আমার প্রিয় পোস্ট

ইরতেজা আলী এর আন্তর্জাল খেরোখাতা www.irtejaali.com/

অকথ্য এই বিবরণ, ক্ষমাহীন এই অপরাধ (আনিসুল হক)

২৫ শে মার্চ, ২০০৮ ভোর ৫:৩৫

শেয়ার করুন:                   Facebook

২৫ মার্চ কালরাতের বিবরণ পাওয়ার জন্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রের ৮ম খন্ড ঘাঁটছি। অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য ছাপা হয়েছে। এগুলো পড়ে সুস্থ থাকা অসম্ভব। রক্ত হিম হয়ে আসছে। বিবমিষা লাগছে। চোখে জল এসে যাচ্ছে। আর লিখতে পারছি না। বরং এর আগে মা উপন্যাসের জন্যে একটা বর্ণনা তৈরি করতে পেরেছিলাম, সেখান থেকে একটু ব্যবহার করি।

...শুধু ২৫ মার্চ রাতের ধ্বংসযজ্ঞ, নৃশংসতা, চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা, কামান লাগিয়ে উড়িয়ে দেওয়া ছাত্রাবাস, ছাত্রাবাস থেকে বের করে এনে কাতারবন্দী করে দাঁড় করিয়ে ছাত্রদের ব্রাশফায়ারে মেরে ফেলা, যেন তারা পিঁপড়ার সারি...গণকবর খুঁড়ে মাটি চাপা দেওয়া সেই সব লাশ, এখনো মারা যায়নি কোনো গুলিবিদ্ধ ছাত্রের মাটি চাপা পড়ে তলিয়ে যাওয়ার আগে মা বলে কেঁদে ওঠা শেষ চিৎকার, শিক্ষক-আবাসে ঢুকে নাম ধরে ডেকে ডেকে হত্যা করা শিক্ষকদের, তার শিশুসন্তানের সামনে, তার স্ত্রীর সামনে.. আর আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া জনবসতি, ভেতরে পুড়ে যাচ্ছে মা আর তার স্তনবৃন্তে মুখ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়া শিশু, ভেতরে পুড়ে যাচ্ছে বৃদ্ধ, তার মুখ থেকে এখনো শেষ হয়নি বিপদতাড়ানিয়া আজানের আল্লাহু আকবার ধ্বনি, মাংসপোড়া গন্ধে চনমনে হয়ে উঠছে বাতাস,..পুলিশ ব্যারাকে আগুন লাগিয়ে জীবন্ত দগ্ধ করে মারা বাঙালি পুলিশদের, ইপিআর ব্যারাকে হামলা চালিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে গুলি করে মারা বাঙালি ইপিআর সদস্যদের, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘেরাও করে ভেতরে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের নির্বিচারে পাখি-মারার মতো করে হত্যা করা, লাশে আর রক্তে ভেসে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গা.. ঢাকার সবগুলো পুলিশ-স্টেশনে টেবিলের ওপর উপুড় হয়ে আছে বাঙালি কর্তব্যরত কর্মকর্তার গুলি খাওয়া মৃতদেহ, দমকল বাহিনীর অফিসে ইউনিফর্ম পরা দমকলকর্মীরা শুয়ে আছে, বসে আছে, গুলিবদ্ধি হয়ে দেয়ালে আটকে আছে লাশ হয়ে...।

পাতার পর শুধু এই পৈশাচিকতার, এই আগুনের, লাশের, হত্যার, আর্তনাদের আর মানুষ মারার আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়া সৈনিকের অট্টহাসির আর মদের গেলাস নিয়ে মাতাল কন্ঠে শাবাশ শাবাশ আরও খুন আরও আগুন আরও রেইপ বলে জেনারেলদের চিৎকারে ফেটে পড়ার বর্ণনা লেখা যাবে, শত পৃষ্ঠা, নিযুত পৃষ্ঠা, তবু বর্ণনা শেষ হবে না, তবু ওই বাস্তবতার প্রকৃত চিত্র আর ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হবে না। কে-ই বা সব দেখেছে একবারে, যে অধ্যাপক ভিডিও করেছেন জগন্নাথ হলের মাঠে সারিবদ্ধ ছাত্রদের গুলি করে মেরে ফেলার দৃশ্য, তিনিও তো ঘটনার সামান্য অংশই চিত্রায়িত করতে পেরেছেন মাত্র, যে সায়মন ড্রিং বিদেশি সাংবাদিকদের বহিষ্ককার এড়িয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের রান্নাঘর দিয়ে পালিয়ে গিয়ে লন্ডনের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফে পাঠিয়েছিলেন জেনোসাইড ইন বাংলাদেশ, সাম উইটনেস অ্যাকাউন্টস, ‘হাউ ডেਆা পেইড ফর ইউনাইটেড পাকিস্তান’, তিনি নরকের বর্ণনার সামান্যই দিতে পেরেছিলেন।

