ফাজলামৗ ও বিটলামি, খোঁচা এবং গুতা,

বিচ্ছিন্ন আবেগ (পর্ব-৯)

০৮ ই মে, ২০০৭ বিকাল ৩:২৮

শেয়ার করুন:                   Facebook

মোটামুটি এই অবস্থা, বেশ ভালো আছি। আর লিখতে ইচ্ছা করছে না, এক বউরে বাদ দিয়ে কাউকেই লিখতে ভাল লাগেনা। এ চিঠি আগে যাবে না আমরা আগে পৌঁছাবো তাও বলতে পারছি না, তবে ছবিগুলো প্রিন্ট করিয়ে রাখিস। এই তো, হ্যা ভালো থাকিস। তোর চাকরি হয়েছে শুনেছিলাম। কী অবস্থা ওটার? আর মিতুলকে ফোন দিয়ে বলিস আমরা ভালো আছি।

তায়েফ
সুন্দরবন থেকে।

প্রিয় মিতুল,
কেমন আছো? এখন বিকেল ঠিক পাঁচটা তেত্রিশ, পশুর নদীর ঠিক মাঝখানে বসে লিখছি। অবশ্যই নৌকাতে আছি। আর চিন্তা করো না; নৌকা ডুবির ভয় নেই। চিন্তা না করলেও রাগ যে আছে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, বিশেষত: অফিসের চাপে সময় দিতে না পারায়তো এমনিই রাগ করে আছো, উপরন্তু এই ছুটিতেও আমি তোমার কাছে নেই। কিন্তু কী করব বলো, বন্ধু সেবা বলেও তো একটা ব্যাপার আছে। ফুয়াদের ব্যাপারতো জানোই। রিহ্যাব থেকে ফেরার পর প্রত্যেকেই বন্ধু সঙ্গ একটু বেশী চায়। তাই ওকে নিয়ে সুন্দরবনে আসা just for a little change! প্রায় দশদিন হলো এখানে এসেছি। এ ক'দিন প্রচুর মজা করেছি। ক্যাম্পিং, সাঁতার, মাছ ধরা ...অন্য রকমের নিজেকে জানছি যেন। তবে কয়েক দিন আগে নদীতে সাতার কাটতে গিয়ে প্রায় ডুবেই গিয়েছিলাম। পানির নীচে দম আটকে আসছিল। মৃত্যুকে হঠাৎই যেন খুব কাছে পেলাম। ফুয়াদ টেনে উঠালো। সাথে নেপো ছিল আমাদের গাইড। তবে এই ডুবে যাওয়াটা কিন্তু এখন খুবই উপভোগ করছি। একেকবার একেক রকমের অনুভুতি হয়; ঠিক যেমন নেশাগ্রস্থ মানুষের মতো। একটা জিনিস ল্ক্ষ্য করেছো? ফুয়াদ এখন আমাকে বাঁচাতেও পারছে পানি থেকে তুলে, যে কীনা ক'দিন আগেও নিজেকে চালাতে পারতো না। সত্যিই আনন্দ লাগছে আমার।

এখানে সব সময় আনন্দ করছি। নিস্তব্ধতায় নিজেদের মিশিয়ে দিচিছ, তারপরও কিন্তু ঠিক পরিতৃপ্তি পাচিছ না। মনে হচেছ তোমায় পাশে পেলেই সবকিছু পরিপূর্ণতা পেত। শুধু তুমি আমি আর ঘন বনানী - কেমন মনে হয়? এখানে থাকব আরো প্রায় পঁচিশ দিন। চলে আসোনা মিতুল, আসবে? যা একা করছি সব সাথে করতাম। আসবে? আজ সকালে আমার শরীরটা বেশ খারাপ ছিল। এ ক‘দিনের অতিরিক্ত সিগারেট আর তোমার শাসনহীতায় অ্যালকোহলের মাত্রাতিরিক্ততার ফলাফলই বোধ হয়। তোমার কাছে করা প্রমিসের এরকম ভরাডুবি হয়তো মার অযোগ্য। কিন্তু প্রকৃতির এই নিবিড় কোলে সভ্যতার জড়বদ্ধ মুখোশটা একটানে ছিড়ে ফেলার ব্যর্থ প্রয়াসই এটাকে বলা যায়। যা বলছিলাম, হঠাৎ করে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, চোখ ঝাপসা বুকে প্রচন্ড ব্যথা। হঠাৎ করে মাটিতে পড়ে গেলাম। শুয়ে থাকলাম কিছুন। শরীরটা প্রচন্ড কষ্টে ছিল আমার। তারপর ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক। তখনই দেখলাম সবচেয়ে আশ্চর্য দৃশ্য। একটু দূরে একটা বাঘ জ্বল জ্বলে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও। একটু পরে অবশ্য মামা চলে গেলেন। আমি তখনও স্তম্ভিত। নিজেকে যেন সবচেয়ে ভাগ্যবান মনে হচিছল।

