বিষয়টা যে কি হচ্ছে আমি আসলে ঠিক করে বোঝাতে পারবো না। বিষয়টা সত্যিই হচ্ছে নাকি হেলুসিনেশন? এমন প্রশ্নের জবাবও আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। তবে যা বুঝতে পারছি একজন সাইকোয়েট্রিষ্টের শরনাপন্ন হওয়া জরুরী। মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। মেয়েটা আমার সব কিছুই নষ্ট করে দিচ্ছে। আমাকে ভালো করে খেতে দিচ্ছেনা, ঘুমাতে দিচ্ছেনা। দিনের পুরোটা সময় ধরে নানা ধরনের অনুরোধ নিয়ে পেছন পেছন ঘুরছে। এ্যাই, চলো না কোথাও ঘুরে আসি। চলো না কোন রেষ্টুরেন্ট গিয়ে খেয়ে আসি। প্রথম দিকে ভালো লাগলেও, এখন ভালো লাগছে না। সবচেয়ে বড় সমস্যা, সে মেয়ের কারনে আজ সারাটাদিন নীলার সাথে প্রচুর মিথ্যা কথা বলতে হয়েছে। নীলা আমার উপর রাগ করে আছে দু'ঘন্টা হয়ে গেলো। আমি এখনো তাকে ফোন করিনি। অথচ নীলা রাগ করার মিনিটখানেকের মধ্যে ফোন কারাটা আমার জন্য ফরজ কাজ। সময়গুলো ওই মেয়েটা নিয়ে নিচ্ছে। কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা? অবস্থাটা এমন চোখ খুলেও রাখতে পারিনা, বন্ধও করতে পারিনা। চোখ খুলে রাখলে দেখি সে সামনে বসে আছে। চোখ বন্ধ করলে শুরু হয় তার ডাকাডাকি, এ্যাই ওঠোনা। কথা বলি।
২.
মেয়েটা যে কে আমি বুঝতে পারছিনা। নাম বলছে, বনলতা সেন। জিজ্ঞাসা করলাম, আমার কাছে কি চাও? প্রশ্ন শুনে কিছুটা রেগে গেল, অভিনয় করার জায়গা পাও না? আমার জন্য এতো কিছু করলে। আমাকে খুঁজতে তুমি নাটোর চষে বেড়ালে আর এখন আমি এসেছি, তুমি ভাব দেখাচ্ছ। জিজ্ঞেস করছ, কি চাই? কি চাই, এসব গল্প বলার ধৈর্য্য আমার নেই। এখন যা বলি মনযোগ দিয়ে শোন, আজ আমি তোমাকে দেখতে এসেছিলাম। কাল থেকে তোমার বাসায় উঠছি। আজ রাতে নাটোর যাবো। কালই চলে আসবো। সমস্যা নেই তো? অবশ্য সমস্যা থাকলেও আমার কিছু করার নেই, আমি সব কিছু ঠিক করে ফেলেছি।
: কি ঠিক করে ফেলেছ?
: ওসব তোমার শুনে কাজ নেই। তুমি ঠিক কর তুমি কি করবে? আমার থাকার জায়গা কর। আর ঘর এমন কেন? কি বাজে অবস্থা ঘরের।
আমি আর কোন কথা বলতে পারলাম না। সে ঘর পরিষ্কারে ব্যাস্ত হয়ে গেল। আমি তাকিয়ে রইলাম। অসম্ভব রূপবতী মেয়েটা কিভাবে কাজ করছে। আমি এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ আবার তার প্রশ্নে সম্বিত ফিরে পেলাম, ঘরে আয়না নেই?
আমি না সূচক মাথা নেড়ে বললাম, ছিল ভেঙ্গে গেছে।
: কাল একটা আয়না অবশ্যই কিনে আনবে। মনে থাকবে?
আমি সম্মতি সূচক মাথা নাড়লাম।
: তাহলে আমি যাই?
আমি হ্যাঁ না কিছুই বলতে পারলাম না। সে চলে যাচ্ছে। রাতের বাসে নাটোর যাবে। আমি তাকে এগিয়ে দিয়ে আসবো কিনা তাও বুঝতে পারছিনা। তার আগেই সে বেড়িয়ে গেল।
৩.
