somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সত্তুর টাকা, সেভেন্টি ফাইভ

৩১ শে আগস্ট, ২০০৯ রাত ২:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্মার্টনেস বিষয়টা কেন যেন আমার সহ্য হয় না। নিজে স্মার্ট নয় বলেই কি না কে জানে, একবোরেই সহ্য-ই করতে পারিনা। আমার এক প্রায় বন্ধু বেবিন। স্কুল পড়াকালীন সময়ে যে গালাগালি ছাড়া কথাই বলতে পারতো না, বছর তিনেক আগে কেমন করে যেন আমাদের সবাইকে ছাপিয়ে তুমুল স্মার্ট বনে গেল। কী কথায়? কী পোশাকে? শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটা চাইনিজ শব্দ দিয়ে ফাষ্টফুড ওমিনি চাইনিজের দোকানও দিয়ে দিল।
ওই এলাকায় আড্ডা মারা সূত্রে তার দোকানে প্রায়ই 'ঢু' মারা হতো। তার দোকানে যাওয়া মূল লক্ষ্য ছিল না। নেপথ্যে ছিল, গরমের মধ্যে তার দোকানের এসি আর বন্ধুবান্ধবদের তখনো আড্ডাস্থলে আগমন না ঘটা।
তার দোকানে ঢুকলেই তার চেহারা মুবারক ছাড়া চিরায়ত বেবিন আমার কাছে অপরিচিত হয়ে যেত। কথাবার্তায় দিন বদলের ইঙ্গিত আমাকে পেরেশান করে ফেলতো। আরে বন্ধু এসেছিস? কেমন আছিস? নে একটা ড্রিংক্স খা।
উপরে হাসি মুখে থাকলেও শুদ্ধ ভাষা শুনে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার অবস্থা হতো। মনে অনেক প্রশ্নরা যন্ত্রণা করতো, এ কিরে ভাই? এতো শুদ্ধ কেন? আমি না তোর বন্ধু, বন্ধুকে এতো কষ্ট দিচ্ছিস কেন? তার উপর যেটা ড্রিংক্স বলছিস, সেটা আবার খায় কি করে?
বেবিন তার শুদ্ধতার চর্চায় নিবেদিত থাকতো। মাঝে মাঝে না পেরে বলেই ফেলতাম, এ্যাই ব্যাটা এতো শুদ্ধ মারাচ্ছিস কেন?
ফাষ্টফুড এবং মিনি চাইনিজের মালিক বেবিন আমার কথায় মোটেও বিচলিত হতো না। সে আরো স্মার্টলি আমাকে বুঝিয়ে দিতো আমার ব্যবাসার মূল ইনভেষ্ট হচ্ছে শুদ্ধ কথা। একদিন দেখাবো তোকে?
আমি আবার বিরক্ত, আবার শুদ্ধ কথা? বল, দেখামু নে।
একদিন তার ক্যাশে তার সাথে বসে এই ইনভেষ্ট এর ফলাফল দেখলাম। এক জুটি এবং সে জুটির দুই পক্ষেরই আসা বন্ধু বান্ধবদের দেখিয়ে বলল, দেখিস।
তারপর আমি শুধু তাকিয়ে রইলাম। সে বলল, তাদের ফাষ্ট ডেটিং তাই এতো বন্ধুবান্ধব। বলেই সে তার কর্মচারিকে ডাকলো, এ্যাই দেখোতো এখানে সামনের টেবিলে কী চায়? সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেও উঠে গেল। গিয়েই, ভাইয়া আমাদের কিছু স্পেশাল আইটেম আছে, আপুকে নিয়ে আজ এই দোকানে প্রথম এলেন একটু টেষ্ট করে দেখতে পারেন।
ছেলেটার মুখ শুকিয়ে গেল। শুকনো মুখ থেকে কথা বের হবার আগে সে নিজেই খাবারের অর্ডার দিল। এ্যাই ভাইয়াদের, তিনটা ওমুক পিজা দাও। পাচটা গ্রেপ জুস দাও আর দেখো কী কী লাগবে?