একটা কথা ছিল। সামনে বলার সাহস বা দৃঢ়তা কখনোই পাবোনা। তাই চিঠির আশ্রয় আজ নিলাম। এর মাধ্যমেই হয়তো আমাদের জীবনের একটা ঝড় কে আমরা মোকাবেলা করতে পারব। প্লীজ একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ো।

দিন কয়েক আগে আমরা নেপোর এক পরিচিতের বাসায় যাই। সেখানে আমরা যথেষ্ট স্ফুর্তি করলাম। তারাও সাধ্য মতো আমাদের খাতির করলো। রাতে একটা ছোট খাটো ভোজ দিল। আগুনের কুন্ডলীর পাশে দাড়িয়ে আমি, তখনই হঠাৎ বন্দনার সাথে আমার দেখা। বন্দনা, দেখতে যথেষ্ট আকর্ষনীয় দুঃখী বঞ্চিত একটা মেয়ে? বিধবা, প্রায় চার বছর হতে চলল। ওর সাথে আমার ভালই গল্প জমে উঠেছিলো। ওর সবই আমাদের বলল। পরবর্তীতে আমাকে বলেছিলো ওর জীবনের একাšত কষ্টকর অভিজ্ঞতার কথা।

না, বন্দনা স¤পর্কে বেশী কিছু বলব না, তবে এটুকু নিশ্চিত, স্বশিতি এই মেয়েটার খুবই দুঃখ, প্রায়ই সন্ধায় আসতো আমার কাছে। এ কথা সেকথা সময়টা প্রায়ই উড়ে যেতো। এক সময় বলল ওদের গোত্রের নিয়মের কথা, গোত্রের বাইরে ওদের বিয়ে হয় না। বিধবা হলে পুনঃ বিবাহের নিয়ম নেই। এরকম ভাবে কয়েকদিন গেল। গতকাল ছিলো ওদের পূজা। সে পূজাতে আমরা সবাই-ই তাদের সাথে সম্পূর্ণ মিশে গিয়েছিলাম। আয়োজন বলতে প্রচুর চোলাই মদ-ওরা বলে হাড়িয়া। আর লবন লাগানো সেদ্ধ ছোলা সাথে কাচা মরিচ। ছাতুও ছিল। কিন্তু খাওয়ার নিয়ম আমাদের বারের মত টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয়। তবে দাম প্রচুর কম। মাত্র পঞ্চাশ টাকাতেই ওদের সব মদ আমি কিনেছিলাম। সবাই খেয়েছে- আমিও, মদ খেয়ে পুরো মাতাল। মনে হলো আমি এদেরই একজন। রীতি মতো নাচছি হেড়ে গলায় গাইছি। এক বুড়ো মদ খেয়েই যাচেছ, সারা শরীর নেশায় টলমল, কিন্তু ঢোলের তাল কাটছে না। সে সময়ই হঠাৎ নিজেকে কেন জানি প্রচন্ড অসহায় মনে হলো। মনে হলো অর্থহীন সব-বেঁচে থাকা, গান শোনা, সব। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে আসছে, নাচ ছেড়ে বনের ভেতরে ঢুকলাম, সিগারেটের আগুনে সামনেই দেখলাম বন্দনা। তার উষ্ণ অধর, কামনামদির চোখ আর অস্থির হাতে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম আমি।

সে ঘটনার পর আমি এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক হইনি। মদিরা খেয়েই যাচিছ, সিগারেট টেনেই যাচিছ-অস্থিরতা কমছে না। নিজেকে ছোটো মনে হচেছ। আজকে সকালে বাঘটা দেখে আমরা মনে হয়েছিল এ কষ্টকর মৃত্যুই কী তবে আমার প্রায়শ্চিত্ত! এত সহজ! তাই বাঘটা যখন চলে গেল, নিজেকে ভাগ্যবান মনে হলো। ভাবলাম কারন আমি অন্তত কনফেস করতে পারবো, প্লীজ মিতুল চিঠিটা শেষ পর্যন্ত পড়ো, প্লীজ।

