জাহাঙ্গীর আলম আকাশ
বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা আর আতংক যেন ক্রমেই বাড়ছে। নির্বাচন কি সত্যি হবে? এনিয়ে জনমনে সংশয়ের শেষ নেই। ‘পূর্ণ সেনা নিয়ন্ত্রিত অবৈধ-অগণতান্ত্রিক’ বর্তমান সরকার বিগত ২১ মাসেও তাদের কর্মপন্থা জনগণের সামনে পরিস্কার করে তুলে ধরতে পারেনি। দুর্নীতিবিরোধী তথাকথিত নিরপে সরকারের নামে এই সরকার দেশ থেকে দুর্নীতি কমাতে পারেনি। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল তাদের রিপোর্টে দুর্নীতি বাড়ার সত্যতা স্বীকার করেছে। তবে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে মূলত: জনমনে রাজনীতিবিরোধী একটা মানসিকতা গড়ে তোলার জন্যই এই সরকার কাজ করে চলেছে বলে নানা মহলে আলোচিত হচ্ছে।
এই দীর্ঘ সময় ধরে সরকারের গৃহিত বিভিন্ন পদক্ষেপ, কর্মকান্ড, আশ্বাস-প্রতিশ্র“তি, কথাবার্তা সাধারণ জনগণকে কোনভাবেই আশ্বস্ত করতে পারেনি। বরং সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা-বিশ্বাস দিন দিন কমছে। ধর্ম ব্যবসায়ী, মৌলবাদীদের প্রতি সরকারের বিশেষ কৃপা দৃষ্টি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে জনগণের। দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এই জঙ্গি আচরনকারী মৌলবাদীদের আশ্রয-প্রশ্রয় ও তাদের দেশদ্রোহী কর্মকান্ড’র বিষয়ে সরকারের নিরবতা।
নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সরকারের বড় আশাবাদী মনোভাব বাহ্যত পরিলতি হচ্ছে। কিন্তু একটি গ্রহণযোগ্য সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের যেসব পূর্বশর্ত পূরণ করতে হয় তার বেশিরভাগই এখনও সম্পন্ন হয়নি বলে আলোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে। যদিও সরকারের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান স¤প্রতি বলেছেন, দেশ নির্বাচনি মহাসড়কে উঠে পড়েছে। এই মহাসড়কের শেষ কোথায় কিংবা মহাসড়ের ওপর দিয়ে কে কে উঠবে, কিভাবে গাড়ি চালাবে সে ব্যাপারে উপদেষ্টা পরিস্কার করে কিছু জানাননি।
অন্তত: চারটি কারণে নির্বাচন নিয়ে সংশয় কাটছে না। প্রথমত: স্মরণকালের সবচেয়ে স্থায়ী জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার, দ্বিতীয়ত: দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের দুই শীর্ষ নেত্রীর নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ (যার দল সংখ্যাগরিষ্ট আসন নিয়ে বিজয়ী হবেন তিনি) করতে পারা না পারা অন্যকথায় দুই নেত্রী মাইনাস হবেন কি হবেন না, তৃতীয়ত: জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ক’দিন পরেই উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চতুর্থত: সংসদীয় আসনের সীমানা পুন:নির্ধারণ। এই চার বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোন সিদ্ধান্ত সরকারের তরফ থেকে জাতির কাছে পরিস্কার করা হয়নি।
দেশের জনগণ জাতীয় সংসদের সংসদীয় আসনের সীমানা পুন:নির্ধারণের কোন দাবি জানায়নি। কিন্তু তারপরও নির্বাচন কমিশন স্ব-উদ্যোগে এই জটিল কাজে হাত দেয়। প্রখ্যাত আইনবিদ টি এইচ খান সংসদীয় আসনের সীমানা পুন:নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে সংবিধান ও আইন পরিপন্থি বলে উল্লেখ করেছেন (সূত্র: দৈনিক সংবাদ-২৯ অক্টোকবর, ২০০৮)।
সংসদীয় আসনের সীমানা পুন:নির্ধারণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চতর আদালতে ইতোমধ্যে রিটও দাখিল হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, রিট মামলার নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন আসনওয়ারী চূড়ান্ত ভোটার তালিক প্রকাশ করতে পারবে না। আর ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে না পারলে নির্বাচনের তফশিল ঘোষণাও করা যাবে না। সীমানা পুন:নির্ধারণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও তার বিরুদ্ধে দাখিল করা রিটের কারণে নির্বাচন ঘোষিত তারিখে অনুষ্ঠানের েেত্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সমূহ সম্ভাবনা ল্য করছে দেশের সচেতন মহল।
বাংলাদেশে সৃষ্টির পর এত দীর্ঘ সময় ধরে জরুরি অবস্থা অতীতে কখনও বহাল ছিল না। জরুরি অবস্থায় মৌলিক মানবাধিকার স্থগিত। জরুরি অবস্থায় রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক বিশেষ করে সেনা কর্মকর্তা-সদস্যের হাতে বহু সাংবাদিক-মানবাধিকারকর্মী বেআইনিভাবে নির্যাতিত হবার অভিযোগ দেশ-বিদেশে উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ইমপিউনিটি বা ইনডেমনিটির সুযোগে নির্যাতনকারীরা উৎসাহিত হয়েছে। অনেককে জাতিসংঘের শান্তিরা মিশনেও নিযুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জরুরি অবস্থার কারণে জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কোন কথা বলতে পারছে না। কিন্তু তারপরও জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের কোন ঘোষণা নেই সরকারের প থেকে। প্রধান দুই দল জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বলে ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে।
অনেকে মনে করেন যে, ‘জরুরি অবস্থা দিয়েই এই সরকার মতার মসনদ টিকিয়ে রাাখতে পেরেছে, জরুরি অবস্থা ছাড়া সরকার এক ঘন্টাও চলতে পারবে না।’ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ প্রায় সকল দলই (সরকারের সমর্থক নতুন করে গজিয়ে ওঠা কতিপয় রাজনৈতিক দল ছাড়া) জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে এবং জানিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