২৫ মার্চ রাতে শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশে পাকিস্তানি মিলিটারি ব্যাপক গুণহত্যা চালিয়ে তোপের মুখে চিরকালের জন্য স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে। শুধু ২৫ মার্চ রাতে নয়, ২ এপ্রিল জিঞ্জিরায় যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, যেকোনো প্রত্যক্ষদর্শীর দোজখ-দেখার দুঃসহ স্নৃতি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। প্রাণভয়ে ভীত আশ্রয়সন্ধানী প্রায় লাখখানেক ঢাকাবাসী আশ্রয় নিয়েছে বুড়িগঙ্গার ওপারে। তাদের কারও কারও কাছে দেশি অস্ত্র। একটা দুটো বন্দুক। পুলিশ কিংবা ইপিআরের ফেলে যাওয়া থ্রি নট থ্রি। ভোরবেলা হঠাৎ পাকিস্তানি আর্মি লঞ্চ আর স্টিমারযোগে চলে আসে নদীর এপারে, অতর্কিতে, বাচ্চুরা টের পেয়ে পেছাতে পেছাতে সৈয়দপুরে সরে আসে, আর পেছনে তাকিয়ে দেখতে পায় আকাশে হেলিকপ্টার জেট উড়ছে, আর হাজার হাজার মানুষ পালাচ্ছে দিগ্বিদিক, আর আর্মিরা কী একটা পাউডার নাকি পাইপ দিয়ে ফুয়েল ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে, মানুষ পুড়ে যাচ্ছে আর ছুটে যাচ্ছে, ছুটন্ত মানুষ পুড়ছে, পুড়ন্ত মানুষ ছুটছে, ছুটন্ত মানুষ ফুটন্ত, জ্বলন্ত, হাজার হাজার ছুটন্ত অগ্নিকুন্ড, আর চিৎকার, পুরোটা জনপদ পুড়ছে, আর গুলি, রিকোয়েললেস রাইফেলের, আর হেলিকপটার জেট থেকে, ছুটন্ত মানুষ পড়ে যাচ্ছে, ধরাশায়ী হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষ পড়ে গেল, মরে গেল, মরে গেল তো বেঁচে গেল, অন্তত ১০ হাজার মানুষ সেদিন মারা পড়েছে জিঞ্জিরায়।