কী বলব আর আমি, তোমার তায়েফ আজ তোমার সমস— প্রতিজ্ঞা ভেঙ্গে হয়েছে বিশ্বাস হন্তা। নিজেকে নয় তোমার বিশ্বাসের মৃত্যু আমি কীভাবে সইবো? নিজেকে শয়তানের চেয়েও নিকৃষ্ট মনে হচেছ যার সব ওয়াদাই প্রতারনা ছাড়া কিছু না। নিজেকে মনে হচেছ জুডাস, যে কীনা প্রভু যিশুর সাথে চরম প্রতারনা করেছিলো। তবে কী জানো, আমি আজো ভাবি ফিরেই তোমাকে নিয়ে যাবো লং-ট্রিপ-এ। কেউ থাকবেনা। হারিয়ে যাব অনেক দূরে কোলাহল ছেড়ে একটু আড়ালে, তুমি আর আমি সাথে প্রকৃতির নিস্তব্ধতা, ঘুট ঘুটে আধার, একটু হিমেল হাওয়া, সেখানে তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকব। নিরালায়, একাকী দু‘জনা। সবই স্বপ্ন, কোনদিনই হয়তো আর তোমায় পাবো না। কিন্তু তোমার জন্যই আমি ছিলাম তোমাকে মনে করেই থাকব। এটাই আমার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত। হয়তো কখনো বলবে কেন বলেছিলাম এ কথা। মনে পড়ে তোমার, একদিন আমাকে একটি বই দিয়েছিলে; 'চঁাদের অমাবশ্যা' ওটা পড়ে বলেছিলাম, একজন মানুষের সব সময়ই উচিৎ নিজেকে নিজের কাছে ওপেন রাখা। নিজের কাছে বিশ্বস্ত থাকা। কখনও যেন তাকে নিজের মুখোমুখি হলে চোখ ফিরিয়ে নিতে না হয়। নিজের কাছে যে হেরে যাবে, পৃথিবীর তাকে হারাতে কোন সমস্যাই হবে না, গ্রাম্য শিকের সেই চরিত্রটা সর্বদাই আমি মনে রেখেছি। আজ, এখন থেকে অন্তত এটুকু আমি বলতে পারবো যে, নিজেকে আমি ঠকাই নি। নিজের বিবেকের সামনে তো দাড়াতে পারবো! নিজের চোখে চোখ রেখে বলতে পারব, আমি অপরাধী কিন্তু spine less নই। অপরাধী যখন নিজেকে বুঝতে পারে তখন তাকে কী আর অপরাধী বলে? আমি তোমার কাছে ক্ষমার্হ কিনা জানিনা, কিন্তু নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার মতো elementsআমার আছে।

আমি পরজম্মে বিশ্বাসী নই, কিন্তু আজ প্রচন্ড ভাবে চাইছি আমার নবজম্ম হোক। পরজম্মেও আমি তোমাকে চাই। চাই এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে। চাই সেখান থেকে বীর দর্পে বেরিয়ে তোমার কাছে ছুটে আসতে, তখন তো আমায় ক্ষমা করবে তুমি। করবে না?