রাত আড়াইটা। এখনো ঘুমাতে পারছিনা। ঘটনাটা কি ঘটছে? মেয়েটা আসলে কে? আমি কি স্বপ্ন দেখছি? আমি কি কল্পনা করছি? কিন্তু এতো দীর্ঘ কল্পনা? আমি নিশ্চিত, এটা আমার উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা। কিন্তু ঠিক অবিশ্বাসও করতে পারছিনা। ভাবতে থাকি, এই বনলতা সেনের জন্য আমার কি সময় কেটেছে? আমার জীবনের একটা বড় সময় বলতে গেলে কাটিয়েছি তাকে ভেবে ভেবে। একরকম ঘোরেই পার করেছি দিনের পর দিন। বনলতা বলয়ে। কাল নাকি সে আসবে। যদি সেটা সত্যি হয় আমি বুঝতে পারছি না কি করবো। সে এসে পড়লে আমি নীলাকে কি বলবো? নীলাই বা কি মনে করবে? আমার পে আর এসব নিয়ে ভাবা আর সম্ভব হচ্ছে না। আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে।
৪.
সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর থেকেও যেন ঘোরের মধ্যেই ছিলাম। উঠে প্রথমেই যে কাজটা করেছি তা হলো, একটা আয়না কিনে এনেছি। কেনার আগে কিছু মনে না হলেও কেনার পর বিষয়টা নিয়ে ভাবলাম, এটা আমি কি করছি। আমি কি বনলতার বিষয়টাকে সত্যি ধরে নিচ্ছি? গতকাল ওটা কি হেলুসিনেশন ছিল না? আজকে বনলতা যখন আসবে তাকে কি আমি ফিরিয়ে দেব? এসব ভাবতে আমার আর ভালো লাগছেনা। ভাললাগা ফিরিয়ে আনার জন্য নীলাকে ফোন করা দরকার। মোবাইলটা বের করলাম। ভয়ে ভয়ে মোবাইলের বাটন চাপলাম। নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপোয় রইলাম। কি কথা শুনতে হয় কে জানে? কিছুই শুনতে হলো না। নীলার ফোন বন্ধ। মনটা আরেক দফা খারাপ হয়ে গেল।
৫.
রাত সাড়ে এগারোটার দিকে বনলতা আসলো। আমি মহা সমস্যায় পড়ে গেলাম। সারাদিন যে ঘটনা হেলুসিনেশন মনে করেছিলাম তা আবার মিথ্যা হয়ে গেল? আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে একরকম ধাক্কা মেরে ঘরে ঢুকে গেল সে। তাকে গতকালের চেয়ে আরো সুন্দর লাগছে। বুঝতে পারছিনা বিষয়টা কি? আমি এবার চট করে তার হাত ধরে ফেললাম, এই মেয়ে বল তুমি চাও? তুমি কে? তুমি সত্যি? নাকি, কল্পনা?
বনলতা আমার দিকে গভীর একটা দৃষ্টি নিয়ে তাকালো, শোন আমি সাধারণ একটা মেয়ে। আমি এতো জটিলতা বুঝিনা। ভনিতা করতে জানিনা। তোমার যদি সমস্যা হয় বলে দাও, চলে যাই।
আমি কিছুটা বিব্রত হয়ে গেলাম, না না আমি তা বলছি না।
: তাহলে সরে দাঁড়াও। আমার প্রচন্ড ুধা লেগেছে। ঘরে কি খাবার কিছু আছে? আমি চুপ করে রইলাম। কিছুই নেই। বনলতা বুদ্ধিমতি মেয়ে। সে বুঝে ফেলল। বলল, সমস্যা নেই আমার ব্যাগে রুটি আছে। বাসে কিনেছিলাম। আমি ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। কিছু কিনে আনা প্রয়োজন। বেরিয়ে বোকা বনে গেলাম। রাত বোধ বেশিই হয়ে গেছে। কিছুই পেলাম না। ফিরে এসে দেখলাম, বনলতা আপন মনে পানিতে ভিজিয়ে ভিজিয়ে রুটি খাচ্ছে। অসাধারন দৃশ্য। নীলা নামের কারো সাথে পরিচয় না থাকলে আমি বোধ হয় চোখ বন্ধ করে মেয়েটার প্রেমে পড়ে যেতাম। তবে প্রেমে যে সামান্য পড়িনি তাও জোর দিয়ে বলতে পারছিনা।
৬.
