আমার প্রিয় পোস্ট

দ্য ওয়ে আই ফিল ইট...

মৃত্যুর মন্থর রিহার্সেল

২৫ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ৯:২৩

শেয়ারঃ
0 0 0

দূরের এক মফস্বল শহরে অদ্ভুত নিস্তরঙ্গ টাইপ ঈদ কাটিয়ে রাতের আঁধারে রাজধানীতে পালিয়ে এলাম একরকম। শেরাটনের সামনে যখন বাসটা নামিয়ে দিলো, তখন রাত তিনটা।‌ শরীর খানিক খারাপ। বাতাস তেমন চিল্ড না, কাছেই দু-এক জায়গায় ধোঁয়ার ধুলো উড়ছে বাতাসে--নকটার্নাল সিটি-কর্মীর ঝাঁটার কারিশমা, ওষুধের আধ-খোলা দোকানের ফাঁকে জবুথবু একজন বসে আর দারুণ নিরব-নিস্তরঙ্গ চারদিক। আধো-হ্যাঙওভার-টাইপ অবস্থায় খুবলে খুবলে পথ হাঁটছিলাম, রিক্সা একটা দেখে ঝট করে উঠতে হলো। দারুণ নিস্তব্ধ সড়ক, ট্রাফিক সিগন্যাল। রিক্সা ছেড়ে দাও, আবারও খানিক পায়ে হাঁটা পথ, লোহার ফটক, হাতড়ে হাতড়ে দরজার তালা খোলা... অতঃপর এই আধো-নিশ্চিত জীবন হাতের মুঠোর নিয়ে ভীষণ নির্বাসিত বিছানার খুব আপন ঘ্রাণের গাদায় নাক ডুবিয়ে বুদ হয়ে থাকা।

অবশ্য খুব বেশি বুদ হয়ে থাকা হয়না। এই আধা-পোড়ো বাড়িতে এমনকি টিকটিকিরও নড়াচড়া নেই এখন, আলো নেই, ঘরময় পত্রিকা বুনেছে কেউ আর অনিয়ম অলসতার সুযোগে রান্নাঘর থেকে একটা গুমোট গন্ধ পাক খেয়ে খেয়ে সারা বাড়ি ছড়িয়ে গেছে। একটু ফ্রেশ হওয়ার কসরৎ হলো, তারপর কম্বলের ওমে আশ্রয় খুঁজে নেয়া। কিন্তু পরিশ্রমী জলদস্যুর মতো আমার পিছু নিয়েছিল কেউ--ঘুম হলোনা ঠিক। একটা চাপা বিবমিষা, নিউরণে বিভ্রম ঝিমুনি, বারবার বিছানা-বাথরুম করতে করতে রাত গড়িয়ে একসময় ঘড়ির কাঁটা বেলা এগারোটায় এসে দাঁড়ালো। মস্ত পৃথিবীটা হঠাৎ বিরাণ মনে হয় ভীষণ, একটু আতঙ্ক যেন ধীর-ব্যরিকেডে ঘিরছে আমাকে। ক্ষুধা আর তামাটে সময় চৈতন্যকে দুর্বল করে দিতে চাইছে। টান-টান করে হাত বাড়ালেও আমার আওতার মধ্যে মায়ের আদলে কেউ নেই, ভাই-বোন বা মায়াময় স্বজনদের আদলে কেউ সান্ত্বনার নরম আঙ্গুল বাড়িয়ে নেই...

নিস্তেজ পড়ে পড়ে পৃথিবীটাকে হঠাৎই খুব ছোট হতে দেখি। এই ঘুপচি ঘরের বাইরেও কি কিছু থাকতে পারে? এই ঘুপচি ঘর, এই ফোস্কা-পড়া চিকন রাস্তাটুকু, এই মাকড়সা-চিত্রকলার যাদুঘর, এই পুরনো গন্ধ, এই ভীষণ নিস্তব্ধ রাতের মতো সময়, এই অনিশ্চিত অসুস্থ-বিভ্রম, ঘুলঘুলি গ’লে ঢোকা বেগুনি-প্রায় রহস্য-আলো--কিংবা আঁধার হয়তো, বাতাস-জলহীন অদ্ভুত শুষ্ক চারপাশ.. এর বাইরে জগতে আর কিছু থাকতেই পারে না। কেউ যেন হিসেব কষে চেনা জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাইছে আমাকে। অথচ একদিন আগেও আমি জীবন দেখে এসেছি। কী প্রাণোচ্ছ্বল জীবন, কী প্রচন্ড জীবন, সবুজ ঘাসে কী অপার্থিব কিশোর-ক্রিকেট আর তীর্যক সূর্য-মৈথুন, দূরগামী রেলের পাশে বিভ্রম-কান্তিহীন প্রবীন-পৌঢ় গুঞ্জন, নরম অলসতার কী অপরূপ এক-একটি চিত্রকল্প। অথচ কয়েকটা ঘন্টার ব্যবধানে আমার পৃথিবী চুপসে আসছে কেমন। আতঙ্কের ডালপালাগুলি হঠাৎই যেন শক্ত মনে হয়।