তোমারই
তায়েফ


সিমন

বিজয় স্মরনীর বিশাল জ্যামে আটকে আছি। সময় দুপুর ৩টা, এখন যতদূর সম্ভব বসন্তকাল। কাঠফাটা গরমে সি.এন.জি'র ভেতরে ঘামতে ঘামতে দু'নটে কবির নাম হাতড়াচিছ, যারা বসন্ত নিয়ে বহু প্যাচাল পারছে; ইচছা কষে গালাগাল করবো, কিন্তু কোন (বলার অযোগ্য) নাম খুজে পাচিছ না। এখান থেকে যাব মীরপুর-ছোট ফুফুর বাসায়। উদ্দেশ্য মহৎ না কিছু কামাই, দুপুরের খাওয়া (বোধ হয় বিকেলে খেতে হবে) ইত্যাদি, ইত্যাদি। (বলার অযোগ্য) কিছু লোক দেশের শীর্ষ নেতা মন্ত্রী, ইচ্ছে করে লাথি মেরে ওদের (বলার অযোগ্য) গলিয়ে দিই। নাহ; সিমন, কুল ... বি কুল। কিন্তু কী ভাবে, নিজের সাথে বোধ হয় আবার শুরু হলো। 'ন তুমি নিজেকে নিয়ে ভাবো। দূরের ভিক্ষুকটার কথা ভাবো, যে কিনা রোদে...' চুপ থাক, বেতমিজ। চার পাশে একগাদা এ.সি গাড়ি, ভেতরে চিরায়ত বাংলার শাশ্বত নারী, কেউ কেউ প্রায় বিবসনা, ওদের না দেখে দেখব ভিক্ষুক? মজা নাও! নিজেকে নিয়ে হতাশ হচ্ছো'?সোনার জান, তুমি জানোনা, আমার চাকরি নাই। তোমার সাথে কথা বইলা ছাড়লাম চাকরিটা। সাতদিনে গিলে ফেললা?
'ওটা তোমার জন্য ছিল না'।
আমার জন্য তো জ্যামের মধ্যে বিবসনা নারী, দুজনের মধ্যে কাঁচের দেয়াল। একজন মেরুতে মরুভাবে, আরেকজন মরীচিকার কোপানলে, নাহ্ তেমার সেরিলাক-টা আজকাল জমছে না, অন্যকিছু ভাবো। অন্য কিছু।

রাতে ফুফুর বাসায় বসে আছি। বারান্দায় বসে সিগারেটটা মাত্র ধরালাম। দেখি জল্লাদ (বোন)।
 ও তুই! (টানতে টানতে) জানিস, যখন আমি তোর বাসায় আসি তখন প্রতিবারই ভাবি কোন একটা কেল্টুরে ধইরে আনব। তারপর তোর শাদী। আর আমার মহানন্দে ধোয়ার রিং, এই যে একটা।
 আহা, জানো না আমার বয়স হয়নি। দেশে কি আইন নাই? ক্যাক করে ধইরে.....
 আইন কানুন! কে? ঐ যে একটা সাদা মুর্তি, চোখে কালো পট্টি বাধা? হাতে পাল্লা! চিনিতো ওকে-কী বলে যেন-হ্যা হিন্দিতে 'আন্ধা কানুন', অমিতাভের ছবি, দেখেছি তো।
 উফ! তোমারে ধরে........
 কিছু হবে না কুনো লাভ নাই। এই যে সিগারেট শেষ। এবার ফোট, তোর বাপ আসলে বলবি যে আমি ঘুমোচ্ছি। গুড নাইট।

ব্যাংকে আছে ছ'হাজার মাসের বাকী বিশ দিন। পকেটে ফুফু'র টাকা সহ প্রায় পনেরোশ বিশ টাকা (বিশ টাকাটাই আমার)। এখন বারো দিন যাবে, আট দিনের মধ্যে দু'দিন যদি....... নাহ্। কাল সুমন ভাইয়ের কাছে যাব। হাতে তিনটা লেখা আছে গল্প, কলাম আর সমালোচনা, যেইটা নেয় ওইটার উপর টাকা, মাস গেলে চাকরি নেব। মোবাইলটা জ্যান্ত-ই আছে। আর মনে হয় কোন প্রব্লেম হবে না।

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): গল্প ;
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার ডায়েরি  বিভাগে ।

 

  • ৩ টি মন্তব্য
  • ১৪৩ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ০ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ০৮ ই মে, ২০০৭ বিকাল ৪:০৩
comment by: সন্ধ্যাবাতি বলেছেন: খুব ভাল লেগেছে। আগের পর্বগুলো ভুলে গিয়েছি কিন্তু, ঘটনা কিচ্ছু মনে নেই। পর্বগুলো এত সমৃদ্ধ যে এক একটা আলাদা করে পড়লেও ভালো লাগে। মিতুলকে লেখা চিঠিটা সুন্দর... ছেলেটাকে এবারের মত মাফ করা যায়, তবে দ্বিতীয়বার একই ভুল হলে মেরুদন্ড সোজা করে মাফ করতে আসলে বুঝা যাবে প্রবলেম হ্যাজ! :)
২. ০৮ ই মে, ২০০৭ বিকাল ৪:০৫
comment by: সন্ধ্যাবাতি বলেছেন: করতে = চাইতে
৩. ০৮ ই মে, ২০০৭ বিকাল ৪:২০
comment by: ঝড়ো হাওয়া বলেছেন: এত বড় ?!

 

 


পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ৮৮৭৭