১ম পর্ব
Click This Link
(২)
টার্বুলেন্স ক্লাসটা সকাল সাড়ে সাতটায়।পাশ করার পরের দুই বছর শিক্ষকতা করেছি। তাই ক্লাসের অন্যদিকে বসাটা আবার নতুন করে অভ্যাস করতে হল। প্রফেসর কুমার প্রথম দিনেই জানিয়ে দিলেন কোর্সটা ইন্ট্রডাকটোরি ধরনের। তাই উনি বিষেয়ের খুব গভীরে যাবেন না। ভদ্রলকের ইংলিস খুবই চমৎকার। বেশিরভাগ ইনডিয়ানদের মত বিচিত্ত্র একাটা টান নেই।
ক্লাশে সাত জন ছাত্র। সবাই নিজের পরিচয় দিল। চারজন পিএইচডি, আমি সহ আর দুইজন মাস্টার্স । দুইজন মাস্টার্স ছাত্রের একজন ইন্ডিয়ান, আরেকজন সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে। সোনিয়া নামের পিএইচডি ছাত্রী জানল এটাই তার শেষ সেমিস্টার। কোর্সটা তার নেওয়ার দরকার ছিল না। তবে বিষয়টা একটু ভালভাবে জানার জন্যে সে কোর্সটা এনরল করেছে। সে কয়েকটি টপিক্সের নাম বলে বলল ডঃ কুমার এগুলি কাভার করবেন কিনা। ডঃ কুমার জানেলেন খুব গভীরভাবে না হলেও তিনই এগুলি ছুয়ে যাবেন।টপিক্স গুলি কি তা আমি কিছুই বুঝলাম না।আমার ভরসা ইন্ডিয়ান আর সিঙ্গাপুরিয়ানটা। আমি যখন বুঝিনাই, আমে নিসচিন্ত ওরাও বুঝেনায়।পরে বুঝেছিলাম ইন্ডিয়ানটার সম্নধে আমার ধারনাটা কতটা ভুল ছিল।
ক্লাস শুরু হল এবং শেষ হল।মনে হল একটা ঘুর্নি ঝড় বয়ে গেল।আমি বোকা হয়ে গেলাম। বিন্দু বিসরগো বুঝি নাই। উনি যে সব টার্মিনোলোজী ব্যাবহার করছেন আমি তার সাথে একেবারেই আপরিচিত। জানতাম কোর্সটা আমাকে ভোগাবে তবে এই অবস্থা হবে তা কে বুঝেছিল।দেশে ভাল ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলাম। ধারনা ছিল যত কঠিন হোক না কেন ম্যানেজ করে উঠতে পারব। ইন্ডিয়ান ছেলেটাকে জিজ্ঞসা করলাম ও কিছু বুঝেছে কিনা। ও উত্তর দিল
-এ তো খুব সোজা ব্যাপার, এ বুঝব না কেন। এসব তো আমি আন্ডারগ্রাজুয়েট থার্ড ইয়ারেই শিখেছি।
আমি না পেরে জানতে চাইলাম ও আন্ডারগ্রাজুয়েট কোথা থেকে করেছে। উত্তর পেলাম,
-আই আই টি মাদ্রাজ।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। আমাদের আলাপচারিতার সময় দেখি সিঙ্গাপুরিয়ানটা খুব বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ছে। বুঝলাম ও ভাল বুঝেছে। সে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল। ওর নাম নিক। ডঃ প্যাটনের ল্যাবে কাজ করে। ফ্লুইড ম্যাকানিক্স ওর বিষয় না। ও কাজ করে স্ট্রাকচারাল ডাইমিক্স নিয়ে। তবে ওর ধারনা ও কোর্সটা খুব এনজয় করবে।
সিঙ্গাপুরিয়ানটার নাম নিক শুনে একটু অবাক হলাম।পরে শুনেছিলাম সব চাইনিজ আমেরিকায় এসে একটা আমেরিকান নাম নেয়।
আমি ক্লাস শেষে সোজা ডঃ কুমারের অফিসে। উনাকে বললাম,
-আমি তো কিছু ধরতে পারছি না। আমার কি হবে।
উনি আসস্থ করে বললেন আজকে প্রথম দিন তাই একটু আসুবিধা হতে পারে। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।বললেন এখানে যে আন্ডারগ্রাজুয়েট ফ্লুইড ম্যাকানিক্স বই পড়ানো হয় তা একটা জোগাড় করে পড়ে ফেলতে। তাহলে আর আসুবিধা হবে না। আমি তেমন কোন ভরসা পেলাম না।
আমি যাদের সাথে রুমমেট হিসাবে উঠেছিলাম তারা জন্মগতভাবে বাংলাদেশি হলেও আনেকদিন ধরে আমেরিকান হয়ে গেছেন। দুজনেই আমার থেকে বেশ বড় কিন্ত এখনও লোয়ার ডিভিসিন কোর্স নিচ্ছেন। তারা দাবী করেন তারা ম্যাথামেটিক্স ডিপার্টমেন্টে পড়েন। তাদের কে আবশ্য আমি কখনও পড়তে দেখিনা। সারাদিন গ্যাস স্টেশনে কাজ করেন আর রাত্রি বান্ধবিদের সাথে বিয়ার খান। তাদেরকে আমার খুব খারাপ লাগেনি। ভালমনের মানুষ, আমাকে আমেরিকার জীবন সম্বন্ধে আনেক পরামর্শ দেন। এই কি করা উচিত কি করা উচিত না।ভালই লাগে।
