এভাবে দিন পেরিয়ে আরেকটা রাতের শেষে অবশেষে প্রায় ৩১ঘন্টা পর বোম্বে পৌঁছলাম। বোম্বে এসে গেছি ? কাঙ্খিত বোম্বে (মুম্বাই)! তারকা নগরী বোম্বে!
আমরা ষ্টেশনে নামলাম তার নাম,‘দাদার’। যাবো‘গোরেগাও’। লোকাল ট্রেন ধরতে হবে। টিকেট কেটে উঠে গেলাম লোকাল ট্রেনে। হিন্দি সিনেমাতে দেখা লোকাল ট্রেনের প্রতি আকর্ষন ছিল ব্যাপক। মজাও পেলাম। গোঁড়েগাও নেমে আমরা হেটে হেটে অনেকটা পথ পেরিয়ে উঠলাম,পূর্ব নির্ধারিত খ্রিষ্টান মিশনারীজের'সর্বদয়া'গেষ্ট হাউজে। দ্রুত রুম নিয়ে ফ্রেশ হলাম। রবি ভাইয়েরা তৈরি হলো তাদের কনফারেন্সের জন্য আর আমি তৈরি হলাম বোম্বে দর্শনের জন্য। সঙ্গী রাজীব ভাই। আমি আর রাজীব ভাই পরের দুদিন বোম্বের ট্রেন,বাস,অটোতে বোম্বের অনেকটা জায়গাই চষে বেড়িয়েছি। দুদিনে বোম্বের অনেক জায়গাগুলো চিনে ফেললাম। তারপরও আমরা খুব বেশী কিছু দেখতে অবশ্য পারিনী। সময় কম হিসেবে ট্রেনে,বাসে,অটোরিক্সাতেই ঘুরে ঘুরে দেখেছি। ট্রেনে আমরা প্রতিবারই টিকেট কাটা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তাম। বিশাল ষ্টেশন। টিকেট কাউন্টার খুঁজে পাওয়া টাফ। আর রেললাইন দিয়েও এক প্লাটফর্ম থেকে অন্য প্লাটফর্মে যাবার উপায় নেই। মুহুর্তেই সুপার ফাষ্ট লোকাল ট্রেন হাজির হয়। ওভার ব্রীজ দিয়ে যেতে হতো। বেশ কয়েক বার টিকেট কেটে হঠাত একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম। টিকেট চেক করার কেউ নেই। আর টিকেট কেউ চাচ্ছেও না। আমরা টিকেট কাটতে গিয়ে দেখতাম কাউন্টারে লাইনও নেই এবং টিকেট চাইলে কাউন্টারের লোকজন কেমন যেন অবাক হয়ে তাকায়। ভাবটা কেমন যেন ছিল। পরে অবশ্য এর অর্থ বুঝেছি। তারা হয়তো মনে মনে বলতো,বলদগুলো টিকেট কেনে কেন ?
বোম্বে কোন প্রাকৃতিক পরিবেশ শোভিত নয়,না বোম্বে কোন ঐতিহ্য লালিতভুমি। তারপরও বোম্বের একটা গ্ল্যামার আছে। আছে,তারকা খ্যাতি। এর অন্যতম প্রধান কারন হয়তো ‘হিন্দি ফিল্ম’। হিন্দী ফিল্মের সূতিকাগার বোম্বে। যে ফিল্মে এই উপমহাদেশ বুদ হয়ে আছে। 'ফিল্মসিটি' দেখার ইচ্ছে থাকলেও দেখা সম্ভব হয়নি সময়ের কারনে আর তেমন নির্ভরযোগ্য মানুষও পাওয়া যায়নি যে নিয়ে যেতে পারে। তবে তারকাদের দেখার জন্য বেশ কয়েকবার গিয়েছি‘জুহু’বীচে। শুনেছিলাম সেখানে ভোরে এবং সন্ধ্যায় জগিংয়ে আসেন তারকারা। দূর্ভাগ্য দেখা হয়নি। তবে এক অটোরিক্সা চালকের কল্যানে দেখছি ম্যাগাষ্টার অমিতাভ বচ্চনের বাড়ী।
বোম্বের সবচেয়ে স্মরনীয় অভিজ্ঞতা হচ্ছে,সেখানে বিশ্বকাপ খেলা দেখা। খেলাটা ছিল, ভারত-বাংলাদেশের। এক অসাধারন অভিজ্ঞতা। সর্বদয়া একটি খ্রিষ্টান মিশনারীজের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হওয়াতে ব্যাপক জাঁকজমকপূর্ণ বিলাসবহুল রুম থাকলেও ছিলনা কোন টেলিভিশন। পুরো প্রতিষ্ঠানে একটা মাত্র ছয় ইঞ্চি টিভি ছিল। ওই হোটেলের এক কর্মচারী রাজুর ঘরে। তাও সেই টিভি দেখতে হয়েছে জানালা দিয়ে। রাজু তার ঘরের ভিতর গিয়ে টিভি দেখতে বললেও আমাদের টিভি দেখতে হয়েছিল বাইরে থেকেই কারণ ভেতরে গেলে টিভি ঘুরিয়ে দেখতে হবে যার কারনে বাইরে থাকা সিকিওরিটি গার্ডদের এই খেলা দেখা সম্ভব হবেনা। তাই বাংলাদেশ ও ভারতের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা বাইরে থেকেই দেখেছি। একদিকে খেলা দেখছি,অন্যদিকে শুনছিলাম রাজু ও অন্যান্য ভারতীয়দের তির্যক মন্তব্য। 'তোমাদের আজ খবর আছে', 'কত রানে হারতে চাও'-জাতীয় কথা। আমরা চুপ করে খেলা দেখেছি আর আল্লাহকে ডেকেছি,একটা চমক দেখাও। চমক পেয়েছিও। যে চমকের পর রাজুদের কোন সাড়া শব্দ মেলেনি। ভারতের মাটিতে খেলা দেখছি,ভারতের বিপক্ষে দৌর্দন্ড প্রতাপে জিতেছে বাংলাদেশ। এ অনুভুতি বলা কঠিন। শুনেছিলাম,দুনিয়াকে ঘুম পাড়িয়ে তারপর বোম্বে ঘুমায়।
সেদিন দেখেছি পরাজয়ের গ্লানিতে কত দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছিল বোম্বে।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


