিয়ার কথা বলা যেতে পারে। এই ছবির একজন দার্শনিক হলেন আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত গনিতবিদ হাইপেশিয়া যিনি তখনকার আলেকজান্দ্রিয়াতে প্লেটোর দর্শন পড়াতেন। সেসময়টিতে প্লেটোর দর্শনকে "মূর্তিপুজারীদের চিন্তাধারা" হিসেবে আখ্যায়িত করে চার্চ এই দর্শনের বিরুদ্ধে আবস্থান নেয়। যার ফলে হাইপেশিয়া আলেকজান্দ্রিয়ার রাস্তায় আক্রান্ত হন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়। রাফায়েল ভয় পান চার্চ হয়ত এ ছবিতে হাইপেশিয়ার অন্তর্ভূক্তির প্রতিবাদ করবে। "দ্য স্কুল অব এথেন্স" কে চার্চের কাছে গ্রহনযোগ্য করার জন্যে রাফায়েল তাই হাইপেশিয়াকে আকেন ফ্রেনসেসকো মারিয়ার ছদ্মবেশে। আর প্লেটোকে তিনি একেছেন নিজের শিক্ষক লিওনার্ডো দ্য ভিনসির বেশে। পুরো ছবিটি স্বর্গীয় ভাবধারায় আবদ্ধ যদিও নানা গ্রীক দেব দেবীর উপস্থিতি রয়েছে যা চার্চের শিক্ষার বিপরীত। এই ছবির মাধ্যমে রাফায়েল চার্চকে গোড়ামী মুক্ত হয়ে জ্ঞানকে সবার উপরে স্থান দেবার ইংগিত দিয়েছেন। এটাই ছিল গ্রীক গডেস দিয়ে "দ্য স্কুল অব এথেন্স" সাজাবার উদ্দেশ্য।
এই ছবির কোথায় রয়েছেন ইবনে রুশদ? দেখুন খুজে। পেয়েছেন কি? হ্যা মোটাসোটা পীথাগোরাসের পাশে রয়েছেন ইবনে রুশদ।
ইবনে রুশদকে কেন এভাবে একেছেন রাফায়েল তা জানা নেই। তবে ইবনে রুশদ যেহেতু রেনেসার ধ্বনি পৌছে দিয়েছেন, সেজন্যে তিনি স্থান পেয়েছেন ছবিটিতে। রেনেসা শব্দটির অর্থ পুনর্জাগরন, যার মাধ্যমে প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের অন্যতম দিক নির্দেশক যুক্তিবাদ এবং র্যাশনালিজম আবার ফিরে আসে চার্চ নিয়ন্ত্রিত ইউরোপে। পুরো ষোল শতক ধরে ইউনিভার্সিটি অব প্যারিস এবং আরো অনেক স্কুলে ইবনে রুশদের ব্যাখায়িত এরিস্টটল ছিল পাঠ্যপুস্তক হিসেবে স্বীকৃত। সে কারনেই ইবনে রুশদ পশ্চিমে রেনেসার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত একজন হিসেবে সম্পৃক্ত ও পরিচিত হয়েছেন।
এরিস্টটলের ব্যাখায় ইবনে রুশদ কেন অনন্য? এর মূল কারন, জটিল এরিস্টটলিয়ানকে ইবনে রুশদই সঠিক ভাবে সহজ বোধ্য ভাষায় ব্যাখা করতে সমর্থ হন। ইবনে রুশদ তার ব্যাখায় নিজের মতামত চাপিয়ে দেন নি, বরং প্রকৃত এরিস্টটলকে তুলে ধরেছেন তার বইতে। সেখানেই ইবনে রুশদের স্বকীয়তা।
ইবনে রুশদ ছিলেন জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষক। তার জীবন ও কর্ম ছিল জ্ঞানের জন্যেই উৎসর্গীকৃত। একবার ধর্মান্ধদের হাতে কর্ডোভার লাইব্রেরী পুড়ে গেলে ইবনে রুশদ মন্তব্য করেন, "এই যাজকদের স্বৈরতার থেকে বড় স্বৈরিতা আর কিছু নেই।" ইবনে রুশদ দ্ব্যর্থ ভাষায় বলে গিয়েছেন, "যুক্তি এবং বিশ্বাস পরষ্পরের পরিপূরক, ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই।"
ইবনে রুশদকে নিয়ে রেনেসার শিল্পীদের আরো কিছু চিত্রকর্ম:
চিত্রকর্ম - ১:
উপরের ছবিটি আকেন রেনেসার সূতিকাগার ইতালীর ফ্লোরেন্সের চিত্রশিল্পী আন্দ্রে বনিটো ১৪ শত শতকে। ছবির একপাশের অর্ধ বৃত্ত প্রাচীন গ্রীক দর্শন এবং অন্য পাশের অর্ধবৃত্ত আধুনিক দর্শনকে প্রকাশ করছে। আর মাঝে চিন্তিত ইবনে রুশদ এই দুইয়ের সেতুবন্ধন।
চিত্রকর্ম - ২:
উপরের ছবিটি আকেন গিওভানি ডি পাওলো। ছবিতে ডায়াসে রয়েছেন থমাস একুইনাস - একজন প্রখ্যাত এভোরিস্ট বা ইবনে রুশদ বিশেষজ্ঞ। মাটিতে শুয়ে রয়েছেন ইবনে রুশদ। ছবিতে একুইনাসকে ইবনে রুশদকে সাধারনের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করতে দেখা যাচ্ছে। ছবিটির প্রেক্ষাপট ১২৫৫ সালে যখন ইউনিভার্সিটি অব প্যারিসে থমাস একুইনাসকে ডাকা হয় ইবনে রুশদের অনুসারীদের সাথে আত্মার প্রকৃতি নিয়ে বিতর্কের জন্য।
চিত্রকর্ম - ৩:
উপরের ছবিটিও একজন রেনেসা শিল্পী কর্তৃক আকা। পরফেরী নামক এক দার্শনিক এবং ইবনে রুশদের মধ্যে কাল্পনিক বিতর্ক।
এই ছবিগুলো পশ্চিমে ইবনে রুশদের ব্যপক প্রভাবকে প্রকাশ করে।
ইবনে রুশদের নিগ্রহের কারন:
আগেই বলেছি ইবনে রুশদ তার শেষ জীবনে নির্বাসিত হন। ইবনে রুশদ এরিস্টটলের উপর কাজ করতে গিয়ে নিচের বিষয়গুলোকে প্রাথমিক স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেন:
১। আত্মার দুটো অংশ রয়েছে - একটি অবিনশ্বর, অন্যটি নশ্বর। সমস্ত মানবজাতি অবিনশ্বর অংশ ধারন করে থাকে।
২। মহাবিশ্ব শ্বাশত।
৩। শ্বাশত সত্য ধর্ম এবং দর্শন দুটোর প্রেক্ষিতেই সত্য, তবে একটি অবস্থান কখনও ধর্মের দৃষ্টিতে সত্য হয়ে দর্শনের দৃষ্টিতে ভুল হতে পারে। আবার উল্টোটাও হতে পারে।
এই সবই তখনকার সাধারন মানুষের মনে বিরক্তি ঊৎপাটন করে। তবে ইবনে রুশদের মত একজন একনিষ্ঠ মুসলিমকে ইসলাম অবমাননার দায়ে দায়ী করা চাট্টিখানি কথাও নয়। তাই ইবনে রুশদ লিখতেই থাকলেন। ইমাম গাজালীর জবাবে লিখলেন "তাহাফুত আল তাহাফুত"। এসময়টায় তুর্কী বীর সালাদিনের হাতে জেরুজালেম বিজিত হল এবং ইবনে রুশদের চিন্তাধারাও দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে তিনি বিখ্যাত হতে শুরু করলেন।
সবশেষে তিনি প্রকাশ করলেন তার সবচেয়ে বিতর্কিত বই প্লাটোর রিপাকলিক। যে বইতে তিনি তার স্পনসর আল মোহাদ সাম্রাজ্যের অধিকারী খলিফাদের স্বৈরাচার বলে দাবী করলেন। যার ফলে খলিফা ভীষন বিরক্ত হলেন। সব মিলিয়ে ইবনে রুশদের পক্ষে আর কেউ রইল না। তাকে প্রস্তরাঘাত করা হল, দেয়া হল নির্বাসন, পুড়ানো হল বই এবং বারন করা হল দর্শন, রাজনীতি কিংবা ধর্ম নিয়ে বই লিখতে। বলা চলে তার নিগ্রহের কারন মোটামুটি দুটো: এক। গ্রীক চিন্তাধারার প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি থেকে ইসলামের অনেক বিষয়কে গ্রীক দর্শনের সাথে সম্পর্কিত করার চেষ্টা। এবং দুই। খলিফাদের তীব্র সমালোচনা করা।
(চলবে)
============================================
ইবনে রুশদ বিষয়ে কিছু কোট:
"এটা খুবই চমকপ্রদ যে প্লাটোর দিক নির্দেশনা ইবনে রুশদের কাছে ছিল গ্রহনযোগ্য ও আদরনীয়, কেননা ইবনে রুশদের জগত সীমিত ও শাসিত ছিল কোরান ধর্ম গ্রন্থ দিয়ে।" - দ্য ক্লাসিক্যাল আউটলুক (Click This Link)।
"ইবনে রুশদ শতক শতক ধরে মানুষের মনে আলোড়ন তুলেছেন। এভোরিজম ষোল শতক ধরে ছিল বিস্তৃত, প্রায় চার শতকের এই বিচরন প্রকৃতপক্ষে প্রাচীনত্ব থেকে আধুনিকত্বে উত্তরন"।
-- জর্জ সারটুন, প্রখ্যাত ইতিহাস বিদ।(http://en.wikipedia.org/wiki/Averroes)
=========================================
আগের পর্বগুলো:
ইবনে রুশদ - ১
ইবনে রুশদ - ২
=============================================
লিংক:
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