স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র অষ্টম খন্ডে সুবেদার খলিলুর রহমান এসআইয়ের বিবরণে পাওয়া যায়, “কোতোয়ালী থানার বরাবর সোজাসুজি গিয়ে বুড়ীগঙ্গার লঞ্চঘাটের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম বুড়ীগঙ্গার পাড়ে লাশ, বিকৃত, ক্ষত-বিক্ষত, অসংখ্য মানুষের লাশ ভাসছে, ভাসছে পুলিশের পোশাকপরা বীভৎস লাশ। দেখলাম বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ, বৃদ্ধা-যুবা, যুবক-যুবতী, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশুর অসংখ্য লাশ। যতদুর আমার দৃষ্টি যায় দেখলাম বাদামতলী ঘাট থেমে শ্যামবাজার ঘাট পর্যন্ত নদীর পাড়ে অসংখ্য মানুষের বীভৎস পচা ও বিকৃত লাশ, অনেক উলঙ্গ যুবতীর লাশ দেখলাম, এই পূত পবিত্র বীরাঙ্গনাদের ক্ষত-বিক্ষত যোনীপথ দেখে মনে হলো, পাঞ্জাবী সেনারা কুকুরের মত ওদের পবিত্র দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদেরকে যথেচ্ছভাবে ধর্ষণ করে গুলিতে ঝাঁজরা করে নদীতে ফেলে দিয়েছে। অনেক শিশুর ও ছোট ছোট বালক-বালিকাদের থেঁতলে যাওয়া লাশ দেখলাম। ওদেরকে পা ধরে মাটিতে আছড়িয়ে মারা হয়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অশ্রুভরা চোখে আমি লাশ দেখলাম−লাশ আর লাশ−অসংখ্য নিরীহ বাঙ্গালীর লাশ−প্রতিটি লাশে বেয়নেট ও বেটনের আঘাত দেখলাম, দেখলাম কারও মাথা চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে আছে, পাকস্থলি সমেত হূৎপিন্ড বের করা হয়েছে, পায়ের গিঁট হাতের কਲা ভাঙ্গা, ঝুলছে পানিতে। সদরঘাট টার্মিনালের শেডের মধ্যে প্রবেশ করে শুধু রক্ত আর রক্ত দেখলাম...দেখলাম মানুষের তাজা রক্ত এই বুড়ীগঙ্গা নদীর পাড়ে। এই টার্মিনাল শেড ছিল ২৫ মার্চের কালোরাত্রিতে ওদের জল্লাদখানা। ওরা বহু মানুষকে ধরে এনে ঐ টার্মিনালে জবাই করে বেটন ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে টেনে-হিঁচড়ে পানিতে ফেলে দিয়েছে। অসংখ্য মানুষকে এভাবে নদীতে ফেলে দেওয়ার পরিষ্ককার ছাপ দেখতে পেলাম সেই রক্তের স্রোতের মধ্যে। শেডের বাইরের প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখলাম অসংখ্য কাক ও শকুন মানুষের সেই রক্তের লোভে ভিড় করেছে। সদরঘাট টার্মিনাল থেকে ভারাক্রান্ত হূদয়ে বের হয়ে পূর্বদিকে পাক সেনাদের সদর আউট পোষ্টের দিকে দেখলাম নদীর পাড়ের সমস্ত বাড়িঘর ভস্ন হয়ে ওদের নৃশংসতা ও বীভৎসতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখলাম রাস্তার পার্শ্বে ঢাকা মিউনিসিপালিটির কয়েকটি ময়লা পরিষ্ককার করার ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, সুইপাররা হাত-পা ধরে টেনে হেঁচড়িয়ে ট্রাকে লাশ উঠাচ্ছে, প্রতিটি ঘর থেকে আমাদের চোখের সামনে বহু নারী-পুরুষ, বালক-বালিকা, কিশোর-শিশু ও বৃদ্ধ-বুড়ার লাশ সুইপাররা টেনে টেনে ট্রাকে উঠাচ্ছিল। পাঞ্জাবী সেনারা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কুকুরের মত নির্মমভাবে প্রহরা দিচ্ছিল। ভয়ে সন্ত্রাসে আমি আর এগুতে পারলাম না। পূর্বদিকের রাস্তা দিয়ে আমি সদরঘাটের কাপড়ের বাজারের নীরব নিথর রাস্তা ধরে সদরঘাট বেপটিষ্ট মিশনের চৌরাস্তার সম্মুখ দিয়ে নওয়াবপুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম। আমাদের কারো শরীরে পুলিশের পোশাক ছিল না...আমি এবং আমার সাথে আরও দু’জন সিপাহী সাধারণ পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করছিলাম। কাপড়ের বাজারের চারদিকে রূপমহল সিনেমা হলের সম্মুখে সর্বত্র বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য মানুষের ইতস্ততঃ ছড়ানো বীভৎস লাশ দেখলাম, বহু যুবতী মেয়ের ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখলাম। খৃষ্টান মিশনারী অফিসের সম্মুখে, সদরঘাট বাস ষ্টপেজের চারদিকে, কলেজিয়েট হাইস্কুল, জগন্নাথ কলেজ, পগোজ হাইস্কুল, ঢাকা জজকোর্ট, পুরাতন ষ্টেট ব্যাংক বিল্ডিং, সদরঘাট গির্জা, নওয়াবপুর রোডের সর্বত্র, ক্যাথলিক মিশনের বাইরে এবং ভিতরে আদালত প্রাঙ্গণে বহু মানুষের মৃতদেহ দেখলাম।