দুই শীর্ষ নেত্রীকে রাজনীতি ও মতা থেকে মাইনাস করার ফর্মুলা থেকে সরকার এখনও সরে আসেনি বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। সূত্র জানায়, সরকার কোনভাবেই শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে মতায় দেখতে চায় না। আর দুই বড় দল তাদের দুই শীর্ষ নেত্রীকে ছাড়া নির্বাচন করবে বলে বাহ্যত ঘোষণা দিচ্ছে বারংবার। তবে অসমর্থিত সূত্রের খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশের প্রতিবেশী একটি দেশ চাচ্ছে আগামি জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের আবকদুর রাজ্জাক অথবা তোফায়েল আহমদ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করুক। আর দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা চাইছেন বেগম মতিয়া চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে। একই সূত্র মতে, বিএনপির আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে ওই আসনে দেখতে চায় একটি বিশেষ শক্তি।
আগামি ১৮ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন একইসাথে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র ৫ দিনের মধ্যে অর্থাৎ আগামি ২৩ ডিসেম্বর ও ২৮ ডিসেম্বর দুই দফায় উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠান করার ঘোষণা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই সিদ্ধান্ত অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ৫ দিনের মধ্যেই কোনভাবেই উপজেলা নির্বাচন করা যাবে না বলে নির্বাচন কমিশনকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তারপরও নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্তে অটল আছে। রাজনৈতিক দলগুলো এধরনের সিদ্ধান্তকে অবাস্তব বলে আখ্যায়িত করেছে। সবমিলিয়ে সরকার সত্যি সত্যি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে চায় কি না তা নিয়েই যথেষ্ট সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে জনমনে।
অপর একটি অসমর্থিত সূত্র জানায়, সরকার নভেম্বরের ১৫ তারিখ নাগাদ তিনটি ধাপে জরুরি অবস্থা তুলে নেয়ার ঘোষণা দেবে। কৌশলে মূলত: জরুরি অবস্থা বহাল রেখেই এধরনের একটি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকতার। এজন্য একটি বিশেষ বৈঠক স¤প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন কথাও জানিয়েছে অসমর্থিত সূত্রটি। সূত্র মতে, দেশের সবক’টি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী গোয়েন্দা দল গঠন করা হয়েছে। যে দলটি প্রতিটি এলাকায় রাজনৈতিক নেতাদের ওপর কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চালাবে।ছোড়া সাবেক মন্ত্রী-এমপি মিলে ৩২ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে তিকর (স্পর্শকাতর) হিসেবে তাদের ওপর কড়া নজরদারির নির্দেশনা জারি করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর প্রতি। নির্বাচনের এক থেকে দেড় সপ্তাহ আগে শর্তসাপেক্ষে জরুরি বিধিমালার বেশ কিছু ধারা প্রত্যাহার করার নির্বাহী ঘোষণাও আসতে পারে। ধর্মভিত্তিক ‘ইসলামী’ দলগুলো একযোগে নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা নিতে পারে এমন আশংকাও করা হয়েছে ওই সভা থেকে। সূত্র আরও বলছে, নির্বাচনি তফশিল ঘোষণা হবার পর দেশে বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড বেড়ে যেতে পারে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে ভোটার আইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট সার্ভার অফিস গুটিয়ে নেয়া হবে না। মূলত: এই সার্ভার অফিসের নামেই সেনা ক্যাম্প থেকেই যাবে। অসমর্থিত সূত্রের তথ্য যদি সঠিক হয় তাহলেও নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয়-সন্দেহ আর অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। জরুরি অবস্থা রেখেই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের সরকারি ঘোষণা আসতে পারে। নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টার বিষয়টিও পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে অসমর্থিত সূত্রের তথ্য থেকেই। যা দেশের জন্য মারাত্মক তি ডেকে আনতে পারে বলে সচেতন মহলের ধারণা।
দেশের মানুষ চায়, নির্বাচন যেন কোন পাতানো গেমে পরিণত না হয়। জনগণ চায়, একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ স্বচ্ছ ও সংশয়মুক্ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের পছন্দের প্রতিনিধিদেরই জাতীয় সংসদে পাঠাতে পারবে। সরকারকে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি তা হলো এই সরকারের ওপর জনগণের আস্থা-বিশ্বাস দিন দিন শূণ্যের কোঠছায় নেমে আসছে। তাই জনগণের বুকের ভেতরের দাবানল দমকা হাওয়ার মতো বেরিয়ে আসার আগেই সরকারের উচিত হবে সবরকমের চাতুরতা, অপকৌশল, ষড়যন্ত্র পরিহার করে জনগণের মতানুসারে ঘোষিত সময়েই একমাত্র গ্রহণযোগ্য একটা জাতীয় নির্বাচন জাতিকে উপহার দেয়া। যার মধ্য দিয়ে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি রাষ্ট্র মতার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তারজন্য মানুষের মন থেকে সন্দেহ-সংশয় অনিশ্চয়তা দূর করে এক্ষুণি জরুরি অবস্থা পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেয়া অত্যাবশ্যক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