রাত তিনটা। বনলতা মাত্র ঘুমাতে গেল। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। এ কি করে সম্ভব? মেয়েটা এসব কি বলল? সে-ই নাটোরের বনলতা? জীবনানন্দ নামের সে কবি তাকে দেখেই কবিতাটি লিখেছিল? তার কথার সবচেয়ে আশ্চর্য তথ্য জীবনবাবু মারা যাননি। এখনো তিনি বনলতার কাছে আসেন। আমি বনলতার কথাগুলো বিশ্বাস করবো কিনা তা বুঝিনি। শুধু ঘন্টাখানেক তার কথাগুলো শুনে গেছি। এমন মেয়ের দিকে তাকিয়ে শুধু ঘন্টাখানেক কেন সারাদিনই পার করে দেয়া যায়।
সে এক এক করে তার সব বলল।
একটা সময় কথা শেষ হলো। আমি বারান্দায় এসে শুয়ে পড়লাম। আমি এখনো বুঝতে পারছিনা। আসল বিষয়টা কি হচ্ছে? আমি কি তাহলে প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়ছি? আমি উঠে গেলাম। আরেকবার দেখে আসি সত্যিই কি কেউ আমার বিছানায় শুয়ে আছে? সত্যিই কি আমি এতোন বনলতা নামে কারো সাথে কথা বলে এসেছি? আমি বিছানার দিকে তাকালাম, কোন সন্দেহ নেই আমার বিছানায় বনলতা শুয়ে আছে। জীবনানন্দের বনলতা সেন। অন্ধকারে চেহারাটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
৭.
সকাল এগারোটা। বেলা অনেক হয়ে গেছে। উঠতে ইচ্ছে করছে না। অস্বীকার করার উপায় নেই, বনলতা নামের যে মেয়েটা, সে অসম্ভব সুন্দর। যত সুন্দরই হোক, গত দু’দিনের মতো আজকেও সে সত্যি হোক, তা চাইনা। আমি আসলে নীলাকে চাই। নীলাই আমার সব। এসব ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে উঠলাম। অজান্তেই বনলতাকে খুঁজলাম। নেই। বনলতাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলনা। আবারও আমি প্রচন্ড দ্বিধায় পড়ে গেলাম। কি করা উচিত? আনন্দিত হবো না কষ্ট পাবো? দু-ই হচ্ছে ভেতরে। নীলার কথা ভেবে ভালো লাগছে। আবার অসম্ভব সুন্দরী বনলতার কথা ভেবে কষ্ট হচ্ছে। এটা যে হেলুসিনেশন আর কোন সন্দেহ রইল না। নিজেকে একরকম ভার মুক্ত লাগছে। জলদি হাত মুখ ধুতে হবে। নীলার কাছে যেতে হবে। নীলাকে নিয়ে আজ সারাদিন রিকশায় করে ঘুরবো। বনলতা সেন নামে কেউ নেই। নীলা নামে একজন আছে। যাকে আমার প্রয়োজন।
৮.
সেই বনলতা সেই হেলুসিনেশনের আজ প্রায় বছরখানেক কেটে গেছে। নীলার সাথে বিয়ে হয়েছে চার মাস হলো। আমি ছোট্ট একটা ব্যবসা করি। ব্যবসাটা মোটামুটি দৌড়ের উপর থাকার ব্যবসা। ব্যবসার কাজে প্রায়ই দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। এবার এসেছিলাম নাটোরে। সারাদিন ব্যবসার কাজে থাকলেও আমি মোটামুটি আজ বনলতার সন্ধানেই পুরো নাটোর ঘুরেছি। যদিও জানি, বনলতা বিষয়টা ছিল পুরোটা কল্পনা। তবু চলতে চলতে এমন কোথায় বাদ নেই যেখানে আমার চোখ পড়েনি। আমার সাথে দু'দিন কল্পনায় অথবা বাস্তবে থাকা সেই বনলতাকে খুঁজে খুঁজে একরকম কান্ত হয়ে গেছি। এই শেষ মুহুর্তে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। বাসে ওঠার আগেও শেষবারের মতো তাকালাম, না নেই। বনলতা সেনকে দেখা হলোনা। বলেছিল, সে এখনো নাটোরেই থাকে। জীবনানন্দও তাকে নাকি মাঝে মাঝে দেখতে আসেন। ভাবতে ভাবতে হতাশা নিয়ে বাসে উঠলাম। আমার সিট একেবারে পেছনে। বাসে উঠতেই হঠাৎ সামনের সিটে বসা একজনকে দেখে চমকে উঠলাম। কেমন যেন চেনা চেনা লাগলো। কোথায় যেন দেথেছি? হঠাৎ মনে পড়লো লোকটা কি জীবনানন্দ দাশ। চেহারা অবিকল জীবনানন্দের মতো। নাম জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে হলো। জিজ্ঞাসা করব কিনা ভাবতে ভাবতে পিছনে চলে এলাম। কিছুই বলা হলো না। কি বলবো আমি? কিইবা বলার আছে আমার?
জীবনবাবু যদি এখনো তার বনলতাকে দেখতে আসেন, তাতে আমার কি?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