অগত্যা মুঠোফোন আঁকড়ে ধরি। এই যন্ত্রটি নাকি মুহূর্তে সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের গোপনতম দরজায় আলতো নক করে আসতে পারে। কিন্তু তাতে কি এই নির্জন শাদা ছাদ, নিঃশব্দ-রহস্য গন্ধময় আদিম গুহার দৃশ্যপট পাল্টে যাবে ? না যাবে না। তবু বোতামগুলিতে এলোমেলো আঙুল চলে খানিকক্ষণ: ‘ফরিদ ভাই, ঈদ মোবারক.. হুম... হুম... হুম... ফরিদ ভাই, আজ অফিসে আসতে পারছি না.. শরীরটা ঠিক ভালনা...।’ কথা ফুরোলে আলো-নেভা মুঠোফোন হাতে দীর্ঘ নিস্তব্ধতা অতঃপর... । আমি জানি, ও ঠিক অফিস থেকে ছুটি নেয়া হয় না, ছুটির ছুতোয় গন্ধ নেয়া হয় মানুষের। যে গন্ধে হয়তো চারপাশের পৃথিবীটার হঠাৎ সঙ্কোচন বন্ধ হবে, বন্ধ হবে ঘুলঘুলি গ’লে বেগুনি অন্ধকারের গলগল অনুপ্রবেশ, অল্প হলেও কেটে যাবে গন্ধ গন্ধ ধোঁয়াশা.. আর অল্পদামী মুঠোফোনটা বালিশের কোচরে গুঁজে হাঁটুতে ভর দিয়ে হয়তো আরেকবার উঠে বসবো বিছানায়.. । এবারের মতো, আরেকবার, বন্ধ হবে মৃত্যুর নিঃসঙ্গ, নিরব, মন্থর রিহার্সেল...

 

সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:৩৬ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

২. ২৫ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ৯:৩১
নেহার পুরকায়স্থ বলেছেন: ভাই মৃত্যুকে বড় ভয় করে। ভাল পোস্টের জন্য ৫ দিলাম!
৫. ২৫ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:১৪
কালপুরুষ বলেছেন: কেমন আছেন? অনেকদিন পর দেখলাম। যথারীতি ভাললাগা ছড়িয়ে দিলেন। উপভোগ করলাম সেই ভাললাগাটুকু।
২৬ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:১৯

লেখক বলেছেন: আছি ভাল কালপুরুষদা। অনেকদিন পরে না ঠিক, মাঝে মাঝেই ঢু মারি ব্লগে, কিন্তু সবার সাথে ব্যাটে বলে ঠিক হয়না। :)

ভাল থাকবেন।

৬. ২৫ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:২৬
কাল্‌বেলা বলেছেন:
অসম্ভব সুন্দর .........।
৭. ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:২১
বৃশ্চিক বলেছেন: সবাইকে ধন্যবাদ।
৮. ২৬ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:৩৩
সামী মিয়াদাদ বলেছেন: ভাল লাগলো.....কবিতা পাইনা কেন?
২৬ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ দুপুর ১২:৪২

লেখক বলেছেন: কবিতাই তো দেখি বেশি। গদ্যটা অনেকদিন পর লিখলাম... :)

৯. ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০০৮ রাত ৩:৪১
তৃনভোজী বলেছেন: শহুরে জীবন আর শহর থেকে একটু দূরে গ্রাম বা মফস্বল জীবনের ফারাক কত প্রকট! জীবন ওখানে যেন 'a flash of a firefly in the night. like the breath of a buffalo in the wintertime. like a little shadow which runs across the grass and loses itself in the sunset!' -- 'কী প্রাণোচ্ছ্বল...সবুজ ঘাসে কী অপার্থিব কিশোর-ক্রিকেট আর তীর্যক সূর্য-মৈথুন, দূরগামী রেলের পাশে বিভ্রম-কান্তিহীন প্রবীন-পৌঢ় গুঞ্জন, নরম অলসতার কী অপরূপ এক-একটি চিত্রকল্প।'

আর ইট-সুড়কি, লোহা-লক্করে ভরা শহরে? 'বাতাস-জলহীন অদ্ভুত শুষ্ক', 'চুপসানো' একঘেয়ে জীবন। যে জীবনে থেকে থেকে 'আতঙ্ক' ভর করে বসে, 'ডালপালা' ছড়ায়! life in the city is first boredom, then fear.
১০. ০৬ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ৮:২০
বৃশ্চিক বলেছেন: তৃণভোজী, you are right. but there were something else.. there were a strange sickness as well.. when i wrote those lines...
১১. ১৭ ই অক্টোবর, ২০০৮ দুপুর ১:৪৮
সুমন রহমান বলেছেন: এই পোস্ট বহুদিন আমার প্রিয়তে ছিল, যেহেতু তখন এখানে মন্তব্য করার অধিকার পাই নি। এখন পেলাম। ভালো লেখা বৃশ্চিক, সামহোয়ারে অনিয়মিত কেন?
১২. ২৫ শে মার্চ, ২০০৯ দুপুর ১২:২৪
আন্দালীব বলেছেন: কথকের বলবার ভঙ্গী তুলনাহীন....ডিটেইলিং প্রসেস ভালো। ছত্রগুলো কাব্যময়তা পুরে দেবার প্রায় প্রতিটা চেষ্টাই সফল।

অনেক ভালোলাগা রইলো...

১৩. ২৭ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ১:১৭
শিমুল সালাহ্উদ্দিন বলেছেন: এতো সুন্দর কাব্যিক গদ্যের জন্য প্লাস।+++

প্রিয়তে রাখলাম। শুভকামনা।


ঘুরে যাবেন আমার ঘর সময় পেলে,হলে।

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৪১০ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
অ্যান আউটসাইডার অ্যাম আই।
অর, পারহ্যাপস, নোবডি এট অল...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