বিশাল ট্রেন। উঠলাম। আমাদের সঙ্গে উঠল একটা ঝামেলাও। কলকাতাতে নতুন একজন যুক্ত হওয়ায়,যাত্রীর সংখ্যা টিকেটের চেয়ে একটি বেশি। সবাই কম বেশি চিন্তিত আশু পরিনতির কথা ভেবে। যাই হোক 'সিষ্টেম' বলে যে একটা শব্দ আছে, যা বাংলাদেশে প্রয়োগ করা যায়। সেটা ইন্ডিয়াতেও সমান প্রয়োগের চেষ্টা চালানো হলো এবং কাজও হলো। ট্রেনের টিটিকে টাকা পয়সা দিয়ে ম্যানেজ করা সম্ভব গেলো। আর আমাদের সম্ভব হলো চিন্তামুক্তভাবে বোম্বে যাওয়ার।
ট্রেন চলছে। আমরা টিকেট কেটেছিলাম স্লিপার'স কেবিনের। সিট খুলে ঘুমানো যায়। একদিকে তিনজন করে। তিনতলা। আমি জানালার কাছে বসে রাতের আঁধারে বিশাল ভারতের ছিটেফোটা দেখার চেষ্টা করলাম। আমার সামনে মুখোমুখি এক ভদ্রলোক বসেছেন। আগ বাড়িয়ে পরিচিত হলেন। আমি যতটুকু পারলাম, জানার চেষ্টা করলাম তাদের দেশ সম্পর্কে। আর প্রতিবেশী দেশ সম্পর্কে তাদের ধারনা। বাংলাদেশ নিয়ে পজেটিভ কোন ধারনা নেই তার। তার ভাবনায় মারামারি আর ঝামেলার দেশের প্রতিচ্ছবি বাংলাদেশ। আমি ধারনা ভাঙ্গানোর তেমন কোন যুক্তিও পেলাম না। তাই তার সঙ্গে কথা বলার চেয়ে অন্ধকারেই ভারত দেখার দিকেই মনোযোগী হলাম।
রাতে আর কিছু দেখা গেলো না। খাবারের অর্ডার দিলাম। খাবার এলো এবং মুখে দিয়ে যে বিস্বাদ পেলাম তার ফলাফল ছিল,বাকী দিনগুলো এরকম না খেয়েই কাটাতে হয়েছিল। তবে খাবারের প্রসঙ্গে একটি জিনিসের কথা না বললেই নয় যা প্রচুর খেয়েছি তা হলো, বিশেষভাবে তৈরি লেবুর শরবত। তাদের কাছে যা ‘নিম্বু পানি’পরিচিত। গভীর রাতে ঘুমাতে গেলাম। ট্রেনে চলছে। জানালা থেকে সরে যাবার পর হালকা গরম লাগলেও রাতে এক এলাকার উপর দিয়ে যাবার সময় প্রচন্ড শীতে অবস্থা করুন হয়ে গেল।
পরদিনও ঘুম থেকে উঠে সারাদিনই জানলাম পাশে বসে ভারত উপভোগ ছাড়া আর কোন কাজ ছিলনা। দু’তিন ঘন্টা পর পর বিভিন্ন ষ্টেশনে ট্রেন থামলে আমরা নামতাম আর ছাড়লে সঙ্গে নিয়ে উঠতাম বিভিন্ন শহর আর প্রদেশের লোকাল যাত্রীদের। অদ্ভুত স্বাভাবের এই সব যাত্রীরা। দেখা যেত, তার উঠেই কোন সিট খালি পেলে ব্যাগ, স্যুটকেস রেখে বসে পড়ে। এমনকি শুয়ে ঘুমিয়েও যায়। এখানে কোন যাত্রী আছে কিনা তার কোন পরোয়া তাদের ভেতর নেই। নানারকম মানুষ দেখলাম ট্রেনে। বিশাল ভারতের কোনে কোনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই মানুষেরা মোটামুটি নিজেদের চিন্তাতেই মগ্ন থাকে। চলতে চলতে এক পিচ্চি উঠল,নাম সঞ্জয়। হিন্দি সিনেমার গান গাওয়া তার পেশা। মোটামুটি মাতিয়ে দিল চলন্ত ট্রেনের বগিটাকে। যেতে যেতে পরিচয় হলো, মহারাষ্ট্র পুলিশের এক সদস্যের সাথে। নাম, সন্দীপ। কিছুক্ষন আমার সঙ্গে কথা বলে আবার কিছুক্ষন ফোনে। ফোনে আসলে কেমন যেন জড়োসড়ো হয়ে যায়। অনুমান করলাম, ওপাশে প্রেমিকা। পরে জানা গেল ঠিকই। বললেন,সামনে বিয়ে করছেন। জিজ্ঞাসা করলাম,দাওয়াত দেবেন না ?
হ্যাঁ-জানালেন।
শুনে কেন জানি মনটা খারাপ হয়ে গেল। সন্দীপের বিয়েতো দূরে আর কয়েক ঘন্টা পরে নেমে গেলে এই সন্দীপের সঙ্গে আর কখনোই দেখা হবার সম্ভাবনা থাকবেনা। কী অদ্ভুত! জীবন আর ট্রেনকে একই রকম মনে হলো।
ট্রেন চলছেই। গ্রাম,শহর,প্রদেশ পেরিয়ে। কয়েক ঘন্টা পর পর থামছে। একেক শহর একেক রকম। প্রায় অর্ধেক পথ 'নাগপুরে' এসে ট্রেন যখন থামলো কেন জানি এখানে থেকে যেতে ইচ্ছে হলো। ষ্টেশনের চারপাশে ভালোলাগার রহস্য খুঁজলাম।
যা শেষ অবধি আর উদ্ধার করা সম্ভব হলোনা।
ট্রেন ছেড়ে দিল।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০০৯ সকাল ১০:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


