আজ নিতুর বিয়ে হলো। লোক মুখের কথা, ইতিহাস অথবা যে কোন হিসেবেই ধরা হোক, এখন যে সময় চলছে তাকে বাসর রাত বলা হয়। নিতুর সামনে অবাক বিস্ময়ে যে অসম্ভব স্মার্ট যে ছেলেটা বসে আছে তার নাম রাশেদ। নিতুকে দেখছে। তার পরিচয় সে নিতুর স্বামী। বাসর রাতে স্ত্রীর পাশে যে থাকে সে স্বামীই হবে। এটা আলাদা করে বলার কিছুই না। বলতে হচ্ছে এ কারনে যে, রাশেদ এই কথাটা শুনতে ভীষণ পছন্দ করে। পৃথিবীর নিয়ম অনুযায়ি আজই আনুষ্ঠানিকভাবে নিতুর স্বামী হলেও সে অনেক আগে থেকে নিতুর সাথে এই পরিচয়ে কথা বলে।
ফোনে কথা হলে বলে, হ্যালো নিতু ম্যাডাম বলছেন? আমি আপনার স্বামী বলছি।
এই বিষয়টা তার এতোই ভালো লাগে একবার নিতুকে বলল, চিন্তা করছি বিয়ের পর আমার একটা নতুন ভিজিটিং কার্ড ছাপবো। সেখানে লেখা থাকবে, নাম রাশেদ হোসাইন। পরিচয় নিতুর স্বামী। রাশেদের এইসব পাগলামির আসলে কোন অর্থ নেই। একটাই কারন, নিতুর প্রতি রাশেদের অসম্ভব ভালোবাসা। রাশেদের এই তাকিয়ে থাকা দেখতে নিতুর বিরক্তি লাগছে। সে রাশেদকে বলল, মাই ডিয়ার স্বামী সামনে থেকে সরে যান। ঘুমোবো।
ঘুমোবো মানে? রাশেদ চরম হতাশা নিয়ে যেন কথাটা বলল।
ঘুমোবো মানে, ঘুমোবো। এতে এ রকম করার কি আছে? জবাব দেয় নিতু।
নিতু তুমি কি বলছো তুমি কি বুঝতে পারছো?
স্যার, না বোঝার কি আছে? আমি তো বাংলাতেই বলছি। নাকি?
নিতু কত সহজে কত কঠিন কথার জবাব দিয়ে দিলে। না? অথচ কি অবস্থা ছিল আমাদের? কি না করতে হয়েছে এই পর্যন্ত আসার জন্য?
তুমি এতো অল্পতে রেগে যাও কেন রাশেদ? আমি তোমাকে কতটা ভালবাসি তুমি কি বোঝ না? যাও ঘুমাবো না। দেখব। এ রাতে আমার স্বামী মহোদয় কি করেন?
এটা কেমন কথা হলো?
কি হলো আবার? যা হবার তাই হয়েছে। তাই হবে।
নিতু তোমার কি মনে হয়না লাইটের আলোটা আজ খুব বাজে ব্যবহার করছে। বিরক্ত লাগছে। কি করা যায় বলতো?
আরে বাবা, লাইট নিভিয়ে দিতে চাচ্ছ নেভাও। এতো ঢং করার কি আছে?
রাশেদ চরম লজ্জা নিয়ে লাইট অফ করতে গেল।
২.
মিলার চোখ বারবার ঘোলা হয়ে আসছে। সে যতবার বাবার দিকে তাকাচ্ছে। ততবার মা এবং বড় ভাই আরিফের দিকেও তাকাচ্ছে। মায়ের কান্না দেখে সে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারছেনা। বড় ভাইটার দিকে তাকাতেও প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছে তার। কি না করছে সে? কোথায় ফোন করছে না? জলিল সাহেবের বুকের ব্যাথাটা আরো বেড়ছে। মিলা বাবার হাত ধরে বসে আছে। এটা ছাড়া তার আর কিছু করারও নেই। আর কিছুক্ষণ পরপর জিজ্ঞাসা করছে, বাবা ব্যাথাটা কমেছে? বাবা এখন কেমন লাগছে?
জলিল সাহেব মেয়ের কথায় জবাব দিতে পারছেননা। রেহানা বেগম অস্থির হয়ে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করল, বাবা এম্বুলেন্স কি আসছে?
আরিফের গলা শুকিয়ে আসছে। তাও জবাব দিল, আসছে মা।
তাদের তিনজনের এখন আর কিছুই করার নেই। যে যার মতো কখনো জলিল সাহেবের দিকে কখনো অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ এম্বুলেন্সের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ক্রমশ সে শব্দ স্পষ্ট হচ্ছে।
৩.
মিজান কোথা থেকে যেন তিনদিন আগের একখানা পেপার জোগাড় করে এনেছে। অসম্ভব মনোযোগ দিয়ে সে পেপারটা পড়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার ঘরে প্রচুর মশা, তাকে ভালোভাবে পড়তে দিচ্ছেনা। মশা মেরে মেরে পেপার পড়তে হচ্ছে। তাই ছোট্ট একটা খবর পড়তেও তার আধঘন্টা পার হয়ে গেল। তাও সে পড়ছে। খবরটা তার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে।
৪.