তখন আমার সারদিন চিন্তা কি করে দেশে ফোন করা যায়। আমি যখনের গল্প বলছি তখন দেশে ফোন করা খুব খরচের ছিল। দেশে লাগেনি ইন্টারনেট। প্রথম দুই সপ্তাহে ২০০ ডলারের কথা বলে ফেললাম। এরকম চলতে থাকলে মাসের শেষে না খেয়া থাকতে হবে। যদিও এখনো পেট খুব ভরে থাকে না। গাড়ী নেই, তাই বাজারে যেতে পারিনা। প্রথমদিকে এসে যা খাবার কিনে এনাছিলাম আমার রুমমেটরা সল্প সময়ে তা খেয়ে ফেলেছে। বাড়ী খাবার শুন্য। জীবনে প্রথম খাবার কস্ষ্ঠ বুঝতে পারলাম।
এর মধ্যে আমার রুমমেটরা ঘোষনা দিলেন, সেমিস্টার শুরু উপলখ্যে বাসায় পার্টি হবে। পার্টিতে কেগ আনা হবে। আমিতো মহাখুশি।ভাবলাম ভালো করে খাওয়া দাওয়া করা যাবে।
পার্টির দিন খুব হতাশ হলাম। খাওয়া বলতে কিছু চিপস। আর কেগ মানে বিয়ারের বিশাল এক ড্রাম। পার্টি মানে একদল ছেলেমেয়ে বিয়ার হাতে গল্প করছে কিম্বা নাচছে। সিগারেটের ধুয়ায় বাসা আন্ধকার হয়ে গেলাম। কাজের মধ্যে বাসা খুব এলোমেলো হয়ে গেল। আর কারা যেন বাথরুম বমি করে ভাসিয়ে দিল। পুরো তিন দিন লেগেছিলে আমাদের বাড়ী পরিস্কার করতে।
আস্তে আস্তে শীত কিছুটা কমে এল। পাতা শুন্য ক্যাম্পাসটা আদ্ভুত এক মায়াবী রুপ নিল। ভিক্টরিয়ান আর্কিটেকচারের বিশাল ক্যাম্পাসটা আমাকে সবসময় স্বপ্নের মত ছুয়ে থাকে। আমি সবকিছু মুগ্ধ হয়ে দেখি। মনটা যখন খুব খারাপ হয় তখন ক্যাম্পাসের দীর্ঘ পথ ধরে এলোমেলো হাটি। ভিষন ভালো লাগে।
এই ভালো লাগায় শুধু কাটা হয়ে বিধে থাকে টার্বুলেন্স ক্লাসটা। আমি কিছু পারছিনা, কিছুই বুঝছি না।সারদিন ল্যাবে কাজ করি, সারারাত বই নিয়ে পড়ে থাকি। কোন লাভ হয় না। মাঝে সিঙ্গাপুরিয়ান নিকের কাছে সাহায্য চেয়েছিলাম। ও এড়িয়ে গেল। ইন্ডিয়ান ছেলেটা অবশ্য খুব আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল। কিন্ত ওর সাহায্য কোন কাজে আসছে না। ওর লেভেল আমার থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে। বুজলাম নিজেকেই পারতে হবে। বুজলাম দেশে ফ্লুইড ম্যাকানিক্সের দক্ষতাটা ভাল করে গড়ে ওঠেনি। ম্যাথ ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো হলেও এই কোর্সের জন্যে অপ্রতুল। ভেবে পেলামনা এটা কি করে ঠিক করব।
দেখতে দেখতে প্রথম মিডটার্মটা এসে গেল। মহা আতঙ্ক নিয়ে পরিক্ষা দিলাম। কিছুই পারলাম না। শুনেছিলাম আমেরিকার প্রফেসররা অনেক মার্ক দেন; তাই আমার ভরসা। পরিক্ষার খাতা ফেরত পেলাম। ১০০ তে ৩৭ পেয়েছি। ডাহা ফেল। অন্য কাউকে দুখিত দেখলাম না। ধরেই নিলাম একা আমিই ফেল করেছি। লজ্জায় দুঃখে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করছিল।
অনেক মন খারাপ নিয়ে লাইব্রেরির প্রিয় জায়গাটাতে বসলাম। বাইরের আকাশ আজ বিষন্ন না। বরং শীতের মিঠে রোদে চারিদিক আলো হয়ে আছে। আমি দেশে চিঠি লিখতে বসলাম।লিখলাম জায়গাটা কি অসম্ভব সুন্দর। চিঠির শেষে লিখলাম আমি প্রথম পরিক্ষায় ১০০ তে ১০০ পেয়েছি। আমাকে প্রফেসর খুব সুনাম করেছেন।
চলবে।
কপিরাইট©২০১১ স্পার্টন
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা অক্টোবর, ২০১১ রাত ৮:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


