জাহাঙ্গীর আলম আকাশ
রাজশাহীর প্রায় অর্ধশত গণকবর বা বধ্যভূমি অবহেলা আর অযন্তে পড়ে রয়েছে। অরতি এসব গণকবর বা বধ্যভূমি এখন গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার ৩৮ বছরেও বধ্যভূমিগুলো সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছে। অন্যান্য গণকবর বা বধ্যভূমিতে নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতি সৌধ। অথচ গণকবরে স্মৃতি সৌধ নির্মিত হলে সেগুলো পাক সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর আর আল-শামসদের অত্যাচার-নিপীড়ন-জুলুম ও নৃশংসতার স্বার বহন করতো।
ইতিহাসের থেকে জানা যায়, রাজশাহী মহানগরীতেই কুড়িটিরও অধিক গণকবর রয়েছে। এর মধ্যে দেশের সর্ববৃহৎ বধ্যভূমিটি রয়েছে রাবির শহীদ ড.শামসুজ্জোহা হলের পেছনের দিকে। রাজশাহী শহর রা বাঁধের টি-বাঁধ সংলগ্ন বাবলা বন জেলা প্রশাসকের বাংলো সংলগ্ন গণকবরটি সংরণের অভাবে পদ্মা নদীর গর্ভে তলিয়ে গেছে। কয়েক বছর আগে এখানে একটি ভিত্তি স্থাপন করা হলেও দীর্ঘদিনেও স্মৃতিফলক নির্মিত হয়নি। ভিত্তি স্থাপনের এলাকাটি এখন গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। পুলিশ লাইন, ঘোড়ামারায় জমিদার কুঞ্জ মৈত্রীর বাড়ি, বোয়ালিয়া থানা সংলগ্ন মোসলেম শাহর বাসভবন, ফুদকিপাড়া এনএসআই অফিস চত্বর, উপশহর ক্রীড়া ও সংস্কৃতি কেন্দ্র সংলগ্ন, সেনানিবাসের ১ নম্বর গেট সংলগ্ন, হাউজিং কলেজ সংলগ্ন পূর্ব ড্রেন, তালাইমারী বাঁধ সংলগ্ন, রুয়েট (পূর্বের বিআইটি) চত্বর, কাজলাদিঘীর পাড়, কেন্দ্রীয় উদ্যানের পাশের এলাকা, বিসমিল্লাহ মার্কেটের সামনের এলাকা, চারঘাট উপজেলার থানাপাড়া ও নওদাপাড়া মাঠ, গোদাগাড়ী উপজেলার ললিতনগর মাকরান্দা, বিদিরপুর, গোদাগাড়ী হাই স্কুলের পাশের এলাকা, মহিশালবাড়ী রেলবাজার নদী সংলগ্ন এলাকা, পাকড়ী এলাকা, সেখেরপাড়া এলাকা, পবা উপজেলার নওহাটা ও হরিপুরে, দূর্গাপুর উপজেলার নওপাড়া ও জয়নগর ইউনিয়ন এলাকা, পুঠিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নে ৪ টি, মোহনপুর উপজেলায় ৪ টি, বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়ায়, বাগমারা উপজেলার তাহেরপুরে, তানোর উপজেলার তালন্দ এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে অর্ধ শত বধ্যভূমি বা গণকবর অরতি অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে ১৪ ই ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। স্বাধীনতার তিন দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শহীদ শিকের নামে কিছুই করা হয়নি। ’৭১ এ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনজন শিক শহীদ হন। এরা হলেন-মীর আবদুল কাইয়ুম, সুখরঞ্জন সমাদ্দার ও হবিবুর রহমান। এদের মধ্যে শহীদ হবিবুর রহমানের নামে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ একটি ছাত্র হল নির্মাণ করেছে। অন্য দু’জনের নামে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ কিংবা সরকারী কোন উদ্যোগে ৩৭ বছর পরেও কিছু করা হয়নি। শুধু তাই নয়, তাঁেদর সমাধিস্থলটুকুও অযতœ-অবহেলায় পড়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে।
বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকদের মধ্যে গণিতের তৎকালীন রিডার অধ্যাপক হবিবুর রহমান, মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ুম এবং সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দারকে হত্যা করা হয় নির্মমভাবে। হবিবুর রহমানকে ১৫ ই এপ্রিল বিকেলে পাক অনুচরদের সহযোগিতায় বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবনে। এরপর তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। ব্রিগেডিয়ার আসলাম ও কর্ণেল তাজ এই অভিযান চালায়। অধ্যাপক রহমানের পতœী ওয়াহিদা রহমান ও তাঁর সন্তান এখন কোথায় আছেন তা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপরে কোন দপ্তর থেকেই জানা যায়নি। অধ্যাপক রহমান ছিলেন অংকশাস্ত্রের একজন দ পন্ডিত।