মেয়ের সামনে স্মার্ট হতে গিয়ে ছেলেটা নির্বাক। সঙ্গের বন্ধু বান্ধবীরা এমন একটা খবারের প্রত্যাশা নিয়ে এসে তা পূরণ হওয়ায় নিশ্চুপ আর মেয়েটা ছেলেটার বিশাল হৃদয় দেখে বাকরুদ্ধ, আরে এমন ছেলেই তো খুঁজছিলাম।
মোটামুটি দুইশ টাকার জার্নি শেষ হলো সাড়ে সাতশ টাকায়।
বেবিন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দ্যাখ এই হচ্ছে রেজাল্ট।
আমি তার কাছে নতি স্বীকার করলাম এবং নিজের আনস্মার্ট এটিচ্যুডকে ধিক্কার দিতে লাগলাম, স্মার্ট হতেও পারলি না। মানুষের স্মার্টনেস সহ্যও করতে পারিস না।
তবে এর মাসখানেক পর অবশ্য আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। নুইয়ে পড়লো বেবিন। তার অতি স্মার্টনেস নিয়ে সে তখন মহা বিপদে। যা জানলাম, ভেজাল খাবার তল্লাশীতে আসা মহিলা মেজিষ্ট্রেটকে কাষ্টমারের ল্যাঙ্গুয়েজে ভুলে আপু বলে ফেলায় নাকি ১৫ হাজার টাকা জরিমানার জালে পড়ে গেছে। খাবারে খুব বেশি খারাপ কিছু না পেয়ে মেজিষ্ট্রেট যখন চলে যাচ্ছিলেন তখনই সে বলে ফেলে আমার খাবার ভালো আপু। মেজিষ্ট্রেট কি মনে করে আবার খাবার চেক শুরু করে এবং ভালো সার্টিফাইড করা একাধিক খাবারে তখন নষ্ট বা পচাঁ বিষয়ের সন্ধান পান।
সেই জরিমানায় তার ব্যবসাও গেছে। সঙ্গে তার শুদ্ধতার চর্চাও। আজও তার সাথে দেখা হলো। কথা হলো সেই স্কুল লাইফের টোনে, কিরে কেমুন আসছ।
আমি বললাম, ভালো। তুই কেমন আছিসরে?
বেবিন বিষয়টা বুঝে হেসে দিল।

স্মার্টনেসের এমন ঘটনা অনেক দেখেছি জীবনে। আরেকবার এক মেলায় এক ছেলেকে দেখে অবাক। সে ষ্টল নিয়ে দিব্বি ইংরেজী সহযোগে নানা আইটেম বিক্রি করছে। মেলার বাইরে তার এমন চরিত্র বিরল। আমরা অবাক হয়ে তার আচরণে দেখছিলাম। কারন যে কখনো এই টোনে কথা বলেনি তার একি হাল! তার উপর ইংরেজী! ভুলভাল ইংরেজী দিয়েই সে কাষ্টমারকে মোটামুটি কাত করে ফেলছে। আমরা তার এই হঠাৎ স্মার্ট হয়ে ওঠায় ইর্ষান্বিত হয়ে তাকিয়ে ওইলাম। শালা বাইরে ইংরেজি পারে না, এখানে কয় ক্যমনে?
আকস্মিকভাবে আমাদরে হৃদয় আরো চূর্ণ করতে একদল সুন্দরী তরুণীর আগমন তার স্টলে। সে ব্যাপক শুদ্ধ কথা আর আধা আধা ইংরেজি ঝেড়ে কুপোকাত করে ফেলল মেয়দেরও। মেয়েগুলো যেন তার ফ্যান হয়ে মাথার উপর ঘুরতে লাগলো ভাইয়া ভাইয়া শব্দ করে।
হঠাৎ একটি মেয়ে একটি ছোট গিফট বক্সের দাম জিজ্ঞাসা করতেই সে ভুলে কিনা কে জানে, না অতিস্মার্টনেসের কারনে দুম করে বলল, খুবই কম দাম আপু। সত্তুর টাকা। সেভেনটি ফাইভ।
৪৬টি মন্তব্য ৪৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×