নিতু চিৎকার করে ওঠল। রাশেদ তার মুখ চেপে ধরল, আস্তে। নিতু বলল, আস্তে কি? এতোদিন এটা গোপন করে গেছো। বলো আর কতজনের সাথে তোমার ইশক ছিল? রাশেদ তুচ্ছ ভাব নিয়ে জবাব দিল, আরে দুর। এগুলো কি প্রেম নাকি? যে কারোরই তো যে কাউকে ভালো লাগতে পারে। কোন মেয়ে আমাকে পছন্দ করলে সে দোষ কি আমার? আচ্ছা আমরা কি এই রাত ঝগড়া করে কাটিয়ে দেব?
নিতু বলল, প্রয়োজনে দেব। রাশেদ ব্যাপক মিনতি স্বরে বলল, প্লিজ নিতু।
নিতু আবারো চিৎকার করে ওঠল, খবরদার গায়ে হাত দিবা না। আগে সব সমস্যার সমাধান হোক। পরে প্রেম ভালোবাসা। ও! আল্লাহ এতোদিন তুমি কি সাধুই না ছিলে রাশেদ। ছিঃ ছিঃ।
রাশেদ এবার কিছুটা রেগে গেল, ওকে তুমি সমস্যার সমাধান করো, আমি ঘুমাই।
রাশেদ পাশ ফিরে ঘুমাতে গেল।
নিতু হেসে দিল, আরে বাবা এতে রাগ করার কি আছে?
রাশেদ চুপ।
নিতু রাশেদের হাতটা ধরল। হাতটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে চাইলো। রাশেদ একটানে হাত সরিয়ে নিল। এবার নিতু উল্টো রেগে গেল, ঠিক আছে দেখবো আমাকে কখনো স্পর্শ কর কিনা? কথা শেষ হবার আগে রাশেদ ঘুরে নিতুকে জড়িয়ে ধরল। নিতু বলল, ছাড়ো। ছাড়ো বলছি।
ছাড়বো না।
ছাড়ো
না, ছাড়বো না।
ছাড়ো
না, ছাড়বো না।
ছাড়ো
ছাড়বো না।
৫.
রেহানা বেগম নিজেকে আর আটকে রাখতে পারছেননা। শব্দ করেই কাঁদছেন। এম্বুলেন্স চলছে। কদিন আগেও জলিল সাহেব তাকে বলেছিলেন, রেহানা আমরা সুস্থ থাকতে থাকতে মেয়েটার দিয়ে দিতে হবে।
রেহানা মেয়েটার দিকে তাকালো। মেয়েটা নিঃশব্দে কাঁদছে। এম্বুলেন্স এসে থামলো হাসপাতালের গেটে। স্ট্রেচারে করে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো জলিল সাহেবকে। রেহানা বেগম আর মিলা চোখ ভর্তি জল নিয়ে তাকিয়ে আছে। আরিফের চোখে পানি না থাকলেও তার ভেতরের অবস্থা চোখে মুখে স্পষ্ট।
৬.
মিজান পেপার পড়তে পারছেনা। পাশে রেখে বসে আছে। প্রচন্ড রাগ নিয়ে সশব্দে মশা মারছে আর মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশে মশা খুঁজছে।
শালারা সাহস থাকলে আয়, পলাইছস ক্যান?
৭.
রাশেদ আর নিতুর কথার শব্দ অনেকটাই নিচু হয়ে গেছে। তারা কি নিয়ে কথা বলছে তা শোনা যাচ্ছে না। আবার তারা যে ঘুমিয়ে পড়েছে তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না । হালকা হালকা কথার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ফিসফিস ধরনের কথাবার্তা। কোনটা যে কার কন্ঠ বোঝা যাচ্ছে না। মনযোগ দিয়ে শুনলে ধরা যায়।
প্লিজ, একবার।
না। যাও এখান থেকে।
প্লিজ, নিতু।
রাশেদ ছিঃ।
এখানে ছিঃ এর কি হলো? আমরা না স্বামী স্ত্রী?
হই স্বামী স্ত্রী। তাতে কি হয়েছে?
নিতু প্লিজ ...প্লিজ
রাশেদ, বাড়ী ভর্তি মানুষ আমি তোমার মাকে ডাক দিলাম... এ্যই ...।
রাশেদ তড়িৎ গতিতে নিতুর মুখ চেপে ধরল।
৮.
রেহানা বেগম আর মিলা বাইরে বসে আছে। বারান্দা দিয়ে আরিফ এগিয়ে আসছে। রেহানা বেগম ওঠে দাঁড়ালেন। সঙ্গে মিলাও। আরিফের হেটে আসার ষ্টাইল দেখে রেহানা বেগমের বুকে যেন কেমন ধাক্কা লাগল। রেহানা বেগম ছেলেকে মুখস্থ পারেন। যে ষ্টাইলে তার ছেলে হেটে আসছে সেভাবে তার ছেলে কখনো হাটেনা। আরিফ সামনে এসে দাঁড়ালো। তার চোখ ফুলে গেছে। সে কাঁদছে। রেহানা বেগমের বুঝতে বাকি রইল না তার ছেলের কান্নার অর্থ কি?
বুঝতে বাকি নেই মিলারও। মিলা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তার প্রচন্ড মাথা ঘুরছে। সে বুঝতে পারছে না সে কি পড়ে যাচ্ছে?
৯.
মিজান পেপার পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে। গভীর ঘুম। অন্তত গোটা বিশেক মশা বসে আছে তার হাতে পায়ে। সে এমন গভীর ঘুমে আছে। মশার কামড়ে সামান্য নড়ছেও না। পেপারটি তার মুখের উপর পড়ে আছে। তিনদিন আগের পেপারে সে যে গুরুত্বপূর্ণ খবরটা পেয়েছিল তা সে শেষ পর্যন্ত পড়তে পেরেছে কিনা কে জানে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