১৪ ই এপ্রিল সকাল সাড়ে ন’টার সময় অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দারের বিশ্ববিদ্যালয়ের প-৭১/খ নম্বর বাসায় হানা দেয় পাক বাহিনী। বাসা তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয় কোথাও কোন ইপিআর আছে কিনা। পাক বাহিনী বাসা থেকে চলে যাবার সময় উর্দূভাষী মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মতিউর রহমান সমাদ্দারকে শনাক্ত করে দিয়ে বলেছিলেন,“ ইয়ে তো হিন্দু হ্যায়”। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে জিপে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সম্ভবত: ঐদিনই তাঁকে হত্যা করা হয় কাজলা পুকুরের ধারে। বেশ কিছুদিন পর হত্যাকারীদের একজন (নাম জানা যায়নি) সমাদ্দারের পতœী মিসেস সমাদ্দারের কাছে স্বামীর চশমা ও সেন্ডেল বাসায় পৌঁছে দেয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সুখরঞ্জন সমাদ্দারের সমাধি রয়েছে। শিার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমন কোন স্মৃতিফলক নেই সেখানে। শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায় সংরতি মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এই শিকদের ব্যবহৃত জিনিসপত্রেও ধূলোবালি পড়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেক ছাত্র-ছাত্রীই জানেনা যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন দেশপ্রেমিক শিক স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন।
মনোবিজ্ঞান বিভাগের শহীদ শিক অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ুমকে পাক বাহিনী ২৫ শে নভেম্বর রাত ন’টার দিকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্যের অবাঙালি স্টেনোগ্রাফার তৈয়ব আলী অধ্যাপক কাইয়ুমের শ্বশুরালয় ঘোড়ামারার বাসা হতে ডেকে নিয়ে যায় মিলিটারীর গাড়ির সামনে। তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাবার পর তিনি আর ফেরত আসেননি। স্বাধীনতার পর জানা যায়, পদ্মা নদীর ধারে চরের মধ্যে নিয়ে কাইয়ুমসহ ১৪ জনকে একসঙ্গে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। ’৭১ এর ৩০ শে ডিসেম্বর বোয়ালিয়া কাবের সামনে পদ্মার চরে এই ১৪ টি লাশ উদ্ধার ও সেখানে একটি গনকবর আবিস্কৃত হয়। রাজশাহী মহানগরীর কাদিরগঞ্জ গোরস্থানে সমাহিত করা হয়েছিল অধ্যাপক কাইয়ুমকে। তাঁর কবরটি বর্তমানে অযতœ আর অবহেলায় পড়ে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিগত প্রশাসন (প্রফেসর খালেক যখন উপাচার্য) রাবির শহীদ তিন শিকের ছবিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেছিল। এর বাইরে তাঁেদর নামে (অধ্যাপক হবিবুর ছাড়া) আর কিছুই করা হয়নি কখনও। সা¤প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণ কাজ চলছে আরও কয়েকটি ভবনের। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল মহল হতে দাবি উঠেছে, শহীদ শিক কাইয়ুম ও সুখরঞ্জনের নামে যে কোন একটি করে ভবনের নামকরণ করে হলেও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন হোক। কেউ-কেউ বলছেন, পরবর্তীতে কোন হল নির্মিত হলে এই দুই শিকের নামে করা যেতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