...রাজারবাগ পুলিশ লাইনে যোগদান করার পর আমরা দেখেছি পাঞ্জাবী সেনারা মিলিটারী ট্রাকে ও জীপে করে প্রতিদিন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের, ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বালিকা যুবতী মেয়ে ও সুন্দরী রমণীদের ধরে আনতে থাকে। অধিকাংশ বালিকা, যুবতী মেয়ের হাতে বই ও খাতা দেখেছি। প্রতিটি মেয়ের মুখমন্ডল বিষণ্ন, বিমর্ষ ও বিষময় দেখেছি। মিলিটারী জীপে ও ট্রাকে যখন এভাবে যুবতী মেয়েদের রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আনা হতো তখন পুলিশ লাইনে হৈচৈ পড়ে যেত, পাঞ্জাবী, বিহারী ও পশ্চিম পাকিস্তানী পুলিশ জিভ চাটতে চাটতে ট্রাকের সম্মুখে এসে মেয়েদের টেনে হেঁচড়িয়ে নামিয়ে নিয়ে তৎক্ষণাৎ দেহের পোশাক-পরিচ্ছদ, কাপড়-চোপড় খুলে তাদেরকে সম্পুর্ণভাবে উলঙ্গ করে আমাদের চোখের সামনেই মাটিতে ফেলে কুকুরের মত ধর্ষণ করতো। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ও অঞ্চল থেকে ধরে এ সকল যুবতী মেয়েদের সারাদিন নির্বিচারে ধর্ষণ করার পর বৈকালে আমাদের পুলিশ হেডকোয়ার্টার বিল্ডিং-এর ওপর তাদেরকে উলঙ্গ করে চুলের সাথে লম্বা লোহার রডের সাথে বেঁধে রাখা হতো। রাতের বেলায় এসব নিরীহ বাঙ্গালী নারীদের ওপর অবিরাম ধর্ষণ চালানো হতো। আমরা গভীর রাতে আমাদের কোয়ার্টারে বসে মেয়েদের আর্তচিৎকার শুনে অকস্নাৎ সবাই ঘুম থেকে ছেলেমেয়েসহ জেগে উঠতাম। সেই ভয়াল ও ভয়ঙ্কর চিৎকারে কান্নার রোল ভেসে আসতো, ‘বাঁচাও, আমাদের বাঁচাও, তোমাদের পায়ে পড়ি, আমাদের বাঁচাও, পানি দাও, এক ফোঁটা পানি দাও, পানি, পানি’।”

একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায় মো. সাহেব আলী নামের সুইপার ইন্সপেক্টর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সুইপার রাবেয়া খাতুন প্রমুখের বর্ণনায়। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশের আর যেসব মানুষের সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে এই দলিলপত্রের অষ্টম খন্ডে, সবখানেই একই রকম বর্ণনা, অগণিত মানুষকে গুলি করে হত্যা, আগুন জ্বালিয়ে ছারখার করে দেওয়া জনপদের পর জনপদ, আর নারীদের ওপর অকথ্য অমানবিক নির্যাতন। সেই সব নির্যাতন কখনো হয়েছে পরিবারের সদস্যদের সামনেই, কখনো বা নির্যাতনের ক্যাম্পে দল বেঁধে নারীদের বন্দী রেখে। নীলিমা ইব্রাহিমের আমি বীরাঙ্গনা বলছি বই থেকে জানা যায়, মেয়েরা যাতে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করতে না পারে, সে জন্যে তাদের শাড়ি বা ওড়না দেওয়া হতো না।

