বাংলাদেশে ফের শুরু হয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনপূর্ব নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনায় সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ে চরম আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। দেবোত্তর সম্পত্তি, মন্দির দখল ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে ইতোমধ্যে। সংখ্যালঘুদের দেশ ছাড়া করতে চলছে হুমকি-ধামকিসহ নানান কৌশল। সংখ্যালঘুরা আশংকা করছেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের ন্যায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরু হতে পারে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাদের জায়গা-জমি দখল ও অন্যান্য সম্পদ লুট হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের ৫ তারিখে এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকার কেরানীগঞ্জে। এনওয়াই বাংলা ডট কম এর বাংলাদেশস্থ বিশেষ প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম আকাশ এর সরজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নির্বাচনপূর্ব সংখ্যালঘু নির্যাতনের এক অমানবিক কাহিনী।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের লজিাতপাড়া এলাকাটিতে শত শত বছর ধরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বসবাস করে আসছেন। বহু পুরনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু এই বসতি ঘিরে মুসলিম স¤প্রদায়ের বসবাস। স্থানীয় ভূমিদস্যু, জোতদার, দখলদার বাহিনী স্বাধীনতার পর ৩৭ বছরে দুইশ বছরের পুরনো একটি মন্দিরসহ হিন্দুদের বহু সম্পত্তি জাল দলিলের মাধ্যমে নিজেদের দখলে নেয়। প্রভাবশালীদের অব্যাহত হুমকি, জবর দখল ও নির্যাতনের ফলে ইতোমধ্যে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে অনেক হিন্দু পরিবার। কিন্তু নানান প্রতিকুলতার মধ্যেও নিম্ন আয়ের প্রায় ৭০টি পরিবার মাতৃভূমির ভিটেমাটি আঁকড়ে ধরে আছে। এসব সহজ-সরল পরিবার বোঝে না কোন কুটকৌশল, জালিয়াতি।
সরজমিন অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে জানায়, একাত্তরের চিহ্নিত রাজাকার ফয়েজ এর নেতৃত্বে লজিাতপাড়ায় রয়েছে একটি ভূমিদস্যু চক্র। এই চক্রের অন্য সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলো সালাহউদ্দিন সুলতান, শাহজাহান, রইসউদ্দিন, লিটন, সুমন, আবদুল লতিফ। এই চক্রটি লীজাতপাড়া (হিন্দুপাড়া) এর প্রায় আড়াই’শ বছরের পুরনো নারায়ণ মন্দির সংলগ্ন ২১ শতক জমি জাল দলিল করে নিজেদের বলে দাবি করে। তারা মন্দিরের পাশের কুলাঘরটিতে তালা লাগিয়ে নিজেদের দখলে নেয।
সূত্র জানায়, এই দখলের ঘটনার পর একাধিকবার স্থানীয় কেরানীগঞ্জ থানায় যান হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। কিন্তু থানা-পুলিশের কোন সহযোগিতা পাননি তারা। এরই প্রেেিত বাধ্য হয়ে তিগ্রস্ত হিন্দুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গিয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। এরপরও থানা-পুলিশ তদন্তের নামে জবরদখলকারী জালিয়াত ভূমিদস্যু চক্রের প নেয়। ফলে দখলকারিদের আস্ফালন বেড়ে যায় কয়েকগুন। ভূমিদস্যুদের সন্ত্রাসী বাহিনী গত ৫ ডিসেম্বর সকাল আটটা/সাড়ে আটটার দিকে সেই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটির কুলাঘর ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয় এবং ঘরের মূল্যবাণ সামগ্রি লুট করে। এসময় হামলকারিদের হাতে লাঞ্ছিত হন প্রায় ৮৫ বছর বয়সী পূর্বতী।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ। কিন্তু তারা হামলা-ভাংচুর ও লুটপাটকারিদের গ্রেফতার করেনি। পুলিশের সম্মুখেই দখলদার লুটেরার দল দম্ভোক্তি প্রকাশ করতে থাকে। সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যদের আহাজারি ও কান্নাকাটির মধ্যেই ভূমিদস্যুর দল উল্লাস করে। তিগ্রস্ত হিন্দু পরিবারের সদস্যদের কান্নাকাটি আর আহাজারিতে এলাকার বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। কিন্তু ‘জনগণের সেবক ও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী পুলিশ দল’ নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তারা (পুলিশ) যেন লুটেরাদের নিরাপত্তা বিধান করতেই সেদিন ঘটনাস্থলে গিয়েছিল।
প্রত্যদর্শীরা জানান, পুলিশের উপস্থিতিতেই হামলাকারী দখলদার বাহিনীর লোকেরা সংখ্যালঘুদের গালমন্দ করতে থাকে। এসময় তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে থাকে, “বাড়ি না ছাড়লে তোদের সিঁদুর মুছে দিয়ে দেশ ছাড়া করবো। চাড়ালের জাত তোদের ছেলে-মেয়েদের অপহরণ করে ভিটেমাটি আঁকড়ে থাকার সাধ মিটিয়ে দেবো। এখনও সময় আছে ঘর-বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যা। নইলে বুঝতেই পারছিস তোদের পরিণতি কি হবে?”
কেরানীগঞ্জের লীজাতপাড়ার দেবোত্তর সম্পত্তির সেবায়েত সবিতা ভট্রাচার্য্য (৫০) বলেন, ‘আমরা হিন্দু সংখ্যালঘু আর গরীব বলে কি আমরা অপমান অপদস্থ ও লাঞ্ছনার শিকার হতেই থাকবো। এই দেশে জবরদখলকারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কি কেউ নেই? আমরা কি মাতৃভূমির মাটিতে থাকতে পারবো না?’
হিন্দু পরিবারের আরেক সদস্য সন্ধ্যা রাণী (৪৪) বলেন, ‘এলাকায় রাজাকার হিসেবে সুপরিচিত ফয়েজ এর ষড়যন্ত্রের শিকার আমরা। তার নির্দেশেই সন্ত্রাসীরা আমাদের পবিত্র স্থান মন্দিরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করেছে। ওরা আমাদের সিঁদুর মুছে ফেলার, সন্তানদের অপহরণ করার হুমকি দেয়। আমরা এখন কোথায় যাবো?’
মন্দিরে সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে হিন্দু স¤প্রদায়ের প থেকে রেখা ভট্রাচার্য্য বাদি হয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি মামলা করেন (মামলা নং-৫ তারিখ, ৭/১২/২০০৮, ধারা-১৪৩/৪৪৭/৩৭৯/৪২৮/৫০৬ দন্ডবিধি)। এ ঘটনায় পুলিশ হাজি সিরাজের ছেলে সালাহউদ্দিন সুলতান (৪০), আবদুর রহিম বেপারীর ছেলে শাহজাহান (৪২) ও আবদুল লতিফ (৫০) কে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে গ্রেফতারকৃতরা জামিনে মুক্ত হয়।
সরজমিন পরিদর্শনকালে আক্রান্ত হিন্দু পরিবারের সদস্যরা জানান, হামলা-লুটতরাজের ঘটনায় স্থানীয় সংখ্যালঘুরা চরম আতংকের মধ্যে আছেন।
প্রিয় ব্লগারবৃন্দ, অপেক্ষা করুন শিগগিরই লিখবো গোপালগঞ্জ ও বরিশালে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন কেরানীগঞ্জ স্টাইল, আসছে গোপালগঞ্জ-বরিশালের সংখ্যালঘুদের খবর
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৪টি মন্তব্য ১টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪
মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।
মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন
শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।