ড. মোজাম্মেল হোসেন নামের বিজ্ঞানী ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা যেসব বার্তা আদান-প্রদান করেছিল, সেটা রেডিওতে ধরে ফেলেন ও রেকর্ড করে রাখেন। পরে সেসব আকাশবাণী থেকে প্রচারিতও হয়। একটা কথোপকথন এই রকম:
কন্ট্রোল: বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আনুমানিক কতজন হতাহত হয়েছে? আনুমানিক সংখা বললেই হবে।
উত্তর আসে : তিন শর মতো।
কন্ট্রোল: চমৎকার। তিন শ-ই মারা গেছে, না কেউ বন্দী বা আহত হয়েছে?
উত্তর: আমি একটাই পছন্দ করি। তিন শ-ই মারা গেছে।
কন্ট্রোল: আমিও তোমার সাথে একমত। ওই কাজটিই সহজ। কিছুই জানতে চাইবে না। আবার বলছি, চমৎকার।

২৫ মার্চ ও তার কাছাকাছি সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আরও অনেকের সঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করে অধ্যাপক গোবিন্দচন্দ্র দেব, অধ্যক্ষ এ এন এম মনিরুজ্জামান, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. ফজলুর রহমান খান, এ মুকতাদির, শরাফত আলী, এ আর কে খাদেম, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য্য, সাদত আলী এবং এম এ সাদেককে।

অপারেশন সার্চলাইট নামের এই সেনা অভিযানের ভয়াবহতা, ব্যাপকতা, নৃশংসতার কোনো নজির নেই। এর একটাই লক্ষ্য ছিল। অস্ত্র আর আঘাত আর মৃত্যু দিয়ে জনগণের দাবিকে স্তব্ধ করে দেওয়া। পরবর্তীকালেও যে পোড়ামাটি নীতি, ঘরবাড়ি জ্বালানো, গণহত্যা ও ধর্ষণ চালানো হয়, তারও লক্ষ্য ছিল থমকে দেওয়া, ধমকে দেওয়া, গুঁড়িয়ে দেওয়া, নিশ্চিহ্ন করা, স্তব্ধ করা আর শেষতক বশীভুত করা। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে থেকে ঘোষণা করছে, অস্ত্রের মুখে জনগণের ঐক্যবদ্ধ আকাঙ্ক্ষাকে দমন করা যায় না।

আশ্চর্য যে, এত কিছুর পর যখন সমস্ত বাংলাদেশ প্রতিরোধের আর প্রতিশোধের ন্যায়যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন জামায়াত, মুসলিম লীগ আর নেজামে ইসলামী গড়ে তোলে আলবদর, আল শামস, মুজাহিদ বাহিনী আর রাজাকার বাহিনী। সমস্ত সাক্ষী অভিন্ন সাক্ষ্য দিচ্ছেন, এই বাহিনীর সদস্যরা কেবল মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের হত্যা, নির্যাতন, গ্রেপ্তার করেছে, পাকিস্তানিদের পথ দেখিয়ে দিয়েছে, তা-ই নয়, এরা মেয়েদের ধরে নিয়ে গিয়ে তুলে দিয়েছে মিলিটারিদের হাতে।

এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আবারও জেগে উঠেছে বাংলাদেশ।

ইতিহাসের এই দায়মোচন একদিন না একদিন আমাদের করতেই হবে।


লিখেছেন আনিসুল হক
আজকের প্রথম আলোথেকে নেওয়া

 

প্রকাশ করা হয়েছে: মুক্তিযুদ্ধ  বিভাগে ।

 

  • ১৫ টি মন্তব্য
  • ২৩৪ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ১১ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ ভোর ৫:৩৭
comment by: রাশেদ বলেছেন: কি আর বলবো!

চোখের পানি আটকানো যায় না এইসব যখন পড়ি।
২. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ ভোর ৫:৩৭
comment by: ইরতেজা বলেছেন: লেখাটি পড়ে খুব মন খারাপ হল। প্রায় কান্না পাচ্ছে
৩. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ ভোর ৫:৪৫
comment by: আবদুর রাজ্জাক শিপন বলেছেন: যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার চাই ।
৪. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ ভোর ৫:৪৮
comment by: রাতমজুর বলেছেন:
দুখ একটাই, আমরা ওদের মত অমানুষ হতে পারি না, গলাবাজী আর পিঠে ছুরি বসাতে পারি না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই ।
৫. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ ভোর ৬:০৭
comment by: শফিউল আলম ইমন বলেছেন: প্রথম আলোতে কিছুক্ষণ আগে পড়লাম।
এ ধরণের নির্মম, লোমহর্ষক ঘটনা পড়ে চোখে পানি আটকাতে পারি না। আমি জন্মেছি স্বাধীনতার অনেক পরে....শুধু বই পরেই বড় হয়েছি। যারা দেখেছে তাদের অবস্থা কেমন হতে পারে...মাথায়ও আসে না। ধর্ম বাচানোর দোহাই দিয়ে এরা কি করেনি....এসব ইসলামবাজদের ধরে ফাসীতে ঝুলানো দরকার।
এসব পড়ে আমার গায়ের লোম কাড়া হয়ে যায় ইচ্ছে করে আমি গিয়ে পাকিস্থানি মেরে আসি পরক্ষণে ভাবি পাকিস্থানি মারতে আমাকে পাকিস্থান যেতে হবে না দেশের রাজাকারদের ধরে ধরে গুলি করলেই পাকিস্থানি মারা হয়ে যাবে। এদের বিচার চাই, এদের যেভাবেই হোক শেষ করতে হবে, প্রয়োজনে আমরা আরেকটা যুদ্ধ করবো।
৬. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ৮:২৪
comment by: জ্বিনের বাদশা বলেছেন: +++++
৭. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ৮:৪৯
comment by: কাঙাল বলেছেন: এদের বিচার চাই, এদের অপরাধ ক্ষমাহীন
৮. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ৮:৪৯
comment by: কাঙাল বলেছেন: এদের বিচার চাই, এদের অপরাধ ক্ষমাহীন
৯. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ৯:৪৯
comment by: মেহরাব শাহরিয়ার বলেছেন: কি বীভৎস , পুরোটা শেষ করার মত শক্তি পাই না
+++++
১০. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ১০:০৩
comment by: ইয়র্কার বলেছেন: এখন কান্নার সময় নয়। হায়েনার বাচ্চাদেরকে আমরা পরাজিত করেছি। তাদের দালালরা আবারও তৎপর। এদেরকে প্রতিরোধ করুন।

গুড পোস্ট ইরতেজা।
১১. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ১১:১৮
comment by: সাগর নীল বলেছেন: দেখেন সাধীনতাকে পজীটভ চোখে দেখুন , মনে রাখবেন এইটা ছিল মুক্তির জন্য যুদ্ধ। আর বাংলাদেশ কি মুক্তিপেয়েছে ? বাংলাদেশ তো দুনিয়ার সবচেয়ে গরীব দেশ। আগে আমাদের ইকোনোমিকালি ডেভেলাপ করতে হবে। তবেই রিয়েল সাধীনতা পাব।

৭১ এ যে অপরাধগুলো হয়েছে তার বিচার তো অলরেডি হয়ে গেছে, এখন আর অইগুলি নিয়ে হা পিত্তেশ না করে আসুন দেশ গড়ার কথা বলি, আসুন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করি।
১২. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ১১:৩৪
comment by: এস্কিমো বলেছেন: এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আবারও জেগে উঠেছে বাংলাদেশ।

ইতিহাসের এই দায়মোচন একদিন না একদিন আমাদের করতেই হবে।

১৩. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ সকাল ১১:৫৬
comment by: মাহবুব সুমন বলেছেন: স্যালুট টু ইরতেজা।
খুব ছোট বেলা এই অংশুটুকু পড়েছিলাম। অনেক বছর পর আবার পড়লাম, সেই একই অনুভূতি।
১৪. ২৫ শে মার্চ, ২০০৮ দুপুর ১২:১৭
comment by: প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব বলেছেন: গুড পোস্ট ... ইরতেজাকে লাল সালাম...

এখনি যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি....
১৫. ২৬ শে মার্চ, ২০০৮ রাত ১:৪৭
comment by: ইরতেজা বলেছেন: এদের বিচার চাই, এদের অপরাধ ক্ষমাহীন

 



 


ছেঁড়া ছেঁড়া ভালবাসা, দুই চোখ ভরা সীমাহিন স্বপ্ন, অদ্ভুত সব স্মতি, একরাশ বেদনা, কঠিন বাস্তবতা, নিদারুণ অলসতা, আড্ডাবাজি, সত থাকার...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ২৬২৭০